protichinta

ফুটপাতের চটি বই ও ‘মাঝারি’ গরিবের আত্মপরিচয়

সুমন রহমান

সারসংক্ষেপ

একটি বিলুপ্তপ্রায় শিল্পমাধ্যমের সঙ্গে একটি বিপন্নপ্রায় সাংস্কৃতিক বর্গের আদান-প্রদান এই প্রবন্ধের বিষয়বস্তু। চটি বই নামক মুমূর্ষু শিল্পমাধ্যমটিকে ধরে শহরকেন্দ্রিক অল্পশিক্ষিত ‘মাঝারি’ গরিবের সাংস্কৃতিক অভিলাষকে শনাক্ত করা হয়েছে এখানে। কোন ভৌগোলিক ও সামাজিক পরিসরে শহরবাসী এই মাঝারি গরিবের প্রেম উত্পাদিত হচ্ছে এবং তার সাথে এই সাংস্কৃতিক শ্রেণীর আত্মপরিচয়ের রাজনীতি কীভাবে সম্পর্কিত হচ্ছে—এই লেখায় তারই অনুসন্ধান করা হয়েছে গত শতকের নব্বই দশকে বের হওয়া কয়েকটি প্রেমপত্রের চটি বইয়ের নিবিড় পঠনের মাধ্যমে। অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণের হাতিয়ার হিসেবে এই প্রবন্ধে চিহ্নতাত্ত্বিক বা সেমিওলজিক্যাল পদ্ধতির সঙ্গে সমাজতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণের মিশেল ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

মুখ্য শব্দগুচ্ছ: ফুটপাতের বই, মাঝারি গরিব, নিম্নবর্গের বিনোদনমাধ্যম, আরবান ফোকগান, সোশ্যাল রিয়ালিজম ও সোশ্যাল ফ্যান্টাসি।

ভূমিকা

সিডি-ডিভিডির সহজলভ্যতার এই যুগে ফুটপাতের বই আজকাল বিরল হয়ে যাওয়া একটি বিনোদনমাধ্যমের নাম। তবু আজও এর অস্তিত্ব আছে এবং শহুরে নিম্নবর্গের একটি অংশ এখনো এসব বই নেড়েচেড়ে দেখে। এই ধারার সস্তা বইয়ের ইতিহাস সুদীর্ঘ আড়াই শ বছরের, আছে বিচিত্র বিষয়ে ও আঙ্গিকে বই প্রকাশনার রেওয়াজ। ‘প্রেমপত্রের বই’ তেমনি একটা ক্যাটাগরি, যাকে আশ্রয় করে বর্তমান নিবন্ধে আমরা দেখব ঢাকা শহরে কীভাবে ‘মাঝারি’ গরিবের আত্মপরিচয় উত্পাদিত হচ্ছে। এসব বইতে বিভিন্ন প্রেমমূলক পরিস্থিতিতে একজন পুরুষের সঙ্গে নারীর চিঠি চালাচালি নমুনা আকারে থাকে। যেহেতু একটি প্রেমের শুরু, মধ্য ও শেষ আছে, ফলে ধারাবাহিকভাবে একটি প্রেমের উপাখ্যানকে বর্ণনা করার চেষ্টার মাধ্যমে প্রেমপত্রের বই প্রায়ই বিভিন্ন কাহিনির উন্মোচন করে। প্রেমার্থী নর এবং নারীই কেবল এসব কাহিনির উপজীব্য নয়, বরং নানান বর্ণের পার্শ্বচরিত্রও ঘুরে বেড়ায় তার ছত্রে ছত্রে। ১৯৯০-এর দশকে বের হওয়া এমনি কয়েকটি বইয়ের নিবিড় পঠনের মাধ্যমে এই লেখাটি মূলত ঢাকা শহরের অল্পশিক্ষিত ‘মাঝারি’ গরিবকে একটি বিপন্নপ্রায় সাংস্কৃতিক প্রজাতি হিসেবে শনাক্ত করবে, যারা অপ্রাতিষ্ঠানিক নগরগরিবি বিকাশের রমরমা এই যুগে নিজেদের শহুরে মধ্যশ্রেণীর বিস্তৃত সাংস্কৃতিক বলয়ের মধ্যে খুঁজে পাওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।

গোড়াতেই ‘মাঝারি গরিব’ বলতে কাদের বোঝাচ্ছি, সেটা পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেওয়া যাক, যদিও আখেরে এ রকম একটি সমাজতাত্ত্বিক অবস্থাকে ঠিকঠাক বোঝার উদ্দেশ্যেই এই সাংস্কৃতিক পঠন। ফলে ‘মাঝারি গরিব’ কারা এটা এখন নিতান্তই শুরুর আলাপ, শেষের মোকাম খানিক ভিন্ন হলেও হতে পারে। সেটুকু ঝুঁকি স্বীকার করেই আলাপটা পাড়া যাক, যাতে এই প্রবন্ধের মনস্তাত্ত্বিক ভ্রমণটুকু পাঠক ওয়াকিবহাল থাকেন। উন্নয়ন-অধ্যয়নশাস্ত্রে আয়ের কিংবা ক্রয়ক্ষমতার ফারাক বোঝানোর জন্য যে গরিব গোষ্ঠীকে ‘মডারেট আরবান পুওর’ বলে শনাক্ত করা হয়, ‘মাঝারি গরিব’কে এর অনুবাদ ঠাওরালে সমস্যা হতে পারে। আবার পেশার রকমফের খেয়াল করে অর্থশাস্ত্রে ‘ফর্মাল পুওর’ বলে যে শ্রেণীকে শনাক্ত করার চেষ্টা আছে, তাতেও পুরোপুরি মিশ খায় না এই ‘সাংস্কৃতিক’ গোষ্ঠী। যে গরিবের কথা এই প্রবন্ধে পাড়া হয়েছে, তারা মোটা দাগে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতিরই অংশ বটে। কিন্তু তাদের যে সাংস্কৃতিক দ্যোতনার উদ্ঘাটন করা হয়েছে এই লেখায়, প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির দেওয়া সংজ্ঞায় সেটাকে আঁটানো যায় না। ফলে বর্তমান প্রবন্ধে, এ রকম একটি দ্ব্যর্থবোধক অভিধাকে সম্বল করেই এগোনোর নিয়ত করেছি।

প্রেমপত্রের বইয়ের প্রায়োগিক উদ্দেশ্যের দিকটি সহজে বোধগম্য। যে চিঠিটি পাশের বাড়ির সখিনার কাছে কিংবা পাশের গ্রামের আয়েশার কাছে লিখবে বলে কত কত দিন হাতে কলম নিয়ে ছটফট করেছে ঢাকা শহরের দোকান কর্মচারী জাহাঙ্গীর, সিএনজিচালিত অটোরিকশার ড্রাইভার ইসরাইল বা বাস টার্মিনালের টিকিট ক্লার্ক সোলমান, কলম নিয়ে মেসের চৌকিতে ছুটির দিন দুপুরবেলা উপুড় হয়ে শুয়ে পড়তেই ফুরিয়ে গেছে ভাব, বদমাশের মতো উধাও হয়ে গেছে অতি দরকারি শব্দ কিংবা শব্দবন্ধ। শেষে, নিরুপায় হয়ে একটা লাগসই ‘ছন্দের’১ জন্য ধরনা দিয়েছে শাহ আলীর মাজারের ভবঘুরে ফকির আবদুল্লার কাছে। সেই চিঠি, সেসব দিস্তা দিস্তা চিঠির জন্য সস্তা কিছু বই তাদের এই ভাবজোগাড়ের কাজ থেকে রেহাই দিয়েছে। সারা দিনের হাঁকডাক মেশিন চালানো বেচাবিক্রির পর ক্লান্ত হাতে কলম নিয়ে ভাবের ঘরে গুঁতাগুঁতি তাদের যেন মানায় না, ফলে এই রেডিমেড পুস্তকি সহায়তা। এসব পুস্তকপ্রণেতা আমাদের জানান যে শহরবাসী মাঝারি গরিবের প্রেম কীভাবে কোথায় হয়, সেখানে কাদের ভাবের ঘরে কারা টোকা দেয়, অমর প্রেমের যাত্রাপথে কোন ঘটনার পর কোন ঘটনা ঘটে, পতনোন্মুুখ ভাবকে ঠেকা দিয়ে রাখার জন্য কোন পরিস্থিতিতে কোন ‘ছন্দ’ লাগসই ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই জানানোটা যে চেহারা নিয়ে বাজারে হাজির হয়, তার চলতি নাম ‘প্রেমপত্রের বই’। নিউজপ্রিন্টে ছাপা এসব বইয়ের প্রচ্ছদে হয় নামী কোনো নায়িকার ছবি থাকে, নয়তো থাকে একটা আঁকা ছবি: মুখে চিঠি নিয়ে উড়ে যাচ্ছে পাখি। পেছনের প্রচ্ছদে অবধারিতভাবে বেহেশতের কুঞ্জী বা এ জাতীয় কোনো বইয়ের বিজ্ঞাপন। টেক্সটের ফাঁকে ফাঁকেও মেকআপ গেটিস হিসেবে সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের অন্তরঙ্গ ছবি থাকতে দেখা যায়, কখনো এত প্রাসঙ্গিকভাবে থাকে যে, মনে হয় যেন অলংকরণ। কোনো কোনো বইয়ের শুরুতে একটা ভূমিকা দেওয়ার চেষ্টা থাকে, যেখানে প্রেম কী কিংবা কীভাবে প্রেম হয় জাতীয় প্রশ্নের দার্শনিক ও জটিল আধিবিদ্যক আলোচনা করেন বইপ্রণেতা। ভেতরে, কল্পিত পাত্রপাত্রীর প্রেমের নানান বাঁকবিকুলির মধ্যেও এসব প্রায়-অবোধ্য দার্শনিকতা থরে থরে বিছানো থাকে। একটি বইয়ের ভূমিকা থেকে খানিক উদ্ধৃত করি:

‘মনে করেন আপনি একজন যুবক আর সে একজন যুবতী। রাস্তায়, পথে, বাড়িতে, গ্রামে প্রতিনিয়ত আপনার আর তার সাক্ষাত্ হচ্ছে। এমনভাবে দেখা সাক্ষাত্ হবার মাধ্যমে আস্তে আস্তে আপনাদের উভয়ের মাঝে দেখা দিলে প্রেম সমুদ্রে উত্তাল তরঙ্গমালা সৃষ্টি করলো। প্রেম সমুদ্র থেকে উত্তাল তরঙ্গমালা সৃষ্টি হতেই সেটাকে নয়ন যুগলের কাছে ছুড়ে ফেলে দেয়। যদিও নয়ন যুগল প্রথমে দর্শন করেছিলো কিন্তু তার কোনো ক্ষমতা নেই, সে শুধু দর্শন লাভ করে হূদয়ের প্রেম কেন্দ্রের কাছে টোকা দিয়ে জানিয়ে দেয়। ব্যস! আর যায় কোথায়! সঙ্গে সঙ্গে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এরপর উভয়ে দিনের পর দিন ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হতে থাকে।’২

বই প্রকাশের আঁতুড়ঘর বাংলাবাজার থেকে ঢাকার ফুটপাতসহ নানান জায়গায় বিক্রি হয় এসব প্রেমের চিঠির বই। দোকান কর্মচারী, অটোরিকশার ড্রাইভার, ফুটপাতের অন্য হকার, রিকশাওয়ালা এবং অন্যান্য শ্রমিকশ্রেণীর মানুষ এসব বই কেনেন বলে জানালেন এক বিক্রেতা।৩ এসব বই মানুষ শুধু যে প্রেমপত্র লেখার গাইড হিসেবে কেনে, তা তো নয়। বরং এদের গল্পমূল্য ও সাহিত্যমূল্যও নেহাত কম নয়। অবশ্য শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সাহিত্যরুচির বিচারে এসবের অধিকাংশই উত্কট ও অশোভন মনে হওয়া সম্ভব। কিন্তু শিক্ষিত মধ্যবিত্তেরও আছে চিঠিসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত, বাংলা সাহিত্যে যেমন যাযাবর প্রণীত দৃষ্টিপাত, তেমনি বিশ্বসাহিত্যে দস্তয়েভস্কি প্রণীত Poor Folk(বাংলা অনুবাদে অভাজন), যেগুলো রচিত হয়েছিল স্রেফ চিঠির পরম্পরায়।৪ ফুটপাতের প্রেমপত্রের বইয়ের চিঠিগুলো পড়লেও এর ভেতরকার সাহিত্যিক উদ্দেশ্য টের পাওয়া যায়। শুধু চিঠির ছাঁচ সরবরাহ করাই বইয়ের উদ্দেশ্য নয়, এর বাইরেও এসব বই নানান বার্তা বহন করে।

বটতলার পুঁথি, চকবাজারের চটি

এসব প্রেমপত্রের বই বাজারচলতি চটি বই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। চটি বই বা বটতলার বইয়ের ইতিহাস কিন্তু বাংলাভাষার ভদ্রলোকি বইয়ের প্রায় কাছাকাছি। ভারতবর্ষে পর্তুগিজরা প্রথম প্রেস বসায় ষোড়শ শতাব্দীতে, মূলত বাংলা ভাষায় বাইবেল ছাপানোর জন্য। এই মিশনারি উদ্যোগ বাদ দিলে, আঠারো শতকের আগ পর্যন্ত বাংলা ভাষায় পুস্তকের বাণিজ্যিক মুদ্রণের খবর পাওয়া যায় না। চটি বইয়ের রমরমা হাল আরম্ভ হয় উনিশ শতকে। ১৮৫৭ সালে, অর্থাত্ সিপাহি বিপ্লবের বছরে বাংলা ভাষায় চটি বই বেরিয়েছিল ৩২২টি এবং রেভারেন্ড জেমস লঙের হিসাব অনুযায়ী শুধু কলকাতাতেই এসব বই ছাপা হয়েছিল ছয় লাখের মতো।৫ বটতলার বইয়ের রমরমা ব্যবসার সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে ভারতচন্দ্র কিংবা বঙ্কিমের বই বের করা অভিজাত তত্ত্ববোধিনী প্রেসের জিব বেরিয়ে যাওয়ার দশা হয়েছিল সেই উনিশ শতকেই। শিক্ষামূলক গল্প, পুরাণকথা, আদিরস ও স্যাটায়ার—এগুলোই মোটা দাগে সেই আমলের চটি বইয়ের বিষয়বস্তু ছিল। ঢাকা কিংবা রাজশাহীও কলকাতা থেকে খুব বেশি পিছিয়ে ছিল না। কলকাতার বটতলায় প্রথম ছাপাখানা বসানো হয়েছিল ১৮২০ সালে আর ঢাকার চকবাজারের কেতাবপট্টিতে ছাপাখানা বসে ১৮৬০-এর দিকে এবং বটতলার অনুকরণে সুলভযন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৩ সালে। সুকুমার সেনের মতে, ১৮৪০ থেকে ১৮৬০ পর্যন্ত ছিল বটতলার স্বর্ণযুগ। এর সূত্র ধরে মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম (১৯৯০) জানান যে বটতলার প্রকাশনার দ্বিতীয় পর্বটি বিকশিত হয়েছিল মুসলমানি পুঁথির ব্যাপকভিত্তিক মুদ্রণের মাধ্যমে। ফলে ১৮৬৫ থেকে ১৯০০ পর্যন্ত সময়টা হলো বটতলার বইয়ের দ্বিতীয় পর্ব তথা মুসলমানি পুঁথি প্রকাশের স্বর্ণযুগ। ঢাকার চকবাজারের কেতাবপট্টি সেই যুগে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে।৬

এই যে বটতলার পুঁথি কিংবা চকবাজারের চটি, তাদের সাংস্কৃতিক রাজনীতির অভিমুখ নিয়ে বিস্তর মতভেদ আছে। ব্রিটিশ-শাসিত বাংলার পরিপ্রেক্ষিতে তপতী রয় এবং সুমন্ত ব্যানার্জির মতো লেখকেরা মনে করেন, বটতলার বই মূলত জনসমাজের রুচিকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি প্রকল্প, যার মাধ্যমে নিম্নবর্গকে নসিহত (disciplining and marginalising) করার সুযোগ নিয়েছে সেকালের ঔপনিবেশিক বাঙালি ভদ্রলোকি সমাজ।৭ পক্ষান্তরে, অনিন্দিতা ঘোষের মতে, বটতলার বই তার ক্রমবর্ধমান পাঠকগোষ্ঠীর কল্যাণে ওই নিয়ন্ত্রণকে প্রতিহত করেছে।৮ এই মোটামুটি অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন (functionally literate) নতুন পাঠকগোষ্ঠীর সামাজিক পরিচয় হলো তাঁরা শহরের অল্প বেতনের কেরানি। অনিন্দিতা স্পষ্ট করে না বললেও বোঝা যায় তিনি মনে করছেন, পাঠকের রুচির শাসনেই বটতলার বইয়ের কনটেন্ট তৈরি হয়েছে। ফলে নিম্নবর্গের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের দ্যোতক হিসেবেই ঐতিহাসিকভাবে আবির্ভূত হয়েছে। মহাভারত কিংবা অন্নদামঙ্গলের মতো বইয়েরও বটতলা সংস্করণের ইলাস্ট্রেশনে আমরা দেখি হিন্দু দেবতা কার্তিকের মাথায় ইউরোপীয় হ্যাট কিংবা মহাভারতে দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণ করছে কোনো ইউরোপীয় সাহেব। এমন অনেক দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। সিপাহি বিদ্রোহের কালে বের হওয়া বটতলার বইয়ে ইংরেজবিদ্বেষ প্রচার একটা মুখ্য বিষয় ছিল, সেটা সত্য ঘটনার বয়ান করেই হোক, পুরাণ কাহিনির নতুন তফসির হাজির করেই হোক কিংবা স্ক্যান্ডাল ছড়িয়েই হোক। বই তখনো এত ব্যক্তিগত পঠনের বিষয় হয়ে ওঠেনি, অন্তত নিম্নবর্গের কাছে। একজন গলা ছেড়ে পড়েছে তো দল বেঁধে অন্যরা শুনেছে। ফলে বটতলার বইয়ের পাঠক-শ্রোতার সংখ্যা কোনো অর্থেই কম ছিল না সে সময়।

দেখা যাচ্ছে, একদিকে সুমন্ত ও তপতী বলছেন, চটি নিম্নবর্গকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রকল্প, আবার অন্যদিকে অনিন্দিতা বলছেন চটি প্রতিরোধের দ্যোতক। বটতলার চটি আবির্ভাবের সময় ও রাজনীতিটুকু বিচার করলে সুমন্ত ও তপতীর দাবি যৌক্তিক, আবার এর ক্রমবিকাশের রাজনীতি বিবেচনা করলে অনিন্দিতার বক্তব্য মানতে হয়। ঐতিহাসিকভাবে যদি দেখি, চটি এসেছিল বইয়ের সস্তা বিকল্প হিসেবে, গজিয়ে ওঠা পাঠকগোষ্ঠীর সীমিত সামর্থ্যের কথা মাথায় রেখে। মনে রাখতে হবে, বাংলার মুদ্রণশালায় প্রথম উত্পাদিত পণ্যটির নাম বাংলা বাইবেল। বটতলার প্রেস থেকে প্রথম দিকে যেসব বই বাজারে এল, তা প্রেস নিয়ন্ত্রকদের রুচিমাফিকই। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বাজারের ভূমিকা সংগত কারণেই নিয়ামক হয়ে উঠল। এভাবে বটতলার চটি মূলত শাসকরুচি ও জনরুচির লড়াইয়ের একটা দুর্দান্ত ক্ষেত্র হয়ে উঠল। এটাকে আমরা মোটা দাগে জনসংস্কৃতিরই একটি নিয়ামক বৈশিষ্ট্য গণ্য করতে পারি, স্টুয়ার্ট হলের অনুসরণে। সাংস্কৃতিক বিধাতাগোষ্ঠী কখনোই এই নিম্নবর্গের চটি বইয়ের বিষয়বস্তু উত্পাদন থেকে হাতের রাশ আলগা করে দেয়নি, আবার কখনোই এই বই এককাট্টাভাবে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের স্মারক হয়ে উঠতে পারেনি। লড়াই হয়েছে বিস্তর, টানাপোড়েন আছে অনেক।

