protichinta

গ্রামীণ নারীর পরিবেশ সচেতনতা ও পরিবেশ অবনয়নের প্রতিক্রিয়া

সাবেকুন নাজমুন

সারসংক্ষেপ

প্রাণিজগতের একমাত্র মানুষই পারে তার প্রয়োজন ও চাহিদা পূরণের জন্য পরিবেশ, প্রকৃতিকে পরিবর্তন কিংবা পরিবর্ধন করতে। চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে উন্নয়ন-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এ পরিবর্তন কিংবা পরিবর্ধন সম্ভব হয়। লক্ষণীয় যে এ উন্নয়নকৌশল গ্রহণ কিংবা পরিচালনায় স্থানীয় সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ সীমিত কিংবা নেই বললেই চলে। উপরন্তু এ উন্নয়ন অভিধায় পরিবেশ ও প্রকৃতির বিষয়টিও স্থান পায় না নিরপেক্ষভাবে। পুরুষতান্ত্রিকতার ফলে সৃষ্ট কাঠামো উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশের নারীকে তার দৈনন্দিন কাজের মধ্য দিয়ে অধিকতর প্রকৃতি-ঘনিষ্ঠ করায় নারীর বিপন্নতা অন্যদের তুলনায় বেশি। এসব অঞ্চলের গ্রামীণ নারীর প্রাত্যহিক খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও পশুখাদ্য সংগ্রহের মধ্য দিয়ে প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়। এ নির্ভরশীলতা নারীকে পারিপার্শ্বিক প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। এ অবস্থায় নারী শুধু তাঁর জীবন-জীবিকা, পরিবার, সন্তান, গবাদিপশু ইত্যাদি রক্ষা নয়, পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন; অনেক ক্ষেত্রে আন্দোলনেও অংশ নেন। পরিবেশসচেতনতা ও পরিবেশ অবনয়নের বিরুদ্ধে নারীর এ সাড়া প্রদান পরিবেশ আন্দোলন ও নারী আন্দোলনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ স্থাপন করে। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় কৃষিজমিকে চিংড়িঘেরে রূপান্তরিত করে চিংড়ি চাষ স্থানীয় পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করছে গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে। ফলে স্থানীয় গ্রামীণ জনগণ বাণিজ্যিক চিংড়ির পরিবেশগত নেতিবাচক প্রভাবের বিরুদ্ধে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ প্রতিবাদ আন্দোলনে অংশ নেয়। এ আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ ও আন্দোলনে নারীর নেতৃত্বদান পরিবেশ রক্ষায় বিশেষভাবে তাত্পর্যপূর্ণ।

মুখ্য শব্দগুচ্ছ: নারী ও প্রকৃতির আন্তসম্পর্ক, পরিবেশ নারীবাদী ধ্যানধারণা, পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো, বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষ, উন্নয়নের নেতিবাচক চরিত্র, পরিবেশ অবনয়ন ও পরিবেশ রক্ষায় নারী।

ভূমিকা

নারীর জীবন-জীবিকার সঙ্গে পরিবেশ ও প্রকৃতি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এ সম্পর্কের কারণে নারী তাঁর পারিপার্শ্বিক পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন। মনুষ্যসৃষ্ট পরিবেশ অবনয়নের ক্ষেত্রে এ সচেতনতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে পরোক্ষ এমনকি প্রত্যক্ষ প্রতিবাদের মাধ্যমে। নির্দিষ্ট কোনো দূষণপ্রক্রিয়ায় যখন পারিপার্শ্বিক পরিবেশের অবনয়ন ঘটে, নারী তা অনুধাবন করতে পারেন সহজেই। পরিবেশদূষণের ফলে সাধারণত যে নেতিবাচক প্রভাব দেখা দেয়, তা হলো: নদীভাঙন, ভূমিক্ষয়, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, নদ-নদী, খাল-বিলে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, মরুকরণপ্রক্রিয়া ইত্যাদি এবং এর ফলে প্রাণীবৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হওয়া। পরিবেশদূষণের নেতিবাচক প্রভাব সবার ওপরই পড়ে। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোয় নির্ধারিত লৈঙ্গিক শ্রম বিভাজন নারীকে প্রকৃতি-ঘনিষ্ঠ করায় তাঁদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব তুলনামূলক বেশি। কেননা, নারী তার দৈনন্দিন কাজের জন্য পারিপার্শ্বিক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। পরিবেশবাদী ওয়াগারি মাথাই বলেন,‘The impact of environmental degradation hits our women and children most. They are the ones who remain in the villages struggling with it while the men flock to cities in search of jobs they may never find’. বিশেষ করে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের গ্রামীণ নারী প্রকৃতি থেকে খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও পশুখাদ্য সংগ্রহ করে থাকেন, আবার অক্লান্তভাবে প্রকৃতির রক্ষণাবেক্ষণে যেমন বীজ ও খাদ্য সংরক্ষণ, পরিবেশবান্ধব জৈব সার, জ্বালানি তৈরি ইত্যাদির ক্ষেত্রে তার সহজাত জ্ঞান কাজে লাগান। তা ছাড়া নারীরা বৃক্ষরোপণ এবং পরিচর্যাও করে থাকেন। পারস্পরিক এ নির্ভরতার মধ্য দিয়ে প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে নারীর নিবিড় সাহচর্য গড়ে ওঠে। এ কারণে প্রকৃতির যখন অবক্ষয় ঘটে, অবনয়নের সম্মুখীন হয় পরিবেশ, তখন নারীর নিয়মিত জীবনধারা হয় বিঘ্নিত, ক্ষতিগ্রস্ত। এ বিপন্নতাকে প্রতিহত করার জন্য নারী প্রতিবাদমুখর হন এমনকি আন্দোলনেও অংশ নেন। ভারতের বিসনোই ও চিপকো আন্দোলন এর অন্যতম দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীর ক্ষেত্রেও বিষয়টি লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষের জন্য কৃষিজমিকে চিংড়িঘেরে রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়ায় নারী ও পরিবেশের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তার বিরুদ্ধে নিজেকে ও পরিবেশ রক্ষায় নারীর অগ্রগণ্য ভূমিকা লক্ষণীয়। আলোচ্য প্রবন্ধে পরিবেশ নারীবাদী ধ্যানধারণার আলোকে নারী ও প্রকৃতির আন্তসম্পর্ক, এর ফলে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বিষয়ে নারীর সচেতনতা এবং একটি নির্দিষ্ট এলাকায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিরূপ প্রভাবে স্থানিক পরিবেশের অবনয়নের বিরুদ্ধে নারীর সাড়া প্রদানের স্বরূপ নির্ণয়ের চেষ্টা করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় এলাকায় বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষের ফলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাবের বিরুদ্ধে নারীর ভূমিকা আলোচনা করা হয়েছে।

