protichinta

বাঙালি পল্টন ও তত্কালীন নারীসমাজ

মুহাম্মদ লুত্ফুল হক

সারসংক্ষেপ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-সংগ্রামে নারীদের অবস্থা কী ছিল? বর্তমান প্রবন্ধে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের একটি ঘটনা সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। যখন বাঙালি নারীকে বলা হতো অবরোধবাসিনী, সেই সময়কার বাঙালি গুটি কয়েক নারী বাড়ির চৌহদ্দি পেরিয়ে গঠন করেছিলেন বাঙালি মহিলা সমিতি। এই সমিতির মাধ্যমে তাঁরা সহযোগিতা করেছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈন্যদল, বাঙালি পল্টনকে। বাঙালি পল্টন গঠন, নারীসমাজের গঠন ও কর্মকাণ্ড, মহিলা সমিতি সম্পর্কে তত্কালীন পত্রপত্রিকা ও স্মৃতিকথায় যে মূল্যায়ন করা হয়েছিল, তা এ প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে।

মুখ্য শব্দগুচ্ছ: মহিলা সমিতি, বাঙালি পল্টন, ঢাকার মহিলা সমিতি, বেঙ্গলি রেজিমেন্ট কমফোর্ট ফান্ড, স্বর্ণকুমারী দেবী, সরলাদেবী চৌধুরাণী।

ভূমিকা

উনিশ শতকে সামাজিক সংস্কার আন্দোলনের পথিকৃত্ রাজা রামমোহন রায় আর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিরামহীন সামাজিক আন্দোলনের ফলে সতীদাহ প্রথা রদ ও বিধবা বিবাহ আইন হয়েছে। কিন্তু বিশ শতকে এসেও কি বাঙালি নারী খুব একটা বের হতে পেরেছিলেন অন্তঃপুর থেকে, পুরুষতন্ত্রের জাঁতাকল থেকে? বিশ শতকে এসে যখন সারা ভারতীয় উপমহাদেশ আন্দোলিত হয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-সংগ্রামে, তখন নারীদের কী অবস্থা ছিল? নারী প্রশ্নটি কীভাবে মোকাবিলা করেছিল উপমহাদেশের সমাজ? পুরুষের তুলনায় নারী যে খুব একটা বহির্মুখী ছিলেন না, তা লক্ষ করা যায় বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তাঁদের অংশগ্রহণের সংখ্যা থেকে। তবে এটা ঠিক, মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে কয়েকটি আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়। তার পরও বলা যায়, নারীরা তখনো অনেকটা ছিলেন অন্তঃপুরের বাসিন্দাই। ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে নারী প্রশ্ন কী রকম ছিল, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক এখনো চলছে। তনিকা সরকারের মতে, ভারতীয় জাতীয়তাবাদে নারীদের স্থান ছিল ‘কালচারাল আর্টিফ্যাক্ট’ হিসেবে।১ তবে সুগত বোস একমত হননি তনিকা সরকারের মতের সঙ্গে। তাঁর মতে, ভারত মাতা ‘কালচারাল আর্টিফ্যাক্ট’ ছিল না। এটা এসেছে সুদীর্ঘ হিন্দু ঐতিহ্য থেকে, যেখানে মাতাকে দেখা হয় পৃথিবী হিসেবে।২ পার্থ চট্টোপাধ্যায় তাঁর একটি প্রবন্ধে বলেছেন, ভারতীয় উপমহাদেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে নারীরা ছিলেন ‘ইনার’ ও ‘স্পিরিচুয়াল’ স্পিরিট। আর এভাবেই নারীরা অন্তঃপুরে থাকলেও তাঁরা অন্তঃপুরে থেকেই পালন করেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।৩ ইতিহাসবিদ ভিলেম ফান সেন্ডেলের মতে, যেসব পণ্ডিত বাংলাদেশের নারীদের পুরুষতন্ত্রের অসহায় বলি হিসেবে দেখাতে চান, তাঁরা একটা বড় ভুল করছেন। তাঁর মতে, এ অঞ্চলের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। সুযোগ রয়েছে যেকোনো বিরাজমান লিঙ্গ-ভূমিকাকে চ্যালেঞ্জ জানানোরও।৪ অন্তঃপুর থেকে বের হয়ে পুরুষের পাশাপাশি বাঙালি নারীরাও যে ইতিহাসের কোনো কোনো সময় অবদান রাখতে চেষ্টা করেননি, এমনটা নয়।

আমার বর্তমান প্রবন্ধে আমি আলোকপাত করব বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের একটি ঘটনা, যখন বাঙালি নারীকে বলা হতো অবরোধবাসিনী, সেই সময় বাঙালি নারীরা বাড়ির চৌহদ্দি পেরিয়ে গঠন করেছিলেন বাঙালি মহিলা সমিতি। প্রবন্ধটিতে দেখানো হবে, তাঁরা কীভাবে সংগঠিত হয়েছিলেন, কর্মকাণ্ড চালিয়েছিলেন এবং কীভাবে তাঁদের কর্মকাণ্ড সক্রিয় সহযোগিতা করেছিল বাঙালি পল্টনের সফলতায়। প্রবন্ধের প্রথম অংশে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করা হবে বাঙালি পল্টন গঠন সম্পর্কে এবং মহিলা সমাজের গঠন ও কর্মকাণ্ড। প্রবন্ধের শেষ অংশে কয়েকজন উল্লেখযোগ্য নারী সংগঠক সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এ ছাড়া মহিলা সমিতি সম্পর্কে তত্কালীন পত্রপত্রিকা ও স্মৃতিকথায় যে মূল্যায়ন করা হয়েছিল, তা তুলে ধরা হয়েছে।

বাঙালি পল্টন গঠন

আধুনিক সামরিক ইতিহাসে বাঙালিকে যোদ্ধা হিসেবে খুব একটা দেখা যায় না। উনিশ শতকের শেষার্ধে ইংরেজ শাসকেরা বাঙালিকে ‘অযোদ্ধা জাতি’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। ফলে বাঙালির জন্য সৈন্যবৃত্তি আরও দূরে চলে যায়। অতীতেও যুদ্ধক্ষেত্রে বাঙালির উপস্থিতি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত নয়। ইতিহাসে বাঙালিকে কেউ যুদ্ধবাজ বা সাহসী যোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করেননি, বরং অনেকে বিপরীত মত প্রচার করেছেন। এই অবস্থার পরিবর্তন আসে প্রথম মহাযুদ্ধকালে—১৯১৫ সালের মাঝামাঝি। এ সময় স্বল্প কয়েকজন বাঙালি স্বেচ্ছাসেবক চিকিত্সাসেবা দেওয়ার জন্য সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে মেসোপটেমিয়ার যুদ্ধে অংশ নেন। তাঁদের প্রশংসনীয় কাজে বাঙালি সম্পর্কে শাসকদের ধারণা পাল্টাতে থাকে। সেনা হিসেবে বাঙালির উপযুক্ততা প্রমাণিত হয়। তাঁরা বাঙালির জন্য পল্টন গঠনের চিন্তাভাবনা শুরু করেন। এরই সঙ্গে এটাও সত্য যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য এ সময় শাসকদেরও প্রচুর সেনার প্রয়োজন দেখা দেয়।

১৯১৬ সালের ৭ আগস্ট ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক আইনসভায় বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল ‘বাঙালি পল্টন’ গঠনের সরকারি ঘোষণা দেন। বাঙালি পল্টনের প্রথম সরকারি নাম ছিল ‘বেঙ্গলি ডবল কোম্পানি’। এর জনবল ছিল ২৫০ জন। এক বছর পর এটিকে ব্যাটালিয়নে রূপান্তরিত করা হয় এবং নামকরণ করা হয় ‘৪৯তম বেঙ্গলি রেজিমেন্ট’ বা সংক্ষেপে ‘৪৯তম বেঙ্গলিজ’। যুদ্ধ শেষে পল্টন ভেঙে দেওয়ার কালে এর জনবল দাঁড়ায় প্রায় ছয় হাজারে। দীর্ঘদিন পর বাঙালির নিজস্ব পল্টন গঠনের সুযোগ আসায় সাজ সাজ রব পড়ে যায় সারা বাংলায়। ৭ আগস্টের ঘোষণা বাঙালি নেতাদের সক্রিয় করে তোলে, তাঁরা মনে করেন যে এই ঘোষণার ফলে বাঙালি জাতির দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ আর ‘অযোদ্ধা জাতির’ অন্যায্য অপবাদ দূর করার সুযোগ এসেছে। ৮ আগস্ট কলকাতার পত্রপত্রিকায় গভর্নরের ঘোষণাটি প্রকাশ পায়। ওই দিন দি ইংলিশম্যান পত্রিকার প্রতিনিধি বাঙালি পল্টনের উদ্যোক্তাদের প্রধান ব্যক্তি ডা. শরত্ কুমার মল্লিকের সাক্ষাত্কার নেন। ডা. মল্লিক বাঙালি পল্টন গঠনের জন্য প্রথম মহাযুদ্ধের শুরু থেকে, অর্থাত্ ১৯১৪ সালের আগস্ট মাস থেকে সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করে আসছিলেন। আর কাজটি ত্বরান্বিত করতে বর্ধমানের মহারাজার নেতৃত্বে ‘বেঙ্গল রেজিমেন্ট কমিটি’ নামের একটি বেসরকারি সংস্থা গঠন করেছিলেন। এই কমিটির কাজ ছিল সরকারের সঙ্গে দর-কষাকষির পাশাপাশি সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণদের পল্টনে যোগদানে উদ্বুদ্ধ করা।

বাঙালি পল্টনে নারী

৮ আগস্টের সাক্ষাত্কারে ডা. মল্লিক বাঙালি পল্টন গঠনের জন্য তাঁর বিভিন্ন উদ্যোগ ও কার্যক্রম সম্পর্কে পত্রিকাটির প্রতিনিধিকে অবহিত করেন। তিনি জানান, বাঙালি পল্টনকে সফল করার জন্য তিনি বেশ কয়েকটি কমিটি গঠন করবেন, যার মধ্যে থাকবে নারীদের নিয়ে কয়েকটি কমিটি। একটি নারী কমিটির দায়িত্ব থাকবে বাঙালি সেনাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় এবং চিত্তবিনোদনের উপকরণ সরবরাহ করা। ডা. মল্লিক আরেকটি মহিলা সমিতি গঠনের কথা উল্লেখ করেন, যাদের কাজ হবে নারীসমাজ, বিশেষ করে মায়েদের উত্সাহিত করা, যাতে তাঁদের পরিবারের সদস্য বা সন্তানেরা পল্টনে যোগ দেয়। অর্থাত্ প্রথম মহিলা সমিতি মূলত সেনাদের বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী সরবরাহের জন্য অর্থ সংগ্রহ করবে আর দ্বিতীয় মহিলা সমিতি প্রচারণার মাধ্যমে নারীদের, বিশেষত মায়েদের, বাঙালি পল্টনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করবে। ৯ আগস্ট সংবাদটি পত্রিকায় প্রকাশ পায়:

