protichinta

প্রপাগান্ডা ও গণমাধ্যম: যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ

সামিয়া রহমান ও সৈয়দ মাহফুজুল হক

সারসংক্ষেপ

যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজের প্রধান চলক তথ্য ও জ্ঞান।  জ্ঞানভিত্তিক সমাজে গণমাধ্যম এই তথ্য ও জনগণের মতামত, বিশ্বাস গঠন ও পরিবর্তনে তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমাজের বিভিন্ন স্তরে গণমাধ্যম ক্রমান্বয়ে তার ক্ষমতার বিকাশ ঘটিয়েছে। সাম্প্রতিককালে গোটা বিশ্ব, বিশেষ করে বাংলাদেশেও, গণমাধ্যমের এই এজেন্ডা নির্ধারণ এবং সেই বিষয়ে জনগণের কাছ থেকে সম্মতি অর্জনের প্রচেষ্টা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিতর্ক উঠেছে কোনো ঘটনা বা সংবাদের নেতিবাচক প্রচারণার ক্ষেত্রে এখন শুধু সরকার, প্রতিষ্ঠান বা সাংবাদিকের নিজস্ব সেন্সরশিপই কাজ করছে না; বরং গণমাধ্যমের স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এজেন্ডা নির্ধারণ এবং সেই এজেন্ডার পক্ষে সম্মতি গঠনের জন্য প্রচারণাও অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এই প্রবন্ধে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে বা কোনো সংঘাতের সময়ে গণমাধ্যম কীভাবে মানুষের মতামতকে প্রভাবিত করেছে, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধের সময়ে মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর যুদ্ধের পক্ষে সাফাইদানকারী ভূমিকা এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একই সঙ্গে আলোচনায় নিয়ে আসা হয়েছে যুদ্ধাপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গঠিত গণজাগরণ মঞ্চ, তার প্রেক্ষাপটে হেফাজতে ইসলামের আবির্ভাব, মতিঝিলে অবস্থান, যৌথ বাহিনীর ‘অপারেশন শাপলা’ পরিচালনা ইত্যাদি। বিশেষ উদ্দেশ্যে পরিচালিত গণমাধ্যমের মতামত নির্ধারণ ও সম্মতি উত্পাদনের প্রচেষ্টার বিষয়গুলো এখানে আলোচিত হয়েছে।

মুখ্য শব্দগুচ্ছ: জনমত, সম্মতি উত্পাদন, এজেন্ডা নির্ধারণ, প্রচারণা, গণজাগরণ মঞ্চ/শাহবাগ আন্দোলন, অপারেশন শাপলা, আস্তিক/নাস্তিক, হেফাজতে ইসলাম।

প্রারম্ভিক কথা

গণতান্ত্রিক সমাজে স্বতঃসিদ্ধ বিশ্বাসটি এমন যে মিডিয়া স্বাধীন এবং সত্য উদ্ঘাটনে ও তা রিপোর্ট করার প্রতি দায়িত্বশীল। ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীগুলো যেভাবে দেখাতে চায়, মিডিয়া কেবল সেভাবেই বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে না। শুধু তথ্য, বিনোদন ও শিক্ষা দিয়েই নয়; বরং এই তিনটি কাজের মাধ্যমে বলীয়ান হয়ে গণমাধ্যম এখন মানুষের মতামতকে নিয়ন্ত্রণ করছে। গণমাধ্যমভিত্তিক যে তথাকথিত গণতান্ত্রিক সমাজে বর্তমানে আমরা বাস করি, সেখানে জনগণের কাছে পৌঁছানোর জন্য গণমাধ্যমগুলো আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ এবং তা প্রচার ও প্রসারের জন্য গণমাধ্যমগুলো একধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে। গণমাধ্যমই এখন এজেন্ডা ঠিক করছে, জনগণ কোন বিষয়ে প্রাধান্য দেবে, আলোচনা করবে। গণমাধ্যমের প্রভাববিষয়ক শুরুর দিকের গবেষণাগুলো, বিশেষ করে ম্যাজিক বুলেট-তত্ত্ব, জনগণের ওপর গণমাধ্যমের সরাসরি প্রভাবকে গুরুত্ব দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা গেল, জনগণের ওপর গণমাধ্যমের প্রভাব ঠিক ততটা সর্বজনীন নয়। জনগণ তাদের পছন্দমতো গণমাধ্যম ব্যবহার করে। অর্থাত্ জনগণ নিজেরাই ঠিক করে তারা কী দেখবে আর কী বর্জন করবে। কিন্তু সমাজ যত তথ্য ও গণমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল হতে শুরু করে, তথ্য যত বেশি জীবনযাপনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠতে থাকে, জনগণেরও গণমাধ্যম নির্ভরশীলতা তত বাড়তে শুরু করে। এই নির্ভরশীলতার সুযোগে, বিশেষ করে আধিপত্য ও ক্ষমতা বিস্তারের জন্য গণমাধ্যম স্বউদ্যোগে ভূমিকা নিতে শুরু করে। বলা হয় যে মিডিয়ার ওপর এখন জনগণের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই—মালিক ও ব্যবস্থাপকেরাই বিজ্ঞাপন আকর্ষণের চেষ্টা করেন এবং নির্ধারণ করেন কী পরিবেশন করা হবে, আর জনগণকে অবশ্যই সেগুলোর ভেতর থেকেই পড়া বা দেখার জন্য বাছাই করতে হয়। জনগণ স্বভাবতই অনেক কিছু পড়ে বা দেখে তার কারণ সেগুলো অনায়াসে পাওয়া যায় এবং সেগুলোই তাদের সামনে তুলে ধরা হয়।

গণমাধ্যম যত সমাজে ক্ষমতার নিয়ামক হয়ে উঠতে থাকে, দেশ ও জনগণের ওপর এর প্রভাবের ধরন তত বদলে যেতে থাকে। ‘ওয়াচডগের’ পরিবর্তে গণমাধ্যম বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে থাকে, গণমাধ্যম নিজেরাই ইস্যু তৈরি করে, সেই ইস্যুর পক্ষে বা বিপক্ষে নেতিবাচক প্রচারণা চালায় বা চালানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়। সমাজে প্রযুক্তিগত উত্কর্ষ যত বেড়েছে, গণমাধ্যম যত মানুষের কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছে, তার একচ্ছত্র আধিপত্য তত বেড়েছে। এই ক্ষমতার বিস্তার মানুষের মনোজগতে, আচরণে পরিবর্তন আনছে। কতটুকু সফল হচ্ছে সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ কিন্তু গণমাধ্যমের এই ভূমিকা যেমন আমরা পশ্চিমা বিশ্বে দেখেছি তেমনি দেখছি বাংলাদেশেও। বিশেষ করে সংঘাত, সহিংসতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের এজেন্ডা নির্ধারণ এবং সেই এজেন্ডার পক্ষে বা বিপক্ষে উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা গণমাধ্যমের ভূমিকাকে করে তুলছে বিভ্রান্তিকর। গণমাধ্যম যখন মানুষের চিন্তার দিক, পরিসর ঠিক করে দেওয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন গণমাধ্যমের ভূমিকা হয়ে ওঠে ঈশ্বরের সমতুল্য।

বাংলাদেশে সহিংসতা বা সংঘাতের সময়গুলোতে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে কাজ দেখা যায় না বললেই চলে। আর এটিই অনুপ্রাণিত করেছে হেফাজতে ইসলামের বিকাশ কিংবা সহিংসতা বা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে গণমাধ্যমের মতামত বিশ্লেষণে। তবে যুদ্ধের সময় মার্কিন গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রচুর কাজ দেখতে পাওয়া যায়। কীভাবে মার্কিন গণমাধ্যমগুলো যুদ্ধের পক্ষে জনগণের মতামতকে নিয়ে যেতে কাজ করছে, তা অনেক গবেষকই দেখিয়েছেন। বলা যায় গবেষক মুইনের (২০১১) কথা। তিনি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারে হামলা এবং ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের উদাহরণ টেনেছেন। ঘটনাবহুল এই দুটি সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা গণমাধ্যম যে এজেন্ডা মানুষের মধ্যে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছে এবং অনেকাংশে প্রভাবিত করেছে, মানুষের আচরণ বা বিশ্বাসেও তা-ই প্রতিফলিত হয়েছে। মুইন অবশ্য শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা গণমাধ্যমের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন।

ঠিক উল্টো ছবি দেখা যায় হায়েসের (২০০৫) গবেষণায়। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে গণমাধ্যমগুলো কীভাবে এজেন্ডা নির্ধারণ করে এবং সেই এজেন্ডার পক্ষে কীভাবে কাজ করে বা সম্মতি আদায় করে, তারই এক অনন্য উদাহরণ বলে মন্তব্য করেন। তিনি আরও জানান, এই যুদ্ধেই প্রথম পেন্টাগন তাদের স্বার্থে গণমাধ্যমকে যুদ্ধের পক্ষে মতামত তৈরির জন্য ব্যবহার করে।

ঠিক একইভাবে বাংলাদেশে বিএনপি ও জামায়াত ঘরানার গণমাধ্যমের ভূমিকা জানাও হবে এই প্রবন্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য। প্রতিটি গণমাধ্যমের নিজস্ব নীতিমালা আছে, আছে সম্পাদকীয় আদর্শ বা সিদ্ধান্ত। কিন্তু গণমাধ্যমের নিজস্ব সব সিদ্ধান্ত বা আদর্শের বাইরেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি বা চেতনা আছে, সেটি হচ্ছে, সত্যের প্রতি একাগ্রতা ও সত্যের অনুসন্ধান। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নামে সংঘাত, সহিংসতা বা রাজনৈতিক অস্থিরতায় সেই সত্যের চেতনার মৃত্যু বা ধ্বংসের যে সাংবাদিকতা আমরা দেখেছি, তা ওয়াচডগ সাংবাদিকতার পরিবর্তে বিভ্রান্তিমূলক সাংবাদিকতার জন্ম দিয়েছে।