নারী ও প্রকৃতির আন্তসম্পর্ক

নারীর পরিবেশ সচেতনতা, পরিবেশের রক্ষণাবেক্ষণে সহজাত প্রবণতা, পরিবেশ অবনয়নের প্রতি সাড়া প্রদান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা প্রভৃতি নারী ও প্রকৃতির আন্তবিজড়িত সম্পর্ক নিয়ে চিন্তাভাবনার উন্মেষ ঘটায়। পরিবেশ নারীবাদীরা তাঁদের ধ্যানধারণার অন্যতম উপাদান হিসেবে নারী ও প্রকৃতির পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতাকে ব্যাখ্যা করেছেন। বিশেষ করে শেরি অর্টনার (১৯৭৪), এরিয়েল কি সালেহ (১৯৮৪), ভল প্লামউড (১৯৮৬), কারেন জে ওয়ারেন (১৯৮৭), বন্দনা শিবা (১৯৮৯), মারিয়া মিজ (১৯৯৩), বীণা আগারওয়াল (১৯৯৭), নোয়েল সাটারজিয়ন (১৯৯৭) প্রমুখ পরিবেশ নারীবাদী তাঁদের মতাদর্শিক অবস্থানের ভিত্তি হিসেবে নারী ও প্রকৃতির অন্তর্গত সম্পর্কের স্বরূপ বিশ্লেষণ করেন। তাদের মতে, নারী ও প্রকৃতির আন্তসম্পর্ক পরিবেশ নারীবাদের কেন্দ্রীয় উপাদান। কারেন জে ওয়ারেন বলেন, ‘Woman nature connections are the backbone of ecofeminism’। পরিবেশ নারীবাদীরা প্রকৃতি ও নারীর মধ্যে নিবিড় যোগাযোগের ক্ষেত্রে জৈবিকতা, আধ্যাত্মিকতা, পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো, ধারণাগত কাঠামো, শোষণমূলক ব্যবস্থা, দ্বৈতবাদ, কর্তৃত্বের যৌক্তিকতা, বস্তুগত বাস্তবতা ইত্যাদি ক্রিয়াশীল বলে মনে করেন। শেরি অর্টনার, এরিয়েল কি সালেহ, জেমস লাভলক, সিলভিয়া ওয়ালবি প্রমুখ মনে করেন নারী ও প্রকৃতির সম্পর্ক জৈবিকতা ও আধ্যাত্মিকতা দ্বারা নির্ধারিত। নারীর জৈবিক নির্মাণ, গর্ভধারণ, সন্তান জন্ম, দুগ্ধদান, লালন-পালন ইত্যাদি বিশেষ ক্ষমতা নারীকে পুরুষ থেকে আলাদা করে। পাশাপাশি প্রকৃতির একই ধরনের ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে নারী ও প্রকৃতির মধ্যে আন্তবিজড়িত সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এরিয়েল কি সালেহ বলেন, নারীর মাসভিত্তিক উর্বরতা চক্র, গর্ভাবস্থার মিথোজীবিত্ব, সন্তান প্রসবের বেদনা, শিশুর স্তন্যপানের আনন্দ—সবকিছুই নারীর চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং এ চেতনা প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত। প্রজনন সক্ষমতার দিক থেকে প্রকৃতির সঙ্গে রয়েছে নারীর সম্পর্ক। অর্থাত্ নারীর পুনরুত্পাদন ভূমিকার সঙ্গে প্রকৃতির একই ধরনের ভূমিকার সামঞ্জস্য রয়েছে বিধায় নারী প্রকৃতির প্রতিরূপে স্থাপিত হয়। বন্দনা শিবা ১৯৯২ সালে প্রকাশিত ‘The Seed and the Earth: Women, Ecology and Biotechnology’ প্রবন্ধে দেখান প্রকৃতির মধ্যে বীজ ও ভূমিকে বাদ দিয়ে জন্ম, বৃদ্ধি ও বিকাশ সম্ভব নয়। বীজ মাটি থেকে পরিপুষ্ট গ্রহণ করে পূর্ণতা লাভ করে, মাটি হলো সব সৃজনশীলতা ও জীবনের উত্স।শেরি অর্টনার মনে করেন নারীর এ পুনরুত্পাদন ভূমিকা নারীকে প্রকৃতির সঙ্গে বিশেষ ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে আবদ্ধ করে এবং এ সংযোগই প্রসিদ্ধ ও বিকশিত সারসত্তা (essential) রূপে। প্রকৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সারসত্তামূলক অনুভূতিই সংস্কৃতিতে নারী ও প্রকৃতিকে মূল্যহীন এবং পুরুষকে মূল্যায়ন করার ক্ষেত্র তৈরি করে। শেরি অর্টনার ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ ‘Is Female to Male as Nature is to Culture?’-এ দেখিয়েছেন সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিকভাবে পুরুষ কর্তৃক নারীর প্রতি অবদমন নারীকে প্রকৃতিঘনিষ্ঠ করেছে। তিনি বলেন, নারীর অবমূল্যায়নের উত্স হচ্ছে প্রকৃতির সঙ্গে নারীর সংশ্লিষ্টতা, বিশেষ করে এ বিশ্বাস যে নারী পুরুষের তুলনায় প্রাকৃতিক জগতের নিকটস্থ, তাঁরা প্রকৃতিকে অতিক্রম করতে অপারগ। অর্টনার প্রকৃতির সঙ্গে নারীর সংশ্লিষ্টতার তিনটি দিকের উল্লেখ করেছেন: প্রথমত, নারী আগামী প্রজন্মের জন্মদাত্রী। নারী মনুষ্য জাতিকে পুনরুত্পাদন করেন। এ কাজটি পুনরাবৃত্তিমূলক। পক্ষান্তরে, পুরুষ উত্পাদন করেন সংস্কৃতি, তিনি প্রযুক্তি ও প্রতীকের সাহায্যে নতুনত্ব উত্পাদন করেন। দ্বিতীয়ত, নারী ঘর ও গৃহী চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। স্তন্যদানের কারণে, মনুষ্য সন্তানের বেড়ে উঠতে অনেক সময় লাগার কারণে, মা ও শিশুর সম্পর্ক কেবল জন্মদানে সীমাবদ্ধ নয়। এবং সর্বশেষ, নারীর মনোজগত্ হচ্ছে প্রকৃতির কাছাকাছি, পুরুষেরটি নয়—বিষয়টিকে এভাবে দেখা হয়। তিনি আরও মনে করেন, নারীর মনোজগত্ পুরুষ থেকে ভিন্ন। তবে সেটি কোনো জৈবিক কিংবা শরীরগত কারণে নয়, এটি ভিন্ন সামাজিকীকরণের কারণে। উল্লিখিত ভাবনা অনুযায়ী প্রতীকীভাবে সব সমাজে নারীকে পুরুষের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়।

সুদূর অতীত থেকে নারীর আধ্যাত্মিক শক্তির ওপর গুরুত্ব প্রদান করে প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের যৌক্তিকতা খোঁজার চেষ্টা লক্ষ করা যায়। যেমন ইউরোপের বিভিন্ন ধর্মীয় পুরকথায় মাতৃদেবীর সন্ধান পাওয়া যায়। গাইয়া, ডায়ানা, আইসিস, ভেনাস, লিলিথ, মারিয়া, সেরোন প্রমুখ মাতৃদেবী কিংবা গডেজের (Goddess) সৃষ্টিশীলতা, আধ্যাত্মিকতা, জীবনদায়ী ভূমিকা ইত্যাদির সঙ্গে নারীর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। জেমস লাভলক (James E. Lovelock) ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত Gaia: A New Look at Life on Earth গবেষণা গ্রন্থে গাইয়া দেবীর প্রাণজ শক্তিকে পরিবেশবাদী মডেল হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। লিন্ডা মেরিনা (Linda Marina) ২০০২ সালে প্রকাশিত ‘Woman and the Land’ প্রবন্ধে ইরকুইজ নারীদের ভূমির মালিকানা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে তাদের ভূমি দেবীর অনুসরণের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, পুরাণ অনুযায়ী ইরকুইজ নারীরা ভূমির মালিক হয় যা তাকে প্রকৃতির সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত করে। ক্রিস্ট (Carol P.Crist) বলেন, জৈবিক জন্মদানে গডেজের সৃষ্টিশীলতা সীমিত নয়, গডেজ সভ্যতার সব কলার (arts) স্রষ্টা, উপশমকারী, লেখক এবং আইনদাতা।১০ এভাবে গড বা স্রষ্টা রূপে প্রকৃতির সঙ্গে নারীর ধারণাগত সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ক্যারোলিন মার্চেন্ট ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত Earthcare গ্রন্থে গ্রিক পুরাণের দেবী গাইয়া (Gaia), খ্রিষ্টধর্মের ঈভ (Eve) ও মিসরের জীবনদায়ী দেবী আইসিসকে (Isis) প্রকৃতির মূর্তকল্প হিসেবে আখ্যায়িত করে তাঁদের সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে নারীর সৃষ্টিশীলতার তুলনার মাধ্যমে নারী ও প্রকৃতির সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করেন।১১ বন্দনা শিবা১২ ভারতের প্রেক্ষাপটে নারীর সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ককে অরণ্য সংস্কৃতির আলোকে বিশ্লেষণ করেন। তিনি মাতৃরূপী নারীকে মাটিরূপী ধরিত্রীর মূর্ত চিত্রকল্প হিসেবে দেখান। তিনি আরও বলেন যে ভারতীয় ধর্ম ও সংস্কৃতিতে নারীর সঙ্গে প্রকৃতির রয়েছে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। লোকমানুষ যে দেবীকে পূজা করত, তার নামও অরণ্য দেবী। এভাবে নারী ও প্রকৃতি অবিচ্ছেদ্য হিসেবে মূর্ত হয়।

আধ্যাত্মিকতা ও জৈবিকতা দ্বারা নির্ধারিত নারী ও প্রকৃতির এ রকম সম্পর্কের দরুন নারীর প্রতি শোষণ ও প্রকৃতির প্রতি শোষণের আদর্শগত অভিন্ন ভিত্তি তৈরি হয় মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও বিভিন্ন ব্যবস্থায়, যা নারী ও অমানবীয় প্রকৃতিকে ক্রমান্বয়িকভাবে পুরুষের নিচে স্থাপন করে। ভল প্লামউড বলেন, যুক্তির নির্মাণ থেকে প্রকৃতি বিচ্যুত ও মূল্যহীন হয়ে আবেগ, শরীর, পশুত্ব, আদিম অথবা অসভ্য সমাজ, অ-মানবীয় প্রকৃতি ইত্যাদির সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হয়, যেখানে যুক্তি থাকে অনুপস্থিত।১৩ এভাবে দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক অনুশীলন নারী ও প্রকৃতিকে একত্র করে অবদমনের অভিন্ন সূত্রে। অর্থাত্ উভয়ই পুরুষতন্ত্র, লৈঙ্গিক সংস্কৃতি এবং এর প্রতিষ্ঠানসমূহ, মূল্যবোধের মাধ্যমে শোষিত ও নিগৃহীত হয়। কারেন জে ওয়ারেন এ অবস্থাকে পীড়নমূলক ধারণাগত কাঠামো (oppressive conceptual framework), মারে বুকচিন লিঙ্গভিত্তিক শোষণ (gender based exploitation), ভল প্লামউড দ্বৈতবাদী (dualism) ভাবনার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা কর্তৃত্বের যৌক্তিকতা (logic of domination) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। পীড়নমূলক ধারণাগত কাঠামো কিংবা কর্তৃত্বের যৌক্তিকতা দ্বারা গড়ে ওঠা বিভিন্ন শোষণমূলক ব্যবস্থা যেমন: পুঁজিবাদের অধীনে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, বস্তুগত বাস্তবতা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে নারী ও প্রকৃতির মধ্যে আন্তসম্পর্ক স্থাপিত হয়। তাঁরা নারী ও প্রকৃতির এ সম্পর্ককে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোয় অবদমনমূলক মতাদর্শিক কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। অর্থাত্ পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোয় আধিপত্যবাদের অধীনে ক্রমোচ্চভিত্তিক অবস্থায় নারী ও প্রকৃতির অবস্থান পুরুষের তুলনায় নিচুতে হওয়ায় প্রকৃতি ও নারীর ওপর নিপীড়ন যৌক্তিকতা পায়। ওয়ারেন পীড়নমূলক ধারণাগত কাঠামোর কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন,১৪ যেমন: এটি কোনো অবস্থা ও শ্রেণির মাঝে স্তরভেদ সৃষ্টি ও ক্রমোচ্চ কাঠামো প্রদানের মাধ্যমে পার্থক্য তৈরি করে। সমাজে কিছু দ্বৈত ধারণা প্রচলিত আছে, যেখানে মানের স্তরভেদ খুবই প্রকট হওয়ায় একটি থেকে আরেকটি অধস্তন হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে যৌক্তিক ভিত্তি পায়। যেমন: পুরুষেরা উচ্চমানের অধিকারী, যুক্তি ও বুদ্ধি প্রয়োগে সক্ষম, শক্তিধর; অপর দিকে নারী নিম্নমানের অধিকারী, আবেগপ্রবণ, দুর্বল। এ কাঠামো কতগুলো ধারণাকে মূল্যবোধ হিসেবে যৌক্তিকতা দিয়েছে, যা গভীরভাবে সমাজে প্রোথিত। ফলে সমাজে একধরনের দ্বৈততার সৃষ্টি হয়েছে। পীড়নমূলক ধারণাগত কাঠামোর ফলেই পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পুরুষ সাপেক্ষে নারী ও মানুষ সাপেক্ষে প্রকৃতি নিচু, হীন ও অধস্তন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