‘Amongst other committees there is talk of forming one of ladies to look after the needs and comforts of the troops, while another will work with the aim of convincing mothers as to the utility of recruiting and of teaching them their duty as women of Bengal.’৫

 

বাংলার নারীরা প্রথম মহাযুদ্ধের শুরু থেকেই বিচ্ছিন্নভাবে বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে বাঙালি তরুণদের যুদ্ধে যোগদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করে আসছিলেন। ১৯১৫ সালের মাঝামাঝিতে বাঙালি স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে ‘বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোর’ গঠিত হয়, আর ১৯১৬ সালের শুরুতে চন্দনগর (কলকাতার সন্নিকটে একটি ফরাসি ঔপনিবেশিক শহর) থেকে কিছু বাঙালি তরুণ ফরাসি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোর ও ফরাসি বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন এক শয়েরও কিছু কম বাঙালি। বাঙালির এই যুদ্ধযাত্রায় বাংলার নারীরা সংহতি প্রকাশ করেছিলেন। এ ছাড়া প্রথম মহাযুদ্ধের বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধরত সেনাদের কল্যাণে অর্থ সংগ্রহের জন্য ‘লেডি কারমাইকেল যুদ্ধ তহবিল’ গঠনেও বাংলার নারীরা অবদান রাখেন। এই উদ্যোগগুলো ছিল মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক ও সীমিত আকারের। এতে সারা বাংলার সম্পৃক্ততা ছিল না। বিপরীতে বাঙালি পল্টনের জন্য প্রয়োজন ছিল হাজার হাজার সেনা ও সমানুপাতিক হারে অর্থ বা তহবিল। অর্থাত্, বাঙালি পল্টন গঠনের উদ্যোগটি ছিল অভূতপূর্ব ও ব্যাপক এবং এতে সারা বাংলার সম্পৃক্ততার প্রয়োজন ছিল।

বাংলার নারীরা বাঙালি পল্টন গঠনে এগিয়ে আসেন। বাঙালি পল্টন গঠনে তাঁরা মূলত দুভাবে অবদান রাখেন। প্রথমত, তাঁরা একটি মহিলা সমিতি গঠন করেন। সমিতি সারা বাংলা থেকে পল্টনের জন্য অর্থ ও দ্রব্যসামগ্রী সংগ্রহ করত। আর ওই অর্থের সাহায্যে তারা নতুন ভর্তি হওয়া সেনাদের ঢাকা আর কলকাতা থেকে পল্টন যাত্রাকালে উপহারসামগ্রী প্রদান করত। এ ছাড়া নওশেরা, করাচি আর মেসোপটেমিয়ায় থাকা বাঙালি সেনাদের কাছে নিয়মিতভাবে প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী পাঠিয়ে দিত। দ্বিতীয়ত, নারীরা বাঙালি তরুণ ও সেনাদের গান, কবিতা আর নাটকের সাহায্যে উদ্বুদ্ধ করতেন। তাঁদের কেউ কেউ বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমেও তরুণদের পল্টনে যোগদানে উদ্বুদ্ধ করতেন। দ্বিতীয় উদ্যোগটি ছিল ব্যক্তি পর্যায়ের এবং বিচ্ছিন্নভাবে সংগঠিত হতো। এই রচনায় মূলত মহিলা সমিতির কর্মকাণ্ড তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। দ্বিতীয় উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট সব নারীকে চিহ্নিত করে তাঁদের কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া খুবই দুষ্কর। রচনায় দুজন নারীর তত্পরতা তুলে ধরে দ্বিতীয় উদ্যোগে নারীদের অবদান সম্পর্কে একটা ধারণা দেওয়া হয়েছে।

মহিলা সমিতি ও বেঙ্গলি রেজিমেন্ট কমফোর্ট ফান্ড

মহিলা সমিতির সাংগঠনিক কাঠামো সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায়নি। তবে এস এন হালদারের স্ত্রী বেলা হালদার (ল্যান্সডন স্ট্রিট) এবং পি কে রায়ের স্ত্রী সরলা রায় (বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড) মহিলা সমিতির যুগ্ম সচিবের দায়িত্বে ছিলেন। পত্রপত্রিকায় মহিলা সমিতির পক্ষ থেকে তাঁদের নামে সংবাদ ও প্রতিবেদন প্রকাশ পেত। কোথাও সরাসরি উল্লেখ না পাওয়া গেলেও বাঙালি পল্টনের প্রধান উদ্যোক্তা ডা. মল্লিকের স্ত্রী শিশির কুমারী মল্লিকা মহিলা সমিতির নেতৃত্বে ছিলেন বলে আভাস পাওয়া যায়, বিশেষ করে সুবেদার মনবাহাদুর তাঁর গ্রন্থে এ রকম ধারণাই দিয়েছেন। একেবারে শুরুতে সমিতির দাপ্তরিক কার্যক্রম ১০ ল্যান্সডন রোডে মিসেস বেলা হালদারের বাসায় শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে প্রায় এক বছর মিসেস আর সি দত্তের ৯/১ হাঙ্গারফোর্ড স্ট্রিটের বাসায় মহিলা সমিতির কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। শেষে মহিলা সমিতির অফিস মিসেস কে বি দত্তের বাসায় স্থানান্তর করা হয়। প্রতি বুধবার মহিলা সমিতির সভা অনুষ্ঠিত হতো। কলকাতায় মহিলা সমিতির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পাশাপাশি বাংলার অন্যান্য স্থানে আঞ্চলিক মহিলা সমিতি গঠিত হয়। বিভিন্ন সূত্র থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর, ভাগলপুর, কাকিনা, আরামবাগে(!) মহিলা সমিতির উল্লেখ পাওয়া গেছে।

১৯১৬ সালের আগস্ট মাসে ডা. মল্লিক বেঙ্গল রেজিমেন্ট কমিটির পক্ষ থেকে সেনাদের প্রয়োজনীয় কিছু দ্রব্য, যা সেনাবাহিনী বরাদ্দ করে না, তা প্রদানের জন্য সর্বসাধারণকে আহ্বান জানান। বাংলার প্রভাবশালী নারীরা এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে কলকাতার ‘মেরি কার্পেন্টার হলে’ একটি বড় ধরনের সভার আয়োজন করেন। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, তাঁরা বাঙালি পল্টন গঠনে সাহায্য করবেন। সেদিন বাঙালি পল্টন ও বাঙালি সেনাদের সহায়তা করতে একটি লেডিস কমিটি বা মহিলা সমিতি গঠিত হয়। সভায় আরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, প্রশিক্ষণের জন্য রওনা হওয়ার সময় প্রত্যেক সেনাকে সাত রুপি মূল্যের ১১টি প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীসহ একটি করে ব্যাগ উপহার দেওয়া হবে। সভায় অনেক ধনী ও উত্সাহী নারী এই উদ্যোগের জন্য তাত্ক্ষণিকভাবে বেশ কিছু অর্থ প্রদান করেন। মহিলা সমিতির উদ্যোগ সফল করার জন্য সর্বসাধারণকে অর্থ পাঠানোর আবেদন জানিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।

১৯১৬ সালের ৩০ আগস্ট কলকাতায় বাঙালি পল্টনে ভর্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়। ‘বেঙ্গলি ডবল কোম্পানি’ নামের এই দলের জনবল ছিল ২২৮। নির্বাচিত সেনাদের ফোর্ট উইলিয়াম সেনানিবাসে রেখে দফায় দফায় নওশেরায় (বর্তমানে পাকিস্তানের অংশ) প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হতো। ১১ সেপ্টেম্বরের দি ইংলিশম্যান পত্রিকা থেকে জানা যায়, সেনানিবাসে অবস্থানকালে কলকাতার বেশ কিছু গণ্যমান্য পরিবারের নারীরা ভর্তি হওয়া নতুন সেনাদের জন্য খাওয়া ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী পাঠাতেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ময়ূরভঞ্জের মহারানি, মিস এস সেন, মিসেস মেহতা, লেডি সিনহা, লেডি মুখার্জি, মিসেস ডি চৌধুরী, মিসেস কে পি বসু, মিসেস আর গুপ্তা, মিসেস এস আর দাস, মিসেস কে এন চৌধুরী, মিসেস এস পি সিনহা, মিসেস এন এন ঘটক প্রমুখ। একই সংবাদ থেকে জানা যায়, মহিলা সমিতি সেনাদের কঠোর জীবনকে সহনীয় ও স্বস্তিদায়ক করার জন্য অর্থ সংগ্রহ করে একটি তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে।৬ মহিলা সমিতির এই তহবিলের নাম রাখা হয় ‘বেঙ্গলি রেজিমেন্ট কমফোর্ট ফান্ড’। মহিলা সমিতির পক্ষ থেকে তহবিল গঠন ও পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় মিসেস কে বি দত্ত ও মিসেস পি চৌধুরীকে (বিশেষ কোষাধ্যক্ষ)। মহিলা সমিতির অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগে মিসেস পি চৌধুরী (বালিগঞ্জ), সরলা রায়, বেলা হালদার বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন, পত্রপত্রিকায় তাঁদের ঠিকানায় অর্থ পাঠানোর জন্য নারীসমাজকে আহ্বান জানানো হতো। তহবিলের অর্থ ব্যাংকে রাখা হতো। এই তহবিলের সাহায্যে মহিলা সমিতি সেনাদের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় করে বিদায়কালে তাঁদের দিত আর পল্টনের বিভিন্ন অবস্থানে পাঠাত।

