protichinta

পাকিস্তান ও জিন্নাহ: গোড়ায় গলদ

হাসান ফেরদৌস

দি ইন্দাস সাগা অ্যান্ড দ্য মেকিং অব পাকিস্তান—আইতাজ আহসান \ সাউথ এশিয়া বুকস \ কলাম্বিয়া, ১৯৯৭

পাকিস্তান: বিটুইন মস্ক অ্যান্ড মিলিটারি—হুসেইন হাক্কানি \ কার্নেগি এন্ডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস্ \ নিউ ইয়র্ক, ২০০৫

মেকিং সেন্স অব পাকিস্তান—ফারজানা শেখ \ কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস \

নিউ ইয়র্ক ২০০৯

১.

পাকিস্তানের ইতিহাস নিয়ে সে দেশের পাঠ্যপুস্তকে বিস্তর মিথ্যাচার আছে, এ কোনো নতুন তথ্য নয়। একাধিক পাকিস্তানি গবেষক তথ্যপ্রমাণ হাতে নিয়ে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, ইতিহাসের নামে একটি সরকারি কল্পকাহিনি নির্মাণে সে দেশ তার জন্মের গোড়া থেকে কী বিপুল অর্থ, শ্রম ও কাষ্ঠখণ্ড ব্যয় করেছে। এই বিষয়ে সর্বাধিক পরিচিত গ্রন্থটি হলো অধ্যাপক কে কে আজিজের দ্য মার্ডার অব হিস্টরি: আ ক্রিটিক অব হিস্টরি টেক্সটবুকস ইউজ্ড ইন পাকিস্তান (২০০৪)। অধ্যাপক আয়েশা জালালেরও এ নিয়ে একাধিক বই রয়েছে। ‘বানানো ইতিহাস’ নামে ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত তাঁর একটি দীর্ঘ প্রবন্ধও স্মরণীয়। নিজের জন্য একটি সম্মানজনক আত্মপরিচয়—যার কেন্দ্রে রয়েছে ইসলাম ধর্মের সঙ্গে একাত্মতা—নির্মাণে সে দেশের সরকার এবং কোনো কোনো বুদ্ধিজীবীর সন্দেহজনক তত্পরতার বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনার জন্য লেখাটি গুরুত্বপূর্ণ। ভাষাবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তারিক রহমানও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন।

সরকার নিজে বা সরকারের প্রভাবাধীন লেখক-বুদ্ধিজীবীদের হাতে পাকিস্তানের ইতিহাস মুখ্যত একটি আদর্শগত প্রভাব-বলয় অনুসরণ করায় এর চরিত্র বহুলাংশে প্রচারণামূলক। এই প্রচারণানির্ভর ইতিহাসের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য, পাকিস্তান সৃষ্টির পেছনে ইসলাম ধর্মের ও জাতির জনক হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ‘মহান’ ভূমিকার গুণকীর্তন। ভারতীয় ‘হিন্দু’ রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রায় একা লড়াই করে ভারতবর্ষের মুসলমানদের জন্য জিন্নাহ পাকিস্তান ছিনিয়ে এনেছেন, এ ব্যাপারে অধিকাংশ পাকিস্তানিই সন্দেহশূন্য। তাদের চোখে জিন্নাহর পরিচয় ‘নব্য সালাদিন’ হিসেবে। আজকের পাকিস্তান যে এক জটিল সংকটাবর্তে নিক্ষিপ্ত, তার মুখ্য কারণ জিন্নাহ-প্রদর্শিত পথ থেকে পরবর্তী পাকিস্তানি নেতাদের বিচ্যুতি, এমন যুক্তিও তাঁরা হরহামেশা তুলে ধরেন। পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবী আরদেশির কোয়াসজি এই সেদিনও আক্ষেপ করে লিখেছেন, ‘আজকের পাকিস্তানের যে অবক্ষয়, তা রোধ এখনো সম্ভব যদি আমরা সেই মহান নেতা, যাঁর হাত দিয়ে আমাদের নির্মাণ, তাঁর দেখানো মতে ও পথে ফিরে যাই।’ (দ্য জিন্নাহ অ্যান্থলজি, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০১০)।

জিন্নাহর প্রতি এই স্তুতিবাদ গত কয়েক বছরে বদলাতে শুরু করেছে, শুরু হয়েছে তাঁর ভূমিকার বস্তুনিষ্ঠ ও নিরাবেগ মূল্যায়ন। একাধিক পাকিস্তানি লেখক দেশটির আজকের দুর্দশার কারণ খুঁজতে গিয়ে তার ইতিহাসের শিকড় ধরে টান দিয়েছেন, ফলে তার জনকের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তাঁরা এ কথাও বলছেন, গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকতা নির্মাণে পাকিস্তানের ব্যর্থতা, বিশেষত একদিকে ধর্ম-ব্যবসায়ী ও অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর হাতে তার জিম্মিদশা, এর পেছনে রয়েছে জিন্নাহ ও তাঁর সহকর্মীদের অদূরদর্শী রাজনীতি। ধর্মকে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে গিয়ে পাকিস্তান নামক দেশটিকে তাঁরা পেয়েছেন বটে, কিন্তু সে দেশ একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ এই সিলমোহর নিজের ভাগ্য-ললাট থেকে মুছে ফেলতে পারছে না। অন্তত দুটি বই—হুসেইন হাক্কানির পাকিস্তান: বিটুইন মস্ক অ্যান্ড মিলিটারি ও ফারজানা শেখের মেকিং সেন্স অব পাকিস্তান এ ব্যাপারে সবিশেষ উল্লেখের দাবিদার। এই দুই পাকিস্তানি লেখকের অন্যতম পূর্বসূরি আয়েশা জালাল তাঁর একাধিক গ্রন্থেও একই প্রশ্নের বিস্তারিত ও গভীর বিশ্লেষণাত্মক প্রস্তাবনার জন্য পাঠকের নজর কেড়েছেন। শুধু তফাত এই যে নিয়মনিষ্ঠ গবেষকের গাম্ভীর্য অনুসরণ করে জালাল কোনো রাজনৈতিক কমেন্টারি থেকে সযত্ন দূরত্ব বজায় রেখেছেন। তাঁর পাশে হাক্কানি ও ফারজানা উভয়েই তাঁদের প্রস্তাবনার উপসংহারে নির্মম ও প্রত্যক্ষ।

যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুসেইন হাক্কানি তাঁর বইপাকিস্তান: বিটুইন মস্ক অ্যান্ড মিলিটারি লেখার অনেক আগে থেকেই সুপরিচিত ও বিতর্কিত। একসময় তিনি জামায়াতে ইসলামীর প্রধান মওলানা মওদুদির ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন, পরে অবশ্য সেনা নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সমালোচনা করে ভিন্ন ক্যাম্পে চলে আসেন। তাঁর কলমের জোর টের পেয়ে বেনজির ভুট্টো থেকে নওয়াজ শরিফ (এবং সাম্প্রতিক সময়ে আসিফ আলী জারদারি) তাঁকে উপদেষ্টা হিসেবে নিজেদের ছাতার তলায় টেনে এনেছেন। জেনারেল মোশাররফের ক্ষমতা দখলের পর রাজনৈতিক নিপীড়নের ভয়ে আরও অনেকের মতো তিনিও দেশ ছেড়েছিলেন। সে সময় কার্নেগি এন্ডাউমেন্টের ফেলো ও বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপক হিসেবে তিনি বেশ কয়েক বছর কাটান। আমেরিকায় থাকার সময়ই হাক্কানি পাকিস্তানে ধর্মের রাজনৈতিকীকরণ ও সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি জার্নালে তাঁর সুপরিচিত থিসিসটি উত্থাপন করেন। পাকিস্তান: বিটুইন মস্ক অ্যান্ড মিলিটারি গ্রন্থটি সে থিসিসেরই এক পূর্ণাঙ্গ রূপ।

পাকিস্তানের রাজনীতিতে সে দেশের সেনা-গোয়েন্দা দপ্তর আইএসআইয়ের প্রভাব কমানোর লক্ষ্যে মার্কিন হস্তক্ষেপ চেয়ে একটি চিঠি লেখার অভিযোগে হাক্কানি সম্প্রতি নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছেন। একই অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে তাঁর চাকরিটিও খুইয়েছেন। একে তো সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কথা, তার ওপর আজকের পাকিস্তানের সব অপকর্মের শুরু সেই জিন্নাহর আমল থেকে, এমন কথা বলায় তোপের মুখে পড়েছেন একসময়ের জামায়াতপন্থী এই আপাত উদারনৈতিক লেখক-সাংবাদিক।

তাঁর বইয়ে হাক্কানি খুব নতুন কিছু বলে ফেলেছেন তা মোটেই নয়। পাকিস্তানি রাজনীতির সামরিকীকরণ নিয়ে সমসাময়িক তাঁর স্বদেশি আরও অনেকেই—যেমন হাসান আব্বাস, আহমেদ রশিদ ও আয়েশা সিদ্দিকা—মিঠে-কড়া বিস্তর লিখেছেন। তবে হাক্কানির বেলায় সাধুবাদ যে কারণে প্রাপ্য তা হলো, গত ৬০ বছরের ইতিহাসকে একটি তাত্ত্বিক কাঠামোর ভেতর রেখে বিষয়টি বিবেচনা করেছেন তিনি। পাকিস্তানের রাজনীতিতে কীভাবে ধর্ম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘লেজিটিমাইজিং এজেন্ট’ হয়ে ওঠে এবং তাকে ব্যবহার করে কীভাবে সেনাবাহিনী দেশের একমাত্র নির্ভরযোগ্য ‘স্টাবিলাইজিং এজেন্টে’ পরিণত হয়, এই বই বস্তুত তারই বিশদ বিবরণ।

অঙ্কটা খুবই সোজা। ১৯৪৭-এ যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়, ভাষাগত ও নৃতাত্ত্বিকভাবে বিভক্ত এই দেশের মানুষকে এক রাখে এমন একমাত্র প্রতীক ছিল ধর্ম—ইসলাম। বাঙালি, পাঞ্জাবি, বালুচ বা সিন্ধি, এরা প্রত্যেকে আলাদা জাতি। এরা দেখতে ভিন্ন, এদের ভাষা ভিন্ন, আচার-ব্যবহারেও এদের ভিন্নতা বিস্তর। এক পতাকার নিচে এক দেশের নাগরিক হিসেবে এদের একত্র করার জন্য দরকার ছিল যেকোনো এক বা একাধিক প্রতীক, যার প্রতি এরা প্রত্যেকে সমানভাবে অনুগত। খুঁজে পেতে দেখা গেল ওই এক ইসলাম ধর্ম ছাড়া আর কোনো কিছুতেই তাদের মধ্যে মিল নেই। তথাকথিত দ্বিজাতিতত্ত্বের মোদ্দা কথাই ছিল, ধর্মের দিক থেকে ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানেরা একটি স্বতন্ত্র জাতি, অতএব ভিন্ন রাষ্ট্র গঠনের পুরো অধিকার তাদের আছে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ থেকে জেনারেল মোশাররফ, প্রত্যেকেই ওই ধর্মকে ছাতা বানিয়ে পাকিস্তান নামক দেশটাকে এক রাখার চেষ্টা করেছেন।

ইসলাম যদি এই রাষ্ট্রের প্রধান খুঁটি হয়, তো ভারত-বিরোধিতা তার দুই নম্বর খুঁটি। প্রথম খুঁটিকে পোক্ত করার জন্যই প্রয়োজন পড়েছে দ্বিতীয় খুঁটিটির। যে যত ভারতবিরোধী (অর্থাত্ হিন্দুবিরোধী), মুসলমান হিসেবে তার ক্রেডেনশিয়াল তত পাক্কা হয়, এই যুক্তি মাথায় রেখে পাকিস্তানের সব রাজনীতিক কে কার চেয়ে অধিক ভারতবিরোধী, সে প্রতিযোগিতা চালিয়ে গেছেন। ইসলাম বিপন্ন, এ স্লোগান পাকিস্তানি রাজনীতিকেরা আগাগোড়াই দিয়ে এসেছেন। দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ভারত, সে যেকোনো সময় আক্রমণে প্রস্তুত। অতএব, ইসলামকে বাঁচাতে হলে ভারতকে রুখতে হবে। দেশের ভেতর যে এই যুক্তির বিরোধিতা করবে, তার কপালে তকমা জুটবে ভারতপন্থী। অতএব সে ইসলামবিরোধী এবং পাকিস্তানের অখণ্ডতার বিরোধী। গোড়ার দিকে পাকিস্তানি রাজনীতিকেরা ধরে নিয়েছিলেন, এই ফর্মুলায় তাঁদের পক্ষে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা কঠিন হবে না। কিন্তু সমস্যা হলো ‘বহির্গত হুমকি’ যদি রাজনৈতিক পাশা খেলায় প্রধান ঘুঁটি হয়, তাহলে যাঁরা সে হুমকি মোকাবিলায় জান বাজি রাখছেন, সেই সেনাকর্তারা রাজা-উজির না হয়ে রাজা-উজির হবেন কিনা অর্ধশিক্ষিত-অশিক্ষিত রাজনীতিক?