গত এক যুগোর্ধ্ব সময়কালে এলিট আধিপত্যের কৌশল হিসেবে সংবাদ উত্সায়ন ও হুমকি-ধমকি ব্যবস্থাগুলো আরও শক্তিশালী হয়েছে। মিডিয়াতে কেন্দ্রীকরণ ও সাংবাদিকতার কাজে অর্থ বরাদ্দ হ্রাস, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় মিডিয়াকে অধিক নির্ভরশীল করে তুলেছে সেসব প্রাথমিক সংবাদ সংজ্ঞায়নকারীর ওপর যারা একই সঙ্গে সংবাদ বানায় এবং প্রাপ্তিযোগ্য ও সস্তা সরবরাহের মাধ্যমে মিডিয়ার ব্যয় সাশ্রয় করে দেয়। মিডিয়ার ওপর এখন তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রবলতরভাবে জারি আছে।

তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা

প্রবন্ধটিতে ঐতিহাসিক ঘটনা বিশ্লেষণের মাধ্যমে ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কেস স্টাডির সাহায্যে ঐতিহাসিক ঘটনাকে বিশ্লেষণ করে গণমাধ্যমের ভূমিকা জানার চেষ্টা করা হয়েছে। একই সঙ্গে গবেষণাটির তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে যোগাযোগের প্রচারণা বা প্রপাগান্ডা-তত্ত্ব ও গণমাধ্যমের এজেন্ডার সেটিং-তত্ত্ব বেছে নেওয়া হয়েছে। প্রচারণা-তত্ত্ব বলে, গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে খুব সুকৌশলে মানুষের মনে নির্দিষ্ট কোনো বার্তা দাগ কাটার প্রক্রিয়াই হলো প্রচারণা। মানুষ যাতে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য বা সংবাদ বিশ্বাস করে, সে লক্ষ্যের কথাই বলে প্রচারণা বা প্রপাগান্ডা-তত্ত্ব। ইতিহাস বলে, জার্মানির শাসক অ্যাডলফ হিটলারের প্রচারণা মন্ত্রণালয় ছিল। যার প্রধান ছিলেন ড. জোসেফ গোয়েবলস। এই তত্ত্ব বিশ্বাস করে, নিজের লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য যেকোনো উপায়ে মানুষের মনে প্রভাব ফেলতে হবে। প্রচারণা মডেল মূলধারা মিডিয়ার আচরণ ও তত্পরতার সাধারণ বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করে, তাদের করপোরেটীয় চরিত্র এবং অধিপতি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার রাজনৈতিক অর্থনীতিতে সম্পৃক্ততার আলোকে। প্রচারণা-তত্ত্বের সঙ্গে মিলিয়ে এই প্রবন্ধে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন মার্কিন অভিযানের সময় এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংঘাত বা সহিংসতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে হেফাজতে ইসলামের আবির্ভাব, কিছু বিশেষ গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক দলের হেফাজতের প্রতি পক্ষপাত ও প্রচারণায় সহায়তাকারী হিসেবে সেসব গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভূমিকার কথা আলোচনা করা হয়েছে। ৫ মে ২০১৩ রাতে যৌথ বাহিনীর অভিযানে আড়াই থেকে তিন হাজার লোক মারা গেছে বলে প্রচারণা চালায় জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি ও একই সঙ্গে হেফাজতে ইসলাম। তাদের সঙ্গে সুর মেলায় বিএনপি-সমর্থক গণমাধ্যমগুলো। তাই যুদ্ধ-সংঘাতের সহিংস পরিস্থিতিতে গণমাধ্যম ও হেফাজতে ইসলামের প্রচারণাকে ব্যাখ্যার জন্য প্রচারণা-তত্ত্বের সাহায্য নেওয়া হয়েছে।

গণমাধ্যম যখন জনগণকে বিশেষ উদ্দেশ্যে পরিচালনা করতে চায়, তাদের চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করতে চায় বা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ইস্যু নির্ধারণ করে, মানুষও ওই একই ইস্যুকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে। এজেন্ডা সেটিং-তত্ত্বের মাধ্যমে সেটিকে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে। এটি শুধু হাল আমলের ঘটনা, তা নয়। সেই ১৯২২ সালেই ওয়াল্টার লিপম্যান তাঁর গ্রন্থ পাবলিক ওপিনিয়নে বলেছিলেন, আমাদের মস্তিষ্কে গণমাধ্যম ঘটনার ছবি তৈরি করে। আর নেতা-নেত্রীদের ওই ছবি সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে। বাংলাদেশে হেফাজতে ইসলামের শাপলা চত্বরে অবস্থান এবং পুলিশের অভিযান নিয়ে মানুষের মনে হেফাজতের কর্মীদের মৃত্যু নিয়ে কিছু গণমাধ্যম ও রাজনীতিবিদ যে ধারণা তৈরি করে এবং আস্তিকতার ও নাস্তিকতার ইস্যুতে যেভাবে পুরো দেশকে দুটি ভাগে ভাগ করে ফেলা হয়েছিল, এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল জনগণের মধ্যে, দেশের সামগ্রিক রাজনীতিতে। ফলাফল, পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বারবার হেফাজতের মিথ্যা প্রচারণার কারণেই এই পরাজয় বলেও মন্তব্য করা হয়েছে। এখানে হেফাজতের মিথ্যা তথ্যের বিভ্রান্তি, জনমতের অনিশ্চয়তা ওয়াল্টার লিপম্যানের মস্তিষ্কে গণমাধ্যমের ছবি তৈরি করার কথাই মনে করিয়ে দেয়। আর ভিয়েতনাম যুদ্ধ বাদে, প্রতিটি অন্যায় মার্কিন অভিযানকে মার্কিন গণমাধ্যমগুলো দেশের স্বার্থে অভিযান বলে চিত্রিত করেছে। ফলে, মানুষ বিশ্বাস করেছে যে ইরাক কিংবা আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান ছিল যৌক্তিক। মার্কিন গণমাধ্যমগুলো যুদ্ধকে দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে পরিবেশন করেছে। জনগণও গণমাধ্যমের কথা বিশ্বাস করে মার্কিন অভিযানকে সমর্থন করেছে।

ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও যুদ্ধবিরোধী মার্কিন গণমাধ্যম

ভিয়েতনাম যুদ্ধ শুরু হয় ১৯৫৫ সালে, আর শেষ হয় ১৯৭৫ সালে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্নায়ুযুদ্ধের সময় এই আগ্রাসন চালায় মার্কিন সরকার। যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরপরই ইন্দোচীনে প্রথমবারের মতো অনুপ্রবেশ করে ফ্রান্সের পুনঃঔপনিবেশীকরণ প্রচেষ্টার সমর্থনে, এরপর একুশ বছর ধরে (১৯৫৪-৭৫) তত্পরতা চালায় ভিয়েতনামের দক্ষিণ অর্ধাংশে এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করতে, যার প্রতি সেদেশীয় জনগণের কোনো সমর্থন ছিল না বলে মার্কিন কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা বারবার বলেছিলেন। দক্ষিণ ভিয়েতনাম যাতে আরেকটি সমাজতান্ত্রিক ঘরানার দেশ না হতে পারে, তা ঠেকাতেই মূলত আমেরিকার এই আগ্রাসন। কমিউনিস্ট হলেও যাদের ব্যাপক গণভিত্তি ছিল বলে সবাই স্বীকার করে। অন্যদিকে উত্তর ভিয়েতনামের সরকার দুই দেশ একত্র হওয়ার স্বপ্ন দেখতে থাকে। আর আমেরিকার এই আগ্রাসনকে তারা নব্য উপনিবেশ স্থাপন বলেই মনে করতে থাকে।৮ এই যুদ্ধকে মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে ঘৃণিত যুদ্ধগুলোর একটি বলে বিবেচনা করা হয়।

ভিয়েতনামে মার্কিন এই তত্পরতাকে আগ্রাসন হিসেবেই বিবেচনা করা যায়। মূলধারা মিডিয়া অবশ্য মার্কিন পলিসিকে কদাচিত্ অন্যভাবে দেখলেও, সব সময় অত্যন্ত নৈতিক ও সুউদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিবেচনা করেছে, যদিও তাদের বিচারে এটি যুদ্ধ-ব্যয়ের ভুল হিসাব-নিকাশভিত্তিক ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৫ সালে যুদ্ধের সামরিক পর্যায়ের অবসান ঘটানোর পর দেশটির ওপর ১৮ বছরব্যাপী বয়কট আরোপ কার্যকর রাখে, যে দেশটিকে তারা কার্যত ধ্বংস করেছিল। ভিয়েতনামিদের হিসাবমতে যুদ্ধের কারণে তিন মিলিয়ন নিহত, তিন লাখ নিখোঁজ, ৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন আহত এবং দুই মিলিয়ন বিষাক্ত রাসায়নিকে আক্রান্ত হয়। এই যুদ্ধে মার্কিন নিহতের সংখ্যা মাত্র ৫৮ হাজার, যা মোট মার্কিন জনসংখ্যার এক শতাংশের এক-দশমাংশ। অন্যদিকে ভিয়েতনামি নিহতের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ১৭ শতাংশ।১০

প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ১৯৯২ সালে বলেন, ‘হ্যানয় আজ বুঝতে পেরেছে, অতীতের জন্য কোনো শাস্তির হুমকি না দিয়ে আমরা শুধুই উত্তর চেয়েছি।’ অর্থাত্ ‘ভিয়েতনাম এমন কাণ্ড করেছে, যার কারণে তারা শাস্তি পাওয়ারই উপযুক্ত, কিন্তু সেটা না করে তারা যুদ্ধে নিখোঁজ সেনাদের সম্পর্কে উত্তর চেয়েছে শুধু।’ নিউইয়র্ক টাইমস-এর কূটনৈতিক ভাষ্যকার লেসলি গেলব ভিয়েতনামকে অপরাধী শ্রেণীতে স্থান দেন, কারণ তারা আমেরিকানদের খুন করেছে।১১

