protichinta

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা: আখ্যান ও বাস্তবতা

সোহরাব হাসান

মিথস অ্যান্ড ফ্যাক্টস: বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার—হাউ ইন্ডিয়া, ইউএস, চায়না অ্যান্ড দ্য ইউএসএসআর শেপড দ্য আউটকাম—বি জেড খসরু \ রূপা অ্যান্ড কোং, দিল্লি ২০১০ \ ৪৬২ পৃষ্ঠা \ ৫৯৫ রুপি

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষের যে পৃথক দুটি ভূখণ্ড নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের পত্তন ঘটেছিল, সেই ভূখণ্ডদ্বয়ের মানুষের মধ্যে ধর্ম ছাড়া কোনো বন্ধন ছিল না। তাদের ভাষা ভিন্ন, সংস্কৃতি ভিন্ন, জীবনাচরণ ভিন্ন। তবে এসব ভিন্নতা সত্ত্বেও যে উপাদানটি রাষ্ট্রকে একত্র রাখতে পারত, তা হলো গণতন্ত্র। শুরু থেকে পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামো ও শাসনব্যবস্থায় গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি ছিল প্রকট। পাকিস্তানের ইতিহাসে একবারই সাধারণ নির্বাচন হয়েছে—১৯৭০ সালে; কিন্তু কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী সেই রায় বানচাল করতে নানা অপকৌশলের আশ্রয় নেয়; ফলে দেশটির ভাঙন ত্বরান্বিত হয়।

সে আলোচনায় যাওয়ার আগে আমরা পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোগত দুর্বলতার দিকে আলোকপাত করব। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে মুসলিম লীগের অধিবেশনে যে প্রস্তাব নেওয়া হয়, যার উত্থাপক ছিলেন বাঙালি নেতা এ কে ফজলুল হক—তাতে এক পাকিস্তানের কথা ছিল না, ছিল ‘ভৌগোলিক দিক থেকে পরস্পরসংলগ্ন ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলের মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে প্রয়োজনবোধে সীমানা রদবদল করে এমনভাবে গঠন করা হবে, যাতে ওই এলাকাগুলো স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ (ইনডিপেনডেন্ট স্টেটস) প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ক্ষেত্রে ওই সব রাষ্ট্র গঠনকারী সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো স্বশাসিত এবং সার্বভৌম থাকবে।’

তবে এই স্বশাসিত ও সার্বভৌম ইউনিটগুলোর সঙ্গে ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের সম্পর্ক কী হবে, সে বিষয়টি মুসলিম লীগ কিংবা এর নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কখনো খোলাসা করেননি; অন্তত ১৯৪৬ সালে দিল্লি অধিবেশনের আগ পর্যন্ত। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের পরও জিন্নাহ কেন্দ্রীয় সরকারে মুসলমানদের হিস্যা নিয়ে দরকষাকষি করেছেন। দেশ বিভাগের আগে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারে প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন। ১৯৪৬ সালে দেশ বিভাগ রোধ করতে ক্যাবিনেট মিশন যে আপস-ফর্মুলা দিয়েছিল, তাও মুসলিম লীগ প্রথমে মেনে নেয়। পরে কংগ্রেসের অনমনীয় মনোভাবের কারণে তারা পিছু হটে। ক্যাবিনেট মিশন কেন্দ্রের হাতে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ রেখে তিনটি পৃথক ‘স্বাধীন ও সার্বভৌম’ ইউনিট গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিল। এতে পশ্চিমাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে দুটি এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ বাকি অংশ নিয়ে একটি ইউনিট গঠনের কথা বলা হয়েছিল।

১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের দিল্লি অধিবেশনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ লাহোর প্রস্তাব সংশোধন করে এক পাকিস্তান গঠনের প্রস্তাব অনুমোদন করিয়ে নেন। বঙ্গীয় মুসলিম লীগ সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম ছাড়া বাংলার অন্য কোনো নেতা এর প্রতিবাদ করেননি। ইতিমধ্যে বাংলার রাজনীতিতে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। ১৯৪১ সালে লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপক এ কে ফজলুল হক মুসলিম লীগ থেকে বহিষ্কৃত হন। মুসলিম লীগকে বাংলায় জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠায় অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন যে দুজন নেতা—হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম—ধীরে ধীরে তাঁরা পেছনের সারিতে চলে যান। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের সফলতার পেছনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বলিষ্ঠ ভূমিকা থাকলেও তাঁর স্থলে প্রধানমন্ত্রী হন পাঞ্জাবিদের বশংবদ নেতা খাজা নাজিমুদ্দিন। দেশ বিভাগের ঠিক আগমুহূর্তে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের নেতা সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গীয় কংগ্রেস নেতা শরত্ বসু স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েও সফল হননি। তার আগেই ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ ঘটে গেছে। বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ দুই পৃথক রাষ্ট্রকাঠামোয় নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এ ব্যাপারে একতরফা কংগ্রেসকে দায়ী করা সমীচীন নয়। অবিভক্ত ভারতে মুসলমান এবং অবিভক্ত বাংলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে সংখ্যালঘু মনস্তত্ত্ব প্রবলভাবে কাজ করেছে।

২.

অবিভক্ত ভারতে পাকিস্তান ছিল বাঙালি মুসলমানদের স্বপ্নভূমি। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর প্রথমেই ধাক্কা খেল অবাঙালি মুসলিম নেতা ও তাঁদের অনুগত লেখক-বুদ্ধিজীবীদের বৈরী আচরণে। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির মাতৃভাষার বিপক্ষে অবস্থান নেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এক মাসের মাথায় ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত তমুদ্দুন মজলিস পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষা বাংলা ও উর্দু করার দাবি জানায়। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি কংগ্রেস নেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গণপরিষদে ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব করলে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানসহ সব পশ্চিমা নেতা এর বিরোধিতা করেন। ১১ মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সারা প্রদেশে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে এক চুক্তি সই করেন। এতে বলা হয়:

এপ্রিল মাসে ব্যবস্থাপক সভায় এই মর্মে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হইবে যে, বেসরকারি আলোচনার জন্য যেই দিন নির্ধারিত হইয়াছে, সেই দিন বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করিবার এবং তাহাকে পাকিস্তান গণপরিষদে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের পরীক্ষাদিতে উর্দুর সমমর্যাদা দানের জন্য একটি বিশেষ প্রস্তাব উত্থাপন করা হইবে।

এই চুক্তির ১০ দিন পর গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা এসে রমনা রেসকোর্স ময়দানে পাঁচ লাখ লোকের সমাবেশে ঘোষণা দেন, ‘উর্দু, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ এর মাধ্যমে তিনি প্রাদেশিক সরকারের চুক্তি অগ্রাহ্য করেন। ছাত্রসমাজ তাত্ক্ষণিক তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানায়। পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের পক্ষ থেকে তাঁকে একটি স্মারকলিপি দিলেও তিনি আমলে নেননি। জিন্নাহ ঢাকায় তাঁর বিদায়ী ভাষণেও সবাইকে পাকিস্তানি হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন এবং বাঙালি, সিন্ধি কিংবা পাঞ্জাবি পরিচয়কে দেশের সংহতির জন্য বিপজ্জনক হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তাঁর ভাষণে সিন্ধি ও পাঞ্জাবির কথা উল্লেখ থাকলেও মূল লক্ষ্য ছিল বাঙালি। চার বছর ধরে চলতে থাকা বাঙালির ভাষার সংগ্রাম শিখরে পৌঁছে বায়ান্নর ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত ঘটনা এবং কয়েকজন তরুণের প্রাণ উত্সর্গের মধ্য দিয়ে। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকার করা হলেও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে চলতে থাকে নানা ষড়যন্ত্র। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কখনো দেশের সংহতি, কখনো ধর্মরক্ষা, আবার কখনো ভারতীয় আগ্রাসনের অজুহাত তুলে বাঙালিকে পদানত রাখার অপচেষ্টা চালায়।

এর পাশাপাশি পূর্ববঙ্গের অর্থনৈতিক বঞ্চনাও বাড়তে থাকে, যার প্রতিফলন দেখতে পাই বেগম শায়েস্তা সোহরাওয়ার্দী ইকরামুদ্দৌলার বক্তব্যে। ১৯৪৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদ বিতর্কে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘A feeling is going among the Eastern Pakistan is being neglected and treated merely as a ‘Colony’ of west Pakistan. We must do everything possible to eradicate this falling’.