পোপের চেয়ে অধিক ধার্মিক হওয়ার চেষ্টা করলে তাতে কল্কে পাওয়া সহজ নয়।

শেষমেশ যে সেনা কর্মকর্তারা মখমলের কুর্সিখানা দখল করে বসেন, তার পেছনে নিজেদের সীমাহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষা তো ছিলই, তার সঙ্গে ছিল জাতীয় রাজনীতিকদের অদক্ষতা ও আপসকামিতা। এ ব্যাপারে যে দুজনকে হাক্কানি বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছেন, তাঁরা হলেন লিয়াকত আলী খান ও চৌধুরী মোহাম্মদ আলী। ১৯৪৯ সালে লিয়াকত আলীর নেতৃত্বে পাকিস্তান আইন পরিষদে যে তথাকথিত ‘অবজেকটিভ রেজল্যুশন’ গৃহীত হয়, তারই ফলে পাকিস্তানে ইসলাম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আসন গেড়ে বসে। এই ধারা অনুসারে এ কথা স্বীকৃত হয় যে, ইসলামবিরোধী কোনো আইন পাকিস্তানে গ্রহণযোগ্য হবে না। হুসেইন হাক্কানি ঠিকই বলেছেন, পাকিস্তানের ইসলামীকরণের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল এই অবজেকটিভ রেজল্যুশনের। কারণ এই রেজল্যুশনের মাধ্যমেই, কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক, তা নির্ধারণের দায়দায়িত্ব পাইকারি দরে ছেড়ে দেওয়া হয় অনির্বাচিত এমন একদল লোকের হাতে, যাদের গ্রহণযোগ্যতার প্রধান চিহ্ন ছিল কার দাড়ি কতটা দীর্ঘ।

এ ছাড়া অন্য আর যে তৃতীয় এবং সম্ভবত অধিক গুরুত্বপূর্ণ শক্তি রক্তচোষা জোঁকের মতো পাকিস্তানের পেছনে লেগে ছিল, তা হলো পশ্চিমা শক্তিসমূহের উসকানি। পশ্চিমা শক্তি মানে মুখ্যত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। একদিকে পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন, অন্যদিকে নিকট প্রাচ্যে সদ্য গজিয়ে ওঠা গণচীন—এই দুই কমিউনিস্ট রাষ্ট্রকে কাবু করতে পাকিস্তানকে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকেই নিয়ে ফেলে ওয়াশিংটন। স্বাধীনতার পরপর প্রথম কয়েক বছর কিঞ্চিত্ দোদুল্যমান থাকলেও এ কথা বুঝতে মার্কিন প্রশাসনের বেশি সময় লাগেনি যে ভারতের তথাকথিত জোটনিরপেক্ষ অবস্থানের পাশে পাকিস্তানই হবে তাদের তুরুপের তাস। এ কথা তারা খুব ভালো করেই জানত যে গণতন্ত্র ব্যাপারটা বড় গোলমেলে। জনগণকে যদি তাদের পছন্দমতো সরকার গঠন করতে দেওয়া হয়, তার ফল সব সময় মার্কিন স্বার্থের পক্ষে নাও যেতে পারে। অতএব সিদ্ধান্ত হলো, পাকিস্তানের মানুষের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য গণতন্ত্রের কথা মুখে বলা হবে বটে, সব চেষ্টা হবে প্রকৃত গণতন্ত্র যাতে আসন গেড়ে না বসতে পারে। আর এ কাজটা সবচেয়ে ভালোভাবে করতে পারে সেনাবাহিনী।

এতে পোয়াবারো হলো সেনাকর্তাদের। একদিকে তাঁরা মুখে ফেনা তুলে ফেললেন এ কথা বোঝাতে যে অদক্ষ ও দুর্নীতিবাজ বেসামরিক রাজনীতিকদের কাজ নয় ভারতকে রোখা ও ইসলাম বাঁচানো, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের কাছে তাঁরা নিজেদের হাজির করলেন সবচেয়ে অনুগত ও নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে। ইস্কান্দার মির্জা থেকে আইয়ুব খান, তারপর জিয়াউল হক এবং সবশেষে পারভেজ মোশাররফ, প্রত্যেকেই নিজেদের পাকিস্তানের একমাত্র ত্রাতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। সবাই ধর্মের টুপি-আচকান চাপালেও এই কাজটি অন্য সবার চেয়ে জেনারেল জিয়াই যে সবচেয়ে বেশি চতুরতার সঙ্গে পালন করেছেন, তাতেও কোনো ভুল নেই।

হাক্কানি কোনো রাখঢাক ছাড়াই এই বিশ্লেষণটি অনুসরণ করেছেন। তিনি লিখছেন:

পাকিস্তানের জন্মের শুরু থেকেই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব পাকিস্তানের আত্মপরিচয় সুদৃঢ় করতে ধর্মীয় অনুভূতির ওপর জোর দিয়ে এসেছে। পশ্চিমা সরকারসমূহের সমর্থনে ভারত-জুজুর বিরুদ্ধে দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতেও এই ধর্মকেই ব্যবহার করা হয়েছে। এই নেতারা সশস্ত্র ইসলামকে বাগে আনতে ধর্মকে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে তা যেন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না করে।

ইসলামি রাষ্ট্র পাকিস্তান যে ভারতীয় আক্রমণের সম্মুখীন, এই বিশ্বাস সে দেশের মানুষের মনে একদম গোড়া থেকেই বদ্ধমূল। হাক্কানি তাঁর বইয়ে দেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর করাচির ইংরেজি দৈনিক ডন-এর সম্পাদকীয় থেকে একটা উদ্ধৃতি দিয়েছেন। তাতে ডন জিন্নাহর উদ্দেশে আবেদন রাখে, ‘ভাত-কাপড় নয়, আমাদের জন্য বন্দুকের ব্যবস্থা করুন।’ জিন্নাহ সেই বন্দুকের ব্যবস্থা করতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। সে কথায় পরে আসছি। দেশের শাসনভার সামরিক কর্তাদের হাতে চলে যাক, জিন্নাহ তা কখনো চাননি। সারা জীবন তিনি ব্রিটিশ ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের পক্ষে আওয়াজ তুলেছেন। কিন্তু ক্ষমতার সব উত্স যদি বন্দুক বলেই সাব্যস্ত হয়, তাহলে সে বন্দুকের বাঁট যাঁর দখলে, ক্ষমতাও যে তাঁরই কবজায় থাকবে, এ তো স্বাভাবিক কথা।

২.

পাকিস্তানের জন্ম-ইতিহাস নিয়ে চলতি বিতর্কের অন্যতম অনুষঙ্গ দেশ বিভাগের পেছনে মুসলমানদের জন্য আলাদা আবাসভূমির দাবি নিয়ে জিন্নাহর ভূমিকা। সাবেক বিজেপি নেতা যশোবন্ত সিং জিন্নাহ: ইন্ডিয়া, পার্টিশন, ইনডিপেনডেন্স (অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০১০) নামে ঢাউস একখানি বই লিখে এ কথা বোঝাতে চেয়েছেন, ভারত বিভক্তির পেছনে জিন্নাহ ও তাঁর দ্বিজাতিতত্ত্ব নয়, সে সময়ের কংগ্রেসি নেতৃত্বের ব্যর্থতাই অধিক দায়ী।

যশোবন্ত বিশেষভাবে অভিযুক্ত করেছেন নেহরু ও বল্লভভাই প্যাটেলকে। গান্ধীকেও তিনি সমালোচনার বাইরে রাখেননি। ভারত ভেঙে পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য জিন্নাহকে আমরা অভিযুক্ত বা অভিষিক্ত করতে পারি, কিন্তু তিনি নিজে এভাবে দেশ ভাগ হোক তা চাননি, এই দাবি তুলে যশোবন্ত সিং ইঙ্গিত করেছেন, তত্কালীন কংগ্রেসি নেতৃত্বের অদক্ষতা ও অধৈর্য এবং নিজেদের বাইরে অন্য কারও সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগিতে অস্বীকৃতি শেষ পর্যন্ত জিন্নাহকে দেশ বিভাগের পথে ঠেলে দেয়। যশোবন্তের বক্তব্য অনুযায়ী, জিন্নাহ চেয়েছিলেন ভারতীয় কনফেডারেশনের ভেতর মুসলমান অধ্যুষিত রাজ্যসমূহে মুসলিম লিগের নেতৃত্বে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনসহ সরকার গঠনের অধিকার। ভারতীয় মুসলমানদের হয়ে একমাত্র তিনি এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লিগ কথা বলতে পারে, এই দাবিরও স্বীকৃতি চেয়েছিলেন জিন্নাহ।

পাকিস্তানের দাবি রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধার জন্য দর-কষাকষি ছাড়া আর কিছু নয়, এই যুক্তির সঙ্গে হাক্কানিও একমত। তিনি লিখেছেন, একটি দেশ কী করে চালাতে হয়, এ সম্বন্ধে মুসলিম লিগ নেতাদের কোনো ধারণাই ছিল না। বস্তুত তাঁরা নতুন দেশ নয়, নতুন দেশের দাবি তুলে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থা সৃষ্টির পাঁয়তারাতেই ছিলেন। মুসলমানরা যে একটি স্বতন্ত্র জাতি এবং তাদের জন্য স্বতন্ত্র দেশ গঠিত হওয়া উচিত, সে যুক্তি প্রথম তুলে ধরেন কবি ইকবাল, সে কথা উল্লেখ করে হাক্কানি যুক্তি দেখিয়েছেন, ভারতের হিন্দু জনসংখ্যার পাশে মুসলমানরা তাদের ‘ব্যতিক্রমী ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্রতা’র কারণে ভিন্ন জাতি হিসেবে স্বীকৃতির দাবিদার। কিন্তু ইকবাল বা জিন্নাহ কেউই সেই দাবির ভিত্তিতে মুসলমানদের জন্য একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাধীন দেশ গঠনের কথা বলেননি। মুসলমানদের জন্য আলাদা যে বাসভূমির কথা তাঁরা বলেছিলেন, তা ভারতের ভেতরই একটি ফেডারেল-ব্যবস্থায় সর্বভারতীয় ‘কনফেডারেশন’-এর অঙ্গরাজ্য হিসেবে টিকে থাকতে পারত। কিন্তু কংগ্রেস নেতৃত্ব কোনোভাবেই মুসলমানদের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে ক্ষমতা ভাগাভাগির এই ফর্মুলা মানতে প্রস্তুত ছিল না। ‘এই ব্যর্থতার ফলই হলো ভারত বিভক্তি ও পাকিস্তান সৃষ্টি’। জিন্নাহর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার বিবরণ দিতে গিয়ে হাক্কানি লিখেছেন, ‘(কংগ্রেসের প্রত্যাখ্যানের মুখে) যে কাজটা জিন্নাহ করতে সক্ষম হন তা হলো ভারতের মুসলিম নেতৃত্বকে তাদের অন্তর্বিভেদ সত্ত্বেও এক সূত্রে বাঁধা।’