আড়াই শ বছরে এই শিল্পমাধ্যমটি নানাভাবে বিবর্তিত হয়েছে, নানাবিধ বিষয়ের ওপর বই বের হয়েছে এবং কলকাতায় বিচ্ছিন্ন কিছু আলোচনা চোখে পড়লেও ঢাকার চটি বইয়ের ইতিহাস নিয়ে খুব অল্পই লেখালেখি হয়েছে। একটি বিশেষ ধরনের চটি বই ‘পথ-কবিতা’ নিয়ে মুনতাসীর মামুন যা লিখেছেন তাতে জানা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীতে ঢাকায় ‘চারপেজি, আটপেজি বা ষোলোপেজি ডাবল ডিমাই আকারের নিউজপ্রিন্টে নিম্নমানের প্রেসে ছাপা’ চটি বই বিক্রি হতো। তাঁর বিবেচনায় ওই শতকে রচিত বেশির ভাগ পথ-কবিতারই বিষয়বস্তু ছিল ১৮৯৭ সালের ঢাকার ভূমিকম্প এবং ১৮৮৮ সালের টর্নেডো। কিছু কিছু পথ-কবিতা রচিত হয়েছে ‘অশ্লীল’ বিষয় নিয়ে, কিছু কিছু হিন্দুদের উত্সব নিয়ে। মুনতাসীর মামুনের মতে, ওই সব পথ-কবিতা সমসাময়িক ঘটনার ও বিষয়ের ‘বিশ্বস্ত দলিল’ এবং যোগাযোগব্যবস্থার ক্রমোন্নতির কারণে এসব প্রকাশনা স্তিমিত হয়ে আসে।৯ বোঝা যায়, মুনতাসীর মামুন এই প্রকাশনাগুলোর সংবাদমূল্যকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, ওই সব প্রকাশনায় কাব্যের বা সাহিত্যের যে অবয়বটি আছে, সেটি নেহাতই ইনস্ট্রুমেন্টাল। যার ফলে, যোগাযোগব্যবস্থার প্রসারে এই শিল্প মার খেয়ে গেছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। কিন্তু অন্য একটি লেখায় আমি দেখিয়েছি যে নেহাত সাংবাদিকতা করাই পথ-কবিতা বা চটি বইয়ের উদ্দেশ্য ছিল না। পথ-কবিতার যাঁরা পাঠক, তাঁরা একটা জানা ঘটনার ভেতর এসব চোরাগোপ্তা ভাষ্যকে সাংবাদিকতাসুলভ বিবরণের চেয়ে কম গুরুত্ব দেন বলে মনে হয় না। সে কারণেই চটি বই কেবল ঘটনার বিবরণই নয়, ভাষ্যও। ঘটনা এখানে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ভাষ্য তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। ফলে এটা সাংবাদিকতা নয়, স্রেফ সংবাদতৃষ্ণা মেটানোর জন্য এর আবির্ভাব হয়নি।১০

অস্বীকার করার উপায় নেই যে চটি বই এখন একটি মৃতপ্রায় সংস্কৃতি, এর কারণ বহুবিধ। প্রথমত, এটি মূূলত ছিল শহরে কাজ করা অল্পশিক্ষিত নিম্নবর্গের বিনোদনমাধ্যম। বাংলাদেশের অশিক্ষিত গরিব ঢাকা শহরে এবং শহরনির্ভর বিনোদনের জগতে প্রবেশ করেছে মোটামুটিভাবে সত্তর দশকের শেষাশেষি। কিন্তু সেটা সংগীত তথা অডিও মাধ্যম মারফত।১১ ফলে এই বিস্তীর্ণ জনগোষ্ঠীর বিনোদনের ভার মুদ্রণমাধ্যম কখনোই সেভাবে হাতে পায়নি। কিন্তু চটি বই শুধু যে মানুষকে টেক্সট দিয়েই বিনোদন দিয়েছে, তা নয়। অক্ষরজ্ঞানবিরল নিম্নবর্গীয় সমাজে চটি বইয়ের সংখ্যালঘু পাঠক আর সংখ্যাগুরু শ্রোতা মিলে এক দারুণ যৌথতার পুনরুত্পাদনও হয়ে আসছিল। ব্যক্তিবাদী হতে থাকা সমাজে এহেন সংঘবদ্ধ বিনোদনের প্রথা কত দিন টিকবে? মুক্তি দিল অডিও, নিরক্ষর থাকার অসুবিধা থেকে। ফলে গরিবের পক্ষেও এখন নিজের ঘরে বসে একা একা বিনোদন সম্ভব। এ জন্য যে আর্থিক বিনিয়োগটুকু করতে হয়, সেটিও চলে এসেছে তার নাগালে। এহেন ব্যবস্থায় চটি বইয়ের টিকে থাকার কথা নয়। তবু সে পুরোপুরি মরেও যায়নি, যেমন করে অল্পশিক্ষিত কেরানিগোষ্ঠী শহরের বিস্তীর্ণ গরিবসমুদ্রে নিজেদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। এখনো গরিব ‘শিক্ষিত’ মানুষজন এসব বই কেনেন বলে জানালেন ফুটপাতের এক দোকানদার। বিক্রি কমে গেছে, আফসোস তাঁর। ফলে বইয়ের সঙ্গে সঙ্গে চিরুনি, কানখোঁচানি, সুইসুতা, ব্লেড, ছোট আয়না, টুকিটাকি নানান স্টেশনারি বেচতে হয় তাঁকে। বইয়ের চেয়ে সিডি ক্যাসেট বেশি চলে, পড়ার ঝামেলা নেই, খালি প্লেয়ারে ঢুকিয়ে চাপ দিয়ে দিলেই কাজ শেষ। পোড়ার বস্তিতে, মাসে এক দিন মাছ কিনে খাবার মুরোদ হয় না অনেকের, কিন্তু ক্যাসেট বাজে ঘরে ঘরে!

বর্তমান নিবন্ধে আমরা এই মুমূর্ষু শিল্পমাধ্যমটিকে ধরে শহরকেন্দ্রিক অল্পশিক্ষিত মাঝারি গরিবের সাংস্কৃতিক অভিলাষকে শনাক্ত করার চেষ্টা করব। গোড়াতেই পরিষ্কার যে আমরা এই নিবন্ধে শহরবাসী গরিবের মধ্যে একটা বিভাজনরেখা টানছি। অন্যভাবে বলা যায়, এই বিভাজনটি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়ার জন্যই বর্তমান প্রবন্ধের অবতারণা। একদিকে বস্তিবাসী অশিক্ষিত নগরগরিব যারা শহরে এসেছে অভাবের তাড়নায়, অন্যদিকে অল্পশিক্ষিত মেসবাসী গরিব যারা শহরে এসেছে শ্রেয়তর জীবনের আশায়। অন্যভাবে বললে, প্রথমোক্তদের গ্রাম ‘ঠেলে’ দিয়েছে, আর দ্বিতীয় দলটিকে শহর ‘টেনে’ এনেছে। এই দুই ধরনের গরিব শহরে থিতু হয়েছে দুভাবে। একদল জড়িয়েছে মূলত অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির চাকায়, অন্য দল নিজেদের হারিয়ে ফেলেছে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির তলানিতে। যদিও উচ্চবর্গের চোখে এরা সবাই ‘গরিব’, কিন্তু নিজেদের মধ্যে একটা আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভাজন সম্পর্কে এরা সচেতন। অবশ্য তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা দিন দিন একই রকম হয়ে ওঠার ফলে সাংস্কৃতিক ভিন্নতারও দাবি কমে যাচ্ছে ক্রমেই। চটি বইয়ের উদ্দিষ্ট পাঠক মূলত সেই অল্পশিক্ষিত গরিব যাদের শহর ‘টেনে’ এনেছে। এই নিবন্ধে, প্রেমপত্রের টেক্সট থেকে আমরা বুঝতে চাইব কোন ভৌগোলিক ও সামাজিক পরিসরে শহরবাসী এই মাঝারি গরিবের প্রেম উত্পাদিত হচ্ছে এবং তার সঙ্গে এই সাংস্কৃতিক শ্রেণীর আত্মপরিচয়ের রাজনীতি কীভাবে সম্পর্কিত হচ্ছে।