অর্থাত্ পীড়নমূলক ধারণাগত কাঠামোর অধীনে সমাজে নারী ও প্রকৃতির প্রতি শোষণের অভিন্ন ভাবনা তৈরি হয়। শোষণের অভিন্ন মাত্রার মধ্য দিয়ে নারী ও প্রকৃতির মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হয়। ভল প্লামউড নারী ও প্রকৃতির প্রতি অবদমনকে জেন্ডার, রেস, ক্লাসের ভিত্তিতে আলোচনা করতে চান।১৫ তবে তিনিও কারেন জে ওয়ারেনের মতো পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মানুষ দ্বারা ‘প্রকৃতি’ এবং পুরুষ দ্বারা ‘নারীর’ ওপর কর্তৃত্ব করার প্রয়োজনে নির্দেশিত কর্তৃত্বের যৌক্তিকতার (logic of domination) ভূমিকা আলোচনা করেন। এ ক্ষেত্রে তিনি পশ্চিমা যুক্তিবাদের সমালোচনা করে বলতে চান, পশ্চিমা বিশ্বের যৌক্তিকতাবাদ তত্ত্বে নারী ও প্রকৃতির সম্পর্ক লক্ষ করা যায়। যেটি দীর্ঘ স্থিতিকাল দার্শনিক ঐতিহ্য তৈরি করে দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করে মানব/প্রকৃতি দ্বি-বিভাজন এবং এ দ্বি-বিভাজন অন্যান্য দ্বৈততার (পুরুষ/নারী, যুক্তি/আবেগ ইত্যাদি) সঙ্গে একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করে। ফলে এ ধারণার জন্ম হয় যে, মানবগোষ্ঠীর মধ্যে পুরুষ অন্যদের চেয়ে আলাদা (অন্যরা হলো নারী, প্রকৃতি, পশু ইত্যাদি)। এভাবে যৌক্তিকতাবাদ নারী ও প্রকৃতির অধস্তনতাকে ভিত্তি প্রদান করে।১৬ অর্থাত্ পাশ্চাত্য সমাজের এ আন্তবিজড়িত দ্বৈততা (interwoven dualism) চরমভাবে আন্তবিজড়িত অবদমন যৌক্তিকতার সঙ্গে অভিন্ন সূত্রে গাঁথা। মারিয়া মিজ এ দ্বৈতবাদী দর্শনের শোষণমূলক দিকটিকে ব্যাখ্যা করে বলেন, নারীর ওপর পুরুষাধিপত্যের চর্চা প্রকৃতির ওপর পুরুষের প্রভুত্ব স্থাপনের ক্ষেত্র নির্মাণের মধ্য দিয়েই দ্বৈতবাদী বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। এ দৃষ্টিভঙ্গিতে নারী প্রকৃতিরূপে ও পুরুষ মানবরূপে আখ্যায়িত হয়।১৭

বন্দনা শিবা ও বীণা আগারওয়াল প্রমুখ অবদমনের অভিন্নসূত্রে সৃষ্ট নারী ও প্রকৃতির এ সংযোগকে পুরুষতন্ত্রের নির্মাণ হিসেবে দেখতে চান। বীণা আগারওয়াল বলেন, ‘there are important connections between the domination and oppression of women and the domination and exploitation of nature’.১৮ তিনি বলেন, উন্নয়নশীল বিশ্বে পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় জেন্ডার-নির্দিষ্ট পথে। এখানে নারী ও প্রকৃতির মধ্যে সম্পর্ক স্থাপিত হয় বস্তুগত বাস্তবতার ভিত্তিতে। উন্নয়নশীল দেশের কৃষি নারী ও পাহাড়ি নারীর প্রসঙ্গ এনে বীণা আগারওয়াল বলেন, এ নারীরা খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও গো-খাদ্যের জোগানদাতা। ফলে যখন পরিবেশ অবনয়ন ঘটে, তখন তারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইভাবে দৈনন্দিন মিথস্ক্রিয়ার কারণে এ নারীরা বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করে। এভাবে তারা প্রকৃতি ও পরিবেশের রক্ষণাবেক্ষণে পরম্পরায় অবগত হয়।

বন্দনা শিবার মতে, পশ্চিমা সংকোচনবাদী উন্নয়ননীতি উন্নয়নশীল দেশের নারীর কাজ ও জ্ঞানকে প্রকৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করে সম্পদ বাড়ানোর ভাবনা করতে ব্যর্থ। অর্থাত্ পশ্চিমা মডেলের উন্নয়ন-প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক সম্পদের অবাধ ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে উন্নয়নশীল দেশের নারী তার দৈনন্দিন জীবনের কাজ হারায়, বিকল্প কাজের ক্ষেত্রে আন্তক্রিয়ার পর্যায়ে নারী শারীরিক ও মানসিক অবসাদ ও অসুস্থতার সম্মুখীন হয়, যা তাকে মানবগোষ্ঠীর মধ্যে প্রান্তিক অবস্থান গ্রহণ করতে বাধ্য করে। বীণা আগারওয়াল যুক্তি দেখান মানব শরীরের ওপর পরিবেশ ক্ষতির প্রভাব জেন্ডার নিরপেক্ষভাবেই ঘটে থাকে। কিন্তু নারী তার পুনরুত্পাদনমূলক ভূমিকার জন্য বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুধু তা-ই নয়, নারীর ক্ষীণ স্বাস্থ্যও এর অন্যতম কারণ।১৯ বন্দনা শিবা ও মারিয়া মিজও মনে করেন শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট বিপর্যয় মানবদেহ হিসেবে নারী ও পুরুষ উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। যদিও তাঁরা বলতে চান যে নারী অধিকতর প্রকৃতির কাছে থাকে পুরুষের তুলনায় এবং অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের নারীরা তাদের দৈনন্দিন কাজের প্রয়োজনে উন্নত দেশের শহুরে ধনী ও মধ্যবিত্ত নারী ও পুরুষের চেয়ে বেশি প্রকৃতিঘনিষ্ঠ হয়। এ কারণে এ অঞ্চলের প্রকৃতিক বিপর্যয় নারীকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে পুরুষের তুলনায়।

নারী ও প্রকৃতির সম্পর্ক বিশ্লেষণে নারীর জৈবিক নির্মাণ, আধ্যাত্মিক অনুভূতি, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, বিশ্বাস, পুরুষতন্ত্র, শ্রম বিভাজন, শ্রেণি, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ ইত্যাদি ভেদে ভিন্নতা, সামরিকায়ন, যৌনবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, গোষ্ঠীবাদ, অবদমনমূলক কাঠামো, দ্বৈতবাদী চিন্তাভাবনা প্রভৃতি আলোচনায় স্থান পাওয়ায় তাত্ত্বিকদের মধ্যে মতদ্বৈধতা লক্ষণীয়। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে নারী ও প্রকৃতির সম্পর্ক যে রূপেই নির্মিত হোক না কেন তা সভ্যতার সংকটের প্রতি সাড়া প্রদান করে এর অন্তর্গত শোষণমূলক ক্ষমতাকাঠামোয় বিদ্যমান জেন্ডার সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়।২০ তবে নারী ও প্রকৃতির আন্তসম্পর্ক নির্ণয় সাপেক্ষে পরিবেশ নারীবাদীরা প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় নারীর অগ্রগণ্য ভূমিকার অবতারণা করেছেন। তাঁরা নারীকে ‘প্রকৃতিসুলভ’ ও প্রকৃতিকে ‘নারীসুলভ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন।২১ তাঁরা মনে করেন, প্রকৃতির বিপন্নতা রোধে নারী ভূমিকা পালন করার মাধ্যমে নিজের প্রতি শোষণ, অবদমনও অবসান করতে পারবে। অবশ্য বীণা আগারওয়াল প্রকৃতি, পরিবেশ রক্ষায় নারীর জ্ঞান উন্নয়নের বিকল্প অ্যাপ্রোচ (approach) হতে পারে বলে মনে করেন।২২

বর্তমান প্রবন্ধে বাংলাদেশের উপকূলীয় গ্রামীণ নারী ও প্রকৃতির পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা, নিয়মবহির্ভূতভাবে চিংড়ি চাষের দরুন সৃষ্ট পরিবেশ অবক্ষয়ে নারীর বিপন্নতার স্বরূপ এবং পরিবেশ ও নিজের বিপন্নতাকে প্রতিহত করার জন্য নারীর ভূমিকাকে বিশ্লেষণের জন্য প্রকৃতি ও নারীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে জৈবিকতা, মতাদর্শিক ও বস্তুগত বাস্তবতা উভয় আলোচনাকে গ্রহণ করা হয়েছে।

এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীলতা নারীকে পরিবেশ ব্যবস্থাপক হিসেবে গড়ে তোলে।২৩ প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে নারী সম্পৃক্ত থাকায় পরিবেশের অবনয়ন যখন ঘটে, তখন নারীর ওপর এর প্রভাব পড়ে।২৪ এমতাবস্থায় প্রতিবাদের মাধ্যমে নারী নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পরিবেশের অবনয়ন রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে লক্ষণীয় এবং বাংলাদেশেও দৃশ্যমান হয়েছে। বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলে উন্নয়নের নামে চিংড়িঘের স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হলে গ্রামবাসীরা বাণিজ্যিক চিংড়ির পরিবেশগত নেতিবাচক প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলনে অংশ নেয়। এ আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ ও আন্দোলনে নারীর নেতৃত্বদান পরিবেশ রক্ষায় বিশেষভাবে তাত্পর্যপূর্ণ।