১৯৭৫ সালে যুদ্ধ পরিসমাপ্তির পর মার্কিন সংস্কৃতিতে তা এক ক্রমবিকাশমান অস্বস্তি হিসেবে জারি আছে। আধিপত্যকারী এলিটদের বিবেচনায় এ যুদ্ধ এমন একটি সময়ের প্রতিনিধিত্ব করে, যখন জাতীয় নীতির বিরুদ্ধতা এবং সেই সঙ্গে সমাজের প্রাক-উদাসীন অংশের উত্থান গণতন্ত্রের সংকট রূপে আবির্ভূত হয়। ওই সব বিশৃঙ্খল জনগোষ্ঠী এবং ভিন্নমতাবলম্বীকে এমনভাবে দেখা হয় যে তারা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং বলপ্রয়োগ নীতির বিরুদ্ধে যৌক্তিক বাধা গড়ে তুলেছে, যা কিনা ভিয়েতনাম লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত। প্রচারণা মডেল আমাদের আন্দাজ করতে বলে যে মূলধারা মিডিয়ার যুদ্ধ পর্যালোচনায় এলিট দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়, ১৯৬০-এর দশককে চিত্রায়িত করা হয় একটা কালো যুগ হিসেবে এবং যুদ্ধে মার্কিন ভূমিকাকে দেখা হয় নিদেনপক্ষে মহত্ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিন্তু ব্যর্থতায় পর্যবসিত।১২

ভিয়েতনাম যুদ্ধে মিডিয়ার সামান্য ভিন্নমত ছিল সরকারের পলিসির সঙ্গে (১৯৬৮ সাল থেকে কিছু এলিটও যুক্ত হয়েছিলেন সমালোচনামুখর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে)। মার্কিন পলিসির পক্ষে সাফাইদানকারীদের যুক্তি ছিল, এটি মিডিয়া পণ্ডিতদের সাময়িক নৈরাশ্যবাদিতা। তারা কৌশলগত বিতর্কের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে বলতে চেয়েছে, মিডিয়ার অবস্থান ছিল বৈরীভাবাপন্ন. এমনকি মিডিয়া যুদ্ধে পরাজয় ডেকে এনেছে।

ষাটের দশকজুড়ে মিডিয়া বিশ্বস্তভাবে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার প্রতি সহযোগিতা করে। ১৯৬৭ সাল নাগাদ সর্বগ্রাহ্য অভিমত বদলে যেতে শুরু করে এবং জনগণ শান্তিবাদী-যুদ্ধবাদী অভিজাতদের অভিমতকে উপেক্ষা করতে শুরু করে। এর অনেক পরে ১৯৮২ সালেও ৭২ শতাংশ জনগণ (কিন্তু স্বল্পসংখ্যক নীতিনির্ধারক বা অভিমত মোড়ল এবং মার্কিন বুদ্ধিজীবী এলিটদের একজনও নয়) ভিয়েতনাম যুদ্ধকে ভুলের চেয়েও বাড়তি কিছু মনে করে। ‘যুদ্ধটা যে মূলগতভাবে অন্যায় ও অযৌক্তিক’, জনগণ ও নেতাদের অভিমতের এই ফারাক ১৯৮৬ পর্যন্ত বজায় থাকতে দেখা যায়।১৩

শত্রুরাষ্ট্রের দ্বারা আক্রান্ত বনাম যুক্তরাষ্ট্র

১৯৮৪ সালে পোল্যান্ডীয় কমিউনিস্টদের বলি ধর্মযাজক জার্জি পপিলাজকো মার্কিন সমর্থনপুষ্ট রাষ্ট্র এল সালভাদরে ১৯৮০ সালে নিহত ধর্মযাজক অস্কার রোমেরোর তুলনায় কেবল বেশি কাভারেজই লাভ করেননি, বরং মার্কিন সমর্থনপুষ্ট রাষ্ট্রগুলোতে নিহত শতধর্মীয় কর্মীর সর্বসম্মিলিত কাভারেজের তুলনায় বেশি কাভারেজ পান, যদিও ওই বলিদের মধ্যে খোদ আটজন ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। এই পক্ষপাত মার্কিন নীতিনির্ধারকদের জন্য খুব লাভজনক ছিল, কারণ শত্রুরাষ্ট্রের আক্রান্তদের ওপর বিপুল মনোযোগদানের সুবাদে ওই সব রাষ্ট্রের চরিত্র দানবীয়-দুষ্ট দেখায় এবং মার্কিন বৈরিতা ন্যায্য হয়ে ওঠে। পপিলাজকো এবং ল্যাটিন আমেরিকার শতধর্মীয় বলির কাভারেজে অতীতে যে ব্যাপক রাজনৈতিক পক্ষপাত দেখা গেছে, সে চর্চা আজও জারি আছে, মিডিয়াতে ১৯৯০-এর দশকে ‘গণহত্যাযজ্ঞ’ শব্দের ব্যবহার থেকেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘গণহত্যা’ একটি বিদ্বেষমূলক প্রত্যয়, যা শত্রুদের ক্ষেত্রে হরহামেশা প্রয়োগ হয়। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্র শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা কদাচিত্ প্রয়োগ হয়। তাই ১৯৯০-এর দশকে সাদ্দাম হোসেন ও ইরাক মার্কিন আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে ওঠে, কিন্তু তুরস্ক মার্কিন মিত্র হওয়ায় সেই বছরগুলোতে কুর্দিদের বিরুদ্ধে জাতিগত শুদ্ধি অভিযানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রধান অস্ত্র সরবরাহক হওয়ায় সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার গেলব্রেথ বলেছিলেন, ‘যদিও তুরস্ক সেদেশীয় কুর্দিদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে, কিন্তু সাদ্দামের দ্বারা ইরাকি কুর্দিদের ওপর পরিচালিত “নব্য গণহত্যাযজ্ঞ” রোধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন মিশনে তুরস্কের সহযোগিতা আবশ্যক।’ মিডিয়ার এই প্রত্যয় থেকে কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু আর কে মিত্র, তা সহজেই শনাক্ত করতে পারা যায়। কসোভো-আলবেনীয়দের বিরুদ্ধে যুগোস্লাভিয়ার নিপীড়নের অভিযোগে ১৯৯৯ সালে দেশটির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোভুক্ত মিত্র দেশগুলোর সরকারি অভিযোগনামা মিডিয়াতেও প্রতিফলিত হয়, সেই সঙ্গে প্রতিনিয়ত এই নিপীড়নকে ‘গণহত্যাযজ্ঞ’ আখ্যায়িত করা হয়।১৪

উপসাগরীয় যুদ্ধ

যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বাজেট ঘাটতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও অর্থনৈতিক মন্দা খানিকটা বেকায়দায় রেখেছিল সিনিয়র বুশ প্রশাসনকে। আর এই যুদ্ধে গণমাধ্যমের সহানুভূতিশীল ভূমিকা ও যুদ্ধের প্রচারণা বেকায়দা অবস্থা থেকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যায় বুশ প্রশাসনকে। আর এই প্রচারণার ক্ষেত্রে খানিকটা কৌশলী ছিল যুক্তরাষ্ট্র। শুরুতে সাদ্দাম হোসেনকে নিয়ে শোরগোল তোলে সরকার। সে সময় আমেরিকার অনেক মানুষই জানত না কে এই সাদ্দাম হোসেন। গণমাধ্যম সাদ্দাম হোসেনকে যুদ্ধবাজ হিসেবে প্রচার করতে থাকে, অনেকটা অ্যাডলফ হিটলারের মতোই। তাই গণমাধ্যমে যুদ্ধের পক্ষের সংবাদ ও বুশ প্রশাসনের অবস্থান জনমতকে উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রতি নিয়ে যায়। মানুষ ভাবতে থাকে, সাদ্দামকে কুয়েত থেকে না হটালে বোধ হয় মার্কিন নিরাপত্তাই হুমকির মুখে পড়বে।১৫