তাঁর চূড়ান্ত লক্ষ্য কী, তা কিছুটা ধোঁয়াটে থাকলেও জিন্নাহ পাকিস্তানের দাবি তুলেছিলেন মূলত মুসলমানদের জন্য সমতাপূর্ণ ক্ষমতা ভোগের শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা আদায় করতে, এই যুক্তিটি পাকিস্তানি ঐতিহাসিক আয়েশা জালাল বেশ কয়েক বছর আগেই দিয়েছেন। নথিপত্র এনে যে প্রমাণপত্র তিনি দাখিল করেছেন, তা অনেকের কাছেই যুক্তিগ্রাহ্য বলে মনে হয়েছে। বস্তুত, দেশভাগ প্রশ্নে জিন্নাহর ভূমিকা নিয়ে সম্প্রতি যেসব পুনর্মূল্যায়ন হচ্ছে, জালালের একাধিক গ্রন্থের মধ্য দিয়েই তার সূচনা ঘটেছে, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।১

জালালের মোদ্দা যুক্তিটি এ রকম: জিন্নাহর লক্ষ্য ছিল অন্য কিছুর আগে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোর রাজনৈতিক অধিকারের স্বীকৃতি। সে স্বীকৃতি আদায়ের পর এসব প্রদেশ কনফেডারেশনের ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে, না নিজেরা স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করবে, সে প্রশ্নে দর-কষাকষি করা যাবে। মুসলিমপ্রধান প্রদেশগুলোয় মুসলিম লিগের প্রাধান্য প্রমাণ করা গেলেই জিন্নাহর পক্ষে কংগ্রেসের সঙ্গে এই প্রশ্নে বাদানুবাদ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু খুব স্পষ্টভাবে যদি সে চূড়ান্ত লক্ষ্য আগেভাগে নির্ধারিত হয়ে যায়, তাহলে সমস্যা দেখা দেবে। যেসব প্রদেশে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়, তাদের ভবিষ্যত্ নিয়ে জটিলতা দেখা দেবে, তাদের বাদ দিয়ে পাকিস্তান গঠিত হোক, তা তারা চাইবে না। এ অবস্থায় ভারতজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মুসলমানদের একসঙ্গে সম্মিলিত করার কোনো সুনির্দিষ্ট পথ তাঁর সামনে ছিল না। কোনো অভিন্ন আদর্শ বা আইডিওলজি ছিল না, যা তাঁদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। এই সংকট সম্যক উপলব্ধি করে জিন্নাহ ঠিক করলেন, ধর্মই হবে সেই সূত্র, যা তাঁদের গোষ্ঠীবদ্ধতার চেহারা দিতে সাহায্য করবে। জালালের কথায়, ‘ধর্ম জিন্নাহর জন্য কোনো আইডিওলজি ছিল না, এমনকি তা প্রতিদ্বন্দ্বী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য কোনো অস্ত্রও ছিল না। এ ছিল শুধু মুসলমানদের একত্র করার একটা পথ।’

জালালের এই তত্ত্ব পাকিস্তান ও ভারত উভয় দেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। পাকিস্তানে যারা ইসলাম ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান গঠনের পক্ষে, তারা এ কথা বিশ্বাস করে যে জিন্নাহ ইসলামকে একটি রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন। পাকিস্তানি লেখক আকবর আহমদের কথায়, জিন্নাহ ইতিহাসের নব্য সালাদিন, ভারতবর্ষের মুসলমানদের ধর্মের ভিত্তিতে এক রাষ্ট্রে একত্র করাই যাঁর লক্ষ্য। অন্যদিকে ভারতে যারা জিন্নাহকে একজন সাম্প্রদায়িক নেতা হিসেবে দেখতে আগ্রহী, তাদের কাছে ভারত বিভক্তি ও দেশভাগের সময়ে যে রক্তগঙ্গা বয়ে যায়, তার কারণ জিন্নাহ—শুধু ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের দাবি তিনিই তুলেছিলেন। ধর্মকে তুলে ধরার জন্য পাকিস্তানে জিন্নাহ যদি হন মহান নেতা, তো ভারতে একই কারণে তিনি দুষ্টগ্রহ।

তাঁর তত্ত্ব নিয়ে এই বাদানুবাদে জালাল নিজে খুশি হননি। পরে করাচির ডন পত্রিকায় কলাম লিখে বলতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁর মোদ্দা থিসিসটিই অনেকে ধরতে পারেননি। জাতি (নেশন) ও রাষ্ট্র (স্টেট), এই দুইয়ের মধ্যে যে তফাত রয়েছে, অনেকেই তা এড়িয়ে গেছেন। জালালের কথায়, ১৯৪০ সালের পর মুসলমানদের জাতি হিসেবে স্বীকৃতি নিয়ে আর কোনো বাদানুবাদে রাজি না হলেও জিন্নাহ স্বতন্ত্র ও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের প্রশ্নে আলাপ-আলোচনায় প্রস্তুত ছিলেন ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত। লাহোর প্রস্তাবের ঘনিষ্ঠ পাঠ থেকে এ কথা স্পষ্ট হয় যে জাতি হিসেবে স্বীকৃতির অর্থ ভারতের অপরাপর অংশ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ নয়। ‘১৯৩০ সালে মুসলিম লিগের এলাহাবাদ সম্মেলনে (কবি) ইকবালের ভাষণের পর থেকে মুসলমানদের পক্ষ থেকে একের পর এক বিকল্প প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়, যার মোদ্দা কথা ছিল ধর্মীয়ভাবে সংখ্যালঘু মুসলমানরা কীভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত থেকেও রাজনৈতিক ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নিতে পারে।’

সমস্যা হলো, জালালের থিসিসটি এই ভ্রান্ত প্রস্তাবনায় নির্মিত যে শুধু ধর্মের ভিত্তিতে কোনো একটি সম্প্রদায় নিজেদের জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দাবি করতে পারে। ভাষাগত ও অবস্থানগত নৈকট্য এবং ইতিহাস ও সংস্কৃতির অভিন্ন অন্তর্ভুক্তি ছাড়া জাতি এবং জাতিরাষ্ট্রের গঠন কার্যত অসম্ভব, ইতিহাসের এই শিক্ষা জিন্নাহ গ্রহণ করেননি। তার চেয়েও বড় ভুল, জাতি হিসেবে স্বীকৃতি অর্জিত হলে তার অনিবার্য পরিণতি রাজনৈতিক বিভক্তি, এই সাধারণ সত্যটুকু অনুধাবনে তাঁর অনাগ্রহ। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন উদাহরণের কমতি নেই, যেখানে বৃহত্ বা অধিক শক্তিশালী জাতি-গোষ্ঠীর নেতৃত্বে বহুজাতিক রাষ্ট্রব্যবস্থা স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু সর্বত্রই সে ব্যবস্থার পেছনে বর্ম হিসেবে কাজ করেছে ক্ষমতাশালী জাতিগোষ্ঠীর বাহুবল। যেই সেই বাহুবলে কমতি পড়েছে, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো একে একে সেই বহুজাতিক কাঠামো থেকে খসে পড়েছে। উদাহরণ হিসেবে খুব বেশি দূরে নয়, বিশ শতকের বলকান ও সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের দিকে তাকালেই সে কথা স্পষ্ট হবে। বাংলাদেশের উদাহরণ না হয় না-ই দিলাম।

জিন্নাহ মুসলমানদের জন্য একটি রাজনৈতিক আত্মপরিচয় নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন এবং ধর্মকে মুসলমানদের সাধারণ স্বার্থ সমুন্নত করতে ব্যবহারে আগ্রহী ছিলেন, জালালের এই মোদ্দা থিসিসটিও কম গোলমেলে নয়। জালাল নিজেই কার্যত এ কথা স্বীকার করে নিয়েছেন যে জিন্নাহর অন্যতম লক্ষ্য ছিল সব ভারতীয় মুসলমানের একমাত্র প্রতিনিধি—তাদের ‘সোল স্পোকসম্যান’—হিসেবে নিজের স্বীকৃতি আদায়। জালাল ও যশোবন্ত সিংহ উভয়েই বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন এই দাবিতে অটুট থাকার ফলে কীভাবে শেষ পর্যন্ত প্রথমে কংগ্রেস হাইকমান্ড এবং পরে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর (অর্থাত্ জিন্নাহর) দূরত্ব সৃষ্টি হয়। অথচ একমাত্র মুসলিম লিগ, এবং সে দলের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে, তিনি পারেন সব ভারতীয় মুসলমানের হয়ে কথা বলতে, এই দাবি কগ্রেসের পক্ষে কোনোভাবেই মানা সম্ভব ছিল না। ভারতীয় মুসলমানদের ভেতর লিগের সমর্থন খুবই সামান্য—১৯৩৭-এর নির্বাচনের ফল দেখে তেমন দাবি করা কংগ্রেসের পক্ষে কঠিন ছিল না। তা ছাড়া কংগ্রেস হাইকমান্ডে একাধিক মুসলমানের উপস্থিতি (যেমন মওলানা আবুল কালাম আজাদ) জিন্নাহর দাবিকে প্রত্যাখ্যান করতে সহায়তা করে।

জালালের (এবং হাক্কানির) ব্যাখ্যার অন্য আরেক সমস্যা, যে মুসলমান সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের জন্য জিন্নাহ ‘সোল স্পোকসম্যান’ হিসেবে নিজের স্বীকৃতি চাইছিলেন, তাদের সঠিক পরিচয়টি কী? রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় এমন মুসলমান সম্ভবত নিজেদের মধ্যে একটি অভিন্ন আত্মপরিচয় আবিষ্কারে সক্ষম ছিল। ভারতীয় হিন্দুদের অর্থনৈতিক উত্থানের বিপরীতে ক্রমেই পিছিয়ে পড়া মুসলমান নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখতে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে একধরনের বিভক্তির দেয়াল তোলা তাদের জন্য লাভজনক হবে বলে ভেবেছিল। কিন্তু এই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে অগ্রসর মুসলমানের সংখ্যা ছিল মোট ভারতীয় মুসলমানের অতি সামান্য এক অংশ। ফারজানা শেখ তাঁর মেকিং সেন্স অব পাকিস্তান গ্রন্থে এই ভুলটি উল্লেখ করে লিখেছেন, ভারতীয় মুসলমানরা যাঁরা নিজেদের ‘আশরাফ’ বলে বিবেচনা করতেন, কেবল তাঁরাই নিজেদের অভিন্ন রাজনৈতিক সম্প্রদায় কল্পনায় সক্ষম ছিলেন। জিন্নাহ নিজেকে যে মুসলমানদের মুখপাত্র বলে দাবি করছিলেন, তাঁরা মুখ্যত এই আশরাফ শ্রেণীভুক্ত। ১৯৪৫-৪৬-এর নির্বাচনে বাংলা ও পাঞ্জাবে মুসলিম লিগ—অথবা লিগের সঙ্গে আঁতাতবদ্ধ এমন দল—প্রথমবারের মতো মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত আসনসমূহের অধিকাংশ দখলে সক্ষম হয়। ধরা যাক, এই বিজয়ের মাধ্যমে জিন্নাহ—তথা মুসলিম লিগ—ভারতীয় মুসলমানদের মুখপাত্র হিসেবে দাবির যোগ্যতা অর্জন করলেন। কিন্তু ১৯৪৫-৪৬ সালে যে নির্বাচন হয়, তা ছিল সম্প্রদায়গতভাবে বিভক্ত এক নির্বাচনী-ব্যবস্থা। এই ‘সেপারেট ইলেক্টোরেট’ ব্যবস্থায় কেবল যে সম্প্রদায়গত বিভাজন ছিল, তা-ই নয়, যাঁরা ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন, তাঁদের একাধিক পূর্বনির্ধারিত শর্তপূরণের পরেই ভোট প্রদানের যোগ্যতা স্বীকৃত হয়। ফলে মোট মুসলমান জনসংখ্যার অতি ক্ষুদ্র এক অংশই সে নির্বাচনে অংশ নেয়। তাদের নির্বাচনী সিদ্ধান্তকে তাই মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বকারী বলে চালানোর চেষ্টা খুব যুক্তিযুক্ত নয়।

৩.