দুর্ভাগ্যজনক যে, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কখনোই বাঙালিদের আবেগ-অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করেনি। তাদের অব্যাহত বৈরী ও বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে বাঙালি নিজ দেশে পরবাসী হয়ে যায়। পাকিস্তানে বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও রাজধানী প্রতিষ্ঠা করা হয় পশ্চিম পাকিস্তানে, সেনাবাহিনী ও কেন্দ্রীয় সরকারে তাদের অংশ ছিল নগণ্য। কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেটের অধিকাংশ বরাদ্দ হয় পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে, যদিও পূর্ববাংলার পাটই ছিল পাকিস্তানের প্রধান রপ্তানি পণ্য। এ ব্যাপারে একজন বিদেশি কূটনীতিকের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে:

পাকিস্তানের দুই অংশ যে শুধু ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন ছিল তা-ই নয়, জাতি ও সংস্কৃতিগত দিক থেকেও ছিল আলাদা। তাদের পররাষ্ট্রবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল অনেকটাই ভিন্ন। পশ্চিম পাকিস্তান ছিল কড়া ভারতবিরোধী এবং পুরো কাশ্মীর হাসিল করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ভারতের ব্যাপারে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ অনেক নমনীয় ছিল...পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের কাছে কাশ্মীর বিশেষ আগ্রহের জায়গায় ছিল না।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়, যে সংগঠনটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসকদের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে যায়। এরপর পূর্ববঙ্গে মুসলিম লীগ আর রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ৩০০ আসনের প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক সভায় তারা মাত্র নয়টি আসন পায়। যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয়ও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সহজে মানতে পারেনি। এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠিত হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার আদমজী মিলে দাঙ্গা লাগিয়ে প্রদেশে ৯২-ক ধারা জারি করে, যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেয়। সংবিধান প্রণয়ন নিয়ে অচলাবস্থার একপর্যায়ে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ গণপরিষদও ভেঙে দেন এবং প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে নাজিমউদ্দিনকে অপসারণ করেন। পূর্ববাংলা থেকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মোহাম্মদ আলী (বগুড়া) স্বল্প সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী হলেও মূল ক্ষমতা ছিল পাকিস্তানি সামরিক-বেসামরিক আমলাদের হাতেই। ১৯৫৬ সালের ৩১ জানুয়ারি করাচিতে গণপরিষদে বিরোধী দলের নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রস্তাবিত সংবিধানের বিরোধিতা করে বলেছিলেন, ‘আমি এমন সংবিধান চাইনি যা দেশের একাংশের স্বার্থের উদগ্র তাগিদে অপরাংশের স্বার্থের পরিপন্থী হবে।’ ১৯৫৬ সালে সংখ্যাসাম্যের নামে পূর্ববাংলার জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী সেই সংবিধানই চাপিয়ে দেওয়া হয় এবং সোহরাওয়ার্দীও তা মেনে নেন। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ ভেঙে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, যাতে বামপন্থীদের সমাবেশ ঘটে। বাঙালির প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ এবং ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করতেই ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করা হয়। এ সময় পূর্ববঙ্গের অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিষয়টি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন একদল বাঙালি অর্থনীতিবিদ। অধ্যাপক রেহমান সোবহানের ভাষায়, ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, উন্নয়নের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বৈষম্যের অবসান ও প্রদেশগুলোর হাতে ক্ষমতা প্রত্যর্পণের ওপর জনগণের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়।’ ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তির সনদ নামে যে ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন, তারও মূল কথা অর্থনৈতিক বৈষম্যের অবসান।

ছয় দফায় প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রা ব্যতীত সব বিষয় আঞ্চলিক সরকারের হাতে ন্যস্ত করার কথা বলা হয়েছিল। এমনকি মুদ্রার ক্ষেত্রেও দুটি পৃথক অথবা সহজে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা চালুর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারা এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন। আইয়ুব খান অস্ত্রের ভাষায় এর জবাব দিতে থাকেন। ছয় দফার পক্ষে প্রচারণা চালাতে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতা গ্রেপ্তার হন। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন হরতালের মধ্য দিয়ে ছয় দফা আন্দোলন বেগবান হয়। অবশ্য এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্কও কম ছিল না। এর আগেই মস্কো-পিকিং বিরোধে কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ হয়ে যায়। মস্কোপন্থীরা ছয় দফা কর্মসূচির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করলেও পিকিংপন্থীরা এর বিরোধিতা করেন। মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, পিডিপিসহ সব ডানপন্থী দল ছয় দফাকে পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতির জন্য বিপজ্জনক মনে করত। অন্যদিকে ১৯৬৮ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্যের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে আইয়ুব সরকার।

১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানে আইয়ুব শাহীর পতনের পর শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি অর্থনীতিবিদদের ছয় দফার আলোকে একটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নেওয়ার কথা বললে তাঁরা বলেছিলেন, ‘আক্ষরিক অর্থে ছয় দফা অনুসরণ করলে এক দেশ থাকে না।’ মুজিবের উত্তর ছিল, ‘সেটি আপনাদের ভাবতে হবে না। আপনারা অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিন।’

ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেনারেল আইয়ুবের পতন ঘটলে দৃশ্যপটে আসেন আরেক সেনাশাসক ইয়াহিয়া খান। লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে তিনি সত্তরের ৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। এই নির্বাচনের ফল নিজেদের পক্ষে নিতে পাকিস্তানি সামরিক-বেসামরিক চক্র নানামুখী চেষ্টা চালায়। আওয়ামী লীগকে ঠেকাতে নির্বাচনের আগে জামায়াত ও মুসলিম লীগসহ ডানপন্থী দলগুলোকে প্রচুর টাকা দেওয়া হয়। নির্বাচনের ফল নিয়ে পাকিস্তানি শাসকদের মধ্যেও আশঙ্কা ছিল । গোয়েন্দা সংস্থা তাদের আশ্বস্ত করে, ‘কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না।’

কিন্তু শাসকগোষ্ঠীকে হতচকিত করে দিয়ে আওয়ামী লীগ কেবল পূর্ব পাকিস্তান নয়, সমগ্র পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে (৩১৩ আসনের মধ্যে ১৬৭)। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান পিপলস পার্টি পায় ৮৮টি আসন। মুসলিম লীগসহ ডানপন্থী দলগুলোর ভরাডুবি ঘটে। এ অবস্থায় পাঞ্জাবি সামরিক-বেসামরিক চক্র নতুন করে ষড়যন্ত্র আঁটতে থাকে। পিপিপির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো তাদের সঙ্গে হাত মেলান এবং দুই আঞ্চলিক দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান।  অন্যথায় পেশোয়ার থেকে করাচি পর্যন্ত অচল করে দেওয়ারও হুমকি দেন। ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণা দিলে ছয় দফার সংগ্রাম গিয়ে এক দফা অর্থাত্ স্বাধীনতা অভিমুখে যাত্রা করে।

এসব ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল? স্নায়ুযুদ্ধকবলিত বিশ্বে তখন বৃহত্ রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা কী ছিল? কারা সেদিন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল? কারা বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল? বিভিন্ন দেশের বই, পত্রপত্রিকা ও দলিলপত্রে এর কিছু বিবরণ ও বিশ্লেষণ আমরা পাঠ করেছি। এ সম্পর্কে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ-লেখক-বুদ্ধিজীবী-গবেষকেরা লিখেছেন, ভারতীয় লেখক-গবেষকেরা লিখেছেন, লিখেছেন পাকিস্তানের রাজনীতিক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তারাও। আবার বাংলাদেশের ঘটনায় সম্পৃক্ত ছিলেন এ রকম কয়েকজন বিদেশি কূটনীতিকও বই লিখেছেন। অবমুক্ত হয়েছে মার্কিন দলিলপত্র। এসব তথ্য-উপাত্ত থেকে আমরা ধারণা করতে পারি, একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আন্তর্জাতিক রূপ নিয়েছিল।

৩.