সোশ্যাল রিয়ালিজম, সোশ্যাল ফ্যান্টাসি

বাস্তবে যেমনই হোক, বইয়ের প্রেমপত্র একতরফা কোনো ব্যাপার নয়। অর্থাত্ এসব বইতে কোনো চিঠি জবাবে ও পাল্টাজবাবে গল্প কিংবা উপন্যাসের আকার নিতে চায়। প্রায়ই দেখা যায়, চারটা-পাঁচটা চিঠিতে ভেঙে ভেঙে একটা গল্পকে বিবৃত করা হচ্ছে। প্রেম বিকশিত হচ্ছে আমাদের চোখের সামনে, পত্রে, পত্রান্তরে। কিন্তু চিঠির বাইরে যে জগত্, সে জগতে আমাদের পাত্রপাত্রীদের দেখা-সাক্ষাত্ হয়, মনোলোভা ঘটনাগুলো ঘটে। সেই জগতে দুজনার মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে আবার চিঠির মাধ্যমে জাবর কাটা কখনো কখনো পীড়াদায়ক লাগতে পারে, ফলে প্রেমের চিঠির এই সিরিজে নতুন নতুন চিঠিগ্রহীতার আবির্ভাব ঘটে। প্রায়ই দেখা যায়, বন্ধু কিংবা বান্ধবীর কাছে লেখা চিঠিগুলোর সুবাদে আমরা প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে ঘটে যাওয়া মুহূর্তগুলোর বিবরণ জেনে ফেলতে পারছি। এগুলো প্রেমের চিঠি না হলেও পুরো গল্পটি বোঝার জন্য অপরিহার্য। ফলে প্রেমপত্রের বইতে শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার চিঠিই থাকছে না, নিজ নিজ বন্ধুমহলের কাছে আলাদাভাবে লেখা চিঠিগুলোও থাকছে। ফলে একদিকে প্রেমিক-প্রেমিকার চিঠি চালাচালির মাধ্যমে যেমন আবেগমথিত প্রেমের নমুনা হাজির থাকছে, অন্যদিকে বন্ধু-বান্ধবীদের কাছে লেখা চিঠিগুলোতে থাকছে এই প্রেম ও প্রেমের পাত্রপাত্রী নিয়ে নিরাবেগ বোঝাপড়া। শেষ পর্যন্ত পাঠকই বিশেষ সুবিধা পায়, পাত্র কিংবা পাত্রী থেকে প্রেম সম্পর্কে বেশি অবগত থাকার সুবিধা। বোঝা যায়, পাঠককে প্রেমপত্র লেখায় সহায়তা করাই বইয়ের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়, এর বাইরে গোপন নান্দনিক সাহিত্যিক উদ্দেশ্যও আছে লেখকের। এ কারণেই সে তার কাহিনির চৌহদ্দির মাঝে পাঠকের ক্ষমতায়ন ঘটায়।

এসব বইতে প্রেমিক-প্রেমিকা পরস্পরের কাছে প্রথম পরিচিত হতে পারে, কিংবা পূর্বপরিচিত ও আত্মীয়তাসূত্রে আবদ্ধও হতে পারে। পূর্বপরিচিতির ক্ষেত্রে তারা হতে পারে একে অপরের নবপরিণীত স্বামী-স্ত্রী অথবা হতে পারে বেয়াই-বেয়াইন, তালাতো ভাইবোন, বন্ধুর ছোট বোন, বান্ধবীর বড় ভাই, প্রাক্তন সহপাঠী, শ্যালিকা-দুলাভাই, দেবর-ভাবি ইত্যাদি। এর বাইরেও প্রেমের বিশদ বিবরণ দিতে গিয়ে চিঠির আদান-প্রদান হচ্ছে প্রেমিক-প্রেমিকার নিজ নিজ বন্ধুদের কাছে, কখনো ভাইবোনদের মাঝে।

প্রেমিক-প্রেমিকা যখন পরস্পরের নিতান্ত অপরিচিত, তখন তাদের মধ্যে প্রথম দেখাটি হচ্ছে কোথায়? বেশির ভাগই হচ্ছে বিয়েবাড়িতে, পার্কে, না হয় কাজিনের বাড়ি বেড়াতে এসে, না হয় ট্রেনে, বাসে কিংবা লঞ্চে। শাহরিক প্রেক্ষাপটে পরবর্তী অভিসারগুলোর জন্য পার্ক রীতিমতো অপরিহার্য। আরেকটু ঘনিষ্ঠ অভিসারের জন্য সিনেমা হল। প্রেমের পাত্রপাত্রী কিন্তু সদা ভ্রাম্যমাণ। বলা যায়, ভ্রমণই যেন তাদের জীবিকা। ফলে চিঠিগুলোর অধিকাংশ জুড়েই থাকে ভ্রমণের বর্ণনা। পরস্পরের মধুময় স্মৃতিচারণার জন্যও ভ্রমণ এক মোক্ষম মুহূর্ত। এসব মুহূর্তে চিঠিগুলো (মধ্যবিত্তের) সাহিত্যের চেহারা নিতে শুরু করে। এমনি এক মুহূর্তে, রাতের ট্রেন ভ্রমণের বিশদ বিবরণ এক চিঠিতে, যেখানে তন্দ্রামগ্ন প্রেমিক ভাবছে তার প্রেমিকার কথা:

‘সঙ্গে সঙ্গে আমার ঘুম ভেঙে যায়। ভাঙতেই তাকিয়ে দেখি কোথায় তুমি? আশেপাশে যাত্রীসাধারণ বসে আবার কেউ ঘুমিয়ে। জ্যোত্স্না রাতে জানালা পথে তাকিয়ে দেখি শস্য শ্যামল মাতৃভূমির ওপর দিয়ে ট্রেন দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে।’১২

এ রকম প্রকৃতিবন্দনা সত্ত্বেও প্রেমিকের এই ভ্রাম্যমাণতা তার সামাজিক শ্রেণীপরিচয়েরও দ্যোতক। ভ্রমণের কোনো আয়েশি চিত্র পেশ করে না এই চিঠিগুলো, বিরল দু-একটা মুহূর্তের কথা বাদ দিলে। বরং যে ক্লেশকর পৌনঃপুনিকতার মধ্য দিয়ে শহরতলি কিংবা নিকটস্থ গ্রাম-মফস্বলের নিম্ন আয়ের মানুষ শহরের কর্মস্থলে যাওয়া-আসা করে, সেসবের চেহারাই ফুটে ওঠে। ঐতিহাসিকভাবেই গ্রাম ছেড়ে শহরে আসা অসুখী নিম্নবর্গ চটি বইয়ের প্রধান ক্রেতাগোষ্ঠী, সুমিত সরকার এ কথা বলেন।১৩ কিন্তু গ্রাম ছেড়ে শহরে আসা এই নিম্নবর্গের মধ্যে যে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ফারাক রয়েছে, তার প্রদর্শন তিনি চটি বইয়ের ক্রেতাগোষ্ঠীর মধ্যে দেখেননি। আবার, যারা ডেইলি প্যাসেঞ্জার, শহরে কাজ শেষে ট্রেনে চেপে বাড়ি ফেরে প্রতিদিন, কম দামের চটি বই তাদেরও ভ্রমণের অপরিহার্য উপাদান, এ কথা বলেছেন অনিন্দিতা ঘোষ।১৪ সম্ভবত এই ধারাবাহিকতা থেকেই ট্রেনে চটি বই বিক্রির ঐতিহ্য আজও বহাল আছে। সমকালীন পরিপ্রেক্ষিতে যে জিনিসটা মাথায় রাখতে হবে, এই শহরে আসা অসুখী নিম্নবর্গের মধ্যেও একটি সংখ্যালঘু অংশ চটি বইয়ের ক্রেতা। এটি বিশেষভাবে বোঝা দরকার, নইলে আমরা হরেদরে সব গরিবকেই চটি বইয়ের ভোক্তা ভাবতে শুরু করব। আদতে তা নয়। এই চটি বইয়ের ক্রেতাগোষ্ঠী তাদের পঠনক্ষমতা দিয়েই অপরাপর বস্তিবাসী গরিব থেকে নিজেদের সাংস্কৃতিকভাবে আলাদা করে। প্রেমপত্রের টেক্সটে আমরা দেখি, প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া প্রিয় বান্ধবীর চিঠির জবাবে বান্ধবী তাকে সাবধান করছে যাতে সে ‘প্রেমিক চিনে’ প্রেম করে, নইলে তাকে সারা জীবন কাঁদতে হবে। এই বক্তব্যের সমর্থনে আমাদের বান্ধবী একটি দৃষ্টান্ত হাজির করে, যেখানে প্রেমিক-প্রেমিকা পূর্বাপর বিবেচনা না করেই বিয়ে করার কারণে সেই সংসার ছারখার হয়ে যায়। ওই দৃষ্টান্তমূলক কাহিনির যে প্রেমিক, সে কিন্তু রিকশা মেকানিক, অর্থাত্ অপ্রাতিষ্ঠানিক ও ‘অশিক্ষিত’ গরিব গোত্রের। অন্যত্র একটি চিঠিতে দেখি প্রাকবিবাহ যৌনসম্পর্ক নিয়ে বান্ধবীকে সাবধান করছে অন্য বান্ধবী। এই ‘গর্হিত’ কাজের ফলে জীবন যে ছারখার হয়ে যায়, তার নমুনা হিসেবে যে কাহিনিটি সে তার বান্ধবীকে বয়ান করে, সেখানেও দেখা যায় ওই ‘গর্হিত’ কাজটি সম্পন্ন হয় বস্তিবাসী ‘অশিক্ষিত’ গরিবের জগতে।  