মূলত উপসাগরীয় যুদ্ধকে মানুষের কাছে নিয়ে গেছে মার্কিন টেলিভিশন। বিশেষ করে সিএনএন ও ফক্স নিউজের ভূমিকা এই যুদ্ধে ছিল মার্কিন সরকারের পক্ষে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডগলাস কেলনার এই যুদ্ধকে বর্ণনা করেছেন ‘আকর্ষণীয় বর্ণনার যুদ্ধ’ হিসেবে। টিভি চ্যানেল সিবিএসের খবরের নীতির সঙ্গে মার্কিন সরকারের নীতি মিলে গেছে বলেও অধ্যাপক কেলনার (১৯৯২) মন্তব্য করেছেন।১৬ তিনি তাঁর বই দ্য পার্সিয়ান গালফ টিভি ওয়ার-এ আরও বলেছেন, মূলত সিএনএনই মার্কিন জনগণের মনস্তত্ত্বকে যুদ্ধের দিকে নিয়ে গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যুদ্ধের ছবি, যুদ্ধের দামামা বাজানো স্টিং আর সরাসরি সম্প্রচার—সবকিছু মিলেই সিএনএন মার্কিন জনগণের মনে যুদ্ধকে আকর্ষণীয় করে কর্ষণ করেছে। মানুষ যুদ্ধের বাস্তব পরিবেশনা দেখতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে টিভিতে। এই যুদ্ধ ছিল তাই অনেকটা ম্যারাথন দৌড়ের মতো। এই প্রতিযোগিতার কারণে দর্শকের মনে উদ্বিগ্নতা তৈরি হয়ে তা কাজ করেছে নেশার মতো। সর্বশেষ খবর জানার জন্য মানুষ ব্যস্ত থেকেছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, সিএনএন উপসাগরীয় যুদ্ধ শুরুর ১০ বছর আগে থেকেই এই ধরনের সংঘাত কাভার করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণের আগেই সিএনএন তার যাবতীয় সরঞ্জাম নিয়ে তৈরি ছিল। যার ফলে চ্যানেলটি যুদ্ধ শুরু হওয়ার দিন থেকেই সরাসরি সম্প্রচার শুরু করে। একই সঙ্গে যুদ্ধের যৌক্তিকতা কর্ষণ করতে থাকে মানুষের মধ্যে। যাকে অনেক যোগাযোগবিদ সিএনএন ইফেক্ট বা সিএনএন প্রভাব বলেছেন। মার্টিন ম্যানিং ও অন্যান্য (২০১১)১৭ তাঁদের বিখ্যাত এনসাইক্লোপিডিয়া অব মিডিয়া অ্যান্ড প্রপাগান্ডা ইন ওয়ারটাইম আমেরিকা  বইয়ে বলেন, ‘১৯৯০ সালের মধ্যভাগ থেকেই পেন্টাগনের কর্মকর্তারা সিএনএন ইফেক্টের কথা স্বীকার করতে থাকেন। আর চ্যানেলটির এই ধরনের খবর পরিবেশন যুদ্ধের সময় জনমতের ব্যবস্থাপনার নতুন এক মাত্রা যোগ করে। এই খবর পরিবেশন সরকারকে বাধ্যই করে দ্রুত ও একপক্ষীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য। কোনো কোনো সমালোচক মনে করেন, সিএনএনের যুদ্ধের খবর অধিকাংশ সময়ই দর্শকের মধ্যে একপক্ষীয় দৃষ্টিভঙ্গি কর্ষণ করে। সিএনএন ইফেক্ট অন্য চ্যানেলের সঙ্গে অনৈতিক প্রতিযোগিতা নিয়ে আসে। এই প্রতিযোগিতা এমন সংবাদ সম্প্রচারে চ্যানেলগুলোকে উত্সাহিত করে, যার কোনো ভিত্তিই নেই।’

সেই সময়ে সংঘাত বা যুদ্ধকালীন সংবাদ পরিবেশনে বেশ নতুনত্ব আসে। প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় প্রচারিত হতে থাকে জেনারেলদের সংবাদ সম্মেলন। লিঞ্জার ও সাইমন (১৯৯৩) জানান,১৮ যেসব দর্শক টিভির ওপর যুদ্ধের সংবাদের জন্য বেশি নির্ভর করেছে, তারা যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের চেয়ে সামরিক সমাধানকে বেশি কার্যকর বলে মনে করেছে। টিভি দর্শকেরা যুদ্ধের ছবি দেখে, যুদ্ধকেই প্রাধান্য দিয়েছে, সমর্থন দিয়েছে। ১৯৯০ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে প্রায় ৫৩ শতাংশ আমেরিকার নাগরিক কুয়েত থেকে ইরাককে হটানোর জন্য মার্কিন সামরিক অভিযানকে সমর্থন দেয়। অর্থাত্ উপসাগরীয় যুদ্ধের জন্য সিনিয়র বুশের পক্ষে প্রায় অর্ধেকেরও বেশি মার্কিন নাগরিকের সমর্থন ছিল।১৯

টুইন টাওয়ার আক্রমণ ও ইসলামভীতি

১৯৪১ সালে পার্ল হারবার আক্রমণের পর টুইন টাওয়ারে আক্রমণই ছিল মার্কিন ভূখণ্ডের একমাত্র সরাসরি হামলা। চারটি বিমানকে কবজা করে আল-কায়েদার সদস্যরা আত্মঘাতী হামলা করে টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনে। আরেকটি বিমান গিয়ে আছড়ে পড়ে পেনসিলভানিয়ায়। বিমানের সব আরোহী মারা যান। আর ভবনধসে মারা যান অনেকে। আল-কায়েদার এই হামলায় হতাহতের সংখ্যা ছিল প্রায় তিন হাজার। অর্থনৈতিক, সামাজিক বা সামরিক শক্তির জোরে সমগ্র বিশ্বে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকারী বা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় নিমগ্ন মার্কিন সাম্রাজ্যের জন্য এই আঘাত ছিল অকল্পনীয় ও অবমাননাকর। এই আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলমানদের প্রতি প্রতিহিংসার ক্ষেত্র তৈরি করে। মুসলমানদের সন্ত্রাসী হিসেবেই চিহ্নিত করা হয় গণমাধ্যমে। স্মিথ (২০০৯) টুইন টাওয়ারে হামলার পর মার্কিন গণমাধ্যমে ইসলামের চিত্রায়ণ নিয়ে তাঁর গবেষণা প্রবন্ধে জানান, ইসলামকে একটি সহিংস ধর্ম হিসেবে এবং মুসলমানদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করতে ভূমিকা রেখেছে পশ্চিমা গণমাধ্যম। বিশেষ করে এর জন্য অনেকাংশে দায়ী মার্কিন গণমাধ্যম। পশ্চিমা বিশ্বে বা মার্কিন সাম্রাজ্যে প্রবেশ বা বসবাস চরম জটিল ও অমানবিক হয়ে ওঠে মুসলমানদের জন্য। শুরু হয় মুসলমানদের ব্যাপক ধরপাকড়। শুধু পশ্চিমা বিশ্বে নয়, মুসলমানপ্রধান দেশগুলোর প্রতিও পশ্চিমা বিশ্ব আগ্রাসী হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যে মুসলিম দেশগুলো মহাশক্তিধর মার্কিন সাম্রাজ্যের তাঁবেদার ছিল না তাদের প্রতি পশ্চিমা সরকার এবং গণমাধ্যম হয়ে ওঠে খড়্গহস্ত। পরিকল্পিতভাবে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণা শুরু করে। এই ইসলামভীতি জুনিয়র বুশের ইরাক আক্রমণ আরও যৌক্তিক ও দ্রুততর করে তোলে।২০

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনার গবেষক ক্রিস্টোফার বেইল নিউইয়র্ক টাইমস, ইউএসএ টুডে ও ওয়াশিংটন টাইমসকে তাঁর গবেষণার জন্য বাছাই করেন।২১ তিনি টেলিভিশন চ্যানেল হিসেবে সিবিএস, সিএনএন ও ফক্স নিউজকে বাছাই করেন আধেয় বিশ্লেষণের জন্য। তিনি প্রায় এক হাজার ৮৪টি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ও ৫০ হাজার ৪০৭টি পত্রিকার সংবাদের বিশ্লেষণ করেন। এই বিশ্লেষণ থেকে তিনি এই উপসংহারেই এলেন, টুইন টাওয়ারে হামলার পর মার্কিন গণমাধ্যমে মুসলমানরা অনেক বেশি আলোচনায় এসেছে। আর এই আলোচনার বড় অংশজুড়েই ছিল নেতিবাচক আলোচনা।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নেব্রাস্কা লিঙ্কনের শিক্ষক লুকিয়ে সারাউব গণমাধ্যমের ইসলামভীতি নিয়ে বলেন,২২ ‘নয়-এগারোর পর মুসলমানরা অনেক বেশি গণমাধ্যমে জায়গা পেতে থাকে, যা এর আগে কখনোই তারা পায়নি। আর মুসলমানদের জন্য বেশ কিছু ছাঁচীকরণ বা স্টেরিওটাইপ ধারণা প্রয়োগ করা হয়, যার মধ্যে ছিল মুসলিম সন্ত্রাসী কিংবা আরব সন্ত্রাসী। এসব ধারণা ইসলাম ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে ভয় ও ভুল ধারণাই তৈরি করেছে।’

ইরাক আগ্রাসন

যখন মার্কিন সমাজে ইসলামকে সন্ত্রাসী একটি ধর্ম হিসেবে রূপায়িত করা হয়ে গেছে, ঠিক সেই সময়ে জুনিয়র বুশ সাদ্দাম হোসেনকে সরানোর জন্য ইরাক আক্রমণ করেন। ২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসন চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মূলত দুটি ভাগে দেশটিতে অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৩ সালের ২০ মার্চ মার্কিন সেনাবাহিনী সাদ্দাম হোসেনকে হটাতে অভিযান চালায়। এরপর আরও বড় পরিসরে মার্কিন সেনাবাহিনী মানববিধ্বংসী মারণাস্ত্র ধ্বংস করতে অভিযান শুরু করে। মার্কিন সরকার ইরাকে নিউক্লিয়ার অস্ত্র আছে, এ প্রচারণা চালায়। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো সরকারের এই প্রচারণার বিস্তার ঘটাতে এবং ইরাক যুদ্ধকে ন্যায্য করতে সহযোগিতা করতে থাকে।২৩ মানববিধ্বংসী মারণাস্ত্র ধ্বংসের নামে (পরবর্তী সময়ে যে অস্ত্রের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি)২৪ জুনিয়র বুশ ও তাঁর প্রশাসন ইরাক আক্রমণ করে। ইরাকে অভিযানের আগে জর্জ ডব্লিউ বুশ এই অস্ত্র ধ্বংসের জন্য সাফাই গান। এখনো হোয়াইট হাউসের আর্কাইভে বুশের এসব বাণী খুঁজে পাওয়া যায়। অভিযানের ঠিক আগে জুনিয়র বুশ মার্কিন জনগণকে তেমনি এক ভাষণে জানান,২৫ ‘এই মুহূর্তে ইরাক তার রাসায়নিক জীবাণু অস্ত্র বাড়াচ্ছে এবং তার প্রযুক্তির উন্নতি সাধন করছে।’ পিছিয়ে ছিলেন না জুনিয়র বুশের উপদেষ্টা ও সহযোগীরা। তাঁরাও মিথ্যা মানববিধ্বংসী মারণাস্ত্রকে সত্যে পরিণত করতে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, একই সঙ্গে টুইন টাওয়ারের হামলার জন্য দায়ী আল-কায়েদাকে সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করছিলেন। অর্থাত্ তাঁরা রাসায়নিক অস্ত্রের সঙ্গে নয়-এগারো নিয়ে মার্কিন জনগণের মনে কড়া নাড়তে চাইছিলেন। সে সময়কার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন,২৬ ‘আমরা জানি, তার (সাদ্দাম হোসেন) সঙ্গে নানা সন্ত্রাসী সংগঠনের সম্পর্ক আছে, তার মধ্যে আল-কায়েদাও আছে। অর্থাত্ বুশ প্রশাসন মার্কিন জনগণের মধ্যে ইরাকের গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র নিয়ে একটি ধোঁয়াশা তৈরি করে। আগের উপসাগরীয় যুদ্ধের মতো এবারও মার্কিন গণমাধ্যম ক্ষমতাবানদেরই পক্ষ নিয়েছিল। যুদ্ধ শুরুর আগেই গণমাধ্যমগুলো যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিয়েছিল তাদের সংবাদের মাধ্যমে। টিভি চ্যানেল এমএসএনবিসি বলেছিল, “কাউন্ট ডাউন ইরাক”, পিছিয়ে ছিল না সিবিএস, তারা সংবাদের বিশেষ সেগমেন্টের নাম দিয়েছিল “শোডাউন উইথ সাদ্দাম”। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো অতি উত্সাহী ভূমিকায় “ওয়ার অ্যাগেইনস্ট টেররিজম”-এর যাত্রা শুরু করে।’