মহিলা সমিতি এই তহবিলে অর্থ দেওয়ার জন্য মূলত নারীদের কাছেই আবেদন রাখত। তবে তহবিলের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অনেক ভদ্রলোক এবং বিভিন্ন ধরনের সংগঠন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও এই তহবিলে অর্থ প্রদান করেছিল। এ ছাড়া বিভিন্ন চ্যারিটি শো, সিনেমা ও নাটক প্রদর্শন এবং মেলা বা প্রদর্শনীর আয়োজন করেও অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল। ১৯১৭ সালের ১১ আগস্টের পত্রিকা থেকে জানা যায়, মনমোহন থিয়েটার (কলকাতা) বেনিফিট পারফরম্যান্সের মাধ্যমে ১৩৫৯ রুপি ছয় আনা (এ সময় আনা ও পয়সারও বেশ মূল্য ছিল) সংগ্রহ করে তহবিলে জমা দিয়েছে। মহিলা সমিতির তহবিল সংগ্রহে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ ধরনের আরও কিছু বেনিফিট পারফরম্যান্সের সংবাদ পাওয়া যায়। যেমন: বগুড়া এডওয়ার্ড ড্রামেটিক ক্লাব ১৩৫ রুপি, রংপুর ড্রামেটিক অ্যাসোসিয়েশন ৫০০ রুপি, রাচি থেকে শিশু পারফরম্যান্স বাবদ ৩০০ রুপি তহবিলে জমা দিয়েছিল। মহিলা সমিতির সদস্যদের অনেকে নিয়মিতভাবে তহবিলে চাঁদা দিতেন। চাঁদার পরিমাণ সুনির্দিষ্ট না থাকলেও মাসপ্রতি চার-পাঁচ রুপি করে দেওয়ার উদাহরণ লক্ষ করা গেছে। আবার কেউ কেউ এককালীন মোটা অর্থ দিতেন। যেমন ১৯১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পত্রিকা থেকে জানা যায়, কাশিমবাজারের মহারানি মহিলা সমিতির তহবিলে এক হাজার ৫০০ রুপি দান করেছেন।৭

বাঙালি পল্টনের সেনারা ১৯১৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর প্রশিক্ষণের জন্য যাত্রা শুরু করেন। ১২ সেপ্টেম্বর রাতে পল্টনের প্রথম দলের যাত্রাকালে হাওড়া রেলস্টেশনে বিদায় অনুষ্ঠান হয়, সেখানে দেশীয় ও ইউরোপীয় নারীরাও উপস্থিত ছিলেন। নারীরা বিদায়কালে আশীর্বাদসহ প্রত্যেক সেনাকে মহিলা সমিতির পক্ষ থেকে কিছু উপহার দেন। মহিলা সমিতি পরবর্তী দলগুলোকেও একইভাবে বিদায় দেয়। নারীরা কীভাবে সেনাদের বিদায় জানাতেন, তা বেশ কয়েকজন সেনার লেখায় উঠে এসেছে। সুবেদার মনবাহাদুর সিং লিখেছেন:

‘[১৯১৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর] প্রায় ৫টার সময় ফোর্ট থেকে হাওড়া স্টেশন অভিমুখে রওনা হলাম। সেখানে দেখি জনসমুদ্র! হর্ষে আনন্দে গর্বে মন অভিভূত হ’য়ে পড়ল। সেদিন যা দেখেছি, সেদিন জীবনে যে সম্পদ লাভ করছি, তা কখনও ভুলব না। আমাদের কামরার সামনে দুধারে দুটো সিঁদুর মাখানো মাটির কলসী ও ছোট ছোট দুটো কলা গাছ দিয়ে মঙ্গলঘট বানানো হয়েছে। লেডিজ্ কমিটি প্রত্যেককে এক-একটি ক’রে ব্যাগ দিয়েছিলেন। তার মধ্যে সাবান, মাথার তেল, আয়না, চিরুনী, তোয়ালে, চিঠির কাগজ, খাম, পেন্সিল ইত্যাদি ছিল। মাতৃহূদয়ের স্নেহের নিদর্শনস্বরূপ সেই দানই সেদিন ছিল আমাদের যাত্রাপথের পাথেয়। মন সেদিন আমাদের কানায় কানায় পূর্ণ। কথা বলার শক্তি ছিল না, নীরব বিস্ময়ে, বিপুল পুলকে, অসীম কৃতজ্ঞতায় সেদিন হূদয় আলোড়িত হয়ে উঠেছিল। হয়তো চোখে দু-এক ফোঁটা জলও দেখা দিয়েছিল। ... গার্ডের বাঁশী বাজল। গাড়িতে উঠছি এমন সময় একটি বাঙালী মেয়ে মধুর কণ্ঠে বলে উঠলেন— “ভিক্টোরিয়া ক্রস আনা চাই কিন্তু।” “ভিক্টোরিয়া ক্রস!” সৈনিক জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্মান—প্রত্যেক সৈনিকের স্বপ্ন! তাই আনব আমরা? আনব কিনা জানি না, তবু বাঙালী কন্যা আমাদের জন্য সেদিন উচ্চতম আশাই করেছিলেন।’৮

 

একই ধরনের বর্ণনা দিয়েছেন ওই বছরের নভেম্বর মাসে বাঙালি পল্টনে যোগ দেওয়া সুবেদার ফণীভূষণ দত্ত। তিনি লিখেছেন:

‘দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা বিশেষতঃ জননী সম্প্রদায় (মহিলা সমিতি) আমাদের জন্য নিজের সুখ শান্তি বিসর্জ্জন পূর্ব্বক কত আগ্রহ সহকারে আমাদের মঙ্গল সাধনে ব্যস্ত - কত কষ্ট করিয়া আমাদিগকে নানাভাবে আশীর্বাদ করিবার উদ্যোগ করিয়াছেন তাহাতে সকলেরই একটা অনবদ্য গর্ব্ব ও আহ্লাদে বক্ষঃস্ফীত হইয়া উঠে। ...

যেদিন আমরা যাত্রা করি সেদিন হাওড়া স্টেশনে খুব সমারোহ এবং লোকের ভীড় হইয়াছিল। মহিলাবৃন্দের উত্সাহবাণী এবং আশীর্ব্বাদ তন্মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। প্রত্যেক সৈনিককে একটি পেটিকায় (Comfort bag) নানাবিধ আবশ্যক দ্রব্য এবং শয্যা-দ্রব্যাদি প্রদান করিয়া তাঁহারা আমাদের আন্তরিক শ্রদ্ধাভক্তি আকর্ষণ করিয়াছিলেন। রমণীগণ বাঙ্গালীবৃন্দের জন্য যাহা করিয়াছেন এবং করিতেছেন সে সমস্ত বস্তুতঃই অবর্ণনীয়, ইহাঁদের ঋণ অপরিশোধ্য—ইহাঁদের স্নেহদৃষ্টি সততই আমাদিগের বহুবিধ সুখ বিধানে নিপতিত রহিয়াছে।৯

 

রেলস্টেশনে মহিলা সমিতির বিদায় অনুষ্ঠান সম্পর্কে সবাই প্রশংসা করলেও কিছু কিছু ত্রুটির জন্য তারা সমালোচিত হয়। পত্রিকায় প্রকাশ পায়:

‘যে-সকল বাঙালীর ছেলে সিপাহী হইতেছে, তাহাদিগকে সমাদর করিয়া হাবড়া স্টেশন হইতে বিদায় দেওয়া হইতেছে এবং পথেও নানা স্থানে তাহাদের অভ্যর্থনা হইতেছে। কলিকাতার একটি নারীসভা সিপাহীদের প্রত্যেককে নানা-প্রকার নিত্যব্যবহার্য্য দ্রব্যে পূর্ণ একটি করিয়া ব্যাগ উপহার দিতেছেন। সৈন্যদের প্রতি এই-প্রকার প্রীতি প্রদর্শন করিয়া নারীরা মাতৃজাতির কর্ত্তব্য পালন করিতেছেন। কিন্তু উপহারের ব্যাগগুলোতে সিগারেট থাকায় আমরা দুঃখিত হইয়াছি। আমাদের দেশী শিষ্টাচার পালন করিতে হইলে মাতৃস্থানীয়া নারীদিগের পক্ষ হইতে সন্তানস্থানীয় বালক ও যুবকগণকে সিগারেট উপহার দিবার প্রয়োজন হয় না। তা ছাড়া, সিগারেট বালক ও যুবকদের পক্ষে হানিকর; সকল বালক ও যুবক যে ধূমপান করে, তাহাও নয়; করিলেও জননী ও ভগিনীরা এই অনিষ্টকর জিনিস তাহাদিগকে উপহার দিবেন কেন?’১০

নারীসমাজের পথিকৃত্ হিসেবে সেনাদের মায়েরাও বিদায়কালে উপস্থিত থেকে তাঁদের সন্তানদের বিদায় জানাতেন বলেও পত্রপত্রিকায় উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৯১৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর হাওড়া রেলস্টেশনে বিদায় অনুষ্ঠানের বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়, ‘শ্রীমান কুমার অধিক্রম মজুমদার ও শ্রীমান অটলবিহারী মুখোপাধ্যায় নামক দুজন সৈনিকের জননীরা চন্দন দুর্বা দিয়া সৈন্যগণকে আশীর্বাদ করেন। এই নিষ্ঠাবতী হিন্দু মহিলাদ্বয় আশীর্বাদ করিবার জন্যই দূর হইতে আত্মীয়দের সঙ্গে আসিয়াছেন।’১১

এভাবেই প্রতিটি সেনাদলকে কলকাতা থেকে নওশেরা ও পরবর্তী সময়ে করাচি রওনা দেওয়ার কালে রেলস্টেশনে বিদায় দেওয়া হতো। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর জৌলুশ কমতে থাকে। প্রথম দিকে স্টেশনে অনেক নারী উপস্থিত থাকলেও পরবর্তী সময়ে উপস্থিতির হার কমতে থাকে। তবে মহিলা সমিতি তাদের উপহার ঠিকই স্টেশনে বিতরণ করত। সেনা মাহবুব-উল-আলম ১৯১৭ সালের এপ্রিল মাসে পল্টনে যোগ দেন। তাঁর বিদায়কালে মহিলা সমিতি থেকে একজন নারী হাওড়া স্টেশনে উপস্থিত হয়ে প্রত্যেককে উপহারসামগ্রী বিতরণ করেন। কলকাতা বা মফস্বলে রেলস্টেশনে বিদায় অনুষ্ঠান ছাড়াও নারীরা নানাভাবে বাঙালি পল্টনের সেনাদের সম্মানিত করতেন। ১৯১৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহ থেকে বাঙালি সেনার একটি দল পল্টন যাত্রা করে। অগ্রভাগে হাতি ও বাদক দলসহ একটি বিরাট মিছিল তাঁদের রেলস্টেশনে পৌঁছিয়ে দেয়। মিছিলটি রেলস্টেশনে যাওয়ার পথে স্থানীয় বালিকা বিদ্যালয়ে বিরতি করে। সেখানে বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ও ছাত্রীরা সেনাদের দেশাত্মবোধক গান গেয়ে শোনায়। ১৯১৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম থেকে প্রথম রিক্রুট দল কলকাতা রওনা হয়। ওই দিন চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির সদস্যরা রায় নবীনচন্দ্র দত্ত বাহাদুরের বাসায় অবস্থানরত ১১ জন রিক্রুটকে বিদায় শুভেচ্ছা জানান। ১৯১৭ সালের এপ্রিল মাসে চট্টগ্রামে সভা করে বিভাগীয় কমিশনার মি কেসি দের স্ত্রী বাঙালি সেনাদের বিদায় জানান।

