protichinta

মোখলেসুর রহমানের (সিধু ভাই) সাক্ষাত্কারভিত্তিক রচনা 'আমার জীবন-কথা ও সময়'

সাক্ষাত্কার গ্রহণকারী সরদার ফজলুল করিম ও মুস্তাফা নূরউল ইসলাম

 [মোখলেসুর রহমান ১৯২১ সালে রংপুর জেলার নীলফামারী মহকুমার ডিমলা থানার খগাখড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাক নাম সিধু মিয়া। তিনি ছিলেন এক বিত্তশালী পরিবারের সন্তান। কিন্তু তাঁদের পরিবার জোতদার হিসেবে পরিচিত ছিল। উত্তরবঙ্গের তেভাগা আন্দোলনের একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। পড়াশোনা সমাপ্ত করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কর্মজীবনে তিনি কলকাতা, ঢাকা ও চট্রগ্রামে ছিলেন অনেক দিন। পরবর্তী সময়ে চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে তিনি পূর্ব বাংলার সব রাজনৈতিক আন্দোলনে কখনো প্রত্যক্ষ, আবার কখনো পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর থেকে তাঁর ভাই মসিউর রহমান (যাদু মিয়া) রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি তাঁর ভাইকে বুদ্ধি-পরামর্শ সহযোগিতা করেছেন। একজন রাজনীতিসচেতন ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও কখনো সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেননি। বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে ছিল তাঁর নিবিড় যোগাযোগ।

এ সাক্ষাত্কারে বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম, শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা গঠন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কর্তৃক অ্যাডমিরাল আহসানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর পদে নিয়োগ, পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে শিল্পপতি আমিন ও আদমজীর রাজনৈতিক সম্পর্ক, তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন নীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যে অবাঙালিদের একচেটিয়া সুযোগ-সুবিধা প্রদানের কথা ইত্যাদি বিষয়ের পাশাপাশি ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনা, মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের মূল্যায়ন, ভাসানীর কথা, বিএনপির গঠন, জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর ভাই যাদু মিয়ার সম্পর্ক, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যাদু মিয়ার সম্পর্ক ইত্যাদি নানা বিষয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসকি তথ্য উপস্থাপন করেছেন। বাংলাদেশের জাতীয় যাদুঘরের কথ্য ইতিহাস প্রকল্পের আওতায় সাক্ষাত্কারটি গ্রহণ করেছিলেন জাতীয় অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম (মরহুম) ও মুস্তফা নূরউল ইসলাম। গৃহীত সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতেই বর্ণনা আকারে এ রচনাটি ছাপা হলো। আর প্রকল্পটির সমন্বয়কারী ছিলেন ইতিহাসবিদ ড. সালাউদ্দিন আহমেদ।)

১. জন্ম-পরিবার

১৯২১ সালে আমার জন্ম। রংপুর জেলার ডিমলা থানার অধীনে, তখনকার নীলফামারী মহকুমায়। ডোমার স্টেশন থেকে ১০ মাইল দূরে আমাদের বাড়ি। বেশ বিত্তশালী বংশেই আমার জন্ম। আমার বাবা পৈতৃক সূত্রে প্রচুর জায়গা-জমি পেয়েছিলেন এবং নিজেও বাড়িয়েছিলেন অনেক। লোকে এ রকম বলত যে ওসমান গনি সাহেব কোনো দিন অন্যের জমির ওপর দিয়ে হাঁটেননি। অর্থাত্ চারদিকে, আমাদের বাড়ির পাশে উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিমে যত জমি ছিল, তার সবই ছিল তাঁর নিজের। তাঁর নিজের ওই জোতদারির অংশ। আমাদের একটা ছোট জমিদারিও ছিল। ওটা ছিল পোশাকি, অর্থাত্ জাতে ওঠার জন্য। কিন্তু আসল জিনিসটা হলো জোতদারি।

জমিদারি আর জোতদারি—এ দুটোর মধ্যে একটা তফাত আছে। তফাতটা হলো সরাসরি ব্রিটিশরাজকে খাজনা দেওয়া আর একটা নিয়ম ছিল জমিদারকে খাজনা দেওয়া। এই দুটোর মধ্যে জোতদারির ব্যাপারটা হলো, জোতদার হলে খাজনা দিতে হতো জমিদারকে। আমরা জমিদারকে খাজনা দিতাম। প্রায় আট-দশজন জমিদার ছিলেন, যাঁদের খাজনা দিতে হতো।

আমরা মূলত পরিচিত ছিলাম জোতদার হিসেবে। আর আমাদের জমিদারিটা ছিল স্রেফ জাতে ওঠার জন্য। অনেকেই বলে থাকেন, সামাজিকভাবে জোতদার শব্দটা তত সম্মানজনক শব্দ ছিল না। কিন্তু সেটা ঠিক নয়। সম্মানজনক ছিল। কেননা, জোতদারদের হাতেই তো তখন ছিল টাকাপয়সা। জমিদারেরা তখন প্রায় সবাই কোর্ট অব ওয়ার্ডসে চলে গেছেন। তাঁরা প্রচুর ব্যয় করতেন। সেই ব্যয়ের জন্য বেশির ভাগ জমিদারেরই তখন দেউলে দশা। আর জমিদারেরা পেতেন কেবল খাজনা। জোতদারেরা তাঁদের কাছ থেকে যে জমিগুলো নিতেন, সেগুলো পত্তন জমি হলেও নিজেদের সরাসরি চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসতেন এবং সেখান থেকেই সারপ্লাস আরও অনেক বেশি থাকত। তাঁরা (জমিদারেরা) নির্দিষ্ট পরিমাণ খাজনার টাকার পরিবর্তে জমি দিতেন। সেখান থেকে কমপক্ষে তার চেয়ে আট-দশ গুণ বেশি আমরা বর্গাচাষিদের কাছ থেকে পেতাম।

আমাদের ওদিকে চাষাবাদের যে প্রথার প্রচলন ছিল, সেটা ছিল আধিয়ার প্রথা। তার মাধ্যমেই আমরা সেটা করতাম। কিন্তু জমির মালিক ছিলাম আমরা। নির্দিষ্ট একটা খাজনার পরিবর্তে জমিদারের কাছ থেকে জমি নিয়ে তারপর সেই জমি আমরা আধিয়ারকে দিয়ে চাষ করাতাম। এবং এর রিটার্ন অন্তত ওই খাজনা বা যে টাকার বিনিময়ে জমি নিতাম, তার চেয়ে আট-দশ গুণ বেশি আমরা পেতাম। এ জন্যই উদ্বৃত্ত একটা সুদ জমত জমিদারের কাছে এবং অনেক সময় তাঁরা এটা উড়িয়ে দিতেন। নানা রকম ব্যয় করে নষ্ট করে দিতেন; কিন্তু যাঁরা একটু হিসাবি ছিলেন, তাঁরা এটাকে দুভাবে ব্যবহার করতেন। মানে আমার বাবা যেভাবে ব্যবহার করতেন আরকি। তাঁর পারিবারিক ব্যয়ভার বহন করার পর যা থাকত, তিনিও সেটা দুভাবেই ব্যবহার করতেন। একটা হলো যে লগ্নি কারবারে তাঁর এই টাকা খাটানো। যেমন ধরেন, ধানের মৌসুমে কিছু ধানের পাইকার এল, তাদের অর্থায়ন করার জন্য তখন কোনো ব্যাংক ছিল না। তাদের একটা নির্দিষ্ট টাকার পরিবর্তে, ধরুন—১০ হাজার টাকা দিলাম। শর্ত হলো, চার হাজার টাকা লাভসহ তিন-চার মাস পর ফেরত দিতে হবে। এই একটা নিয়ম ছিল। আর একটা নিয়ম ছিল যে ওই টাকা যে ধার চাইতে আসত, তাকে সুদে ধার দেওয়া হতো। এটা হলো কৃষি থেকে যে উদ্বৃত্তটা আসত, সেই উদ্বৃত্তটা বিনিয়োগ করার কোনো রাস্তা ছিল না। কাজেই এই দুভাবে তাঁরা এটা বিনিয়োগ করতেন এবং এটা আবার জমির ওপরই খরচ করতেন। এভাবে জমির বিস্তৃতিটা হতো।

ফসল বিক্রি করেই উদ্বৃত্তটা হতো। বিপুল পরিমাণ ফসল আমরা পেতাম। আট-দশ হাজার মণ ধান পেতাম, তিন-চার হাজার মণ পাট আর তামাক পেতাম। এই তিনটা ফসলই তার প্রধান উপার্জনের উত্স ছিল।

টাকাপয়সার অর্থাত্ বিত্তের একটা বর্ণনা দিলাম। পারিবারিক ঐতিহ্য, আপনারা যাকে বলেন ‘শরাফতি’, সে কথা বলতে গেলে বলতে হয়, সে ব্যাপারে আমি কেবল আমার বাবার প্রজন্ম সম্পর্কেই জানি এবং তাঁর বাবা যেহেতু তাঁর জন্য একটা বেশ বড় সম্পত্তি রেখে গেছেন, অনুমান করি, তাঁরও বিশাল একটা সম্পত্তি ছিল। এর আগের ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না।

২. পারিবারিক ঐতিহ্য ও শিক্ষা

আমাদের পরিবারের শিক্ষার যে ঐতিহ্য, তার শুরুটা কখন থেকে, সেটা আমি জানি না। আমি কেবল জানি আমার বাবা যখন ক্লাস সেভেন-এইটে পড়তেন, তখন তাঁর বাবা মারা যান। ফলে এর চেয়ে বেশি পড়াশোনা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। যাকে বলে আধুনিক শিক্ষাদীক্ষা, সেটা আমাদের প্রজন্ম থেকে এসেছে।

আমাদের রংপুর-দিনাজপুরের ওই এলাকা বা তখনকার জলপাইগুড়ির সঙ্গেও আমাদের কিছু কিছু যোগাযোগ ছিল। তখনকার দিনের মুসলমান সমাজে এই ধরনের বিত্তবান পরিবার যারা ছিল, তাদেরও তো মোটামুটি একই ঐতিহ্য ছিল। তবে আমার বাবা এই ঐতিহ্যের বাইরে ছিলেন। কারণ, উনি নিজে খুব পরিশ্রমী ছিলেন এবং আমাদের, মানে আমার বোনদের লেখাপড়া শিখিয়েছেন এবং বিয়েও দিয়েছেন সেভাবে। আমাদের জোতদার পরিবারের নিয়ম ছিল, এক জোতদার আর এক জোতদার পরিবারে বিয়ে-থা দিত। কিন্তু উনি আমার দুই বোনকে শিক্ষিত পরিবারে বিয়ে দিয়েছিলেন। আমার এক ভগ্নিপতি ছিলেন জজ, আরেকজন ছিলেন ইনকাম ট্যাক্স অফিসার। তিনি দেশবিভাগের অনেক আগেই সহকারী কমিশনার হয়ে মারা যান। কাজেই আমাদের বাড়ির ঝোঁকটাই আলাদা ছিল এবং অন্য মুসলমান পরিবারের সঙ্গে আমাদের খুব বেশি সম্প্রীতি ছিল না এবং সে ঐতিহ্যও ছিল না। আমার বাবাকে সব সময় ধুতি পরতে দেখেছি। খুব সুন্দর ধুতি পরতেন এবং ঈদের নামাজ কোনো দিন পড়তেন না। ঈদের জামাতে আমাদের বাড়ি থেকে শতরঞ্জি যেত, ঈদগাহটাও আমাদের জমির ওপরই ছিল কিন্তু উনি নিজে ঈদের নামাজ কোনো দিন পড়তেন না। আমাদের বলতেন, যাও নামাজ পড়ো, কিন্তু উনি নিজে যেতেন না। আমাদের বাড়িতে গান-বাজনার পরিবেশ ছিল, আমার বড় বোনের শিক্ষার জন্য উনি রবীন্দ্রসংগীতের শিক্ষক রেখেছিলেন ওই গ্রামের বাড়িতেই। যদি প্রশ্ন করেন, আমার বাবা ধুতি পরতেন। তারপর নামাজের প্রতি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর আকর্ষণ তেমন ছিল না। উপরন্তু ছেলেমেয়েদের তিনি গান শেখাচ্ছেন, ইংরেজি শিক্ষা দিচ্ছেন, এ জন্য তখনকার সমাজে বা আপনাদের মতো বিত্তবান আরও যাঁরা ছিলেন, তাঁরা আমাদের কী দৃষ্টিতে দেখতেন?

এই প্রশ্নের জবাবে বলব, উনি, মানে আমার বাবা আসলে একটু উন্নাসিক প্রকৃতির লোক ছিলেন। যাঁরা আমাদের বাঁকা চোখে দেখতেন, তাঁদের ধর্তব্যের মধ্যেই আনতেন না। আমি যতটুকু জানি তাঁর বেশির ভাগ বন্ধুবান্ধবই ছিলেন অমুসলমান। মানে তাঁদের প্রায় সবাই হিন্দু ছিলেন। রংপুরে আসতেন, রংপুর থেকে গ্রামের বাড়ি ফিরতেন।

আমাদের গ্রামে জায়গা-জমি যাঁদের ছিল, তাঁদের প্রায় সবাই মুসলমান ছিলেন। হিন্দু আমাদের ওখানে থাকলেও এলাকাটা ছিল শিডিউল কাস্ট বা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের এলাকা। কোচ, বর্মণদের সংখ্যাই ছিল বেশি। পরে এরা ক্ষত্রিয় বলে পরিচিত হয়। কিন্তু আশপাশের গ্রামে সে রকমভাবে নিম্নবর্ণের হিন্দুভুক্ত তেমন কোনো পরিবার ছিল না।

যা-ই হোক, আমার বাবা মারা যান ১৯২৮ কি ১৯২৯ সালে। তখন আমি পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ি এবং তার আগ পর্যন্ত আমাদের বাড়িতে এবং পুরো গ্রামে একটা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আবহাওয়া বিরাজ করত। কারণ, আমাদের গ্রামে একটা পুজো হতো। দেবীহাটি বলে একটা হাটে, সেখানে পুজোর আসর বসত। সেখানে হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়েরই লোকজন এসে মহররমের সময়ে লাঠিখেলার প্রতিযোগিতা করত এবং যারাই জিতত, তাদের পুরস্কার দেওয়া হতো। এসব কিছুর চল আমার বাবার সময়ও ছিল। বাবার মৃত্যুর পরও অনেককাল এটা চলেছিল। মানে সবদিক দিয়েই আমাদের গ্রামটা ছিল অসাম্প্রদায়িক। এবং স্বয়ম্ভর গ্রাম বলতে যা বোঝায়, তা-ই ছিল সেটা। সেখানে তাঁতি ছিল, সেখানে কুমার ছিল, সেখানে নাপিত-ধোপা সবকিছুই ছিল। আমরা কেউ কেউ হয়তো সেখানকার কোনো কাপড় পরতাম না। তবে আমাদের ওখানে কোচ-বর্মণ শ্রেণি যেমন রঙিন ডুরে কাপড় পরে বুকের সঙ্গে আঁটসাঁট করে বেঁধে রাখে, তারাও তা-ই করত। ওখানে তাঁতে উত্পাদিত কাপড় ইত্যাদি স্থানীয়ভাবেই বিক্রি হতো। এ সবকিছুই এখন উঠে গেছে।

৩. পরিবারে উচ্চশিক্ষার প্রতি অনুরাগ

আমি একটা জিনিস লক্ষ করেছি, রংপুর-দিনাজপুর মিলিয়ে যে বেল্টটা, অন্তত ১৯৪০ বা ১৯৪১ সাল পর্যন্ত, সেই বেল্টের মুসলমান জোতদার পরিবারের ছেলেরা হায়ার এডুকেশনের দিকে আসেনি। চল্লিশের দশকের পর যখন ধানের দাম বাড়ল তখনই দিনাজপুর শহরের কলেজে কিছু কিছু মুসলমান ছেলেপেলে লেখাপড়া করতে এল। এ ক্ষেত্রে আমাদের পরিবারে একটা ব্যতিক্রম লক্ষ করা যাচ্ছে। সেটা হলো বিশের দশকের দিকে আমরা ইংরেজি শিক্ষার দিকে যাচ্ছি। এর কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে যে দিকটি বেরিয়ে আসে, তা নিয়েই একটু কথা বলা যাক।

এক নম্বরে উচ্চশিক্ষার বিষয়, সেটা ছিল অনেকটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। দুই নম্বরে বলতে গেলে বলতে হয়, প্রত্যেকেরই এ রকমের ইচ্ছা ছিল যে আমার পরিবার থেকে একটি ছেলেকে উপযুক্ত করে গড়ে আমি মরে যাব। আমার ছেলে আমার বিষয়সম্পত্তি দেখবে। সে জন্যই এ ধরনের একটা প্রবণতা ছিল। আমার বাবা ওটা খেয়াল করেননি এবং আমার যে সবচেয়ে বড় ভাই, আমি যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি, উনি তখন ক্লাস টেনে পড়তেন, সে অবস্থায় আমার বাবা মারা যান। কিন্তু তাঁকে সংসারে বসানোর চিন্তা আমার বাবা করেননি।

৪. নিম্নবর্ণের হিন্দুদের কথা

নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ছিল আমাদের গ্রামের একটা প্রধান অংশ। তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের কথা বলতে গেলে বলতে হয়, সেটা ছিল খুব ভালো। তাদের সবাই আমাদের আধিয়ার হলেও তাদের সঙ্গে আমাদের আচরণ এমন ছিল—যদি কারও বয়স বেশি হতো, তাহলে তাকে আমরা ‘ভাই’ কিংবা ‘মামা’ কিংবা ‘চাচা’ বলে সম্বোধন করতাম। আমরা কোনো দিন নিজেদের মধ্যে কোনো রকম সম্পর্কগত বিভাজনরেখা টানিনি। কারণ, তখন লোকসংখ্যাও অনেক কম ছিল এবং আধিয়ার হলেও তখন যদি একটা লোকের কাছে ১০ বিঘা জমি থাকত, যেহেতু তার ফ্যামিলি ছোট ছিল, তার কোনো দিন অভাব হতো না। যেটুকু পেত সে, তা-ই দিয়ে তার ভালোভাবে চলে যেত। তারা আমাদের আধিয়ার ছিল এবং কাগজ-কলমে তারা অর্ধেক ফসলই পেত। তবে আসলে কী পেত, সেটা আলাদা জিনিস। এটা খুবই করুণ ব্যাপার। কারণ, কথা হচ্ছে কি, আমার যে জমির ওপর আমি একটা আধিয়ার বসালাম, সেই ভিটার ওপর তার কোনো রাইট ছিল না। সে যত দিন আমাকে মন যোগিয়ে থাকতে পারত, তত দিন সে ভিটায় থাকতে পারত। ওই জমিতে যদি আমি অন্য আরেকজনকে বসাই, তাহলে তাকে আমি উচ্ছেদ করতে পারতাম এবং এভাবে অনেককে উচ্ছেদ করাও হয়েছে।

৫. এলাকায় আধিয়ার-ব্যবস্থা

আমি যখন নতুন একটা আধিয়ার বসাব, তখন তাকে আমার হালের গরু দিতে হবে। তারপর তাকে কিছু ধান দিতে হতো—বীজ ধান দিতে হতো, বাড়ি করার জন্য কিছু টাকাও দেওয়া হতো। এগুলো সবই জোতদারকে দিতে হতো এবং এর ওপর সুদ প্রদান করা হতো। আর সবচেয়ে বড় একটা এক্সপ্লয়টেশন বা শোষণ ব্যবস্থা যেটা ছিল, পরে এটা আমরা তুলে দিয়েছিলাম, আমাদের পরিবার থেকে অন্তত তুলে দিয়েছিলাম, সেটা হলো এই যে ধরুন, আজকে একটা লোক বদলালাম। তার খাবার নেই। তাকে আমি পাঁচ মণ ধান দিলাম। আজকে ধানের মূল্যে ধরুন ১০ টাকা। পাঁচ মণ ধানের দাম ১০ টাকা করে ৫০ টাকা লিখে রাখলাম। কিন্তু তার এই দাম আমি শোধ করে নেব দামের ওপর। সে যখন আবাদ করে ধানটা ঘরে তুলল, আমি তখনকার বাজারদরে আগের ধানের দামটা ধানের ওপর দিয়ে উশুল করে নেব। তখন হয়তো বাজারদর দুই টাকা। এমন হতে পারে, যখন ধানটা উঠল তখন বাজারদর আগে যদি ১০ টাকা থেকে থাকে, তখন হয়তো পাঁচ টাকা। আমি যখন উশুল করে নিলাম, তখন দেখা গেল দুই টাকা যদি মণ হয়, তাহলে ওকে ২৫ মণ ধান দিতে হবে। অথচ সে নিয়েছিল পাঁচ মণ ধান। আমার জীবনেই এ রকম ঘটনা হয়েছে এবং সে জন্য আমি আমার মাকে বলে এই প্রথা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। এই ব্যাপারটা আমাকে রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছিল।

আমার সামনেই এ রকমের একটা ঘটনা ঘটেছিল। আমাদেরই এক প্রজা, তার নাম ছিল নেবড়ু, সে মুসলমান। যখন তার ধানের গাদা (যাকে আমরা বলি পুঞ্জ) ভাঙানো হলো, মানে মাড়াই করা হলো, তখন তার বউ, তার ছেলেমেয়ে—সবাই বস্তা নিয়ে এসেছে ধান নিয়ে যাবে বলে। আমি ওখানে বসে আছি। ধান মাপা হলে আমি সরকারকে বললাম যে দেনা-পাওনা কী?

সরকার বলল, ওরা কিছু পায় না। আমি বললাম, ২৫ মণ ধান তো ও পায়।

সে বলে, পায় না।

আমি বলি, কী করে পায় না? অর্ধেক হিসাবে তো ২৫ মণ ধান পাচ্ছে।

বলে, না, ওর আগের পাওনা আছে। সেই পাওনা কী, সেটা আমি জানতে গিয়ে ওই সিস্টেমটা সম্পর্কে জানলাম। এবং সেদিনই আমি বললাম যে ওকে তো আমি খালি হাতে ফেরত দিতে পারব না। ওর ছেলেমেয়ে সব কান্নাকাটি আরম্ভ করে দিয়েছে।

আমার তখন বয়স ১০-১১ বছর হবে।

আমি বাড়ির বড় ছেলে। ইতিমধ্যে আমাদের ষোলো আনা অংশ ভাগ হয়ে গেছে। এবং তাতে আমার ছিল নয় আনা ভাগ। ফলে আমার একটা ক্ষমতা বা মতামতের জোর ছিল।

আমার অংশের জন্য আমি বড়। যখন নেবড়ুর ছেলেমেয়ে কান্নাকাটি শুরু করল, কেননা, সরকার বলে দিয়েছে যে সে ধান পায় না। সবটা গোলায় তোল। আমি ওদের কান্নাকাটি করতে দেখে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হলাম।

আমি বললাম যে এ জিনিসটা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। এটা এখন তুমি বন্ধ রাখো। ওকে পাঁচ মণ ধান দিয়ে দাও। পরে এটার হিসাব হবে। পরে রাতের বেলা যখন আমার মায়ের সঙ্গে বসলাম, তখন আমি তাঁকে বললাম, ‘মা, এটা তো হতে পারে না। তুমি ধানের পরিবর্তে ধান নিতে পারো। তুমি তখন ১০ টাকা মণ দরে ধান দিয়েছ আর এখন নেবে দুই টাকা দরে—এ হতে পারে না।’ সরকার আপত্তি তুলল এই বলে যে আমরা যদি তখন ওকে না দিয়ে ধানটা বিক্রি করতাম, তাহলে তো আমরা ১০ টাকাই পেতাম। আমরা বিক্রি না করে তো ওকেই দিয়েছি। সুতরাং ও সে টাকাটাই আমাদের দেবে। এখন তো ধানের মণ (দর) কম। কাজেই এখন টাকা দিতে গেলে তো এত মণ ধানই তাকে দিতে হয়। যেহেতু আমরা এই নিয়মেই পাওনা উশুল করে থাকি, কাজেই এই হিসাবে সে আর ধান পায় না।

এ কথা আমি বলার পর আমার মা বললেন, ‘হ্যাঁ, তা-ই তো।’ আমরা তখন দুটো কাজ করলাম। একটা হচ্ছে, আমরা সুদটা নিতাম না। ওই টাকার ওপর যে একটা সুদ ধরা হতো, সেটা নিতাম না। এটা ছিল সবচেয়ে বড় একটা এক্সপ্লয়টেশন এবং এ কারণেই আমি ব্যক্তিগতভাবে বলতে পারি, তেভাগা আন্দোলন১ যখন হয়, তখন আমরা তেমন হুমকি-টুমকির সম্মুখীন হইনি। উপরন্তু তেভাগা আন্দোলনের অনেক নেতা আমাদের বাড়িতে ছিলেন। যাদু মিয়াও তখন বাড়িতে এবং তাঁরা তখন আমাদের বাড়িতেই ঘাঁটি গেড়ে বসেছিলেন। কিন্তু গোলমালটা হয়েছে আমাদের আশপাশে, আমাদের আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে, তাদের জমির ওপর। তবে তেভাগা আন্দোলনের সময় যাদু বাড়িতে ছিল। আমি তখন কলকাতায়। সেখানে তখন আমি চাকরি করি। ঢাকা ইউনিভার্সিটি এমপ্লয়মেন্ট অ্যাডভাইজরি ব্যুরো বলে একটা প্রতিষ্ঠান ছিল, আমাকে তার পার্টটাইম সেক্রেটারি করা হয়েছিল। সেখানে কাজ করলেও আমি আসলে মুসলিম লীগের কাজ করতাম।

৬. তেভাগা আন্দোলনের তাপ

তেভাগা আন্দোলনের সময় আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম না। তবে যাদু মিয়াকে আসামি করে একটা মামলা দায়ের করা হলে আমি ঘটনাস্থলে যাই। যাদু মিয়া তখন বাড়িতেই ছিল। ওই সময় আমাদের জমি নিয়ে কোনো ধরনের গোলমাল হয়নি। কারণ, যাদু মিয়া দশ আনা-ছয় আনার একটা ভায়া মিডিয়া বের করেছিল। আমাদের জমির ওপর দশ আনা হিসাবে সবাই রাজি হয়। আর নেতারাও সবাই আমাদের বাড়িতেই ছিলেন। কাজেই আমাদের জমি নিয়ে কোনো ধরনের গোলমাল হয়নি। তেভাগা আন্দোলনের যাঁরা নেতা, তাঁদের মধ্যে আমার শুধু গোপাল হালদারের কথা মনে আছে। আমি শুনেছি যে গোপাল হালদার ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। তেভাগা আন্দোলনের বেশির ভাগ নেতাই ছিলেন বাইরের। আর বাইরের ছাড়া যে দু-একজন নেতা ছিলেন, তাঁরা ছিলেন মুসলমান এবং তাঁরা এসেছিলেন কৃষক শ্রেণি থেকে। একজন মুসলমান কৃষক নেতা ছিলেন, তাঁর নামটা ঠিক মনে নেই। ডিমলার লোক। তিনি অনেক দিন জেল খেটেছেন এবং কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বহুদিন। আমার ধারণা, আন্দোলনটা হয়েছিল সংগত কারণেই। কিন্তু আন্দোলন করার সময়টা বোধ হয় ঠিক ছিল না। কারণ, এই সময়টায় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে একটা অভাবিত রক্তাক্ত দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ঘটনা ঘটছিল। এই সময়টার শুরু ওই ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৬ সালের  মধ্যে। চূড়ান্ত আন্দোলনে রূপ নেয় ১৯৪৫ সালে। ব্যাপারটা ক্লাইমেক্সে উঠল ফরটি ফাইভে। এই সময়টা আবার মুসলিম লীগের চূড়ান্ত উত্থানের সময়। তেভাগা আন্দোলনের নেতারা ছিলেন বাইরের। এটা হলো এক নম্বর। আবার দেশের ভেতরেও এই আন্দোলনের যাঁরা নেতা ছিলেন, তাঁদেরও বেশির ভাগ ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের। প্রজারা ছিলেন মুসলমান। মানে যাঁরা আধিয়ার, তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলমান। সুতরাং তাঁদের কমিউনাল লাইনে ডিভাইড করা কোনো অসুবিধাজনক কিছু ছিল না। আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে যাদু মিয়াকে যে কেসে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, সেটা ছিল মিথ্যা এবং কেসটা দায়ের করা হয়েছিল হত্যা মামলার।

  তদনারায়ণ বর্মণ নামের একজনকে হত্যা করা হয়েছিল। স্বাধীনতা কাগজে এ রকমেরই হেডলাইন ছিল। তদনারায়ণ বর্মণ ছিলেন আমাদের প্রতিবেশী। আমার মামাদের প্রজা। আর তাঁর ভাগনেরা ছিলেন আবার আমাদের প্রজা। কেতাই বর্মণ ছিলেন আমাদের প্রজা। তাঁরাই এফআইআর করেন এবং তার সাক্ষী করা হয় হরিকান্ত পণ্ডিতকে। সেই পণ্ডিত আবার আমাদের প্রথম অক্ষরজ্ঞান দিয়েছিলেন। আমি যখন সংবাদ শুনি যে যাদু মিয়াকে প্রায় পাঁচ হাজার লোক আমাদের বাড়িতে ঘিরে রেখেছে এবং ‘যাদু মিয়ার রক্ত চাই’ স্লোগান চলছে, সঙ্গে সঙ্গে এই খবর পেয়ে আমি বাড়ি চলে যাই। বাড়ি গিয়ে আমি প্রথম ওই পণ্ডিতের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাঁকে বলি যে আপনি আমাকে বলেন যে যাদু মিয়া কি গুলি করেছে? আমাকে তিনি বললেন যে আমি দেখি নাই। আমি বললাম, কথাটা আপনি নিশ্চিত করে বলেন। কারণ, আপনি তো এফআইআরের সাক্ষী।

তখন তিনি বললেন যে না, তিনি গুলি করেননি।

আমি বললাম, তাহলে কে করেছে?

তখন পণ্ডিতজি আমার এক মামাতো ভাইয়ের নাম বললেন। বললেন, আনসার এই কাজ করেছে।

আমি বলি, তাহলে আপনারা কেন মিথ্যা কেস করলেন?