এই আগ্রাসনের সঙ্গে গণমাধ্যমের এজেন্ডা সেটিংয়ের সঙ্গে সহসম্পর্ক রয়েছে বলে গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা তাঁদের নানা গবেষণায় বলেছেন। বিশেষ করে মুইন (২০১১) তাঁর গবেষণায় বলেন,২৭ ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পেছনে গণমাধ্যমের বিশেষ একটি ভূমিকা রয়েছে। গণমাধ্যম এখানে মানুষের মধ্যে যুদ্ধের বিষয়ে মতামত তৈরি করেছে, আর মানুষ ওই মতামতের কারণে ইরাক আক্রমণকে সমর্থন দিয়েছে। ইরাক আক্রমণের ঠিক এক বছর আগে ২০০২ সালে বুশ প্রশাসনের মিথ্যাচার বাড়ে। আর ঠিক ওই সময়ে প্রায় ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরাক আক্রমণকে সমর্থন করে। ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আক্রমণের ঠিক আগে আল-কায়েদা, মানববিধ্বংসী মারণাস্ত্র ও ইরাকের রাসায়নিক অস্ত্র নিয়ে জর্জ ডব্লিউ বুশ ও তাঁর সভাসদেরা ১৪০টি বক্তব্য দেন। ঠিক ওই সময় মার্কিন টিভি চ্যানেল সিবিএস ও নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার জরিপে দেখা যায়, শতকরা ৮৫ ভাগ মার্কিন নাগরিক বিশ্বাস করতে থাকে, ইরাকে মানববিধ্বংসী মারণাস্ত্র আছে। ইরাক আগ্রাসনে আগেরবারের সিএনএনের মতোই ভূমিকা পালন করে ফক্স নিউজ। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ইরাক যুদ্ধ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভুল ধারণা পোষণ করে ফক্স নিউজের দর্শকেরা। ইরাক যুদ্ধের ভুল তথ্যকে সত্য বলেই মেনেছে ফক্স নিউজের প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৬৭ জন দর্শক। সেখানে সিএনএনের শতকরা ৩১ ভাগ দর্শক তার চ্যানেলের ভুল তথ্যকেই বিশ্বাস করেছে। অর্থাত্ ফক্স নিউজ যুদ্ধের সংবাদকে এতটাই নিজের মতো করে প্রচার করেছে, যার কারণে তার দর্শকেরা ভুল তথ্যকেই সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করেছে। এর একটি বড় কারণও রয়েছে। আর তা হলো ফক্স নিউজের মালিক রুপার্ট মারডক, যিনি আবার যুদ্ধবাজ বলেও পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণের সহযোগী হতে রুপার্ট মারডক সেই সময়কার যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে ফোন করে চাপও দিয়েছিলেন। মালিকের এই যুদ্ধবাজ মনোভাব ফক্স নিউজের আধেয়কে প্রভাবিত করেছে। নয়-এগারোর ঠিক পরপরই চ্যানেলটি তার পর্দার বাঁ কোনায় মার্কিন পতাকা দিয়ে রাখে। আর এই অ্যানিমেটেড পতাকার সঙ্গে ইরাক আক্রমণের পর চ্যানেলটির নিচে টিকার যেতে থাকে ‘অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম’। যুদ্ধের দামামা সুকৌশলে বাজিয়ে যুদ্ধের পক্ষে মতামত তৈরি করেছে ফক্স নিউজ।২৮

২০০৩ সালের গ্রীষ্মে ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডে ইন্টারন্যাশনাল পলিসি অ্যাটিচিউড প্রোগ্রাম ও জরিপ সংস্থা নলেজ নেটওয়ার্ক জনগণের মতামত ও ভুল অনুধাবন নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করে। এই গবেষণার উদ্দেশ্য

ছিল জনগণের মধ্যে ভুল মত প্রচারের জন্য গণমাধ্যম কেমন ভূমিকা পালন করেছে, তা জানা। পুরো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তিন হাজার ৩৩৪ জনের ওপর এই জরিপ চালানো হয়। জনমনের ভয়ানক ভুল ধারণা এই অনুধাবনে বের হয়ে আসে।২৯ যেমন:

*          শতকরা ৪৯ ভাগ মার্কিন বিশ্বাস করে, আল-কায়েদার সঙ্গে ইরাক কাজ করেছে।

*          শতকরা ২২ ভাগ বিশ্বাস করে, ইরাকে গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র পাওয়া গেছে।

*          শতকরা ২৩ ভাগ বিশ্বাস করে, বিশ্বজনমত ইরাক আক্রমণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ছিল।

*            সর্বোপরি শতকরা ৬০ ভাগ ওপরের যেকোনো একটি ভুল ধারণায় বিশ্বাস করে।

 

গ্যান্ট জেফরি তাঁর ওয়ার অন টেরর: আনফোল্ডিং বাইবেল প্রফেসি বইতে মন্তব্য করেছিলেন, ইরাক যুদ্ধ ছিল আমেরিকার বিপক্ষে প্রতিশোধ। উপসাগরীয় যুদ্ধে সাদ্দামের পরাজয় আমেরিকার প্রতি তার ঘৃণা বাড়িয়ে দিয়েছিল বহুগুণে। ইরাক এমন একটি দেশ, যার নয়-এগারো হামলায় অংশ নেওয়ার মতো প্রভাব, শক্তি, সামর্থ্য ও সামরিক সক্ষমতা আছে। প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের মূল লক্ষ্য ছিল আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়া, আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে ধ্বংস করে ফেলা। জেফরির মতে, সাদ্দাম হোসেনের লক্ষ্য ছিল আরব বিশ্বের মহান নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। তাঁর স্বপ্ন ছিল সুপ্রাচীন ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সামরিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া। জেফরি তাঁর বইতে উল্লেখ করেন, আমেরিকান সরকার শতভাগ নিশ্চিত যে ইরাক ওসামা বিন লাদেনের আল-কায়েদার সঙ্গে জড়িত এবং তারা আমেরিকার বিভিন্ন অংশে বিধ্বংসী সিরিজ সন্ত্রাসী হামলা চালানোর পরিকল্পনায় নিয়োজিত। ইরাক ছিল নিশ্চিতভাবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের জন্য হুমকি। সাদ্দাম তাঁর সব শক্তি, সামর্থ্য ও অর্থ নিয়োজিত করেছিল বিধ্বংসী অস্ত্র নির্মাণে, যে অস্ত্র তারা ব্যবহার করবে আমেরিকার বিরুদ্ধে। পশ্চিমের অবশ্যই এখন সাদ্দাম এবং তাঁর সামরিক শক্তিকে দেখে নিতে হবে।৩০

নয়-এগারো হামলার পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে মার্কিন ডিফেন্স সেক্রেটারি ডোনাল্ড রামসফেল্ড বলেছিলেন, ‘আমার আগ্রহ এখন সাদ্দামকে আঘাত করা।... ব্যাপকভাবে সব ধ্বংস করে দাও, ঘটনার সঙ্গে সম্পর্ক থাকুক আর না-ই থাকুক।’ ২০০১ সালের নয়-এগারো হামলার ১০ দিন পর প্রেসিডেন্ট বুশকে নিশ্চিতভাবে জানানো হয়, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার কাছে কোনো রকম তথ্যপ্রমাণ নেই যে সাদ্দাম হোসেন নয়-এগারো হামলার সঙ্গে জড়িত বা আল-কায়েদার সঙ্গে সাদ্দাম জড়িত, এমন তথ্যও তাদের কাছে নেই। ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স টেররিজম রিপোর্টে সাদ্দামের সঙ্গে আল-কায়েদার সঙ্গে ষড়যন্ত্রের কোনো তাত্পর্যপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু বুশ প্রশাসন ক্রমাগতভাবে নয়-এগারো হামলার জন্য সাদ্দামকেই দায়ী বলে প্রচার করেছে এবং পশ্চিমা মিডিয়াগুলো সেই তথ্য ক্রমাগতভাবে জনগণকে ইনজেক্ট করেছে। বুশ প্রশাসন এভাবেই ইরাকে আগ্রাসনকে ন্যায্যতা দান করেছে এবং জনগণকে নিয়ে এসেছিল তাদের পক্ষে।