উপকূলীয় গ্রামীণ নারী দৈনন্দিন খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও পশুখাদ্য সংগ্রহ, বৃক্ষরোপণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে পারিপার্শ্বিক প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল হয়। এ নির্ভরশীলতা নারীকে পারিপার্শ্বিক প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। এ সচেতনতার ফলে নারী সহজেই প্রকৃতি ও পরিবেশের সুস্থতা রক্ষায় উদ্যোগী হয়। গড়ে ওঠে নারী ও প্রকৃতির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। গ্রামীণ নারীরা দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজ ও পানের জন্য প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করে থাকে। গৃহস্থালির কাজে পানি সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রায় সব নারী পুকুর/ডোবা, নদীনালা কিংবা পুকুর ও নদী উভয় উত্স থেকেই পানি সংগ্রহ করে থাকে। উল্লেখিত এলাকায় লবণাক্ততার কারণে স্বল্পসংখ্যক টিউবওয়েল রয়েছে, যেগুলো থেকে নারীরা সুপেয় পানি সংগ্রহ করে থাকে। সুপেয় পানির টিউবওয়েলগুলো গ্রামের নারীদের নিজ গৃহ থেকে বিভিন্ন দূরত্বে অবস্থিত। পরিবারের সদস্যসংখ্যা ও চাহিদার ওপর নির্ভর করে দুই বা ততোধিকবার পানি সংগ্রহ করতে যেতে হয়। অথাত্ এ নারীদের দৈনন্দিন কাজের একটি বৃহত্ সময় সুপেয় পানি সংগ্রহে ব্যয় হয়। শুধু পানি নয়, জ্বালানি সংগ্রহ ও তৈরিতেও গ্রামীণ নারীদের প্রচুর সময় ও শ্রম ব্যয় করতে হয়। ইশরাত শামিম ও খালেদা সালাউদ্দিন এক গবেষণায় দেখান, বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে জ্বালানি ও সুপেয় পানির ঘাটতি এবং এ ঘাটতির ফলে গ্রামীণ পরিবারগুলোয় নারীদের অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হয়।২৫

গ্রামের নারীরা রান্নার কাজে মাটির তৈরি একধরনের চুলা ব্যবহার করে থাকেন। শুকনা ছোট ডালপালা, খড়ি, লতা-পাতা, কচুরিপানা, শণ (শুকনা ধানগাছ), ঘুসে (গোবর দিয়ে চ্যাপ্টা করে বানানো যা কয়েক দিন রোদে শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে সংরক্ষণ করে ব্যবহার করা হয়), বইড়ে (এটিও গোবর দিয়ে হাতে তৈরি জ্বালানি, পাঠখড়ি কিংবা চিকন ডালের মধ্যে পুরো করে গোবর মাখিয়ে শুকিয়ে ব্যবহার করা হয়) ইত্যাদি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহূত হয়। গৃহে জ্বালানি তৈরি ও সংগ্রহের কাজ সাধারণত নারীরাই করে থাকে। ভারতের প্রেক্ষাপটে এক গবেষণায় দেখা যায়, যেখানে মরুকরণের ফলে গাছ জন্মায় না সেখানে নারীরা জ্বালানির জন্য গোবরের ওপর নির্ভরশীল।২৬ শুধু তা-ই নয়, গবাদিপশুর খাদ্য সংগ্রহেও নারীরা প্রচুর শ্রম ও সময় দিয়ে থাকে।২৭ অর্থাত্ গবাদিপশু পালনে জ্বালানিপ্রাপ্তির বিষয়টি সম্পৃক্ত হওয়ায় নারীরা এ কাজকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে। নারীদের নিজ গৃহ থেকে অনেক দূরে গিয়ে গবাদিপশু চরানোর মাঠ থেকে গোবর সংগ্রহ করতে হয়। তা ছাড়া গোবর থেকে জ্বালানি তৈরির কাজটি সময়সাপেক্ষ। কেননা গোবর থেকে ঘুটে ও বইড়ে তৈরি করে রোদে শুকানোর পর তা ব্যবহার উপযোগী হয়।

এক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগে নারী খাদ্য, জ্বালানি, বস্ত্র, চুলা ইত্যাদি সংরক্ষণ করে থাকে জরুরি প্রয়োজন মেটানোর জন্য।২৮ পরিবারের বৃদ্ধ, যুবা, শিশু থেকে শুরু করে সব সদস্যের খাদ্য ও পানীয় জল সরবরাহের কাজ নারীর শ্রমের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে যাতে তাত্ক্ষণিক খাদ্য ও জ্বালানিসংকটে পড়তে না হয় কিংবা দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে পুনর্বাসিত হওয়ার সময় পরিবারের সবার খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি নারীর কার্যক্রমে প্রাধান্য পায়। এ সময় তারা বস্তা কিংবা প্লাস্টিকের ব্যাগে চাল, চিঁড়া, মুড়ি, ডাল, চিনি, গুড় ইত্যাদি ভরে শক্ত করে বেঁধে ঘরের শুকনো স্থানে রেখে দেয়। তা ছাড়া গ্রামীণ নারী বস্তায় ভরে ঘুসে কিংবা বইড়ে সংরক্ষণ করে থাকে। দুর্যোগের সময় নারীর এ ভূমিকার ফলে পরিবারের অন্য সদস্যরা সংকটকালীন তাত্ক্ষণিক সহায়তা পেয়ে থাকে, যা তাদের মানসিকভাবে সবল করে তোলে।২৯ কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন দৃশ্য লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে সন্তানসম্ভবা থাকলে, শিশুসন্তান থাকলে, অসুস্থ থাকলে ইত্যাদি সাময়িক অবস্থায় পুরুষ সদস্যরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় খাদ্য ও জ্বালানি সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করে থাকে।

খাদ্য, জ্বালানি, পশুখাদ্য, অর্থপ্রাপ্তির অন্যতম উত্স গাছগাছালি। গ্রামের নারীরা মনে করে গাছ তাদের খাদ্য (ফল, শাকসবজি) সরবরাহ করে, ওষুধের জোগান দেয়, গৃহনির্মাণের জন্য কাঠ ও রান্নার জন্য জ্বালানির জোগান ইত্যাদি দিয়ে থাকে। উল্লেখ্য, উপকূলীয় এলাকায় সব ধরনের গাছ প্রচুর পরিমাণে জন্মায় না। এ কারণে যেসব গাছগাছালি জন্মায় সেগুলোর ওপর উপকূলীয় নারীদের নির্ভরতা বেশি পরিলক্ষিত হয় এবং এসব গাছ, লতা-পাতার যত্নও নিয়ে থাকে নারীরা। সাধারণত শাকসবজি, ফলমূল, কাঠ/জ্বালানি, ঔষধি ইত্যাদি সব ধরনের গাছই তারা লাগিয়ে থাকে। এদের অনেকের পরিবারের শাশুড়ি কিংবা বয়োজ্যেষ্ঠ নারী সদস্যদের লাগানো ফলের গাছের সংখ্যা পর্যাপ্ত হওয়ায় তারা শুধু গাছগুলোর পরিচর্যা করে থাকে। সহজে জ্বালানিপ্রাপ্তির জন্যও অনেকে গাছ লাগিয়ে থাকে। মান্দার, ধইঞ্চা, কাইফলা ইত্যাদি বিভিন্ন গাছ, যেগুলোতে ফল হয় না কিংবা কাঠও হয় না, এ ধরনের গাছ জ্বালানি হিসেবে যথেষ্ট উপযোগী। তাই নারীরা জ্বালানিপ্রাপ্তির জন্য এ ধরনের গাছ লাগিয়ে থাকে। গাছ লাগানোর পেছনে অনেকেরই ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা কাজ করে। সন্তানের লেখাপড়ার খরচ নির্বাহ, বিয়ে দেওয়া, স্থাবর সম্পত্তি ক্রয়, গৃহনির্মাণ, গৃহ সংস্কার, গৃহস্থ আসবাব তৈরি ইত্যাদি কারণে নারীরা প্রতিনিয়ত গাছ লাগিয়ে থাকে। গ্রামীণ নারীরা অসুখবিসুখে গাছগাছালির ওপর নির্ভর করে। যাদের নামের সঙ্গে কবিরাজ রয়েছে, তারা মূলত বংশপরম্পরায় বিভিন্ন অসুখবিসুখে হারবাল চিকিত্সা দিয়ে থাকে। ডায়রিয়া, পেটে ব্যথা, পেট খারাপ, আমাশায়, ধাতু ভাঙা, বাচ্চার দুধ, বমি ইত্যাদি অসুখে গাছগাছালির ওপর নির্ভরতা বেশি লক্ষ করা যায়। এ ধরনের অসুখে কলা পাতা, শতমূল, থানকুনি পাতা, সফেদা, বেল পাতা, কচি আনারস, জার্মানি লতা, পেয়ারা পাতা ইত্যাদির ঔষধি গুণ সম্পর্কে নারীরা সচেতন।

অর্থাত্ গ্রামীণ নারী দৈনন্দিন কাজের মাধ্যমে সহজাতভাবেই প্রকৃতি ও পরিবেশের সংরক্ষক হয়ে ওঠে। উপকূলবর্তী এলাকার পানি লবণাক্ত হওয়ায় এখানে সুপেয় পানিপ্রাপ্তি শ্রম ও কষ্টসাধ্য এবং মাটিতে লবণের পরিমাণ বেশি হওয়ায় সব ধরনের গাছগাছালি না জন্মানোর কারণে গাছগাছালি থেকে জ্বালানি সংগ্রহ সম্ভব হয় না। উপরন্তু কৃষিজ ফসল উত্পাদন তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় এবং পানির অভাবে সেচব্যবস্থা না থাকায় বছরের অর্ধেক সময় কোনো ধরনের ফসল জন্মাতে পারে না। ফলে জ্বালানি হিসেবে ফসলের আগাছা ব্যবহার পর্যাপ্ত নয় এ নারীদের কাছে। এ কারণে নারীরা জ্বালানির জন্য গোবরের ওপর নির্ভর করে। তবে চিংড়ি চাষের কারণে একরের পর একর ভূমি ঘেরে পরিণত হলে গবাদিপশু লালন-পালন সম্ভব নয় বিধায় নারীদের জ্বালানিপ্রাপ্তির প্রধান উত্স হুমকির সম্মুখীন। সুতরাং পরিবেশের প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর সহজলভ্যতার অভাবে উপকূলীয় গ্রামীণ নারীকে অনেক বেশি শ্রম ও সময় দিতে হয় খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও পশুখাদ্য সংগ্রহের কাজে।

বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষ: বিপন্ন পরিবেশ ও বিপন্ন নারী

উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্রের লোনা জলের প্রাপ্যতাকে কাজে লাগিয়ে কৃষিজমিকে চিংড়িঘেরে রূপান্তরিত করে চিংড়ি চাষ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হলেও তা স্থানীয় প্রকৃতি ও পরিবেশকে করেছে বিপন্ন। এ বিপন্নতার ফল ভোগ করতে হচ্ছে স্থানীয় জনগণকে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের নিমিত্তে উন্নয়ন ব্যবস্থাপত্র অনুসরণ করে চিংড়ি চাষের ফলে স্থানিক পরিবেশ ও নারীর বিপন্নতাকে বিশ্লেষণ করার আগে বাংলাদেশে চিংড়ি চাষের ইতিহাস আলোচনা করলে দেখা যায়, উপকূলীয় অঞ্চলকে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবণ-পানি থেকে মুক্ত করে কৃষিকাজের সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটানো ও খাদ্যচাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ১৯৬০-৭০ দশকে কোস্টাল এমব্যাঙ্কমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ করা হয় বৈদেশিক সহায়তা নিয়ে। এ বাঁধের মাধ্যমে পরিকল্পিত উপায়ে চিংড়ি চাষেরও চিন্তাভাবনা করা হয়, যেখান থেকে বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে আশা করা হয়। উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে পরিবেশগত, অবকাঠামোগত ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি—এ তিনটি ক্ষেত্রে উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অথচ স্বাধীনতা অর্জনের পর উপকূলীয় বাঁধ কেটে অধিক পরিমাণে সমুদ্রের লোনা জল প্রবেশ করিয়ে মুনাফালোভীরা একরের পর একর কৃষিজমিতে চিংড়ি চাষ শুরু করে। এটা ছিল ‘এমব্যাঙ্কমেন্ট অ্যান্ড ড্রেনেজ অ্যাক্ট অব ১৯৫৩-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। নব্বইয়ের দশকের শেষ নাগাদ কমপক্ষে ১ হাজার ১০০ স্থানে বেড়িবাঁধ কাটা হয়।৩০ ফলে পরিবেশ, অবকাঠামো, শ্রম তিনটি ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যদিও ঘের মালিক এবং এর পৃষ্ঠপোষকেরা চিংড়ি রপ্তানি করে প্রচুর পরিমাণে অর্থ-বিত্তের অধিকারী হয়। চিংড়ি রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় বলে এ খাতকে জাতীয় আয়ের ক্ষেত্রে অন্যতম লাভজনক খাত হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বর্তমানে আনুমানিক ১ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর উপকূলীয় জমিতে চিংড়ি চাষ হচ্ছে কৃষিজমি ও ম্যানগ্রোভ বনকে চিংড়িঘেরে রূপান্তরিত করে।৩১ অর্থনৈতিকভাবে প্রবৃদ্ধি অর্জনের এ প্রক্রিয়ায় নারী ও পরিবেশ ইস্যু বিবেচ্য হয়নি অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের মতো। বিশ্বব্যাংকের ১৯৯০ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যায়, বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে নারী ইস্যু গুরুত্ব পায় না মানব উন্নয়নের প্রশ্নে।৩২ অচিরেই এলাকাগুলোতে পরিবেশগত বিপর্যয় শুরু হলে এ উন্নয়নপ্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়। চিংড়িঘেরের লবণ-পানির ফলে আশপাশের কৃষি জোতগুলো লবণাক্ত হওয়ায় কৃষি উত্পাদন হুমকির মুখে পড়ে। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষির জমির মালিকেরা ঘেরমালিকদের কাছে স্বল্পমূল্যে জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এভাবে ঘেরের আয়তন বৃদ্ধি পেয়ে বিশাল এলাকাজুড়ে লবণাক্ততার সৃষ্টি হয়। কৃষিজমিসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা লবণাক্ত হয়ে পড়ায় গাছগাছালি, লতা, গুল্ম তথা বনাঞ্চল বিলীন হয়। শুধু তা-ই নয়, মাটিতে বসবাসকারী বিভিন্ন পোকামাকড়ের অস্তিত্ব ধ্বংস হয়। লবণাক্ততার দরুন মিঠা পানির মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী হুমকির সম্মুখীন হয়, যা জীব-বৈচিত্র্যকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। চিংড়ির পোনা ধরার জালে জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ আটকা পড়ে। সামুদ্রিক মত্স্য দপ্তর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সহকারী পরিচালকের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, একটি চিংড়ি পোনা সংগ্রহে ৯০টি অন্য মাছের পোনা মারা যায়।৩৩ আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, বিশেষ জাল দিয়ে চিংড়ির একটি বাগদা পোনা ধরার সময় শিকারিরা ১৪টি অন্যান্য প্রজাতির চিংড়ির পোনা, ২১টি মাছের পোনা এবং ১ হাজার ৬০০ জুস্ন্যাংকটন ধরে।৩৪ শিকারিরা চিংড়ির পোনাটি রেখে বাকি সব আবর্জনা হিসেবে নদীর চরে ফেলে দেয়। এ ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরসহ সমগ্র উপকূলীয় অঞ্চল মাছশূন্য হয়ে পড়বে বলে ধারণা করা হয়। লবণাক্ততার প্রভাবে পর্যাপ্ত গো-খাদ্যের অভাব দেখা দেয়। ফলে গবাদিপশু লালন-পালন বন্ধ হয়ে যায়। তা ছাড়া কৃষিজমি না থাকায় গবাদিপশুর চাহিদা কমে যায়।

গ্রামীণ নারীর জীবন-জীবিকা প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় উপরিউক্ত পরিবেশগত বিপর্যয়ে নারীর অবস্থা হয় বিপন্ন। এখানে কারেন জে ওয়ারেন নির্দেশিত লিঙ্গ-জেন্ডার পার্থক্যের মাধ্যমে নারী প্রকৃতির কাছে ভিন্নভাবে উপস্থিত হয়।৩৫ অর্থাত্ ওয়ারেন নারীর জৈবিক অনুভূতিকে পুরুষের সঙ্গে পৃথক্করণের মাধ্যমে প্রকৃতির প্রতিরূপে নারীকে স্থাপন করেন। যেটিকে মারিয়া মিজ লৈঙ্গিক শ্রমবিভাজন হিসেবে উল্লেখ করেন।৩৬ অর্থাত্ লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবিভাজন নারীকে প্রকৃতিঘনিষ্ঠ করে। ফলে প্রকৃতির বিপর্যয় নারীর বিপর্যয় হিসেবে আবির্ভূত হয়। নারীর আর্থসামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক, শারীরিক সংকট সৃষ্টি হয়। চিংড়িঘেরের জন্য জমি বিক্রির (কিংবা একধরনের দখলের সম্মুখীন হয়ে বিক্রি করতে বাধ্য হওয়া) প্রক্রিয়াটি শান্তিপূর্ণ নয়। ঘের মালিকদের সঙ্গে জমির মালিকদের কোন্দল সৃষ্টি হয়। কৃষিজমি জোরপূর্বক দখল কিংবা ভীতি প্রদর্শনের জন্য ঘেরের মালিকেরা ভাড়াটে সন্ত্রাসী রাখে। সন্ত্রাসীরা অবশ্য ঘের-শ্রমিক কিংবা পাহারাদার হিসেবে থাকে। শহীদ সাংবাদিক মানিক সাহার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০২ সালে চিংড়ি চাষকে কেন্দ্র করে ৪১টি সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছে, যেখানে নিহত হয়েছেন ১২ জন ও আহত হয়েছেন ৬৮ জন।৩৭ সন্ত্রাসীরা গ্রামের নারী, কিশোরী, তরুণীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কৃষককে ভীতি প্রদর্শন করে এবং তাদের পরিবারের নারীদের অপমান, লাঞ্ছিত করে। সিডিপি-এসএসওকিউ পার্টনারশিপ রিপোর্ট ২০০৩ অনুযায়ী, ২০০৩ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর এ ছয় মাসে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট তিনটি জেলায় চিংড়ি চাষে যুক্ত ব্যক্তিদের দ্বারা ৩৪ জন নারী ধর্ষিত হয়েছেন।৩৮

উদ্ভূত পরিস্থিতি গ্রামের জনগণের প্রান্তিকীকরণ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। জনগণের বিশাল অংশ কৃষিকাজ থেকে উত্খাত হওয়ায় আবহমান কাল ধরে পরিচালিত হওয়া তাদের কৃষিভিত্তিক জীবিকার বদল ঘটে। পুরুষেরা জীবিকার তাগিদে অ-কৃষি পেশায় নিযুক্ত হয়। নিকটবর্তী শহরে গিয়ে রিকশা-ভ্যানচালক, যানবাহনের শ্রমিক, দোকানের শ্রমিক ইত্যাদি কাজে তারা অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করে। অনেক সময় পুরুষেরা চিংড়িঘেরে শ্রমিক হিসেবেও কাজ করে থাকে। পরিবারের প্রধানের অন্যত্র গিয়ে বিকল্প কাজের সন্ধান নারীর জীবন-জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলে। নারীকে তখন গৃহ ও গৃহসম্পৃক্ত সব কাজে অন্তর্ভুক্ত হতে হয়। নারীর শ্রম ও শ্রমঘণ্টা বেড়ে যায়।