মিথস অ্যান্ড ফ্যাক্টস: বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার—হাউ ইন্ডিয়া, ইউএস, চায়না অ্যান্ড দ্য ইউএসএসআর শেপড দ্য আউটকাম—বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিয়ে রচিত একটি বই। লিখেছেন বি জেড খসরু, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি সাংবাদিক। লেখকের দাবি অনুযায়ী, শুধু অবমুক্ত করা দলিল নয়, অবমুক্ত করা হয়নি এমন বেশ কিছু মার্কিন দলিল এ বইয়ে সংযোজিত হয়েছে। এতে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের ভূমিকাও বিশ্লেষণ করেছেন, অবশ্য সব ক্ষেত্রে সাক্ষ্য মেনেছেন মার্কিন সরকারি ভাষ্যকে। লেখক তাঁর বইয়ের উত্স হিসেবে ব্যবহার করেছেন সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলো থেকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে কিংবা পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে দূতাবাসগুলোতে পাঠানো বার্তা, হোয়াইট হাউস ও পররাষ্ট্র দপ্তরে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন বৈঠকের বিবরণী, কংগ্রেস কমিটিতে বিভিন্ন রাজনীতিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য। লেখকের ভাষায়, ‘Despite its grounding in the events that shaped the Bangladesh liberation war, this book narrates a tale that touches Americans foray into the subcontinent as far back as early 1940’s.’

বি জেড খসরু যথার্থই বলেছেন, ‘দক্ষিণ এশীয় জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও লক্ষ্যের সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশটির লক্ষ্যের মিল কদাচিত্ ঘটে থাকে। তাঁরা আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদী ও শোষণকারী দেশ হিসেবেই বিবেচনা করে থাকেন। তার পরও কোথায় যেন একটি বন্ধন আছে, যা অগ্রাহ্য করা যায় না।’

বইয়ে লেখক যেসব আমেরিকান অনবমুক্ত তথ্য ব্যবহার করেছেন, তার কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা যাক।

পৃষ্ঠা ৪১৯: ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১, শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার জন্য আমেরিকার সহায়তা চেয়েছেন।

পৃষ্ঠা ৪২৬-৪২৭: ১০ মার্চ ১৯৭১, শেখ মুজিবুর রহমান মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্ল্যাডকে গোপন বার্তা পাঠান যে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের সংকট নিয়ে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনায় রাজি আছে।

পৃষ্ঠা ৪২০-৪২৫: শেখ মুজিবুর রহমান ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ সফরল্যান্ডকে বলেছেন, আওয়ামী লীগ নেতা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন করার পক্ষপাতী। যদিও তিনি (মুজিব) পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেছেন।

পৃষ্ঠা ৪২৮-৩০: ৩১ জুলাই ১৯৭১, আওয়ামী লীগ গণপরিষদ সদস্য কাজী জহিরুল কাইউম কলকাতায় মার্কিন কূটনীতিকদের জানান, আওয়ামী লীগের নেতারা ঘটনাবলিতে উদ্বিগ্ন এবং পাকিস্তানের সঙ্গে একটি রাজনৈতিক মীমাংসায় আসতে আগহী। কেননা ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বেধে গেলে এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রলম্বিত হলে বামপন্থীরা তা দখল করে নেবে।

এসব তথ্য যাঁর যাঁর সুবিধা অনুযায়ী ব্যবহার করেন। পাকিস্তানিরা  করেন শেখ মুজিবকে বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রমাণ করতে। অতি বামপন্থীরা করেন, ‘শেখ মুজিব স্বাধীনতা চাননি’—প্রমাণ করতে। বি জেড খসরু দিনক্ষণসহ সব তথ্য তুলে ধরলেও নিজে মন্তব্য করেননি। তবে তিনি যেভাবে অধ্যায়গুলো উত্থাপন করেছেন, তাতে পাঠক অতিবামপন্থীদের প্রচারণারই সমর্থক ভাবতে পারেন। স্নায়ুযুদ্ধের সেই টালমাটাল সময়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন ও অন্যান্য দেশ নিজ নিজ স্বার্থকে বড় করে দেখেছে, সন্দেহ নেই। যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল, তারা এ থেকে সুবিধা নিতে চেয়েছে, যারা বিরোধিতা করেছে, তারাও। অন্যদিকে উপমহাদেশের দুটি দেশ ভারত ও পাকিস্তান বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে, যার সূচনা ঘটে ১৯ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় বিমান ছিনতাই করে দুই কাশ্মীরি যুবকের লাহোরে অবতরণ-এর মাধ্যমে। সুযোগসন্ধানী পিপিপির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো তাঁদের জাতীয় বীর হিসেবে আখ্যায়িত করেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বিমান ছিনতাইয়ের তীব্র নিন্দা করেন। এ ঘটনার পর ভারত সরকার তাদের ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে পাকিস্তানি বিমান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে, যা যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখে।

তারও আগে ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর দক্ষিণাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা দুর্গত মানুষের ত্রাণ ও পুনর্বাসনে এগিয়ে এলেও কেন্দ্রীয় সরকারের বিমাতাসুলভ ভূমিকা বাঙালিদের ক্ষুব্ধ করেছিল। পশ্চিম পাকিস্তানি কোনো নেতা দুর্গতদের দেখতে না আসায় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পল্টন ময়দানে জনসভা ডেকে বলেছিলেন, ‘ওরা কেউ আসেনি।’ একাত্তরের মার্চে শেখ মুজিব সে কথাটি ভুট্টোকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। জবাবে ভুট্টো বলেছিলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষ মারা গেলে আমি কী করতে পারি?’ মুজিবের পাল্টা উত্তর ছিল, ‘অন্তত তাদের জানাজায় শরিক হতে পারতে।’১০ এই ছোট্ট ঘটনা থেকেই বাঙালিদের সম্পর্কে পাকিস্তানি নেতাদের দৃষ্টিভঙ্গি আঁঁচ করা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রেরও ধারণা ছিল বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যাবে, একসঙ্গে থাকবে না। কিন্তু শেখ মুজিবের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে তাদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী রজার্সসহ তাঁর মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করেন, তিনি (শেখ মুজিব) পশ্চিমমুখী। কিন্তু নিক্সন-কিসিঞ্জার তাঁদের সঙ্গে একমত ছিলেন না। তাঁদের মতে, মুজিব ভারত ও সোভিয়েত-ঘেঁষা।

২৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ডের বৈঠকের বিবরণটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। শেখ মুজিব সংকোচের সঙ্গে যে কথাটি বলেছেন তা হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত নীতির সঙ্গে না মিললে বন্ধুকে ত্যাগ করে। এবার তার জন্য আরেকটি পরীক্ষা। ইতিমধ্যে শেখ মুজিব জেনে গেছেন, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তান ভাঙার বিরোধী। তিনিও চান না, পাকিস্তান ভেঙে যাক। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকচক্র যদি নির্বাচনী রায় মেনে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে, তাহলে ভাঙন ঠেকানো যাবে না। সে অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কী হবে? মুজিবের প্রশ্নটি পররাষ্ট্র দপ্তরে পাঠানোর সঙ্গে নিজের ইতিবাচক মতও জুড়ে দেন রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ড। বৈঠকের বিবরণী থেকে আমরা আরও জানতে পারি, নির্বাচনী রায় মানার ব্যাপারে ইয়াহিয়া খানকে রাজি করাতে শেখ মুজিব যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছেন। আবার ৭ মার্চের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ ছিল মুজিব একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করেন কি না? তবে যা করেছেন, তাও স্বাধীনতার অনুরূপ বলে বিবেচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