বললেন, আমাদের বাবুরা বলেছে যে যাদু মিয়া হচ্ছেন এখানকার সবচেয়ে প্রভাবশালী লোক এবং তাঁকে যদি এক নম্বর আসামি না করা যায়, তাহলে এই মামলা টিকবে না। কাজেই আমরা তাঁকে ৩০২ ধারায় এক নম্বর আসামি করেছি।

তখন আমি পণ্ডিত মশায়কে বললাম, এটা তো আপনাকে সংশোধন করতে হবে। আর ততক্ষণে তাঁরা বুঝতে পেরেছে যে এভাবে এর সমাধান হবে না, আন্দোলনটা টিকবে না। ইতিমধ্যে অন্যান্য এলাকা থেকে খবর এসেছে আর্মড পুলিশ গিয়ে অত্যাচার করছে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে, দেখে-শুনে তাঁদের মনে একটা ভীষণ ভয় জেগেছে। মানে সাধারণ লোকের মনে সাংঘাতিকভাবে ভয় জেগেছে। তারা এখন বলতে চাইছে যে আমরা শান্তি চাই। পুলিশের নিপীড়ন-নির্যাতনের মুখে তারা ভীতিবিহ্বল হয়ে পড়েছে। তখন আমাকে বললেন যে ‘আমরা আপনার সঙ্গে সব রকম সহযোগিতা করতে পারি, আপনি যদি এটুকু ব্যবস্থা করতে পারেন যে আমাদের ওপর আর কোনো অত্যাচার হবে না।’ আমি কলকাতা থেকে আসার আগে ফজলুর রহমান২ সাহেবের মারফত নাজিমুদ্দিন সাহেবের কাছে গিয়ে বললাম যে আমার ভাইকে অন্যায়ভাবে ৩০২ ধারায় আসামি করা হয়েছে। আমি যেতে চাই। আমাকে সাহায্য করুন। উনি স্বরাষ্ট্রসচিবকে দিয়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে একটা চিঠি দিলেন। তাতে তিনি বললেন, আমাকে যেন সহযোগিতা করা হয়।

আমি ওই হরিকান্ত পণ্ডিতকে বললাম যে আমি যখন ডিমলা হয়ে আসি, তখন ওই চিঠিটা আমি ডেলিভারি করেছি। এবং ওকে আরও বলেছি যে এখানে যে গোলমালটা হচ্ছে, এটা বোধ হয় মিটে যাবে। আপনি খামোখা পুলিশ পাঠাবেন না। আমি ওই হরিকান্ত পণ্ডিতকে বললাম যে আপনারা যদি এই কথাটা বলতে রাজি হন যে আপনারা মিথ্যা মামলা করেছেন, তাহলে যাতে পুলিশি অত্যাচার আর না হয়, তার ব্যবস্থা আমি করতে পারব বলে আশা করি। পরের দিন সকালবেলা যখন থানায় গেলাম, তখন ওরা সব ওখানে ছিল। থানায় আমি বললাম যে এরা যে এফআইআর করেছে, এখন বলছে যে এফআইআর রিপিউডিএইট করবে। আর শর্ত হলো যে এখানে সব ঠিকঠাক হয়ে গেছে, তোমরা খামোখা পুলিশ পাঠিয়ে অত্যাচার কোরো না।

তখন তারা বলল যে না, আমরা তো এটার কিছু করতে পারব না। আমাদের ওপর নির্দেশনা আছে।

আমি বললাম যে আমাকে ২৪ ঘণ্টা সময় দেন, তাহলে আমি এখনই নর্থ বেঙ্গল প্রেসে ফিরে যাচ্ছি। ওখানে গেলে নাজিমুদ্দিন সাহেব খুব ইমপ্রেসড হয়ে গেলেন। স্বরাষ্ট্রসচিব বললেন, বলো কী, তুমি একেবারে সেই এফআইআর যারা করেছে, তার সাক্ষী এবং তার লিডারকে সঙ্গে নিয়ে এসেছ? আমি বললাম, হ্যাঁ, তা-ই করেছি।

আমি কেতাই বর্মণ আর হরিকান্ত পণ্ডিতকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতা চলে গিয়েছিলাম এবং পরের দিন রাইটার্স বিল্ডিংয়ে তাঁদের হাজির করি। হাজির করলে সবাই খুব ইমপ্রেসড হয়ে গিয়ে বলল যে ঠিক আছে। তবে যারা লিডার ছিল, তাদের আমরা সিলেকটিভ ওয়েতে অ্যারেস্ট করব। সমগ্র এলাকার ওপর কোনো নিপীড়ন-নির্যাতন চালানো হবে না। পরে আলীপুরে ফার্স্ট ক্লাস ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে গিয়ে তারা এফিডেভিট করল ‘কে গুলি করেছে আমরা তা জানি না’ বলে। তবে আমরা যে কেস দিয়েছি, সেটা ঠিক নয়, মিথ্যে।

এবার আন্দোলনটা কীভাবে দানা বাঁধল এবং বিস্তার লাভ করল, তার প্রকাশটা কী রকম ছিল, সে ব্যাপারে একটু বলি।

যারা জমি চাষ করত, তারা হো-হো-হো-হো করে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত একটা আওয়াজ তুলত। সবাইকে জমায়েত করার জন্যই এমনটা করা হতো। মানে সবাই তখন এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল।

এই আওয়াজটা আমি এখনো যে দু-এক সময় হঠাত্ হঠাত্ করেই শুনতে পাই। কিন্তু এমন কোনো একজন কৃষক আমি দেখিনি যে এই আওয়াজটার সঙ্গে সে সময় সুর মেলায়নি। মানে সে এক সাংঘাতিক ব্যাপার ছিল।

এই আন্দোলনে রাজনৈতিকভাবে প্রধানত নেতৃত্ব দিয়েছিল কমিউনিস্ট

পার্টি। বলা হয়ে থাকে যে কৃষকদের মূল দাবি ছিল যে তাদের তিন ভাগ ফসল দিতে হবে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার সেটা না। তাদের দাবি ছিল যে তিন ভাগের দুই ভাগ ফসল দিতে হবে। কিন্তু আধিয়ার বলে যে জিনিসটা চালু ছিল, সেটা প্রকৃতপক্ষে একটা চূড়ান্তভাবে অমানবিক শোষণগত প্রক্রিয়া ছিল। এই প্রথার মাধ্যমে কোনোমতে তাদের বাঁচিয়ে রাখা হতো। কারণ, তাদের বাঁচিয়ে রাখা দরকার ছিল।

তার মানে তারা তাদের চাষাবাদ করা ফসলের অর্ধেকও পেত না। বিশ্বাস করতে পারছেন না, আমি নিজে জোতদার হয়েও বলছি যে এই ব্যাপারটা একটা অমানবিক ব্যাপার ছিল এবং এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এবং তারা যে তিন ভাগ ফসলের দুই ভাগ দাবি করেছিল, সেটা শুধু পুরোপুরি ন্যায়সংগত ছিল, তা-ই নয়, ওটার আরও কতকগুলো সামাজিক দিক ছিল। যেমন ধরুন, এটা করার পর আমরা যখন এই নিয়ম বা প্রথাটা তুলে দিলাম এবং ঘোষণা দিলাম যে আমরা ধানের পরিবর্তে সমপরিমাণ ধান নেব, তখন অন্য জোতদারেরা আমার কাছে রাতের বেলা এসে আমাকে এই বলে সাংঘাতিকভাবে ধমকালেন যে ‘তোমরা তো এটার ওপর নির্ভর করে বাঁচবে না। তোমাদের তো বড় সম্পত্তি আছে, বাইরে আত্মীয়স্বজন আছে, ফলে তোমাদের চলে যায়, কিন্তু আমাদের তো এই আয়ের ওপরই নির্ভর করতে হয়। আমরা এখন তোমাদের এটা সমর্থন করি না। আমাদের আগের নিয়মই চলবে। আমাদের জিজ্ঞেস না করে এটা করলে কেন—তোমাকে জবাবদিহি করতে হবে।’

তখন আমি বললাম যে ওই লোকটার দ্বারাই তো তোমাদের কৃষিকাজটা চলে, তুমি নিজে তো আর জমি আবাদ করছ না। ওই লোকটাকে বাঁচিয়ে না রাখলে তুমি জমি আবাদ করবে কেমন করে? যেভাবে সে বাঁচছে, তাতে করে তো তার কোনো ক্ষমতাই নেই। এবং পরে দেখা গেল যে যারা আধিয়ার, তারা আর জমি চাষ করতে আগ্রহী নয় এবং ব্যাপারটা এখনো চলছে। এখন আমি যেটা দেখছি, তা হলো যে এখন প্রত্যেকেরই একটা করে গরুর গাড়ি আছে, কিংবা মহিষের গাড়ি আছে অথবা হাটে গিয়ে দোকান দিয়েছে। তারা জমিজমার চাষাবাদে আর মোটেও আগ্রহী নয়। কেননা, ওখান থেকে আয়ের পরিমাণ খুবই অল্প। কাজেই এটা যে শুধু মানবিক দিক ছিল, তা-ই না। কথা হলো, আমার যদি উত্পাদন বাড়াতেও হয়, তাহলে আমাকে কিছু না কিছু করতেই হবে।

ওই ব্যবস্থার কথা না হয় বাদই দেন। যে মানুষগুলো চাষাবাদ করে তাকে প্রণোদনা দেওয়া ছাড়া ওখানে তাকে আর ধরে রাখা যাবে না। কারণ, ওই আয়ের ওপর তার সংসার চলে না। তার সংসার এক জায়গায় ঠেকে নেই। বেশ বড় হয়েছে। ফলে সে আর মনোযোগ দিয়ে চাষাবাদ করে না। আর যদিও করে সেটুকু দিয়ে তার পেটের ভাত কোনোমতে হয়ে যায়। তবে চিন্তা থাকে কীভাবে তার রোজগার বাড়বে।

প্রসঙ্গের একটু বাইরে গিয়ে বলি, মুসলিম লীগ এই আন্দোলনের বিরোধিতা করেছে। কেননা, মুসলিম লীগের মধ্যে কারা ছিল? যারা জোতদার ছিল, তারাই মুসলিম লীগে ছিল। সুতরাং আমার স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যাপারটা চলে যায়। কাজেই মুসলিম লীগ তো এই আন্দোলনের বিরোধিতা করবেই। তবে কংগ্রেস করেছে কি না, আমি জানি না।

৭. মওলানা ভাসানী প্রসঙ্গ

মওলানা সাহেবের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় করাচিতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের অধিবেশনে। ১৯৪৩-৪৪ সালের কথা সেটা। আমার ঠিক মনে নেই। সেই সময় আমরা বাংলার প্রতিনিধিরা আমাদের তাঁবু কনফারেন্স হলে যাচ্ছি। দেখি, একজন লোক মাথায় বেতের টুপি, গায়ে একটা খদ্দরের পাঞ্জাবি আর একটা চারকোনা লুঙ্গি পরা, পায়ে টায়ারের স্যান্ডেল। তিনি কতকগুলো ‘ইশতেহার’ বিলি করছেন। তিনি ছুটে ছুটেই সেগুলো বিলি করছিলেন। ব্যাপারটা দেখে আমার পাশে যে লোক ছিলেন আমি জিজ্ঞেস করলাম, ওই ভদ্রলোক কে?

তিনি বললেন, উনি ভাসানীর চরের মওলানা, আবদুল হামিদ তাঁর নাম। সেটা (ইশতেহার) ছিল আসামের লাইন প্রথার বিরুদ্ধে এবং ওটার বিষয়বস্তু হচ্ছে যে এখন মুসলিম লীগেরই গভর্নমেন্ট, স্যার মোহাম্মদ সাদউল্লা তখন আসামের চিফ মিনিস্টার, লাইন প্রথা এখন উঠবে না কেন? যেতে যেতে ওই ইশতেহারটা পড়লাম। ইংরেজিতে লেখা ছিল সেটা। কেননা, সবাই যাতে পড়তে পারেন, সে কারণে ওটা ইংরেজিতেই লেখা ছিল। তারপর ভেতরে যখন গেলাম, তখন দেখি মওলানা সাহেব বারবার উঠছেন আর জিন্নাহ সাহেব তাঁকে ‘সিট ডাউন মওলানা সাহেব’ বলে বসিয়ে দিচ্ছেন। তখন মওলানা একবার প্রায় দৌড়ে গিয়ে ডায়াসে উঠে গেলেন। উঠে গিয়ে বললেন যে আমার একটা রেজল্যুশন আছে। কথাটা তিনি উর্দুতে বললেন। বললেন যে রেজল্যুশনটা সাজেস্ট কমিটি বাছাইয়ের পর বাদ দিয়ে দিয়েছে। ওটা আমি উত্থাপন করতে চাই।

সাধারণ অধিবেশনেই ঘটনাটা ঘটে। সাজেস্ট কমিটিতে বাদ দেওয়ার ফলে ওটাকে আর উত্থাপন করা যায় না বলেই মওলানা সাহেব ব্যাপারটা নিয়ে লাফাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত জিন্নাহ সাহেব ন্যাশনাল গার্ড ডেকে ডায়াস থেকে মওলানা সাহেবকে নামিয়ে দিলেন।

সেশন ভাঙার পর মওলানা সাহেব কেবল ওটাই বোঝানোর চেষ্টা করতে থাকেন সবাইকে গ্রুপে গ্রুপে ভাগ করে। আমি সে সময় এই লাইন ব্যবস্থা সম্পর্কে মওলানাকে জিজ্ঞেস করলাম। এ ব্যাপারে আগে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। পরে শুনলাম যে মওলানা সাহেব এই চর অঞ্চল থেকে লোক নিয়ে গিয়ে আসামে জঙ্গল কেটে সেখানে তাদের বসতি স্থাপনে সাহায্য করেছেন। তখন আসামের চিফ মিনিস্টার গোপীনাথ বড়দৌলী। উনি এই লাইন ব্যবস্থাটা চালু করেছিলেন। ফলে বাঙালিরা এই লাইনের উত্তরে আর যেতে পারবে না। এবং যারা গিয়েছিল, হাতিটাতি দিয়ে বাড়িঘর ভেঙে ফেলে তাদের সেখান থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। মওলানা সাহেবের কথা হচ্ছে, গোপীনাথ বড়দৌলী আপনারা তো জানেন যে কংগ্রেস বলেছিল যে গভর্নমেন্ট থেকে পদত্যাগ করো। এটা বোধ হয় ১৯৩৯ সালের কথা। তখন গোপীনাথ মেম্বার কিন্তু মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিলেন।

তখন কংগ্রেস সাপোর্ট করে সাদউল্লাকে আনা হলো চিফ মিনিস্টার করে। সাদউল্লার গভর্নমেন্ট কিন্তু কংগ্রেসের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কংগ্রেস তাঁকে বলেছে, তুমি যদি লাইন প্রথা তুলে দাও, তাহলে তোমার ওপর থেকে আমরা সাপোর্ট তুলে নেব। কাজেই সাদউল্লা কিছু করতে পারেন না। এটা হলো মওলানার দাবি, মুসলিম লীগের গভর্নমেন্ট কেন এই প্রথা তুলবে না? অর্থাত্ মুসলিম লীগের গভর্নমেন্ট তখন নির্ভরশীল হচ্ছিল কংগ্রেসের ওপর।

ওই প্রথম মওলানা সাহেবকে দেখে এবং তাঁর এসব কথা শুনে খুব মুগ্ধ হলাম। পরে যখন সিলেটে গণভোট বা রেফারেন্ডাম হলো, তখন তিনি পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করলেন এবং আওয়ামী লীগ গঠন করলেন এবং তখন যদিও আমি মুসলিম লীগে, আমার ভাইও মুসলিম লীগে এবং আমি যাদের সঙ্গে কাজ করছিলাম, তারাও মুসলিম লীগ করত। আমি মুসলিম লীগ থেকে সরে এসেছিলাম অনেক আগেই। দেশ ভাগ হওয়ার আগেই আমি সরে আসি। কিন্তু সরে এলেও বরাবর ফজলুর রহমানের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। শুধু ফজলুর রহমান সাহেবই নন, আরও অনেকেই মুসলিম লীগে ছিলেন। কিন্তু ফজলুর রহমান সাহেবের সঙ্গে বিশেষভাবে আমার একটা সম্পর্ক ছিল।

৮. মুসলিম লীগ ও আমি

আমি নীলফামারী মুসলিম লীগের সদস্য ছিলাম। রংপুর মুসলিম লীগে ছিলাম। তারপর আমি অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ কাউন্সিলের মেম্বার হই। মুসলিম লীগ করার সময়কার একটা ঘটনা, যেটা আমি মনে করি ইতিহাসের স্বার্থেই জানানো দরকার, সেটা ক্যাবিনেট মিশন৩ প্রস্তাবসংক্রান্ত। এটা ১৯৪৬ সালের মে মাসের কথা। ১৪তম প্ল্যান যেটা, সেটা করা হয় ইম্পোরিয়াল হোটেলে বসে এবং আমি অন্তত যেটুকু জানি, তার থেকে মনে করি, খুবই গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা ছিল সেটা। তিন দিন ধরে এ নিয়ে অধিবেশন চললেও জিন্নাহ সাহেব গ্রুপিং পাস করাতে পারছিলেন না।

হোটেল ছিল দিল্লিতে। অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ কাউন্সিলের মিটিংয়ে জিন্নাহ সাহেব প্লিড করছিলেন গ্রুপিং গ্রহণ করার জন্য। তিন দিন ধরে ডিবেট চলেছে। এটার বিরুদ্ধে একটা বিরাট প্রতিবাদ—যে তুমি এত দিন বলছ পাকিস্তান, গ্রুপিং ফল শর্ট অব পাকিস্তান, এটা তুমি অ্যাকসেপ্ট করার জন্য কেন বলছ? জিন্নাহর জন্য সময়টা বেশ কঠিন ছিল। জিন্নাহ সাহেব হ্যাড এ ভেরি টাফ টাইম। আমার মনে আছে, মওলানা হজরত মোহানি ফ্রম ইউপি, আর জেড এ জিলানী তারপর আমাদের আবুল হাশিম৪ সাহেব, আমরা যদিও এদের সঙ্গেই ছিলাম। কারণ, আমি তো তখন ঘোর পাকিস্তানি। আমার মত হলো, আমরা এটা গ্রহণ করব না।

তখন বলছেন যে ‘উই ক্যানট ফাইট বোথ হিন্দুজ অ্যান্ড দ্য ব্রিটিশ অ্যাট আ টাইম।’ পাকিস্তান আমরা এক দিনে হাসিল করতে পারব না। হেয়ার ইজ সামথিং দ্যাট উই শুড অ্যাকসেপ্ট। যা-ই হোক, তিন দিন ধরে চেষ্টা চালিয়েও উনি গ্রুপিং পাস করাতে পারছিলেন না। মানে সাধারণ পরিস্থিতিটা ছিল তার বিরুদ্ধে। গ্রুপিং গ্রহণ করার বিরুদ্ধে তারপর রাতে ওয়ার্কিং কমিটির মেম্বার সোহরাওয়ার্দী সাহেব, নাজিমুদ্দিন এই দুজন ছিলেন বাংলার এবং অন্যদের ডেকে বললেন যে কালকে ১০টার মধ্যে এটাকে পাস করিয়ে দিতে হবে। যত রকমের বিরুদ্ধতাই থাকুক না কেন, এটা কায়েদে আযমের অর্ডার। আমরা তো নাছোড়বান্দা। আমরা কেন এটা গ্রহণ করব? নাজিমুদ্দিন সাহেব তো সোজাসরল মানুষ, উনি বললেন যে ‘ভাইসব জিন্নাহ সাহেব বলেছেন, তোমরা যদি গ্রহণ করো এবং কংগ্রেস যদি গ্রহণ না-ও করে, তাহলে যারা যারা এটা গ্রহণ করবে, তাদের দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে।’

আবুল হাশিম সাহেবকে আমরা গিয়ে বললাম, মুসলিম লীগ গ্রহণ করল কি করল না, কংগ্রেস গ্রহণ করল কি করল না, কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হবে, আমরা সেটা বিশ্বাস করি না।

ওরা বলল যে—‘না, ওয়াভেল হ্যাজ প্রমিজড। জিন্নাহ সাহেব মাস্ট গো টু ওয়াভেল অ্যান্ড হ্যাভ আ লাঞ্চ উইথ হিম অ্যান্ড হি মাস্ট কনভে দ্যাট।’ আমরা ওয়ার্কিং কমিটি এবং কাউন্সিল ব্যাপারটা গ্রহণ করেছি। হেয়ার ইজ আ চান্স ফর আস টু গো ইনটু দ্য গভর্নমেন্ট। সুতরাং আমাদের এটা গ্রহণ করতেই হবে।

শেষ পর্যন্ত হলো এই যে ওয়াভেলকে সরিয়ে দেওয়া হলো। ওয়াভেল তাঁর কথা রাখতে পারলেন না। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমার এই ধারণা ছিল যে কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে ব্রিটিশরা কিছু করবে না এবং এটাই প্রমাণিত হলো এবং আমার খুব জানার ইচ্ছা ছিল যে কংগ্রেস কী গ্রাউন্ডে এটাকে গ্রহণ করছিল না। দ্যাট ওয়াজ দি ওনলি ওকেশন যে মুসলিম লীগ যেকোনো প্রস্তাবের ব্যাপারে কংগ্রেসের আগে ওপিনিয়ন দিয়েছে। এর আগে কংগ্রেস সব ব্যাপারে আগে আগে কথা বলত, মুসলিম লীগ তার পরে বলত। এবারই প্রথম মুসলিম লীগ এ ব্যাপারে আগে কথা বলল। কংগ্রেস তারপর মিট করেছে। আমি দিল্লিতে কয়েক দিন বেশি থাকলাম। আমার এক আত্মীয়া ছিলেন তখন সচিবালয়ে। তাঁর বাড়িতে থেকেই আমি কংগ্রেসের মিটিংয়ে অগ্রগতি ইত্যাদি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করলাম। মিটিং হচ্ছিল বিরলা ভবনে। তার সামনে দিয়ে আমি ঘোরাঘুরি করছি। হঠাত্ স্টেটসম্যান-এর একজন সংবাদদাতার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তাঁকে দেখে আমি বললাম, ‘ভাই, আপনি বলেন তো ভেতরে কী হচ্ছে?’

তিনি জবাবে বললেন, ‘এখন তো বলতে পারব না, বিকেলে এলে বলতে পারব।’

আমি বিকেলে সেখানে গেলাম। আমাকে বলা হলো, প্রস্তাব গ্রহণ করার পক্ষেই পাল্লাটা ভারী। তিনি আরও জানালেন যে আজকের রাতটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আমি বললাম, কিসের জন্য?

বলা হলো, তা তো জানি না, কিন্তু আজকের রাতটায় যদি এই মতামতটা থাকে, তাহলে কালকে তা গৃহীত হয়ে যাবে। পরদিন সকালে গেলে বলা হলো, রাতে গোলমাল হয়ে গেছে।

জিজ্ঞেস করি, কী হয়েছে?

বলা হলো যে সরদার প্যাটেল বলেছেন, মুসলিম লীগের সঙ্গে কোনো ধরনের গভর্নমেন্ট ফর্ম করা সম্ভব নয়।

আর গোপীনাথ বড়দৌলী গান্ধীজির পায়ে গিয়ে পড়ে বলতে লাগলেন, বাপুজি আপনি (বাংলা আর আসাম মিলে একটা গ্রুপ) ঠেকান। এই তো বাঙালিরা আমার আসাম দখল করে ফেলবে, তুমি ছাড়া আমাকে আর বাঁচানোর কেউ নেই। গোপীনাথ বড়দৌলী গান্ধীজির কাছ থেকে যতক্ষণ কথা পাননি, ততক্ষণ তিনি গান্ধীজির পায়ের ওপর মাথা দিয়ে বসে ছিলেন আর কেবলি বলছিলেন যে তুমি আমাকে বাঁচাও। আমার আসামকে বাঁচাও। গোপীনাথ বড়দৌলী এবং সরদার প্যাটেল গ্রুপিংটা অপোজ করেছিল এবং এ কারণেই আমাদের এই উপমহাদেশের চেহারা হয়তো পুরোপুরি ভিন্ন হয়ে যেতে পারত। ওই গ্রুপিং যদি মেনে নেওয়া হতো, তাহলে পুরো জিনিসটা অন্য রকম হয়ে যেত। কিন্তু ওই দুজনের জন্যই হয়নি।

এসব কথা আমার প্রত্যক্ষ নলেজ থেকেই আমি বলছি। কেননা, আমি এটুকু জানার জন্যই সেখানে গিয়েছিলাম। আমার সন্দেহ ছিল যে কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে ওয়াভেল এটা করতে পারেন না এবং শেষ পর্যন্ত ওয়াভেলকে সরানো হয়। তাঁর জায়গায় মাউন্ট ব্যাটেন সাহেব আসেন।

৯. যুক্তফ্রন্ট গঠন ও যাদু মিয়া প্রসঙ্গ

এবার মওলানা ভাসানী সম্পর্কে কিছু কথা বলি। যুক্তফ্রন্টের৫ প্রতি আমার সহানুভূতি ছিল। যদিও আমার আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধু-বান্ধবদের সবাই মুসলিম লীগে ছিল এবং যুক্তফ্রন্টের বিজয়ে আমি আন্তরিকভাবে খুশি হয়েছিলাম।

চুয়ান্ন সালে যুক্তফ্রন্টের বিজয়ে আমি খুশি হলেও তারপর ফ্রন্টের তিন প্রধান নেতা মিলে যেসব ঘটনা ঘটিয়ে চলেন, তাতে আমি রাজনীতিতে যতখানি এঁদের সঙ্গে অ্যাসোসিয়েটেড হব বলে ভেবেছিলাম, সবকিছু দেখে আমি আবার পিছিয়ে গেলাম। ভেবেছিলাম মওলানা সাহেব যদি নিজে কোনো দিন দল করেন, আর সেটা যদি কোনো আদর্শভিত্তিক দল হয়, তাহলে তাঁর সঙ্গে আমি যুক্ত হব। আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে সংশোধনী করার পরপরই উনি বেরিয়ে এলেন দল থেকে। সংশোধনী দুটো হলো যে স্বাধীন নিরপেক্ষ বৈদেশিক নীতির ভিত্তিতে যে সংশোধনীটা হলো, সেই থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে যখন তিনি ন্যাপ সংগঠিত করবেন বলে ঠিক করলেন, তখন আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করি এবং মওলানাকে বলি যে আপনি যদি কোনো পার্টি করেন, তাহলে আমি তার সঙ্গে যুক্ত থাকতে চাই। যাই হোক, উনি বললেন, ঠিক আছে। যখনই ন্যাপের মিটিং হয় তখনই আমি যাদু মিয়াকে৬ রংপুর থেকে নিয়ে আসি এবং যাদু মিয়ার সঙ্গে রংপুরের অনেক মুসলিম লীগের লোক এসে ন্যাপে যোগ দেন।

তাঁর সঙ্গে যোগ দেওয়ার পর আমাকে ন্যাপের কেন্দ্রীয় কমিটির যে সিটটা উনি অফার করেছিলেন, আমি বললাম যে এটা আমার চেয়ে বরং যাদু মিয়াকে দেওয়া উচিত। কারণ, তিনি মুসলিম লীগের ওয়ার্কিং কমিটির মেম্বার এবং ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান। তিনি যখন এত কিছু ছেড়েছুড়ে দিয়ে আপনার কাছে এলেন, তখন তাঁকেই এটা দেওয়া উচিত। যাদু মিয়ার সঙ্গে মওলানার আগে কোনো ধরনের যোগাযোগ ছিল না। আমি তাকে তাঁর কাছে নিয়ে আসি। বলতে গেলে আমিই তাকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করে নিয়ে আসি এবং সেই সময় রংপুরে যাঁরা মুসলিম লীগের রাজনীতি করতেন, তাঁদের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক বলে আমাদের একটা পরিচিতি ছিল। সে জন্যই রংপুরের যাঁরা অন্যান্য হিন্দু লিডার ছিলেন, তাঁরাও যাদু মিয়াকে পছন্দ করতেন। ন্যাপ যে একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে উঠবে, সে সম্পর্কে সবাই ধারণা করেছিলেন।

রংপুরেও দলটির সমর্থন কম ছিল না। তাঁরাও তাঁকে বললেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যেতে এবং তারপর আমি তাঁকে নিয়ে এলাম। যাদু মিয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরাও এলেন এবং তাঁদের সঙ্গে অনেক দিন রাজনীতি করেছেন যাদু মিয়া।

ভাসানী সাহেব আমাকে যখন ওয়ার্কিং কমিটির মেম্বার করতে চাইলেন, আমি তখন বললাম যে যাদু মিয়াকে করুন। আমাকে মেম্বার করেন আর না-ই করেন, আমি তো থাকবই; কিন্তু যদি অফিশিয়ালি আপনি কাউকে করতে চান, তাহলে আমাকে না করে তাকে করেন। কারণ, সে এত ত্যাগ স্বীকার করে এসেছে। ফলে যাদু মিয়াকে সেন্ট্রাল ওয়ার্কিং কমিটির মেম্বার করা হলো।

১০. ন্যাপের জনপ্রিয়তা

ন্যাপের সংগঠনের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির খুব সাংঘাতিক একটা উন্নয়নের সুযোগ ছিল। তখন যাঁরা বামপন্থী ছিলেন, তাঁদের মধ্যে একটা দ্বিধা ছিল। ন্যাপের সদস্য কর্মকর্তাদের অধিকাংশই বামপন্থী ছিলেন। মওলানা সাহেব যে সমর্থন তুলে নিলেন আতাউর রহমানের সরকারের ওপর থেকে, এ নিয়ে একটা দ্বিধা ছিল। আমার নিজেরও দ্বিধা ছিল। ব্যাপারটা নিয়ে মিটিংয়ে অনেক দিন আলাপ-আলোচনা করা হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত মওলানা সাহেব এবং তাঁর সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানি যেসব লিডার ছিলেন, তাঁরা এটা চাপিয়ে দিয়েছিলেন এবং আমরাও তখন একটা নতুন ধরনের রাজনীতি করতে যাচ্ছি বলে ভেবেছি। ভেবেছি ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট পাকিস্তান মিলে রাজনীতি করলে মন্দ কি! কিন্তু একটা প্রাদেশিক সরকারের কেন পতন ঘটানো হবে, তার পক্ষে কোনো যুক্তি খুঁজে পেতাম না। কেন তাকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বৈদেশিক নীতি (ইনডিপেনডেন্ট অ্যান্ড নিউট্রাল ফরেন পলিসি) মানতে হবে। এ জন্য প্রাদেশিক সরকারকে (প্রভিন্সিয়াল গভর্নমেন্টকে) কেন ফেল করানো হবে? সেদিন আমরা অনেক রাত পর্যন্ত ছিলাম মওলানা সাহেবের সঙ্গে। এর আগে চার-পাঁচ দিন ধরে নানা ধরনের আলাপ-আলোচনা চলছিল।

এ রকমের একটা প্রশ্ন উঠতে পারে যে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে আসাটা ঠিক হয়েছিল কি না? আমি মনে করি যে ঠিক হয়েছিল। কারণ, আওয়ামী লীগ তখন লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি শুরু করে দিয়েছিল। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সেই মন্তব্য ‘জিরো প্লাস জিরো’ তারপর তখনকার পূর্ব পাকিস্তান (আজকের বাংলাদেশ) প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন শতকরা ৯৮ ভাগ পেয়ে গেছে। আমি চিফ মিনিস্টার—এসব বুলির কারণে আওয়ামী লীগের সেই যে একটা ভাবমূর্তি ছিল, যে জন্য আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষ আকৃষ্ট হচ্ছিল, সেই জিনিসটা চলে গিয়েছিল এবং সেই জিনিসটাই ন্যাপ তুলে ধরল। সেটা তুলে ধরাতেই ন্যাপের জনপ্রিয়তাও খুব বাড়ছিল।

১১. ভাসানী ও যুক্তফ্রন্ট প্রসঙ্গ

শেখ মুজিবের সঙ্গে আমার পার্সোনাল কোনো যোগাযোগ ছিল কি না, এ রকমের প্রশ্নের জবাবে বলতে হয়— আইয়ুববিরোধী যে ছাত্র আন্দোলনটা শুরু করা হয়, ব্যক্তিগতভাবে বলতে গেলে বলতে হয় আমি সেই ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে খুব নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলাম। ছাত্র না হলেও।

আমার ছাত্রত্ব শেষ হয়ে গিয়েছিল ১৯৪২ সালে। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র।

ফজলুল হক সাহেবের নেতৃত্বাধীন শ্যামা-হক মন্ত্রিসভার৭ বিরুদ্ধে নানা রকম প্রতিবাদ করেছিলাম বলে আমাকে রাসটিকেট করা হয়েছিল। যা-ই হোক মওলানা সাহেব সমর্থন তুলে নেওয়ার পর আমরা কিন্তু মওলানা সাহেবকে একটাই কন্ডিশন দিয়েছিলাম এই বলে যে ‘দেখেন, আপনি যখন একটা সরকারের পতন ঘটাচ্ছেন, তখন এটা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব যে আরেকটা সরকার আমরা আনব। বিকল্প সরকার আমরা জনগণকে দেব। আমরা সেই সরকারে অংশগ্রহণ করি কি না করি, সেটা হলো অন্য কথা। কিন্তু একটা সরকার আমাদের আনতেই হবে। সংসদীয় ব্যবস্থাটা আমরা বজায় রাখব।’ মওলানা সাহেবের একটা চরিত্র ছিল, এটা কেন উনি করতেন আমি জানি না, সংকটের সময় তিনি নিখোঁজ হয়ে যেতেন। আমরা তাঁকে বারবার এ কথাটাই বললাম যে আপনি কিন্তু থাকবেন। আপনি ঢাকা থেকে যাবেন না। তখন উনি রয়েল স্টেশনারির ব্যারিস্টার শওকত আলীর ওখানে থাকতেন। আমরা বাসায় এসেছি। আমার বাসায়ও তিন-চারজন মেম্বার ছিলেন। আমরা ঘুমিয়ে গেছি। ভোর ছয়টার দিকে আমার দরজায় ধাক্কাধাক্কির শব্দ পেলাম। বাইরে থেকে কে যেন দরজা ধাক্কাচ্ছিলেন আর বলছিলেন, ‘উঠেন, উঠেন’।

আমি বলি, কী ব্যাপার?