১৯১৬ সালের আগস্ট মাসের শেষে মহিলা সমিতি গঠিত হয় এবং পরের মাস থেকে তহবিল সংগ্রহ শুরু হয়। তহবিলে যথেষ্ট অর্থ সংগ্রহের আগেই বাঙালি পল্টনের সেনারা প্রশিক্ষণের জন্য যাত্রা শুরু করেন। তাই প্রথম দিকের, সম্ভবত শুধু সেপ্টেম্বর মাসের, সেনাদের বিদায়কালে প্রদত্ত উপহারের অর্থ ‘লেডি কারমাইকেল যুদ্ধ তহবিল’ থেকে খরচ হয়। পরবর্তী সময়ে মহিলা সমিতির পৃথক তহবিল গঠিত হয়ে গেলে অর্থের বিষয়ে তাদের আর সমস্যায় পড়তে হয়নি।

১৯১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর মহিলা সমিতি সারা ভারতের নারীদের কাছে বাঙালি পল্টনের জন্য গঠিত তহবিলে অর্থ প্রদানের আবেদন করে। আবেদনে প্রত্যেক সেনাকে কী কী দ্রব্য প্রদান করা হচ্ছে এবং তার জন্য কী পরিমাণ অর্থ খরচ হচ্ছে, তা উল্লেখ ছিল:

‘On behalf of the Mohila Samiti we beg to bring to the kind notice of all Indian ladies that we have been working towards supplying necessities for the newly formed Bengali Double Company. The following list of things we are packing in the bags to be given to each of the recruited soldiers namely:- 1 bed sheet, 2 handkerchiefs, 2 towels, 1 vest, 1 pillow, 1 pillowcase, 1 bottle of mustard oil, 1 tooth powder, 1 soap, 1 cloth cleaning soap, 1 hair brush, 1 shoe brush, 1 shoe polish, button-thread, needle, letter papers, envelopes, pencil, looking glass, comb, pen, knife and enameled plat and glass. The cost of each bag of such bags is Rs. 7 and 228 bags are necessary which would cost Rs. 1576. For the present only 60 bags have been subscribed for and a donation of Rs. 105 has been received by the Samiti. May we ask you to subscribe towards this scheme and help the Mohila Samiti in completing this work. You must be aware through your husbands that this is the first time that Bengal has been allowed this privilege and we need hardly remind you how important it is that we women should come forward and help in encouraging our young men to go out to uphold the honour of our country’১২

 

একই সংবাদ ২ অক্টোবর পুনরায় প্রকাশ পায়। এভাবে পত্রপত্রিকায় মাঝেমধ্যে মহিলা সমিতির পক্ষ থেকে আবেদন প্রকাশ পেত। ১৯১৬ সালের ৯ ডিসেম্বর দ্য হিন্দু প্যাট্রিয়ট, ১৯১৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দি ইংলিশম্যান এবং একই সালের ৭ এপ্রিল দ্য বেঙ্গলি পত্রিকায় অর্থ ও দ্রব্যসামগ্রী পাঠানোর জন্য এ ধরনের আবেদন লক্ষ করা যায়। আবেদনের ভাষাও লক্ষণীয়, ‘All contributions, no matter how small, be received by Mrs P Chaudhury, 1 Bright Street, Ballygong.’

১৯১৬ সালের ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, ডা. মল্লিক বাঙালি পল্টনের সেনাদের জন্য বিনোদনমূলক প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছেন।১৩ এ ধরনের সামগ্রী সেনাদের একঘেয়েমি দূর করবে এবং তাঁদের কষ্টের জীবনকে কিছুটা স্বস্তিদায়ক করবে। তিনি সর্বসাধারণের কাছে খেলার সামগ্রী, কাপড়চোপড়, শীতবস্ত্র ও অন্যান্য জিনিস পাঠানোর আবেদন রাখেন। এই দ্রব্যসামগ্রীর পাশাপাশি খাদ্যদ্রব্য, বিশেষ করে চাটনি, আচার, মসলা, মিষ্টি, শুকনো ফল, গুঁড়া দুধ, চা, বিস্কুট ইত্যাদি মহিলা সমিতির মিসেস এস এন হালদার ও মিসেস মল্লিকের (বিডন স্ট্রিট) ঠিকানায় পাঠানোর জন্য তিনি অনুরোধ করেন। বেঙ্গল রেজিমেন্ট কমিটি এভাবে মাঝেমধ্যে পত্রিকার মাধ্যমে সর্বসাধারণকে, বিশেষ করে নারীদের কাছে খাদ্যদ্রব্য পাঠানোর জন্য আবেদন করত।

মহিলা সমিতি তাদের তহবিলে যে অর্থ সংগ্রহ হতো, তার আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রতি এক-দুই মাস পর পত্রিকা মারফত প্রচার করত। অর্থের হিসাবের পাশাপাশি মোটা দাগের বা অধিক পরিমাণে পাওয়া দ্রব্যসামগ্রীর তালিকাও প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হতো। ১৯১৬ সালের ৯ ডিসেম্বর হিসাবের প্রথম প্রতিবেদন দ্য হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকায় প্রকাশ পায়। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শুরু থেকে ১৯১৬ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত তারা দুই হাজার ৫১২ রুপি ১৫ আনা সংগ্রহ করেছে। একই সংবাদ থেকে জানা যায়, মহিলা সমিতি প্রশিক্ষণরত সেনাদের জন্য তাদের তহবিল থেকে খাদ্য, কাপড়, ওষুধ ইত্যাদি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাতে জনপ্রতি দুই রুপি হিসেবে মাসে আনুমানিক ৪৫০ রুপির প্রয়োজন হবে।

২৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, ওই সময়ে তহবিলে মোট চার হাজার ২৯৪ রুপি ১২ আনা সংগৃহীত হয়েছিল।১৪ ১৯১৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মহিলা সমিতি ওই পর্যন্ত ছয় হাজার ৫৭২ রুপি ১২ আনা সংগ্রহ করেছে। প্রতিবেদনে অর্থ ও দ্রব্যসামগ্রী প্রদানকারীদের একটি তালিকাও প্রকাশ করা হয়।১৫ পরবর্তী সময়ে একই পত্রিকার ২১ এপ্রিল ও ৩১ মে সংখ্যা থেকে জানা যায়, মহিলা সমিতির তহবিলে যথাক্রমে ১০ হাজার ৩৫ রুপি ১২ আনা ও ১৩ হাজার ৫৯১ রুপি ১৪ আনা নয় পয়সা জমা পড়েছে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, মহিলা সমিতি অর্থ সংগ্রহ ছাড়াও বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য ও সেনাদের ব্যবহার্য ব্যক্তিগত দ্রব্যসামগ্রী, যেমন চাটনি, আচার, মিষ্টি, সরষের তেল, সাবান ইত্যাদি সংগ্রহ করে বাঙালি পল্টনে পাঠিয়ে দিত। মহিলা সমিতি এই উদ্যোগ ১৯১৬ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু করেছিল; আর এর জন্য তাদের সেনাপ্রতি দুই রুপি খরচ হতো, পরবর্তী সময়ে ১৯১৭ সালের জানুয়ারি মাস থেকে এ অর্থ বাড়িয়ে চার রুপি করা হয়।

মহিলা সমিতি ১৯১৭ সালের আগস্ট মাসে তাদের তহবিলের নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে উল্লেখ ছিল, ১৯১৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯১৭ সালের আগস্ট পর্যন্ত সময়ে তহবিলে ১৬ হাজার ৩১৪ রুপি ১৫ আনা নয় পয়সা সংগ্রহ হয়েছে, যার মধ্যে খরচ হয়েছে ১২ হাজার ৭৯১ রুপি ১৫ আনা তিন পয়সা। ১৯১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর দি ইংলিশম্যান পত্রিকায় বেলা হালদার ও সরলা রায় স্বাক্ষরিত মহিলা সমিতির একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ পায়। ওই প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো ছিল নিম্নরূপ:

১.১৯১৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯১৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ১৩ মাসে মহিলা সমিতি ১৫ হাজার ৬৬৬ রুপি সংগ্রহ করে, যার মধ্যে ১৪ হাজার ৬৫৯ রুপি খরচ হয়েছে।

২. মহিলা সমিতি বাঙালি পল্টনের জন্য দ্রব্যসামগ্রীর চাহিদা নিরূপণ করে নিজস্ব তত্ত্বাবধানে তা সংগ্রহ ও বাক্সবোঝাই করে প্রতি সপ্তাহে পল্টনের করাচি ও মেসোপটেমিয়া অংশে প্রেরণ করছে।

৩. প্রতি মাসে এই পদ্ধতিতে বাঙালি পল্টনে দ্রব্যসামগ্রী প্রেরণে মহিলা সমিতির গড়ে এক হাজার ৬০০ রুপি প্রয়োজন হচ্ছে।

৪. বাঙালি পল্টনের সুবেদার মেজর, সুবেদার, জমাদার ও অন্য সেনারা দ্রব্যসামগ্রী প্রেরণের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মহিলা সমিতিকে নিয়মিতভাবে চিঠি পাঠাচ্ছেন।

৫. উত্তর কলকাতার নারীদের সুবিধার জন্য ডা. মিসেস গাঙ্গুলি (গুরু প্রসাদ চৌধুরী লেন) এবং মিসেস মৃগেন্দ্র লাল মিত্রের (কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট) নিকট অর্থ ও দ্রব্যসামগ্রী প্রেরণের অনুরোধ করা হয়। অন্যান্য এলাকার নারীদের আগের মতো ট্রেজারার মিসেস পি চৌধুরীর (বালিগঞ্জ) সঙ্গে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করা হয়।

প্রতিবেদনে বাংলার নারীদের কাছে পুনরায় নিম্নরূপ আবেদন রাখা হয়:

‘The Mahila Somity therefore approach you once more with the earnest hope that each and every well wisher of the Bengali Regiment will kindly contribute something towards the fund, which will enable them to carry on their work with satisfaction. Some of the boys who are now in Mesopotamia, had left their home over a year ago, it is needless to say how much they appreciate and love to receive any little gifts which come (as they say) from their mother and sisters at home. It would be an extra pleasure and delight to them if we could send something as the Puja and Bhatri Dyttia gift.’১৬

 