এরপর পাকিস্তানে দ্রুত কিছু ঘটনা ঘটতে থাকে—১ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন এবং এর প্রতিবাদে পূর্ববাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ পালিত হয়। শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে বেসামরিক প্রশাসন চলতে থাকে, পাকিস্তান সরকারের কর্তৃত্ব কয়েকটি সেনানিবাসের মধ্যে সীমিত হয়ে পড়ে। সমঝোতার শেষ চেষ্টা ছিল ইয়াহিয়া-মুজিব আলোচনা। কিন্তু তাও ব্যর্থ হলে পাকিস্তান সরকার ২৫ মার্চ রাতে দেশব্যাপী গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে। গ্রেপ্তার হন শেখ মুজিবুর রহমান। তার আগেই বাঙালি প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু করে, যা শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতাকামী একটি জনগোষ্ঠীর পরিকল্পিত মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়।

প্রশ্ন উঠেছে, ২৫ মার্চ রাতে শেখ মুজিবের গ্রেপ্তার নিয়ে। সবাইকে ‘যার যা আছে তাই নিয়ে’ প্রতিরোধ গড়ার আহ্বান জানিয়ে কেন তিনি গ্রেপ্তার হলেন? এ ব্যাপারে মুজিব নিজে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর ধারণা ছিল তাঁকে না পেলে পাকিস্তানিরা সবকিছু জ্বালিয়ে দেবে। তিনি যেহেতু জনগণের নির্বাচিত নেতা সেহেতু পাকিস্তানি শাসকেরা তাঁকে অগ্রাহ্য করতে পারবে না।

গ্রেপ্তার না হয়ে কী করতে পারতেন তিনি? শেখ মুজিব চে গুয়েভারার মতো বিপ্লবী নন, জনপ্রিয় জাতীয়তাবাদী নেতা। তাঁর পক্ষে বাংলাদেশের কোনো অঞ্চলে আত্মগোপন করে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা সম্ভব ছিল না। ভারতে পালিয়ে যাবেন? তখন পাকিস্তানিরা তাঁকে ভারতের দালাল হিসেবে চিহ্নিত করত। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল পাকিস্তানিরা যত অত্যাচার-নির্যাতনই করুক বাঙালিকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না।

২৫ মার্চ সন্ধ্যায় অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান পাকিস্তান টাইমস-এর সম্পাদক মাজহার আলি খানকে নিয়ে ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে গেলে তিনি বলেছিলেন, ‘ইয়াহিয়া খান মনে করছেন আমাকে হত্যা করলেই আন্দোলন ধ্বংস করে দিতে পারবেন। কিন্তু তিনি ভুল করছেন। আমার কবরের ওপর স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি হবে।’১১

সাংবাদিক আতাউস সামাদও সেদিন রাতে ৩২ নম্বরে গিয়েছিলেন। লাইব্রেরি কক্ষে দেখা হতেই মুজিব বললেন, ‘আমি তোমাদের স্বাধীনতা দিয়ে দিলাম, এখন যাও সেটা রক্ষা করো।’১২

৪.

একাত্তরে বাংলাদেশ ছিল বিশ্ব রাজনৈতিক মঞ্চের অন্যতম প্রধান আলোচিত ও আলোড়িত বিষয়। মার্কিন দলিলপত্রের আকার এবং জাতিসংঘের বিতর্কের বিবরণী দেখলেই ধারণা করা যায়, বাংলাদেশের ঘটনাবলিতে যুক্তরাষ্ট্র মোটেই নিষ্ক্রিয় ছিল না। প্রায় প্রতিটি পর্যায়ে দেশটির ত্বরিত ও বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। তারা বন্ধু ও বৈরী রাষ্ট্রগুলোর মতামত জেনে কৌশল ঠিক করেছে। বিভিন্ন দেশের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতার উদাহরণ যেমন আছে, তেমনি আছে সহযোগিতার উদাহরণও। অনেক ক্ষেত্রে তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকেও উসকে দেয়। কিন্তু পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো কেন? গণতন্ত্রকে মাপকাঠি ধরলেও দেশটির পাকিস্তানকে সমর্থন করার কথা নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষেই তারা অবস্থান নিল—তা গবেষণার বিষয়। ঘটনাটি ১৯৭১ সালে না ঘটে ২০১১ সালে ঘটলে কী হতো? স্বীকার করতে হবে, বাংলাদেশ সে সময়ের দুই পরাশক্তির মধ্যকার বিরোধের সুবিধা পেয়েছে। দুই ফ্রন্টেই বাংলাদেশ জয়ী হয়, যুদ্ধক্ষেত্রে ভারতের সহায়তায় এবং জাতিসংঘে সোভিয়েতের সহায়তায়। আবার যুক্তরাষ্ট্র দুই ফ্রন্টেই পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে কূটনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে।

মার্কিন দলিলপত্র, বিশেষ করে কংগ্রেস ও প্রতিনিধি পরিষদের বিতর্ক থেকে জানা যায়, একাত্তরে বাংলাদেশ সম্পর্কে মার্কিন নীতি ও ভূমিকা একরৈখিক ছিল না। অর্থাত্ এক আমেরিকা বহু নীতি। কেউ পাকিস্তানের প্রতি মৌন ছিল, কেউ নিরপেক্ষতার ভান করেছিল, আবার কেউ মানবাধিকারের পক্ষে সোচ্চার ছিল। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে বিশ্বব্যাপী এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া আঁচ করতে পারেনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অথবা তারা চীনের সঙ্গে মৈত্রীর স্বপ্নে বিভোর ছিল। সে সময় ওয়াশিংটনে কর্মরত বাংলাদেশি কূটনীতিক আবুল মাল আবদুল মুহিত লিখেছেন, ‘জুলাইয়ের শুরুতে হেনরি কিসিঞ্জার যখন উপমহাদেশ ভ্রমণ করলেন, তখন বাংলাদেশ সংকট তাঁর কাছে মোটেই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল না। তিনি ছিলেন চীন-মার্কিন সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচনে ব্যস্ত।’

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি আগেই ২৬ মার্চের ভয়াবহ ঘটনার পূর্বাভাস পেয়েছিল? এর পক্ষে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় না। বাঙালি নেতা শেখ মুজিবের মতো তাদেরও ধারণা ছিল সেনা অভিযান হতে পারে সীমিত পর্যায়ে। কিন্তু ব্ল্যাডের বার্তায়ই তারা প্রথম জানতে পারে বাছাইকৃত গণহত্যার কথা। যেসব দলিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এত দিন যেভাবে পাঠক জেনেছেন, বুঝেছেন, দেখেছেন, বর্তমান বইটি তার থেকে কিছুটা ভিন্ন। অনেক ক্ষেত্রে বিপরীত বলেও প্রতীয়মান হবে।

অস্বীকার করা যাবে না, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে সবচেয়ে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা রেখেছেন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও তাঁর নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার। তাঁরা পররাষ্ট্র দপ্তরের অনেক সিদ্ধান্ত পাল্টে দিয়েছেন কিংবা বাস্তবায়ন করতে দেননি। তাঁরা বিভিন্ন মিশনে ভুল বার্তা পাঠিয়েছেন। আবার অপছন্দের কূটনীতিককে ফেরত নিয়ে গেছেন (যেমন ঢাকায় নিযুক্ত কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্ল্যাড)। কূটনীতিতে কিসিঞ্জার কখনো কখনো স্ববিরোধী ভূমিকাও পালন করেছেন। তিনি ভারতকে সাবধান করে দিয়ে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ হলে তাদের কোনো লাভ নেই। সেখানে বামপন্থীরা জয়ী হলে ভারতেও প্রবেশ করবে।’ চীনকে বলেছেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় সোভিয়েত প্রভাব বাড়তে দেওয়া হবে না।’ আবার পাকিস্তানকে বলেছেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানে তারা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে আমেরিকার আপত্তি নেই।’১৩