জানানো হলো যে মওলানা সাহেব তো চলে গেছেন।

আমি তো বিশ্বাসই করতে পারলাম না। কী করে মওলানা সাহেব গেলেন। আমরা তো এগারোটার সময় এলাম।

আগত ব্যক্তি জানালেন, না, এগারোটা চল্লিশে যে বাহাদুরাবাদ ট্রেন আছে, সেই ট্রেনে চেপে উনি চলে গেছেন।

বলি, কোথায় গেছেন?

বলেন, পাঁচবিবিতে।

তখন আমি বললাম, আমি কী করতে পারি?

বললেন, আপনাকে এখন যেতে হবে মওলানা সাহেবকে আনার জন্য।

আমি বললাম যে এটা অসম্ভব। আমি যেতে পারব না। শওকতকে পাঠাও।

বললেন, না, শওকত বলছে, সে যেতে পারবে না।

তারা এত জেদ ধরে বসল যে শেষে আমি বলতে বাধ্য হলাম যে আমি কিন্তু আপনাদের কাছ থেকে একটা অনুমতি চাই। মওলানা সাহেবকে তো আমি জোর করে আনতে পারব না। উনি যদি না আসতে চান, তাহলে হয় আমি মওলানা সাহেবকে নিয়ে আসব অথবা তাঁর পদত্যাগপত্র নিয়ে আসব। দুটোর একটা করব। যা-ই হোক সে অনেক ঘটনা। আমি যখন সকালবেলা পাঁচবিবিতে মওলানা সাহেবের কাছে গেলাম, গিয়ে আমগাছের নিচে মাচায় বসে খবর পাঠালাম। কিছুক্ষণ পর মওলানা সাহেব এলেন।

এসে বললেন, ‘সিধু, তুমি?’

আমি বললাম, আপনি তো কাউকে না বলেই চলে এলেন। ব্যাপারটা কী বলেন তো? আপনি একটা পার্টির প্রেসিডেন্ট, আপনার কথামতো সমর্থন তুলে নিয়ে একটা সরকারের আমরা পতন ঘটালাম। বিকল্প একটা সরকার গঠন না করেই আপনি চলে এলেন?

তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, আমাকে এসে হামিদুল হক চৌধুরী৮ আর ফরিদ আহমেদ৯, তারা খবর দিল যে তারা জয়েন্ট ইলেকটরেটে রাজি না। মানে আগে চুক্তি ছিল যে তারা জয়েন্ট ইলেকটরেট করবে কিন্তু এখন তারা জয়েন্ট ইলেকটরেটে রাজি না। নেজামে ইসলাম পার্টি না। তারা আপত্তি করেছে। কাজেই কোনো সরকার হয় না। সুতরাং সে প্রস্তাব এখন বাদ দিতে হবে। আমি তাই বিরক্ত হয়ে চলে এসেছি।’

আমি বললাম, আপনি একটা পার্টির প্রেসিডেন্ট। এ রকম একটা সংকটের মুহূর্তে আপনি চলে এলেন, এটা তো হতে পারে না। আপনাকে যেতে হবে। বললেন, ‘না, আমি আর গিয়ে কী করব?’ তখন আমি সত্যি সত্যি খুবই মর্মাহত হলাম। একটা দলের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এ রকম একটা জিনিস আমি আশাই করতে পারিনি। পার্টিকে এ রকম একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে দলের প্রধান নিজে সরে আসেন। ব্যাপারটা আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না। আমি যাওয়ার সময়ই ওদের যেমন বলেছিলাম যে আমি উনার পদত্যাগপত্র নিয়ে আসব। সেই মর্মে আমি একটা পদত্যাগপত্র তৈরি করে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি যখন কয়েকবার বলার পরও উনাকে রাজি করাতে পারলাম না, আমি তখন তাঁকে বললাম, ঠিক আছে যাবেন না যখন, তখন এইটা একটু সই করে দিন।

উনি কাগজটা পড়ে আমাকে বললেন, ‘এটা কী?’

আমি বললাম, এটা তো আপনার পদত্যাগপত্র। হয় আপনি যাবেন, না হয় আপনার পদত্যাগপত্র নিয়ে যাব।

তখন তিনি বললেন, ‘আচ্ছা বসো।’ ১০-১৫ মিনিট পর তাঁর টিনের সুটকেস নিয়ে বের হয়ে বললেন, ‘চলো যাই।’

১২. ভাসানী সম্পর্কে একটি মূল্যায়ন

আমরা ঢাকায় এলাম। মধ্যখানে রেডিওতে শুনলাম যে এখানে একটা সরকার গঠিত হয়েছে ন্যাপকে বাদ দিয়েই। ন্যাপের একটা বিরাট সম্ভাবনা ছিল এবং মওলানা সাহেবই এই সম্ভাবনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালেন। বাধাটা এই অর্থে যে মওলানা সাহেব ১৯৫৪ সালে সংসদীয় ব্যবস্থার রাজনীতিতে যে ধোঁকাটা খেয়েছিলেন, নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপারে আওয়ামী লীগ তাঁকে যে ধোঁকাটা দিয়েছিল, তাতে তিনি ভীষণভাবে অসন্তুষ্ট ছিলেন। আর দ্বিতীয়ত, তাঁর মনে এ রকমের একটা ধারণা ছিল এবং সে ব্যাপারে তাঁকে অনেকেই এই বলে উসকানি দিচ্ছিলেন যে ‘মওলানা সাহেব, আপনি তো পার্টির প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন, কিন্তু সরকারপ্রধান তো কোনো দিনই হতে পারবেন না। আপনাকে মই হিসেবে ব্যবহার করে মানুষ ওপরে উঠে যাবে, তারপর আপনাকে লাথি মেরে ফেলে দেবে’—এ রকমের ধারণা তাঁর মাথার মধ্যে সাংঘাতিকভাবে গেঁথে গিয়েছিল। সে সময় ন্যাপের এতটাই জনপ্রিয়তা ছিল যে বাইরে থেকে যাঁরা ব্যারিস্টার হয়ে আসতেন, এখানে এসেই তাঁরা সোজা ন্যাপে জয়েন করতেন। মানে বেশ কিছু ভালো ব্যারিস্টার ও আইনজীবী ন্যাপের প্রতি এই ভেবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন যে এই দলটি ভবিষ্যতের দল। এর ভবিষ্যত্ আছে। কিন্তু দলটির এত যে সম্ভাবনা ছিল, মওলানা সাহেব তাঁর নিজের কারণে এই সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দিলেন। এবং পরবর্তীকালে এ জন্য আমাদের ওপরই সব দোষ চাপানো হয়। বিশেষ করে, কমিউনিস্টদের ওপর। কিন্তু আমার সঙ্গে কমিউনিস্টদের যে কথাবার্তা হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে গেলে বলতে হয়, তারা একটা ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক রেভল্যুশন চাচ্ছিলেন। আমি যখন কৃষক সমিতির কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, তখন আমি নিজে কৃষক সমিতির কনফারেন্সে তেভাগার অনুকূলে প্রস্তাব পর্যন্ত আনতে বলেছিলাম।

কৃষক সমিতির নেতারা তখন বলেছেন যে না, আমাদের জেনারেল পলিটিক্সটার ভেতর আমরা এখন সেকশনাল পলিটিক্সকে আনতে দেব না। আমরা এখন সত্যিকারভাবেই একটা ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক রেভল্যুশন চাই। কাজেই কমিউনিস্টরা ন্যাপের অগ্রগতির জন্য কোনো ধরনের বাধা ছিল না। বাধা ছিলেন মওলানা ভাসানী। তিনি তাঁর নিজের সীমাবদ্ধতা বা ভুলের জন্য এটাকে বাড়তে দেননি এবং বারবার ন্যাপকে নির্বাচনে যেতে দিচ্ছিলেন না। নির্বাচন এলেই বয়কট করার ডাক দিয়ে যাচ্ছিলেন।

আসলে মওলানা ভাসানী ছিলেন একজন পীর মানুষ। আবার এদিক দিয়ে তাঁর সব রকমের চিন্তার খোরাক জুগিয়ে চলেছিলেন কমিউনিস্টরা। কারণ, কমিউনিস্ট পার্টির যাঁরা কৃষক ফ্রন্টে ছিলেন, তাঁরা তো মওলানা সাহেবের খুব প্রিয় ছিলেন। যেমন: জিতেন ঘোষ১০, জ্ঞান চক্রবর্তী১১—এঁরা সব সময়ই মওলানা সাহেবের সঙ্গে ছিলেন এবং তিনি তাঁদের খুবই মানতেন। তাঁদের কথা শুনতেন। পরের দিকে এসে যেটা হলো, তিনি সরে গেলেন। তাঁর এই বামপন্থী বন্ধুদের কাছ থেকে সরে গিয়ে একেবারেই আবার ইসলামের দিকে চলে গেলেন। তাঁর সত্যিকার দ্বন্দ্বটা এখানেই। তিনি হয়তো চেয়েছিলেন যে ইসলাম এবং সমাজতন্ত্র—এই দুটোকে সমন্বয় করার জন্য। কিন্তু আমার মনে হয় না তাঁর সেই ক্ষমতা ছিল। কারণ, ইসলামের একজন পণ্ডিত হিসেবে তাঁকে কোনো দিন কেউ স্বীকৃতি দেননি। কেবল একজন কৃষকনেতা হিসেবে তাঁর স্বীকৃতি বা পরিচিতি ছিল। কিন্তু মওলানা হিসেবে তাঁর কোনো স্বীকৃতি ছিল না, পীর হিসেবে ছিল। কিন্তু একজন আলেম হিসেবে তাঁর কোনো ধরনের স্বীকৃতি ছিল না। কিন্তু শেষের দিকে তিনি ওই সব দিকেই ঝুঁকেছিলেন।

আমি তাঁর পড়াশোনা সম্পর্কেও কিছু জানি না। বলতেও পারব না। কারণ, আমার সঙ্গে যে সময় তাঁর পরিচয়, আমি কেবল তাঁর সেই সময়ের কথা বলতে পারব। মওলানা সাহেব সম্পর্কে আরও কতগুলো ঘটনা বলছি।

ধানমন্ডির বাড়ি থেকে তাঁকে রিলিজ করার পর উনি আমাকে তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য সন্তোষে যাওয়ার জন্য খবর পাঠালেন। আমি গেলাম। যাওয়ার পর উনি আমাকে একটা চিঠি দিয়ে বললেন, ‘পড়ো। চিঠিটা আইয়ুব খানের লেখা।’ তাতে তিনি মওলানাকে লক্ষ্য করে বলেছেন যে ‘মওলানা, আমি তোমার কো-অপারেশন চাই। তোমাকে জেলেটেলে রাখতে হয়েছিল, তোমার কমফোর্টের জন্য। সে কারণে তোমাকে আমি ধানমন্ডির বাড়িতে রেখেছিলাম। তখন আমি তোমার বিবিকে অ্যালাও করেছি। সেই গোনার জন্য আমাকে মাফ-টাফ করে দাও। ওটা আমাকে বাধ্য হয়েই করতে হয়েছে। এবং আমি তোমার কো-অপারেশন চাই।’

চিঠিটা আমার কাছে দিয়ে একটা প্যাডের নিচে সই করে দিয়ে বললেন, ‘এর উত্তর তুমি দিয়ে দাও।’

আমি বললাম, আমি কী করে উত্তর দেব? চিঠিটা তো আপনার? আমি কী করে উত্তর দিই?

বললেন, ‘না, তুমি একটা উত্তর লিখে দাও।’ বললাম, মওলানা সাহেব, আমি শুনেছি আপনি অতীতে এ রকম করেছেন কিন্তু আমি তো এটা করতে পারব না। আমি এ রকম কিছুতেই বিশ্বাস করি না। আপনার চিঠি আপনাকেই লিখতে হবে। তবে হ্যাঁ, আপনি বাংলায় আপনার বক্তব্য বলেন, আমি এটাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে আপনাকে এনে দেব। তারপর আপনি শুনে সই করবেন। তাঁর সঙ্গে আলোচনা করলাম।

আলোচনা করলে তিনি বললেন, ‘লিখে দাও যে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ছাড়া আপনার সঙ্গে কোনো সহযোগিতা আমি করতে পারি না।’

আমি বললাম, ঠিক আছে।

তারপর তিনি আরও লোকাল কিছু পয়েন্টস বললেন। আমি পরের দিন তাঁর বলা পয়েন্টগুলো লিখে তাঁর কাছে নিয়ে যাই। তখন তিনি তাতে সই করে দেন। জবাবি চিঠিতে লেখা ছিল যে ‘প্রভিন্সিয়াল অটোনমি যতক্ষণ তুমি না দিচ্ছো, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমাকে কোনো ধরনের সহযোগিতা করতে পারি না।’

মওলানা সাহেবের একটা বড় সংসার ছিল। স্ত্রী-পুত্র নিয়ে তাঁর যে সংসার, তার ব্যয় নির্বাহ করা হতো কীভাবে, সেটা আমি জানতাম না। বলতেও পারব না। তবে এটুকু আমি দেখেছি যে পাঁচবিবিতে মাঠের মধ্যে তাঁর যে একটা বাড়ি ছিল, তার সামনেই তাঁর স্ত্রী, পাঁচবিবিতেই যিনি থাকতেন, তাঁর বাবার একটা বেশ দালানকোঠাওয়ালা বাড়ি ছিল। তাঁরা নাকি তাঁর ওই বউয়ের জিম্মাদারিতে ওই জমিজিরাতগুলো তুলে দিয়েছিলেন। এগুলো থেকেই তাঁর সংসারের ব্যয় নির্বাহ করা হতো। আর তিনি সন্তোষে যে বাড়ি করেছিলেন, সেটা নয়, আরেকটা বাড়ি ছিল টাঙ্গাইলের বিন্যাবাড়িতে, সেখানে একটা জায়গা ছিল। পোড়াবাড়ী থেকে মাইল দুয়েক ভেতরের দিকে যেতে হতো। পোড়াবাড়ীতে গাড়ি রেখে আমি একবার গিয়েছিলাম। সেখানেও তাঁর স্ত্রীর কিছু জায়গাজমি ছিল।

তবে বড় ধরনের কোনো আর্থিক সহায়তা তিনি আমার কাছ থেকে নেননি। চানওনি কখনো। একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আমাকে যদি তিনি বলতেন, ‘সিধু, আমাকে একটা করাচির টিকিট কিনে দাও’, আমি কিনে দিতাম। কখনো ঈদের সময় বললেন, ‘আমি তো এখন বাড়ি যাব, কী করে খালি হাতে যাই বলো তো?’

আমি বলতাম, ঠিক আছে। হয়তো তাঁর পরিবারের জন্য কিছু জামাকাপড় কিনে দিলাম। এই রকম অনেকেই করত।

তাঁর অনেক মুরিদ ছিলেন। তাঁরাও আসতেন নানা ধরনের নজরানা নিয়ে। তবে আমি নিজের চোখে তাঁকে নজরানা নিতে দেখিনি। তবে যখনই যেখানে মজলিশ হতো, সেখানে মুরিদরা আসতেন। চাল, ডাল ইত্যাদি সব নিয়ে তাঁরা আসতেন। কেউ টাকাকড়িও নিয়ে আসতেন। মজলিশে আসা মুরিদরা তাঁকে দুই-এক টাকা করে নজরানাও দিতেন। কেউ বা তাঁর কাছ থেকে পানি পড়া নিতেন, কেউ বা নিতেন তাবিজ।

আমি এসব কিছু নিয়ে একবার তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলাম। জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনি এসব করেন কেন? তাবিজ, পানি পড়া দেন কেন?’

জবাবে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, ‘তারা তো আমার কাছে একটা বিশ্বাস নিয়ে আসে। আমি যখন পানিটায় ফুঁ দিই, আল্লাহর কালাম পড়েই ফুঁ দিই। এই বিশ্বাসে হয়তো ওর কাজ হবে। কিন্তু আমি যদি পয়সাটা না নিই, তাহলে সে ভাববে যে হুজুর পয়সা নেন নাই, তাহলে এটা দিয়ে কোনো কাজ হবে না। মনে মনে সে বিশেষভাবে আঘাত পাবে। কাজেই আমি পয়সা নিই আর মুরিদদের কাছ থেকে নেওয়া এসব পয়সা তো বাবা আমি আমার নিজের জন্য ব্যবহার করি না। অন্য কারও কাজে আমি টাকাটা দিয়ে দিই।’

পীরগিরিতে তাঁর কোনো বিশ্বাস ছিল কি না, জানি না। তবে আমরা জিজ্ঞেস করলে এই কথাটাই বলতেন যে ‘আমি তো আল্লাহ পাকের কালাম পড়ে ফুঁ দিলাম, ওর এখন যদি তাতে কাজ হয়, তাহলে হবে।’ আমরা যাঁরা মওলানার পেছনে সমবেত হয়েছিলাম, আমাদের মনেও এ রকমের একটা প্রশ্ন জাগত—আমরা যে রাজনৈতিক নেতার পেছনে সমবেত হয়ে কাজ করছি, যিনি কুসংস্কার বিশ্বাস করেন। সত্যি বলতে কি, বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিতে আমরা মওলানার এ-জাতীয় কাজকর্মকে বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারতাম না।

১৩. প্রসঙ্গ শেখ মুজিব

রাজনৈতিক সময়টা তখন—১৯৫৫-১৯৫৬ সাল, তার পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে এসে ন্যাপ তৈরি হলো, এ সময় পরিসরে শেখ মুজিবের সঙ্গে আমার কখনো কোনো ধরনের যোগাযোগ হয়েছে কি না, এ রকম প্রশ্নের জবাবে বলতে হবে, না, সে রকমভাবে কিছু হয়নি। আমি শুধু একটা কথা বলতে পারি, একদিন আমি নিজে উপযাজক হয়ে তাঁর কাছে গিয়েছিলাম। তখন তিনি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী। তাঁর সম্পর্কে অনেক রকমের কথাবার্তা হচ্ছিল তখন। ফলে আমার নিজের কাছেই খুব খারাপ লেগেছিল। আমি একদিন তাঁর কাছে গিয়ে বলেছিলাম যে ‘দেখো, তোমার সম্পর্কে তো নানা রকমের কথাবার্তা হচ্ছে।’

কথাটা শুনে আমাকে বললেন, ‘মোখলেস ভাই, আমি কী করব?’

আমি বললাম, ‘যদি তুমি আমার কথা শোনো তাহলে তুমি মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দাও। পার্টির সচিব থাকো। মন্ত্রীর পদটা ছেড়ে দাও। দুটো পদ ধরে রাখায় তোমার সম্পর্কে অনেক রকমের কথা হচ্ছে।’ কথাটা বলেছিলাম হাসতে হাসতেই। কিন্তু শেখ মুজিব সাত দিনের মধ্যেই মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়ে বেছে নিয়েছিলেন দলের অর্থাত্ আওয়ামী লীগের সচিবের পদ। ওই একটা দিনই আমি তাঁর কাছে গিয়েছিলাম। অবশ্য গিয়েছিলাম অন্যের একটা কাজে এবং তখন এই কথাটা তাঁকে বলেছিলাম। কথাটা তিনি রেখেছিলেন।

শেখ মুজিবের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাত্ হয় গোপালগঞ্জে। আমি তখন দশম শ্রেণিতে পড়ি। আমার বেরিবেরি অসুখ হলে সেই অসুখে আমার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে পড়েছিল। একটা নার্সিং টিম হয়েছিল। সেই নার্সিং টিমে শেখ মুজিব ছিলেন। আমি যখন মিশন স্কুলে, তিনি তখন টাউন স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়তেন। আমি ওখানে পড়তে গিয়েছিলাম, আমার দুলাভাই আলী আহম্মদ সাহেব তখন ওখানে বদলি হয়েছিলেন বলে। তাঁর সঙ্গেই আমি গোপালগঞ্জে যাই। আমার দুলাভাই তখন সেকেন্ড অফিসার ছিলেন, মানে এসডিওর পরেই তাঁর স্থান ছিল। গোপালগঞ্জের যেসব ঘটনা আমার মনে পড়ে, সেগুলো বেশ ইন্টারেস্টিং। কারণ, মেদিনীপুর পর্যন্ত আমি হাফপ্যান্ট পরতাম। গোপালগঞ্জে এসে পারিবারিক ইনফ্লুয়েন্সে পড়ে আমাকে ধুতি পরতে হয়। হাফপ্যান্ট আমি পরতে পারি না দশম শ্রেণির ছাত্র বলে। ব্যাপারটা দৃষ্টিকটুও লাগে। সিনিয়র মোস্ট স্টুডেন্ট হওয়ায় আমি এ সময় খুবই মানসিক সংশয়ের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। কারণ, গোপালগঞ্জে একটা জায়গা ছিল, যেখানে নমশূদ্র আর মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে সাংঘাতিকভাবে একটা উত্তেজনাকর অবস্থা বিরাজ করছিল। এই প্রথম এখানে আসার পর হিন্দু-মুসলমানের মধ্যকার এই উত্তেজনার ব্যাপারটা আমি দেখেছিলাম। এমন কিছু কিন্তু আমি মেদিনীপুরেও দেখিনি। এসব ঘটনা যখন ঘটছে, তখন আমি দশম শ্রেণিতে পড়ি। সালটা ’৩৪-’৩৫ হবে। এখানে এসে তখন আমি পায়জামা পরা ধরলাম। অথচ আমার পরার কথা ছিল ধুতি। কিন্তু ধুতি পরার সাহসই আমি পেলাম না। আমাকে পায়জামা ধরতে হলো। আর এমনটা আমাকে করতে হলো ওই হিন্দু-মুসলমান টেনশনের জন্য। ওখানে ওয়াহিদুজ্জামান১২ পায়জামা পরতেন কিন্তু শেখ মুজিব পরতেন লুঙ্গি। গোপালগঞ্জ শহরে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা না হলেও কোটালীপাড়া আর যেখানে যেখানে নমশূদ্র আর মুসলমানদের বসবাস ছিল, সেসব জায়গায় প্রায় প্রায়ই একটা দাঙ্গা লেগেই থাকত। এবং সেখানে বিভেদ ও বিভক্তি দিন দিনই বেড়ে যেতে থাকে।

অবশ্য দাঙ্গার কারণ সম্পর্কে আমি অতটা জানতাম না, বুঝতেও পারিনি। কিন্তু দাঙ্গা হচ্ছিল এবং সাংঘাতিকভাবে। মুসলমানেরা আমার দুলাভাইয়ের কাছে আসত। হিন্দুরা চলে যেত কে এল ব্যানার্জি বলে এফএসডিওর কাছে। সম্পূর্ণ সমাজটাই তখন স্পষ্ট দুভাগে বিভক্ত। আমাদের ওঠাবসা ইত্যাদি সবকিছুই ছিল ওই হিন্দু-মুসলমান অফিসার যারা ছিল, তাদের সঙ্গে। তাদের মধ্যে একটা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিদ্যমান ছিল। কিন্তু তার বাইরে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সদ্ভাব বলতে ছিলই না। মেদিনীপুরেও আমি এমন কিছু দেখিনি।

যা বলছিলাম, আমাদের সেবা-শুশ্রূষা করার জন্য যে টিম গঠন করা হয়েছিল, শেখ মুজিব সেই টিমের সঙ্গে ছিলেন। ফলে ওই বয়সে খুব কাছাকাছি থেকে আমি তাঁকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। সপ্তম শ্রেণির সেই ছাত্রের মধ্যে নেতৃত্বের কিছু লক্ষণ দেখতে পেয়েছিলাম। তিনি বেশ বলিষ্ঠভাবে কথাবার্তা বলতেন। আমাকেও তিনি একটু মান্য করতেন। কারণ, তখনকার দিনের সপ্তম শ্রেণির ছেলেরা দশম শ্রেণির ছেলেদের যেভাবে সম্মান করতেন, আমার ব্যাপারেও সেটা তিনি বরাবরই মেনে চলেছেন। এই সময় মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে রাজনৈতিক কোনো ব্যাপারস্যাপার তেমন লক্ষ করা যায়নি। তবে ওই যে সাম্প্রদায়িক ব্যাপার, তার ঘূর্ণিপাকে পড়ে আমরাও প্রভাবিত হয়ে গিয়েছিলাম। মুজিব একটু বেশিই প্রভাবিত হয়েছিলেন। কারণ, ওর বাড়ি তো গোপালগঞ্জেই। তাঁর মধ্যে নেতৃত্বের গুণ ওই সময়ই দেখা গিয়েছিল। কেবল অসুস্থ আমাকে সেবা করাই না, আমার মতো হয়তো আরও দু-চারজনকে নিশ্চয়ই সেবা করতেন। তা না হলে আরও ছাত্র থাকতে শেখ মুজিব আসবেন কেন আমাকে নার্সিং করতে! নিশ্চয়ই তাঁর এদিকে একটা প্রবল প্রবণতা ছিল।

ওই সব বয়সের ছেলেপেলেদের মধ্যেও নেতৃত্বের, সাংগঠনিক দক্ষতার যে একটা ব্যাপার আছে, সেটা লক্ষ করা যায়। অনেককে জড়ো করার মতো প্রবণতাও লক্ষ করা যায়! ফুটবল খেলা নিয়েই হোক বা একটা সেবামূলক কাজ নিয়েই হোক, শেখ মুজিবের মধ্যে এ রকম কিছু দেখা গিয়েছিল কি না, আমি বলতে পারব না। কেননা, আমরা দুজন দুই স্কুলে পড়তাম। আমি পড়তাম মিশন স্কুলে, মুজিব পড়তেন টাউন স্কুলে। কাজেই সেভাবে আমি তাঁর গুণাবলি সম্পর্কে জানি না কিন্তু আমার অসুস্থতার সময় তাঁর ওই সেবাকর্মের ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছিলেন ওহিদুজ্জামান (ঠান্ডা মিয়া) এবং তিনিই শেখ মুজিব ও তাঁর সহযোগীদের জোগাড় করে এনেছিলেন।

চল্লিশের দশকে আমি কলকাতায়। শেখ মুজিবও তখন সেখানে। ইসলামিয়া কলেজে পড়তেন। তখনো তাঁকে আমি খুব ঘনিষ্ঠভাবে দেখার সুযোগ পাইনি। কারণ, তাঁরা ছিলেন সোহরাওয়ার্দী গ্রুপের সঙ্গে। আমরা ছিলাম ঢাকা গ্রুপের সঙ্গে। ঢাকা গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন নাজিমুদ্দিন, শাহাবুদ্দিন, ফজলুর রহমান প্রমুখ। আর ওটা, শেখ মুজিবের গ্রুপটা হলো সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে। অল বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্ট লীগ সোহরাওয়ার্দী গ্রুপের সঙ্গে বেশি সংযুক্ত ছিল। আমরা ঢাকাকেন্দ্রিক যাঁরা ছিলাম, তাঁরা অল বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্টস লীগের মধ্যে ছিলাম না। ১৯৪২ পর্যন্ত আমি ছিলাম ঢাকায়। অল বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্টস লীগ শেষ পর্যন্ত যাদের হাতে গিয়ে পড়ে, সেটা তো প্রো-মওলানা আকরম খাঁ অথবা প্রো-নাজিমুদ্দিনের লোকজনের হাতে, যেমন: আনোয়ার সাহেব, শাহ আজিজুর রহমানের১৩ মতো লোকজনের নেতৃত্বে।

আনোয়ার অবশ্য শহীদ সাহেবের লোক ছিলেন আগাগোড়া। আর শাহ আজিজুর রহমান ওয়াজ নট এ ফ্যাক্টর ইন দ্য মুসলিম স্টুডেন্টস লীগ।

চল্লিশের দশকে শেখ মুজিবের ভূমিকা সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয়, তাঁরা মুসলিম স্টুডেন্টস লীগ করতেন। কিন্তু ঢাকা থেকে যে ছাত্র আন্দোলন হতো সেটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সম্পূর্ণ স্বাধীন। ঢাকাতেও স্টুডেন্টস মুসলিম লীগ ছিল বলে যে কথা বলা হয়, এখানে তার কোনো অস্তিত্ব ছিল না।

একটা ঢিলেঢালা প্রতিষ্ঠান ছিল। ছিল ঢাকা ইউনিভার্সিটি-কেন্দ্রিক একটা প্রতিষ্ঠান। এখানকার ছাত্র কারা কারা আমার সঙ্গে ছিলেন, সে কথা এখন আর মনে পড়ে না।

তবে আমাকে যে রাসটিকেট করা হয়েছিল কেন, সে সম্পর্কে একটু না বললেই নয়।

১৪. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাসটিকেট

১৯৪২ সালে আমাকে রাসটিকেট করা হয়েছিল। কেননা, আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে ৩০-৪০ জন ছাত্র নিয়ে ফজলুল হক সাহেব যে শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন, তার বিরুদ্ধে আমরা একটা আন্দোলন গড়ে তুলেছিলাম। সেই আন্দোলনটা আমরা করি তখনকার ইস্টবেঙ্গল অর্থাত্ আজকের বাংলাদেশে। আমাকে শহীদ সাহেব তখন নর্থবেঙ্গলের দায়িত্ব দিয়েছিলেন সেখানে সবকিছু সংগঠিত করার জন্য। তারপর দু-দুটো উপনির্বাচন হলো। সেটাতে ফজলুল হক সাহেবের প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে গেল।

এসব কিছু হওয়ার পর ফজলুল হক সাহেব এখানে এলেন। ঢাকার নবাব তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন। তিনিই তাঁকে এখানে নিয়ে আসেন। আমরা ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনে তাঁকে কালো পতাকা দেখাই এবং মার খাই। শহীদুল্লাহ সাহেব তখন ফজলুল হক হলের প্রভোস্ট। তিনি সাতজন ছাত্র নিয়ে স্টেশনে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে গিয়েছিলেন। আমি তখন ফজলুল হক হলে থাকি। ওইখানে সংসদীয় ব্যবস্থা ছিল। আমি তখন প্রিমিয়ার। আমাদের সমর্থকেরা মিলে ঠিক করল, যে সাতজন ফজলুল হক সাহেবকে অভ্যর্থনা জানাতে গেছে, তাদের মার দিতে হবে।