জিন্নাহকে নিয়ে আরেকটি বিতর্ক—তিনি কি খাঁটি মুসলমান, না ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিক? পাকিস্তান মুসলিম রাষ্ট্র, সে কথা দেশটির নামকরণে ও শাসনতন্ত্রে স্পষ্টভাবে নির্দেশিত আছে এবং এই রাষ্ট্রের আদর্শগত ভিত্তি ইসলাম, প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসে এ কথার যেমন দ্বিধাহীন স্বীকৃতি আছে, তেমন স্বীকৃতি রয়েছে সে আদর্শের শ্রেষ্ঠ মুখপাত্র হিসেবে জাতির জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নাম। কিন্তু যাঁরা পাকিস্তানকে শুধু একটি আইডিওলজিক্যাল রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চান না, অথবা একমাত্র ইসলামে তার রাষ্ট্রতান্ত্রিক যৌক্তিকতা নিহিত বলে মনে করেন না, তাঁরা জিন্নাহকে যতটা সম্ভব উদারনৈতিক এবং সেহেতু সেক্যুলার বলে প্রমাণে আত্মনিবেদিত।

এঁদেরই একজন পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান ‘পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল’ বলে পরিচিত আইতাজ আহসান। পাকিস্তান শুধু ধর্মভিত্তিক একটি দেশ নয়, এই রাষ্ট্র গঠনের পেছনে যেমন ভৌগোলিক সন্নিবিষ্টতা কাজ করে, তেমনি কাজ করে তার অভিন্ন সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, এই যুক্তি বগলে নিয়ে তিনি ২০০৫ সালে লিখেছিলেন দি ইন্দাস সাগা অ্যান্ড দ্য মেকিং অব পাকিস্তান নামে একটি বই। অধিকাংশ পাকিস্তানি লেখক, রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী যেখানে নিজেদের বৃহত্ ভারত থেকে সর্বতোভাবে বিযুক্ত করতে প্রাণান্ত, সেখানে আইতাজ এই যুক্তি দেখিয়েছেন যে আজ যাকে আমরা পাকিস্তান বলে জানি, সে প্রকৃতপক্ষে একটি অতি প্রাচীন ও ধনী ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ। ভৌগোলিক অর্থে সে ভারতীয়, তবে তার প্রধান পরিচয় ভারতীয় নয়, সে ‘সিন্ধুমানব’, যা গড়ে উঠেছে সিন্ধু নদ ও তার শাখাসমূহের অববাহিকায়। ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়েও সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন এই সিন্ধুমানবের ইতিহাস পাঁচ হাজার বছরেরও পুরোনো। এই সিন্ধু সভ্যতার বিপরীত হলো গাঙ্গেয় বদ্বীপভুক্ত সভ্যতা, যা বৃহত্তর ভারতীয় সভ্যতা বলে পরিচিত।

সিন্ধু সভ্যতার অন্তর্গত মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ধর্মাবলম্বী—হিন্দু, খ্রিষ্টান ও মুসলমান—হলেও সাংস্কৃতিকভাবে তারা পরস্পরের নিকটবর্তী, আইতাজের অভিনব থিসিসের এটি কেন্দ্রীয় বক্তব্য। তার চেয়েও বড় কথা, আইতাজ তাঁর সিন্ধু সভ্যতার সঙ্গে কোনোভাবে আরব বা মুসলিম সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে গুলিয়ে ফেলতে চান না। মধ্য এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব সীমানায় অবস্থিত এই সভ্যতা পারস্য সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত হলেও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত বরাবর ভারতীয় সভ্যতার সঙ্গে তার কোনো সরাসরি নির্ভরশীলতা ছিল না। এমনকি আরব সভ্যতা দ্বারাও সে প্রভাবিত হয়নি। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির মাধ্যমে এই সিন্ধু ও গাঙ্গেয় সভ্যতার ইতিহাসের নবায়ন করা হয় মাত্র। অর্জিত হয় তাদের ভিন্ন ভিন্ন অস্তিত্বের পুনঃস্বীকৃতি। আইতাজ আহসানের দাবি, এই যে সিন্ধুমানব, সে কেবল উদারনৈতিক, ভিন্নমতসহিষ্ণু ও একাধিক ধর্মীয় চেতনারই অঙ্গীভূত নয়, সে বৈদিক সভ্যতারও উত্তরাধিকারী। জিন্নাহ—পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা—তেমনই একজন সিন্ধুমানব। আইতাজ লিখছেন:

সিন্ধুমানব যে সভ্যতার উত্তরাধিকারী, তা আকবর বা অন্য কোনো রাজা-মহারাজার দান নয়, অথবা কোনো মৌলবাদী কূপমণ্ডূকতার প্রকাশ নয়। এ হচ্ছে এক গভীরভাবে কাব্যিক সভ্যতা, যা ধনী হয়েছে খসরু, হুসেইন, বাহু, বুল্লেহ, ওয়ারিস, লাতিফ, খুশাল, ইকবাল ও ফয়েজের হাতে। এই সভ্যতা সমৃদ্ধ হয়েছে এমন সব মানুষের কার্যকলাপে, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন রাসালু, জসরাত, সারাং, অর্জুন, দুললাহ, শাহ ইনায়েত, সাকার, খুশাল, আহমেদ খান খারাত, ভগত্ সিং এবং সর্বোপরি অতুলনীয় প্রগতিশীল ও আলোকিত মানুষ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।

বলাই বাহুল্য, আইতাজ আহসানের এই সিন্ধু সাগা তাঁর নিজ দেশের খুব কম লোকের কাছেই আদৃত হয়েছে। পাকিস্তানি মাত্রই ইসলামি ঐতিহ্যের অন্তর্গত, এই নির্ধারিত ঐতিহাসিক ন্যারেটিভের বাইরে তার অন্য কোনো পরিচয় থাকতে পারে, এমন সম্ভাবনা উত্থাপন করায় কেউ কেউ আইতাজের শিরশ্ছেদের প্রস্তাব করেছিলেন। আইতাজের প্রস্তাবিত সিন্ধুমানবের বিবরণে একটা বড় সমস্যা হলো, তিনি শুধু পাঞ্জাব ও অংশত দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের অন্তর্গত ভৌগোলিক সীমানা চিহ্ন নিয়ে তাঁর পছন্দের পাকিস্তান নির্মাণ করেছেন। এতে পূর্ববঙ্গের নাম সংযোজনের তো প্রশ্নই ওঠে না, এমনকি বেলুচিস্তানও তাঁর অঙ্কে নেই। হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো সভ্যতাকে কীভাবে বৃহত্তর ভারতীয় সভ্যতা ও ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে চিহ্নিত করা যায়, সে ব্যাখ্যাও সীমান্তের এপার বা ওপারের কোনো ইতিহাসবিদ যুক্তিসম্মত বলে রায় দেননি।

আইতাজ তাঁর এই সিন্ধুমানবের তাত্ত্বিক কাঠামোর ভিত্তিতেই জিন্নাহর রাজনৈতিক পরিচয় নির্ণয়ে আত্মনিয়োগ করেন। জিন্নাহ এবং তাঁর আদর্শগত পূর্বসূরি ইকবাল, একটি ধর্মভিত্তিক ইসলামিক রাষ্ট্র নয়, বরং ধর্মাচারী মুসলমান এমন মানুষের স্বার্থ রক্ষায় সহায়ক কিন্তু ভারত থেকে গঠনগতভাবে বিচ্ছিন্ন নয় এমন একটি বা একাধিক সার্বভৌম মুসলিম রাষ্ট্রের কথা ভেবেছিলেন, আইতাজের এই মোদ্দা বক্তব্যে কোনো মৌলিকতা নেই। জিন্নাহকে ‘সেক্যুলার’ প্রমাণে তাঁর চেষ্টাও তেমন অভিনব নয়। এই প্রস্তাবনার পক্ষে তাঁর সবচেয়ে স্মরণীয় চেষ্টাটি আমরা দেখি ১৯৯৮ সালে, ইসলামাবাদের ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজ কর্তৃক আয়োজিত একটি বিতর্কে। ‘পাকিস্তান: ধর্মনিরপেক্ষতা না ইসলাম’ এই বিষয়ে সে বিতর্কে আইতাজ এ কথা প্রমাণের চেষ্টা করেন যে রাষ্ট্রযন্ত্রের ইসলামীকরণ প্রকৃতপক্ষে জিন্নাহর স্বপ্নে দেখা পাকিস্তানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এ বক্তব্যের সপক্ষে তিনি জিন্নাহর কথার অসংখ্য উদ্ধৃতি দেন, যদিও তাঁর অধিকাংশই ১৯১৫ থেকে ১৯২৫ সালের মধ্যে দেওয়া, যখন জিন্নাহ হিন্দু-মুসলমানের মৈত্রীর দূত বলে অভিষিক্ত হয়েছিলেন।২

তাঁর বক্তব্য প্রমাণে আইতাজ দেশভাগের ঠিক আগে, ১১ আগস্ট ১৯৪৭ সালে, পাকিস্তান আইন পরিষদে জিন্নাহর বহু পরিচিত ভাষণটি ব্যবহার করেছেন। সে ভাষণে জিন্নাহ বললেন, পাকিস্তানি—তা মুসলমান, হিন্দু বা খ্রিষ্টান যে-ই হোক, সে তার ধর্মপরিচয়ে পরিচিত হবে না। আজ থেকে সবাই পাকিস্তানি। আইতাজ দাবি করেছেন, জিন্নাহর সে ভাষণ থেকেই স্পষ্ট, রাজনৈতিক কারণে এর আগে তিনি যে কথাই বলে থাকুন না কেন, স্বাধীন পাকিস্তানকে একটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত করার কোনো চিন্তাই তাঁর মাথায় ছিল না। পাকিস্তানের স্বাধীনতা অর্জিত হওয়ামাত্রই জিন্নাহ তাঁর ধর্মীয় বাগাড়ম্বর ছেড়ে সর্বধর্মসহিষ্ণু এক উদারনৈতিক পাকিস্তানের রূপরেখা তুলে ধরলেন।