তবে মার্কিন প্রশাসন, পররাষ্ট্র দপ্তর একটি বিষয়ে একমত ছিল যে শেখ মুজিবের বিচার বা মৃত্যুদণ্ড হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। আগস্টে ইয়াহিয়া খান তাঁর বিচারের উদ্যোগ নিলে যুক্তরাষ্ট্র তার পক্ষে একজন দক্ষ আইনজীবী নিয়োগের জন্য চাপ দেয়। রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ড বারবার ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দেখা করে ওয়াশিংটনের উদ্বেগের কথা জানান।

বইয়ের ‘হোয়াই দ্য ইয়াহিয়া মুজিব টক ফেইল্ড: ডিড মুজিব ওয়ান্ট টু ব্রেক পাকিস্তান?’ অধ্যায়টি পাঠকের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দেবে। লেখক আমেরিকান দলিলপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলতে চাইছেন, মুজিব পাকিস্তান ভাঙতে চাননি। মুজিবের একাত্তর-পূর্ববর্তী রাজনীতি এর বিপরীত সত্যই তুলে ধরে। বাঙালি রাজনীতিকদের মধ্যে একমাত্র তিনিই অব্যাহতভাবে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর বিরোধিতা করেছেন। এখানে দুটি ঘটনার উল্লেখ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে:

এক. ১৯৬২ সালে তত্কালীন আত্মগোপনকারী কমিউনিস্ট নেতা মণি সিংহ ও খোকা রায়ের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেছিলেন, ‘দাদা, একটি কথা আমি খোলামনে বলতে চাই, আমার বিশ্বাস গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন এসব কোনো দাবিই পাঞ্জাবিরা মানবে না। কাজেই স্বাধীনতা ছাড়া বাঙালির মুক্তি নেই। স্বাধীনতার দাবিটা আন্দোলনে রাখা দরকার।’

কিন্তু কমিউনিস্ট নেতাদের বক্তব্য ছিল, ‘এখনই নয়। স্বাধীনতার দাবি তোলার আগে জনগণকে প্রস্তুত করতে হবে।’ মুজিব বললেন, ‘আপনাদের কথা মানলাম। একমত হলাম না।’১৪

দুই. ১৯৬৩ সালে শেখ মুজিব আগরতলা যান। এর আগে স্বাধীনতাকামী সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর কয়েক দফা বৈঠক হয়। ইনার সার্কেল নামে স্বাধীনতাকামী একটি গ্রুপের সিদ্ধান্তে তিনি আগরতলা যান স্বাধীনতাসংগ্রামে ভারতের সহযোগিতার জন্য। ইনার সার্কেল গ্রুপের প্রধান সংগঠক মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর বক্তব্য হলো:

আমাদের যেটা পরিকল্পনা ছিল মুজিবকে পার করে দিয়ে তখন লন্ডনে গিয়ে সুভাষ বোস-টাইপের একটা মুভমেন্ট করার। সুভাষ বোস যেমন বাইরে থেকে আলাপ করেছিল, সেভাবে পৃথক্করণের সংগ্রামে শেখ মুজিব আলাপ করবেন। আমাদের প্ল্যান ছিল শেখ মুজিব আগরতলা ক্রস করে যাবেন। রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলবেন। কিন্তু আগরতলা থেকেই তাঁকে ফিরে আসতে হয়।১৫

কেবল ইতিহাসখ্যাত ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ নয়, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে স্বাধীনতা অভিমুখী যতগুলো তত্পরতা ছিল তার প্রতিটিতে শেখ মুজিব প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েন।

৫.

বি জেড খসরু বইটি বিন্যস্ত করেছেন ২৩টি অধ্যায়ে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হাউ আমেরিকা ভিউড ইস্ট পাকিস্তান ইন নাইনটিন সেভেনটি ওয়ান: জেনেসিস অব ইউএস পলিসি; পাকিস্তান ইন ট্রাবল; হোয়াই দি ইয়াহিয়া-মুজিব টকস ফেইলড: ডিড মুজিব ওয়ান্ট টু ব্রেক পাকিস্তান?; কিসিঞ্জারস ডিপ্লোম্যাসি: ট্রাস্ট উইথ ফেইলিওর; ব্ল্যাডস টেলিগ্রাম: ডিপ্লোম্যাটিক রিভোল্ট ইন ইস্ট পাকিস্তান; হোয়াই নিক্সন অপোসড ইন্ডিয়া: দি ইন্দো-ইউএস, সিনো-সোভিয়েত ইক্যুয়েশন; ডিড ইয়াহিয়া ওয়ান্ট টু হ্যাং মুজিব?; মোশতাক-ইউএস সেকরেট টকস: হোয়াট রিয়েলি হ্যাপেন?; পাকিস্তান ক্রাইসিস: সুপার পাওয়ার গেইম; আমেরিকা ওয়েকস আপ: স্মেলস ওয়ার অপারেশন লিবারেটেড ঢাকা; বাংলাদেশ উইনস ফ্রিডম: আমেরিকা ফেসেস নিউ রিয়েলিটি। অধ্যায়গুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, পাঠক একটি ধারাবাহিকতা পাবেন। তবে সব আলোচনার উত্স যেহেতু মার্কিন দলিলপত্র, তাদের নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গিই প্রাধান্য পেয়েছে।

আলোচ্য বইয়ে উত্থাপিত তথ্য-উপাত্ত থেকে জানতে পারি, বাংলাদেশ নিয়ে নিকসন প্রশাসনের সঙ্গে পররাষ্ট্র দপ্তরের যেমন বিরোধ ছিল, তেমনি পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে কংগ্রেসেরও দূরত্ব ছিল। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকায় নিক্সন প্রশাসন পাকিস্তানে অস্ত্র ও সাহায্য পাঠানোর প্রস্তাব পাস করাতে পারেনি। তবে আপসরফা হিসেবে অস্ত্র পাঠানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় ভারত ও পাকিস্তান—দুই দেশের ওপরই। কংগ্রেস ও প্রতিনিধি পরিষদের অধিকাংশ সদস্য বাংলাদেশের ঘটনাবলিকে দেখেছেন গণতন্ত্র হরণ ও মানবিক বিপর্যয় হিসেবে। তাঁদের কাছে পাকিস্তানের সংহতির চেয়ে বড় ছিল নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। অনেক কংগ্রেস সদস্য ও সিনেটর পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও নৃশংসতার নিন্দা করেছেন। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ও ভারতের প্রতিনিধিরা মার্কিন কংগ্রেস ও প্রতিনিধি পরিষদে লবি করেন। একাত্তরের আগস্টে সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি শরণার্থীদের অবস্থা দেখতে ভারত ও পাকিস্তান সফরের সিদ্ধান্ত নেন। পাকিস্তান সরকার তাঁর সহযোগীদের ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তিনি পাকিস্তান সফর বাতিল করেন। ভারতে বাংলাদেশি শরণার্থীদের দুরবস্থা দেখে দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলন করে নিক্সন প্রশাসনের কঠোর সমালোচনা করেন। পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পটভূমিতে কেনেডি বলেন, ‘এই যুদ্ধ শুরু হয়েছে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংস নির্যাতনের মধ্য দিয়ে। দক্ষিণ এশিয়ায় মানবিক বঞ্চনা ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া সত্ত্বেও দীর্ঘ আট মাস আমাদের জাতীয় নেতৃত্ব নীরব ও নির্বিকার ছিল।’১৬

২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ডের ধারণা ছিল, মুজিব একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। তিনি তা করেননি। বরং মুজিব জানিয়ে দিলেন, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তান সরকারকে যে সাহায্য দেয় তার এক-চতুর্থাংশ তাঁকে দিলে তিনি বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করতে পারবেন। ছয় দফায় বহির্বিশ্বের সঙ্গে চুক্তি করার এখতিয়ার প্রাদেশিক সরকারের হাতে রাখা হয়েছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে শেখ মুজিব পাকিস্তান ভাঙতে চাইবেন কেন? তিনি জানতেন, তাঁর দাবি মেনে নিলে পাকিস্তানের অস্তিত্ব থাকে না। অন্তত আগে যে কাঠামোয় ছিল। তিনি বল পাকিস্তানিদের কোর্টেই ছেড়ে দিলেন।