আমি বললাম, ‘ভাই, আমি কী করে এর মধ্যে সক্রিয়ভাবে থাকি!’ আরও বলি, ‘আমরা মার খেলাম, যারা আমাদের মার দিল, তাদের আমরা এই বলে বোঝাব, শহরের মধ্যে চলো, মাথায় পট্টিটট্টি বাঁধা আছে, চলো চাখানায় গিয়ে বসি।’ তাদের এভাবে প্রভাবিত করি। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো কিছু করার ব্যাপারে অর্থাত্ মারপিট-টারপিট করার ব্যাপারে আমি রাজি ছিলাম না। কিন্তু আমার দলের স্বার্থে আমি বললাম, ‘আমি ডাইনিং হলে বসে বাতি বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে যা করার তোমরা কোরো।’

ফজলুল হক হল তখন ছিল মেডিকেল বিল্ডিংয়ের নিচে। ওখানে বেশ ভালোমতোই হামলা চালানো হয়েছিল। তার মধ্যে এ কে নাজমুল করিমের বিছানাপত্র ফেলে দেওয়া হয়েছিল। মানে সাতজন যারা ছিল, তাদের বিছানাপত্র ইত্যাদি পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল।

এসব কিছুর জন্য আমাকেই দায়ী করা হলো। আমি এমএ সেকেন্ড পার্ট দিচ্ছিলাম, তার কয়েক দিন আগে আমাকে রাসটিকেট করা হলো। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ওটা তুলে নেওয়া হয়েছিল। রাসটিকেট তুলে নেওয়ার পর ঢাকা ইউনিভার্সিটি আমাকে নিয়োগ দেয়। অ্যাডভাইজরি ব্যুরোর একটা খণ্ডকালীন চাকরি দেয়। তাতে করে আমার একটা সুবিধা হলো যে আমি ওটাও করতাম, পাশাপাশি মুসলিম লীগও করতাম। তবে ঢাকায় নয়, কলকাতায় বসে। ১২ নম্বর ডালহৌসি স্কয়ারে আমার এক কামরার একটা অফিস ছিল, সেখানে একজন ক্লার্ক, একজন টাইপিস্ট এবং একজন পিয়ন ছিল।

১৯৪২ সালের যে ঘটনা ইউনিভার্সিটির ফজলুল হক হলে ঘটছে, শ্যামা-হক মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে, সেই সময় শহীদুল্লাহ সাহেব ছিলেন প্রভোস্ট। শহীদুল্লাহ সাহেবের বিরুদ্ধে তখন মামলা হয়েছিল। আমরা তো মেইন সুইচটা অফ করে দিয়েছিলাম। সুতরাং শহীদুল্লাহ সাহেব ওই কোনার বাড়িতে থাকতেন, যেটাকে তখনকার দিনে চামেলী হাউস বলা হতো। ঘটনা সামাল দিতে উনি আর কাজী মোতাহার হোসেন১৪ সাহেব দুজনেই ছুটে আসেন। শহীদুল্লাহ সাহেব সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে থাকেন। তার হাতে একটা টর্চ ছিল। তিনি সেটা জ্বেলে সবার মুখে মারতে শুরু করেন। ছেলেদের শনাক্ত করার জন্য। এই অবস্থায় একটি ছেলে করল কি, তাঁর হাতে আঘাত করে টর্চটা ফেলে দিল। তারপর শহীদুল্লাহ সাহেবকে নিয়ে একটা ঠেলাঠেলির মতো ঘটনা ঘটে। ফলে সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে তিনি নিচের দিকে পড়ে যান। আমি তাঁকে টেনে ধরে তুলি। যদিও আমি ওই ঠেলাঠেলির মধ্যে ছিলাম না। আমি বলতে পারব না তিনি কিসের জন্য হক সাহেবের পক্ষ নিয়েছিলেন।

১৫. চট্টগ্রামে ব্যবসা জীবন

১৯৪৮ সালে আমি চট্টগ্রামে গিয়ে আমার ব্যবসায়িক জীবন শুরু করি। কীভাবে আমি দেশের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হলাম, কীভাবে তখনকার রাজনীতিকে প্রভাবিত করলাম, সে কথা বলতে গেলে আমাকে চট্টগ্রামের সেই সময়কার ব্যবসার পরিবেশ সম্পর্কে বলতে হবে। আমি নিজে ব্যবসায়ী হয়ে গেছি হঠাত্ করে। ব্যবসায়ী হওয়ার আমার কোনো দিন কোনো পরিকল্পনা ছিল না। আমার পরিকল্পনা ছিল আমি রাজনীতি করব। কিন্তু সেখানটায় একরকম গোলমাল হয়ে যাওয়ার পর আমি একটা সরকারি চাকরি নিতে বাধ্য হই। আর সেই চাকরিই আমাকে চট্টগ্রামে নিয়ে যেতে বাধ্য করেছিল। তবে সেখানে চাকরিবাকরি করার যে পরিবেশ ছিল, তার সঙ্গে আমি খাপ খাইয়ে নিতে পারছিলাম না। ফলে ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চাকরি ছেড়ে দিই। চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সময় আমার হাত একেবারেই শূন্য ছিল। কোনো ধরনের টাকাপয়সা ছিল না। চাকরি করা অবস্থায় কিছু লোককে আমি কিছু সাহায্য করেছিলাম। আমি পদত্যাগ করতে গেলে আমার সহকর্মীরা এসে আমাকে পদত্যাগপত্র তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দিতে লাগল।

আমি বললাম, ‘আমি তো চাকরি করতে পারব না। কারণ, আপনাদের সঙ্গে আমার বনিবনাই হচ্ছে না। ফলে আমার মনে হয়, আপনাদের সঙ্গে আমার একটা গোলমাল সব সময় লেগেই থাকবে, তাই আমি স্বাধীনভাবে কিছু করতে চাই।’ এই খবর শুনে আমার যাঁরা সাহচর্যে ছিলেন, বন্ধুবান্ধব যাঁরা ছিলেন, তাঁদের সবাই ছুটে এলেন। তার মধ্যে একজন লোক, যাঁকে আমি শাহাবুদ্দিন সাহেবকে বলে পেপার কন্ট্রোলের ইন্সপেক্টর করেছিলাম, সেই তিনি পেপার কন্ট্রোলের অফিস চট্টগ্রামে এসে হয়ে গেলেন সিনিয়র মোস্টম্যান। তাঁর নাম ছিল শামসুদ্দিন। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে তিনি আমার জুনিয়র ছিলেন। শামসুদ্দিন এসে বললেন, ‘ভাই, আপনি কী করবেন?’

আমি বললাম, ‘আমি তো জানি না।’

বললেন, ‘আপনি যদি কাগজ আমদানি করেন, তাহলে আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি।’

আমি বললাম, ‘আমি তো আমদানি-টামদানির কিছুই জানি না, বুঝি না।’

এ কথা শোনার পর তিনি বললেন, ‘আপনাকে কিছুই করতে হবে না। আপনি কেবল একটা ফার্মের নাম বলেন।’

আমি বললাম, ‘তাহলে তো একটু চিন্তা করতে হবে।’ তাঁরাই কয়েকজন মিলে আমার ফার্মের নাম ঠিক করেছিলেন ‘ওভারসিজ ট্রেডার্স’। বললেন, এই প্রতিষ্ঠানের নামে কিছু কাগজপত্র, প্যাড ইত্যাদি ছাপতে হবে। সেগুলো জমাটমা দিয়ে এলসি খুলতে হবে।

আমি বললাম, ‘এসব আনুষ্ঠানিকতারও আমি কিছুই জানি না।’

তখন তিনি বললেন, ‘কোনো ব্যাংকের কারও সঙ্গে কি আপনার জানাশোনা আছে?’

সেন্ট্রাল ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার এক পার্মি ভদ্রলোক ছিলেন। তাঁর নাম ভ্যাসানিয়া। তিনি আমাদের সঙ্গে ব্রিজ খেলতেন। সব শুনে ভ্যাসানিয়া বললেন, ‘তোমার টাকাপয়সা কত আছে?’ আমি বললাম, ‘তোমার ওখানেই তো অ্যাকাউন্ট। দেখে নিয়ো।’ মাত্র ৬০০ টাকার মতো ছিল আমার ওই ব্যাংক অ্যাকাউন্টে।

তিনি বললেন, ‘এই টাকার বিপরীতে তো আর এলসি খোলা যাবে না। তবে এক কাজ করি, তোমাকে আমি নিল মার্জিনে এলসি খুলে দিচ্ছি।’ তারপর তিনি নিল মার্জিনে এলসি খুলে দিলেন এবং বললেন, ‘দলিল-পত্র সব আমার কাছে আসবে। তুমি আমাকে না জানিয়ে কিছু করতে পারবে না।’ আমি সবকিছুতেই রাজি হলাম। মাস খানেকের মধ্যেই অর্থাত্ কনসাইনমেন্টশিপ করার এক মাসের মধ্যেই এই ১০ হাজার টাকার কনসাইনমেন্টে আসা কাগজই বিক্রি হলো সাড়ে সাত হাজার টাকা লাভে। আমি ব্যবসায়ী হয়ে গেলাম। এবং এটা শুধু আমার বেলাতেই নয়, যাঁরা তখন ব্যবসা করতেন, এই কাগজই তিন থেকে চার হাত ঘুরত। আর আমার কিছুই ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল না। আমার চেয়েও যাঁদের একটু বেটার সংযোগ ছিল, তাঁরা আমার চেয়েও বড় ব্যবসায়ী হয়ে গেলেন। এবং ইন্ডিয়াতে যাঁরা ব্যবসায়ী ছিলেন এবং যাঁরা সেখান থেকে এখানে এসেছেন কিংবা ওয়েস্ট পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন, তাঁরা আমাদের চেয়ে আরও অনেক বড় ব্যবসায়ী হয়ে গেলেন এবং সেই পিরিয়ডটা এমনই ছিল যে তখন লাইসেন্স-পারমিটের কোনো প্রয়োজন ছিল না। কেবল জানতে হতো যে কী জিনিস আমদানি করবেন, কী জিনিস বাজারে চলবে, কোথা থেকে তা পাবেন এবং ব্যাংকের সঙ্গে আপনার কতটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং থাকা দরকার ইত্যাদি। সুযোগ-সুবিধার দরজা ছিল অবারিত। বিশেষ করে, কতগুলো আইটেমের ব্যাপারে। যেমন: কাপড়, সুতা এসব কিছু ছিল জেনারেল আইটেম। এগুলো আমদানি করে মানুষ অজস্র পয়সা করে এবং এই যে ট্রেন্ডটা বন্ধ হয়ে গেল। কাজেই যেসব বাঙালি অপরিণামদর্শী আমদানিকারক ছিলেন, মানে যাঁরা এখান থেকে কিছুই সঞ্চয় করেননি, ভেবেছিলেন, এ রকমই চলবে, তাঁরা ভয়ানকভাবে ধাক্কা খেলেন।

চট্টগ্রামে একটা ঘটনা ঘটেছিল এ রকমেরই। সদরঘাট রোডে। একটা হেয়ার কাটিং সেলুনকে পাঁচ হাজার টাকা সেলামি দিয়ে তাকে পরিণত করা হয়েছিল একটা ইমপোর্ট-এক্সপোর্টের ফার্মে। ভাবুন, ইভেন এ হেয়ার কাটিং সেলুন ওয়াজ কনভার্টেড ইনটু এ ফার্ম। এভাবে চলছিল। আর ঠিক যখন স্লাপটা এল, তখন ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা বেশির ভাগ ইমপোর্টের ব্যবসা থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে চলে গেল। শুধু যে ইমপোর্টার হিসেবে সুবিধা ছিল, তা-ই নয়, এই যে বড় বড় অবাঙালি ইমপোর্টার, তাঁদের কাছ থেকেও মাল কিনে দুই হাত তিন হাত করে বিক্রি করে অনেকে বিস্তর টাকাকড়ি করেছিলেন। কিন্তু যখন এই স্লাপটা এল, তখন এসব বাঙালি ব্যবসায়ীর শতকরা ৫০ ভাগ ব্যবসা ছেড়ে চলে গেলেন। এবং এই যে উদ্বৃত্ত পুঁজিটা, এই যে কাপড় আর সুতার ব্যবসা করে জমে ওঠা উদ্বৃত্ত পুঁজিটা ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তাঁরা নিয়ে গেলেন তখনকার পশ্চিম পাকিস্তানে। যখনই এই ওজিএলটা বন্ধ হয়ে গেল, তখন দুটো ব্যাপার ঘটল। ওজিএলের পারফরম্যান্সের ওপর একটা হাফ ইয়ার্লি কোটা দেওয়া হতো। যেখানে আমি কাগজ আমদানি করতাম এক বছরে পাঁচ লাখ টাকার কাগজ, আমার অর্ধবছরের কোটা হলো আড়াই লাখ টাকা। আড়াই লাখ টাকার কাগজ আমি আমদানি করতে পারতাম। তেমনি কাপড় আর সুতার বেলায়ও ওই রকম ব্যাপার ঘটল। তাঁদের কাছে যে উদ্বৃত্ত পুঁজিটা ছিল, সেটা তাঁরা বিনিয়োগ করলেন গিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের কাপড়ের মিলে। এভাবে সেখানে ১০টা কাপড়ের মিল একই সঙ্গে দাঁড়িয়ে গেল। আমাদের এখানে আমরা অত বড় স্কেলে ব্যবসা করতে পারিনি। ব্যবসা করলেও আমরা পেছনের দিকটা ভাবিনি। ভাবলাম এ রকমই চলবে। যা-ই ব্যবসা হয়েছে, গাড়ি-বাড়ি করে সব শেষ করে দিয়েছেন এবং এর ফায়দা নিতে পারেননি। এই গেল একটা দিক এবং দ্বিতীয় দিক যেটা সেটা হলো যে পাকিস্তানের অর্থ মন্ত্রণালয় হঠাত্ করেই একটা অদ্ভুত রকমের আদেশ জারি করে দিল। ফলে আমাদের স্থানীয় পুঁজি যেটা ছিল, আমি জানি চাটগাঁয়ে বহু লোকের হাতে অনেক পয়সা ছিল, কিন্তু তাঁরা লগ্নি করতে পারতেন না এবং এটা নিয়ে আমরা অনেক দেনদরবারও করেছি। কেন লগ্নি করতে পারলেন না? কারণ, অর্থ মন্ত্রণালয় এই বলে একটা আদেশ জারি করল যে যদি কোনো পুঁজিকে প্রমাণ করা যায় যে এটা উদ্বাস্তু পুঁজি, তাহলে তার জন্য কোনো ধরনের জবাবদিহি করতে হবে না। এই আদেশের অর্থ হলো এই পুঁজিটা তুমি কোথা থেকে পেলে? আর যদি এটা উদ্বাস্তু পুঁজি হিসেবে প্রমাণিত না হয়, তাহলে বুঝতে হব যে সে অতীতে কর ফাঁকি দিয়ে এই পুঁজি গড়ে তুলেছে এবং এ জন্য অ্যাট সোর্স ফরটি পারসেন্ট কেটে নেওয়া হবে। যে ক্যাপিটালটা সে প্রদর্শন করবে তার শতকরা ৪০ ভাগ অ্যাট সোর্স কেটে নিয়ে তার ওপর যে আয়, সেটার ওপর কর বসানো হবে। এটা একটা সাংঘাতিক ধরনের বাধা ছিল। কারণ, চাটগাঁয়ের বহু লোকের হাতে বহু পয়সা ছিল, কিন্তু কেউ সে টাকা বের করতে পারেনি। এই একই লোক চাটগাঁয়ের হাতি কোম্পানি আর কলকাতার আমীন এজেন্সির মালপত্রের ব্ল্যাক করেছে। কিন্তু হাজি কোম্পানি যেহেতু ইস্ট পাকিস্তানের এবং হাতি কোম্পানি চিটাগাংয়ের, তাই তারা কলকাতার ব্ল্যাকের টাকাকে হোয়াইট করতে পারছে না, কিন্তু আমীন এজেন্সি পারছে। কারণ, সে বলছে তারটা রিফিউজি ক্যাপিটাল। এই যে একটা বৈষম্য, এটাই একটা সাংঘাতিক প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেল। এ জন্যই চট্টগ্রামের বহু লোকের হাতে বহু টাকাপয়সা থাকলেও সেটা তাঁরা ব্যবসায় খাটানোর সুযোগ না পেয়ে আজেবাজে পথে খরচ করে উড়িয়ে দিলেন এবং এটা নিয়ে বহু রকমের দেনদরবারও করা হয়েছে। এমনকি ফজলুর রহমান সাহেবসহ অন্যান্য মন্ত্রীকেও এ ব্যাপারে বলা হলেও কেউ কিছু করতে পারেননি। বস্তুত বড় ব্যবসায়ে যাঁরা এলেন, পাট বা কাপড়ের ব্যবসায়, তাঁরা রাজনীতির সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হয়ে গেলেন, সে ব্যাপারে কথা বলতে গেলে, একটু ব্যাখ্যা না দিলেই নয়।

১৬. স্থানীয় ব্যবসায়ীদের রাজনীতির সঙ্গে যোগাযোগ

পাকিস্তানের যে রাজনীতিটা, আমার মতে সেটা ডিফেন্স কন্ট্রাক্ট গ্রুপ কন্ট্রোল করত। মানে মিলিটারি কন্ট্রাক্টে যারা ছিল, তাদের দিয়ে, বিশেষ করে আমেরিকা এসে পাকিস্তানের কাঁধে ভর করার পর থেকে ওখানে, মানে তখনকার পশ্চিম পাকিস্তানে, একটা সাংঘাতিক গ্রুপ দাঁড়িয়ে গেল, যারা ডিফেন্স কন্ট্রাক্টের সঙ্গে জড়িত ছিল এবং যখনই আমেরিকা একটা মিলিটারি এইড দেয়, সঙ্গে সঙ্গে সে ইকোনমিক এইডও দিতে শুরু করে অর্থাত্ একটা তাঁবেদার শ্রেণি ব্যবসায়ীদের মধ্যে সৃষ্টি করে। এটা পশ্চিম পাকিস্তান তথা পাকিস্তানভিত্তিক ছিল। তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিল এখনকার গ্রুপ দ্য জুট গ্রুপ ইন ইস্ট পাকিস্তান। এরা ডিসাইড করত এখানকার পলিসি। আমার নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এ কথা আমি বলতে পারি। কারণ, তখনকার দিনের আমীন এজেন্সির আবদুল জলিল নামের যে কর্মকর্তা ছিল, সে ছিল আমার খুব বিশিষ্ট বন্ধু। খুব অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল। তাকে আমি দেখেছি কীভাবে সে সবকিছু ম্যানিপুলেট করত। তার কাছ থেকে অনেক কিছু শুনেছি। তারা এখানে গভর্নর চেঞ্জ করত, তারা শেখ মুজিবকে রিলিজ দেওয়া হবে কি না, এমন ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নিত এবং শেষ পর্যন্ত এটুকু বলতে চাই যে মওলানা ভাসানীর একটা জিনিসের জন্যই তারা খুব হতাশা বোধ করেছে। বিশেষ করে, মওলানা ভাসানী যখন জ্বালাও-পোড়াও এসব আরম্ভ করলেন, তখন। এই গোষ্ঠীটা তখন খুবই হতাশ হয়ে গেল। আসলে তারা আওয়ামী লীগকে পছন্দ করত না কিন্তু যেহেতু মুসলিম লীগের কোনো অলটারনেটিভ তারা খুঁজে পাচ্ছিল না, সেই জায়গায় তারা মওলানা ভাসানীকে দাঁড় করিয়ে তাঁকে সাপোর্ট করতে চাচ্ছিল। আর সেটা তারা করছিল মওলানার জনসমর্থনের জন্য। কিন্তু তারা মওলানাকে বাগে আনতে পারছিল না। মওলানার ‘জ্বালাও-পোড়াও’ আন্দোলনে তারা ভীত-শঙ্কিত হয়ে পড়ে। এসবই আটষট্টি-উনসত্তর সালের দিকের ঘটনা।

কাজেই তারা অনিচ্ছুকভাবে শেখ মুজিবুরের সঙ্গে বোঝাপড়া করল এবং একটা ঘটনা এখানে বলছি যে মসিউর রহমান (যাদু মিয়া) এবার রাওয়ালপিন্ডি থেকে ফ্লাই করে এল। আমার বাসায় এসে আমাকে বলল, ‘আমি খুব একটা জরুরি কাজে এসেছি। আমাকে একটা নাম বলেন, যিনি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হতে পারবেন।’

আমি বলি, ‘এটা কী রকমের কথা। তুমি চায়ের টেবিলে বসে আমাকে ইস্ট পাকিস্তানের গভর্নর নমিনেট করতে বলছ!’

বলল, ‘না, ব্যাপারটা ভীষণ জরুরি। আজকে রাতেই আমাকে ফিরে যেতে হবে।’

আমি বললাম, ‘ব্যাপারটা কী বলো তো?’

তখন ইতিমধ্যেই আইয়ুবকে সরিয়ে ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসে গেছেন এবং ইয়াহিয়ার জন্য ওই একই জিনিস অর্থাত্ তাঁর সমর্থন দরকার। মওলানা ভাসানীকে এ ব্যাপারে অ্যাপ্রোচও করা হয়েছে। মওলানা ভাসানী বলেছেন, যাদু মিয়ার সঙ্গে কথা বলো। যাদু মিয়া এই বলে শর্ত দিয়েছেন যে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর যদি আমাদের কথামতো নমিনি করো, তাহলে তোমাকে সমর্থন দেব। অর্থাত্ পরবর্তী নির্বাচনের পর তাহলে তাদের সুবিধা হবে।

আমি যাদু মিয়াকে বললাম যে, ‘আমি তো এত তাড়াতাড়ি কিছু বলতে পারব না। তুমি এক দিন পেছাও। আমি একটু চিন্তাভাবনা করি।’ অনেক চিন্তাভাবনা করে আমার একজন পুরোনো বন্ধুর কথা মনে হলো। যাদু মিয়া বলল যে ‘এমন লোক দেবেন, যার ওপর আপনার কর্তৃত্ব থাকবে। আপনার কথা শুনবে।’ আমি অনেক ভাবনাচিন্তা ও তত্ত্বতালাশ করার পর দেখলাম খাজা মোহাম্মদ কায়সারকে মনোনয়ন দেওয়া যায়। সে তখন চীনে অ্যাম্বাসেডর।

নামটা বলার পর যাদু মিয়া খুব খুশি হলো। খাজা কায়সার১৫ হলে তো আমাদের রাজনৈতিক লাইনও ঠিক থাকছে। খাজা কায়সারের তখন অ্যাপয়েন্টমেন্ট হওয়ার কথা ছিল ডিফেন্স সেক্রেটারি হিসেবে। সুতরাং তিনি গ্রহণযোগ্য ছিলেন এবং তিনি কথিত জুট গ্রুপের কাছে বেশ পরিচিত ছিলেন।

আবদুল জলিলের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব ছিল। এসব কিছু আমি জানতাম। সুতরাং খাজা কায়সার ওয়াজ ইমিডিয়েটলি অ্যাকসেপ্টেড। যাদু মিয়া এখান থেকে টেলিফোন করে তাঁর নাম পেশ করল এবং তাঁরা জানালেন যে হি ইজ অ্যাকসেপ্টেবল টু আস।

তবু আমি যাদু মিয়াকে বললাম, ‘তুমি ওখান থেকে কনফার্ম করার পর আমি পিকিং যাব।’

এই জুট গ্রুপের প্রভাবে ইয়াহিয়া তাঁর মাইন্ড চেঞ্জ করে ফেললেন এবং খাজা কায়সারকে না নিয়ে তাঁরা নিলেন অ্যাডমিরাল আহসানকে। অ্যাডমিরাল আহসানের ছিল আদমজীদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠতা। আদমজীরাই তখন তো জুট গ্রুপটাকে লিড করত। তাই শেষ পর্যন্ত খাজা কায়সার না হয়ে অ্যাডমিরাল আহসান তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হলেন।

মওলানা ভাসানী এবং ন্যাপকে তারা শেষ পর্যন্ত পছন্দ করল না। বরং মওলানা ভাসানীর ‘জ্বালাও-পোড়াও’ নীতির জন্য তারা তাঁকে রীতিমতো ভয় করতে শুরু করল।

যাদু মিয়া ফিরে যাওয়ার আগেই শুনল যে অ্যাডমিরাল আহসানকে অ্যাপয়েন্ট করা হয়েছে। তখন সে তো খুব রেগেমেগে অস্থির। পাঞ্জাবের তোবাটেকসিংয়ে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় সে ইয়াহিয়ার চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করে ছাড়ল। যাচ্ছেতাই বলে তাঁকে গালাগাল করল। তাঁকে অভিহিত করল বিশ্বাসঘাতক বলে। কথা দিয়ে কথা রাখেননি—এ রকমের কথাবার্তা বলল প্রকাশ্য জনসভায়। এ জন্য যাদু মিয়াকে অনেক দিন গ্রেপ্তার করে রাখা হয়েছিল।

এই যে জুট গ্রুপের কথা বললাম, এই গ্রুপটাই প্রধানত আমাদের পূর্ব পাকিস্তানের নীতি ইত্যাদি নির্ধারণ করত। শুধু তা-ই নয়, তারা সরকারের কাছ থেকে সব রকমের সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদি আদায় করে নিত এবং তাদের ওখানে মিল-ফ্যাক্টরিতে যখন স্ট্রাইক-ফাইক হতো, তখন মিলিটারি এবং পুলিশ বাহিনী সব রকমভাবে ব্যবহার করে তারা এগুলোকে দমন করত। অ্যান্ড দ্যাট ওয়াজ দ্য রিজন যে এরা খুব একটা ডিটারমাইন্ড গ্রুপ হিসেবে এখানে এসেছিল, তারা সরকারের স্বার্থই রক্ষা করত। এ ধরনের দু-একটা উদাহরণ তুলে ধরা যায়। যেমন এই জুট গ্রুপই জাকির হোসেনকে সরায়। এই জুট গ্রুপই শেখ মুজিবকে রিলিজ করায়, বিশেষ করে, ষাটের দশকের শুরুর দিকে।

আবদুল জলিলের সঙ্গে যে আমার খুব ঘনিষ্ঠতা ছিল সে কথা আগেই বলেছি। একদিন হঠাত্ করে দেখি যে সে আর আমি দুজনেই ট্রেনে যাচ্ছি এবং একই কম্পার্টমেন্টের যাত্রী। আমীন জুট মিলের আবদুল জলিল। তারা এতটাই প্রভাবশালী ছিল যে প্রথম দিকে তারা ইস্টবেঙ্গল রেলওয়েকে ফাইন্যান্স করত। রেলের পরিচালনা সম্পৃক্ত যাবতীয় খরচাপাতির পুরো টাকাটাই তারা দিত। যে টিকিট বিক্রি হতো সেই টিকিটের টাকা থেকে তারা তাদের বিনিয়োগ করা টাকাটা কালেক্ট করত। ফলে তাদের সাংঘাতিক প্রভাব ছিল। তাদের ক্ষমতার প্রধান খুঁটি ছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। এই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক থাকায় তারা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করত। একমাত্র পাঞ্জাবিরা ছাড়া এই অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ বাঙালিরা কোনো দিনও পায়নি। এই শক্তির বলে তারা সামগ্রিক রাজনীতিটা নিয়ন্ত্রণ করত। জলিল অ্যান্ড দি আমীন গ্রুপ দে হ্যাভ দ্যাট ইন্টিমেসি উইথ দ্য ফাইন্যান্স মিনিস্ট্রি। তো যা বলছিলাম, দুজনে মিলে তো আমরা আসছি অর্থাত্ আমি আর আমীন জুট মিলের আবদুল জলিল। আমি জানতাম যে জাকির হোসেন তার বন্ধু। জাকির হোসেনের সঙ্গে আমাদেরও একটু আত্মীয়তা হয়েছিল। আলী আহম্মদ সাহেবের এক মেয়ের সঙ্গে জাকির হোসেনের ভাগনের বিয়ে হয়। সেই সূত্রে তার সঙ্গে আমাদেরও খুব অন্তরঙ্গতা ছিল। সেদিন ট্রেনে দেখা হতেই আবদুল জলিল জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে কথা বলতে আরম্ভ করল।

আমি বললাম, ‘কী ব্যাপার, হঠাত্ তোমার বন্ধুর বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করলে!’

জলিল বলতে লাগল, ‘নো, হি ক্যানট ডেলিভার দ্য গুডস।’

আমি বললাম, ‘অসুবিধাটা কোথায়?’

বলল, ‘না, শেখ মুজিবকে সে ম্যানেজ করতে পারছে না।’

আমি প্রশ্ন করলাম, ‘হঠাত্ তোমাদের শেখ মুজিবের প্রতি নজর পড়ল কেন? আমরা তো দেখছি না পূর্ব পাকিস্তানকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো আর কেউ আছে?’