আইতাজের এই বক্তব্য খণ্ডন করার দায়িত্ব পড়েছিল ড. ওয়াহিদ কুরেশির ওপর। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত জিন্নাহর সব ভাষণ তন্নতন্ন করে খুঁজে তিনি দেখান, জিন্নাহ কম করে হলেও ৯০ বার ইসলামের পক্ষে তাঁর বক্তব্য পেশ করেছেন। তাঁর দাবি অনুসারে, ১১ আগস্টের যে ভাষণটি আইতাজ আহসান উদ্ধৃত করেছেন, তা অসম্পূর্ণ। তা ছাড়া সে ভাষণ জিন্নাহ এমন এক সময় দিয়েছিলেন, যখন তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রোধ করা। দেশের হিন্দুদের আশ্বস্ত করতেই তিনি সে ভাষণ দিয়েছিলেন, এই মর্মে আবুল আলা মওদুদির একটি বিশ্লেষণ থেকেও উদ্ধৃতি দেন ড. কুরেশি। তিনি যুক্তি দেখান, জিন্নাহ ১১ আগস্ট কী বলেছিলেন তার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর নবগঠিত রাষ্ট্রের নীতিগত ভিত্তির বিষয়ে তাঁর অভিমত। এ ব্যাপারে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র মেলে ১১ অক্টোবর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশে এক ভাষণে। তাতে জিন্নাহ স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, একমাত্র ইসলামের বিধান অনুসারেই পাকিস্তান পরিচালিত হবে।

স্মরণ করা ভালো যে ১১ আগস্ট ১৯৪৭-এ যে ভাষণ জিন্নাহ দেন, উচ্চপর্যায়ের সরকারি হস্তক্ষেপে শুধু সেন্সরকৃত অংশটুকু প্রকাশিত হয়। নিজ দলের ভেতরই জিন্নাহ তাঁর সে বক্তব্যের জন্য সমালোচনা ও প্রতিবাদের সম্মুখীন হয়েছিলেন। সম্ভবত নিজের ভুল শোধরানোর জন্যই তাঁকে দুই মাস পর একই বিষয়ে ভিন্ন সুরে কথা বলতে হয়েছিল।

১১ আগস্টের ভাষণটি আইতাজ যে চেতনার বশবর্তী হয়ে ব্যবহার করেছেন, হাক্কানির ব্যবহার তার থেকে অভিন্ন নয়। তাঁর গ্রন্থে হাক্কানি এই ভাষণ থেকে দীর্ঘ উদ্ধৃতি দিয়ে এই টিপ্পনী যুক্ত করেছেন, পাকিস্তানের প্রতিটি সেক্যুলারপন্থী মানুষ জিন্নাহর সে ভাষণ থেকে এই যুক্তি আহরণের চেষ্টা করে থাকে যে পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা একটি ‘সেক্যুলার স্টেট’ গঠনেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন। অন্যত্র হাক্কানি অবশ্য কবুল করেছেন, দেশভাগের পর নিজের মত ও পথ পরিবর্তনের চেষ্টা করলেও যে ধর্মীয় উন্মাদনার ছত্রতলে পাকিস্তান আন্দোলন বাস্তবায়িত হয়, সে উন্মাদনায় সৃষ্ট সড়ক থেকে সরে আসা জিন্নাহ অথবা অন্য কোনো পাকিস্তানি নেতার পক্ষে সম্ভব হয়নি। হাক্কানি লিখেছেন, মুসলমানদের মধ্যে সমর্থন জোরদার করতে জিন্নাহ ও তাঁর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লিগ কোনো রাখঢাক ছাড়াই ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক মনোভাবের প্রতি আবেদন জানানো শুরু করেন। ‘জিন্নাহ ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের অধিকাংশই ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাবাপন্ন হলেও ১৯৪৫-৪৬ সালে তাঁদের রাজনৈতিক আন্দোলন পুরোপুরি ইসলামিক বাগ্মিতার ওপর নির্ভরশীল ছিল।’ এই সময় মুসলিম লিগের বিরোধিতায় কংগ্রেসের তরফ থেকে উদারপন্থী জামিয়াত-এ-উলামাদের কাজে নামানো হয় পাকিস্তান দাবির অসারতা প্রমাণে। তার জবাবে মুসলিম লিগও নিজেদের ধর্মগুরুদের মাঠে নামাল। একদিকে রাজনৈতিক নেতাদের ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতি, অন্যদিকে ধর্মগুরুদের একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করার আহ্বান—এই দুই মিলে যা দাঁড়াল, তার ফলে পাকিস্তান ও ইসলাম একদম একার্থবোধক হয়ে পড়ল। সাধারণ ভারতীয় মুসলমান, যারা পাকিস্তানের পক্ষে আওয়াজ তুলেছিল, তারা যে ইসলামের পক্ষেই ঝান্ডা তুলে ধরেছে, এ ব্যাপারে তাদের নিজেদের মধ্যে কোনো সংশয় ছিল না।

ধর্ম ও রাজনীতির এই মিশ্রণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি জিন্নাহ। তিনি যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মকে যথেচ্ছ ব্যবহারে প্রস্তুত, সম্ভবত অনিচ্ছাকৃতভাবে, তার প্রমাণ হিসেবে হাক্কানি দুটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংযোজন করেছেন। প্রথমটি, মানকা শরিফের পীরের কাছে লেখা জিন্নাহর একটি চিঠি; অপরটি সে সময়ের রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী একজন পাকিস্তানি কূটনীতিকের ব্যক্তিগত সাক্ষ্যভাষ্য। ১৯৪৫ সালের নভেম্বরে লেখা সে চিঠিতে জিন্নাহ মানকা শরিফের পীর সাহেবের কাছে এই প্রতিশ্রুতি দেন যে, ‘পাকিস্তানের আইন পরিষদ—যেখানে স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানদের প্রাধান্য থাকবে—ইসলাম ও শরিয়াবিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন করবে না।’

প্রায় একই সময়ে পাঠান উপজাতি সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া একটি ভাষণে জিন্নাহ বলেন, ‘পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন জানানো মুসলমানদের কর্তব্য। সে কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হলে আপনারা শূদ্রে পরিণত হবেন, ভারতের মাটি থেকে ইসলাম চিরদিনের মতো নিশ্চিহ্ন হবে। মুসলমানরা হিন্দুদের দাসে পরিণত হবে, এ আমি কিছুতেই হতে দেব না।’

পাকিস্তানি কূটনীতিকের কথা উদ্ধৃত করে হাক্কানি জানিয়েছেন, রাজনৈতিক প্রচারণায় যে ধর্ম ও ধর্মীয় চেতনা ব্যবহূত হচ্ছে, এ কথা জিন্নাহ খুব ভালো করেই জানতেন। এ কথায় কোনো ভুল নেই যে সে সময় পাকিস্তানের সমর্থকেরা ইসলাম ছাড়া আর অন্য কোনো ভাষায় এ নতুন রাষ্ট্রের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যায় সক্ষম ছিল না। পাকিস্তান তাদের কাছে ছিল ‘ইসলামের সূতিকাগার, ইসলামের দুর্গ’।

দেশভাগের আগে পাকিস্তানের পক্ষে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, তা যে সম্পূর্ণ ধর্মীয় ছিল, হাক্কানির এই ব্যাখ্যায় আমাদের দ্বিমত পোষণের কোনো কারণ নেই। সমস্যা বাধল দেশভাগের পর। যারা পাকিস্তানে রাজনৈতিক ক্ষমতা ভোগ করবে ভেবেছিল, তাদের পক্ষে সাধারণ নাগরিকদের চাহিদা অনুযায়ী ‘ইসলাম’ সরবরাহ করা অসম্ভব ছিল। ফলে, এই কাজে যাঁরা অধিক দক্ষ ও পেশাদার, অর্থাত্ ধর্মব্যবসায়ী ওলামা, তাঁরা খুব সহজেই রাজনৈতিক হর্তা-কর্তাদের নিজেদের হাতের থাবার নিচে নিয়ে আসেন, অথবা নিজেরাই রাজনৈতিক নেতা বনে বসেন। উদাহরণ হিসেবে মওলানা মওদুদি ও তাঁর জামায়াতে ইসলামীর কথা বলা যায়। মওদুদি পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধিতা করেন এবং জিন্নাহসহ অধিকাংশ মুসলিম লিগ নেতাকে কাফের বলে মুণ্ডুপাত করেন। দেশভাগের পর অবশ্য পরিস্থিতি বদলে যায়। রাজনৈতিক ‘লেজিটিমেসি’ আদায়ের লক্ষ্যে রাজনীতিকেরা যে ভাষায় কথা বলা শুরু করেন, তাতে ভোল পাল্টানো মওদুদির ভাষারই অনুরণন ছিল। মওদুদি জামায়াতের যে নতুন স্লোগান নির্বাচন করেন, তাঁর মোদ্দা কথা ছিল এই রকম: পাকিস্তান আল্লাহর দান। একমাত্র আল্লাহর আইন এই দেশে বলবত্ থাকবে। শুধু ধার্মিকভাবে যারা শুদ্ধ (অর্থাত্ ওলামারা) তারাই এ দেশের ক্ষমতা পরিচালনায় নেতৃত্ব দেবে। মওদুদি বা জামায়াতকে ঘৃণা করলেও পাকিস্তানি নেতাদের পক্ষে তাঁর বাগ্মিতাকে উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। ফলে, নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের কারণে নিজেরাই ক্রমেই মওদুদির ভাষায় কথা বলা শুরু করেন।