এক গবেষণায় দেখা যায়, চিংড়ি চাষের ফলে সাধারণ মানুষ তাদের ভূমি, গবাদিপশু, মাছ, বৃক্ষ ইত্যাদির ওপর থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ হারায়। ধনীকে আরও বিত্তশালী ও ক্ষমতাধর করে এবং সাধারণ সম্পদ ভোগের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে দরিদ্ররা আয়ের পথ থেকে বিতাড়িত হয়।৩৯ অর্থাত্ উন্নয়নের নামে যে অর্থায়ন হয়, তা সাধারণ জনগণের জন্য কোনোভাবেই ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনে না, উপরন্তু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করে।

পুরুষেরা বিকল্প পেশায় নিয়োজিত হলেও নারী পুরুষের মতো স্থানান্তরিত হতে পারে না। কারণ, পরিবারের শিশু, গবাদিপশু, গৃহস্থালি বিষয়াদির দেখাশোনার দায়িত্ব তাঁর। এ কারণে পুরুষের তুলনায় নারীর জীবন-জীবিকা বিপন্ন হয় বেশি। নারী তার পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, পানি, জ্বালানির সংকটে পড়ে। এগুলো সংগ্রহের জন্য তাকে অনেক সময় ও শ্রম দিতে হয়। শুধু তা-ই নয়, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি না থাকায় নারীর আয়ের পথ বন্ধ হয়। এক গবেষণায় দেখা যায়, স্থানান্তরিত নারীর কর্মসংস্থান সীমিত।৪০ কেননা পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোয় নির্মিত শ্রমবিভাজনের ফলে নারীর জন্য নির্ধারিত কাজের বাইরে নারীকে একজন শ্রমিক হিসেবে গ্রহণ করতে অভ্যস্ত নয় সমাজ।

জীবিকার তাগিদে নারীরা চিংড়ি পোনা ধরে বিক্রি করে। দিনে আট-দশ ঘণ্টা নদীতে ঠান্ডা লোনা পানিতে দাঁড়িয়ে পোনা ধরার ফলে হূদরোগসহ অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতার সম্মুখীন হয়।৪১ আবার নারীরা চিংড়ি কারখানায় নিম্নমজুরির বিনিময়ে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। এ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের যথাযথ পোশাক না থাকায় তাদেরকে কেমিক্যালের ক্ষতিকর প্রভাব যেমন: মাথাঘোরা, চর্মরোগ, হাত ও পায়ের নখ ভাঙা, হূৎপিণ্ডের অসুখসহ নানা ধরনের শারীরিক সমস্যায় পড়তে হয়। তা ছাড়া দৈনন্দিন গৃহস্থালির কাজের প্রয়োজনে লবণাক্ত পানি ব্যবহার করায় নারীকে বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগে ভুগতে হয়।

চিংড়ি চাষ নারীর আর্থসামাজিক, শারীরিক ও মানসিক ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ প্রভাব স্থানিক জনগণের ওপর পড়লেও নারীর ভোগান্তি অন্যদের চেয়ে বেশি। চিংড়ি চাষের কারণে সৃষ্ট দুর্যোগে নারী তার আবহমান কালের কাজ হারায়। বিকল্প কাজের সন্ধানে নারীকে মুখোমুখি হতে হয় বিভিন্ন মনোদৈহিক সমস্যার। ধনী চিংড়িঘেরের মালিকেরা চিংড়িবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদানকারীদের মিথ্যা মামলায় আসামি করে এবং নারী ও শিশুদের নির্যাতন করে।৪২ অনেক সময় আন্দোলনকারী নারীদের বিরুদ্ধেও মিথ্যা মামলা করে থাকে। শুধু তা-ই নয়, চিংড়িঘেরগুলোতে অন্য এলাকা থেকে আসা ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা চিংড়ির মালিকের শক্তি হিসেবে থাকায় তারা গ্রামীণ নারীদের বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করে। তা ছাড়া চিংড়ি প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় নারীশ্রমিকের যৌন হয়রানির ঘটনা অহরহই ঘটে থাকে।

নারীর প্রতিবাদ আন্দোলন: তাত্পর্য ও অর্জন

প্রবৃদ্ধি অর্জন তথা উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিচালিত বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষের ক্ষতিকর প্রভাবের ফলে বৃহত্তর খুলনা বিভাগের খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা জেলার উপকূলীয় স্থানীয় জনগণ তাদের বিপন্নতা রোধে রুখে দাঁড়ায় নব্বইয়ের দশকে এসে। বিশেষ করে ১৯৯০ সালে সংঘটিত চিংড়িঘেরবিরোধী সর্বপ্রথম সক্রিয় আন্দোলনে উপকূলবর্তী বিভিন্ন গ্রাম যেমন : হরিণখোলা, নোয়াই, দারুণ মলিক, বিঘরদানা গ্রামের নারীরা ‘ঘের করতে দিব না, লবণ-পানি ওঠানো যাবে না’ স্লোগানকে ধারণ করে সমন্বিত আন্দোলনে অংশ নেয়। এ আন্দোলনে চিংড়িঘেরের মালিকদের সন্ত্রাসীদের গুলি ও বোমা হামলায় আন্দোলনে নারীনেত্রী করুণাময়ী সরদার নিহত হন এবং উর্মিলা সরদার, রূপজান বিবি, আনোয়ারা, রূপবান, রহিমা বেগমসহ অসংখ্য নারী আহত হন। শুধু তা-ই নয়, আন্দোলনকারী নারীদের অনেকের নামে মিথ্যা মামলা করা হয় এবং পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে এবং জেলহাজতে পাঠায়। এ প্রতিবাদ আন্দোলনের ফলে ওই গ্রামগুলোতে সাময়িকভাবে ঘের তৈরি বন্ধ হয়। ঘেরের মালিকেরা সাধারণত সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যায় বলে এলাকার জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সরকারি প্রশাসন নির্লিপ্ত থাকে। তা ছাড়া চিংড়ি রপ্তানি অর্থনৈতিক আয়ের অন্যতম খাত হওয়ায় সরকারের পরিবেশ নীতিমালায় বিষয়টি সম্পর্কে গুরুত্ব প্রদান করে চিংড়ি চাষের বিরুদ্ধে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়নি। সরকারের জাতীয় চিংড়ি নীতি ২০০৯ (প্রস্তাবিত)-এ অনিয়ন্ত্রিত চিংড়ি চাষের নেতিবাচক আর্থসামাজিক ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের কথা স্বীকার করা হলেও তা নিরসনকল্পে কোনো প্রস্তাব রাখা হয়নি। উপরন্তু অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষের সম্প্রসারণের যৌক্তিকতায় চিংড়িকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী পণ্য হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে সম্প্রতি পরিবেশ সংগঠন বেলার দায়ের করা মামলায় ২০১০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট উপকূলীয় এলাকার কৃষিজমিকে চিংড়িঘেরে রূপান্তরিত করার ওপর নিষেধ আরোপ করে রায় প্রদান করেন।

পরিবেশ অবনয়নের বিরুদ্ধে নারীর সাড়া প্রদান প্রকৃতি, পরিবেশ তথা নারীর অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। পরিবেশ রক্ষায় নারীর প্রতিবাদের ধরন ও প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে পরিবেশ রক্ষায় নারীর সম্ভাবনার যে কয়েকটি দিক লক্ষণীয় তা নিচে আলোচনা করা হয়েছে।

স্বতঃস্ফূর্ততা

গ্রামের নারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিবাদ ও আন্দোলনে অংশ নিয়েছে বিভিন্ন মাত্রায়। সমর্থন দেওয়া, সংগঠিত করা, নেতৃত্ব প্রদান—সব স্তরেই নারীরা স্বতাগিদে ও স্বেচ্ছায় অংশ নিয়েছে। দারিদ্র্য ও প্রকৃতির বৈচিত্র্যপূর্ণ আচরণের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর নিরন্তর প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে উপকূলবর্তী গ্রামীণ নারীর পরিবেশসচেতনতার পাশাপাশি পরিবেশ সংবেদনশীলতাও তৈরি হয়। ফলে তাদের কাছে জীবন-জীবিকা রক্ষা ও পরিবেশ রক্ষার তাগিদ সমান্তরালভাবেই উপস্থিত হয়। এ কারণে কোনো ধরনের সাংগঠনিক বিন্যাস ছাড়াই নারীরা সহজাতভাবে প্রতিবাদ আন্দোলনে অংশ নিয়েছে। উপকূলবর্তী বিভিন্ন গ্রাম যেমন: মধুখালী, পার মধুখালী, জকারওলা, রাধানগর, দিঘলিয়া ইত্যাদিতে ঘেরবিরোধী, লিজবিরোধী আন্দোলনে নারীরা সক্রিয় অংশ নিয়ে আসছে।

পরিস্থিতি উদ্ভূত নেতৃত্ব

জীবন-জীবিকা রক্ষার স্পৃহা নারীদের তাত্ক্ষণিকভাবে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে নেতৃত্বদানে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। উল্লেখ্য, সরল জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত গ্রামীণ নারীরা পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা তথা পরিবেশ রক্ষার জন্য অন্য নারীদের সংগঠিত করে নেতৃত্বদানে অগ্রগামী হয়। হরিণখোলা গ্রামের করুণাময়ী সরদার, উর্মিলা সরদার, রহিমা বেগম প্রমুখ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নেতৃত্বগুণ ধারণ করেছেন, একজন নেতা হিসেবে চিংড়িঘের মালিকদের নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছেন।