‘আর কে আছে ইস্ট পাকিস্তানকে নিয়ন্ত্রণ করবে! আমরা কোনো বিকল্প খুঁজে পাচ্ছি না।’

আমি ওকে আর কিছু বলিনি। আমার দুই-একজন যাঁরা বন্ধুবান্ধব ছিলেন, তাঁদের বললাম যে আপনারা কয়েক দিনের মধ্যেই দেখবেন যে জাকির হোসেনকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং শেখ মুজিব মুক্তি পাচ্ছেন এবং কয়েক দিন পর সত্যি সত্যিই জাকির হোসেনকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং শেখ মুজিবকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। জাকির হোসেনের পরে গভর্নর হন মোনেম খান।

১৭. বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনা

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি যা কিছু ঘটেছিল, আমি নিজের চোখে যেটুকু দেখেছিলাম, এখানে তার বিবরণ:

সেদিন আমি সকালবেলা আমার নবাবপুরের অফিসে গিয়েছিলাম। সেখানে যাওয়ার পর শুনলাম ইউনিভার্সিটিতে গোলমাল হচ্ছে। ইউনিভার্সিটিতে ছাত্রাবস্থায় ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যেহেতু খুবই জড়িত ছিলাম, গোলমাল হচ্ছে শুনে আমি সেখানে চলে যাই। মেডিকেল কলেজের সেকেন্ড গেটটা যেখানে, সেখানে গিয়ে দেখলাম ছেলেপেলেরা সব শুয়ে পড়ে পিকেটিং করছে। আর এসপি ইদ্রিস সাহেবকে দেখলাম।

সকাল সাড়ে নয়টা কি দশটা এই রকম সময় হবে। এসবই গুলি হওয়ার আগেকার ঘটনা। গোলমাল হচ্ছে শুনে আমি ওখান থেকে চলে এলাম। এসে দেখলাম ওই গাছগুলোর নিচে জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক সাহেব এবং আরও কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছেন। রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে যেহেতু আমার অনেক দিনের পরিচয়, আমি ঠিক তাঁর পাশেই গিয়ে দাঁড়ালাম। এই সময় ইদ্রিস ছিল এখানকার এসপি। ছাত্রাবস্থায় ইদ্রিস যে আইপিএস পরীক্ষা দেয়, আমার জানামতে সে ব্যাপারে রাজ্জাক সাহেবের কাছে অত্যন্ত ঋণী। কারণ, রাজ্জাক সাহেবই তাকে পড়িয়েছিলেন। তিনি ওখানে দাঁড়িয়ে আছেন, আর চোখের সামনে ইদ্রিস পিকেটিংরত ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এ রকম ঘটনার মুখে একটা ছেলে ইদ্রিসের মুখে থুতু ছিটিয়ে দিল। আর তার মুখের ওপরই বলল, ‘তুমি না বাঙালি, তুমি এসব কী করছ?’ থুতু দেওয়ায় ইদ্রিসের ফরসা চেহারা মুহূর্তে লাল হয়ে গেল। রুমাল দিয়ে দ্রুত মুছে নিয়ে একটু এগিয়ে এসে বলল, ‘স্যার, আমি কিন্তু আর পারছি না। এখন গুলি করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’ তখন রাজ্জাক সাহেব বললেন, ‘আরে, এরা তোমার ভাইয়ের মতো। তুমি এদের ওপর রাগ করছ কেন?’ এ কথা বলে একজনকে বললেন, ‘যাও, ওয়াহিদ আলীর রেস্টুরেন্ট থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে এসো।’ পানি নিয়ে আসার পর ইদ্রিসকে তিনি বললেন, ‘তোমার মুখটা ধোও। উত্তেজিত হয়ো না।’

অল্পক্ষণের মধ্যে পরিস্থিতি একটু শান্ত হয়ে গেল। এর কিছুক্ষণ পর সম্ভবত ঘণ্টা দুয়েক পর আমরা ভাবলাম যে কোনো ঘটনা যেহেতু আর ঘটছে না, সবকিছু বোধ হয় এভাবেই আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে যাবে।

আমি থাকতাম ১৪ নম্বর বকশীবাজারে। রাজ্জাক সাহেব থাকতেন হোসেনি দালানে। আমরা রেললাইন ধরে এসে যার যার বাসায় চলে গেলাম। বাসায় গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে সবে খেতে বসেছি। অমনি কানের পর্দায় আছড়ে পড়ে গুলির আওয়াজ। আমি যতটুকু জানি যে ইদ্রিস এই গুলির মধ্যে ছিল না। এই গোলাগুলির নেপথ্যে ছিল তখনকার সিটি এসপি পাঞ্জাবি মাসুদ মাহমুদ। তাকে সরাসরি গুলি করার আদেশ দিয়েছিল প্রধান সচিব আজিজ আহম্মদ। তারই সরাসরি আদেশে সে এই গুলিটা চালায়। এই মাসুদ মাহমুদ পরে ভুট্টোর মামলার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল এবং সে ওই মামলার রাজসাক্ষী হয়েছিল। তার সাক্ষ্যের ওপরই ভুট্টোর ফাঁসি হয়ে যায়। এই হলো সেই মাসুদ মাহমুদ।

আরেকটা কথা, তখন আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ছাত্র ছিলেন, কারোর বা ছাত্রজীবন সবে শেষ হয়েছে। আমাদের কারও কারও মধ্যে আগাগোড়া ধারণা ছিল যে নুরুল আমিন সাহেবের প্রত্যক্ষ নির্দেশেই গোলাগুলি হয়েছে এবং এ জন্য নুরুল আমিন সাহেব নিন্দিত হয়েছেন, হয়েছেন ঘৃণার পাত্রও। কিন্তু এ ব্যাপারে আমার কোনো ব্যক্তিগত ধারণা নেই। আমি গোলাগুলির ঘটনার আগে এবং পরেও যতটুকু ভেবেছি এবং জেনেছি সেটা হলো এই যে আজিজ আহম্মদ এবং মাসুদ মাহমুদের উদ্যোগেই ঘটেছে গোলাগুলির ঘটনা। নুরুল আমিন সাহেব গুলির কোনো নির্দেশ দিয়েছেন কিংবা দেওয়ার মতো লোক ছিলেন বলে আমার মনে হয়নি। প্রশ্ন উঠতে পারে অ্যাসেমব্লিতে আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ১৬ প্রমুখ যখন নানা ধরনের প্রতিবাদ করতে শুরু করলেন, নুরুল আমিন সাহেব তখন তাঁদের পক্ষ সমর্থন করলেন না কেন? নিজেও হতাহত ব্যক্তিদের দেখতে এলেন না কেন? তাঁকে তো বারবার বলা হয়েছিল যে একবার সরেজমিনে দেখে আসুন। এ ধরনের অনুরোধ বা আহ্বানে কান না দেওয়ায় এ ধরনের ধারণা হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক ছিল যে নুরুল আমিন সাহেব এই গোলাগুলির ঘটনাকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু আমার সে রকমের ধারণা হয়নি। কেননা, নুরুল আমিন সাহেব ব্যক্তিগতভাবে খুব নরমপন্থী লোক ছিলেন। এবং আমি যতটুকু জানি তাঁর কাছে কোনো ধরনের কমপ্লিকেটেড বা জটিল বিষয়ের ওপর কোনো ফাইল গেলেই তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন না। তাঁর ধারণা ছিল, এ রকম কিছুর সমাধান আপনাআপনিই হয়ে যাবে।

একুশের রক্তাক্ত ঘটনার পরও যে নুরুল আমিন সাহেব ঘটনাস্থলে যাননি, আমার মনে হয়, সেটা চাকরি রক্ষা করার জন্যই করেছিলেন। এর পেছনে তাঁর অন্য আর কোনো ধরনের উদ্দেশ্য ছিল বলে আমার মনে হয় না। বস্তুত, তখন নুরুল আমিন সাহেব ছিলেন একটা জেলা শহরের একজন সাধারণ আইনজীবী মাত্র। তাঁর পক্ষে ইস্ট পাকিস্তানের চিফ মিনিস্টার হওয়া একটা বিরাট ব্যাপার ছিল। যাঁরা তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন, তাঁদের কাছ থেকে শুনেছি তিনি উকিল হিসেবে কোনো দিন দুই তরফা কেস করেননি। অর্থাত্ কম্পিটিশন করে যে কেস, আরগুমেন্ট করার মতো কোনো কেস তিনি নিতেন না। অর্থাত্ তিনি একতরফা কেস করতেন। যেখানে বিরোধী পক্ষ নেই, কনটেস্ট হবে না যে কেসে, সে ধরনের কেসের উকিল ছিলেন তিনি। কাজেই সে রকম একটা আইনজীবীর পক্ষে অথবা সে রকম পর্যায়ের একজন লোকের পক্ষে পূর্ব পাকিস্তানের চিফ মিনিস্টারশিপ একটা মস্ত বড় ব্যাপার ছিল। মামলায় উনি কোনো পক্ষ নিলে বরং তাঁর সুবিধা হবে এবং কনটিনিউ করতে পারবেন—এ রকম কোনো কিছু সম্পর্কে বোধ হয় তিনি খেয়ালই করেননি। তবে একটা কথা বলব যে আমি মওলানা ভাসানীর বক্তব্য শুনেছি। এই পল্টনের মার্চের বক্তৃতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি নুরুল আমিনের দুর্নীতির ফিরিস্তি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেছিলেন, ময়মনসিংহে তাঁর (নুরুল আমিনের) মর্মর পাথরের একটা বাড়ি আছে। সত্যি বলতে কি, একবার আমার ময়মনসিংহে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল এবং তখন সেখানকার যিনি ডিসি ছিলেন, তিনি আমার পরিচিত এবং আত্মীয়ও ছিলেন।

আমাকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি ময়মনসিংহের কোথায় যাবেন?’

আমি বললাম, ‘একটা জায়গা আমার দেখার ইচ্ছা আছে। নুরুল আমিন সাহেবের মর্মর পাথরের বাড়ি।’ যা-ই হোক, সে বাড়ি দেখতে গেলাম। তবে মর্মর পাথর তো আর দেখলাম না, দেখলাম অর্ডিনারি টাইলসের একটা বাড়ি।

মওলানা সাহেব যে শান্তি সম্মেলনে ইউরোপে গিয়েছিলেন, আমি তাঁর সঙ্গে সেই সম্মেলনে যাইনি। ফিরোজ খান নূন ছিলেন তখন প্রধানমন্ত্রী। শান্তি সম্মেলনে যাওয়ার জন্য এখান থেকে সাতজনের নাম ঠিক করা হয়। প্রথম দিকে সরকারি মহল থেকে জানানো হলো যে সাতজনকেই অনুমতি দেওয়া হবে। পরে সেই অনুমতিটা এল মাত্র তিনজনের জন্য। মওলানা সাহেব চাচ্ছিলেন, আমি তাঁর সঙ্গে যাই। কিন্তু অত লোককে ডিঙিয়ে নিজে যাব—এ ব্যাপারে আমি ইতস্তত করছিলাম। পরে একটা খবর পেয়েছিলাম, তবে কোন সূত্র থেকে পেয়েছিলাম, আমি জানি না। শুনেছিলাম, ইউরোপের শান্তি সম্মেলন থেকে ফেরার পথে মওলানা সাহেবকে কায়রোয় নামতে হবে। খবরটা শুনে মনে প্রশ্ন জাগল, তাঁকে কায়রো নামতে হবে কেন? অনেক ভেবেচিন্তেও ব্যাপারটার কূলকিনারা পেলাম না। পরে আমি শুনেছি যে কায়রোতে তাঁর নামার মূলে ছিলেন ইস্কান্দার মির্জা। কেউ কেউ মওলানা সাহেবকে এই বলে বুঝিয়েছিলেন যে এসব এনএপি বা ন্যাপট্যাপ দিয়ে আপনার সোশ্যালিজম হবে না। আমরা আর্মির লোক, আমরা ক্ষমতা দখল করলে সোশ্যালিজম কায়েম করব এবং আপনি কায়রোতে যান, গিয়ে দেখেন কর্নেল নাসের সেখানে কী করছেন! মওলানা সাহেব তাই কায়রোতে জার্নি ব্রেক করেন এবং সেখানে কয়েক দিন থাকেন। এভাবে সামরিক বাহিনী সমাজতন্ত্র সূচনা করবে—এ রকম একটা ধারণায় তিনি বিশ্বাসী হয়ে আসেন। পরে এ জন্যই বোধ হয় ইস্কান্দার মির্জাদের সঙ্গে তাঁর একটা সমঝোতা হয়ে যায়। তখন আমি তো এনএপির (ন্যাপ) রাজনীতির সঙ্গে খুব জড়িত ছিলাম এবং মওলানা সাহেব কোথাও যাতায়াত করতে গেলে টিকিট ইত্যাদির জন্য আমাকেই ডাকতেন। ডেকে বললেন যে ‘আমি করাচি যাব, আমাকে একটা টিকিট কিনে দাও।’ এর আগে মওলানা সাহেব আমাকে ডেকে বলেছিলেন যে ‘আমি ইস্ট পাকিস্তান ট্যুর করব। সব জেলার প্রতিটি মহকুমায় আমি যাব। একটা ট্যুর প্রোগ্রাম তৈরি করো।’ আমার বাসায় বসেই সেই ট্যুর প্রোগ্রাম তৈরি করে সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হলো। হঠাত্ করে কয়েক দিন পর উনি বললেন যে ‘টিকিট কিনে দাও, করাচি যাব।’

দুপুরবেলা খাওয়ার সময় আমি দলের অন্যদের বললাম যে ‘তোমরা ট্যুর প্রোগ্রাম করছ, আর মওলানা সাহেব তো করাচি যাচ্ছেন।’ তাঁরা বললেন, ‘আমরা তো এসবের কিছু জানি না।’

আমি বললাম, ‘আমি জানি। আমার কাছে তিনি করাচি যাওয়ার টিকিট চেয়েছেন।’

দলের অন্য সবাই যখন আমাকে বললেন যে ‘সিধু ভাই, আমাদের কাছে ব্যাপারটা কেমন যেন বেশ জটিল মনে হচ্ছে। আপনিও মওলানা সাহেবের সঙ্গে যান। ব্যাপারটার তাহলে একটা হিল্লে করা যাবে।’

আমি বললাম, ‘আমি কী করে যাব? মওলানা সাহেব তো আমাকে যেতে বলেননি।’

তাঁরা বললেন, ‘না, কোনো একটা ওজর-আপত্তি বের করে আপনাকে যেতেই হবে।’

আমি পরের দিন টিকিটটা মওলানা সাহেবের হাতে তুলে দিয়ে তাঁকে বললাম যে ‘আমিও করাচি যাচ্ছি। হঠাত্ করেই আমার একটা কাজ পড়ে গেছে।’ মওলানা সাহেব তেমন একটা খুশি হলেন না। বললেন, ‘ঠিক আছে, তুমি যাও।’ দুজন একসঙ্গেই এয়ারপোর্টে গেলাম। পথে কিংবা প্লেনে খুব কথাবার্তা তিনি আমার সঙ্গে বললেন না। কেন জানি গম্ভীর হয়ে থাকলেন। তারপর করাচিতে গিয়ে যখন নামলাম, তখন রাত ১১টা সাড়ে ১১টার মতো। দেখলাম মাহমুদুল হক ওসমানী তাঁকে নিতে এসেছেন। মওলানা সাহেব নিজের থেকে আমাকে তাঁর সঙ্গে যেতেটেতে বললেন না। তখন ওসমানী সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘রহমান সাব, আপকো ক্যায়া অ্যারেঞ্জমেন্ট?’

আমি বললাম, ‘আমি তো খবর দিতে পারিনি।’

বললেন, ‘ঠিক আছে, আজ রাতটার জন্য আমার এখানেই আপনি থাকুন।’

মওলানা সাহেবের সঙ্গে একই ঘরে আমার থাকার ব্যবস্থা করা হলো। আহারপর্বের পর একই ঘরে পৃথক বিছানায় শুয়ে পড়লাম। দুজনার মধ্যে তখনো তেমন কথাবার্তা নেই।

তিনি ঠাউরেছিলেন আমি ঘুমিয়ে গেছি। ভোরের দিকে দরজার আওয়াজ, পায়ের আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। মওলানা সাহেবকে পাঁচটার দিকে আবার তাঁর বিছানায় শুয়ে পড়তে দেখলাম। আমি জেগে চুপ করে থাকলাম।

তারপর সকাল হতেই আমি বেরিয়ে গিয়ে আমার এক সাংবাদিক বন্ধু ছিলেন, নাম আসরার আহম্মেদ,পাকিস্তান টাইমস-এর সংবাদদাতা, কফি হাউসে গিয়ে তাঁকে ধরলাম। তাঁকে সবকিছুই খুলে বললাম।

বললাম মওলানা সাহেবের ব্যাপারস্যাপারগুলো। যে জন্য আমার আসা, সে ব্যাপারে তো আমার প্রায় হেরে যাওয়ার দশা!

আমার কথা শুনে আসরার আমাকে বললেন, ‘ঠিক আছে, আপনি সন্ধ্যার দিকে আসেন। আমি যতটুকু জানি বলব।’

সন্ধ্যাবেলা যখন আমি গেলাম, তখন আসরার আমাকে বললেন, ‘মওলানা সাহেব হকমেবতে ইস্কান্দার মির্জার সঙ্গে দেখা করেছেন।’ তিনি যে এ কাণ্ড করেছেন, এ ব্যাপারে আমি মওলানা সাহেবকে আর কিছু বলিনি।

যা-ই হোক, আমি মওলানা সাহেবের সঙ্গেই ঢাকায় ফিরে এলাম। ফিরে আসার পর তিনি যথারীতি ব্যারিস্টার শওকতের রয়েল স্টেশনারির ওপরের তলার ঘরে গিয়ে উঠলেন। আমি আমার বাসায় চলে এলাম। আমার অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে আমার বাসাতেই দেখা হলো। আমার জন্য তাঁরা অপেক্ষায় ছিলেন। সবাই ন্যাপের।

তাঁদের মধ্যে ছিল মতিন, আবদুল হক। সম্ভবত তোয়াহাও ছিলেন। এখন সবার কথা মনে পড়ছে না। দেখা হওয়ামাত্র আমি তাঁদের বললাম, ‘ভাই, এই এই ব্যাপার ঘটেছে। আমি সরাসরি কিছু ধরতে পারিনি। তবে আসরারের কাছে যাওয়ার পর তিনি আমাকে এই এই বলেছেন।’ এ কথা তাঁদের বলার পর আমি এই বলে অনুরোধ করলাম যে ‘তোমরা অন্তত এসব ব্যাপারে মওলানা সাহেবকে আমার সামনে কিছু বলবে না। ঝগড়া-বিবাদ করবে না। আমি তাহলে খুবই অ্যামবারাস ফিল করব। মওলানা সাহেব আমার সম্পর্কে খারাপ ধারণা নেবেন। বাট দিস ইজ দ্য স্টোরি।’

সব শুনে তাঁরা গিয়ে মওলানা সাহেবকে ধরে বসলেন, ‘হুজুর, আপনি তো ট্যুর করতে চাইছিলেন। এখন ট্যুরের কী হবে?’

মওলানা সাহেব উত্তরে হঠাত্ করেই বলে বসলেন, ‘না, ওটা বাদ দিয়ে দাও।’

তাঁরা বললেন, ‘কেন? বাদ করে দেব কেন?’

মওলানা সাহেব এবার ধরা পড়ে গেলেন। এঁরা অনেক চাপাচাপি করতে লাগলেন, ‘না, বাদ করা যাবে না।’ মতিন তো একপর্যায়ে আস্তিন-টাস্তিনও গোটালেন। এ অবস্থায় মওলানা সাহেব একটু ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, ‘কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম থাকবে না।’

‘কেন থাকবে না?’

সবাই একযোগে তাঁকে ধরে বসল, ‘কী হয়েছে, আপনি সবটা আমাদের খুলে বলেন?’

মওলানা বললেন, ‘বাবা রাজনীতি আর করা যাবে না। “কৃষক সমিতি” তোমরা করতে পারবে। তোমরা এর বেশি আমার কাছে জানতে চেয়ো না।’

মতিন ও আবদুল হক তখন বললেন, ‘রাজনীতিই যদি করতে না পারব, তাহলে “কৃষক সমিতি” কেমন করে করতে পারব?’

মওলানা জবাবে বললেন, ‘ওটা একটা শ্রেণিগত প্রতিষ্ঠান। ওটা বোধ হয় করা যাবে।’

কিন্তু মতিনরা যখন রাজনীতি করার পক্ষে জোরাজুরি করতে লাগলেন, মওলানা সাহেব তখন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তাঁকে বলতেই হলো যে আর্মি শাসন আসছে। রাজনীতি আর থাকবে না।

১৮. জিয়ার রাজনৈতিক নকশা

এখন ভিন্ন একটা প্রসঙ্গে কথা বলা যাক। যাদু মিয়ার সঙ্গে জিয়াউর রহমান সাহেবের যোগাযোগের ব্যাপারটি নিয়ে বেশ কথা আছে। বাজারে কথা আছে যাদু মিয়ার মৃত্যু সম্পর্কেও। এ সম্পর্কে নানা ধরনের গুজবও ছিল সেই সময়ে। এই দুটি বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যেতে পারে।

যখন শেখ মুজিবের মৃত্যু হয়, আমি তখন লন্ডনে। তাঁর মৃত্যুর পরই যাদু মিয়া জেল থেকে ছাড়া পায়। ছাড়া পেয়েই সে লন্ডনে চলে যায়। আমার সঙ্গে সেখানে দেখা হওয়ার পর থেকেই সে আমাকে কেবলি বলছিল যে একজন আমার সঙ্গে একটা রাজনৈতিক সংলাপ করতে চাইছে।

যাদু মিয়া ছাড়া পেয়েছিল মোশতাকের টাইমে। অবশ্য কে তার সঙ্গে রাজনৈতিক সংলাপ করতে চাইছে, সে কথা আমাকে বলেনি। আমি বললাম যে ‘তুমি তো এসেছ তোমার শারীরিক সমস্যা নিয়ে। তুমি আগে এ কাজটাই সারো।’ চেকআপ সেরে এক মাসের মধ্যে মেডিকেলে আসার সময় আমাকে বলল, ‘যদি আমার সঙ্গে এরা কোনো আলোচনা করতে চায়, তাহলে আপনার সাহায্য আমার দরকার হবে। আপনি আসবেন।’

আমি বললাম, ‘আমি সেটা বলতে পারছি না। কী রকমের ডায়ালগ হবে, সে ব্যাপারে তুমি আগে আমাকে জানাবে।’

খোন্দকার মোশতাক তখন ক্ষমতা থেকে চলে গেছেন। জিয়াউর রহমান সাহেব ক্ষমতায় এসেছেন। জিয়াউর রহমান সাহেব এসে যাদু মিয়ার সঙ্গে ডায়ালগ ওপেন করেন। জিয়াউর রহমান যখন তাঁর সঙ্গে ডায়ালগ ওপেন করেন, তখন তিনি একদিন আমাকে একজনের হাত দিয়ে খুব একটা জরুরি চিঠি পাঠালেন। তাতে বলা হয়েছিল, ‘সংবিধান ও অন্যান্য ব্যাপার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমি তো পারছি না। আপনি তাড়াতাড়ি আসেন।’ আমি তাড়াতাড়ি গেলাম। আমি যাওয়ার আগেই জিয়াউর রহমান সাহেবের সঙ্গে তাঁর নানা রকমের আলোচনা ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। প্রথমেই, জিয়াউর রহমান চাচ্ছিলেন যে তাঁকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হোক এবং যাদু মিয়া সেটা নিয়ে কোনো ব্যক্তিগত দর-কষাকষিতে যাতে না যায়। সংবিধানের ওপরই কথা চলছিল। কথা চলছিল সংবিধানের রূপরেখা কী হবে, তা নিয়ে। প্রেসিডেন্ট এবং পার্লামেন্টের ক্ষমতা কী হবে, সে নিয়েও কথা হচ্ছিল। ফরাসি সংবিধান, জার্মান সংবিধান, পাকিস্তানের সংবিধান ইত্যাদি নিয়েও আলাপ হয়। জিয়াউর রহমান সাহেবের কাছে ১৯৭২ সালের সংবিধান গ্রহণযোগ্য নয়, তিনি এক ব্যক্তির হাতে আরও বেশি ক্ষমতা চাইছেন। সেই ক্ষমতার বণ্টন হবে কি না, হলে কীভাবে হবে, সে নিয়েও কথা হলো। এ জন্য বিভিন্ন দেশের সংবিধান আনা হলো। সেগুলোকে বিবেচনায় নেওয়া হলো। কিন্তু আলোচনা যখন চলছে, তখন জিয়াউর রহমান সাহেব হঠাত্ করেই যাদু মিয়ার সঙ্গে আলোচনা বন্ধ করে দিলেন। এবং গণভোটের সিদ্ধান্ত নিলেন। আর সেটা কার বুদ্ধিতে নিলেন, সে কথা আমি জানি না। যখনই গণভোট দিলেন, যাদু মিয়া তো একেবারে খেপে লাল। সে আমার বাসায় ছুটে এল। বলল, ‘জিয়া আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আমি একটা প্রেস কনফারেন্স করব।’

আমি বললাম, ‘কী প্রেস কনফারেন্স করবে। এখন তো মার্শাল ল চলছে।’

যাদু বলল, ‘না, প্রেস কনফারেন্স করবই।’ আমি বললাম, ‘যদি নেহাতই করো, তাহলে তোমার বক্তব্য যেন রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। ব্যক্তিগত আক্রমণ কোরো না কিংবা গালাগাল দিয়ো না।’ যাদু মিয়ার সেই প্রেস কনফারেন্সের বিবরণ কোনো দিন ছাপানো হয়নি। কারণ, সেটা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। প্রেস কনফারেন্স ওর বাড়িতেই হয়েছিল এবং তার একটা কপি সে আমাকে দিয়েছিল। আমি বোধ হয় হারিয়ে ফেলেছি। সেখানে জিয়াউর রহমান সাহেব যে গণভোট করলেন, তার আগে সংবিধানে কতকগুলো সংশোধনী এনেছিলেন। উনি যে কৃতিত্বের দাবি করেন, সেটা হলো তিনি শাসনতন্ত্রে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ যোগ করেছেন। যাদু মিয়া তার প্রেস কনফারেন্সে বলল যে উনি তো ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ যোগ করার কথা বললেন, তার আগে একটা লাইন ছিল ‘আউজুবিল্লাহ মিনাস শায়ত্বায়ানির রাজিম’—ওটা দেন নাই কেন? মানে জিয়াকে নানাভাবে আক্রমণ করতে লাগল। তারপর ওই ‘সোশ্যালিজম’-এর জায়গায় ‘সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার’ করা হলো কেন, এ ধরনের প্রতিটি দিকের সমালোচনা করতে লাগল। করার পর আমাকে এই বলে টেলিফোন করল যে ‘আমি তো যা করার করেছি। এখন আমার বাড়ি তো ঘেরাও।’

আমি বললাম, ‘কী রকম?’

বলল, ‘সাদা পোশাকের পুলিশে আমার বাড়ি ঘেরাও। বাড়ি থেকে কাউকে বেরোতে দিচ্ছে না, কাউকে ভেতরে আসতেও দিচ্ছে না।’

আমি বললাম, ‘আমি তো রাতে কোথাও যাব না। আগামীকাল সকালবেলা তোমার ওখানে আসার জন্য চেষ্টা করতে পারি।’

পরের দিন সকালবেলা আমি যখন যাই, তখনো সাদা পোশাকের পুলিশে যাদু মিয়ার বাড়ি ঘেরাও হয়ে রয়েছে।

আমি বললাম যে ‘দেখেন, ও খুব উত্তেজিত। ওর ব্লাডপ্রেশার। আমি ওকে একটু দেখতে চাই। বেশিক্ষণ থাকব না।’ আমাকে যেতে দিল। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণ তো করো নাই?’

বলল, ‘না, তাঁকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করিনি। তবে আমি তাঁকে কায়দা করে কয়েকটা খোঁচা দিয়েছি।’

যা-ই হোক, যাদু মিয়াকে পাক্কা তিন দিন ওই রকমভাবে রাখা হয়েছিল। ইতিমধ্যে একটা ঘটনা ঘটে গেল। ডিজিএফআইয়ের প্রধান আমিনুল ইসলামের তরফ থেকে একটা ফাইল দেওয়া হলো জিয়াউর রহমানের কাছে। তাতে মশিয়ুর রহমানকে মার্শাল লতে গ্রেপ্তার করার কথা বলা হলো। আমিনুল ইসলামের এই ফাইলটা পেয়ে জিয়াউর রহমান করলেন কি এরশাদ সাহেবকে ডাকলেন। তখন উনি ডেপুটি চিফ ছিলেন। মঞ্জুর ছিলেন সিজিএস। এরশাদ এনএসআই, কমিশনার অব পুলিশ এবং ডিআইজিএসবি—এঁদের সবাইকে ডাকলেন এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। এরশাদ সাহেব প্রথমেই নাকি বলেছিলেন, (আমার এটা যাদুর কাছ থেকে শোনা) ‘যাদু মিয়া আমার আত্মীয়। কাজেই আমি এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে থাকতে চাই না।’

জিয়াউর রহমান সাহেব শুনে বলেছিলেন, ‘ইউ আর এক্সকিউজড।’

এরশাদ সাহেব উঠে চলে গিয়েছিলেন। দেন ইট কেম টু মঞ্জুর।

মঞ্জুর বলেছিলেন, ‘মশিয়ুর রহমান সাহেব যে মার্শাল ল ভঙ্গ করেছেন, এটা আপনি কী করে জানলেন?’

বললেন, ‘আমার কাছে টেপ আছে।’

বললেন, ‘টেপটা প্লে করেন।’

টেপ প্লে করা হলো। বাজানো টেপ শুনে দেখা গেল যে মার্শাল লকে উনি আক্রমণ করেননি। জিয়াউর রহমানকেও উনি ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেননি। এসব শোনার পরে মঞ্জুর বললেন যে ‘আমার ধারণা, উনি মার্শাল লর কোনো শর্ত ভঙ্গ করেননি। সুতরাং তাঁকে গ্রেপ্তার করার আমি কোনো যুক্তি দেখি না।’ এনএসআইয়ের সরদার তাঁকে বললেন, ‘আপনার কী মত?’

সরদার নাকি বলেছিলেন, ‘আমরা তো আগের খবর সব জানি স্যার। উনি তো আমাদের বন্ধু। হি ইজ অ্যা ফ্রেন্ড অব দ্য অথরিটি এবং আপনার সঙ্গে তো তাঁর অনেক আলাপ-আলোচনা হয়েছে।

তাঁকে গ্রেপ্তার করার পক্ষে আমি উপযুক্ত ক্ষেত্র খুঁজে পাচ্ছি না। তাঁকে গ্রেপ্তার করে শত্রু বানানোর আমি বিপক্ষে। সুতরাং আমরা তাঁর গ্রেপ্তারের পক্ষে নই।’ পুলিশ বলল যে তাঁকে এ অবস্থায় গ্রেপ্তার করলে যে অবস্থার সৃষ্টি হবে, সেটা আমরা সামলাতে পারব কি না, জানি না। সুতরাং, আপনারা সিদ্ধান্ত নেন। তারপর আমাদের যদি আদেশ দেন, তাহলে আমরা সেভাবে ব্যবস্থা নেব। এসবির তরফ থেকে বলা হলো, আপনারা যখন কেউই দায়িত্ব নিতে চান না, আমাদের ঘাড়ে সেটা কেন চাপাতে চাইছেন, আপনারা এর দায়দায়িত্ব নেন।

যা-ই হোক, শেষ পর্যন্ত মঞ্জুরের মতামতই বজায় থাকল এবং মশিয়ুর রহমান যাদু মিয়া ওয়াজ নট অ্যারেস্টেড আন্ডার মার্শাল ল ফর হোল্ডিং দ্যাট প্রেস কনফারেন্স। কিন্তু কয়েক দিন তাঁর দুই ছেলেকে গ্রেপ্তার করে রাখা হয়। এই অভিযোগ এনে যে গণভোটের পোস্টার দেয়ালে সাঁটা হয়েছিল, সেটা নাকি তারা ছিঁড়েছিল। যাদু মিয়ার দুই ছেলেকে গ্রেপ্তার করে প্রায় তিন সপ্তাহ, মানে গণভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত থানাহাজতে আটক রাখা হয়। ছেলে দুটো ন্যাপ করত না, কিছুই করত না। তারা মসিউর রহমানের ছেলে, এটাই তাদের আটক রাখার কারণ।

যা-ই হোক, রেফারেন্ডাম তো হয়ে গেল। জিয়াউর রহমান তাতে শতকরা ৯৬ না ৯৯ ভাগ ভোট পেলেন। ব্যাপারটা দেশেও কেউ বিশ্বাস করেনি, বিদেশে তো নয়ই। উনি গেলেন কমনওয়েলথ হেড অব স্টেটসের মিটিংয়ে। সেই সময় ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান লিখে দিল যে যে ভোট উনি পেয়েছেন, সেটা ক্যালকুলেট করলে দেখা যাবে যে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একটা করে ভোট পড়েছে। যেটা ব্রিটেন কিংবা অন্য কোনো গণতান্ত্রিক দেশেও আমরা দেখি না। বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে এমন কী সচেতন দেশ যে সেখানে এ রকম হারে ভোট পড়তে পারে!