এখানে আমরা এ কথা যুক্ত করতে পারি যে রাজনৈতিক জীবনের প্রথম পর্বে জিন্নাহ হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের পক্ষে জোরালো বক্তব্য তুলে ধরেন। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত হিসেবেই তিনি ভারতীয় কংগ্রেসের রাজনীতিতে একজন প্রথম সারির নেতা হয়ে ওঠেন। কিন্তু তা ছিল মহাত্মা গান্ধীর ভারত প্রত্যাবর্তন ও কংগ্রেসের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশের আগে। পরিণত গান্ধী ও নবীন নেহরু যেভাবে কংগ্রেসকে তাঁদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন, তাতে জিন্নাহ কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েন। তা ছাড়া ইংরেজদের সঙ্গে প্রতিরোধ আন্দোলনের যে নতুন মানচিত্র গান্ধী ও তাঁর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস অনুসরণ শুরু করে, জিন্নাহ তাকেও স্বাগত জানাতে পারেননি। তিনি ব্রিটেনের সঙ্গে সলাপরামর্শের ভিত্তিতে আপসমূলক রাজনীতি, তাঁর ভাষায় ‘শাসনতান্ত্রিক’ আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন। একদিকে গান্ধীর নেতৃত্বে গণ-আন্দোলন, অন্যদিকে ধর্মীয় চেতনাভিত্তিক খেলাফত আন্দোলনকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একটি প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহারে গান্ধীর চেষ্টা জিন্নাহকে সর্বভারতীয় রাজনীতির ভিন্ন বলয়ে ঠেলে দেয়। একই সময় মুসলিমপ্রধান রাজ্যগুলোতে আঞ্চলিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমান্তরাল উত্থান মুসলিম লিগকে একটি সর্বভারতীয় দল হিসেবে কার্যত গুরুত্বহীন করে তোলে। ১৯১৯ সালের ভারত আইন সংস্কারের মাধ্যমে আঞ্চলিক পর্যায়ে যে নয়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু হয়, তাতে কেন্দ্রীয় নয়, আঞ্চলিক নেতাদের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। শুধু তা-ই নয়, নিজেদের অবস্থান পোক্ত করার লক্ষ্যে এসব প্রাদেশিক নেতার মধ্যে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে অগ্রাহ্য করার একটি প্রবণতাও গড়ে ওঠে। পাঞ্জাব ও বাংলায়, যেখানে সংখ্যাধিক্যের কারণে মুসলিম প্রাদেশিক নেতৃত্ব প্রশাসনিক দায়িত্বভার গ্রহণের সুযোগ পায়, তাদের মধ্যে এই প্রবণতা ছিল খুবই স্পষ্ট। জিন্নাহ যে ভারতীয় রাজনীতি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে আইন ব্যবসায় পুরোমাত্রায় মনোনিবেশের লক্ষ্যে ইংল্যান্ডে ফিরে যান, তার পেছনে এসব কার্যকারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই সময়ের ইতিহাসের পাঠ আরেকটি সম্ভাবনার প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মুসলিম লিগের নেতাদের সনির্বন্ধ অনুরোধে অনেকটা বাধ্য হয়েই ১৯৩৫ সালে যখন জিন্নাহ এই দলের কান্ডারি হয়ে ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন, তত দিনে তিনি এই বিষয়ে সন্দেহশূন্য যে গান্ধী-নেহরু-প্যাটেলদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সর্বভারতীয় মঞ্চে রাজনৈতিক নেতৃত্ব অর্জন করতে হলে তাঁকে ভিন্ন পথ অনুসরণ করতে হবে। ধর্ম ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ছিল এই প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জনে তাঁর টিকিট। এই উপলব্ধি থেকেই জিন্নাহ খুব পরিকল্পিতভাবে ধর্মকে তাঁর রাজনীতির অঙ্গীভূত করে ফেলেন। এই রাজনৈতিক রণকৌশলের পরিণতিই ছিল ১৯৪০ সালের পকিস্তান প্রস্তাব।

তাঁদের সমালোচনাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি সত্ত্বেও আলোচ্য পাকিস্তানি লেখকেরা যুক্তি দেখিয়েছেন, জিন্নাহ সচেতনভাবেই হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক ক্ষমতার সমান ভাগাভাগির দাবিটি তুলেছিলেন, কিন্তু সে দাবির পেছনে তাঁর কোনো গোপন চক্রান্ত বা দুরভিসন্ধি ছিল না। তাঁদের এই যুক্তি মেনে নিলেও এ কথায় কোনো ভুল থাকে না যে ভারতীয় হিসেবে হিন্দু-মুসলমান ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের অভিন্নতা নির্দেশের বদলে তাদের ভিন্নতা প্রমাণে জিন্নাহ ও মুসলিম লিগের একরোখা চেষ্টার ফল কেবল দেশ ভাগ নয়, হিন্দু ও মুসলমান—এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে রক্তাক্ত সংঘর্ষ। ধর্মীয় অর্থে ভিন্নতা সত্ত্বেও তাঁদের ঐক্যবদ্ধ করে, ভারতীয় নাগরিক সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন উপাদানের অভাব ছিল না। হাজার বছর ধরে যারা প্রতিবেশী হিসেবে বসবাস করেছে, তাদের মধ্যে ভিন্নতার চেয়ে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐক্য খুঁজে পাওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু ঔপনিবেশিক প্রভু ইংরেজদের দেখানো পথ ধরে তাদের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে নিকটবর্তী মুসলিম নেতারা হিন্দু-মুসলমানের নৈকট্য খোঁজার বদলে তাদের কীভাবে বিভক্ত রাখা যায়, তার অনুসন্ধানেই অধিক আগ্রহী ছিলেন।

ভারতীয় লেখক রফিক জাকারিয়া তাঁর দ্য প্রাইস অব পার্টিশন (ভারতীয় বিদ্যাভবন, ১৯৯৮) গ্রন্থে এই রাজনৈতিক পাঁয়তারার পরিণতির দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে লিখেছেন—বস্তুত, বিভক্তির প্রতি অনড় থেকে, সব মুসলিমের পক্ষে তিনি একাই কথা বলবেন, এই দাবিতে অবিচল থেকে জিন্নাহই দেশভাগের প্রশ্নটি অনিবার্য করে তোলেন। নেহরুকে তিনি ধমকের সুরে বলেছিলেন, ‘আপনি নিজের মানুষ (অর্থাত্ হিন্দুদের) নিয়ে কথা বলুন। আমি আমার মানুষের হয়ে কথা বলব।’ বিভেদের রাজনীতির পরিণতি শুভ নয়, এ কথা জিন্নাহ জানতেন না, তা হতে পারে না। তবে তিনি হয়তো এই আশা পোষণ করে থাকবেন যে চূড়ান্ত বিপর্যয় ঘটার আগে ইংরেজরাজ তাঁকে উদ্ধারে এগিয়ে আসবেন। জাকারিয়া লিখেছেন, ‘দাবার বোর্ডে বিপজ্জনক ঘুঁটি চালাতে জিন্নাহ অভ্যস্ত ছিলেন। কিন্তু এই ক্ষেত্রে দাবার বোর্ডটিই সরিয়ে ফেলা হচ্ছিল। সেই কারণে পাকিস্তান, তাঁর তুরুপের তাস, যা তিনি মোক্ষম দান হিসেবে চালার আশা করেছিলেন, উল্টো তাঁর গলায় ফাঁস হয়ে দেখা দিল।’

পাকিস্তানের সূচনাপর্বে ইসলামের ভূমিকা প্রশ্নে গুণগতভাবে ভিন্ন আরেকটি বিষয়ে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ফারজানা শেখ। পাকিস্তান প্রস্তাবের ভেতর যে অন্তর্গত দ্বন্দ্ব নিহিত ছিল, তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি লিখেছেন, ‘ইসলামি সম্প্রদায়ভুক্তি’ প্রশ্নে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে কোনো রকম মতদ্বৈধতা না থাকলেও ‘পাকিস্তান’ বলতে কী বোঝায়, সে বোধ তাঁদের সবার অভিন্ন ছিল না। পাকিস্তান সৃষ্টির পর এই ভিন্নতা হ্রাস পাওয়ার বদলে বরং বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন ভাষাভাষী জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও  জাতিগত দূরত্ব এই মতদ্বৈধতার একমাত্র কারণ তা নয়, ‘আসলে জাতি হিসেবে তাদের আকাঙ্ক্ষার স্পষ্ট বৈরিতা ছিল’। বাংলাদেশের সৃষ্টি সে-কথার একটি বড় প্রমাণ। আল্লামা ইকবাল থেকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পর্যন্ত বিভিন্ন মুসলিম নেতা শুধু ধর্মীয় কারণে ভারতবর্ষের মুসলমানদের একটি স্বতন্ত্র জাতিগত বৈশিষ্ট্য আরোপ করে এক ধরনের ‘স্থানগত জাতীয়তাবাদ’ (টেরিটরিয়াল ন্যাশনালিজম) তৈরি করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁদের এই চেষ্টার পেছনে যে বৈপরীত্য ও প্রচ্ছন্ন দ্বন্দ্ব লুকানো আছে, তা অনুধাবনে তাঁরা ব্যর্থ হন। সম্ভবত রাজনৈতিক সুবিধাবাদের লক্ষ্যে তাঁরা সেসব দ্বন্দ্ব ও জটিলতা আপাতত কার্পেটের নিচে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছেন।

ফারজানা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। পাকিস্তান যদি শুধু মুসলমানদের আবাসভূমি হবে, তাহলে ইসরায়েলে ইহুদিদের মতো সব ভারতীয় মুসলমানের ‘প্রত্যাবর্তনের অধিকার’ কেন অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি? সে অধিকারের সুনিশ্চয়তা প্রদানে ব্যর্থতা, ফারজানার কথায়, ‘পাকিস্তান মুসলমানের বাসভূমি, এই দাবিকে ঠাট্টার বিষয়ে পরিণত করে তোলে।’ তাঁর উত্থাপিত প্রশ্নের একটি সম্ভাব্য উত্তরের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ফারজানা নিজেই। জিন্নাহ ও তত্কালীন মুসলিম লিগের নেতাদের আসল লক্ষ্য ছিল মুসলমানদের অধিকার সুনিশ্চিত করা নয়, তাঁদের সমশ্রেণীভুক্ত মুসলিম অধিকারভোগী গোষ্ঠীর রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা। ফারজানা তাঁর গ্রন্থে এই শ্রেণীস্বার্থ-ভিত্তিক ব্যাখ্যা বিস্তৃতকরণে সাহায্য গ্রহণ করেছেন মার্ক্সিস্ট বলে পরিচিত আরেক পাকিস্তানি লেখক হামজা আলভির রচনা থেকে। ফারজানা বা হাক্কানির অনেক আগে থেকেই পাকিস্তান টুডে নামক ত্রৈমাসিক পত্রিকার এককালীন সম্পাদক আলভি পাকিস্তানে মৌলবাদী রাজনীতির প্রভাব বিষয়ে সাবধান করে আসছেন। তাঁর বিশ্লেষণে, পাকিস্তান দাবির পেছনে ‘ইসলাম মোটেই কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না’। তথাকথিত বেতনভোগী মুসলমান শ্রেণী—আলভির ভাষায় ‘সালারিয়াত ক্লাস’—হিন্দুদের পাশে প্রতিযোগিতায় কুলিয়ে উঠতে না পেরে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় পাকিস্তান সৃষ্টির দাবি তোলে। একবার সে দেশ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে এই ‘সালারিয়াত শ্রেণীর’ দ্বন্দ্ব বাধে আঞ্চলিকভাবে সংগঠিত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর (যেমন: বাঙালি, সিন্ধি বা বালুচ) সঙ্গে। মুসলিম লিগ সৃষ্টির একদম গোড়ায় হাত দিয়ে আলভি লিখেছেন, ১৯০৫ সালে ঢাকায় যখন নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে এই দল গঠিত হয়, তার পেছনে উদ্দেশ্য ছিল একটাই: শ্রেণী হিসেবে আশরাফ মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষা করা। এই ‘সালারিয়াত শ্রেণীর আসল রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল ইউপি (আজকের উত্তর প্রদেশ) ও বিহারে। পাঞ্জাব বা বাংলার মতো মুসলিম সংখ্যাগুরু প্রদেশে তাদের প্রভাব ছিল নামমাত্র।’৩

ধর্মকে নিজের রাজনৈতিক প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে নিলেও পাকিস্তান যে অবশেষে একটি ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত হবে, জিন্নাহ এ রকম একটি বিপদের আশঙ্কা তাঁর পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত করেননি, এ কথা হাক্কানি ও ফারজানা দুজনেই বলেছেন। আলভির রচনায়ও সে-কথার আভাস মেলে। কিন্তু, যা কেবল মুসলমানদের আবাসভূমি, সেটি ‘ইসলামিক’ না হয়ে অন্য আর কী হবে, এমন প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর অবশ্য এসব উদারনৈতিক বুদ্ধিজীবীর ভাষ্যে মেলে না। হিন্দু ভারতের পাশে মুসলমানদের পাকিস্তানে ‘আল্লাহর আইন’—অর্থাত্ শরিয়া—কার্যকর হবে, মুসলমানদের এমন প্রতিশ্রুতি জিন্নাহ ও তাঁর সব ঘনিষ্ঠ সহচর নির্দ্বিধায় দিয়েছিলেন। জিন্নাহ যদি ইসলামের ব্যবহার শুধু কৌশলগত উদ্দেশ্যে করে থাকেন, দেশ ভাগের পর তাঁর সহকর্মীদের বুঝতে খুব একটা বিলম্ব হয়নি যে দেশের মানুষকে সেক্যুলার রাজনীতির বড়ি গেলানো সহজ হবে না। এ কথা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে রাজনৈতিকভাবে এসব রাজনীতিকের জোরালো কোনো খুঁটি ছিল না। মোহাজের হওয়ায় নতুন পাকিস্তানে তাঁদের সুনির্দিষ্ট জনসমর্থনেরও অভাব ছিল। ১৯৫১ সালে, জিন্নাহর ডান হাত, তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের উত্তরসূরি লিয়াকত আলী খান নিজেই আগ বাড়িয়ে তথাকথিত ‘প্রিন্সিপাল রেজল্যুশন’-এ সম্মত হন, তা কেবল নীতিগত মতৈক্যের কারণে নয়, নিজেদের গায়ের চামড়া বাঁচানোর জন্যও বটে।

৪.