সাংগঠনিক তত্পরতা

সংগঠিতভাবে পরিবেশ অবনয়নের বিরুদ্ধে নারীর সাড়া প্রদানকে প্রতিবাদের ভাষায় রূপ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে আন্দোলনকে সংগঠিত করার পেছনে বেসরকারি সংগঠনের উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়। যেমন: বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন ‘নিজেরা করি’ উপকূলবর্তী গ্রামের দরিদ্র নারী ও পুরুষদের নিয়ে ভূমিহীনদের সংগঠন তৈরি করে, যাতে তারা অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হয়, জীবনমানের উন্নয়ন ঘটে। ভূমিহীনদের সংগঠনের নারীরা বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

প্রতিবাদের কৌশল

উপকূলবর্তী সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ নিজেকে ও পরিবেশকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য উদ্যোগী হয়। তাদের প্রতিবাদ আন্দোলনের বহিঃপ্রকাশ ঘটে অহিংসভাবে। যখনই কৃষিজমিকে চিংড়িঘেরে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করা হয় তখনই স্থানীয় জনগণ ঘের খনন হবে এমন স্থানে মিছিল করতে গিয়ে সম্মিলিতভাবে অবস্থান নেয় এবং সভা করে যাতে ওই স্থানটি খনন করা সম্ভব না হয়। এভাবে দিনের পর দিন অহিংসভাবে আন্দোলন চলতে থাকে। হরিণখোলা, নোয়াই, বিঘরদানা প্রভৃতি উপকূলবর্তী গ্রামে কৃষিজমি খনন করে চিংড়িঘের স্থাপনের বিরুদ্ধে অহিংসভাবে আন্দোলন চলে আসছে।

আত্মত্যাগ

পরিবেশ রক্ষায় নারীর আত্মত্যাগের ইতিহাস অনেক পুরোনো। গাছ জড়িয়ে ধরে বিসনোই নারীর জীবন উত্সর্গ ইতিহাসে এখনো সমুজ্জ্বল। বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীও পরিবেশ রক্ষায় নিজের জীবন উত্সর্গ করতে দ্বিধা করেনি। আন্দোলনে চিংড়িঘের মালিকদের সন্ত্রাসীদের গুলি ও বোমা হামলায় হরিণখোলা গ্রামের করুণাময়ী সরদার নিহত হন এবং অসংখ্য নারী আহত হন।

নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলন

নারীর পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলনে রূপ নেয়। এভাবেই পরিবেশবাদী আন্দোলনের সঙ্গে নারীবাদী আন্দোলনের সংযোগ ঘটে। নিহত নারীনেত্রীর হত্যার বিচারের দাবি ও মিথ্যা মামলা থেকে মুক্তির দাবিতে গ্রামের নারীরা সংগঠিত হয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনের স্পৃহা গ্রামীণ নারীকে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোয় বিভিন্ন নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতেও সহায়তা করেছে। উপকূলীয় নারীরা যৌতুক ও পারিবারিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তা ছাড়া ২০০৪ সালে রহিমা নামের এক নারীকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে হাজতে এক দারোগা নির্যাতন করলে সেই দারোগাকে অপসারণের জন্যও নারীরা আন্দোলন করে। পরে অবশ্য ওই দারোগাকে থানা থেকে প্রত্যাহার করে বদলি করা হয়। ২০০১ সালে বারোয়ারিয়া গ্রামে লোনা পানির ঘেরের পক্ষের লোকজন টাকা দিয়ে আর্মি ক্যাম্পের এক ক্যাপ্টেনকে দিয়ে গ্রামবাসীর ওপর নির্যাতন চালালে নারীরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলনে অংশ নেয়।

সর্বজনীনতা

পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন একপর্যায়ে সবার আন্দোলন হয়ে ওঠে। অর্থাত্ পরিবেশ বিপর্যয়ে নারী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বিপর্যয়ের প্রভাব সবার ওপরেই পড়ে। কেননা নারীর জীবন-জীবিকার অংশ তার পরিবার ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা। সুতরাং নারীর জীবন বিপন্ন হলে এর প্রভাবে সবাই বিপন্ন হয়ে পড়ে। সংগঠিত প্রতিবাদ আন্দোলনে বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষ ধারাবাহিকভাবে অংশ নিলেও প্রতিবাদের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আন্দোলনে নেতৃত্বদান, অংশগ্রহণ, সমর্থন করা—সর্বত্রই নারীর ভূমিকা অগ্রগণ্য।

তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ

মূলত পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো নারী ও প্রকৃতির ওপর দমন, শোষণের ক্ষেত্র তৈরি করে। সব সমাজেই কর্তৃত্বের মতবাদ (isms of dominations)ক্রিয়াশীল এবং কর্তৃত্বের মতবাদের ওপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠিত পীড়নমূলক ধারণাগত কাঠামোই পুরুষ কর্তৃক নারীর অধীনতাকে এবং মানব কর্তৃক প্রকৃতির অধীনতাকে বৈধতা দেয়।৪৩ কারেন জে ওয়ারেনের মতে পুরুষতন্ত্রে ক্ষমতা প্রদর্শনে অধীনদের ওপর আধিপত্য বিস্তারের ফলে ক্ষমতার বিরুদ্ধে ক্ষমতা (power against power) সম্পর্ক নারী ও প্রকৃতির ওপর শোষণের নৈতিক ক্ষেত্র তৈরি করে। চিংড়িঘের অধ্যুষিত অঞ্চলে লক্ষ করা যায়, অধিপতিশীল ঘেরের মালিকদের সঙ্গে অধস্তন জনগোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব স্পষ্ট। এ দ্বন্দ্বমূলক সম্পর্কের কারণ হচ্ছে আধিপত্য বিস্তারের মনোভাব, যা পুরুষতন্ত্র থেকে উত্সারিত। অধীনতার অনুশীলনের মধ্যদিয়ে নারী ও প্রকৃতি যুক্ত হয়। উন্নয়ন ও অধিক মুনাফার নামে মানব কর্তৃক প্রকৃতিকে শোষণ করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে উপকূলীয় এলাকায় চিংড়ি চাষের মাধ্যমে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, সেখানে নারীর অধস্তনতা ও বিপন্নতার মাত্রা বৃদ্ধি পায়। ভল প্লামউড অবশ্য নারী ও প্রকৃতির অধস্তনতার পেছনে পশ্চিমা যুক্তিবাদী (western rationalism) ভাবনার দ্বৈতবাদকে (dualism) তাঁর আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করে বলেন, পুরুষ/নারী, সংস্কৃতি/প্রকৃতি, যুক্তি/আবেগ প্রভৃতির দ্বৈত ও বৈপরীত্য ভাবনায় পুরুষ, সংস্কৃতি, যুক্তি, শ্রেষ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং নারী, প্রকৃতি, আবেগ, শ্রেষ্ঠের অধস্তন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।৪৪ অধিক মুনাফা অর্জনের যুক্তিতে বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষের মধ্য দিয়ে যে উন্নয়ন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে সেখানে নারী ও পরিবেশ অধস্তন হিসেবে বিবেচিত। পরিবেশ ও নারীর অবস্থান মূল্যায়িত না হওয়ার পেছনে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোয় দ্বৈতবাদী ভাবনার আলোকে কর্তৃত্বের যৌক্তিকতা (logic of domination) বিদ্যমান রয়েছে। একইভাবে বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের ফলে যে উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে, সেখানেও প্রকৃতি এবং নারীর অবস্থা যথারীতি প্রান্তিক। কেননা এ উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় প্রকৃতির অবনয়ন ঘটে, যা নারীর প্রান্তিকায়নকে ত্বরান্বিত করে। সম্পদ সৃষ্টিকারী এ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে বন্দনা শিবা অপ-উন্নয়ন (mal-development) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মারিয়া মিজ অবশ্য পুরুষতন্ত্র, বিজ্ঞান ও যুদ্ধ প্রযুক্তিকে মানব অস্তিত্বের হুমকিস্বরূপ আখ্যায়িত করে বলেন, এগুলোর অধীনে পরিচালিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শিল্পোন্নত ও শিল্পে অনুন্নত উভয় রাষ্ট্রেই নারীকে বিপন্ন ও প্রকৃতিকে ধ্বংস করে। আবার কারেন জে ওয়ারেনের মতানুযায়ী, মানুষ প্রকৃতিকে নিজের প্রয়োজনে পরিবর্তন করার সামর্থ্য রাখে। প্রকৃতিকে পরিবর্তন করার মধ্য দিয়ে যে অবদমনমূলক মনোভাবের জন্ম হয় তার সঙ্গে নারীর প্রতি পুরুষতন্ত্রের শোষণমূলক মনোভাবের সামঞ্জস্য রয়েছে। ফলে চিংড়ি চাষের মাধ্যমে নিজের প্রয়োজনে প্রকৃতি ও পরিবেশকে পরিবর্তন করার মনোভাবের সঙ্গে চিংড়ি চাষ এলাকার নারীদের অবদমন করার মনোভাবের মধ্যে মিল রয়েছে। অবদমনের এ মনোভাবের মধ্য দিয়ে নারী ও প্রকৃতির অবস্থান সমভাবে উপস্থিত হয় পুরুষতন্ত্রে। অর্থাত্ নারী ও প্রকৃতি পুরুষতন্ত্রের অধস্তন হিসেবে আবির্ভূত হয়। এভাবে সমাজে আধিপত্যের ধারণাগত কাঠামো বিদ্যমান। সেজন্য চিংড়ি চাষের ফলে সৃষ্ট দুর্যোগে নারী ও পরিবেশ আধিপত্যের ধারণাগত কাঠামোয় আবদ্ধ হয়। এ কারণে চলমান আন্দোলনের ফলস্বরূপ কৃষিজমিকে চিংড়িঘেরে রূপান্তরিত করার ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও, ভবিষ্যতে চিংড়ি চাষের সম্ভাবনা থেকে যায়। তবে পরিবেশ রক্ষা ও নারীর অধিকার রক্ষার মধ্যে সংযোগ স্থাপন কিংবা পরিবেশ ইস্যুতে নারীর সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশবাদী ও নারীবাদী আন্দোলনের অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম সকল ধরনের শোষণমূলক কাঠামোকে বিনাশ করবে বলে পরিবেশ নারীবাদীরা মনে করেন।