বাঙালি পল্টনের একাংশ ১৯১৮ সালের জানুয়ারি মাসে আজিজিয়ায় (মেসোপটেমিয়া) অবস্থান করছিল। সুবেদার মনবাহাদুরের লেখা থেকে জানা যায়, সেখানেও তাঁদের জন্য মহিলা সমিতির উপহার পৌঁছে যেত। তিনি লিখেছেন, ‘এখনও বাংলাদেশের মহিলা সমিতির পক্ষ থেকে নানারকম জিনিস আসছে।’১৭ মহিলা সমিতির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মেসোপটেমিয়ায় বাঙালি সেনাদের দ্রব্যসামগ্রী প্রেরণে প্রতি মাসে পাঁচ থেকে ছয় শ রুপি প্রয়োজন হতো।

১৯১৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির পত্রিকা থেকে জানা যায়, বেঙ্গলি রেজিমেন্ট কমফোর্ট তহবিলে মোট ১৯ হাজার ৪৮৩ রুপি ১৩ আনা নয় পয়সা জমা হয়েছে। এ সময় মহিলা সমিতির তহবিলে বেঙ্গলি প্যাট্রিয়টিক ফান্ড থেকেও নিয়মিতভাবে ২৫০ রুপি করে পাওয়া শুরু হয়। ১৯১৮ সালের প্রথমার্ধে তহবিলের সংকট দেখা দিলে কাশিমবাজারের মহারাজা তাঁর নিজস্ব জায়গায় মহিলা সমিতিকে একটি প্রদর্শনী করার অনুমতি দেন। মে মাসে তিন দিনের জন্য মহিলা সমিতি সেখানে প্রদর্শনীর আয়োজন করে এবং তা থেকে চার হাজার রুপি সংগ্রহ করে।১৮

১৯১৮ সালের নভেম্বর মাসে প্রথম মহাযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। ধীরে ধীরে বাঙালি সেনারা পল্টন ত্যাগ করতে থাকেন। ১৯২০ সালের মাঝামাঝি বাঙালি পল্টন চূড়ান্তভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে বাঙালি পল্টনের জন্য গঠিত ‘মহিলা সমিতি’ আর ‘বেঙ্গলি রেজিমেন্ট কমফোর্ট ফান্ড’ও বিলুপ্ত হয়। বেঙ্গলি রেজিমেন্ট কমফোর্ট ফান্ডে চূড়ান্তভাবে কী পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ হয়েছিল, তা জানা যায়নি। তবে ১৯১৮ সালের জুলাই পর্যন্ত মহিলা সমিতির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন সৈনিক বাঙালী গ্রন্থে পাওয়া যায়। প্রতিবেদনটিতে সমিতির যুগ্ম সেক্রেটারিরা স্বাক্ষর করেন। সেখানে শুরু থেকে ১৯১৮ সালের জুলাই পর্যন্ত সমিতির বিভিন্ন তথ্যের উল্লেখ আছে। প্রতিবেদনটি অনেকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় পরিশিষ্ট হিসেবে রচনার সঙ্গে সংযুক্ত করা হলো। এই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এ সময় পর্যন্ত তহবিলে মোট ২৭ হাজার ৪৪০ রুপি চার আনা সংগ্রহ হয়েছিল এবং বিভিন্ন ধরনের খরচের পর সাত হাজার ৫৬৩ রুপি পাঁচ আনা উদ্বৃত্ত ছিল। চূড়ান্তভাবে তহবিলের উদ্বৃত্ত অর্থ মহিলা সমিতি সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে।

বাঙালি পল্টনের মৃত সেনাদের স্মৃতি রক্ষার্থে ১৯২৪ সালের আগস্ট মাসে কলকাতার কলেজ স্কয়ারে সামরিক কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়। মহিলা সমিতি ‘বেঙ্গলি রেজিমেন্ট কমফোর্ট ফান্ড’-এর যে অর্থ সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছিল, তা এই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে ব্যবহূত হয়। সুবেদার মনবাহাদুর বলেছেন, ‘মহিলা সমিতির তহবিলে যে টাকা ছিল সেই টাকা এই স্মৃতিস্তম্ভ রচনায় সাহায্য করেছে। সমিতি সেই টাকা সামরিক কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠিয়ে বাঙালী পল্টনের স্মৃতি রক্ষার জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন।’১৯

ঢাকার মহিলা সমিতি

বাঙালি পল্টনে সেনা সংগ্রহের জন্য ঢাকায় একটি রিক্রুটিং সেন্টার ছিল। যেসব বাঙালি তরুণ ঢাকায় সেনা হিসেবে ভর্তি হতেন, তাঁরা ঢাকা থেকে সরাসরি করাচিতে চলে যেতেন। ফলে কলকাতা মহিলা সমিতির পক্ষে তাঁদের উপহারসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। ১৯১৭ সালের ৩ জুনের পত্রিকা থেকে জানা যায়, ওই দিন বিকেলে ঢাকায় ইস্ট বেঙ্গল ইনস্টিটিউশনে গণ্যমান্য নারীদের একটি সভা হবে। এই সভায় সেনাদের উপহারসামগ্রী প্রদানের দায়িত্ব দিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হবে, যাতে কলকাতা মহিলা সমিতিকে এ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া যেতে পারে। এরপর ঢাকায় মহিলা সমিতি গঠিত হয় এবং কর্মকাণ্ড শুরু করে। মেসোপটেমিয়ায় নজরুল গ্রন্থে ঢাকায় গঠিত মহিলা সমিতির কর্তাব্যক্তিদের আংশিক পরিচয় পাওয়া যায়, ‘এ-সময় ঢাকায় যে-সব মহিলা প্রশংসনীয় কর্মতত্পরতার পরিচয় দেন, তাঁদের মধ্যে স্থানীয় উকিল অমৃত লাল চৌধুরীর সহধর্মিণী, সরসীবালা চৌধুরাণী; ব্যারিস্টার মি. এস. কে. নাগের পত্নী, প্রতিভা নাগ; উকিল শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।’২০ [মেসোপটেমিয়ায় নজরুল: পৃ. ১৪৭]। এখানে উল্লেখ্য, ঢাকার নারীরা বাঙালি পল্টন গঠনের আগেও ভারতীয় সেনাদের জন্য ব্যবহার্য জিনিস প্রেরণ করতেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়:

 

‘এ শহরের [ঢাকা] অনেক মহিলাই যুদ্ধে আহত সৈনিকগণের সুখ-স্বচ্ছন্দতার নিমিত্ত নানাবিধ দ্রব্য সামগ্রী প্রস্তুত করিতেছেন। রমনাস্থ গভর্ণমেন্ট হাউসের যে-ঘরে বসিয়া ঐ সকল রমণীগণ তাহাদের কার্য্য করিয়া থাকেন, মাননীয় গভর্ণমেন্ট বাহাদুর সেদিন [১৯১৬ সালের জুলাই মাসে] সে-গৃহটি পরিদর্শন করিয়াছেন। সরকার বাহাদুরের এই পরিদর্শন দ্বারা মহিলাকুল বড়ই আনন্দিত ও উত্সাহিত হইয়াছেন।’২১

১৯১৮ সালের ৯ মার্চ গভর্নর লর্ড রোনাল্ডস ঢাকায় স্থানীয় নারীদের কাজে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে উল্লেখ করেন:

‘I thank too the ladies of Dhaka, both Indian and European for the works which they are doing in providing comfort for the troops. I thank too all those who have generously subscribed to the Dacca Ladies War Fund and in particular Srimati Sarajabala Devi of Bhowal, Babu Ramnath Ray of Kapasia, Babu Harendralal Ray of Bhagyakul, the Estate of Srimati Ananda Kumari Devi of Bhowal and Babu Rananath Das and his mother.২২

গভর্নর রোনাল্ডসের ঢাকায় প্রদত্ত বক্তৃতাটি ১০ মার্চ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ পায়, যেখানে তিনি ঢাকার মহিলা সমিতির অর্থ সংগ্রহে অবদান রাখার জন্য কয়েকজন নারীর নাম উল্লেখ করে প্রশংসা করেন। যুদ্ধ শেষে সরকার ঢাকার নারীদের মধ্যে প্রতিভা নাগ ও সরসীবালাকে ‘সার্টিফিকেট অব অনার’ প্রদান করে। ১৯১৯ সালের ২১ নভেম্বর ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট মি. হার্ট সভা করে পুরুষ ও নারীদের সার্টিফিকেট প্রদান করেন। সরসীবালা পর্দানশিন বলে সভায় উপস্থিত হননি।

প্রশংসা ও স্বীকৃতি

মহিলা সমিতির কর্মকাণ্ড সমাজের সব স্তরে প্রশংসিত হয়। পল্টনের সেনারা, পত্রপত্রিকা, বিশিষ্ট ব্যক্তি, সাধারণ মানুষ—সবাই মহিলা সমিতির উদ্যোগগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করেন। ১৯১৭ সালের ১৭ মার্চের পত্রিকায় উল্লেখ পাওয়া যায়, ‘The efforts of the Mahila Samiti and Mr. J. N. Bose of Chandernagore and few others to see to the comforts of the members of the Double Company are most praise worthy.’২৩ ১৯১৭ সালের ৯ জুন দ্য হিন্দু প্যাট্রিয়ট মহিলা সমিতির কর্মকাণ্ডের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে তাদের উদ্যোগকে চলমান রাখার জন্য অনুরোধ করে। নিচে সংবাদের অংশবিশেষ দেওয়া হলো:

‘The very successful efforts of the Mahila Samiti in providing comforts for the Bengalee Regiment have been appreciated by the soldiers and the military authorities and by the public at large. Indeed, if the men’s committee have busied themselves with the work of recruiting and organization, the Mohila Samiti have felt a mother’s love for the lads and have thoughtfully provided them with many of the necessaries which would go for to soften the rigours of a soldier’s life. ... We have every hope that Bengalee ladies will not be slow to contribute their mite towards the provision of comforts for the soldier sons of their motherland.’২৪

সার্বিকভাবে মহিলা সমিতির অবদান যে কত বিস্তারিত ও ব্যাপক ছিল, তা সেনা মাহবুব-উল-আলম উল্লেখ করেছেন এভাবে:

‘মায়েদের সহানুভূতি আগা-গোড়াই ছিল। বাঙালী পল্টনের পশ্চাতে ছিল বাঙালী নারীর Sanction। পল্টন যত দূরেই গিয়াছে, জননীদের মঙ্গল জিজ্ঞাসা উহার অনুসরণ করিয়াছে। চোখের জল, আশীর্বাদ, হাওড়া হইতে যাত্রাকালে বিদায়—অভিনন্দন, পথের জন্য জলের কুজো, খাওয়ার সরঞ্জাম, বাগদাদের শীতের সময় সুদৃশ্য গরম কাপড়, জলপাই আচার, আমসত্ত্ব, মুড়ি, সন্দেশ, রসগোল্লা, নারিকেল, মাথায় মাখিবার তেল প্রভৃতি মায়ের দল বাঁধিয়া এবং জনে জনে পাঠাইয়াছেন। তাঁহাদের প্রতিষ্ঠান লেডীজ কমিটি পূজা পার্বণে তত্ত্ব পাঠাইতেও ভুলেন নাই। ফলতঃ একমাত্র নারীরাই পল্টনের প্রতি অবিমিশ্র আন্তরিকতার পরিচয় দিয়াছেন।’২৫