পাকিস্তান রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ। তার ইতিহাসের অধিকাংশ সময়ই সে হয় সরাসরি বা অপ্রত্যক্ষ সামরিক শাসনে কাটাতে বাধ্য হয়েছে। সামরিক শাসন আইনসিদ্ধ করতে সেনাকর্তারা তাঁদের ইচ্ছামতো শাসনতন্ত্র পাল্টেছেন, কাটাছেঁড়া করেছেন। সামরিক শাসনের বৈধতা অর্জনে বিচার বিভাগ ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর যথেচ্ছ ব্যবহারও সুপরিচিত ঘটনা।

পাকিস্তানের রাজনীতিতে প্রশাসনিক অস্থিরতা—নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হটিয়ে হয় কেন্দ্রীয় শাসন বা সেনা হস্তক্ষেপ—তা-ও জিন্নাহর হাত দিয়েই শুরু। এ কথা এখন খুব একটা শোনা যায় না কিন্তু এটি ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পর জিন্নাহর প্রথম কাজগুলোর একটি ছিল আইন পরিষদের সিদ্ধান্ত এককভাবে প্রত্যাখ্যান। আইন পরিষদের গৃহীত যেকোনো আইন বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ‘ভেটো’ দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর রয়েছে, এই মর্মে একটি ডিক্রি তিনি নবগঠিত পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রিসভার কাছ থেকে আদায় করে নেন। খুব বেশি সময় পাননি জিন্নাহ দেশ পরিচালনার, কিন্তু সে সময়ের মধ্যে দু-দুটো নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। পাকিস্তানের সরকারি ইতিহাসে উভয় ঘটনাকেই নানা কূটযুক্তিজালে গ্রহণযোগ্য হিসেবে হাজির করার চেষ্টা দেখা যায়। তিনি প্রথমে সীমান্ত গান্ধী আবদুল গাফ্ফার খানের ভাই ড. খানের নেতৃত্বাধীন উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের সরকারকে আগস্ট ১৯৪৭ সালে ক্ষমতাচ্যুত করেন। তখন পাকিস্তানের বয়স দুই সপ্তাহও হয়নি। জিন্নাহর সম্পূর্ণ একক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে আবদুল কাইয়ুম খানকে সে প্রদেশের দায়িত্বভার তুলে দেওয়া হয়। ভারত সরকার আইনবিধি বা গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্টের ৫১(৫) ধারায় ক্ষমতাচ্যুত করার ঘোষণা দেওয়া হলেও আইনত সে ক্ষমতা গভর্নর জেনারেল হিসেবে জিন্নাহর ছিল না। ব্রিটিশ আমলে প্রণীত এই আইনে গভর্নর জেনারেল কোনো প্রাদেশিক গভর্নরের প্রতি নির্দেশনামা জারির অধিকার ভোগ করতেন, তার বেশি নয়। ব্রিটিশ আমলে প্রশাসনিক ডিক্রির মাধ্যমে একাধিক নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার উদাহরণ রয়েছে, কিন্তু সে জন্য একই আইনের ৯৩ ধারার প্রয়োগ হতো, যাতে গভর্নর জেনারেলের হাতে সুনির্দিষ্টভাবে সে ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয়। দেশ বিভাগের আগেই ঔপনিবেশিক ইংরেজ সরকার ভারত সরকার আইনের ৯৩ ধারা বিলোপ ঘোষণা করে। তা সত্ত্বেও জিন্নাহ যে সেই আইন প্রয়োগ করলেন, তা আইনবহির্ভূত হওয়া সত্ত্বেও কোনো মহলেই এ নিয়ে উচ্চবাচ্য হয়নি মুখ্যত ‘জাতির জনকে’র প্রতি শর্তহীন আনুগত্যের কারণে।

একইভাবে ১৯৪৮ সালের এপ্রিলে জিন্নাহ সিন্ধু প্রদেশের ক্ষমতাসীন এম এ খুররো সরকারকেও বরখাস্ত করেন ওই একই ধারা প্রয়োগের মাধ্যমে। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই জিন্নাহ করাচিকে পাকিস্তানের রাজধানী হিসেবে নির্বাচিত করে তাকে ফেডারেল-শাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেন। খুররো সরকার সে সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায় এবং এই প্রশ্নে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে গুরুতর দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। মুখ্যমন্ত্রী খুররোর এই অবস্থানের প্রতি তাঁর প্রাদেশিক আইন পরিষদের পূর্ণ সমর্থন ছিল। তা সত্ত্বেও জিন্নাহ প্রাদেশিক গভর্নর হিদায়েতুল্লাহর মাধ্যমে সিন্ধু সরকারকে পদচ্যুত করার নির্দেশ দেন। তখন যুক্তি দেখানো হয়েছে, রাজ্য পরিচালনায় খুররো সরকার অকার্যকর ও অদক্ষ। কিন্তু কাজটি যে আইনসম্মত নয়, এ নিয়ে টুঁ-শব্দটিও ওঠেনি।

গত ৬০ বছরে শাসনতন্ত্র অগ্রাহ্য করে ইচ্ছামতো সরকার গঠন ও সরকার বদলের যে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি পাকিস্তানে আমরা দেখেছি, তার শিকড় যে জাতির জনক জিন্নাহর স্বৈরাচারী পদক্ষেপে প্রোথিত, সে-কথা এখন কেউ কেউ বলা শুরু করেছেন। আয়েশা জালাল তাঁর দ্য স্টেট অব মার্শাল রুল: দি অরিজিন’স অব পাকিস্তান’স পলিটিক্যাল ইকোনমি অব ডিফেন্স (লাহোর, ১৯৯৯) গ্রন্থে খালিদ বি সায়ীদকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন, পাকিস্তানের রাজনৈতিক জটিলতার শিকড় পোঁতা রয়েছে জিন্নাহর ‘একনায়কসুলভ’ মনোভাবে। তিনি খান সরকার ও খুররো সরকারের উদাহরণ দিয়েই সে মন্তব্য সংযুক্ত করেন। জালাল অবশ্য এই স্বেচ্ছাচারী মানসিকতা, যাকে তিনি বলেছেন, ‘ভাইস-রিগাল সিস্টেম’, তার সমর্থনে এই বলে মৃদু সাফাই গেয়েছেন যে সদ্য স্বাধীন দেশে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাহী ক্ষমতার সংহতিকরণে এই জাতীয় পদক্ষেপের প্রয়োজন ছিল।

ফারজানা শেখের বিশ্লেষণে জিন্নাহর প্রতি অভিযোগ অবশ্য অনেক বেশি প্রত্যক্ষ ও নির্দয়। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স পত্রিকায় পাকিস্তানবিষয়ক একাধিক গ্রন্থের আলোচনাকালে (আগস্ট ২০০০) ফারজানা দেশ বিভাগের আগেই মুসলিম লিগের ভেতর যে স্বেচ্ছাচারী প্রবণতার প্রকাশ ঘটে, তার কারণ হিসেবে জিন্নাহর সব ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত রাখাটাকে অন্যতম বলে উল্লেখ করেছেন। স্বাধীনতার আগে এই প্রবণতা কূটযুক্তিজালে সমর্থন করা গেলেও স্বাধীনতার পর তা যায় না, এ কথা বলে ফারজানা মন্তব্য করেছেন, সিন্ধু ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের সরকারকে কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়া যেভাবে পদচ্যুত করা হয় এবং পূর্ব বাংলায় জাতীয় ভাষার প্রশ্নে আঞ্চলিক দাবি তিনি যেভাবে বাতিল করে দেন, তা ছিল স্পষ্ট স্বৈরতান্ত্রিক। পাকিস্তানের পরবর্তী রাজনৈতিক চর্চাতে তার জনকের এসব কর্মকাণ্ড যে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল, এ কথায় কোনো ভুল নেই। তা সত্ত্বেও পাকিস্তানি লেখক-গবেষকেরা যেভাবে জিন্নাহর স্তুতিতে ব্যস্ত, ফারজানার ভাষায় তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। ফারজানা লিখেছেন:

স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতার জন্য পরিচিত একটি দেশে তাঁর (অর্থাত্ জিন্নাহর) একনায়কবাদী ব্যবহার ও বাগ্মিতা দেখে এই নেতার গণতন্ত্রের প্রতি আনুগত্যের কোনো প্রমাণ মেলে না। (পাকিস্তানিরা গান্ধী ও নেহরুর বক্তৃতায় একই রকম সুন্দর সুন্দর শব্দের প্রয়োগকে ‘ফালতু’ বলে অনেক আগেই বাতিল করে দিয়েছে।) জিন্নাহ দেশ ভাগের পর যে হঠাত্ সংখ্যালঘুদের সম-অধিকারের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেন, তা দেখেও গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর অঙ্গীকারের কোনো প্রমাণ মেলে না। প্রকৃতপক্ষে, হিন্দু ও মুসলমানের প্রভেদকে ভিত্তি করে যে নেতা তাঁর রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলেন, পাকিস্তান সৃষ্টির পর ‘আজ থেকে রাজনৈতিক অর্থে হিন্দু আর হিন্দু থাকবে না, মুসলমান মুসলমান থাকবে না’, তাঁর এমন কথা বলার মধ্যে একধরনের কপটতা আছে।