এর আগে অবশ্য আরও কিছু ঘটনা ঘটে। ১১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের বৈঠকে বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা না দিয়ে সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই বৈঠকে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা এস এ সউদ এর বিরোধিতা করেন এবং পরে তিনি বাঙালি কর্মকর্তাদের কাছে জানিয়ে দেন। বাঙালি কর্মকর্তারা বিষয়টি শেখ মুজিবকে অবহিত করেন বলে মার্কিন সূত্র নিশ্চিত করেছে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শেখ মুজিব গভর্নর এস এম আহসান ও উপসামরিক প্রশাসক সাহেবজাদা ইয়াকুব খানের সহায়তা কামনা করেন। তত দিনে তাঁদের বদলির আদেশ হয়ে গেছে। এই দুজনের সঙ্গেই শেখ মুজিবের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো ছিল।

ওয়ালি খান ও বেজেঞ্জোর সঙ্গে বৈঠক, আমেরিকান রাষ্ট্রদূত ও মিশনপ্রধানের আলোচনার সূত্র ধরেই বি জেড খসরু প্রশ্ন তুলেছেন, মুজিব কি পাকিস্তান ভাঙতে চেয়েছেন? দেশ বিভাগের প্রেক্ষাপটে একই কথা জিন্নাহ সম্পর্কেও বলা হতো। তবে দুটোর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হলো—একটি ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজিত হয়েছে, আরেকটি ভাষা, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে।

জিন্নাহ ছিলেন সংখ্যালঘু দলের নেতা। শেখ মুজিব সংখ্যাগুরু দলের নির্বাচিত নেতা। তিনি বিচ্ছিন্ন হতে চাইবেন কেন? সে কথাটিই তিনি ওয়ালি খান ও বেজেঞ্জোকে বলেছেন। তা ছাড়া রাজনীতিক হিসেবে তিনি তাঁর কর্মকৌশল ও পরিকল্পনার সব কথা আমেরিকানদের কাছে ফাঁস করবেন না, সেটাই স্বাভাবিক। ইয়াহিয়াকে ক্ষমতা হস্তান্তরে রাজি করাতে শেখ মুজিব যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছেন তেমনি ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে, অধিবেশন স্থগিত হওয়ারও আগে ভারতের সহায়তা চেয়েছেন। দলের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদের মাধ্যমে ঢাকার ভারতের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলেছেন। এই বৈঠকে সম্ভাব্য সব সহযোগিতার আশ্বাস পেলেও সাহায্যের প্রকৃতি বা পরিমাণ নিয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি।১৭

যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা ছিল যুদ্ধ বাধলে পাকিস্তানের পরাজয় নিশ্চিত। সে কারণে তারা রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর জোর দেয়। কিন্তু ইয়াহিয়া খান যাঁকে দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়েছেন, কীভাবে তাঁর সঙ্গে আলোচনায় বসেন? তিনি প্রবাসী মুজিবের সঙ্গে আলোচনার চেয়ে তাঁর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করাকে শ্রেয় মনে করেন। এ প্রেক্ষাপটে মার্কিন সরকার প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার জন্য কলকাতা মিশনকে নির্দেশ দেয়। প্রবাসী সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খোন্দকার মোশতাক আহমদ, গণপরিষদ সদস্য জহুরুল কাইউম ও রাষ্ট্রদূত হোসেন আলীর সঙ্গে মিশন কর্মকর্তাদের আট দফা বৈঠক হয়। ভারত সরকার প্রথম দিকে এ আলোচনার ব্যাপারে উত্সাহ দেখালেও পরে আপত্তি জানায়। এত দিন আমরা জেনে এসেছি, খোন্দকার মোশতাক আহমদ স্ব-উদ্যোগে মার্কিন মিশন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু মার্কিন দলিল বলছে, বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সম্মতি ও ইচ্ছায়ই তিনি আলোচনা করেন। বি জেড খসরু অবশ্য মন্তব্য করেছেন, একাত্তরের সূত্রেই খোন্দকার মোশতাক পঁচাত্তরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আস্থা লাভ করেছিলেন। মোশতাক একাত্তরে মার্কিনিদের এই বলে সতর্কও করে দিয়েছিলেন, যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে নকশাল বা কমিউনিস্টদের হাতে কর্তৃত্ব চলে যাবে। এই আশঙ্কা ভারত সরকারের একাংশের মধ্যেও ছিল। প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার যখন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ঝাঁর সঙ্গে কথা বলেন, তখন বারবার সোভিয়েত প্রসঙ্গ এসেছে। একপর্যায়ে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত নিজেকে আমেরিকাপন্থী প্রমাণের জন্য সব দোষ চাপান প্রধানমন্ত্রীর সোভিয়েতপন্থী সচিব পি এন হাকসারের ওপর। ভারত সরকারের নানামুখী নীতির কথা জানা যায় মঈদুল ইসলামের বইয়েও। বামপন্থীদের ঠেকাতে সে দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সক্রিয় সহযোগিতায় মুজিব বাহিনী গঠন করা হয় বলে অভিযোগ আছে। যদিও মুজিব বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় নেতাদের দাবি, ‘তাঁরা যা করেছেন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই করেছেন।’১৮

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথিত নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতিতে প্রথম ধাক্কা দেয় ঢাকার কার্যালয় জেনারেল আর্চার কে ব্ল্যাডের বার্তা। ২৮ মার্চ ১৯৭১, পররাষ্ট্র দপ্তরে পাঠানো বার্তায় বলেন:

Here in Dacca we are mute and horrified witness to a reign to terror by Pak military. Evidence continues to mount that the MLA qualitionaries have a list of Awami League supporters whom they are systematically eliminating by seeking them out in their homes and shooting them down.১৯

তিনি একে বাছাইকৃত গণহত্যা বলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর বার্তাটি পছন্দ করেনি নিক্সন প্রশাসন। এ কারণে বার্তার এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন করেন। তিন মাসের মাথায় তাঁকে ঢাকা থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

লেখক ঢাকার মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্ল্যাডের বইয়েরও উদ্ধৃতি দিয়েছেন। তাঁকে অভিহিত করেছেন বিদ্রোহী কূটনীতিক হিসেবে। এ রকম বিদ্রোহী কূটনীতিক ও কর্মকর্তা নিক্সন প্রশাসনে আরও ছিলেন নিশ্চয়ই।

৬.

বাংলাদেশের স্বাধীনতা কিংবা পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কোনোটি একাত্তরে মার্কিন কূটনীতিতে অগ্রাধিকার পায়নি। অগ্রাধিকার পেয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের স্বার্থ ও প্রভাব। এ ক্ষেত্রেও মার্কিন সরকারের মধ্যে মতভেদ ছিল। পররাষ্ট্রসচিব রজার্সসহ অন্যান্য কর্মকর্তা মনে করতেন, ভারতকে বৈরী করে দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করা যাবে না। কিন্তু নিক্সন-কিসিঞ্জারের চিন্তা ছিল চীন ও পাকিস্তানকে নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় সোভিয়েত প্রভাব কমানো। তাঁদের অভিযোগ ছিল পররাষ্ট্র দপ্তর অতিমাত্রায় ভারত ও সোভিয়েতপন্থী। তবে গণতন্ত্রের ত্রাতা হিসেবে পাকিস্তানি শাসকসৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় শরণার্থী সমস্যা পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। রাজনৈতিক সমাধানের ওপর তারা এ কারণে জোর দিত যে যুদ্ধ হলে পাকিস্তানের পরাজয় অবধারিত। মূলত মার্কিন চাপেই ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানে বেসামরিক সরকার গঠন করতে বাধ্য হন; যদিও তারা ছিল পুতুলমাত্র। ইয়াহিয়া চক্র যখন দেখতে পেল, পূর্ব পাকিস্তানকে কোনোভাবেই হাতে রাখা যাবে না, তখন মার্কিনদের সম্মতি ছাড়াই ভারত আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। তার পরও যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল সম্মানজনক যুদ্ধবিরতি। ১৪ ডিসেম্বর পোল্যান্ড জাতিসংঘে একই সঙ্গে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সীমান্তে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিলে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন তাকে স্বাগত জানায়। কিন্তু বাদ সাধে পাকিস্তান। পাকিস্তান প্রতিনিধিদলের নেতা ভুট্টো তখন ‘হাজার বছর ধরে যুদ্ধ’ করার প্রতিজ্ঞায় অটল। ইয়াহিয়া খান ইসলামাবাদ থেকে বারবার ভুট্টোকে পোল্যান্ডের প্রস্তাব সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কিছু শোনা যাচ্ছে না।’ তখন যে টেলিফোন অপারেটর তাঁদের সংযোগ করে দিয়েছিলেন তিনি বললেন, ‘আমি তো সব শুনতে পাচ্ছি’, ভুট্টো তাঁকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেন এবং বলেন, ‘তুমি চুপ করো।’ ইয়াহিয়া খান ১৯৭৯ সালে রিচার্ড সিসন ও লিওইরোজকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে এ ঘটনার কথা বলেছেন।২০