সুবেদার মনবাহাদুরও তাঁর গ্রন্থে মহিলা সমিতির প্রশংসা করেছেন:

‘ডাক্তার মল্লিক, সুরেন ব্যানার্জ্জি প্রভৃতি বাঙালী নেতারা যেভাবে বাঙালী যুবকদের অনুপ্রাণিত করে তুলছিলেন তাতে বাংলার মাতৃজাতিও নীরব ছিলেন না। মিসেস এস কে মল্লিক, মিসেস কে বি দত্ত, মিসেস জে এম রায়, মিসেস এম এস মিত্র, মিসেস জে সি মুখার্জি, মিসেস এ সি দত্ত, মিসেস এ পি সেন, মিসেস পি কে রায়, ডাক্তার মিসেস গাঙ্গুলি, মিসেস এস এন হালদার, মিসেস চৌধুরী এবং শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত গুরুসদয় দত্ত আইসিএস মহাশয়ের পত্নী সরোজনলিনী দত্ত প্রভৃতি নেত্রীস্থানীয় মহিলাদের আন্তরিক উত্সাহে এবং উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে মহিলা সমিতি (লেডিস কমিটি) গঠন করে বাংলা থেকে বহু অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন এবং তা থেকে প্রায় সাত (৭০০০) হাজারের উপর বাঙালী সৈনিকের দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযুক্ত বহু জিনিসপত্র নৌসেরা, করাচি ও মেসোপটেমিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়েছিলেন। দূর দেশে বসে স্নেহহীন রুক্ষ আবহাওয়ায় এই দান আমাদের মনকে কৃতজ্ঞতায় এবং আনন্দে অভিভূত করে ফেলত।’২৬

 

মহিলা সমিতির সহায়তার কথা সেনারা ছাড়াও সাধারণ বাঙালিরাও বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করেছেন। ১৯১৭ সালের প্রথম দিকে একজন বাঙালি ভদ্রলোক করাচিতে গিয়ে বাঙালি পল্টন পরিদর্শন করেন। তিনি পল্টনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড দেখে এসে তার বিস্তারিত বিবরণ পত্রিকায় প্রকাশ করেন। বিবরণে মহিলা সমিতি প্রসঙ্গে লিখেছেন:

‘মহিলা-সমিতি রোগীদের জন্য কয়েক প্রকার ঔষধ, ব্যান্ডাজ, হলিক্রস মিল্ক, টেবলয়েড, টিকেন ও এসেন্স প্রভৃতি দিয়াছেন। তাঁদের প্রদত্ত টিকেন ও মাউন এসেন্স বাঙ্গালী কোম্পানীর মরণোন্মুখ রোগীদেরকে প্রকৃতই সঞ্জীবনী শক্তি প্রদান করিয়াছে। এ-জন্য মহিলা-সমিতিকে ধন্যবাদ না দিলে নিতান্ত অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দেওয়া হয়।

‘সৈনিক জীবনের কঠোরতার ভিতরে “মহিলা-সমিতি” প্রদত্ত জিনিসের দ্বারা বাঙ্গালী সৈনিকেরা অনেক আরাম পাইয়াছে। তাহাদের জিনিসগুলি ব্যবহারের সময়ে মনে হয় যেন “অমরধামের দেবীগণ” বাঙ্গালীর ঘরে ঘরে বরান্বিতা থাকিয়া আশ্বাসজনিত কঠোর ব্রতালম্বী বাঙ্গালী সৈনিকের শ্রম ও ক্লান্তি দূর করিতেছেন। তাহাদের স্নেহ-মানসপটে অঙ্কিত থাকিলে, বাঙ্গালী সৈনিকেরা অচিরেই রণক্ষেত্রে পৃথিবীর অজেয় বীর বলিয়া পরিচিত হইবে।’২৭

মহিলা সমিতির অবদান বিখ্যাত ব্যক্তিদের নজরও এড়ায়নি। রায় সাহেব রাজেন্দ্রলাল আচার্য্য তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ বাঙ্গালীর বল-এ উল্লেখ করেছেন:

‘বঙ্গ-মাতৃকা সেদিন “মহিলা-সমিতির” বেশে দেখা দিয়া নবধর্ম্মে দীক্ষিত পুত্রগণের শিরে আশীষকুসুম বর্ষণ করিয়াছিলেন, নানা নিত্যাবশ্যক উপাচার প্রদান করিয়া তাঁহারা পুত্রদিগকে সমরাঙ্গনে প্রেরণ করিয়াছিলেন - সহসা জাগ্রত পুত্রগণের নবদীক্ষার যজ্ঞভূমিতে উপস্থিত থাকিয়া তাহাদের হূদয়ে বল সঞ্চার করিয়াছিলেন। মাতৃস্নেহ সেদিন অবরোধ প্রথাকেও উপেক্ষা করিয়া রেল স্টেশন পর্য্যন্ত বীর পুত্রের অনুগমন করিয়াছিল। সংবাদপত্রের বিজ্ঞ ইংরাজ সম্পাদক ও লেখকগণ এই সকল দেখিয়া বলিয়াছিলেন - বঙ্গের এই অনুষ্ঠান বাঙ্গালীর জাতীয় ইতিহাসের একটি গৌরবমন্ডিত সূচনাকে উজ্জ্বল করিয়াছে - সন্দেহশূন্য করিয়াছে - সত্য বলিয়া জগত্ সমক্ষে বিঘোষিত করিয়াছে।’২৮

নারীসমাজের অন্যান্য অবদান

বাঙালি পল্টনকে উপলক্ষ করে বাংলা সাহিত্যে বেশ কিছু গান, কবিতা ও গল্প রচনা হয়েছিল। এসব গান, গল্প ও কবিতার মূল আবেদন ছিল বাঙালি তরুণদের উদ্বুদ্ধ করা, যাতে তাঁরা যুদ্ধে যোগ দেন এবং বিজয়ীর বেশে ফিরে আসেন। নারীদের মধ্যেও কেউ কেউ এই উদ্যোগে অংশ নেন। তাঁদের কবিতা ও গান এবং গানের স্বরলিপি সে সময়ের প্রধান সাময়িকীগুলোতে প্রকাশিত হয়েছিল। এ বিষয়ে স্বর্ণকুমারী দেবীর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। এ ছাড়া নারীদের মধ্যে সরলা দেবী তাঁর লেখনী ছাড়া অন্যান্য বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সাহায্যে বাঙালি পল্টন গঠনে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। নারীসমাজের মধ্যে স্বর্ণকুমারী ও সরলা দেবীর ভূমিকা প্রতিনিধিত্বশীল বিবেচনায় নিচে পৃথকভাবে উল্লেখ করা হলো।

স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৫৫-১৯৩২)

স্বর্ণকুমারী দেবী ১৮৫৫ সালের আগস্ট মাসে কলকাতার জোড়াসাঁকোতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় বোন ছিলেন। তিনি কবি, ঔপন্যাসিক ও সমাজসেবিকা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বাঙালি পল্টনের শুরু থেকেই তিনি এই আন্দোলনকে সমর্থন করেন এবং এর সপক্ষে বেশ কিছু কবিতা ও গান রচনা করেন।

১৩২১ সালের অগ্রহায়ণ মাসের ভারতী পত্রিকায় ‘বীর বন্দনা’ নামে স্বর্ণকুমারী দেবীর একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। কবিতায় স্বদেশি বীর সেনার স্তুতি গাওয়া হয়েছে। নিচে কবিতাটির প্রথম ও শেষ পঙিক্ত উল্লেখ করা হলো:

‘হে সৈনিক, মহাবীর, স্বদেশী আমার,

তোমার বীরত্বে মুগ্ধ দ্যুলোক ভূলোক,

ক্ষুদ্র আমি মহা গণি ভাই ব’লে ডাকি,

ভুলেছি গৌরবে তব, অধীনতা শোক। ...

কেমনে প্রশংসী তোমা? —নাহি কোনো ভাষা,

এ মহাসমরে আশা, দেবতার তুমি,

জানি না কি অর্ঘ্যে বীর বন্দিব তোমারে,

তব নামে দেশ ধন্য, ধন্য পরভূমি।’

১৩২৫ সালের পৌষ সংখ্যা ভারতী পত্রিকায় ‘বাঙ্গালী পল্টনের যুদ্ধযাত্রা সংগীত’ নামে স্বর্ণকুমারী দেবীর (১৮৫৫-১৯৩৯) একটি গান প্রকাশিত হয়। গানটির সুর ও স্বরলিপি রচনা করেন ব্রজেন্দ্রলাল গাঙ্গুলী (১৮৮৪-১৯৪০)। গানটি ‘রাগিনী মিশ্র-তাল কাওয়ালি’ সুরে রচিত। গানের প্রথম পঙিক্তটি নিচে দেওয়া হলো:

‘ঐ আহ্বান-গীতি বাজে,

জয় জয় জয় জয় প্রণামি রাজ রাজে,

সবে জাগি, এস লাগি জন্মভূমির কাজে।

হের দূরিত তিমির রাত্রি,

মোরা দীপ্ত প্রভাতের যাত্রী,

চলি উত্সাহে কোটি ভ্রাতৃ

বীর সৈন্যের সাজে;

যাপি বৃথা আলস্য ঘুমে

আর লুণ্ঠিত না রব ভূমে,

সম-আসন লব করমে

জগত-জাতির মাঝে।

(কোরাস) ঐ আহ্বান-গীতিবাজে, ইত্যাদি।’

‘রণসংগীত’ নামে স্বর্ণকুমারী দেবী আরেকটি গান প্রকাশ করেন ভারতী পত্রিকার ১৩২৬ সালের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায়। এটি ছিল ‘মিশ্র শঙ্করা - একতাল’ সুরে। সুর ও স্বরলিপি রচনা করেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪৯-১৯২৫)। গানের চারটি পঙিক্ত ছিল, এর দ্বিতীয় ও তৃতীয় পঙিক্ত নিচে দেওয়া হলো:

(২)

‘অন্ধ নয়ন গেছে খুলি, রণের মাঝে কোলাকুলি

মরণ আগে ভ্রাতৃবরণ, পূণ্য শপথ বলব—

কোরাস - জয় জয় জয় আর কি শঙ্কা, বেজেছে ঐ অভয় ডঙ্কা,

সমরে আজ অমর হয়ে বিজয়ধ্বনি তুলব।’