উপসংহার

অন্যান্য অনুন্নত বা উন্নয়নশীল সমাজের মতো বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীর প্রকৃতি সংশ্লিষ্টতা গড়ে ওঠে তার দৈনন্দিন গৃহস্থালির কাজের মধ্য দিয়ে। এ আন্তসম্পর্কের ফলে নারীর মধ্যে পরিবেশসচেতনতা ও সংবেদনশীলতা তৈরি হয়। এ কারণে পরিবেশের বিপন্নতায় নারীর জীবন-জীবিকাও বিপন্ন হয়ে পড়ে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য নারী প্রতিবাদী হয়, আন্দোলনে অংশ নেয়। পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে গ্রামের নারীদের অংশগ্রহণ কিংবা নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি কাজ করেছে তা হচ্ছে, নিজ পরিবারের সদস্য ও গবাদিপশুর জন্য খাদ্য, পানি, জ্বালানি সরবরাহ করার জন্য পারিপার্শ্বিক পরিবেশের ওপর নির্ভরতা। টিকে থাকার প্রশ্নে নারী ও প্রকৃতির স্বার্থ অভিন্ন হওয়ায় নারীর সাড়া প্রদান সহজাত হয়। নোয়েল স্টারজিওনের মতে, নারী বস্তুগত ও ঐতিহাসিক কাজের মাধ্যমে প্রকৃতির সঙ্গে একত্র হয়। যার ফলে যেকোনো পরিবেশগত সমস্যা নারীর দ্বারা দৃষ্টিগোচর হয় আগে, নারীর সংশ্লিষ্ট কাজের ওপর প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে।৪৫ আলোচনায় দেখা যায়, চিংড়ি চাষ নারীর জীবন-জীবিকার হুমকিই তৈরি করে না, এটি নারীর শারীরিক ও মানসিক বিপর্যস্তার জন্য নেতিবাচক পরিবেশও তৈরি করে। বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষে ব্যবহূত লোনা পানি বৃক্ষসহ অন্যান্য জীবজন্তুর জন্য হুমকিস্বরূপ এ বিষয়টি নারীদের অজানা নয়। গ্রামীণ নারীদের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পেছনে অবশ্য বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন ‘নিজেরা করি’, ‘উবিনিগ’ প্রভৃতির ভূমিকাও রয়েছে। এ সংগঠনগুলো চিংড়িবিরোধী চলমান আন্দোলনে স্থানিক জনগোষ্ঠীকে আইনি-সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ সম্পর্কেও সচেতন করার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া চিংড়িঘেরবিরোধী চলমান আন্দোলনে নারীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রেও বেসরকারি সংগঠনগুলোর কার্যক্রম লক্ষণীয়। পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে নারীর সংগঠিত শক্তি এবং ভূমিকা বৃহত্তর পরিসরে নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলনের ভিত্তি হতে পারে। আবার পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নারীকে পরিবেশের সংরক্ষক ও ব্যবস্থাপক এবং ভবিষ্যত্ প্রজন্মের ধারক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারে।

তথ্যসূত্র

১. Ishrat Shamim, and Khaleda Salahuddin, Energy and Water Crisis in Rural Households Linkages with Women’s Work and Time, Dhaka, Women for Women, 1994, p.34.  

২. Karen J. Warren, ‘Introduction to Ecofeminism’, http://media.pfeiffer.edu/lridener/courses/ ecowarrn.html on 06-11-2010, p.4.

৩. Bina Agarwal, ‘The Gender and Environment Debate: Lessons from India’, Visvanathan, Nalini & et al. (eds.), The Women, Development and Gender Reader, London, Zed books, 1997, p.69.

৪. Vandana Shiva, ‘The Seed and the Earth: Women, Ecology and Biotechnology’, The Ecologist, Vol. 22, No. 1, Jan/Feb, 1992. p. 4-8, http://www.theecologist.org/back_archive /19701999/ on 6-01-11

৫. Feminist Studies, Vol. 1, No. 2, (Autumn, 1972), p. 5-31 http://www.students.sbc.edu/ watson08/ HNW /3177638.pdf on 20-12-2010.  

৬. Sherry B. Ortner, ‘Is female to male as nature is to culture?’ in M. Z. Rosaldo and L. Lamphere (eds), Woman, culture, and society, Stanford, CA: Stanford University Press, 1974, p. 68-87.

৭. রেহনুমা আহমেদ, ও মানস চৌধুরী, নৃবিজ্ঞানের প্রথম পাঠ সমাজ ও সংস্কৃতি, ঢাকা, একুশে পাবলিকেশন্স লিমিটেড, ২০০৩, পৃ. ১৪৮।

৮. James E. Lovelock, Gaia: A New Look at Life on Earth, USA, Oxford University Press, 1979.

৯. Linda Marina, ‘Woman and the Land’, accessed at http://www.lancs.ac.uk/staff/twine/ ecofe m /linda.pdf.  

১০. Sadeka Halim, ‘Women’s Affinity with Nature: Two Perspectives on Ecofeminism’, The Dhaka University Studies, Journal of the Faculty of Arts, Vol. 55, No. 1, June, 1998, p. 194.  

১১. Carolyn Merchant, Earthcare: Women and the Environment, New York, Routledge, 1995, Introduction-xvi.  

১২. Vandana Shiva, Staying Alive: Women, Ecology and Development in India, London, Zed Books, 1989. p. 55.

১৩. Val Plumwood, Feminism and the Mastery of Nature, London and New York, Routledge, 1993, p. 20-21

১৪. Karen J. Warren, ‘The Power and the Promise of Ecological Feminism’, in H. LaFollete, Ethics in Practice, London, Blackwell, 1997, p. 658.  

১৫. Val Plumwood, op.cit, 1993, p. 1.  

১৬. Val Plumwood, ‘Nature, self and gender: feminism, environmental philosophy and the critic of rationalism’, Hypatia, 1991.  

১৭. Maria Mies, Search for a New Vision, Dhaka, Narigrantha Prabartana, 2005, p. 198.  

১৮. Bina Agarwal, op.cit, p. 68.  

১৯. Sandhya Venkateswaren, Environment, Development and the Gender Gap, New Dehi/Thousand Oaks/London, Sage Publications, 1995, p. 198.   

২০. Sadeka Halim, op.cit, p. 193.

২১. Karen J. Warren, op. cit, http://media.pfeiffer.edu/lridener /courses/ ecowarrn.html, p. 11.

২২. Bina Agarwal, op.cit, p. 74.  

২৩. Salma Khan, ‘The Impact of Environment on Women’s Health Status’, in Jahan, Roushan & et al. (eds.), Environment and Development Gender Perspectives, Dhaka, Women for Women, 1995, p. 60.

২৪. Sandhya Venkateswaran, op.cit, p. 12.  

২৫. Ishrat Shamim, and Khaleda Salahuddin, Energy and Water Crisis in Rural Households Linkages with Women’s Work and Time, Dhaka, Women for Women, 1994.  

২৬. Sandhya Venkateswaran, op.cit, p. 45.

২৭. Ibid, p. 46.

২৮. Nilufar Ahmed, ‘Environment Development and Women : Bangladesh Perspective’, in Jahan, Roushan & et al. (eds.), Environment and Development Gender Perspectives, Dhaka, Women for Women, 1995, p. 25.  

২৯. Israt Shamim, ‘Women and Environment Disasters: Riverine Erosion and Displaced Women as Managers’, in Jahan, Roushan & et al. (eds.), Environment and Development Gender Perspectives, Dhaka, Women for Women, 1995, p. 47.  

৩০. সাজেদ রহমান, ‘দক্ষিণাঞ্চলে চিংড়িঘের বঞ্চিত শ্রমিক, নির্বিকার সরকার’, সাপ্তাহিক, ২৩ অক্টোবর ২০০৮, বর্ষ ১, সংখ্যা ২৩, পৃ. ৪১।

৩১. Nilufar Ahmed, op.cit, p. 31.  

৩২. Israt Shamim, op.cit, p. 55.  

৩৩. কালের কণ্ঠ, ৮ আগস্ট, ২০১০, রোববার, পৃ. ৪।

৩৪. ‘বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষ: খাদ্যনিরাপত্তা, সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব’ শীর্ষক সেমিনার, এলজিইডি মিলনায়তন, ঢাকা, ২৯ আগস্ট, ২০০৯।

৩৫. Karen J. Warren, op.cit, http://media.pfeiffer.edu/lridener/courses/ ecowarrn.html on 06-11-2010.

৩৬. Sandhya Venkateswaran, op.cit, p. 24.

৩৭. ‘বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষ: খাদ্যনিরাপত্তা, সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব’ শীর্ষক সেমিনার, এলজিইডি মিলনায়তন, ঢাকা, ২৯ আগস্ট, ২০০৯।

৩৮.   প্রাগুক্ত.

৩৯. Atiqur Rahman, `The Impact of Shrimp Culture on the Coastal Environment’, in Rahman, Atiq, A. & et al. (eds.), Environment and Development in Bangladesh, Dhaka, UPL, 1994, p. 499.   

৪০. Raana Haider, ‘Women, Poverty and the Environment’, in Rahman, Atiq, A. & et al. (eds.), Environment and Development in Bangladesh, Dhaka, UPL, 1994, p. 283.

৪১. Nilufar Ahmed, op.cit, p. 341.

৪২. Ibid, p. 34.     

৪৩. Karen J. Warren, op.cit, 1997.     

৪৪. Val Plumwood, op.cit, 1993.  

৪৫. Noel Sturgeon, Ecofeminist Natures, London and New York, Routledge, 1997.        

pathok

যোগাযোগের ঠিকানা

সিএ ভবন,
১০০ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,
কারওয়ান বাজার, ঢাকা - ১২১৫।

ফোন: ৮৮০-২-৮১১০০৮১, ৮১১৫৩০৭
ফ্যাক্স - ৮৮০-২-৯১৩০৪৯৬

protichinta kinte chile