সম্মানজনক যুদ্ধবিরতি হলে তা ইয়াহিয়ার কৃতিত্ব হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানো কঠিন হবে। ভুট্টো সেই পথে পা বাড়াননি। ফলে পাকিস্তান ১৬ ডিসেম্বর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ভয় ছিল, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পশ্চিম পাকিস্তানও খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যেতে পারে। যুদ্ধবিরতি রেখা ডিঙিয়ে ভারতীয় সেনারা কাশ্মীর দখল করতে পারে। সোভিয়েত ইউনিয়নের মাধ্যমে উদ্বেগের কথা জানিয়ে বলা হয়, পাকিস্তানের পশ্চিমাংশের অখণ্ডতার প্রতি কোনো হুমকি তারা মেনে নেবে না। হেনরি কিসিঞ্জার সোভিয়েত প্রতিনিধিকে পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক চুক্তির দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে প্রস্তাবিত নিক্সন-ব্রেজনেভ শীর্ষ বৈঠক বাতিলের হুমকি দেন। মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্য পাকিস্তানকে ‘উচিত শিক্ষা’ দেওয়ার পক্ষে থাকলেও ইন্দিরা একক সিদ্ধান্তে ১৮ ডিসেম্বর পশ্চিম ফ্রন্টেও যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। বি জেড খসরুর এই বয়ান পড়ে বিজিপির নেতা এল কে আদভানি কংগ্রেসকে একহাত নিতে চেষ্টা করেন। তিনি প্রমাণ করতে চান, একাত্তরে ভারত কাশ্মীর দখল করে নিতে পারত। ইন্ধিরা গান্ধীর জন্য সেটি সম্ভব হয়নি।

এ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রে তত্কালীন সোভিয়েতের রাষ্ট্রদূত আনাতলি দবরিনিন তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ইনকনফিডেনস-এ লিখেছেন, ‘কিসিঞ্জার আমাদের কাছে পরিষ্কার করেন যে ভারত-পাকিস্তান ফ্রন্টের পশ্চিমাংশ নিয়েই মূলত যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, পূর্ব ফ্রন্টের পাকিস্তানের পরাজয়ে পশ্চিমাংশও ধসে পড়বে। পরবর্তী সময়ে যেমন কিসিঞ্জার লিখেছেন, তিনি ধারণা করেছিলেন, পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে হামলা ও পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা করছেন শ্রীমতী গান্ধী। আর পূর্বাংশে পাকিস্তানের লজ্জাজনক পরাজয়ের মধ্য দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের অবশিষ্ট অংশকেও খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়ার দিকে ঠেলে দেবেন।’২১

নিক্সন প্রশাসন পাকিস্তানিদের অপরাধ আড়াল করলেও বিশ্বের তথা আমেরিকার গণতন্ত্রকামী মানুষ তাঁর বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা নিয়েছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীরা বাংলাদেশে মানবিক বিপর্যয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জাতিসংঘে লুক্সেমবার্গ প্রতিনিধির প্রশ্ন ছিল:

যখন আমাদের চোখের সামনে লাখ লাখ লোকের বর্ণনাতীত দুর্দশা দেখতে পাই, যখন দেখি যে তাদের কঠিন শাস্তি দেওয়া হচ্ছে জাতীয় নিরাপত্তার ধুয়া তুলে, যখন দেখি যে সভ্য সমাজে যে মৌলিক অধিকার দুর্বলতমজনের জন্যও স্বীকৃত তা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে, তখন প্রশ্ন জাগে, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা—এ ধরনের বর্বরতাকে কি চলতে দেওয়া উচিত হবে?

যুদ্ধবিরতির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একমত হয়নি তার মিত্র যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ফ্রান্সও। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আনা মার্কিন প্রস্তাবে দেড় শতাধিক রাষ্ট্র ভোট দিলেও যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স অনুপস্থিত থাকে। কানাডীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিসেলমার্স ২৯ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে বলেন, ‘যখন একটি অভ্যন্তরীণ বিবাদ অনেক দেশকে এত প্রত্যক্ষভাবে আন্দোলিত করে, তখন তাকে কি আর অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে বিবেচনা করা সমীচীন হবে?২২

তবে জাতিসংঘে এর বিপরীত বক্তব্যও শোনা গেছে। চীনের স্থায়ী প্রতিনিধি হুয়াং হুয়া তাঁর ভাষণে বলেন, ‘সোভিয়েত শক্তি চীনকে অপদস্থ করার এক ঘৃণ্য ও রাক্ষুসে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। তারা চাইছিল ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করে চারদিক থেকে চীনকে পরিবেষ্টন করে এশিয়ায় তাদের প্রভাববলয়কে নিরঙ্কুশ করতে। পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ নিয়ে সোভিয়েতকে সুবিধা নিতে দেওয়া হবে না।’

অন্যদিকে জাতিসংঘে মার্কিন প্রতিনিধি জর্জ বুশ ৪ ডিসেম্বর বলেন:

We have called both India and Pakistan to avoid action which would increase military tensions. Specifically, the United States Government has proposed that both side withdraw this military forces from this border. Pakistan accepted this proposal. Regrettably India did not.২৩

এই বুশই পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন, তাঁর পুত্র জর্জ ডব্লিউ বুশও।

৭.

বইটিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং তত্কালীন আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কে বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তথ্যসূত্র আমেরিকার সরকারি দলিলপত্র। কিন্তু এর বাইরে অন্যান্য দেশের তথ্য-উপাত্ত এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি দলিলপত্রের কোথায় মিল বা অমিল আছে, সেটি লেখক আলোচনায় আনেননি। এ ছাড়া সোভিয়েত বা ভারতীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তাদের বৈঠকের রেকর্ডপত্র নিশ্চয়ই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মহাফেজখানায় থাকার কথা। মার্কিন দলিলপত্রের সত্যতা যাচাই করার জন্যও সেগুলো সংগ্রহ ও আলোচনা করা প্রয়োজন। ভারত সরকার একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অনেক দলিলপত্র নষ্ট করে ফেলেছে। এ ধরনের দলিলপত্র ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ভারতের যুক্তি, তাদের যুদ্ধকৌশল প্রকাশ না করার জন্যই এটি করা হয়েছে। কিন্তু সেই কৌশল কি পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের, না বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের? যদি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের হয়, এর ওপর আমাদেরও হক আছে।