এ রকমের তিক্ত সব কথা লেখা হলো তাঁর বিরুদ্ধে। জিয়াউর রহমান কমনওয়েলথ সম্মেলন থেকে ফিরে এসে যাদু মিয়াকে আবার ডাকলেন। ডেকে তার কাছে দুঃখ প্রকাশ করলেন। যা কিছু হয়েছে তার ফিরিস্তি দিয়ে বললেন, ‘যাদু ভাই, এবার আপনি ছাড়া কেউ আর আমার মানসম্মান রক্ষা করতে পারবে না। মানসম্মান বলতে আর কিছু নেই।’ যাদু মিয়া বলল, ‘কেমন করে করব?’ জিয়া বললেন, ‘আমাকে জনসাধারণের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে দেন।’

জিয়ার সঙ্গে তার এসব কথা হয়েছে অনেক রাত পর্যন্ত। খানাপিনাও হয়েছে। তারপর ভোর ছয়টার দিকে যাদু মিয়া টেলিফোন করে আমাকে বলল, ‘আপনি একটু আসেন। আপনার সঙ্গে কথা আছে।’ আমি তার গলার আওয়াজে একটু ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম ভোর ছয়টার সময় হঠাত্ করে তার ফোন কেন? তাই শঙ্কিত গলায় আমি বললাম, ‘কী হয়েছে তোমার?’

বলল, ‘না, কিছু হয়নি। আপনি একটু আসেন।’ আমি তার কাছে যাওয়ার পর সে আমাকে বলল যে ‘জিয়া আমাকে এ রকমভাবে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমি তো কথা দিয়ে এসেছি যে তাঁকে আমি জনসাধারণের সরাসরি ভোটে পাস করাব।’

আমি বললাম, ‘কথা দিয়ে এসেছ অথচ তুমি কি পারবে? তুমি যে একলা কথা দিয়ে এলে, জিয়াউর রহমানকে জনসাধারণের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করার  তোমার ক্ষমতা আছে?’

যাদু মিয়া বলল, ‘না, আমি পারব না বলেই আপনাকে খবর দিলাম। কথা যখন দিয়ে এসেছি, তখন আমি কী করব বলেন!’

তখন তার সঙ্গে মিলে একটা রাজনৈতিক কৌশল ঠিক করা হলো। কৌশলটা ছিল এ রকমের, আওয়ামী লীগের শেষের দিকে যে কাজ-কারবার, তাতে করে একটা বিপুলসংখ্যক জনগণ রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াদের আমি বলেছিলাম ‘সাইলেন্ট মেজরিটি’। তারা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কিছু বলতেও সাহস পায় না অথবা আওয়ামী লীগকে সমর্থনও করতে পারছে না। ফলে রাজনৈতিকভাবে তারা চুপচাপ হয়ে গেছে। আমি বললাম, ‘যদি এই সাইলেন্ট মেজরিটিকে তুমি কনভার্ট করে তোমার পক্ষে আনতে পারো, তাহলে শুরু হতে যাওয়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তাদের অংশ নেওয়ার এই বলে ডাক দেওয়া যেতে পারে যে “আপনারা আসেন, এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেন এবং মার্শাল ল থেকে বেরিয়ে আমরা একটা গণতান্ত্রিক পদ্ধতির উত্তরণ ঘটাই। আপনারা এতে অংশ নেন।” এভাবে জনগণকে যদি তুমি বোঝাতে পারো, তাহলে তোমার সাফল্যের সুযোগ আছে। কিন্তু তার আগে তোমাকে একটা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম দাঁড় করাতে হবে। একটা রাজনৈতিক জোট গড়ে তুলতে হবে। কার কার সঙ্গে মিলে এই জোট করতে পারো?’

যাদু মিয়া আমাকে বলল, ‘আওয়ামী লীগ সামরিক বাহিনীর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থাত্ এই জোটে সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগকে আনতে পারবে না অথবা আওয়ামী লীগের সে রকমের কোনো প্রতিষ্ঠিত নেতাও এতে আসতে পারবে না।’

আমি বললাম, ‘তাহলে ব্যাপারটা হবে কী করে? তাঁদের বাদ দিয়ে কিছু হলে সেটা হবে অত্যন্ত দুর্বল কিছু।’

যাদু মিয়া বলল, ‘মুসলিম লীগকে পারব।’

আমি বললাম, ‘মুসলিম লীগ মানেই তো সবুর খান। সবুরকে তো বিশ্বাস করবে না বাংলাদেশের লোক।’

তখন ও বলল, ‘একটা কাজ করা যায়, সবুর ভাইকে কিছু ভালো ব্র্যান্ডি-ট্র্যান্ডি দিয়ে তাঁর সঙ্গে আজকে রাতেই একটু কথা বললে হয় না! উনাকে যদি কিছুদিনের জন্য সরিয়ে দিই আর শাহ আজিজকে মুসলিম লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট করা হয়, অর্থাত্ চার্জ বুঝিয়ে দিয়ে সবুর খান সরে যান, তাহলে শাহ আজিজ আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারেন।’

সবুর সাহেবের কাছে খুব ভালো ব্র্যান্ডি নিয়ে গেল যাদু মিয়া এবং রাতের মধ্যেই সবুর সাহেব দুই-এক মাসের জন্য শাহ আজিজকে তাঁর দায়িত্বভার বুঝিয়ে দিয়ে দেশের বাইরে চলে গেল। ইট ওয়াজ অল ফাইন্যান্সড বাই গভর্নমেন্ট অথবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান। এ ঘটনার পরপরই শাহ আজিজ যাদু মিয়ার সঙ্গে জয়েন করলেন।

এই ঘটনা ঘটেছিল ‘জাগদল’ হওয়ার পর। এভাবে একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি হলো। তার মধ্যে কাজী জাফর এল। তারপর যাদু মিয়া ন্যাপকে আনল। কিন্তু ন্যাপকে ফ্রন্টের মধ্যে বিলীন করে দিল না।

সাময়িকভাবে তার কাজকর্মকে স্থগিত করল। ন্যাপের কর্মতত্পরতা স্থগিত করার ব্যাপারটা একটা গোঁজামিল ছাড়া আর কিছু ছিল না। কিন্তু তাতে যাদু মিয়ার যে পারপাস, সেটা হাসিল হয়নি। কারণ, ক্ষমতার লোভে পড়ে ন্যাপের সব লোক যাদু মিয়ার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে ছিল।

কাজী জাফরের কথাই ধরা যাক। এর আগে আগাগোড়া সে একটা এস্টাবলিশমেন্ট-বিরোধী ভূমিকা পালন করে এসেছে। এখানটায় এসে সে এস্টাবলিশমেন্ট, বিশেষ করে মিলিটারি এস্টাবলিশমেন্টের সঙ্গে হাত মেলায়। আমার মতে, এটা ছিল তার বাইরের দিক। ভেতরে ভেতরে সে সবার সঙ্গেই যোগাযোগ রেখে চলত।

১৯. জিয়াকে রাজনীতিবিদ বানানোর প্রকল্প

তখনো আমি অত কিছু জানি না। জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে যে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া চলছিল, সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যাঁরা জড়িত ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ রাখতেন। তারপর তো তিনি সরাসরি এগিয়ে এলেন। প্ল্যাটফর্ম তৈরি হলো। এই প্ল্যাটফর্ম থেকেই জিয়াউর রহমানকে প্রেসিডেন্ট করা হলো। কারণ, তাঁরা জানতেন যে জিয়াউর রহমানকে প্রেসিডেন্ট করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। অ্যাপার্ট ফ্রম এনিথিং জিয়াউর রহমানের একটা পপুলারিটি ছিল এবং সত্যি বলতে কি, তাঁকে রাজনীতিবিদ বানানোর যে প্রসেস, সেটা ছিল একটা খুবই ইন্টারেস্টিং ব্যাপার।

জিয়াউর রহমান কিন্তু বাংলা লিখতে-পড়তে জানতেন না। তিনি শেষের দিকে যা কিছুতে সই করতেন, সেটা করতেন শুধু বাংলায় ‘জিয়া’ লিখে। আপনারা যদি তাঁর স্বাক্ষর করা ফাইল ইত্যাদি দেখেন, তাহলে এই ব্যাপারটা লক্ষ করবেন। করাচিতে তিনি লেখাপড়া শিখেছেন। যত্সামান্য বাংলা বলতে পারতেন। বাংলা লেখাপড়া কিছু জানতেন না।

প্রথম দিকে তিনি বাংলায় যে বক্তৃতা দিতেন সেগুলো উর্দুতে লিখতেন। লিখে তারপর তা-ই দেখে দেখে ভাষণ দিতেন। যা-ই হোক, আমার নিজের ছেলেও বাংলা বলে কিন্তু পড়তে পারে না। কারণ, সে জন্মের পর থেকেই ইংরেজি স্কুলে লেখাপড়া করেছে। তার পরও বলব, এটা তাঁর চরিত্রের একটা দুর্বল দিক। কিন্তু এ নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবে না।

যা-ই হোক, যে কথা আমি বলছিলাম—জিয়াউর রহমানের একটা ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো বদনাম ছিল না। মানুষ তাঁকে পছন্দই করত। কিন্তু ভালো করে বক্তৃতা দিতে পারতেন না। দিতে গেলে খালি হাত-পা ছুড়তেন। এসব দেখেটেখে যাদু একদিন আমাকে বলল যে ‘এ রকম হলে কী করে তাঁকে আমি চালিয়ে নেব?’

আমি বললাম, ‘দেখো, জিয়া বক্তব্য দিতে পারেন না ঠিক আছে। তিনি সবচেয়ে ভালোভাবে কী করতে পারেন, সেটা খুঁজে বের করো।’

জবাবে যাদু বললেন, হাঁটতে পারেন একনাগাড়ে ২০ থেকে ৩০ মাইল পর্যন্ত।

আমি বললাম, এই তো পাওয়া গেল সবচেয়ে ভালো একটা উপায়। তুমি তাঁকে সঙ্গে নিয়ে পাড়াগাঁয়ে হাঁটাও। হাঁটাও আর যেটা পারে তাঁকে দিয়ে সেটাই করাও। গাঁও-গ্রামের রাস্তা দিয়ে যাবে আর মানুষজনকে জিজ্ঞেস করবে, ‘কেমন আছেন?’

প্রেসিডেন্ট, দেশের মিলিটারি লিডার, তিনি গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে, কানাকানচি দিয়ে ঘোরাঘুরি করছেন আর লোকজনের ভালোমন্দের খোঁজখবর করছেন, তাতেই তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠবেন। এভাবে দেখতে দেখতে তিনি বক্তব্য দেওয়াটাও রপ্ত করে ফেললেন। কিন্তু এ তো ঘটনার এক দিক। অন্য দিকটা হলো, যেখানে কোনো দিন যাননি, ইউনিয়ন বোর্ডের একজন চেয়ারম্যানও, সেখানে খোদ দেশের প্রেসিডেন্ট যাচ্ছেন এবং তাঁর সঙ্গে অন্য আরও অনেকেই যাচ্ছেন। সেটা একটা বিশাল ব্যাপার। এসব দেখেটেখে গ্রামের লোকজন ভাবল, জিয়াউর রহমান এমন লোক, যিনি আমাদের খোঁজখবর রাখেন।

এভাবে তাঁর একটা জনপ্রিয়তা তৈরি হলো। এভাবেই তো তিনি প্রেসিডেন্ট হলেন। হওয়ার পর সংসদীয় নির্বাচনও হলো।

আপনারা বলতে পারেন, আমি নীতিচ্যুত হয়েছি কি না; কিন্তু আমি নিজের স্বার্থে এসব করিনি। এমনকি যাদু মিয়া প্রাইম মিনিস্টার কিংবা এ রকমের কিছু হোক—তেমন উদ্দেশ্য থেকেও কিছু করিনি। আমি দেশে গণতন্ত্র আসুক—সত্যিকারভাবে সেটা চেয়েছিলাম বলেই তাদের এই সমর্থনটুকু দিয়েছিলাম। এবং ক্ষমতাটা যে এক হাতে কুক্ষিগত হয়েছিল, জানতাম সেখান থেকে একেবারে একদিনে আমি বেরিয়ে আসতে পারব না। কাজেই সেটা যদি একটা স্টেজের ভেতর দিয়ে আসে, তা-ও আসুক। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম যে জিয়াকে এ রকম সমর্থন দেওয়ার আগে তাঁর সঙ্গে যাদু মিয়ার একটা চুক্তি হতে হবে এবং সেটা হতে হবে সংবিধানের ওপর ভিত্তি করে এবং সত্যি বলতে কি, এ ব্যাপারে চুক্তি হয়েছিলও। হয়েছিল সাংবিধানিক ফরমুলার ওপর ভিত্তি করেই। সেই চুক্তিতে যাদু মিয়া ও জিয়াউর রহমান—দুজনেরই সই ছিল। চুক্তিটার দুটো কপি ছিল। একটা ছিল যাদু মিয়ার কাছে। আর একটা ছিল জিয়াউর রহমানের কাছে। থার্ড একটা কপিও থাকতে পারে। খুব সম্ভবত সেটা ছিল মেজর জেনারেল নুরুল ইসলামের কাছে। তিনি তখন জিয়াউর রহমানের সিভিলিয়ান অ্যাফেয়ার্স বিভাগে কাজ করতেন। আমি দেখেছি সেই কপিটায় ১২-১৩টা প্রস্তাব লেখা ছিল। তার নিচেই সব সইটই করা হয়েছিল। জিয়াউর রহমান ও মসিউর রহমানের সই ছিল। তাতে ছিল সংসদের ক্ষমতা এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা (পাওয়ার্স অব পার্লামেন্ট অ্যান্ড পাওয়ার্স অব প্রেসিডেন্ট) কী হবে, তার বিবরণ। মোটামুটি গণতান্ত্রিক সংবিধানের একটা রূপরেখাও তাতে তুলে ধরা হয়েছিল। তবে ওটার প্রথম খসড়া কার, আমি জানি না। কিন্তু আমার সঙ্গেও চুক্তিটা নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সবার মতামত ও পরামর্শ নিয়েই চুক্তিটা দাঁড় করানো হয়েছিল। তার একটা কপি যাদু মিয়া আমাকে দিয়ে বলেছিল, ‘এটা আপনার কাছে রাখেন।’ আমি তো আর জানি না যে যাদু মিয়া এ রকমভাবে মারা যাবে! আমি তাঁকে বলেছিলাম, ‘দেখো, এটা তো একটা গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এটা তোমার কাছেই থাকা উচিত। আমার কাছে থাকা উচিত নয়। আমি হয়তো কোথায় রেখেটেখে দেব। অন্য লোকে দেখেটেখে ফেলতে পারে। এটা একান্তভাবেই তোমাদের জিনিস।’ আমি আর ওটা নিইনি।

যাদু মিয়ার মৃত্যুর পর আমি প্রথম যে জিনিসটার খোঁজ করেছি, সেটা হলো চুক্তিটির কপি। যাদু মিয়ার শোয়ার ঘরের আলমারির ওপর রাখা একটা সুটকেসের মধ্যে ওটাকে রাখা হয়েছিল। কিন্তু তন্নতন্ন করে খুঁজেও আমি ওখান থেকে আর ওটাকে পাইনি। ওটা উধাও হয়ে গিয়েছিল। এ কথা হচ্ছে, যাদু মিয়া এবং জিয়ার মধ্যে যে বোঝাপড়াটা হয়েছিল, সেটা যাদু মিয়ার মৃত্যুর পরে কিন্তু আর থাকেনি। লিডার হিসেবে তুলে আনা হলো শাহ আজিজুর রহমানকে।

একদিন যাদু মিয়া আমাকে দুঃখ করে বলেছিল, ‘আমি তো শাহ আজিজকে নিয়ে গেলাম সংসদে আর প্রেসিডেন্টের পাওয়ার কী হবে, কতটুকু হবে, সে ব্যাপারে সাহায্য করার জন্য। সেখানে সে এ রকমের একটা শর্ত রেখেছিল যে প্রেসিডেন্টই প্রধানমন্ত্রী নমিনেট করবেন; কিন্তু পার্লামেন্টে গিয়ে তাঁকে ৩০ দিনের মধ্যে আস্থা ভোট নিতে হবে।’

শাহ আজিজ ওখানে বসেছিল। সে জিয়াকে লক্ষ করে বলেছিল, ‘স্যার, এর আবার কী দরকার? আপনি নমিনেট করবেন, তার আবার আস্থা ভোটের কী দরকার? দ্যাট ইজ এনাফ। ইয়োর নমিনেশন ইজ এনাফ।’

যাদু বলল, ‘তাকে নিয়ে গেলাম, আর সে গিয়ে কিনা আমার বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করল জিয়ার কাছে।’ এসব ব্যাপার নিয়ে যাদু মিয়া শাহ আজিজ সম্পর্কে হতাশা বোধ করছিল। কিন্তু তখন আর উপায় ছিল না। তাঁকে যে সাহায্য করব, আমার সামনে তেমন কোনো রাস্তা আর খোলা ছিল না।

২০. যাদু মিয়ার মৃত্যু প্রসঙ্গ

নির্বাচনের পর অনেক ঘটনা ঘটল এবং জিয়াউর রহমান অন্যদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যাদু মিয়ার কাছে তিনি তাঁকে প্রধানমন্ত্রী করবেন বলে যে অঙ্গীকার করেছিলেন, সেখান থেকে তিনি সরে যাচ্ছিলেন। তাকে ভাইস প্রেসিডেন্ট করার অফার দেওয়া হচ্ছিল কিন্তু যাদু মিয়া বলছিল যে ‘হয় তুমি ওয়াদা রাখবে অথবা রাখবে না—দুটোর একটা করো। আমি অন্য কিছু নেব না।’ এসব কিছু নিয়ে খুব গোলমাল হলো এবং যাদু মিয়ার পক্ষের কিছু লোক যাদু মিয়াকে এসব নিয়ে খুবই টেনশনে রেখেছিল। তাকে তারা স্বস্তি দিচ্ছিল না। যাদু মিয়ার মৃত্যুর কিছুদিন আগে টঙ্গীতে একটা মিটিং ছিল। সে তাতে বক্তৃতা করেছিল এবং মিটিং চলার সময়ই সে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে। তার উচ্চ রক্তচাপও ছিল। টেনশনেই তার এমনটা হয়।

আমি অবশ্য নির্বাচনের পরেই যাদু মিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি চুকিয়ে দিয়েছিলাম। কারণ, বহু লোক তদবিরের জন্য তার কাছে আসত। আমি যাদু আর জিয়াউর রহমানকে মূলত সমর্থন করেছিলাম গণতন্ত্রের জন্য।

আর একটা কথা যাদু মিয়াকে বলেছিলাম, ‘আর যা-ই করো আর না করো, দেয়ার ক্যান নট বি অ্যানি ডেমোক্রেসি উইথআউট অ্যান অপজিশন।’ সে ব্যক্তিগতভাবে একদিন আমাকে বলেছিল, ‘আপনি কোন সিট থেকে দাঁড়াতে চান বলেন। আমি আপনাকে পাস করিয়ে আনব।’

আমি বলেছিলাম, ‘আমি তেমন কিছু চাই না।’ অবশ্য আমি তাকে ঠাট্টা করে বলেছিলাম, ‘তুমি যেখানে প্রধানমন্ত্রী হবে, সেখানে আমি সদস্য হব!’

বলেছিলাম, ‘আমি কিছু চাই না কিন্তু তোমরা আমাকে একটা কথা দাও যে দেশে একটা অপজিশন বা বিরোধী দল থাকবে।’

ও বলেছিল, ‘থাকবে মানে, থাকবে।’

আমি বললাম, ‘শেখ মুজিবের কাছেও একটা গ্রুপকে আমি পাঠিয়েছিলাম। আমার নিজেরই যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু আমি যাইনি। কারণ, আমি নিজেকে আয়ত্তে রাখতে পারব না।’

যা-ই হোক, তাদের দিয়ে একটা কথাই শেখ মুজিবকে বলানো হয়েছিল যে সংসদে যাতে বিরোধী দল থেকে ৩০-৪০ জন সংসদ সদস্য সংসদে এসে কথা বলতে পারেন, আপনি তার সুযোগ রাখবেন।

যাঁরা তাঁর কাছে গিয়েছিলেন, শেখ মুজিব নাকি তাঁদের বলেছিলেন, ‘বিরোধী দলের তারা যদি ভোট না পায়, আমি কি বাক্স ভেঙে তাদের পক্ষে ভোট দেব।’ যাদু মিয়াও আমাকে একই কথাই বলেছিল, ‘অপজিশন আমরা ক্রিয়েট করব মানে?’

আমি বললাম, ‘বিরোধী দলকে আসতে দিতে হবে, বলতে দিতে হবে।’

যাদু বলল, ‘তারা যদি ভোট না পায়।’

আমি বললাম, ‘ভোট তো তাঁরা পাবে যাদু মিয়া, তোমরা যদি ভোটারের ভোট কেড়ে না নাও।’ তারা আমার এই কথাটা খুব সিরিয়াসলি নিয়েছিল, অ্যান্ড দে অ্যালাউড দ্য অপজিশন টু কাম।

কিছু কিছু লোক সত্যিকারভাবে নিজেদের জোরে এসেছিলেন আর কিছু কিছু জায়গায় ব্যাপারটা একটু অন্যভাবে ঘটেছিল। যেমন খান সবুর সাহেবের কথাই ধরুন। তিনি মুসলিম লীগার। এই মর্মে চুক্তি হয়েছিল যে তাঁকে তিন জায়গা থেকে পাস করিয়ে আনতে হবে। তাঁকে তিন জায়গা থেকেই পাস করিয়ে আনা হয়েছিল।

আমাদের রংপুরে মুসলিম লীগের কাজী আবদুল কাদেরের কথাই ধরা যাক। সেখানে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন যিনি, তিনিই আমাকে এসব কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, তাঁকে টাকা দেওয়া হয়নি। শুধু তা-ই নয়, তাঁর বিরুদ্ধে গভর্নমেন্ট অফিসাররা পর্যন্ত কাজ করেছেন। সবাই কাজ করেছেন কাজী কাদেরের পক্ষে।

আওয়ামী লীগের কিছু লোক নিজেদের শক্তির বলেই এসেছেন। কিছু কিছু লোককে পুলিশ রেকর্ড-টেকর্ড দেখে আনা হয়েছে। ফলে একটা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিরোধীদলীয় সদস্যও সংসদে আসার সুযোগ পেয়েছেন। তাঁদের সংখ্যা ছিল ৮০ জনের মতো।

জিয়াউর রহমানের সময়কার ঘটনা এটা। আমার সঙ্গে তাঁদের কথা হয়েছিল। এটা তারই ফল। আমার সেই পরামর্শকে তাঁরা গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে সংসদে বিরোধীরা এল। বিরোধীদের তাঁরা কোনোভাবেই আসতে দেওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেননি।

শেষের দিকে যেমনটা হয়েছিল, বিরোধীদের একেবারে আসতেই দেব না, কথা বলতেই দেব না। কেবল আমরাই কথা বলব। তেমন কিছু করার সত্যিই একটা সুযোগ ছিল। কিন্তু তেমন কিছু হলো না।

এবার যাদু মিয়ার মৃত্যু প্রসঙ্গে একটু কথা বলি।

আমি তার সঙ্গে অনেক দিন সম্পর্ক রাখিনি। তার মৃত্যুর আগের দিন সেদিন বৃহস্পতিবার ছিল, বাইজু অর্থাত্ ফরিদা হাসান আমাকে টেলিফোন করেছিল। তার পরদিন অর্থাত্ শুক্রবারে সে অসুস্থ হয়। বাইজু আমাকে টেলিফোন করে বলেছিল, ‘ভাই, আপনি কি জানেন, যাদু ভাই ভীষণ অসুস্থ?’

আমি বললাম, ‘না, আমি তো জানি না।’

বলল, ‘খুবই অসুস্থ সে।’

তখন আমি আমার অফিসে ছিলাম। বাইজুকে বললাম, ‘এখন তো আমি যেতে পারব না।’ আমার সামনে একজন বসে ছিল, সে যাদু মিয়ার ওখানে যাতায়াত করত। তাকে বললাম, ‘তুমি যাও তো, যাদু নাকি অসুস্থ। তাকে দেখে আসো।’

সে দেখে এসে বলল, ‘কোথায় অসুস্থ! উনি তো খাওয়া-দাওয়া করছেন। তাঁর বাড়িতে গেস্ট আছে। উনি খাওয়া-দাওয়া করছেন বলে আমি আর ভেতরে যাইনি।’

আমার ছেলেকে বললাম, ‘তুমি বিকেল চারটার দিকে একবার খোঁজ নিতে যেয়ো তোমার চাচা অসুস্থ কি না।’ আমার ছেলে সেখানে গিয়ে দেখে যে সে ঘুমাচ্ছে। অনেকক্ষণ বসে ছিল। কথা হয়নি।

আমি শুক্রবার সকালবেলা অফিসে যাওয়ার সময় একটু তাড়াতাড়ি বেরোলাম এই ভেবে যে একটু যাদুর ওখানে হয়ে যাব। আমি যখন এলাম, তখন অলরেডি হি হ্যাড এ স্ট্রোক। তার মুখের বাঁ দিকটা বাঁকা হয়ে গেছে...। আমি তাঁর ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এটা কেমন করে হলো?’

সে জানাল, ‘এটা হয়েছে সকালবেলায়। উনি খুব উত্তেজিত ছিলেন বলে ভেলিয়াম-টেলিয়াম কিছু খেয়েছিলেন। শুনেছি অনেক রাত পর্যন্ত বাইরে ছিলেন। সেখান থেকে ফিরে এই ভেলিয়াম খাওয়ার পরপরই হি হ্যাড দ্যাট স্ট্রোক।’

তখন আমি বললাম, ‘যাদু মিয়াকে তুমি এভাবে রাখতে পারো না। তোমার বাবা হতে পারে সে। কিন্তু আসলে তো সে গভর্নমেন্টের লোক। সে তো সিনিয়র মিনিস্টার। হ্যাভ ইউ আসকড জিয়া, সে কী করতে চায়?’ জিয়াউর রহমানকে টেলিফোন করা হলো।

জিয়াউর রহমান বললেন, ‘আপনারা কিছু করবেন না। আমি পিজির ডাক্তার নুরুল ইসলাম সাহেবকে পাঠাচ্ছি।’

তার পরিবারের দিক থেকে আপত্তি ছিল ডা. নুরুল ইসলাম এবং পিজিতে পাঠানোর ব্যাপার নিয়ে।

আমি তখন বললাম, হলে পিজিতেই থরো ট্রিটমেন্ট হতে পারে।

ডা. নুরুল ইসলাম সাহেব এসে বললেন, এখনই নিয়ে যেতে হবে।

আমি বললাম, ‘নিয়ে যাওয়ার আগে আপনি ওর ব্লাড ইত্যাদির পরীক্ষা করিয়ে নিন। আপনি প্যাথলজিস্ট পাঠান।’

তবে যাদুর পরিবারের দিক থেকে একটু আপত্তি আছে। আমি তাদের সঙ্গে কথা বলে ব্যাপারটা মীমাংসা করে দিই। আমরা শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম যে তাঁকে পিজিতেই পাঠানো হবে এবং পিজিতে যখন সে গেল, তখন বিকেল চারটার মতো। আমি যখন তাঁকে দেখি, তখন তাঁর অবস্থা খুব একটা ভালো দেখিনি। অর্থাত্ এখান থেকে সে ফিরে আসবে বলে আমার মনে হয়নি।

আই ফাউন্ড হিম ইন রিয়্যালি ব্যাড কন্ডিশন। আমি বাইরের রুমে বসা এবং আমার পাশে ছিল ফরিদা হাসান। ভেতরে আরও দু-একজন ছিল। আমি যাদুর দিকে তাকাতে পারছিলাম না। তাই বাইরে এসে বসে ছিলাম।

তারা বলল যে কোনো ওষুধই দেয়নি। শুধু স্যালাইন দিয়ে চলে গেছে। অ্যাকচুয়ালি পরে দুবার ডা. নুরুল ইসলাম সাহেবকে ডাকা হয়। একবার জবরদস্তি করে আনা হলো আর একবার উনি আসতে অস্বীকারই করে বসলেন, ‘আমি যাব না, গিয়ে কোনো লাভ হবে না।’ এ নিয়ে অনেকের একটু সন্দেহ ছিল। কিন্তু যে জিনিসটা আমি পরে জানতে পেরেছি, তা হলো এই যে যখন যাদু মিয়ার শেষ দশা, ঠিক তখনি গভর্নমেন্টের দিক থেকে খুব উত্সাহ দেখানো হতে লাগল—বাইরে থেকে চিকিত্সক আনা হোক।

আমাকে বলা হলো, পৃথিবীর যেখান থেকে বলেন, সেখান থেকে ডাক্তার আনা হবে। আমি এত কিংকর্তব্যবিমূঢ় (পাজলড) ছিলাম, কেবল বললাম, ‘ডাক্তার এনে এখন আর কী হবে। এখন তো শেষ অবস্থা।’

যা-ই হোক, পাকিস্তান থেকে আমরা ডক্টর জুম্মাকে, দিল্লি থেকে একজন ব্রেন স্পেশালিস্ট আর কলকাতা থেকে একজন ব্রেন সার্জন—এই তিনজনকে আনালাম।

প্রথমে এলেন ডা. জুম্মা। তিনি এসেই একটা ইনজেকশনের কথা বললেন। ডা. নুরুল ইসলামকে লক্ষ করে তিনি বললেন, ‘হ্যাভ ইউ পুশ দ্যাট ইনজেকশন?’

ডা. নুরুল ইসলাম আমতা আমতা করতে লাগলেন। তারপর জুম্মা তাঁকে বললেন, ‘ইউ মিন টু সে দ্যাট ইউ হ্যাভ নট পুশড ইট। ডন’ট হ্যাভ ইউ হেয়ার?’ ডা. নুরুল ইসলাম চুপ করে ছিলেন।

এসব কিছু যখন হচ্ছে, তখন আমি সেখানে ছিলাম না। যারা শুনেছে, তারা পরে আমাকে বলেছে। আমি নিজের কানে শুনিনি। ইন্ডিয়ান ডাক্তার এসেও বলেছেন, যাদুর চিকিত্সা ঠিকঠাকমতোই হয়েছে।

এখন কথা হলো যে ওষুধটা কী? আমার মেয়ে ডাক্তার। দিন কয়েক আগে বাচ্চার মা হয়েছে। আমার স্ত্রীও ওখানে ছিল। এই খবর শুনে তারা ফিরে আসে। যাদু মিয়ার মৃতদেহ প্রথমে আমাদের গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। চারটার সময় জানাজা পড়িয়ে সেদিনই আবার ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ওই দিনই তারা বিমান থেকে নামে। এয়ারপোর্টেই ছিল তারা। আমি যাদু মিয়ার লাশটাকে অ্যাসেমব্লি হাউসে নামিয়ে দিয়ে তাদের আনতে গিয়েছিলাম।

বাসায় গিয়ে আমি আমার মেয়েকে বললাম, ‘তোমার চাচার মতো কোনো রোগী যদি তোমার কাছে যায়, তার একটা স্ট্রোক হয়েছে, তখন তোমরা সাধারণত কী করো? ধরো, তখন তুমি ইমারজেন্সিতে আছো। এ রকম একটা রোগী গেল, তখন তুমি কী করবে?’

আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার মেয়ে বলেছিল, ‘আমরা ওই ইনজেকশনটা দেব।’

আমি বললাম, ‘কেন?’