যাদের জবানিতে প্রেমপত্রগুলো বইতে লেখা হচ্ছে, ব্যক্তিগত জীবনে তারা কে কী করে? এ বিষয়ে কোনো বইয়ের অবস্থান সত্যপ্রায় বা সোশ্যাল রিয়ালিস্টিক, কোনোটার হলো ইচ্ছাপূরণ বা সোশ্যাল-ফ্যান্টাসি। সোশ্যাল রিয়ালিস্ট কৌশল থেকে আমরা জানতে পারি, আমাদের নায়ক কোনো জুট মিলে চাকরি করে, নয়তো ব্যাংকের নিম্নপদস্থ কেরানি, নয়তো প্রবাসী নিম্ন আয়ের শ্রমিক। আর আমাদের নায়িকা হয় কলেজে পড়ে, না হয় পোশাকশ্রমিক, নয় প্রবাসী নারীশ্রমিক, নয়তো গৃহবধূ। লক্ষণীয়, পাত্রপাত্রীর পেশাগুলো যথাসম্ভব নিম্নবর্গীয় হলেও সচেতনভাবেই শহরের বিস্তীর্ণ অপ্রাতিষ্ঠানিক পেশাবলয়ের বাইরে। অর্থাত্ আমাদের মূল নায়কদের কেউ রিকশা চালায় না বা এমনকি ফুটপাতে দোকানদারিও করে না। তারা মাঝারি গরিব। কিন্তু তারা যখনই নিজেদের মধ্যে খারাপ দৃষ্টান্ত হাজির করে, সেখানে আমরা অপ্রাতিষ্ঠানিক নগরগরিবের সন্ধান পাই। এই প্রবণতা থেকেও আমরা চটি বইয়ের উদ্দিষ্ট পাঠকের সাংস্কৃতিক শ্রেণীকে ঐতিহাসিকভাবে শনাক্ত করতে পারি। অনিন্দিতা ঘোষ জানান, ব্রিটিশ আমলে বটতলার বইয়ের প্রধান ক্রেতা ছিল শহরের অল্পশিক্ষিত ‘পাতি ভদ্রলোক’ শ্রেণী, যাদের পেশা মূলত কেরানিগিরি।১৫ এরা অর্থনৈতিক বিচারে নিম্নবর্গ হলেও সাংস্কৃতিক বিচারে ভদ্রলোকি কৃষ্টির মার্জিনে অর্থাত্ চলতি ভাষায় ‘গরিব হলেও ছোটলোক নয়’। কিন্তু গত এক শতকে সেই সাংস্কৃতিক বিভাজনের অনেক অদলবদল ঘটেছে। অর্থনৈতিক অবস্থানের নৈকট্য তথা ক্রয়ক্ষমতার সাদৃশ্যই হয়তো শহুরে কেরানি শ্রেণী আর অপ্রাতিষ্ঠানিক গরিবের সাংস্কৃতিক দূরত্ব অনেক কমিয়ে এনেছে। পক্ষান্তরে, একই কারণে শহুরে উচ্চবর্গ ও নিম্নবর্গের দূরত্ব বেড়েছে অনেক।

আত্মপরিচয়ের সোশ্যাল-ফ্যান্টাসিগুলোতে দেখা যায়, পাত্রের বাবা যদি হয় সাংসদ, পাত্রীর বাবা সেখানে মধ্যপদস্থ সরকারি আমলা। অথবা, পাত্রীর বাবা যেখানে পুলিশের এসপি, পাত্রের বাবা সেখানে হয়তো নামজাদা অ্যাডভোকেট। সেসব গল্পে আবার আমাদের প্রেমিক-প্রেমিকারা প্রত্যেকেই মা-বাবার একমাত্র সন্তান, সেই অর্থে সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী। পাত্রীর বাবা সত্ পুলিশ হলেও গরিব নয়, কারণ সে উত্তরাধিকারসূত্রে অগাধ সম্পদের অধিকারী! আর এদিকে পাত্রের বাবা নামকরা উকিল। অর্থাত্ একটু আঠারো-বিশ থাকলেও গুরুতর কোনো সামাজিক মিসম্যাচ হচ্ছে না এই নবগঠিত প্রণয়সম্পর্কের মাধ্যমে। এহেন সম্পর্কের দিকে চোখ গরম করে তাকানোর দরকার নেই। কিন্তু তবু এদের চিঠিগুলো প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যকার গুরুতর অসাম্য থাকার যাতনাখানি বহন করে। অর্থাত্ পরিচয় বিনির্মাণে ফ্যান্টাসি থাকলেও অনুভব বিনির্মাণে লেখক বাস্তবের অনুগামীই থেকে যান। এভাবে, ধনীর গরিবি যাতনা এক অবিশ্বাস্য পরাবাস্তব অবস্থার উদ্বোধন ঘটায় চিঠিগুলোতে। আবার, এ রকম ঊর্ধ্বতন শ্রেণীপরিচয় ধারণ করেও আমাদের প্রেমিক-প্রেমিকাদের গরিবি খায়েশ যায় না। তারা যদিও গাড়ি ছাড়া চলাফেরা করে না, তবু সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখে, প্রেমিককে চিঠি লেখে, পার্কে গিয়ে বাদাম খায় ইত্যাদি। পুলিশকন্যা নায়িকার একটা চিঠি থেকে উদ্ধৃতি দিই:

‘ছবি খুব বড় বেশী একটা দেখি না। যখন হঠাত্ মন চাইলো একাই চলে আসি। তবে সর্বদা গাড়ী নিয়ে আসি। আজ গাড়ী নিয়ে বাবা কাজে বের হয়ে গেছেন। মন চাইলো রিকশা নিয়ে চলে এলাম। কুমিল্লার প্রত্যেকটি সিনেমা হলের গেইট কিপার থেকে শুরু করে মালিকরা আমাকে চিনেন। আমি আসলে ওনারা পয়সা নিতে চান না। কিন্তু আমি কোনদিন পয়সা ছাড়া ছবি দেখি না। আমার বাবা পুলিশ সুপার হলেও বিনা পয়সায় ছবি দেখাকে ঘৃণা করি।’১৬

চিঠিগুলোতে দেখা যায়, আমাদের নায়িকা পুলিশ সুপারের মেয়ে হলেও প্রেমে অপুলিশের মেয়ের মতোই কাতর, শয়নে স্বপনে প্রেমিকের নাম জপে এবং তার বাবা পুলিশ সুপার হলেও কৃষকের মতো লিবারাল! আবার অন্যত্র, নায়কের সঙ্গে নায়িকার দেখা হচ্ছে ‘চলন্ত কোস্টারে’ এবং নায়িকার বাবা ঢাকার বিখ্যাত ব্যবসায়ী যার দু-দুটো বাড়ি আছে ঢাকা শহরে। তাদের প্রতিদিনকার দেখা-সাক্ষাত্ হচ্ছে রমনা পার্কে। এসব বিবরণ প্রেমিক জানাচ্ছে তার বন্ধুকে অন্য চিঠিতে। প্রেমিকের সেই বন্ধুটি, যে কিনা বন্ধুর প্রেমকেই নিজের প্রেমের মতো ভেবে নিয়ে মাতোয়ারা হয়ে আছে, সেও ফেরত-চিঠিতে আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে ‘ধনীর ছেলে ধনীর মেয়ে এই যাকে বলে বড়লোকের বিরাট কারবার’। এই বিরল বন্ধুবাত্সল্যের সুযোগে আমরা জেনে যাই সেই বন্ধুটির ইতিবৃত্ত:

‘...মনে বড় আশা ছিল প্রেম করার কিন্তু কোনো মেয়েই ভালবাসতে চাইল না, কি বা আছে আমার ধন সম্পদ না রূপ, কোনটাই না, না আছে মুখের শ্রী, গায়ের রংটা শ্যামলা, হালকা স্বাস্থ্য। তুই যে কেমন করে আমায় ভালবাসলি, এটাই আমার সুভাগ্য।’১৭

এই বন্ধু-অন্তঃপ্রাণ বন্ধুটি সুপরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করছে তার প্রেমিক বন্ধুকে, বলছে প্রতিদিনই অভিসারে না গিয়ে ‘ধীরে চলো নীতি’তে এগোতে। সে নিজে প্রেম করতে না পারলেও ঢাকা শহরে যেসব ‘প্রেম প্রেম খেলা’ হয়, সে বিষয়ে বন্ধুকে সতর্ক করে দেওয়ার দায়িত্ব বোধ করে। বড়লোকদের বিয়ে যে ক্ষণিকের জিনিস, এই গড়ে তো এই ভাঙে, এটাও সে একটি সত্য ঘটনা বয়ানের মাধ্যমে বন্ধুকে জানিয়ে দেয় চিঠিতে। কিন্তু এত কিছু বলার পরও আমাদের গরিব বন্ধুটি তার দায়িত্ব সম্পর্কে অসচেতন নয়। চিঠিতেই জানাচ্ছে, সে কয়েক দিনের মধ্যে আসছে এবং এসে এই প্রেমের পরিণতির ব্যাপারে পরিবারের সঙ্গে দেনদরবার করার মাধ্যমে বন্ধুর অনুরোধ রক্ষা করবে। এই পরোপকারী বন্ধুটিকে কি চেনা চেনা লাগে?