বি জেড খসরু বইটিতে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অনেক অজানা বিষয় উন্মোচিত করেছেন। উঠে এসেছে মার্কিন সরকারের ভেতরে নানা রকম দ্বন্দ্ব ও টানাপোড়েনের কথাও। এসব তথ্যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেসব কল্পকথা আছে, তারও অবসান হবে। কিন্তু বইটির একটি বড় ত্রুটি, এর কোনো পটভূমি নেই। লেখক বিষয়টি যেভাবে উত্থাপন করেছেন তাতে মনে হবে, ১৯৭১ সালেই পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বিরোধের সূচনা এবং শেষ। কিন্তু ইতিহাস তা বলে না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরই পূর্ব ও পশ্চিমের সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেয়। বাঙালি মুসলমান পাকিস্তান চেয়েছিল আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার হিসেবে আর পাঞ্জাবি মুসলমানরা এটিকে নিয়েছিল বাঙালিদের ওপর আধিপত্য বিস্তারের সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে। যে কারণে বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও পাকিস্তানের শাসনক্ষমতায় যেতে পারেনি। যখনই বাঙালির ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, পাঞ্জাবিরা নানা কৌশলে সে সম্ভাবনা বিনষ্ট করে দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাঙালি নেতাদের অনৈক্য-দোদুল্যমানতাও কম দায়ী নয়। পঞ্চাশের দশকে তাঁরা সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়েছেন, পাকিস্তানের ঐক্য রক্ষার স্বার্থে দুই ইউনিটের সমতাতত্ত্বও মেনে নিয়েছেন। কিন্তু ১৯৫৮ সালে যখন সামরিক শাসন জারি হলো, তখন বাঙালি নেতারা বুঝতে পারলেন, পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোয় বাঙালিদের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না। স্বাধীনতার কথা অনেকেই ভেবেছেন, প্রকাশ্যে বলেছেন, কিন্তু শেখ মুজিবের মতো কেউ আগাগোড়া অনড় থাকতে পারেননি, নির্দিষ্ট কর্মসূচি নিয়েও এগিয়ে আসেননি। শত দুর্বলতা-ব্যর্থতা সত্ত্বেও শেখ মুজিবই স্বাধীনতার প্রধান নেতা। এ ব্যাপারে আমরা রাজনীতিক-লেখক মওদুদ আহমদকেও সাক্ষী মানতে পারি, যিনি আওয়ামী শিবিরের লোক নন। মওদুদ তাঁর এরা সব শেখ মুজিবুর রহমান গ্রন্থে লিখেছেন:

Mujib is the greatest phenomenon of our history. His death is not his end. He will continue to remain as a legend in the political life of Bangladesh. Bangladesh might have had leaders in their history more intelligent, more capable and more dynamic than Sheikh Mujibur Rahman but none gave so much to the bangalis political independence and national identity.২৪

৮.

বি জেড খসরু সরাসরি না হলেও শেখ মুজিবের বাংলাদেশ আন্দোলনের সঙ্গে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর পাকিস্তান আন্দোলনের একটি তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। বিষয়টি ভাবার মতো। তিনি বলেছেন, জিন্নাহ যেমন দ্বিজাতিতত্ত্ব হাজির করেছিলেন অবিভক্ত ভারতে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য, তেমনি শেখ মুজিবও অবিভক্ত পাকিস্তানে ছয় দফা কর্মসূচি দিয়েছিলেন বাঙালির অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে। কংগ্রেস ও নেহরু ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব অগ্রাহ্য করায় জিন্নাহর পাকিস্তান স্বপ্ন যেমন সফল হয়েছে, তেমনি বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের গণহত্যা বাঙালি জনগোষ্ঠীকে অবিকলভাবে স্বাধীনতার দিকেই ঠেলে দিয়েছে।

কিন্তু কংগ্রেস যদি জিন্নাহর দাবি মেনে নিত কিংবা পাকিস্তানি শাসকচক্র গণরায় বানচাল না করত, তাহলে কী হতো? ‘যদি’ ও ‘কিন্তু’ দিয়ে ইতিহাস হয় না। একাত্তরে বাংলাদেশে যা ঘটেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকার সে ঘটনায় যেভাবে নিজেকে সংশ্লিষ্ট করেছে, তার অনুপঙ্ক্ষ বিবৃত করেছেন বি জেড খসরু। তিনি নির্দিষ্টভাবে বইয়ের শেষে আলাদা অধ্যায়ে তথ্যসূত্র জানিয়েছেন। কিন্তু ঘটনার বিবরণ যেখানে দিয়েছেন, সেখানে সূত্র উল্লেখ করেননি। এমনকি চয়িত তথ্য সম্পর্কে মতামত প্রকাশ থেকেও বিরত থেকেছেন। গবেষণাধর্মী বইয়ের ক্ষেত্রে এটি ত্রুটি বটে। তার পরও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এ রকম একটি শ্রম ও গবেষণালব্ধ (আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অধিকাংশ লেখা যেখানে মনের মাধুরী মেশানো স্মৃতিচারণা এবং নকলনবিশি প্রয়াস) বই উপহার দেওয়ার জন্য লেখককে অভিনন্দন।

তথ্যসূত্র

১. শামসুল হুদা চৌধুরী: একাত্তরের রণাঙ্গন, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ১৯৮২

২. বদরুদ্দীন উমর: পূর্ববাংলার ভাষা আন্দোলন ও তত্কালীন রাজনীতি, মাওলা ব্রাদার্স, ১৯৭৯

৩. হাসান হাফিজুর রহমান (সম্পাদিত): ‘পাকিস্তান গণপরিষদ বিতর্ক’, স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস: দলিলপত্র, হাক্কানী পাবলিশার্স, ১৯৮১

৪. আর্চার কে ব্ল্যাড: দি ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ: মেমোয়ার্স অব অ্যান অ্যামেরিকান ডিপ্লোম্যাট, ইউপিএল, ঢাকা, ২০০২

৫. ইত্তেফাক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী সংখ্যা, ১৯৬৩

৬. রেহমান সোবহান: ‘হাউ টু বিল্ড পাকিস্তান’

৭.  অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, ড. বিনায়ক সেনের সঙ্গে সাক্ষাত্কার, ২০০৯

৮. সিদ্দিক সালিক: উইটনেস টু সারেন্ডার, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৭

৯. প্রাগুক্ত

১০.প্রাগুক্ত

১১.রেহমান সোবহান: বাংলাদেশের অভ্যুদয়: একজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য

১২.আফসান চৌধুরী: বাংলাদেশ ১৯৭১, মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৭

১৩.প্রাগুক্ত

১৪.জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী থেকে বেরোনো কমরেড মণি সিংহ স্মারকগ্রন্থ-এ সংকলিত বজলুর রহমান-এর প্রবন্ধ ‘শেখ মুজিব-মণি সিংহের ঐতিহাসিক বৈঠক’, পৃষ্ঠা-১০০-১০১

১৫.আফসান চৌধুরী: বাংলাদেশ ১৯৭১, পৃষ্ঠা ১৮৮-৮৯

১৬.মার্কিন কংগ্রেস কমিটির শুনানি, ৭ ডিসেম্বর ১৯৭১, প্রাগুক্ত

১৭. মঈদুল হাসান: মূলধারা ’৭১, ইউপিএল, ১৯৮৬

১৮.প্রাগুক্ত

১৯.আর্চার কে ব্লাড: ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ

২০. রিচার্ড সিশন ও লিও ই রোজ: ওয়ার অ্যান্ড সিসেশন: পাকিস্তান, ইন্ডিয়া, অ্যান্ড দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া প্রেস, ১৯৯১

২১. প্রাগুক্ত

২২. আবুল মাল আবদুল মুহিত: বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব, সাহিত্য প্রকাশ, ১৯৯৮

২৩. বি জেড খসরু: মিথস অ্যান্ড ফ্যাক্টস: বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার—হাউ ইন্ডিয়া, ইউএস, চায়না অ্যান্ড দি ইউএসএসআর সেভড দি আউটকাম, রূপা অ্যান্ড কোং ২০১০

২৪. মওদুদ আহমেদ: এরা সব শেখ মুজিবুর রহমান, ইউপিএল, ১৯৮৩

pathok

যোগাযোগের ঠিকানা

সিএ ভবন,
১০০ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,
কারওয়ান বাজার, ঢাকা - ১২১৫।

ফোন: ৮৮০-২-৮১১০০৮১, ৮১১৫৩০৭
ফ্যাক্স - ৮৮০-২-৯১৩০৪৯৬

protichinta kinte chile