পাকিস্তান যে আজ একটি সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা পুলিশনির্ভর দেশে পরিণত হয়েছে, তারও শুরু জিন্নাহর সময়ে, তাঁরই নির্দেশে। দেশ বিভাগের অব্যবহিত পরই পাকিস্তান কাশ্মীর প্রশ্নে ভারতের সঙ্গে সামরিক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তানের সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারীদের কাশ্মীর থেকে চুক্তি অনুযায়ী সরিয়ে না নেওয়ার ফলেই সামরিক সংঘর্ষের শুরু, এ নিয়ে এখন আর কোনো দ্বিমত নেই। এই আলোচনার শুরুতে ডন থেকে যে উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়েছে তা থেকেই স্পষ্ট, তার সৃষ্টির মুহূর্ত থেকেই একটি জঙ্গি ও ধর্মীয় ‘জোশ’ পাকিস্তানিদের আচ্ছন্ন করে ফেলে। যোদ্ধা হিসেবে পাকিস্তানিদের নিজেদের সম্বন্ধে একটি বাগাড়ম্বরপূর্ণ ধারণা প্রচলিত আছে। ভারত তথা হিন্দুদের সঙ্গে যেকোনো যুদ্ধই ধর্মযুদ্ধ, এই যুক্তিতে পাকিস্তানিদের উদ্বুদ্ধ করেছেন, এমন পাকিস্তানি ধর্মগুরুর অভাব কোনোকালেই ছিল না। ফলে তার রাজনৈতিক মোড়কের আড়ালে প্রতিটি যুদ্ধই ধর্মীয় অভিযান হয়ে দাঁড়ায়। এতে দেশের মানুষের কোনো লাভ হোক বা না হোক নিজেদের ফায়দা পুরো মাত্রায় ঘরে তুলতে সক্ষম হন দেশের সেনা অধিকর্তারা। এই ইতিহাসের শুরু পাকিস্তানের ইতিহাসের সূচনাপর্ব থেকে। নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রথম বছরের বাজেটের ৭০ শতাংশই নির্দিষ্ট হয় সামরিক খাতে। হাক্কানি জানিয়েছেন, প্রতিবেশীর সঙ্গে সংঘর্ষের সূত্র ধরে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা বিভাগকেও জোরদার করা হয়। রাজনীতিকদের ওপর নজরদারির জন্য দেশের প্রতিটি প্রদেশে স্থাপন করা হয় আইবি (ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ) বিভাগ। হাক্কানি মন্তব্য করেছেন, আজকের আইএসআইয়ের (আন্তসামরিক গোয়েন্দা বিভাগ) বীজ সেই ১৯৪৭-৪৮ সালেই পোঁতা হয়।

পাকিস্তানি রাজনীতির আরেক উপাদান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রের ভূমিকা গ্রহণ, সে কাজটিও শুরু হয় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সময়েই। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগ সম্পূর্ণ হলেও মার্কিন সরকার নবগঠিত পাকিস্তানের স্থায়িত্ব নিয়ে সন্দিহান ছিল। আজ হোক বা কাল, দেশটি তার নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ভারতের সঙ্গে পুনরায় সংযুক্ত হবে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এ ব্যাপারে প্রায় সন্দেহশূন্য ছিল। এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে ট্রুম্যান প্রশাসন পাকিস্তানকে এড়িয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে ত্বরিত উদ্যোগ গ্রহণ করে। নেহরু সরকার ওয়াশিংটন ও মস্কো এই দুই পরাশক্তি থেকে সমান দূরত্ব বজায় রাখার জোটনিরপেক্ষ নীতির পক্ষপাতী, এ কথা ঠাহর করার পরই ওয়াশিংটন পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে মনোনিবেশ করে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের বদলে আমেরিকার বন্ধুত্ব পাকিস্তান কেন কামনা করে, সে কথার তাত্ত্বিক ভিত্তিটি সরবরাহ করেন জিন্নাহ নিজে। ৭ অক্টোবর ১৯৪৭ সালে মন্ত্রিপরিষদের এক সভায় জিন্নাহ যুক্তি দেখান, পাকিস্তান ইসলামিক দেশ হওয়ায় এই দেশে কমিউনিজমের কোনো স্থান নেই (ডেনিস কাক্সের দি ইউনাইটেড স্টেটস অ্যান্ড পাকিস্তান ১৯৪৭-২০০০, জন হপকিনস ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০১)। কিন্তু আসল কারণটি ছিল ভিন্ন। দেশ বিভাগের পরপর কাশ্মীর প্রশ্নে ভারতের সঙ্গে সামরিক সংঘর্ষ বাধার উপক্রম হলে সামরিক অস্ত্র ও যন্ত্রাংশ পাওয়ার উদ্দেশ্যেই জিন্নাহ আমেরিকার বন্ধুত্ব কামনা করেছিলেন। অর্থনীতির নড়বড়ে অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য দ্রুত ঋণের ব্যবস্থা করা পাকিস্তানের বাঁচা-মরার প্রশ্ন হয়ে ওঠে। মস্কো নয়, আমেরিকার কাছ থেকেই মোটা অঙ্কের ঋণ বা অনুদান পাওয়ার সম্ভাবনা আছে, সে-কথা বুঝতে পেরে জিন্নাহ ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত এম এ এইচ ইস্পাহানির মাধ্যমে দুই বিলিয়ন ডলারের ঋণ চেয়ে বসেন।

জিন্নাহ অবশ্য একটি লোক-দেখানো যুক্তি দিয়েছিলেন যে তাঁর দেশের নয়, আমেরিকারই বেশি প্রয়োজন পাকিস্তানকে। হাক্কানি তাঁর গ্রন্থে দেশ ভাগের অব্যবহিত পরে লাইফ ম্যাগাজিনের বিশেষ প্রতিনিধি মার্গারেট বুর্ক-হোয়াইটের সঙ্গে জিন্নাহর এক কথোপকথন থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। সে সাক্ষাত্কারে জিন্নাহ বলেন, পাকিস্তানের সামরিক রণকৌশলগত গুরুত্বের কারণেই আমেরিকার পাকিস্তানের প্রয়োজন আছে। ‘পাকিস্তানের আমেরিকাকে যতটা প্রয়োজন, আমেরিকার পাকিস্তানকে প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি’। রাশিয়া পাকিস্তান থেকে খুব দূরে নয়। সে যদি এ দিকে পা বাড়ায়, তাহলে সারা বিশ্ব বিপদগ্রস্ত হবে, সে ইঙ্গিত দিয়ে জিন্নাহ বলেন, রুশদের ঠেকাতে আমেরিকার প্রয়োজন পড়বে পাকিস্তানকে। বুর্ক-হোয়াইট জানাচ্ছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে নিকট সামরিক সম্পর্ক নির্মাণ—তাকে আর্থিক ও সামরিকভাবে সাহায্য করা—ছাড়া আমেরিকার অন্য কোনো পথ খোলা নেই, জিন্নাহর এই যুক্তি পাকিস্তানি নেতারা তাঁকে বারবার বোঝাতে চেয়েছেন। পাকিস্তানে রুশ আগ্রাসনের স্পষ্ট কোনো লক্ষণ রয়েছে কি না, তা জানতে চাইলে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা অবশ্য তাঁকে কোনো সদুত্তর প্রদানে ব্যর্থ হন।

আমেরিকার সঙ্গে বন্ধুত্বের প্রশ্নটি জিন্নাহ ফের উত্থাপন করেন ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭-এ, মন্ত্রিসভার নির্ধারিত বৈঠকে। পখতুন নেতা বাদশা খানের নেতৃত্বে তত দিনে স্বতন্ত্র পাখতুনিস্তানের দাবি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। মস্কো পাকিস্তানের সংহতিতে আঘাত হানতে চায়, এমন ইঙ্গিত করে জিন্নাহ সে বৈঠকে বলেন, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে পাখতুনদের মধ্যে যে রাজনৈতিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে, তার পেছনে রয়েছে মস্কো। জিন্নাহ দাবি করেন, সীমান্ত প্রদেশের নিরাপত্তা শুধু এক পাকিস্তানের জন্য নয়, সারা পৃথিবীর জন্যই নিশ্চিত করতে হবে। একই বৈঠকে জিন্নাহ মনে করিয়ে দেন, অধিকাংশ দেশ নবগঠিত পাকিস্তানের জন্য তাঁকে অভিনন্দনবার্তা পাঠালেও মস্কো তখন পর্যন্ত নিশ্চুপ। ডেনিস কাক্স মস্কোকে জড়িয়ে বৃহত্ শক্তিগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব বাধানোর এই চেষ্টাকে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ ও জার রাশিয়ার মধ্যকার ‘গ্রেট গেম’-এর সঙ্গে তুলনীয় বলে মন্তব্য করেছেন।

আমেরিকার কাছ থেকে প্রার্থিত ঋণ পেতে ব্যর্থ হলেও সে দেশের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে জিন্নাহ তাঁর চেষ্টা ছাড়েননি। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানে আমেরিকার প্রথম রাষ্ট্রদূত পল এলিং তাঁর দায়িত্বভার গ্রহণে করাচি এসে পৌঁছালে জিন্নাহ তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা জানান। মার্কিন রাষ্ট্রদূত আরব সাগরপারে জিন্নাহর অবকাশ নিবাসে দেখা করতে এলে পাকিস্তানি নেতা তাঁকে করাচিতে তাঁর ব্যক্তিগত বাসভবন ভাড়া নেওয়ার আহ্বান জানান। এলিং অবশ্য সে অনুরোধ রাখতে পারেননি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এই উষ্ণ অভ্যর্থনার পটভূমিটি বর্ণনা শেষে হাক্কানি মন্তব্য করেছেন, রাষ্ট্র হিসেবে সংহতি অর্জন করা এবং হিন্দু-ভারতের বিরুদ্ধে ইসলামের ক্ষেত্রভূমি হিসেবে পাকিস্তানকে রক্ষার জন্য প্রয়োজন ছিল আর্থিক ও সামরিক সাহায্য। সে উদ্দেশ্যে পাকিস্তান নিজ উদ্যোগেই আমেরিকাকে তার রক্ষক হিসেবে মনোনীত করে। জিন্নাহর তৈরি যুক্তি ও প্রদর্শিত পথ ধরে আমেরিকার ওপর যে সামরিক ও রাজনৈতিক পরনির্ভরশীলতা গড়ে ওঠে, ইসলামিক পাকিস্তানের সে পথ থেকে সরে আসা আর কখনোই সম্ভব হয়নি।

নিজের ইতিহাসের ৬০ বছর অতিক্রমের পর নতুন করে তার জনকের ভূমিকার এই মূল্যায়ন পাকিস্তানের দুর্ভাগ্যের ইতিহাসের সঙ্গে আমাদের নতুন করে পরিচিত করেছে। সবচেয়ে আশার কথা, এই মূল্যায়ন হয়েছে পাকিস্তানি লেখকদের হাতেই। তা সে দেশের লেখক-বুদ্ধিজীবীদের পরিপক্বতার পরিচায়ক। আমরা এমন আশা করতে পারি, দেশের বুদ্ধিজীবীদের এই পরিপক্বতার প্রতিফলন রাজনীতিবিদ ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও একসময় সংক্রমিত হবে।

টীকা

১. আয়েশা জালাল তাঁর সোল স্পোকসম্যান: জিন্নাহ, দ্য মুসলিম লিগ অ্যান্ড দ্য ডিমান্ড ফর পাকিস্তান (কেমব্রিজ, ১৯৮৫) গ্রন্থের মাধ্যমে এই তত্ত্বের দিকে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করেন। পরে সেলফ অ্যান্ড সভরেনিটি: ইনডিভিজুয়াল অ্যান্ড কমিউনিটি ইন সাউথ এশিয়ান ইসলাম সিন্স ১৮৫০ (রুটলেজ, ২০০০) গ্রন্থে সে তত্ত্ব তিনি আরও বিস্তৃত করেছেন।

২. বিস্তারিত জানতে দেখুন: পাকিস্তান: বিটুইন সেক্যুলারিজম অ্যান্ড ইসলাম: ইডিওলজি, ইস্যুজ অ্যান্ড কনফ্লিক্ট, তারিক জান সম্পাদিত, ইসলামাবাদ, ১৯৯৮

৩. হামজা আলভি, ইন্টারনেট আর্কাইভ, http://hamzaalavi.wordpress.com/ 2010/02/07/the-rise-of-religious-fundamentalism-in-pakistan

pathok

যোগাযোগের ঠিকানা

সিএ ভবন,
১০০ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,
কারওয়ান বাজার, ঢাকা - ১২১৫।

ফোন: ৮৮০-২-৮১১০০৮১, ৮১১৫৩০৭
ফ্যাক্স - ৮৮০-২-৯১৩০৪৯৬

protichinta kinte chile