(৩)

‘রক্তে লব প্রেমের টিকা, বুকে জ্বালব ক্ষেমের শিখা,

স্বদেশ বিদেশ ন্যায়ের দ্বারে এক ক’রে ভাই ফেলব।

কোরাস - জয় জয় আর কি শঙ্কা, বেজেছে ঐ অভয় ডঙ্কা

সমরে আজ অমর হয়ে বিজয়ধ্বনি তুলব।’

স্বর্ণকুমারী দেবী ‘রণসংগীত’ শিরোনামে আরও একটি গান রচনা করেন, যা ভারতী পত্রিকার ১৩২৬ সালের শ্রাবণ সংখ্যায় প্রকাশ পায়। এর সুর ও স্বরলিপি রচনা করেন ইন্দিরা দেবী (১৮৭৯-১৯২২)। তিন পঙিক্তর গানের শেষ পঙিক্ততে উল্লেখ ছিল:

‘তপ্ত রক্ত শিরায় জাগে, নামরে কূলে,

চলরে আগে,

দাড়াই গিয়ে পুরোভাগে,—অরির প্রতাপ হবি।

ধন্য হোক তুচ্ছ জীবন, —ধন্য মানি স্তন্য গ্রহণ

জয়সমুদ্রে পার হব ভাই —ধর্ম্মরাজে স্মরি।

কোরাস

জয় জয় জয় জয় বল বল হো—

দিগ সীমান্তে চল চল হো—

গাও জয়, রণ জয়, গগন ভরি—

আমরা ‘তুফানে কি ভড়ি।’

এ ছাড়া স্বর্ণকুমারী দেবী বাংলা ১৩২৪ সনের আষাঢ় সংখ্যা ভারতীতে একজন বাঙালি সেনার লেখা ব্যঙ্গ কবিতা সম্পর্কে আলোচনা করেন। কবিতাটি সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেন, ‘ইহা ছন্দে বন্ধে নির্দ্দোষ নহে, ভাষা লালিত্যেও অপরুপ নহে, তথাপি ইহার ছত্রে ছত্রে যে একটি হাস্য কৌতুক নিহিত আছে তাহা অতি মনোরম এবং ইহার বর্ণনাও অতি উপাদেয়।’

সরলাদেবী চৌধুরাণী (১৮৭২-১৯৪০)

সরলাদেবী ১৮৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতার জোড়াসাঁকোতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম জানকীনাথ ঘোষাল। বাংলার নারীরা বাঙালি পল্টন গঠনের বেশ আগেও বাঙালি তরুণদের শৌর্যবীর্য এবং শক্তি ও সাহস জাগিয়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। সরলাদেবী এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। বিশ শতকের প্রারম্ভে ভারতী পত্রিকায় এ বিষয়ে তিনি বেশ কিছু রচনা প্রকাশ করেছিলেন। সরলাদেবী ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বাঙালি তরুণদের মধ্যে বীরপূজা, বীরের নামে উত্সব ইত্যাদি কর্মকাণ্ড শুরু করেন। উত্সবে বাঙালি তরুণেরা তলোয়ার খেলা, কুস্তি, বক্সিং ইত্যাদি যুদ্ধন্যায় ক্রীড়ার চর্চা করতেন। সরলাদেবী বাঙালি বীরদের নিয়ে ছোট ছোট পুস্তিকাও প্রকাশ করেন। সরলাদেবীর এ সমস্ত কর্মকাণ্ডকে কেউ কেউ ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে তত্পরতা মনে করতেন। সরলাদেবীর মামা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এ সমস্ত উদ্যোগকে  সন্দেহের চোখে দেখতেন এবং বিরোধিতা করতেন। জীবনের ঝরা পাতা সরলাদেবীর বিবাহপূর্ব জীবনের (১৯০৫ সাল পর্যন্ত) স্মৃতিকথা। এই বই-এ সরলাদেবী বাঙালি তরুণদের শৌর্যবীর্য জাগিয়ে তোলার জন্য কী কী করেছিলেন, তার বর্ণনা পাওয়া যায়।

বাঙালি পল্টনে সেনা ভর্তির জন্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে উদ্দীপনামূলক সভার আয়োজন করা হতো। এই সভায় দেশের নামকরা নেতারা বক্তৃতা দিতেন। নারীরাও এ ধরনের সভায় তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতেন। এ প্রসঙ্গে সরলাদেবী সবচেয়ে এগিয়ে ছিলেন। তিনি লাহোরে থাকতেন এবং সেখান থেকে ১৯১৮ সালের প্রথম দিকে দু-তিন মাসের জন্য বাংলায় আসেন। এখানে অবস্থানকালে তিনি বাঙালি পল্টনে যোগদানের জন্য তরুণদের এবং তাঁদের অভিভাবকদের উদ্বুদ্ধ করতে কলকাতা, চট্টগ্রাম, হুগলি, কাশীপুর প্রভৃতি এলাকায় সভা করে বক্তৃতা দেন। এসব বক্তৃতার কিছু উদ্ধৃতাংশ নিচে দেওয়া হলো:

‘আজ তোমাদের বীরত্বে উত্তেজনা দিতে এখানকার [হুগলীর] ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের দ্বারা এ সভা আহূত হয়েছে। ডাক্তার মল্লিক প্রভৃতি উদ্যোগীরা তোমাদের যুদ্ধক্ষেত্রে আহ্বান করতে এসেছেন এবং আমার মুখ দিয়ে সেই আহ্বানবাণী উচ্চারিত করার জন্য আমাকে নিয়ে এসেছেন। কেন? কারণ আমার আহ্বান আজ হঠাত্ আহ্বান নয়। যতদিন আমার জ্ঞানবুদ্ধি বিকশিত হয়েছে ততদিন থেকে আমি তোমাদের আহ্বান করছি। আর সে আমারও আহ্বান নয়। আমার দ্বারা চিত্রূপিনী জগজ্জননী শক্তির আহ্বান। যিনি অখিলের আত্মা, সত্-অসত্ যা-কিছুর মধ্যে যে শক্তি তা যিনি, সেই শক্তির শক্তি মহাশক্তি বাঙ্গালী জাতিকে আমার ক্ষুদ্র কণ্ঠ দিয়ে আহ্বান করছেন।’ [ভারতী: চৈত্র ১৩২৪. পৃ. ১১৩৮ ও ১১৩৯]। ‘বাঙ্গালীর ধড়ে বীরত্ব নেই বাঙ্গালীর শরীরে সাহস নেই, বাঙ্গালীর প্রাণে কষ্ট সহিষ্ণুতা নেই, বাঙ্গালীর আত্মমর্য্যাদা নেই, আত্মসম্মান বোধ নেই এ কলঙ্ক স্খলন কর।’ [ভারতী: বৈশাখ ১৩২৫. পৃ. ৯০]। ‘মেকলে থেকে আরম্ভ করে সব ইংরেজই বাঙ্গালীকে বুলি পড়িয়ে আসছেন—“বাঙ্গালী ঝুটো, বাঙ্গালী নগণ্য, বাঙ্গালী মূল্যহীন”—এত বছরের বুলি পড়েও বাঙ্গালী বল্লে—“না বাঙ্গালী সাচ্চা, বাঙ্গালী সোনা, আগুনে পুড়িয়ে দেখ”। চট্টগ্রামের বাঙ্গালী, তোমাদের মধ্যে সেই কথা বলবে কে, কে আগুনে পুড়তে সাহস করবে?’২৯

১৯১৮ সালের ২ মার্চ কলকাতা কলেজ স্কয়ারে জে জি কেসির সভাপতিত্বে একটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কুমার মনিন্দ্র, কর্নেল বুডিয়ার, পণ্ডিত রামেন্দ্রভূষণ, ডা. মল্লিকসহ আরও কেউ কেউ বক্তব্য দেন। সরলাদেবীও এই সভায় উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি তরুণদের বাঙালি পল্টনে যোগদানের জন্য আবেগপ্রবণ ভাষণ দেন। তিনি বলেন:

‘Where are the youths of our nation? Let them come forward. Let them think of the day when their ideals will change, so that a Deputy Magistrate or an Engineer or a lawyer will be less in popular-esteem than a Lieutenant, or Captain, or Colonel, or General. They wanted University medals, why do they not try for a Victoria Cross. The University must not be the all and end all of life. Mother Bengal was calling on them to come forward.’৩০

 

বাঙালি পল্টনে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করার বিষয়ে সরলাদেবীর ভূমিকার প্রশংসা করে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার তাঁকে একটি পত্র দেন। পত্রের অংশবিশেষ নিচে দেওয়া হলো:

You [Sarala Devi] have asked me to say what you did to help recruiting in my Division, your services to the cause in Bengal have already been commended by Sir Charles Monro in his Dispatch, I add to that by saying that you re-kindled the enthusiasm when our endeavors had failed and popular feeling had subsided, your speeches drew the attention of the Mohammedans who were so long keeping away and your earnestness fervor brought fresh life to the movement and really increased the rates of recruiting in Chittagong Division, Sitakund and Agartola.
We had been supplying a large number of non-combatants but on combatant recruits were very few and after you came that we succeeded in inducing the lower classes, particularly the Mohammedans to join the combatants ranks. This was to a great extent due to your effects and we are all deeply grateful to you. ... K C De.’৩১

 

১৯১৬ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বাঙালি পল্টনে যোগ দেওয়া সেনাদের প্রশিক্ষণ নওশেরায় (বর্তমানে পাকিস্তানের অংশ) হতো। সেনাদের লাহোর হয়ে নওশেরায় যেতে হতো। সরলাদেবী বিবাহসূত্রে লাহোরে থাকতেন। সরলাদেবী নিয়মিতভাবে লাহোর রেলস্টেশনে বাঙালি সেনাদের অভ্যর্থনা জানাতেন। অনেক সেনাই সরলাদেবীর এই বদান্য তাঁদের স্মৃতিচারণায় উল্লেখ করেছেন। পল্টনের সেনা সুবেদার ফণীভূষণ দত্ত সরলাদেবীর আতিথেয়তা সম্পর্কে উল্লেখ করেন:

‘লাহোরে শ্রদ্ধাস্পদা মাতৃস্থানীয় শ্রীমতী সরলা দেবীর আতিথ্য গ্রহণে আমরা পবিত্র ও ধন্য হই। সহস্র অসুবিধা সত্ত্বেও তিনি আমাদের জন্য স্টেশনে ধাবিত হইয়াছিলেন। আমাদের এই “লক্ষ্মীছড়া দলের” জন্য এই মূল্যহীন নগণ্য ক্ষুদ্র জীবগুলোর জন্য—তাহার অসীম অকৃত্রিম স্নেহের নিদর্শন পাইয়া পরম আপ্যায়িত ও আনন্দিত হইলাম—আমাদের জীবনগুলিকে সার্থক জ্ঞান করিতে লাগিলাম। তিনি আমাদের স্বহস্তে নানাবিধ ভোজদ্রব্য প্রস্তুত করিয়াই ক্ষান্ত হয়েন নাই—আমাদের পরিতোষ ও উত্সাহের নিমিত্ত রাতে ১০ ঘটিকার সময় স্বীয় পুত্রদ্বয়ের সহিত নিম্নোদ্ধৃত স্বরচিত সুললিত সঙ্গীতটি সুমধুর কণ্ঠে গান করিয়া আমাদিগকে চমত্কৃত করেন—

“বাঙ্গালী ডবল কোম্পানী”

খাম্বাজ-একতাল

(১)

‘কোন, রূপ সাগরে ডুব দিলিরে,

         বাঙ্গালী সেপাইরা!