কিন্তু পুলিত্জার পুরস্কার বিজয়ী সাংবাদিক রন সাসকিন্ড রিপোর্ট করেন যে হোয়াইট হাউসের নির্দেশে সিআইএ নয়-এগারো হামলায় মুসলিম সন্ত্রাসীদের সঙ্গে ইরাক জড়িত, তারিখ পিছিয়ে এমন জালিয়াত ডকুমেন্ট তৈরি করে। সিআইএ সেই নির্দেশনা মেনে জালিয়াতি করে এবং সেই জালিয়াত ডকুমেন্ট ব্যবহূত হয় ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ন্যায্যতা দেওয়ার পক্ষে। সাসকিন্ড আরও প্রকাশ করেন যে বুশ প্রশাসনের কাছে উচ্চপদস্থ ইরাকি গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে তথ্য ছিল যে ইরাকে কোনো ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র ছিল না। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার কাছে পর্যাপ্ত তথ্য ও সময় ছিল এই আগ্রাসন বন্ধ করার।৩১

২০০০ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের মহাপরিচালক ছিলেন গ্রেগ ডাইক। ইরাক আক্রমণের সময় মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর অবস্থান স্পষ্টতই যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে তা নয়, তাদের মধ্যে অনেকেই অতিমাত্রায় দেশপ্রেম দেখাচ্ছে এবং যুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরি করছে।’ সিএনএনকে ছাড়িয়ে

এক নম্বরে যেতে ফক্স নিউজ মার্কিন প্রশাসনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় রেডিও নেটওয়ার্ক ইউএস কেব্ল নিউজ নেটওয়ার্কিং যুদ্ধের পক্ষে দেশজুড়ে র্যালি করেছে বলেও সমালোচনা করেন গ্রেগ ডাইক (হাফেজ, ২০০৩)।৩২

২০০৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর বুশ স্বীকার করেন, নয়-এগারো হামলার সঙ্গে সাদ্দাম জড়িত হওয়ার কোনো প্রমাণ তাঁদের ছিল না। তারপরও বুশ এবং ডিক চেনি (ভাইস প্রেসিডেন্ট, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) ইরাক যুদ্ধের ন্যায্যতার পক্ষে সাফাই দিতে থাকেন। ২০০৯ সালে ডিক চেনি শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেন, সাদ্দাম ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। ২০০৬ সালের দ্বিপক্ষীয় সিনেট রিপোর্টে প্রকাশিত হয়, বুশ গণমাধ্যমকে বিভ্রান্ত করেছিলেন ইরাকের সঙ্গে আল-কায়েদার যোগাযোগের মিথ্যা তথ্য দিয়ে। নয়-এগারো হামলায় সাদ্দামের জড়িত থাকা নিয়ে প্রশাসনের ক্রমাগত মিথ্যা অভিযোগ অধিকাংশ আমেরিকান জনগণকে ইরাকের বিরুদ্ধে নিয়ে গিয়েছিল। ইরাকের বিরুদ্ধে আগ্রাসন অধিকাংশ আমেরিকানের সমর্থন পায়। সেপ্টেম্বরের হামলা আমেরিকানদের মধ্যে আরববিরোধী ঘৃণাকে এমনভাবে উসকে দিয়েছিল যে প্রশাসনের মিথ্যা অভিযোগ আমেরিকানদের সহজেই প্রভাবিত করে। ইরাকের বিরুদ্ধে এই মিথ্যা অভিযোগ এতটা জোরালো হতো না, যদি না সেপ্টেম্বরের হামলার কারণে আমেরিকানদের মধ্যে আরববিরোধী ঘৃণা তৈরি হতো। ২০০৬ সালের নির্বাচনে দেখা যায়, ৯০ শতাংশ আমেরিকান সেনা বিশ্বাস করত, ইরাকের বিরুদ্ধে এই মিশন ছিল নয়-এগারো হামলার বদলা। আমেরিকার এই পুরো ‘টর্চার প্রোগ্রামের’ ভিত্তি ছিল মিথ্যা অভিযোগ ও তথ্যের ওপর। বুশ প্রশাসন আল-কায়েদার সঙ্গে ইরাকের যোগাযোগ সম্পর্কে শুধু মিথ্যা তথ্যই দেয়নি, তারা ‘টর্চার প্রোগ্রামের’ মাধ্যমে বন্দীদের মিথ্যা জবানবন্দি দিতে বাধ্য করত। জোরপূর্বক এই মিথ্যা জবানবন্দির উদ্দেশ্য ছিল আল-কায়েদার সঙ্গে ইরাকের যোগসূত্র তৈরি করা।৩৩

প্রশাসন দ্বারা চালিত হয়ে ও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মার্কিন গণমাধ্যমগুলো তাদের একপেশে সংবাদ দিয়ে জনগণের মধ্যে যুদ্ধের পক্ষে মতামত প্রচার করতে সম্মত হয়। জরিপ প্রতিষ্ঠান ‘গ্যালাপ’ ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে একটি জরিপ চালায়। ওই জরিপেও যুদ্ধের পক্ষেই জনমত দেখতে পাওয়া যায়। ওই জরিপ অনুসারে, শতকরা ৭১ ভাগ মার্কিন ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে সমর্থন করেছিলেন। যুদ্ধ ভালোভাবেই চলছে বলে শতকরা ৯০ ভাগ উত্তরদাতা মনে করেছেন।৩৪

 

আমরা বুশ প্রশাসন ও গণমাধ্যমের ভূমিকাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখব, প্রথমে বুশ প্রশাসন যুদ্ধের পক্ষে একটি হুজুগ তোলে। এই হুজুগের কারণে মার্কিন জনগণ ধাঁধায় পড়ে যায়। গণমাধ্যম তার স্বার্থে সরকারের যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেয়। অবস্থান নিয়ে যুদ্ধের পক্ষে সংবাদ ও ছবি প্রচার করতে শুরু করে। মিথ্যা জবানবন্দি আদায় করতে থাকে। এই দুইয়ের মিলিত প্রভাব পড়ে জনগণের ওপর। জনগণ গণমাধ্যম দ্বারা বিভ্রান্ত হয়, সরকার ও গণমাধ্যমের আচরণ দ্বারা পরিচালিত হয়। সম্মত হয় তাদের মতাদর্শের সঙ্গে। যার প্রমাণ আমরা পেয়েছি আগের অনুচ্ছেদে ‘গ্যালাপে’র জরিপের মাধ্যমে।

এজেন্ডা ছড়িয়ে দিয়ে সম্মতি উত্পাদন: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

গত আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রাধান্য পেয়েছিল যুদ্ধাপরাধের বিচার। ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ১৪-দলীয় সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে শুরু করে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া। মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের অধিকাংশ নেতা। এই বিচারপ্রক্রিয়ার শুরু থেকে জামায়াত এর বিরোধিতা শুরু করে। যুদ্ধাপরাধের বিচার হলে দেশে গৃহযুদ্ধ হবে বলে হুমকি দেয়। এমনকি ১৮-দলীয় জোট নেত্রী খালেদা জিয়া যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের রাজবন্দী বলে আখ্যায়িত করে তাদের মুক্তির দাবিতে বগুড়ার জনসভায় ভাষণ দেন। শুরু হয় হরতাল, ভাঙচুর, সহিংসতা। ২০১৩ সালের পুরো সময়টাই বাংলাদেশ এক অস্থির রাজনৈতিক সময় পার করেছে। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে দেশের তরুণসমাজ একত্র হয়ে ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ সালে শাহবাগে গঠন করে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’। এই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে শুধু আর ব্লগার এবং অনলাইন অ্যাকটিভিস্টদের আন্দোলনে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এতে যুক্ত হয় সমাজের বিভিন্ন স্তরের হাজার হাজার মানুষ। ‘গণজাগরণ মঞ্চের’ আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতির মাঠে উত্থান ঘটে আর একটি শক্তির: ‘হেফাজতে ইসলাম’। ২০১০ সালে নারী নীতির বিরোধিতা করে ‘হেফাজতে ইসলামের’ আবির্ভাব ঘটলেও ২০১৩ সালে তাদের উত্থান ছিল ‘গণজাগরণ মঞ্চের’ বিরুদ্ধ শক্তি হিসেবে। শাহবাগের তরুণদের দাবি ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তবায়ন, যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি। কিন্তু শাহবাগ আন্দোলনের বিপক্ষ বিরুদ্ধ শক্তি একে আস্তিক-নাস্তিকের আন্দোলন হিসেবে আখ্যায়িত করে (মুরশিদ ২০১৩)।৩৫ ১৩ দফা নিয়ে মাঠে নামে হেফাজতে ইসলাম, যেখানে ১৩ দফায় শাহবাগের আন্দোলনকারীদের নাস্তিকতার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। তাদের শাস্তি দাবি করা হয়। নারীর অধিকারের বিরুদ্ধে, নারী-পুরুষের মেলামেশা বন্ধের জন্য দাবি জানানো হয়, দাবি ওঠে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ‘হেফাজতের’ ঢাকা অবরোধ আন্দোলনে সম্পৃক্ততা জানান। শুরুর দিকে ‘গণজাগরণ মঞ্চের’ সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিয়ে বিএনপি দ্বিধায় থাকলেও অচিরেই তারা তাদের অবস্থান পরিষ্কার করে। ১৮-দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল জামায়াতের অনেক নেতা যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত। আর শাহবাগ আন্দোলন ছিল এই যুদ্ধাপরাধীদের বিপক্ষে, জামায়াতের অপশক্তির বিপক্ষে। বিএনপি-জামায়াত সমর্থক গণমাধ্যমগুলো শাহবাগের আন্দোলনের বিপক্ষে পরিষ্কারভাবে অবস্থান নেয়, তাদের দলীয় অবস্থানের কারণে। তারা একই সঙ্গে ওই আন্দোলনকে নিষিদ্ধ করার জন্য ‘হেফাজতে ইসলামের’ দাবির প্রতিও সমর্থন জানায়। বিএনপিপন্থী দৈনিক আমার দেশ পত্রিকাটি এখানে সবচেয়ে পক্ষপাতমূলক ভূমিকা পালন করেছিল। শুধু পক্ষপাত নয়, আন্দোলনকে ভিন্নপথে চালিত করার জন্য পরিকল্পিতভাবে প্রচারণা চালিয়েছিল। প্রবন্ধটিতে তাই আমার দেশ পত্রিকাটি বেছে নেওয়া হয়েছে প্রচারণা-তত্ত্বের সম্প্রসারণ ও প্রসারণকে বোঝার জন্য। দেখার চেষ্টা করা হয়েছে গণমাধ্যম কীভাবে একটি ইস্যু তৈরি করে সেই ইস্যুর পক্ষে সম্মতি গঠনের জন্য চেষ্টা চালায়।