মেয়ে বলল, ‘ওই ইনজেকশনটা পুশ করা হবে এ জন্য যে স্ট্রোকটা হয়েছে ব্রেনে। অনেকগুলো সেল আছে তাতে। সেসবের একটাতে স্ট্রোক করেছে এবং রক্তক্ষরণ হচ্ছে। ইনজেকশনটা যদি স্ট্রোক করার সঙ্গে সঙ্গে পুশ করা হয়, তাহলে তা ছড়াতে পারে না। মস্তিষ্কের আর কোনো ধরনের ক্ষতি করতে পারে না। সবকিছু সীমিত করে ফেলে। তারপর অস্ত্রোপচার করে তাকে আবারও সচল করা যেতে পারে। আমি যতটুকু জেনেছি, তা হলো এই।’

ওই ইনজেকশনটা যাদুকে দেওয়া হয়নি। ডা. নুরুল ইসলামের মতো একজন বিজ্ঞ ডাক্তারের এটা ছিল একটা বিচ্যুতি। এ কথা আমি সত্যিই বিশ্বাস করতে পারি না। এই হলো সত্য। সার্বিক সত্য।

২১. সোহরাওয়ার্দী প্রসঙ্গ

এবার একটু প্রসঙ্গান্তরে যাই। তবে এটা আমার জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। চল্লিশের দশক থেকেই আমার সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কাছাকাছি আসার সুযোগ হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আমি আগে দুই-একটা মিটিংয়ে তাঁর কথা শুনেছি বা গিয়েছি কিন্তু তাঁর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয় যখন ফজলুল হক সাহেবের শ্যামা-হক মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে অবিভক্ত বঙ্গব্যাপী যে আন্দোলন হয়, তাতে সোহরাওয়ার্দী সাহেবেরই সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল। এবং তারই নেতৃত্বে আমরা দুটো উপনির্বাচনে অংশ নিয়েছিলাম এবং ওই দুটো নির্বাচনেই ফজলুল হক সাহেবের যে প্রার্থী ছিল, তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল।

একটা নির্বাচনী কেন্দ্র ছিল বালুরঘাটে, আর একটা নাটোর। ওই দুই নির্বাচনী এলাকায় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৩০ থেকে ৪০ জনের একটা দল নিয়ে কাজ করতে গিয়েছিলাম। ঠিক সে সময়ই তাঁর কাজ করার যে সাংঘাতিক ক্ষমতা, সেটা আমাকে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। আমার বয়স তখন তাঁর অর্ধেকেরও কম। আমরা ১৬ ঘণ্টা, কখনো বা ১৮ ঘণ্টা তাঁর সঙ্গে ঘোড়ার গাড়িতে চেপে নির্বাচনী সফর করতাম। যেতে যেতে আমরা বলতাম, ‘চলুন, আমরা এখানে নেমে যাই। সামনের ডাকবাংলোয় নেমে যাই।’ কিন্তু উনি তাঁর ওই চাদরের খুঁটে রাখা ঝালমুড়ি খাচ্ছেন আর একইভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন। করে চলেছেন নির্বাচনী সফরের কাজ। থামাথামি নেই। একনাগাড়ে ১৬ ঘণ্টা, ১৮ ঘণ্টা এই যে তাঁর অদ্ভুত কাজ করার ক্ষমতা, এটা আমাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করেছিল এবং আমি মনে করি যে ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের যে বিজয়, শুধু বিজয় না, এটাকেই পাকিস্তান কায়েমের মূল শক্তি জুগিয়েছিল, সেই বিজয়ের নেপথ্যে সবচেয়ে বেশি যদি কারও অবদান থেকে থাকে, তাহলে সেটা শহীদ সোহরাওয়ার্দীর। কিন্তু ইতিহাসের এটাই পরিহাস যে সেই শহীদ সোহরাওয়ার্দীকেই ‘রানিং ডগস অব দ্য হিন্দুজ’ বলে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। বলতে গেলে এই সময়ই আমি আরও বেশি করে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রতি আকৃষ্ট হই। এবং তিনি ওই যে তাঁর বাড়িতে পেছনের দিকে খাটিয়ায় শুয়ে থাকতেন, ওখানে গিয়ে তাঁকে জাগিয়ে কথা বলার অধিকার আমার ছিল।

মাঝেমাঝেই আমি একটা ব্যাপারে ভাবতাম যে উনি আমার একটা ক্ষতি করেছেন। এখন অবশ্য আমি তেমন কিছু ভাবি না। ১৯৪৫ সালে আমাদের নীলফামারী নির্বাচনী এলাকায় একটা বাই ইলেকশন হয়। তাতে আমি প্রার্থী হই। কিন্তু শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেব আমার প্রার্থিতার বিরোধিতা করেন এবং আমাকে নমিনেশন না দিয়ে স্যার এম রহমানকে নমিনেশন দেন। স্যার এম রহমান ছয় মাস পরে মারা যান এবং আমি ওই সময় খুব মনঃক্ষুণ্ন হয়ে, হতাশ হয়ে কলকাতায় চলে যাই। এক মাসের বেশি আমার এলাকার বাইরে থাকি। ইতিমধ্যে নির্বাচনে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে পারিনি বলে নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ আমাকে আগামী পাঁচ বছর নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করে দেয়। তখন মনে হয়েছিল যে আমার একটা সাংঘাতিক ক্ষতি হয়ে গেল কিন্তু এখন মনে করি যে ক্ষতি হয়নি। কারণ, আমার সমসাময়িক যাঁরা মুসলিম লীগে ছিলেন, পলিটিক্যাল ফোর্স হিসেবে এখন আর তাঁদের কেউই বেঁচে নেই। আমি কিছু হতে পারিনি সত্যি কিন্তু তবু মনে করি, আমি এখনো রাজনৈতিকভাবে জীবিত। এখন আর মনে করি না যে এ কারণে আমার একটা ক্ষতি হয়েছে।

বস্তুত শহীদ সাহেব ছাড়া মুসলিম লীগের ১৯৪৬-এর যে বিজয়, সেটা সম্ভব হতো না। কিন্তু যখন প্রশ্ন উঠল যে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম লীগের নেতা হবেন কে? সেখানে তিনি নির্বাচিত হতে পারলেন না। নির্বাচিত হলেন খাজা নাজিমুদ্দিন। এমনকি কলকাতা থেকে নারায়ণগঞ্জে এলে তাঁকে স্টিমার থেকে নামতে পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। আমি খবরটা আগেই পেয়েছিলাম এবং একটা ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কিনে ওই স্টিমারে উঠে যাই। সোহরাওয়ার্দী সাহেব তাঁর কেবিনে ছিলেন। তাঁর পাশে যে রেস্তোরাঁ ছিল, আমি সেখানে গিয়ে বসি। একসময় তিনি কেবিন থেকে বেরিয়ে আসেন এবং রেস্তোরাঁয় আমাকে ওখানে বসে থাকতে দেখে রীতিমতো অবাক হয়ে যান।

বললেন, ‘আরে মোখলেস, তুমি এখানে?’

আমি বললাম, ‘স্যার, আপনাকে তো সবাই ছেড়েছে, আমি আপনার সঙ্গে না এসে আর পারলাম না।’ আমার এ কথা শোনার পরপরই সোহরাওয়ার্দী সাহেবের চোখ দিয়ে তখন অঝোর ধারায় পানি গড়িয়ে পড়ছে।

দুজনে মিলে অনেক কথা বললাম। ১৯৪৬-এর উপনির্বাচনে আমাকে মনোনয়ন দিতে পারেননি বলে খুব দুঃখ প্রকাশ করলেন।

যা-ই হোক, আমি এটুকু বলতে চাই যে পাকিস্তান মুসলিম লীগে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অবদান অতুলনীয়। এ রকম একজন মানুষকে নিগৃহীত হতে দেখে আমার সেদিন খুব খারাপ লেগেছিল। বলতে পারেন, এর প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ আমি তাঁর সঙ্গে চলে গিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে যেমন ঘনিষ্ঠতা ছিল ফজলুর রহমান সাহেবের, তেমনি শহীদ সাহেবেরও। তাঁরা দুজনই ছিলেন ভিন্ন শিবিরের লোক। কিন্তু পরে তাঁরা আবার এক শিবিরে এসে মিলিত হয়েছিলেন।

ফজলুর রহমান সাহেব ১৯৪৬-এর নির্বাচনের পর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মন্ত্রিসভায় যোগ দেন রাজস্ব ও জেলসংক্রান্ত মন্ত্রী হিসেবে। তবে ’৪৭ সালে পার্টিশনের একটু আগেভাগে সোহরাওয়ার্দী-শরত্ বসু যুক্তবঙ্গের যে আন্দোলন হয়, সে ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না। আমার কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নেই।

২২. মুক্তিযুদ্ধ—১৯৭১ পর্ব

আওয়ামী লীগের সঙ্গে যেসব ছাত্র-কর্মী বা যুবকর্মী ছিলেন, পঞ্চাশের দশকের গোড়ার থেকেই তাঁঁরা মোটামুটিভাবে মুক্তচিন্তার অধিকারী ছিলেন। তাঁরা পাকিস্তান, আমেরিকার সঙ্গে বা আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে যুক্ত হোক, সেটা তাঁরা চাননি। কিন্তু শহীদ সাহেব প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই ঢাকায় এসে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে খুব জোর ওকালতি করার কারণ সম্পর্কে বলতে গেলে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে কিছু বলতে পারব না। তবে আমি অনুমান করতে পারি যে অমনটা করা না হলে ক্ষমতায় আসা যেত না।

এ দেশে যখন গণ-আন্দোলন হয় এবং যখন মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হয়, তখন শাহ আজিজুর রহমানের যে ভূমিকা দেখা গেছে, সেটা চলমান গণ-আন্দোলনের পক্ষেও নয়, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেও নয়।

আটষট্টি থেকে একাত্তর সাল পর্যন্ত যাদু মিয়ার ভূমিকা সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয় যে ইয়াহিয়ার সঙ্গে তাঁদের একটা সমঝোতা হয়েছিল। ইয়াহিয়া সেই সমঝোতার কথা ভুলে গিয়েছিলেন। পাত্তা দেননি। সে কারণে যাদু মিয়া রাগ করেছিল। সেই রাগ-অভিমান থেকে ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে কথা বললে ইয়াহিয়া তাকে জেলে ঢুকিয়ে দেন। জেল থেকে মুক্ত হওয়ার পর যাদু মিয়ার রাজনীতিটা আমার কাছে খুব স্পষ্ট ছিল না। তখন তার রাজনৈতিক নানা প্রশ্নে তাঁর সঙ্গে আমার মতপার্থক্য দেখা দেয়।

একাত্তর সালে তাঁর ভূমিকা কী ছিল, তাও জানি না। কিন্তু যখন মার্চের ওই গোলযোগটা আরম্ভ হলো, তখন আমি তাকে খোঁজ করে বের করি। কারণ, আমার একটা ভয় ছিল যে সে পাকিস্তানিদের হাতে পড়ে যেতে পারে এবং তাকে দিয়ে পাকিস্তানিরা অনেক কুকাজ করাতে পারে। সে জন্য আমি তাকে খুঁজে বের করি।

সে আত্মগোপন করেছিল। সেখান থেকে তাকে আমি খুঁজে বের করি। ওই সময় আমরা গুলশান হয়ে লোকজনকে পার করে দেওয়ার একটা ব্যবস্থা করেছিলাম। ওখান থেকেই অনেক বড় বড় লোককে পার করিয়ে দেওয়া হয়।

যা-ই হোক, আমি যাদু মিয়াকে গুলশানে নিয়ে আসি তাকে ওখান দিয়েই পার করিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু যেদিন বিকেলবেলা তাকে পাঠাব, সেদিনই গুলশান লেকের ওপারে, বাড্ডায় আর্মিরা চড়াও হয়। আমরা একটা বাড়ির ছাদ থেকে ব্যাপারটা দেখেছিলাম। আমি যখন যাদুকে বোঝাচ্ছি এই রাস্তা দিয়ে তুমি যাবে, ঠিক তখনই ওখানে গোলমালটা শুরু হলো। তাতে করে সে ভয় পেয়ে গিয়ে বলল, ‘আপনাকে কথা দিচ্ছি, আমি যাব কিন্তু এই রাস্তা দিয়ে যাব না।’ তারপর সে অন্য রাস্তা দিয়ে আরিচাঘাট হয়ে কলকাতায় যায় এবং সেখানে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগ-ওয়ালাদের সঙ্গে তার বনিবনা হয়নি।

বস্তুত যাদু মিয়ার রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে তাদের মনোভাব খুব একটা পরিষ্কার ছিল না। ওই সময় আমি যেহেতু কলকাতায় ছিলাম না, সে কারণে তার ভূমিকা সম্পর্কে আমি ঠিকঠাকমতো কিছু বলতে পারব না। তবে তার জীবনের ওপর আঘাত আসতে পারে—এ রকম একটা ভয় ছিল এবং সে ভয়ের জন্য যাদু মিয়া আবার দেশের ভেতরে ফিরে আসে এবং ফিরে এসে আমাদের দেশের বাড়িতে গেলে পাকিস্তানি আর্মি আমাদের বাড়ির ওপর চড়াও হয়ে তা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়। তাতে অনেক লোকজন মারা যায় এবং যাদু মিয়াকে পাকিস্তানি সেনারা ওখান থেকে ধরে নিয়ে আসে। নিয়ে এসে তারা তাকে সৈয়দপুর সেনানিবাসে আটকে রেখেছিল বলে শুনেছি। এই সময় তারা তার কাছ থেকে একটা বিবৃতি লিখিয়ে নেয়। সেটা পরে নাকি রংপুর বেতার মারফত প্রচার করা হয়েছিল।

অবশ্য, এসবই আমার শোনা কথা। আমি সম্যক কিছু জানি না। এ ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাসাও করিনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের দিকে যাদু মিয়া ঢাকায় আসে। আসার পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী শেখ মুজিবের ওপর যাদু মিয়াকে গ্রেপ্তার করার ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেন। যাদু মিয়া এবং শেখ মুজিব আসলে খুবই অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। ফার্স্ট ফ্রেইন্ড বলতে যা বোঝায়, তা-ই ছিলেন তাঁরা। এই সময় আমার কাছে একটা খবর এল (একজন দায়িত্বশীল নেতাই তিনি) আমাকে এসে জানালেন যে, তিনি শেখ সাহেবের ওখানে বসে ছিলেন। তখন কয়েকজন লোক শেখ সাহেবকে বলতে শোনেন যে, মশিউর রহমান তো এখন ঢাকাতেই আছেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হোক। জবাবে শেখ সাহেব বলেছিলেন, ‘আচ্ছা, সে হবে।’ তিনি এ রকম কিছু কথা বলে তাঁদের তুলে দিলেন।

আমি যাদুকে এসে বললাম, ‘তুমি ঢাকায় এসে বসে আছো কেন? তোমাকে নিয়ে তো এ ধরনের কথাবার্তা হচ্ছে। তুমি একটু সরে থাকো।’ আমার এ কথা শোনার পর আমাকে অবাক করে দিয়ে সে সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোন তুলে শেখ মুজিবের নাম্বারে ডায়াল করে। লাইন পেয়ে যেতেই সে শেখ মুজিবকে বলে, ‘এই... তুই নাকি আমাকে অ্যারেস্ট করবি!’

ওদিক থেকে মুজিব কী বলেছিলেন, আমি জানি না, কিন্তু দুজনের মধ্যে খুবই হাসি-ঠাট্টা হয়েছিল সেদিন। যা-ই হোক, অনেক দিন পর্যন্ত শেখ মুজিব জানতেন যে যাদু মিয়া ঢাকায় আছে। কিন্তু দলের চাপ থাকা সত্ত্বেও তিনি তাকে গ্রেপ্তার করেননি।

পরে যাদু মিয়া যখন উত্তেজিত হয়ে এ রকমের একটা উক্তি নাকি করেছিল যে ‘আমি কদিনের মধ্যেই এই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারি,’ কেবল তখনই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ১৯৭২ সালের কথা এসব।

প্রশ্ন উঠতে পারে, যাদু মিয়া তো জানতেন যে মুক্তিযুদ্ধে শাহ আজিজুর রহমানের কী ভূমিকা ছিল, তেমন একজন লোককে জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় নিয়ে আসার জন্য তিনি উদ্যোগী হয়েছিলেন কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে বলতে হয়, এটা অন্য কোনো কারণে নয়। সে জিয়াকে কথা দিয়েছিল বলেই শাহ আজিজকে সেখানে ভিড়িয়েছিল। তার নিজেরও একটা ইচ্ছা বা আকঙ্ক্ষা ছিল। এ দুটো প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়েই তাদের আনতে হয়েছিল। বস্তুত জিয়াউর রহমানকে যাদু মিয়া এই বলে কথা দিয়েছিল যে মুসলিম লীগের তার পুরোনো বন্ধুদের জিয়ার দলে আনতে হবে এবং শাহ আজিজুর রহমান মুসলিম লীগের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন বলেই তাঁর সাহায্য নিয়ে তাঁর সেই মুসলিম লীগারদের আনতে হয়েছিল। কাজটা করতে গিয়ে যাদু বিচার করেনি, কারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আর বিপক্ষে কারা ছিল। আসলে যাদু মিয়া তার লক্ষ্য সাধন করতে চেয়েছিল।

২৩. ফজলুর রহমান/শেরে-বাংলা প্রসঙ্গ

একটু অপ্রাসঙ্গিক হলেও ফজলুর রহমান সাহেব সম্পর্কে, তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে আমাকে একটু বলতে হবে।

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার দু-এক বছর পর আমার মনে হয়, উনচল্লিশ সাল থেকে তাঁর সংস্পর্শে আসি। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই কনস্টিটিউয়েন্সি থেকে বেঙ্গল অ্যাসেমব্লিতেও সদস্য। সে সময় ঢাকায় একটা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা চলছিল। মুসলিম স্বার্থ রক্ষায় সর্বতোভাবে তিনি কাজ করতেন। এর একটা উদাহরণ দিই—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের যখন তিনি সদস্য, তখন মুসলমান শিক্ষক যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পেয়েছিলেন, তাঁদের প্রত্যেকের চাকরি পাওয়ার পেছনে ফজলুর রহমান সাহেবের একটা অবদান ছিল। এবং এমনও দেখা গেছে যে একজন সুপিরিয়র অ্যান্ড বেটার কোয়ালিফিকেশনের হিন্দু ক্যান্ডিডেট আর লেসার কোয়ালিফিকেশনের একজন মুসলিম ক্যান্ডিডেট—এই দুজনের ভেতর থেকে মুসলমান ক্যান্ডিডেটটিকেই ফজলুর রহমান সাহেব অনেক সময় নিয়োগ দিতে পেরেছেন।

এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং যাকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, উভয়ের সুনাম সে রকমভাবে রক্ষা না করা গেলেও তিনি মুসলমান ক্যান্ডিডেটকে নিযুক্ত করতে পেরেছেন। আমি মনে করি যে মুসলিম স্বার্থ রক্ষা করার জন্য যত রকমভাবে কাজ করা সম্ভব তিনি তার সবই করেছেন। এই সময়জুড়ে ফজলুর রহমান সাহেবকে আমি এভাবেই দেখেছি।

আমার রাজনীতিসম্পৃক্ত অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আপনাদের আমি বলেছি। আমি একটা অসাম্প্রদায়িক মানুষ হলেও রংপুর কলেজে এসে শ্রীপদ্ম আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাই। এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফজলুর রহমানের মতো মানুষদের সংস্পর্শে এসে আমি মুসলিম লীগ এবং পাকিস্তানবাদের আদর্শে উজ্জীবিত হই। শুধু তা-ই নয়, তাঁদের সঙ্গে আমার পরিচয় শুধু নয়, বেশ অন্তরঙ্গ সম্পর্কও ছিল। তাঁরা আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। আমার নিজের দিক থেকে বলব যে আমি তাঁদের আমার অভিভাবক বলেই মনে করতাম। বিশেষ করে, ফজলুর রহমান সাহেব ও মওলা মামাকে। ফজলুর রহমান সাহেব মওলা মামার বাসাতেই থাকতেন এবং তাঁরা আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। আমিও তাঁদের দ্বারা অনেক ব্যাপারে প্রভাবিত হয়েছি। আমি তো কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত না থাকলেও এই যে আমার রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা কিংবা রাজনৈতিক চিন্তা করার ক্ষমতা, তার হাতেখড়ি তাঁদের কাছ থেকেই। কোনো সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক ঘটনা বিশ্লেষণ করার পর একটা সিদ্ধান্ত টানার যে ক্ষমতা, এও আমার তাঁদের কাছ থেকেই পাওয়া।

বাঙালি স্বার্থ এবং মুসলিম স্বার্থ রক্ষা করার জন্য করাচিতে আমি ফজলুর রহমান সাহেবকে অনেক কিছু করতে দেখেছি। তাঁর আরবি হরফ প্রচলন করার ব্যাপারে যে কথা বলা হয়ে থাকে, তার মূলে ছিল তাঁর ঘোর পাকিস্তানি হওয়ার ব্যাপার। কায়েম হওয়া পাকিস্তান কী করে রক্ষা করা হবে, সেই লক্ষ্যে তাঁর একটা ভাবনা ছিল। এ জন্যই দু-একটা ক্ষেত্রে তাঁকে আপনারা মনে করতে পারেন যে বাঙালি স্বার্থ কিংবা বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর সহানুভূতি ছিল না। কিন্তু তাঁর চরিত্রে সাংঘাতিক একটা জিনিস ছিল এবং সেটা বোধ হয় ভৌগোলিক কারণেই হয়েছিল।

আমাদের উত্তরবঙ্গে বাড়ি কিন্তু আমরা অতখানি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারিনি। ফজলুর রহমান সাহেব অনেক উদ্ভট পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারতেন। বুক চিতিয়ে দাঁড়াতেন। চর অঞ্চলের লোক ছিলেন তো, পদ্মার চরের লোক হিসেবে সাংঘাতিক একটা একরোখা মনোভাব ছিল তাঁর। এটা আমার মধ্যে নেই। আমি তাঁর মধ্যে আর একটি জিনিস দেখেছি যে পশ্চিম পাকিস্তানের মাটিতে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবিদের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো বুকের পাটা আর কারোর ছিল না।

আমি একমাত্র ফজলুর রহমানের নাম করতে পারি, বাঙালিদের মধ্যে যতজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছিলেন, ফজলুর রহমান ছাড়া অন্য কেউ পাঞ্জাবিদের সামনে মুখ খুলতে পারেননি।

কোরীয় যুদ্ধের পর গোলাম মোহাম্মদ অর্থমন্ত্রী, তিনি চাচ্ছিলেন মুদ্রার অবমূল্যায়ন। ফজলুর রহমান সাহেব বলেছিলেন যে অবমূল্যায়ন নয়। এ কারণে গোলাম মোহাম্মদ ও ফজলুর রহমানের মধ্যে একটা তিক্ত সম্পর্ক চলছিল।

ফজলুর রহমান সাহেবের যুক্তিটা ছিল এ রকমের যে আমরা হচ্ছি প্রাথমিক কমোডিটির রপ্তানিকারক, মুদ্রার অবমূল্যায়ন করে আমাদের কোনো লাভ হবে না এবং গোলাম মোহাম্মদ অর্থমন্ত্রী হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অবিচার করছিলেন বলে আমি ফজলুর রহমান সাহেবের বাড়িতে তাঁর প্রণীত বাজেটের ওপরে কাট মোশান দেখেছি এবং দ্যাট কাট মোশান প্রস্তাব করেছিলেন নুরুল আমিন।

সেই কাট মোশানটা নেওয়ার সময় লিয়াকত আলী খান বলেছিলেন, ‘মোশানটা আসতে পারবে না, আমরা সংসদের বাইরে ব্যাপারটার মীমাংসা করব।’ এগুলো আমি করতে দেখেছি। কাজেই বাঙালি স্বার্থ তিনি জলাঞ্জলি দিয়েছেন—ভাষার প্রশ্নে তাঁর ভূমিকার বিচারে সে কথা আপনারা বলতে পারেন। সংস্কৃতি বা কালচারের প্রশ্নে তাঁর ভূমিকার বিচারে এ কথা হয়তো বলতে পারেন, কিন্তু তিনি মূলত বাঙালি ছিলেন এবং বাংলা ভাষা তাঁর নিজেরও ভাষা ছিল কিন্তু তিনি ছিলেন এই পাকিস্তান রক্ষা করা এবং পাকিস্তানের অখণ্ডত্ব রক্ষা করার জন্য নিবেদিতপ্রাণ একজন। এ জন্যই তাঁর সম্পর্কে অনেক সময় অনেকের এ রকমের একটা ধারণা হতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি যে তিনি একজন বাঙালি ছিলেন এবং বাঙালি স্বার্থ জলাঞ্জলি দেননি।

আরেকটা জিনিস বলব যে ফজলুর রহমান সাহেব সবকিছু সত্ত্বেও এই যে ফাতেমা জিন্নাহ যে প্রার্থী হয়েছিলেন আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে, এ জন্য একজনই দায়ী ছিলেন, তিনি ফজলুর রহমান। কারণ, আইয়ুব খান যখনই তাঁর সংবিধানটা গ্রহণ করলেন, তখন থেকেই ফজলুর রহমানরা জানতেন যে আইয়ুব প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য নির্বাচনটা করবেনই।

২৪. ফাতেমা জিন্নাহর রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থিতা

ফজলুর রহমান সাহেব তখন করাচি থেকে ঢাকায় এসে বসবাস করতে শুরু করেছেন। কিন্তু তিনি কেবল নিজে থাকেন। তাঁর পরিবারের সদস্যরা থাকে করাচিতেই। সেবার তিনি এখানে এলে আমি একদিন তাঁর সঙ্গে এমনিই দেখা করতে যাই। আমি তাঁর সঙ্গে রাজনীতি না করলেও সামাজিক সম্পর্ক রাখতাম। ঈদের আগেই তিনি চলে যাবেন বলে আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম।

আমি বললাম, ‘আপনি যে যাচ্ছেন, কদিন পরে আসবেন?’

আমাকে বললেন, ‘বলো তো, এই আইয়ুবের বিরুদ্ধে কাকে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করানো যায়?’

আমি বললাম, ‘প্রার্থী তো আপনার জানাশোনার মধ্যেই আছে।’ কথাটা আমি হঠাত্ করেই বলে ফেললাম।

শুনে বললেন, ‘কে আছে আমার জানাশোনার মধ্যে?’

আমি বললাম, ‘ফাতেমা জিন্নাহ।’

বললেন, ‘বলো কী, ফাতেমা জিন্নাহ!’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, তিনিই একমাত্র প্রার্থী হতে পারেন।’

তিনি বললেন, ‘আসবে না।’

বললাম, ‘তাঁকে একটা কথা বলেন যে আপনি কি আপনার ভাইয়ের মতো কেবল বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব শেষ করবেন, না পাকিস্তান কী পর্যায়ে আছে, সে ব্যাপারে আপনার কি কোনো দরদ-টরদ কিছু নেই? আর যদি দরদ থাকেই, তাহলে আপনাকে কিছু করতে হবে।’

তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, যাই।’

ঈদের নামাজ পড়ার পর তিনি ফাতেমা জিন্নাহর সঙ্গে দেখা করেন।

দেখা করে এসব কথা তাঁকে বললেন। প্রথমবার কোনো ধরনের সাড়া দেননি। তারপর যখন কোরবানির ঈদে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন, তখন আবার কথাটা বললেন।

ফাতেমা জিন্নাহ তখন বলেছিলেন, ‘তুমি এসব কী বলছ ফজলুর রহমান?’

ফজলুর রহমান সাহেব তখন একটু সাহস সঞ্চয় করে বললেন, ‘এ দেশকে বাঁচানোর জন্য আপনাকে তো আরও একটু সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।’

সেবারও ওই পর্যন্তই কথা হয়েছিল। এরপর উনি আরও দু-তিনবার তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ফাতেমা জিন্নাহকে রাজিই করিয়ে ফেললেন।

অ্যাবডিকেশন অব আইয়ুব খান বাই আলতাফ গওহর শিরোনামে একটা বই আছে, ওই বইয়ে লেখা একটা কথার জন্য আমি তার উল্লেখ করছি। সেখানে আলতাফ গওহর লিখেছিলেন, ‘ফাতেমা জিন্নাহ যে প্রার্থী হবেন, আমরা সেটা জানতেই পারিনি, দিস ওয়াজ অ্যা সারপ্রাইজ টু দেয়ার ক্যাম্প।’

আসলে ব্যাপারটাকে চূড়ান্তভাবে গোপন রাখা হয়েছিল। একেবারে শেষ মুহূর্তে তা প্রকাশ করা হয়েছিল। তারপর তো যে সাড়া বা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল, সেটা তো আপনারা চোখের সামনেই দেখেছেন এবং ওখানে মানে পশ্চিম পাকিস্তানে কালারাগের নওয়াব ছাড়া আইয়ুবকে আর কেউ বাঁচাতে পারত না। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে কোনো ভোটই দিতে দেননি। সেখানে তিনি আইয়ুবের পক্ষে যাতে ভোট পড়ে, সে লক্ষ্যে জোরজবরদস্তি করেছেন।

এখানে এমন একটা ঘটনার কথা আমি বলতে চাই, যেটা কেউ জানতেন না। অথচ আমিও তখন ওই ব্যাপারটা নিয়ে খুবই খাটাখাটনি করছিলাম। ফজলুর রহমান সাহেবও খাটছিলেন। কিন্তু, আমি তখন শুনেছিলাম যে মুসলিম লীগের মধ্যে কিছু কিছু লোক ভেতরে ভেতরে একটা ছায়া মন্ত্রিসভা তৈরি করে ফেলেছিলেন। কারণ, তাঁরা স্থির ছিলেন যে ফাতেমা জিন্নাহ জিতে যাবেন এবং তিনি জিতে গেলে যে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন, সে সংক্রান্ত খবরটা প্রকাশ হয়ে পড়েছিল। এর মধ্যে মওলানা ভাসানীকে আনা হয়েছিল, আওয়ামী লীগকেও আনা হয়েছিল; কিন্তু তাঁদের মধ্যে সব সময় একটা দ্বিধা ছিল যে ফাতেমা জিন্নাহ নির্বাচনে জিতলে মুসলিম লীগকে আবার পুনরুজ্জীবিত করা হবে না তো? এ কারণেই তাঁরা ইতস্তত করতে লাগলেন। কিন্তু যখন তাঁরা এটা জানলেন যে তলে তলে একটা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়ে গেছে, তখন তাঁরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন যে যা হতে চলেছে, তা মুসলিম লীগের পুনরুজ্জীবন ঘটাবে, যে মুসলিম লীগকে আমরা ১৯৫৪ সালে পরাজিত করেছিলাম। ফলে ভাসানী এবং আওয়ামী লীগ পিছিয়ে গেল।

২৫. ইত্তেফাক প্রসঙ্গ

আরেকটা ঘটনার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। এই সময়ই আইয়ুব খান চিঠি লিখে মওলানা সাহেবকে জানালেন যে ‘আমি একটা কাজ করতে চাই। ইত্তেফাক তো আসলে আপনারই কাগজ ছিল। পত্রিকাটিকে আবার আমি আপনার কাছে ফেরত দিতে চাই। আপনি ওটা নিয়ে নেন।’ মওলানা সাহেব আমাকে বললেন, ‘এর একটা জবাব দিয়ে দাও।’

আমি বললাম, ‘আপনি বলেন, জবাবে কী লিখতে হবে?’