তোদের দেখে চক্ষু জুড়ায়

        ওরে মানিক ভাইরা!

বাঙ্গালী সেপাইরা, আমার মানিক ভাইরা! ...

‘তাঁহার শুভাকাঙ্ক্ষা ও আশীর্ব্বাণী জীবনে কখনই ভুলিব না। তাঁহার বাণীগুলো প্রস্তরাঙ্কিত অক্ষরের ন্যায় আমাদিগকে সতত সত্যের আলোকে ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করিবে। তাঁহার উপদেশ, কর্তব্য শিক্ষা এবং বিপথগামী হইলে তাঁহারই আশীস, সুদৃঢ় বর্ম্মের মত আমাদিগকে প্রতিনিয়ত রক্ষা করিবে। ...

‘বলিতে ভুলিয়াছি, বোধহয় শ্রদ্ধাস্পদা সরলা দেবী মহাশয়া নিজে। “বাঙ্গালী ডবল কোম্পানী”র কল্যাণার্থে তিনবার আনন্দধ্বনি করেন। আমরাও অবনত মস্তকে তাহা গ্রহণ করিয়া তাঁহাকে যথারীতি সম্মান প্রদর্শনে ধন্য হই!’৩২

সরলাদেবীর রচিত ওপরে উল্লিখিত গানটিই সম্ভবত বাঙালি পল্টন গঠনের পর রচিত প্রথম গান। বাঙালি পল্টনের প্রথম দল যখন লাহোর হয়ে নওশেরায় যাচ্ছিল, তখন তিনি তাঁর রচিত গানটি গেয়ে শোনান। পরবর্তী সময়ে পল্টনের যত দল এ পথে নওশেরায় গিয়েছিল, তাদের সবাইকেই সরলাদেবী গানটি শুনিয়েছিলেন এবং এর নকল সরবরাহ করেছিলেন।

১৩২৪ সনের ফাল্গুন সংখ্যা ভারতী পত্রিকায় সরলাদেবী ‘যুদ্ধ গীতি’ নামের একটি গান স্বরলিপিসহ প্রকাশ করেন। গানটি ‘ঝিঁঝিট খাম্বাজ-কাওয়ালি’ সুরের। সরলাদেবী উল্লেখ করেছেন, মেসোপটেমিয়া থেকে বাঙালি সেনাদের অনুরোধে তিনি এই মার্চিং সঙ বা রণসংগীতটি রচনা করেন। গানের শেষ পঙিক্ততে রচয়িতা লিখেছেন,

‘মা ভৈঃ মা ভৈঃ রবে চল ছুটে সবে

আ হবে, আগে কে হবে!

বিজয় বা স্বরগের স্বাদ কেবা লবে

আ হবে, আগে কে হবে।

আমি সে, আমি সে, আমি, আমি, আমি

যেতে দে, আগে হতে দে।

রণরঙ্গে মার সঙ্গে হতে দে

আগে যেতে দে।

গরজে তোপ কামান মাঝে

জগ জননী সমর সাজে রে

                    না চে!

আজি নাচে!

ঐ নাচে

                রণ মাঝে।’

(বন্দে মাতরম)

 

বাঙালি পল্টন ভেঙে দিলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সঙ্গে আগ্রহী সেনারাও হতাশ হন। তাঁদের অনেকে মত প্রকাশ করেন, দু-একজন নেতা ব্যতীত অন্যদের অনুত্সাহের কারণেই বাঙালি পল্টন স্থায়িত্ব পায়নি। তাঁদের ধারণা হয়, সরলাদেবী বা এ ধরনের উদ্যোগীরা চেষ্টা করলে হয়তো বাঙালি পল্টন স্থায়িত্ব পেত। সুবেদার মনবাহাদুর উল্লেখ করেন, ‘বাঙালি রেজিমেন্ট গড়ে তুলতে হলে বর্ধমানের মহারাজা, মি. সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি ও ডাক্তার এস কে মল্লিকের মত উত্সাহী নেতা প্রয়োজন। আর একদিকে আরও প্রয়োজন পুজনীয়া শিশির কুমারী মল্লিক (মিসেস এস কে মল্লিক) ও সরলা দেবীর মত উত্সাহী কর্মী মাতা।’৩৩

উপসংহার

বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে বাঙালি নারীরা অন্তঃপুরবাসিনী হলেও যে মাঝেমধ্যে তাঁরা চৌহদ্দির বাইরে বের হননি বা হতে চাননি, তা নয়। বাঙালি পল্টনে নারীরা যে ভূমিকা রেখেছিলেন, তা আলোচ্য এ প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে। শহর ও গ্রামের নারী কিংবা বয়স্ক ও কম বয়স্ক নারী সবাই বাঙালি পল্টন গঠনে একত্র হন। বিশ শতকের প্রথম ভাগ বাঙালি সমাজ ভীষণভাবে পুরুষতান্ত্রিক হলেও, সমাজের ফাঁক গলে নারীরা মাঝেমধ্যেই হাজির হতেন জনসাধারণ্যে, ইতিহাসে তাঁদের অস্তিত্বের জানান দিতেন। বাঙালি পল্টনে নারীদের অবদান এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ইতিহাসের কর্তৃত্বশীল ধারা নারীদের এসব অবদানকে এর বিবরণে প্রায় জায়গা দেয়নি বললেই চলে। তাই বর্তমান প্রবন্ধে প্রায় বিস্মৃত এই ঘটনা বাংলার ইতিহাসতত্ত্বে যেন সামান্যতম হলেও একটু জায়গা পায়, সে চেষ্টা নেওয়া হয়েছে।

 

তথ্যসূত্র

১. Tanika Sarkar, Rebels, Wives, Saints: Desining Selves and Nation in Colonial Times (London: Segaul Books, 2009) AviI ˆ`Lyb Tanika Sarkar, Hindu Wife, Hindu Nation: Community, Religion and Cultural Nationalism (London: Hurst and Company, 2001).

২. Sugata Bose, ‘Nations as Mother: Representations and Contestations of India’ in Sugata Bose and Ayesha Jalal (eds.), Nationalism, Democracy and Development: State and Politics in India (New Deldhi: Oxford University Press, 1997), p. 154.

৩. Partha Chatterjee, `The Nationalist Resolution of the Women’s Question’ in Kumkum Sangari and Sudesh Vaid (eds.), Recasting Women: Essays in Colonial History (New Delhi: Kali for Women, 1989), pp. 233-253.

৪. Willem van Schendel, A History of Bangladesh (Cambridge: Cambridge University Press, 2009), p.34.

৫. The Englishman, 9 August, 1916.

৬. The Englishman, 11 September, 1916.

৭. The Englishman, 11 August, 1917.

৮. সুবেদার মনবাহাদুর সিংহ, সৈনিক বাঙালী (কলকাতা: মুখার্জি প্রেস, ১৯৪০), পৃ. ৭২-৩।

৯. সুবেদার ফণীভূষণ দত্ত, ‘আমার যুদ্ধ যাত্রা’ মালঞ্চ, মাঘ ১৩২৫, পৃ. ৭০৯।

১০. প্রবাসী, কার্ত্তিক ১৩২৩, পৃ. ১১।

১১. প্রবাসী, কার্ত্তিক ১৩২৩।

১২. The Englishman, 27 September, 1916.

১৩. The Englishman, 19 October, 1916.

১৪. The Hindoo Patriot, 29 December, 1916.

১৫. The Hindoo Patriot, 27 February, 1917.

১৬. The Englishman, 11 December 1917.

১৭. সিংহ, সৈনিক বাঙালী, পৃ. ১৬৭।

১৮. The Englishman, 27 February, 1918.

১৯. সিংহ, সৈনিক বাঙালী, পৃ. ২২৪-২২৬।

২০. ড. এস. এম. লুত্ফর রহমান, মেসোপটেমিয়ায় নজরুল (ঢাকা: ধরণী সাহিত্য সংসদ, ২০০৫), পৃ. ১৪৭।

২১. রহমান, মেসোপটেমিয়ায় নজরুল, পৃ. ১৪৬।

২২. সিংহ, সৈনিক বাঙালী, পৃ. ২৩৫।

২৩. The Hindoo Patriot, 17 March 1917.

২৪. The Hindoo Patriot, 9 June 1917.

২৫. মাহবুব-উল-আলম, পল্টন-জীবনের স্মৃতি (চট্টগ্রাম: জামানা পাবলিশার্স, ১৯৫৫), পৃ. ৩, ৫।

২৬. সিংহ, সৈনিক বাঙালী, পৃ. ১১০।

২৭. রহমান, মেসোপটেমিয়ায় নজরুল, পৃ. ৬২।

২৮. রায় সাহেব রাজেন্দ্রলাল আচার্য্য, বাঙ্গালীর বল (কলকাতা: স্টুডেন্টস লাইব্রেরী, ১৩৪৫), পৃ. ৫৯৪।

২৯. ভারতী, জৈষ্ঠ্যে ১৩২৫. পৃ. ১১৬, ১১৭।

৩০. The Englishman, 5 March 1918.

৩১. The Bengalee, 7 September 1919.

৩২. মালঞ্চ, মাঘ ১৩২৫ পৃ. ৭১০ ও ৭১১।

৩৩. সিংহ, সৈনিক বাঙালী, পৃ. ২৪১।

pathok

যোগাযোগের ঠিকানা

সিএ ভবন,
১০০ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,
কারওয়ান বাজার, ঢাকা - ১২১৫।

ফোন: ৮৮০-২-৮১১০০৮১, ৮১১৫৩০৭
ফ্যাক্স - ৮৮০-২-৯১৩০৪৯৬

protichinta kinte chile