এই বন্ধুটিই আসলে এহেন চটি বইয়ের উদ্দিষ্ট শহুরে অল্পশিক্ষিত মাঝারি গরিব, যুগপত্ এই পুস্তকের লেখক ও পাঠক, বড়লোকি ফ্যান্টাসির স্বখাতসলিলে পুরোপুরি আরাম না-পেয়ে ‘বন্ধু’ পরিচয় নিয়ে কাহিনিতে পুনঃপ্রবিষ্ট হয়েছে। সেটা এই কাহিনি ও ফ্যান্টাসিকে নিয়ন্ত্রণ করার আকাঙ্ক্ষা থেকেই। ফলে অন্য একটি রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানের মধ্যে বসেও আমরা এই যুবকের জীবন ও চিন্তাভাবনা সম্পর্কে অবগত হতে বাধ্য হই। প্রেমের আকাঙ্ক্ষা ছিল তার, কিন্তু দারিদ্র্য ও অস্বাস্থ্য তাকে করেছে দার্শনিক ও পরোপকারী। সে হাজির হয়েছে এই প্রেমের উপাখ্যানে ধনীর বিবেকের অপরিহার্য ভূমিকায়। ফলে পাঠকের দ্বিবিধ আনন্দ হলো: একবার তার পুলক বাড়ল ধনীর পোশাক পরে এই প্রেমের আখ্যানে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় নিজেকে ভাবার মাধ্যমে; পাশাপাশি, পরোপকারী বন্ধুকে সহায়তা করার মাধ্যমে সে তার শ্রেণীপরিচয়কে এই কাহিনিতে একটা প্রভাব বিস্তারকারী ভূমিকা দিতে পারল, এটাও কম আনন্দের কথা নয়।

যৌন-নৈতিকতার ব্যবস্থাপনা

চটি বই ঐতিহ্যগতভাবেই শৃঙ্গার রসে উত্সাহী। ফলে প্রেমের কাহিনিতে তার ঢেউ লাগবে, এটা প্রত্যাশিত। চিঠিগুলোতে আমরা প্রেমিক-প্রেমিকার অভিসারের যে বর্ণনা পাই, তার একটি প্রধান অংশ এই শারীরিক সংস্পর্শের বর্ণনা। কিন্তু এই শরীরী আকর্ষণ বাঁধা থাকে কঠিন নৈতিক অনুশাসনে। আবার, নৈতিক আকর্ষণ যত কঠিনই হোক, সে পাত্রপাত্রীর মধ্যে যৌনতার প্রাথমিক উদ্বোধন ঠেকাতে অসমর্থ। ‘বিবেক’ জাগ্রত হয় কেবল গভীরতর যৌনতার পর্দা উন্মোচিত হওয়ার প্রাক্কালে।

প্রেমপত্রের পাত্রপাত্রীদের এই যে যৌনসংযম, তাকে মিশেল ফুকো নির্দেশিত বুর্জোয়া সমাজের যৌনতাবিষয়ক বাকসংযমের উপজাত হিসেবে ভাবার ন্যায্য কারণ আছে। হিস্ট্রি অব সেক্সুয়ালিটি গ্রন্থের প্রথম পর্বে ফুকো দেখিয়েছেন যে পাশ্চাত্যবাসীর বদ্ধমূল ধারণা হচ্ছে সপ্তদশ শতাব্দী থেকে বিংশ শতাব্দীর দুই-তৃতীয়াংশ অব্দি সমাজে ও জীবনে যৌনতা জিনিসটাকে বেশ দমিয়ে রাখা হয়েছিল। যদিও ফুকো বলছেন, আদতে সে রকম ছিল না। তার পরও যৌনতা নিয়ে পশ্চিমারা এমন ধারার একটি দমনমূলক প্রকল্প (রিপ্রেসিভ হাইপোথিসিস) দাঁড় করাচ্ছে কেন? উত্তর সোজা, বর্তমানের যে (খোলামেলা) যৌনসংস্কৃতি, তাকে প্রতিরোধী সংস্কৃতি আকারে উপভোগ করার জন্য। ফুকোর ভাষায়, সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত যৌনতার আলোচনা ছিল খোলামেলা, কোনো রাখঢাকের বালাই ছিল না। কিন্তু ভিক্টোরীয় বুর্জোয়ার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রকাশ্য আলাপের সংস্কৃতির মধ্যে নানা রকম প্রতীক-সংকেতের অনুপ্রবেশ ঘটে এবং সেটি শোবার ঘরের ফিসফাস হয়ে দাঁড়ায়। আলাপ আর বাস্তবিক চর্চার এই ফারাককে ফুকো ভিক্টোরীয় মতাদর্শে দীক্ষিত বুর্জোয়ার হিপোক্রেসি হিসেবেই শনাক্ত করেছেন।১৮

লক্ষণীয়, যেসব চিঠি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে লিখিত, অর্থাত্ যাদের মধ্যে বৈধ যৌনসম্পর্ক আছে, তাদের যৌনতার বিবরণ চিঠিগুলো বহন করে না। বরং যাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হয়নি, কিংবা যাদের মধ্যে যৌনসম্পর্কের ক্ষেত্রে শিথিল টাবু রয়েছে (যথা দুলাভাই-শ্যালিকা, দেবর-ভাবি ইত্যাদি) তাদের যৌনসম্পর্কের বিবরণই থাকে চিঠিগুলোতে। সম্পর্ক না বলে উসকানি বলাই শ্রেয়, কারণ এহেন যৌনক্রিয়ায় এদের কেউই ঝাঁপিয়ে পড়ে না, বরং বিবাহবহির্ভূত দৈহিক সম্পর্ককে ‘খারাপ’ মনে করে। একটি যৌথতার মাঝামাঝি এহেন নৈতিকতার উদ্বোধন বরং এর পাঠককে উদ্দীপ্ত করার কাজেই ব্যবহূত হয়। দৃষ্টান্ত দিই:

নারী পুরুষ ফেস টু ফেস আলিঙ্গনে যে কত সুখ তা জীবনে কোনো দিন অনুভব করতে পারিনি, তুমি সেই আশা পূর্ণ করে দিলে আমায় নিজেকে বিলিয়ে, আর আমি দুহাত বাড়িয়ে তোমার নরম তুলতুলে দেহখানি যৌবন ভরা বুকে, কুসুম কলিতে চলে যাই, তুমি প্রথমে বাধা দিলেও পরে শুধু চোখ বুজে আনন্দ উপভোগ করছিলে।... ঠিক সেই সময় ফেরিওয়ালা ছেলেটা যদি না আসত তাহলে যে কি হতো ভাবতেই পারিনি।১৯

এখানে অবশ্য ভিক্টোরীয় নৈতিকতা নয়, পার্কে ভ্রাম্যমাণ ফেরিওয়ালা অনুপ্রবেশ করেছে। এমন নয় যে ফেরিওয়ালা না এলেই তাদের আশঙ্কা সত্য হয়ে যেত! কারণ, অন্য আরেকটি পার্কেই আমরা দেখি:

আমি তোমাকে আমার দুহাত দিয়ে তোমার নরম তুলতুলে দেহখানি একান্তভাবে কাছে টেনে নিলাম, আর সেই মুহূর্তে যদি তুমি আমার মাঝে জেগে ওঠা উত্তেজনাকে তোমার মধুর কটি সংলাপ দিয়ে দমিয়ে না দিতে হয়তো একটা অঘটন ঘটে যেত আমাদের মাঝে। পবিত্র প্রেম কলঙ্কিত হয়ে পড়ত।... যৌন উত্তেজনা যে মানুষকে অমানুষে পরিণত করতে পারে, সেদিনই সেটা প্রথম বুঝতে পেরেছিলাম।২০

অন্যত্র—

যখন তুমি চরম উত্তেজনায় উত্তেজিত হয়ে তোমার অবাধ্য হাতটি নিচের দিকে নিয়ে গেলে, তখন আমার চেতনা ফিরে এল।২১

অন্যত্র, নায়ক স্বীকার করছে—

প্রেম ভালোবাসাতে দেহের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। যারা প্রেম ভালোবাসাকে দেহের সম্পর্ক বলে মনে করে তারা সত্যি সত্যি প্রেমিকের অযোগ্য।২২

প্রায় সব চিঠিতেই দেখা যাচ্ছে, পরস্পরের প্রতি শরীরী আকর্ষণই এদের প্রেমের উপজীব্য। কিন্তু প্রাক-বৈবাহিক অবস্থায় পূর্ণ শরীরী যোগাযোগ রীতিমতো বিষবত্ পরিত্যাজ্য। এহেন আধাসিদ্ধ যৌনতা নিশ্চিতভাবেই ফুকো-নির্দেশিত শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের অর্জিত ভিক্টোরীয় মূল্যবোধের নকলি রূপ, সম্ভবত সিনেমা-বাহিত হয়ে নিম্নবর্গের এই অংশের মধ্যে প্রবেশ করেছে। শরীর আধা ‘রক্ষা’ করেও কীভাবে উদ্দাম প্রেম করা যায়, সেটা সত্তর দশক থেকে বাংলা সিনেমা জোরেশোরেই দেখিয়ে আসছে। ফলে সিনেমার সঙ্গে এসব চিঠির আদর্শিক যোগাযোগের অনুমান জোরালো হয়। যৌনতা ছাড়াও এসব চিঠির নানান জায়গায় সিনেম্যাটিক মেলোড্রামার সন্ধান মেলে। যেমন প্রতারিত প্রেমিকা তার প্রাক্তন প্রেমিকের বাসরঘরের দিকে ধাবমান:

গরু জবাইর ছুরিখানা নিয়ে উল্কা বেগে ছুটে চলেছি। যখন তোমাদের বাড়ী ঢুকলাম, তখন তোমার মত জালিম কুকুরটা আক্রমণ করল। চলার পথে বাধা পড়ল, তাই প্রথমে কুকুরটা খুন করে তোমার ঘরের নিকট যাই। দরজা বন্ধ, অনেক কষ্ট করে জানালা খুলতে চাঁদের আলোতে দেখতে পেলাম তোমরা দুজন পাশাপাশি শুয়ে আছ। তোমার নববধূর পানে চেয়ে পারলাম না তোমাকে খুন করতে। কেননা আমি যে নারী, নারী হয়ে অপর নারীকে বাসরঘরে বিধবা করতে পারলাম না, তাই ফিরে এলাম।২৩

আবার, ব্যর্থ প্রেমিক বা বিরহী প্রেমিকা যখন ভাবপ্রকাশের জন্য গান খোঁজে, তা অবধারিতভাবেই বাংলা সিনেমার গান। কোনো কোনো বইতে শেষ পৃষ্ঠাগুলো ভরিয়ে দেওয়া হয় বাংলা সিনেমার গান দিয়ে। নায়ক-নায়িকার ফটোগ্রাফের কথা তো আগেই বলেছি।