মওলানা সাহেব বললেন, ‘দেখ, ইত্তেফাক পত্রিকার আমিই প্রতিষ্ঠাতা ছিলাম। কিন্তু পত্রিকাটির যা কিছু উন্নতি, সেটা তো আর আমি করিনি। সে কাজটা করেছেন মানিক মিয়া১৭ এবং অন্যরা। আজকে ইত্তেফাক দৈনিক পত্রিকা এবং তার গ্রাহকসংখ্যাও অনেক। বেশ ভালো কাগজ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত। আমি তো আর কাগজ পরিচালনা করি না, এখন আর ওটা আমার ফিরে পাওয়ার কোনো অধিকার নেই। তা ছাড়া আমি নিতেও চাই না। বর্তমানে যারা আছে, তারাই চালাক। তারা পত্রিকাটিকে কোনো দিন দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে না বলে আমি আশা করি। নিজেদের একান্ত স্বার্থে ব্যবহার করবে না বলেও আমি আশা করি। কাজেই যেভাবে চলছে, তাতেই আমি সন্তুষ্ট। ওসবের মধ্যে আমি আর ফিরে যেতে চাই না।’

মওলানা সাহেবের আরেকটা গুণের কথা বলতে চাই। সেটা হলো, খবরের কাগজের প্রতি তাঁর একটা বড় দুর্বলতা ছিল। তিনি এটা বিশ্বাস করতেন যে সংবাদপত্র ছাড়া রাজনৈতিক বা অন্যান্য মতবাদ প্রচার করা এবং দেশে একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করা সম্ভব নয়। তিনি ‘ন্যাপ’ গঠন করার পরপরই একদিন আমাকে অনেক রাতে ডেকে আমার হাতে সাত হাজার টাকা তুলে দিয়ে বললেন, ‘তুমি একটা কাগজ বের করো।’

আমি বললাম, ‘আমার তো কাগজ বের করার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। আমি এই টাকা দিয়ে কী করব? তা ছাড়া এ টাকা আপনি পেলেন কোত্থেকে?’

বললেন, ‘টাকাটা আমি তোমাকে দিচ্ছি। তোমার কাছে রাখো। একটা পত্রিকা বের করতে হবে। তার প্রারম্ভিক কিছু খরচাপাতি লাগবে। এই টাকাটা সেই কাজে লাগিয়ো।’

যা-ই হোক, এ কথা শোনার পর আমি মওলানাকে বললাম, ‘তা কাগজের নাম কী হবে? আপনি যদি একটু এ ব্যাপারে বলেন!’

কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে তাঁর ধারণা ছিল খুবই ভালো। সেই সূত্র ধরেই বললেন, ‘এক কাজ কর, নজরুল ইসলামের একটা কাগজ ছিল না ধূমকেতু নামে। ওই নামেই তুমি একটা কাগজ বের করো।’

আমি বললাম, ধূমকেতু তো ধূমকেতুর মতোই উদয় হয়েছিল এবং একইভাবে সে অস্ত গিয়েছিল।

বললেন, ‘তোমারটারও দশা একই রকম হতে পারে। তুমি ওই নামেই চালাও। নাম দাও ধূমকেতু।’ শেষমেশ ঠিক করা হলো, ধূমকেতু নামে একটা পাক্ষিক অথবা সাপ্তাহিক কাগজ প্রকাশ করা হবে। তারই প্রাথমিক খরচাপাতি চালানোর জন্য তিনি আমাকে এই সাত হাজার টাকা দিলেন।

ধারণা করলাম, টাকাটা তিনি সিতারউদ্দিনের কাছ থেকে পেয়েছেন। সেই টাকাই তিনি তুলে দিয়েছেন আমার হাতে। তা-ই দিয়ে প্রারম্ভিক খরচপাতি করে আমরা ধূমকেতু বের করলাম। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন কাজী মো. ইদ্রিস। আনোয়ার জাহিদ ও গোলাম মাওলাও এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’র রাজনীতির পেছনে যে দর্শন ছিল, রাজনৈতিক দর্শন; তারই প্রতিফলন ঘটানো হতো এই পত্রিকার মাধ্যমে। এটা একটা মতবাদসর্বস্ব কাগজ ছিল। কোনো সংবাদপত্রের চরিত্র ছিল না ধূমকেতুর। এর মধ্যে কিছু কিছু লেখা এবং কার্টুন বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। ১৯৫৮ সালে মার্শাল ল হওয়ায় পত্রিকাটা আর চালানো যায়নি। কাজেই আপনাআপনি ওটাকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

সাধারণ মানুষের লোক বলে পরিচিত হওয়ার একটা বাসনা পৃথিবীর প্রায় সব বড় মানুষেরই ছিল। রবীন্দ্রনাথ এ জন্য তাঁর এক কবিতায় লিখেছিলেন, ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক/ আমি তোমাদেরই লোক’।

মওলানা ভাসানীর কিন্তু কষ্ট করে ‘আমি তোমাদেরই লোক’ বলে পরিচয় দেওয়ার কিছুই ছিল না। কেননা, ওনার সাধারণ লোকের ঘরেই জন্ম। সাধারণ লোকের স্বার্থের জন্যই কাজ করে গেছেন এবং সাধারণ মানুষের নেতা বলেই সাধারণ মানুষ তাঁকে গ্রহণ করেছিল। মাঝেমধ্যে তিনি কোমর একটু-আধটু দুলিয়েছিলেন বটে কিন্তু মাথার কলসিটা ঠিকই ছিল। অর্থাত্ তিনি সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো দিন কোনো কাজ করেননি।

একেবারেই সাধারণ মানুষ ছিলেন তিনি। তাঁকে ঢাকায় এবং তাঁর কাগমারি অথবা তাঁর পাঁচবিবির বাড়িতে দেখেছি যে হাজার হাজার লোক তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসত। উনি তাদের পীরও ছিলেন।

মওলানা ভাসানী বাংলা এবং উর্দু দুটো ভাষাই জানতেন। এবং দুটো ভাষাতেই ভালো বক্তব্য দিতে পারতেন। আমি তাঁকে করাচিতে এবং অন্য নানা জায়গায় অবাঙালি শ্রোতাদের মধ্যে বক্তব্য দিতে শুনেছি। সেখানেও তারা, মানে সাধারণ মানুষজন তাঁর বক্তব্য অনেক আগ্রহের সঙ্গে শুনেছে। মওলানা ভাসানীকে তারা তাদের লোক বলেই গ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশের কোনো নেতাকে আমি এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার জনগণের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করতে এর আগে শুনিনি।

কিন্তু মওলানা ভাসানী একমাত্র নেতা, যিনি আমাদের রাজনীতিতে একটা নতুন মাত্রা যোগ করলেন। তিনি বড় বড় মিটিংয়ে, পাকিস্তান, ইন্ডিয়া, এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকার জনগণের আন্দোলনের সঙ্গে জোরালো ভাষায় একাত্মতা ঘোষণা করতেন।

শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের জীবনীতে একটা গল্পের উল্লেখ আছে। গল্পটা এ রকমের: একদিন তাঁর এক ভক্ত এসে বিবেকানন্দ সম্পর্কে অভিযোগ করে বললেন যে তিনি এমন কিছু কাজ করে থাকেন যেটা তাঁর করা উচিত নয়। শ্রী রামকৃষ্ণও বললেন, না, ও ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু অভিযোগকারী সেই ব্যক্তি কয়েকবারই এসে একই রকমের অভিযোগ করতে লাগলেন। ঠিক এই ঘটনার মুখে শ্রী রামকৃষ্ণ যে গল্পটা বলে শোনালেন, সেটা এ রকমের: গ্রামের কুয়ো থেকে জল আনতে যায় গ্রামের যুবতী তরুণীরা, তখন আশপাশের ছেলে-ছোকড়াও যায় তার সঙ্গে সঙ্গে। তারা শিস ইত্যাদি বাজিয়ে তাদের উত্ত্যক্ত করে, হাসিঠাট্টাও করে। তারপর সবাই জলটল নিয়ে কলসি মাথায় নিয়ে ফিরতে থাকে বাড়িমুখো। ছেলেরা আগের মতোই শিস বাজায়। আর মেয়েরাও কোমর দোলায়। কিন্তু কোনো দিন কি তাদের মাথা থেকে কলসি পড়ে যায়? পড়ে না। বিবেকানন্দও এমনই। তিনি যদি এদিক-ওদিক করেনও, তিনি আমার কাজ ঠিক ঠিকই করে যাবেন। চিন্তার কোনো কারণ নেই।

মওলানা ভাসানীও তেমনি মাঝেমধ্যে একটু কোমর দুলিয়েছিলেন সত্য; কিন্তু সাধারণ মানুষের স্বার্থের জন্য তিনি সারা জীবনই লড়াই করেছেন। তাদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে তিনি কোনো দিন কিছু করেননি।

মওলানা ভাসানীর যে ব্যাপক পরিচিতি, সাধারণ মানুষের বন্ধু বলে তাঁর যে খ্যাতি কিংবা তিনি নিজেও সাধারণ লোক বলে সাধারণ মানুষজনও তাঁকে তাদের নিজেদের লোক বলে ভাবে—এই যে তাঁর একটা গুণ অথবা এই যে তাঁর জনপ্রিয়তা, তাঁকে সাংগঠনিকভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয় ন্যাপ।

সেই ব্যর্থতার কারণে মওলানা ভাসানীও পরের দিকে খুবই হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। আসলে এনএপি বা ন্যাপ-এর মধ্যে দুটো ভাগ ছিল। এক ভাগে ছিল বামপন্থী। অর্থাত্ লোকজন যাদের কমিউনিস্ট বলে জানত। তাদের সংখ্যাই ছিল ন্যাপে বেশি। আরেকটা গ্রুপ ছিল ডানপন্থী। বামপন্থীদের নেতৃত্ব দিত কমিউনিস্টরা এবং ডানপন্থীদের নেতৃত্ব দিতেন মাহমুদ আলী এবং অন্যরা। মওলানা ভাসানী এই দুটো গ্রুপের মধ্যে একটা ভারসাম্য রক্ষা করে চলতেন এবং মনে করতেন যে কমিউনিস্টদের যে সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জনগণের স্বার্থে কাজ করার লক্ষ্যে তাঁদের নিজেদের উত্সর্গ করার যে মনোভাব, তিনি তাঁর সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার ক্ষেত্রে এটাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার বলে মনে করতেন। কিন্তু পরে এ ব্যাপারে তাঁর ভয়ানক মোহভঙ্গ ঘটেছিল।

আরেকটা কারণে তার মোহভঙ্গ হয়েছিল ঠিক তখন, যখন মস্কো কমিউনিস্ট পার্টির চীনের পার্টির মধ্যকার নীতিগত বিরোধের জের ধরে এখানেও কমিউনিস্টরা বিরোধ ও বিভেদে জড়িয়ে পড়ে। তারা একত্রে আর কাজ করতে পারল না। সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে হয়, মওলানা ভাসানী তাঁর সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কমিউনিস্টদের যেভাবে ব্যবহার করবেন বলে ঠিক করেছিলেন, তেমনটা না হওয়ায় তিনি সত্যি সত্যি হতাশ হয়েছিলেন। ঠিক এই একই কারণে পরে তিনি কমিউনিস্টদের সংস্রব প্রায় ত্যাগ করেছিলেন। ত্যাগ করে তিনি আবার তাঁর ওই প্রাথমিক জীবনের ধর্মীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে চলে গিয়েছিলেন। অর্থাত্ আবার সেই ইসলাম পন্থার অনুসারী রাজনীতি শুরু করলেন। পরের দিকে আমার মনে হয়েছিল তিনি ইসলামিক সোশ্যালিজম বা ইসলামিক সমাজতন্ত্র কায়েম করার কথাও বোধ হয় বলতে শুরু করেছিলেন। ফলে এ কথা সম্ভবত বলা যায় যে যাঁরা তাঁর সঙ্গে কাজ করতেন, তাঁদের ব্যর্থতার কারণেই, তাঁদের মধ্যকার চরম বিভেদের কারণেই মওলানা ভাসানী আবার এসব কিছুর মধ্যে চলে গিয়েছিলেন।

মওলানার বিশাল সব সম্মেলন, ন্যাপের সম্মেলন, কৃষক সম্মেলন—এ-জাতীয় সব সম্মেলনে প্রচুর লোকসমাগম হতো। যেসব লোক আসত, তাদের আবার রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করে তাদের একটা কাজের মধ্যে নিয়ে আসার যে ব্যাপারটা, সেই কাজটা মওলানা করতে পারতেন না। এই লোকগুলোকে তিনি যে ন্যাপে ডেকে আনলেন কিংবা তাঁর কর্মীদের মধ্যে নিয়ে এলেন, তাদের সংগঠিত করে একটা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে না পারা একটা বিরাট ব্যর্থতার ব্যাপার।

মওলানা ভাসানী নিজে কোনো দিন এভাবে সংগঠন করতে পারেননি, অন্তত আমি যখন থেকে তাঁকে জানতাম, তত দিন পর্যন্ত পারেননি। তিনি সংগঠন করতেন না, সে ক্ষমতাও তাঁর ছিল না। দেখেছি, তিনি বিশাল সব কৃষক সম্মেলন ডাকছেন—পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সব বড় বড় নেতা তাতে যোগ দিলেন, লাখ লাখ লোকসমাগম হলো। কিন্তু তিনি কেন ডাক দিয়েছেন, সে ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য নেই। তাঁরা এসেছেন মওলানা সাহেব ডেকেছেন বলে। সাধারণ মানুষজন এসেছেন তাঁদের ‘পীর’ বা ‘হুজুর’ ডেকেছেন বলে। কেন তাঁরা যোগ দিলেন, কৃষক সমিতির উদ্দেশ্যটা কী, তাঁদের কেন ডাকা হলো—বলার আগেই তাঁর গলা ভেঙে গেল, তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আর তাঁর দলভুক্ত নেতা-কর্মীরা, কৃষক ও শ্রমিক ফ্রন্টের নেতা-কর্মীরাও রাজনৈতিকভাবে এসব কিছুকে যথাযথ কাজে লাগাতে পারলেন না। আর তেমনটা না করতে পারার জন্য শেষ পর্যন্ত দেখা গেল যে এত বড় একটা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার পরও তার কোনো প্রভাব পড়ল না। এটা একটা মস্ত বড় ব্যর্থতা। এটা কেবল তাঁর নিজের ব্যর্থতা নয়, তাঁর দলভুক্ত অন্যান্য ফ্রন্টের নেতা-কর্মীর পাশাপাশি অন্য আর যাঁরা এসবের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁদেরও ব্যর্থতা।

জনগণের অভাব-অভিযোগ সাম্প্রতিক কালে অনেক বেড়েছে। লোকজন কথায় কথায় বলে থাকে যে, মওলানা ভাসানীর মতো কেউ যদি থাকত, তাহলে এখন আমাদের এমন দুর্দশা হতো না। যখনই জনসাধারণের তরফ থেকে কোনো ধরনের অভিযোগ উঠেছে, তার দুর্ভোগের শিকার হয়েছে, তখনই তার প্রতিকারের আশায় তারা ভাসানী সাহেবের কাছে ছুটে গেছে। এ রকমটা যখনই হয়েছে মওলানা সাহেব সঙ্গে সঙ্গে সংবাদপত্রে একটা বিবৃতি দিয়ে দিতেন। সেই বিবৃতি ছাপানোর সঙ্গে সঙ্গেই যারা দেশের কর্তা ছিলেন, তাঁদের টনক নড়ে যেত। তাঁরা দ্রুতই মওলানার উত্থাপিত সমস্যাগুলোর সমাধানে তত্পর হতেন।

এমনও দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ তাদের দাবি জানাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়ে পথে নামলেই মওলানা সাহেবও তাদের কাতারে শামিল হতেন। তিনি এ ধরনের কোনো মিছিল বা সমাবেশে গেলে, ফলাও করে সেটা প্রচারও করা হতো। মানুষ জানত, কেন মওলানা ভাসানী পথে নেমেছেন সাধারণ মানুষকে তাঁর সঙ্গী করে।

আজকে এত অভাব-অভিযোগের পর মানুষ কাউকে তাদের পাশে পায় না। মওলানা ভাসানীর অবর্তমানে একটা রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। আজকে মানুষ জানে না কার কাছে গেলে তাদের অভাব-অভিযোগের প্রতিকার হবে। আজকে মওলানা ভাসানীর সম্পর্কে অনেক কথা বলা যায়, তাঁর সমালোচনাও করা যায়। কিন্তু এ কথা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে মওলানা ভাসানী বজ্রকণ্ঠে যে প্রতিবাদ করতেন, সেই প্রতিবাদে শাসনকর্তাদের আসন টলে উঠত। এই একজন মানুষের অভাব, দেশের সাধারণ মানুষ হাড়ে হাড়ে অনুভব করছে। এই অভাব যে কোনো দিন পূরণ হবে, এমন কোনো আশার আলো আমরা দেখছি না। দেশে যে শুধু রাজনৈতিক শূন্যতাই আছে, তা নয়, নেতা ও নেতৃত্বেরও শূন্যতা আছে। মওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পর নেতৃত্বের যে শূন্যতা, সেটা পূরণ হবে বলে মনে হয় না।

টিকা

১. তেভাগা আন্দোলন বাংলার ইতিহাসের একটি কৃষক আন্দোলন। ১৯৪৬ সালে বাংলার রংপুর, দিনাজপুর, ময়মনসিংহসহ উত্তরবঙ্গে এ কৃষক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। তেভাগা আন্দোলনের মূল দাবি ছিল উত্পন্ন ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ পাবেন চাষি এবং এক ভাগ পাবেন মালিক। তেভাগা আন্দোলনের মূল দাবি ছিল ‘জান দেব তবু ধান দেব না’।

২. ফজলুর রহমান (১৯০৫-১৯৬৬) একজন রাজনীতিবিদ। ১৯৩৩ সালে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে ১৯৩৭ সালে প্রথমবারের মতো এবং ১৯৪৬ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ঢাকা শহর থেকে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৩ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার চিফ হুইপ ও ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় সরকারের রাজস্ব মন্ত্রী নিযুক্ত হন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর লিয়াকত আলী খানের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষা, বাণিজ্য ও শরণার্থী পুনর্বাসন, খাজা নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষা ও বাণিজ্য ও আই আই চুন্দ্রীগড়ের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের বাণিজ্য, অর্থ ও আইনবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া তিনি পূর্ববঙ্গ পরিষদের নির্বাচিত সদস্য, পাকিস্তান দ্বিতীয় গণপরিষদের সদস্য, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য, বঙ্গীয় রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য, নিখিল ভারত মুসলিম লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য, নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং পাকিস্তান হিস্টোরিক্যাল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাকিস্তান আন্দোলনে তার অবদান উল্লেখযোগ্য। উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার এবং আরবি হরফে বাংলা লেখার অন্যতম প্রবক্তা।

৩. ভারতের শাসনতান্ত্রিক সমস্যার সমাধান এবং ভবিষ্যত্ সংবিধান রচনার ব্যাপারে ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার সদস্য স্যার স্টাফোর্ড ক্রিপসের নেতৃত্বে ভারত সচিব লর্ড প্যাথিক লরেন্স ও নৌ-প্রধান আলেকজান্ডারকে নিয়ে তিন সদস্যের যে প্রতিনিধিদল ভারতে আসে, তা-ই ক্যাবিনেট মিশন নামে পরিচিত।

৪. আবুল হাশিম (১৯০৫-১৯৭৪) একজন চিন্তাবিদ ও রাজনীতিবিদ। পড়াশোনা শেষে দক্ষ আইনজীবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩৬ সালে বঙ্গীয় বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৩৮ সালে বর্ধমান জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি, ১৯৪২ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, ১৯৪৩ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তাঁর কর্মকুশলতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও সাম্যবাদী আদর্শে মুগ্ধ হয়ে তরুণসমাজ ব্যাপকভাবে লীগের পতাকাতলে সমবেত হয়। ফলে মুসলিম লীগ একটি গণসংগঠনে পরিণত হয় এবং ১৯৪৬ সালের বঙ্গীয় আইন সভার নির্বাচনে মুসলিম লীগ বিজয়ী হয়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলের নেতা হিসেবে নেতৃত্ব প্রদান করেন। ১৯৫০ সালে কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় আসেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন ও গ্রেপ্তার হয়ে ১৬ মাস কারাজীবন ভোগ করেন। মুক্তি পাওয়ার পর খেলাফতে রব্বানী পার্টির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬০ সালে ইসলামিক একাডেমির প্রথম পরিচালক নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে মুসলিম লীগের রাজনীতি পরিত্যাগ করে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন।

৫. ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগকে পরাজিত করার জন্য আওয়ামী লীগ, কৃষক প্রজা পার্টি, গণতন্ত্রী দলসহ সমমনা দলগুলোকে নিয়ে একটি নির্বাচনী জোট গঠন করা হয়। এটি যুক্তফ্রন্ট নামে পরিচিত। যুক্তফ্রন্ট ঐতিহাসিক ২১ দফা তাদের নির্বাচনী ইশতেহার হিসেবে ঘোষণা করে।

৬. মসিউর রহমান (১৯২৪-১৯৭৯) একজন রাজনীতিবিদ। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত রংপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুসলিম লীগের নেতা হিসেবে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করেন। পঞ্চাশের দশকে মুসলিম লীগের রাজনীতি ত্যাগ করে মওলানা ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন। শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ছয় দফা দাবির বিরোধিতা করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদশের স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে প্রথমে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ ও পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেন। স্বাধীনতার পর দালাল আইনে গ্রেপ্তার হন। মওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পর ১৯৭৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের বিএনপিতে যোগ দেন। মসিউর রহমান যাদু মিয়া নামে পরিচিত। দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান ও বাগ্মী হিসেবে খ্যাতি ছিল।

৭. ১৯৪১ সালের নভেম্বরে মুসলিম লীগ ও কৃষক প্রজা পার্টির কোয়ালিশন সরকার থেকে মুসলিম লীগের বেরিয়ে যাওয়ার পর এ কে ফজলুল হক ও তাঁর মন্ত্রিসভা ৭ ডিসেম্বর ইস্তফা দেয়। ফজলুল হককে সংগঠন ও মুসলিম কার্যবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য মুসলিম লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। ফজলুল হক ডিসেম্বর মাসে মন্ত্রিসভা গঠন করেন। ৪৩ জন সদস্য নিয়ে খাজা নাজিমুদ্দিন মুসলিম লীগে রয়ে যান এবং বিরোধী দলের নেতৃত্ব দেন। নতুন মন্ত্রিসভায় ফজলুল হক ছাড়াও চারজন হিন্দু ও চারজন মুসলিম সদস্য ছিলেন। উগ্র হিন্দু মহাসভার নেতা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে গুরুত্বপূর্ণ অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করার কারণে কেউ কেউ এ মন্ত্রিসভাকে ‘শ্যামা-হক’ মন্ত্রিসভা নামে অভিহিত করেন।

৮. হামিদুল হক চৌধুরী (১৯০১-১৯৯২) একজন রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী। শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগের মনোনয়নে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত নির্ধারণে র্যাডক্লিফ কমিশনের সদস্য হন। দেশভাগের পর কলকাতা থেকে ঢাকায় আগমন। ১৯৪৯ সালে পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক সরকারের অর্থমন্ত্রী, ১৯৫৩ সালে শেরেবাংলার নেতৃত্বে কৃষক প্রজা পার্টি গঠন ও এর সহসভাপতি হিসেবে নির্বাচিত, ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান দ্বিতীয় গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত, ১৯৫৮ সালে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত হন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফার বিরোধিতা করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেন। হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য গঠিত শান্তি কমিটির শীর্ষ নেতা ছিলেন। দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা।

৯. ফরিদ আহমদ (১৯২৩-১৯৭১) একজন রাজনীতিবিদ। পাকিস্তান সরকারের ভাষানীতির প্রতিবাদে এবং ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে ঢাকা কলেজের অধ্যাপনার চাকরিতে ইস্তফা দেন। ১৯৫৪-১৯৬৯ পর্যন্ত নেজামে ইসলাম পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মনোনয়নে পূর্ববঙ্গ পরিষদের সদস্য, ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান দ্বিতীয় গণপরিষদের সদস্য, ১৯৫৭ সালে চুন্দ্রীগড় মন্ত্রিসভার শ্রমমন্ত্রী, ১৯৫৬ সালে কক্সবাজার মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান, ১৯৬২ সালে মৌলিক গণতন্ত্রের অধীনে উপনির্বাচনে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন ও মিস ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে প্রচারণাকাজে অংশ নেন। ডাক এর বিশিষ্ট সদস্য হিসেবে ১৯৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী  গণ-আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান গণতান্ত্রিক দল গঠনে বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেন। শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফার বিরোধিতা করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেন। হানাদার বাহিনীর সহযোগী শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনী গঠন ও নেতৃত্ব দেন। ১৯৭১ সালে জনগণ কর্তৃক ধৃত ও বিক্ষুব্ধ জনতার প্রহারে নিহত হন।

১০. জিতেন ঘোষ (১৯০১-১৯৭৬) একজন লেখক ও রাজনীতিবিদ। ছাত্রাবস্থায় অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে কলেজজীবন ত্যাগ করেন। ছাত্রাবস্থায় যুগান্তর দলের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯২৫ সালে বিপ্লবী পার্টির সংগঠক হিসেবে বার্মায় গমন ও সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৩০ সালে দেশে ফেরার পর ১৯৩১ সালে গ্রেপ্তার এবং বিনা বিচারে সাত বছর কারাভোগের পর ১৯৩৮ সালে মুক্তি পান। ওই বছর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন ও পরের বছর পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪০ সালে আবার গ্রেপ্তার হন ও ১৯৪১ সালে মুক্তি পান। ১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষের সময় চাঁদা তুলে বিক্রমপুরে একটি এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৭ সালে ঢাকা জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে বাংলাদশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন।

১১. জ্ঞান চক্রবর্তী (১৯০৭-১৯৭৭) একজন রাজনীতিবিদ। স্কুল বয়সেই সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। ১৯৩০ সালে গোপন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জন্য গ্রেপ্তার হন। ১৯৩৮ সালে দেউলী বন্দিশিবির থেকে  মুক্তি লাভ করেন। ১৯৩৮ সালে ঢাকা জেলা কমিউনিস্ট পার্টির পরিচালনায় গণসাহিত্যচক্র নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা স্থাপন করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নেন।

১২. ওয়াহিদুজ্জামান (১৯১২-১৯৭৬) একজন রাজনীতিবিদ। ডাকনাম ঠান্ডামিয়া। মুসলিম লীগের সদস্য হিসেবে পাকিস্তান আন্দোলনে অংশ নেন। নিখিল ভারত মুসলিম লীগের কাউন্সিলর, বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য, বেঙ্গল কো-অপারেটিভ অর্গানাইজেশনের সেক্রেটারি, কলকাতা করপোরেশনের কাউন্সিলর, বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য, পূর্ব পাকিস্তান কো-অপারেটিভ ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পাকিস্তান স্টেট ব্যাংকের বোর্ড অব ডাইরেক্টরসের মনোনীত সদস্য ও নির্বাচিত সদস্য, পাকিস্তান প্রথম গণপরিষদের সদস্য, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য, কনভেনশন মুসলিম লীগের নিখিল পাকিস্তান কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, ১৯৬২ সালে আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের অধীনে জাতীয় পরিষদের সদস্য ও আইয়ুব মন্ত্রিসভার বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি শেখ মুজিবের ছয় দফার বিরোধিতা করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা করেন। হানাদার বাহিনীর সহযোগী শান্তি কমিটির অন্যতম নেতা ছিলেন।

১৩. শাহ আজিজুর রহমান (১৯২৫-১৯৮৭) একজন রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী। অবিভক্ত বাংলার অন্যতম ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিত। ১৯৪৫-১৯৪৭ সাল পর্যন্ত নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করেন। ১৯৫২-১৯৫৮ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি পক্ষের অন্যতম আইনজীবী। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে বিরোধিতা করেন। পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে বক্তব্য প্রদান করেন। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন।

১৪. কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১) একজন সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী। পড়াশোনার শেষ অবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের ডেমোনস্ট্রেটর হিসেবে কর্মজীবন শুরু। কর্মজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী প্রভাষক, গণিত ও পরিসংখ্যান বিভাগের প্রভাষক, পরিসংখ্যান বিভাগ আলাদা হলে এর রিডার ও বিভাগীয় প্রধান, অধ্যাপক পদে উন্নীত, সুপার নিউমারারি অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব স্ট্যাটিসটিক্যাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা।

১৫. খাজা কায়সার (১৯১৮-১৯৮৫) একজন লেখক ও কূটনীতিক। শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৪১ সালে ভারতীয় পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। দেশভাগের পর ১৯৫০ সালে পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগ দেন। কূটনীতিক হিসেবে পিকিং, নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, বার্মা, সিঙ্গাপুর, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড এবং চীনে পাকিস্তান ও পরে বাংলাদেশের হাইকমিশনার, পররাষ্ট্র দপ্তরের পরিচালক, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি, নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৬. আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ (১৯০০-১৯৮৬) একজন রাজনীতিবিদ। স্কুলে পাঠ্যাবস্থায় অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন। লাহোরে তর্ক প্রতিযোগিতায় সুনাম অর্জন করে তর্কবাগীশ উপাধি লাভ করেন। আঞ্জুমানে ওয়াদিনের পক্ষ থেকে বাংলার বিভিন্ন স্থানে ইসলাম ধর্ম প্রচার করার কাজ করেন। পরবর্তী সময়ে কৃষক আন্দোলনে যোগ দেন। কৃষক খাতক সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩৬ সালে মুসলিম লীগে যোগ দেন ও ১৯৪৬ সলে বঙ্গীয় বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলি চালানোর প্রতিবাদে পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের অধিবেশন থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৪৭ সাল পরবর্তী প্রতিটি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং এ সময় তাঁকে বহুবার কারাবরণ করতে হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ও আশির দশকে এরশাদের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে জোরালো ভূমিকা পালন করেন।

১৭. তফাজ্জল হোসেন (১৯১১-১৯৬৯) একজন সাংবাদিক ও সম্পাদক। তাঁর ডাকনাম মানিক মিয়া। শিক্ষাজীবন শেষে সোহরাওয়ার্দীর সহযোগিতায় সরকারি চাকরিতে যোগ দিলেও পরবর্তী সময়ে সোহরাওয়ার্দীর কথামতো সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন। কলকাতা প্রাদেশিক মুসলিম লীগ অফিসের সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ পান। রাজনৈতিক মতাদর্শে সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৪৬ সালে সোহরাওয়ার্দী কর্তৃক দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকার পরিচালনা বোর্ডের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৮ সালে পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেলে কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৫১ সালে আওয়ামী লীগের মুখপত্র হিসেবে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে এটি তাঁর সম্পাদনায় দৈনিক পত্রিকায় পরিণত হয়। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হলে ১৯৫৯ সালে গ্রেপ্তার হন। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে ষাটের দশকে প্রতিটি আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৩ সালে আন্তর্জাতিক প্রেস ইনস্টিটিউট পাকিস্তান শাখার সভাপতি, পাকিস্তান প্রেস কোর্ট অব অনার সংস্থার সেক্রেটারি, পিআইএ’র ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

 

কপি অনুলিখন: রীতা ভৌমিক

pathok

যোগাযোগের ঠিকানা

সিএ ভবন,
১০০ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,
কারওয়ান বাজার, ঢাকা - ১২১৫।

ফোন: ৮৮০-২-৮১১০০৮১, ৮১১৫৩০৭
ফ্যাক্স - ৮৮০-২-৯১৩০৪৯৬

protichinta kinte chile