শাহবাগের ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ ও ‘আমার দেশ’ পত্রিকার ভূমিকা

বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ী আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও মালিক মাহমুদুর রহমান শাহবাগ আন্দোলনের শুরু থেকেই পত্রিকাটি শাহবাগ আন্দোলন নিয়ে নেতিবাচকভাবে সংবাদ প্রকাশ করতে শুরু করে। প্রথম দিকে আন্দোলনের ঝোঁক স্পষ্ট হওয়ার আগে পত্রিকাটি আন্দোলনকে আওয়ামী লীগের আন্দোলন বলে প্রচারণা শুরু করে। শাহবাগের আন্দোলনের চার দিন পর পত্রিকাটির প্রধান শিরোনামই ছিল এমন—‘ফ্যাসিবাদ আক্রান্ত গণজাগরণ মঞ্চ: শাহবাগ ক্রমেই আওয়ামী নিয়ন্ত্রণে: বক্তৃতা দিয়েছেন মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী: ব্যবস্থাপনা ছাত্রলীগ সভাপতি।’৩৬

১৩ ফেব্রুয়ারি আমার দেশ একটি কার্টুন ছাপায় প্রথম পাতায়। যেখানে দেখা যায়, শাহবাগের আন্দোলনে সমর্থন-সহায়তা দিচ্ছে পুলিশ। অন্যদিকে, বিরোধী জোটের আন্দোলনে দমন-নিপীড়ন চালাচ্ছে পুলিশ। এ যেন একই মুদ্রার দুটি ভিন্ন দিক। শুধু খবরের মাধ্যমে নয়, কার্টুন বা ব্যঙ্গচিত্র দিয়েও শাহবাগ আন্দোলনকে আওয়ামী রূপ দিতে চেষ্টা করে আমার দেশ পত্রিকাটি।৩৭

আমার দেশ পত্রিকাটি দিনের পর দিন এই বলেও খবর প্রকাশ করতে থাকে যে শাহবাগের আন্দোলন ভারতীয় সংস্কৃতিরই প্রতিচ্ছবি। ১৪ ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগের ‘গণজাগরণ মঞ্চের’ একটি কর্মসূচি ছিল প্রদীপ প্রজ্বালন। পত্রিকাটি পরদিন এই প্রদীপ প্রজ্বালনকে হিন্দুদের দীপাবলির সঙ্গে তুলনা করে সংবাদ প্রকাশ করে। এই নিয়ে সংবাদটির শিরোনাম ছিল, ‘রাজধানীর শাহবাগে আয়োজিত আওয়ামী লীগ-বাম শোডাউনে গতকালও ভারতীয় হিন্দুদের রীতিতে প্রদীপ প্রজ্বালন কার্যক্রম পালিত হয়।’৩৮ সংবাদটিতে আরও বলা হয়, ‘ছাত্রছাত্রীদের অনেকটা জোর করেই আন্দোলনে যুক্ত করেছে ছাত্রলীগ। তাদের হিন্দুয়ানি কায়দায় প্রদীপ জ্বালাতে বাধ্য করা হয়।’

যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচারের দাবিতে সংগঠিত শাহবাগ আন্দোলনে ব্যাপক জনসমর্থন বিএনপি-জামায়াত জোটকে শঙ্কিত করে তুলেছিল। আশঙ্কিত করছিল বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত গণমাধ্যমগুলোকেও। তারা পরিকল্পিতভাবে গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করে। আমার দেশ এ ক্ষেত্রে জোরালো ভূমিকা রাখে। সাম্প্রদায়িকতার বীজকে উসকে দিয়ে, যুদ্ধাপরাধের ইস্যুকে সম্পূর্ণ ভিন্নদিকে ধাবিত করার জন্য ‘আস্তিক-নাস্তিক’ ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসে আমার দেশ পত্রিকাটি।

৫ মার্চ ২০১৩, আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, ‘বানরকে লাই দিলে শুধু ঘাড়ে চেপে বসে না, লাইদাতার ঘাড়ে বসে চুলের মুঠি ধরে দুই গালে মনের সুখে চড় মারতে থাকে। শাহবাগিদের কাজ-কারবার দেখে এবং কথাবার্তা শুনে মনে হয় তারাও এখন লাই পাওয়া বানরের মতো জাতির ঘাড়ে চেপে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে থাপ্পড় মারতে শুরু করেছে...শাহবাগিদের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেছেন, “এই সরকার আমাদের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হতে পারে না।”...শাহবাগ আন্দোলনের চাপেই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। শাহবাগিদের নির্দেশে যখন জাতীয় পতাকা ওঠানামা করে, জাতীয় সংসদে যখন অন্য সব প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে শাহবাগ বন্দনার মঙ্গল শঙ্খ বেজে ওঠে, তারুণ্যের জাগরণে মুগ্ধ প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং অন্তরে শাহবাগের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার আকুতি অনুভব করেন, জাতির পক্ষ থেকে যখন শাহবাগ চত্বরে পোলাও বিরিয়ানি মিনারেল ওয়াটারের ঢল নামে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও যখন শাহবাগে তারুণ্যের সঙ্গে সংহতি জানাতে অফিস ছেড়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়েন, মিডিয়ার অতি বড় অংশ যখন শাহবাগের “জীবনে লভিয়া জীবন ধন্য হওয়ার প্রতিযোগিয়ায় মেতে ওঠে” তখন শাহবাগিরা নিজেদের সরকারের চেয়ে শক্তিশালী ভাবতেই পারে। তবে শাহবাগি নেতা ইমরান যে বললেন তাদের চাপেই দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে—এ বক্তব্য অবশ্যই বিশ্লেষণের দাবি রাখে। শাহবাগি নেতার বক্তব্য সঠিক হলে আমাদের ধরে নিতে হবে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ধারাবাহিকতায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেননি, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে শাহবাগিদের চাপের ধারাবাহিকতায়।’ 

গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে শুধু সংবাদ প্রকাশ করেই বসে থাকেনি আমার দেশ, একই সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতপন্থী বুদ্ধিজীবীদের উপসম্পাদকীয় প্রকাশ করে তাদের সংবাদকে আরও বেশি যৌক্তিক করে তোলার চেষ্টা করেছে পত্রিকাটি। ২০১৩ সালের মার্চ মাসের ২ তারিখে আমার দেশ-এর সম্পাদকীয়তে ফরহাদ মাজহারের লেখায় প্রকাশিত হয়, শাহবাগ দৃশ্যমান চ্যালেঞ্জ হয়ে আদালতের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। রীতিমতো বিচারব্যবস্থা ভেঙে ফেলার শামিল হয়েছে। আদালতের সওয়াল-জবাব ও বিদ্যমান আইনের পরিপ্রেক্ষিতে যদি কাউকে বিচারক ফাঁসি দিতে না পারেন, তবু শাহবাগ দাবি করছে ফাঁসিই দিতে হবে। বিচার করো, কিন্তু ফাঁসি ছাড়া আর কোনো রায় মানি না—দাবি করলে সেটা হয় আদালতের নাম ভাঙিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটানোর নির্দেশ চাওয়া। পিটিয়ে মানুষ মারার মতো হত্যায় আদালতকে অংশগ্রহণের জন্য বাধ্য করা হচ্ছে। শাহবাগ এ ধরনের পাবলিক লিঞ্চিং বা গণঅংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পক্ষে দাঁড়িয়েছে কি?...একেই কিছু গণমাধ্যম আখ্যা দিয়েছে ‘গণজাগরণ’। গণজাগরণ মঞ্চ বিচার নয়, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চায়।৩৯

যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে ক্রমাগত মানবিক আবেগমূলক প্রতিবেদন লিখে আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে আমার দেশ। ১ মার্চ ২০১৩ তারিখে আমার দেশ পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, ‘সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের খবর প্রকাশিত হবার পর উল্লাসে মেতে ওঠে শাহবাগের জনতা। অন্যদিকে এ রায়ের পর সারাদেশের মানুষ তীব্র প্রতিবাদ করেছে।’৪০

শাহবাগ আন্দোলন ও গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারের বিরুদ্ধে পত্রিকাটি প্রকাশ করতে থাকে একাধিক প্রতিবেদন। ৪ মার্চ ২০১৩ তারিখের আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, ‘শাহবাগিদের নেতা ইমরান এইচ সরকার হচ্ছেন রাজাকারের নাতি...গোয়েন্দা ব্লগার সূত্র জানায় আন্দোলন শুরুর পর জামায়াতি প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্ত করার নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে চাঁদাবাজি, চাঁদার টাকায় ধানমন্ডি এলাকায় ফ্ল্যাট কেনা, রাতে সহযোদ্ধাসহ উত্সুক সাধারণ মানুষ শাহবাগের খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করলেও ইমরানের পার্শ্ববর্তী একটি হোটেলে রাত যাপন, ডিস্কোতে নাচানাচি, এয়ারপোর্ট এলাকায় আরেকটি বিলাসবহুল হোটেলে ছাত্রলীগেরই আরেক প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে ফুর্তি করা, তথাকথিত অগ্নিকন্যা লাকির আন্দোলনবিমুখ হওয়া, শত শত ছাত্রী ও নারীর রাতে শাহবাগে অবস্থান থেকে বিমুখ হাওয়াসহ নানা তথ্য জানা যায়।’