যেসব আত্মীয়ের মধ্যে যৌনসম্পর্কের শিথিল ট্যাবু আছে, সেসবের ফিরিস্তি পাওয়া যায় প্রেমপত্রের বইতে। এ ক্ষেত্রে দেবর-ভাবি এবং দুলাভাই-শ্যালিকা প্রেমপত্রের বইতে দুটি জনপ্রিয় নমুনা। কিন্তু তাকেও বৈধতা দেওয়ার যাবতীয় আয়োজন রয়েছে কাহিনিগুলোতে। দেবর-ভাবির প্রেমপত্রে দেখা যায়, বড় ভাই অর্থাত্ ভাবির স্বামী গত হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে, ফলে যৌবনবতী ভাবি একা। আর এদিকে বিবাহযোগ্য দেবর, ভাবি যখনই তাকে বিয়ের কথা বলে, দেবর তখনই গোঁজ হয়ে জবাব দেয় যে এমন মেয়ে দেখে দিতে হবে যে কি না ভাবির মতো! আবার ভাবিও কোনো এককালে কথায় কথায় বলেছিল যে দুই ভাইয়ের শরীরের গঠন একই রকমের। যা ই হোক, দেবর-ভাবির পারস্পরিক এই ভালো লাগাগুলো প্রাণ ফিরে পাওয়ার জন্য বড় ভাইকে মৃত্যুবরণ করতে হলো। শুধু মরেই যে সে তার দায়িত্ব পালন করল তা নয়, জীবিত অবস্থায় এমন কিছু বলে রেখে গেল যার ফলে এই দেবর-ভাবির সম্পর্ক শক্ত নৈতিক ভিত্তি পেয়ে যায়! ভাবির চিঠিতে:

তোমার ভাই মৃত্যুর পরই আমি তোমাকে আমার স্বামী বলে গ্রহণ করে নিয়েছি। কারণ তোমার ভাই মৃত্যুর পূর্বে যখন বলেছিল, সে না থাকলে তোমাকে আপন করে নিতে, মৃত ব্যক্তির আদেশ অমান্য করতে পারি না।... এত দিন ছিলাম বড় ভাইয়ের দাসী, এখন হবো ছোট ভাইয়ের দাসী।২৪

প্রেমিকার দাসীভাব আরও প্রকট হয়ে ওঠে, যখন আমরা দেখি সে তার দেবরের ‘সংযমে’র প্রশংসা করছে, কারণ তার দেবর রাতের অন্ধকারে ভাবির ঘরে ঢুকে শুধু তার শরীরের সংবেদনশীল অংশগুলোতে হাত বুলিয়েই চলে গেছে। ভাবি নিশ্চিত যে ‘কোনো পুরুষ এমতাবস্থায় তার প্রিয়তমা নারীকে অক্ষত রেখে ঘর থেকে চলে যেতে পারে না।’ দেবর যে সেটা পারল, এটা তার শক্ত নৈতিকতারই স্মারক!

ভাইয়ের মৃত্যুর পর আমাদের এই দেবর-ভাবি লোকের কানাঘুষা সত্ত্বেও এক ছাদের নিচে বসবাস করে। তাদের চিঠি থেকে এটাও বোঝা যায় যে, বাড়িতে আর অন্য কেউ থাকে না। একই বাড়িতে বসবাসকারী দুজন নিকটাত্মীয় যখন চিঠি চালাচালি করছে মনের ভাব জানানোর জন্য, তখন আমরা এসব চিঠির সাহিত্যিক ও গাল্পিক উদ্দেশ্য টের পাই। চিঠি এখানে শুধু চিঠি নয়, অর্থাত্ পাঠককে চিঠি লেখা শেখানোই তার একমাত্র উদ্দেশ্য নয়, বরং সে চিঠির অছিলায় একটি গল্প বলতে চায়। চিঠি এখানে গল্পের ফর্ম হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে।

এক ছাদের নিচে থেকে দেবর-ভাবি যেমন সম্পর্কে জড়াচ্ছে, অন্যদিকে দূর বিদেশে অবস্থান করেও দুলাভাইয়ের নজর সরছে না সোমত্ত শ্যালিকার শরীর থেকে। বোন গর্ভবতী, সেটা যে দুলাভাইয়ের ‘কীর্তি’, সে রকম উসকানিমূলক ইঙ্গিত শ্যালিকার চিঠিতে ছিল। ফলে দুলাভাইকে আর পায় কে? ‘আপা’কে তিনি যা যা করেছেন তার ফিরিস্তি শুনিয়েছেন স্ত্রীর স্কুলছাত্রী ছোট বোনকে। তা ছাড়া তিনি জানেন ‘শ্যালিকার কাছে পত্র লেখা বা তাকে আরও নিজের করে পাওয়া অশোভন কিছু নয়।’২৫ পরের চিঠিতেই আমরা দেখি দুলাভাইয়ের সংযমের বাঁধ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। তিনি স্মৃতিচারণা করছেন,

সেদিন যখন তোমাকে আমার কাছে টেনে নিয়ে কানে কানে একটি কথা বলতে গিয়ে তোমার গালে একটি চুম্বন এঁকে দিয়েছিলাম। সে সময় সত্যি আমি মনে করেছিলাম স্বর্গসুখ। তোমার আপাকে বারবার চুম্বন দিয়েও সে সুখ শান্তি আমি পাইনি।২৬

দুলাভাইদের এসব চিঠির জবাবে শ্যালিকারা কী কী লিখবে, তা সম্ভবত আমাদের চিঠিপ্রণেতাগণ নিজেরাও কূলকিনারা করতে পারেননি। ফলে দুলাভাইয়ের উসকানিকাতর চিঠিগুলোর কোনো প্রত্যুত্তর বইগুলোতে ছাপা হয়নি। তবে এহেন শিথিল-ট্যাবু সম্পর্কের প্রথম উসকানি যে শ্যালিকা তথা নারীর কাছ থেকেই আসে, এ বিষয়ে চিঠিপ্রণেতাদের মধ্যে দ্বিমত নেই। এটা নিশ্চয়ই পুরুষ চিঠিলেখকের ইচ্ছাপূরণের গল্প। কিন্তু এটা আবার সেই সমাজেরও গল্প, যেখানে নারী ধর্ষিতা হলেও তার পেছনে খোদ ভিকটিমেরই ‘উসকানি’ আছে, এমনটা সন্দেহ করা হয়।

আত্মপরিচয়ের নতুন মেরুকরণ?

অনিন্দিতা যেমন বলেছেন, ফুটপাতের প্রেমপত্রের বই মূলত শহরে কাজ করতে আসা অল্পশিক্ষিত ‘পাতি ভদ্রলোক’-এর বিনোদনমাধ্যম হিসেবে ঐতিহাসিকভাবে বিকশিত হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে গণ-অভিবাসনে শহরে আসা ‘অশিক্ষিত’ গরিব কিন্তু প্রায় কাছাকাছি রকমের আর্থিক সক্ষমতা (এমনকি কখনো এদের চেয়েও বেশি) অর্জন করেছে। অর্থাত্ হাল আমলে নিম্নপদস্থ কেরানি আর বাসচালকের বা ফেরিওয়ালার উপার্জনের মধ্যে ফারাক বিশেষ নেই। কিন্তু এই দুই নিম্নবর্গের সাংস্কৃতিক সত্তার উসকানি আসছে ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে। মাঝারি গরিবের অল্পশিক্ষা তাকে সাংস্কৃতিকভাবে মধ্যবিত্তের কৃপানির্ভর করে তুলেছে, ফলে সে সব সময় মধ্যবিত্তের লালন করা মূল্যবোধগুলোকে শ্রেয়তর ভেবে এসেছে। প্রেমপত্রের বইগুলো পাঠ করে আমরা টের পেয়েছি এই মাঝারি গরিব কীভাবে মধ্যবিত্তের সাহিত্য ও যৌনভাবনার অনুরাগী গ্রাহক হয়ে উঠেছে।

সাংস্কৃতিক ফর্মগুলোর নিজেদের মধ্যে আদান-প্রদানের যে রীতি, সেই বিচারে আমরা এও দেখেছি যে এসব চিঠিতে বর্ণিত প্রেমলীলা বিকশিত হয়েছে সত্তর দশকের ঢাকাই সিনেমার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। মূল্যবোধ ভারাক্রান্ত মাঝারি গরিবের জীবন সেসব সিনেমারও যেমন প্রধান উপজীব্য, এসব চিঠিতেও তা-ই। তাদের নিজস্ব কোনো ফোক-ফ্যান্টাসি নেই, কিচ্ছাকাহিনির গ্রামীণ জীবন তারা এমনকি মধ্যবিত্তের চেয়েও নির্মমভাবে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। ফলে এদের চিঠিপত্রে কোথাও বৃহত্তর গ্রামীণ জীবনের কোনো অনুষঙ্গ খুঁজে পাওয়া যায় না, এমনকি নায়ক যখন নায়িকার গ্রামের বাড়িতে অভিসার করছে তখনো। শহরের নিম্নবর্গ হিসেবে জীবন শুরু করার প্রাক্কালে এরা মধ্যবিত্তের জীবনকেই নাগালযোগ্য আরাধনা ভেবে নিয়েছে, আর উচ্চবর্গের রঙিন জীবন হয়ে উঠেছে তাদের নিরানন্দ জীবনের ফ্যান্টাসি।

নিরুপায় গরিব মানুষের শহরমুখী যে স্রোত, এর থেকে আমাদের এই পত্রলেখক মাঝারি গরিব এভাবেই আলাদা হয়ে থাকতে চেয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে না হলেও সাংস্কৃতিকভাবে। কিন্তু সত্তর থেকে নব্বই দশকের শহরায়ণের ফলে শহরের অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি ফুলেফেঁপে উঠেছে, অশিক্ষিত গরিবের জয়জয়কার হয়েছে শহরে, মেসকে ছাড়িয়ে গিয়েছে বস্তি, ক্রমে ক্রমে এই বিপুল ভাসমান জনগোষ্ঠী তাদের বিনোদন খুঁজতে শুরু করে। নিম্ন মধ্যবিত্তের মূল্যবোধ-শাসিত বাংলা সিনেমা দিয়ে এই জনগোষ্ঠীর বিনোদনচাহিদা যে মিটবে না, তা বলাই বাহুল্য। সিনেমার উত্পাদক আর ভোক্তার সাংস্কৃতিক দূরত্ব ঘোচানোর জন্য বাংলা সিনেমা নানা রকম চেষ্টাই করেছে, ফোক-ফ্যান্টাসি থেকে রগরগে যৌনতা পর্যন্ত, অশিক্ষিত গরিব কখনো কখনো সেসবের দু-একটা চেখে দেখেছে, তবু মুমূর্ষুদশা থেকে সিনেমাশিল্প উঠে আসতে পারেনি। ইত্যবসরে, নিম্নবর্গের বিনোদনের জায়গাটি দখল করে নিয়েছে বিশেষ ধরনের আরবান ফোক গান। অন্যত্র আমি দেখিয়েছি যে এই গানের মাধ্যমে শহরমুখী নিরক্ষর গরিব তাদের পূর্বাপর জীবনধারাগুলোকে যুক্ত করতে পেরেছে, ফলে গান তাদের জীবনে অর্থময় হয়ে উঠেছে।

এই বিশাল ভোক্তাগোষ্ঠী মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কারণে একদিকে যেমন সিনেমাশিল্প ও চটি বই দুই-ই বিপন্ন হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে এই বিপন্ন বিনোদনমাধ্যমগুলোর ভোক্তা হিসেবে মাঝারি গরিবও কম বিপন্ন হয়নি। চটি বই বা সিনেমাশিল্প বিপন্ন হওয়ায় মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত টেলিভিশনের খোঁড়লে ঢুকে পড়েছে, আর বস্তিবাসী গরিবের জন্য গান হয়ে উঠেছে আশ্রয়ের জায়গা। মাঝখানে পড়ে থাকা এই গোষ্ঠীর বড় একটি অংশ ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে এসব আরবান ফোক গানের শ্রোতা।২৭ এভাবে, বিনোদনমাধ্যম-কেন্দ্রিক এই মেরুকরণ তাদের আত্মপরিচয়ের রাজনীতিতেও নির্ণায়ক ভূমিকা রাখছে। প্রেমপত্রের আখ্যানগুলো থেকেই আমরা বুঝতে পারি, সংখ্যালঘু একটি শ্রেণী কীভাবে শহুরে অপ্রাতিষ্ঠানিক গরিবের সঙ্গে দূরত্ব এবং মধ্যবিত্তের সঙ্গে নৈকট্য বোধ করে আসছিল। কিন্তু, অশিক্ষিত গরিব ও অল্পশিক্ষিত মাঝারি গরিবের মধ্যকার আর্থসামাজিক বিভেদ যতই কমে এসেছে, বিনোদনমাধ্যম হিসেবে চটি বই ততই বিরল হয়ে গিয়েছে।

 

তথ্যসূত্র

১. অন্ত্যমিল দেওয়া দুই লাইন থেকে চার লাইনের কবিতা, যা একটি পূর্ণ ভাব প্রকাশ করে, এরই চলতি নাম ‘ছন্দ’।

২. প্রকাশ চৌধুরী, বৃহত্ প্রেমের চিঠি, (ঢাকা: সালমা বুক ডিপো, ১৯৯২)।

৩. ব্যক্তিগত কথোপকথন, ২০০৯।

৪. যাযাবর (বিনয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়), দৃষ্টিপাত, (কলকাতা: প্রকাশালয় অজ্ঞাত, ১৩৫৩ বাংলা); F. Dostoyevsky, 2011 (First published in Russian in 1846). Poor Folk. Traslated by C. J. Hogarth. http://ebooks.adelaide.edu.au/d/dostoyevsky/d72po/

৫. Anindita Ghosh, “Cheap Books, ‘Bad’ Books: Contesting Print-Cultures in Colonial   Bengal,” South Asia Research 18 (1998): 173-94.

৬. মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম, চকবাজারের কেতাবপট্টি (ঢাকা: ঢাকা নগর জাদুঘর, ১৯৯০)।

৭. Tapati Roy, “Disciplining the Printed Text: Colonial and Nationalist Surveillance of Bengali Literature,” in Texts of Power: Emerging Disciplines in Colonial Bengal, ed. Partha Chatterjee, (Calcutta: Centre for Studies in Social Sciences, 1996); Sumanta Banerjee, The Parlour and the Streets: Elite and Popular Culture in Nineteenth Century Calcutta. (Calcutta: Seagull, 1989).

৮. Ghosh, “Cheap Books, ‘Bad’ Books,” 1998.

৯. মুনতাসীর মামুন, ঢাকার হারিয়ে যাওয়া বইয়ের খোঁজে, (ঢাকা: অনন্যা, ২০০৬)।

১০. সুমন রহমান, “মুমূর্ষু চটি বই আর তার বিপন্ন নারীরা,”নারী ও প্রগতি, রোকেয়া কবীর সম্পাদিত, সপ্তম সংখ্যা: জুলাই-ডিসেম্বর, ২০০৮।

১১. সুমন রহমান, কানার হাটবাজার, (ঢাকা: দুয়েন্দে, ২০১১)।

১২. চৌধুরী, ১৯৯২। প্রাগুক্ত।

১৩. Sumit Sarker, “Kaliyug”, “Chakri” and “Bhakti”: Ramkrishna and his Times,” Economic and Political Weekly 27 (1992): p. 1549.

১৪. Ghosh, 1998. Ibid.

১৫. Ghosh, 1998. Ibid.

১৬. এম ডি কামরুল হাসান,মডার্ন লাভ লেটার, (ঢাকা: সালমা বুক ডিপো, ১৯৯৩)।

১৭. কবি সিদ্দিক, মেয়েদের গোপন প্রেমপত্র, (ঢাকা: সালমা বুক ডিপো, ১৯৯৪)।

১৮. Michel Foucault, The History of Sexuality Part One, 1978, pp. 4-5.

১৯. সিদ্দিক, ১৯৯৪। প্রাগুক্ত।

২০. হাসান, ১৯৯৩। প্রাগুক্ত।

২১. হাসান, ১৯৯৩। প্রাগুক্ত।

২২. চৌধুরী, ১৯৯২। প্রাগুক্ত।

২৩. সিদ্দিক, ১৯৯৪। প্রাগুক্ত।

২৪. হাসান, ১৯৯৩। প্রাগুক্ত।

২৫. চৌধুরী, ১৯৯২। প্রাগুক্ত।

২৬. চৌধুরী, ১৯৯২। প্রাগুক্ত।

২৭. রহমান, ২০১১। প্রাগুক্ত।

 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি

কাইয়ুম, মোহাম্মদ আবদুল। চকবাজারের কেতাবপট্টি। ঢাকা: ঢাকা নগর জাদুঘর, ১৯৯০।

চৌধুরী, প্রকাশ। বৃহত্ প্রেমের চিঠি। ১১২ পৃষ্ঠা। ঢাকা: সালমা বুক ডিপো, ১৯৯২।

মামুন, মুনতাসীর। ঢাকার হারিয়ে যাওয়া বইয়ের খোঁজে। ঢাকা: অনন্যা, ২০০৬।   

যাযাবর (বিনয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়)। দৃষ্টিপাত। কলকাতা: প্রকাশালয় অজ্ঞাত, ১৩৫৩ বাঙলা।

রহমান, সুমন। কানার হাটবাজার। ঢাকা: দুয়েন্দে, ২০১১।

রহমান, সুমন। “মুমূর্ষু চটি বই আর তার বিপন্ন নারীরা।” নারী ও প্রগতি, রোকেয়া কবীর সম্পাঃ, সপ্তম সংখ্যা: জুলাই-ডিসেম্বর, ২০০৮।

সিদ্দিক, কবি। মেয়েদের গোপন প্রেমপত্র। ঢাকা: সালমা বুক ডিপো, ১৯৯৪ (তৃতীয় সংস্করণ)।

হাসান, এমডি কামরুল। মডার্ন লাভ লেটার। ঢাকা: সালমা বুক ডিপো, ১৯৯৩।

Banerjee, Sumanta. The Parlour and the Streets: Elite and Popular Culture in Nineteenth Century Calcutta. Calcutta: Seagull, 1989.
Dostoyevsky, F. Poor Folk. Traslated by C. J. Hogarth. 2011 (First published in Russian in 1846). http://ebooks.adelaide.edu.au /d/dostoyevsky/d72po/
Ghosh, Anindita. Cheap Books, ‘Bad’ Books: Contesting Print-Cultures in Colonial Bengal. South Asia Research 18 (1998): 173-94.
Foucault, Michel. The History of Sexuality Volume 1: An Introduction, Trans. Robert Hurley. New York: Pantheon Books, 1978.
Roy, Tapati. Disciplining the Printed Text: Colonial and Nationalist Surveillance of Bengali Literature. Texts of Power: Emerging Disciplines in Colonial Bengal, ed. Partha Chatterjee. Calcutta: Centre for Studies in Social Sciences, 1996.
Sarker, Sumit. ‘Kaliyug’, ‘Chakri’ and ‘Bhakti’: Ramkrishna and his Times, Economic and Political Weekly 27 (1992): 1549.

pathok

যোগাযোগের ঠিকানা

সিএ ভবন,
১০০ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,
কারওয়ান বাজার, ঢাকা - ১২১৫।

ফোন: ৮৮০-২-৮১১০০৮১, ৮১১৫৩০৭
ফ্যাক্স - ৮৮০-২-৯১৩০৪৯৬

protichinta kinte chile