সাঈদীর ছবি চাঁদে দেখা নিয়ে ১৭ মার্চ ২০১৩ তারিখে আমার দেশ প্রকাশ করে, ‘কোনটা বেশি দামি—১৩ জন ধর্মপ্রাণ মানুষের জীবন নাকি তথাকথিত গণজাগরণ মঞ্চ?... আওয়ামী ও বামপন্থীদের কথিত এই মঞ্চ রক্ষা করতে গিয়েই বগুড়ার ইতিহাসে ঘটে সবচেয়ে মর্মন্তুদ হত্যাযজ্ঞ ৩ মার্চের গণহত্যা। ধর্মপ্রাণ  মানুষের হামলা থেকে মঞ্চটি রক্ষা করতেই পুলিশ সেদিন নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে ১৩ জন সাধারণ মানুষকে। বরেণ্য আলেম আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছবি চাঁদে দেখা গেছে, ৩ মার্চ রাতে এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার নারী-পুরুষ রাস্তায় নেমে আসে। তারা নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবর, সাঈদীর মুক্তি চাই—দিতে হবে দিয়ে দাও স্লোগান দেয়। গভীর রাত থেকে সকাল পর্যন্ত বগুড়া জেলা শহর ও উপজেলাগুলোতে হাজার হাজার মানুষ মিছিল করলেও অপ্রীতিকর তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। ফজরের নামাজের পর হাজার হাজার মানুষ শহরের প্রাণকেন্দ্র সাত মাথার দিকে যেতে থাকে। ওই স্থানে রয়েছে গণজাগরণ মঞ্চ। ওই মঞ্চের আশপাশে রাস্তার মুখে অবস্থান নেয় পুলিশ সদস্যরা। মিছিলকারীরা গণজাগরণ মঞ্চ ভাঙতে পারে, এই আশঙ্কায় পুলিশ সদস্যরা ভোর ছয়টার দিকে মুহুর্মুহু গুলি ছুড়তে থাকে—তাতেই ঘটে এত বিপুল মানুষের প্রাণহানি।...এ ঘটনায় নিহতদের পরিবারে মাতম চলছে। নিহতদের বেশির ভাগই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন। ধর্মপ্রাণ এসব মানুষ দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তির দাবি জানাতেই রাস্তায় নেমে এসেছিলেন।’

‘আমার দেশ’ ও ব্লগারদের নাস্তিকীকরণ

শাহবাগ আন্দোলনের অন্যতম একজন উদ্যোক্তা ব্লগার রাজীব দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হন ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে। ব্লগার রাজীব খুনের পর থেকেই যেন পাল্টে যায় আমার দেশ পত্রিকার এজেন্ডা সেটিং। এর আগ পর্যন্ত পত্রিকাটির ঝোঁক ছিল শাহবাগের আন্দোলনের আওয়ামীকরণ নিয়ে। অথচ ব্লগার রাজীব মারা যাওয়ার পর পত্রিকাটি নতুন করে সামনে নিয়ে আসে আস্তিক-নাস্তিক ইস্যু। পুরো দেশ দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। আমার দেশ এবং বিএনপি-জামায়াত জোটের পক্ষ থেকে অভিযোগ ওঠে, যারা শাহবাগ আন্দোলনকে সমর্থন করে তারা নাস্তিক। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে আমার দেশ পত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়, ‘রাজধানীর ভয়ঙ্কর ইসলামবিদ্বেষী ব্লগার চক্র’ শিরোনামে এই সংবাদটিতে ব্লগার রাজীব হত্যাকেই পরোক্ষভাবে সমর্থন দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে পত্রিকাটির ভাষা ছিল অনেকটা এমন, ব্লগার রাজীব নাস্তিক, তাই তার হত্যা সমর্থনযোগ্য। প্রতিবেদনটির একটি অনুচ্ছেদে লেখা হয়,৪১ ‘ধর্মদ্রোহী ও নাস্তিক যুবগোষ্ঠী মহান আল্লাহ, পবিত্র গ্রন্থ কোরআন, মহানবী হজরত মোহাম্মদ (স.) ঈদ, নামাজ, রোজা ও হজ সম্পর্কে জঘন্য ভাষায় বিষোদ্গার করে মুসলমানদের ইমান-আকিদায় আঘাত হানছে। তাদের কুিসত ও অশ্লীল লেখা পড়লে যেকোনো মুসলমানের স্থির থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি বিবেকবান অমুসলিমদেরও গা শিউরে ওঠার কথা। ব্লগে ইসলামি বিধান, রীতিনীতিকে কটাক্ষ করা হচ্ছে প্রকাশের অযোগ্য ভাষায় এবং নবী-রাসুলদের কাল্পনিক কাহিনি ও মতামত লেখা হচ্ছে অবলীলায়। ধর্মদ্রোহী ব্লগারদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শুক্রবার রাতে মিরপুরে খুন হওয়া শাহবাগ আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তা আহমেদ রাজীব হায়দার ওরফে থাবা বাবা।’

এখানে বেশ কয়েকটি বিষয় চলে আসে। প্রথম: তরুণদের একটি দল ধর্মদ্রোহী ও নাস্তিক। তারাই আবার শাহবাগের আন্দোলনে শামিল। তাদেরই গুরু রাজীব, যিনি নিজেই একজন নাস্তিক। অনেকটা যোগ করে করে শাহবাগের আন্দোলনের সঙ্গে নাস্তিকদের যোগসাজশ করার চেষ্টা করেছিল আমার দেশ পত্রিকাটি। যখন যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির দাবিতে সমগ্র দেশ ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করেছিল, ঠিক তখনই আমার দেশ সাম্প্রদায়িকতা ও মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে সুড়সুড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেছে। চেষ্টা করেছে ঐক্যবদ্ধতা ভেঙে দিয়ে ভিন্ন খাতে মানুষের চিন্তাধারাকে প্রবাহিত করতে। আমার দেশের সঙ্গে সুর মিলিয়ে প্রচারণায় যোগ দেন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। আরও যোগ হয় বিএনপি-জামায়াতপন্থী টিভি চ্যানেল ইসলামিক টিভি ও দিগন্ত টেলিভিশন। বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত অন্য গণমাধ্যমগুলোও এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে থাকে। তবে আমার দেশ পত্রিকাটি যেভাবে এজেন্ডা সেটিং করে মাঠে নেমেছিল এবং জনগণের সম্মতি অর্জনের জন্য পরিকল্পিতভাবে প্রচারণার আশ্রয় নিয়েছিল, সেই আস্তিক-নাস্তিক ইস্যুকে তারা আরও মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেয় ফেসবুক ও টুইটার থেকে জামায়াতে ইসলামীর অঙ্গসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রশিবিরের নানা ফ্যান পেজের মাধ্যমে। সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল ও সামাজিক যোগাযোগের নানা ওয়েবসাইটে শাহবাগবিরোধী আস্তিক-নাস্তিক প্রচারণা বলা চলে একপ্রকার ঝড়ই তোলে।

১ মার্চ ২০১৩ তারিখে আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, ‘আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে ইসলামের সৈনিক উল্লেখ করে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী বলেছেন, কিছু জনবিচ্ছিন্ন নাস্তিক ও বামপন্থীদের শাহবাগ আন্দোলনের আড়ালে আল্লাহ, রাসুল (সা.) ও ইসলামের বিভিন্ন প্রতীকগুলোকে অব্যাহতভাবে অবমাননা ও নাস্তিক মুরতাদদের মুখোশ উন্মোচন করায় সরকারের রোষানলে পড়েছেন মাহমুদুর রহমান। তাকে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।...মুসলমানদের মালিকানাধীন হয়েও দেশের অধিকাংশ মিডিয়া যখন প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ইসলামের বিপক্ষে ও নাস্তিক মুরতাদদের পক্ষে নির্লজ্জ অবস্থান নিয়েছে, এমন কঠিন পরিস্থিতিতে মাহমুদুর রহমান জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আল্লাহ, রাসুল (সা.) ও ইসলামের পক্ষে জোরালো অবস্থানে লড়ে গিয়ে তিনি একজন দৃঢ় ইমানদারের পরিচয় দিয়েছেন।’৪২

ইসলামিক ফাউন্ডেশন সরকারি একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের বিরুদ্ধে ব্লগারদের আশকারা দেওয়ার অভিযোগ করে ১ মার্চ ২০১৩ তারিখে আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, ‘মহানবী (সা.)-এর অবমাননাকারী নাস্তিক, মুরতাদ ও ইসলামবিদ্বেষীদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আলেম-ওলামা ও তৌহিদী জনতার আন্দোলন প্রতিহত করতে ব্যাপক তত্পরতা চালাচ্ছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। এক সপ্তাহ ধরে নানা তত্পরতার পাশাপাশি সবশেষ গতকাল বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেট প্রতি শুক্রবার বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ফাউন্ডেশনের ডিজি। এ ছাড়া বায়তুল মোকাররমসহ সারা দেশের কোনো মসজিদ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না বলেও ঘোষণা দেন তিনি।...সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রমতে মহানবী (সা.)-এর অবমাননাকারী নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে গত ২২ ফেব্রুয়ারি বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদসহ সারা দেশের মসজিদ থেকে বের হওয়া সব স্তরের আলেম-ওলামা ও ইসলামি দলগুলোর মিছিলে পুলিশের হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় সরকারি মহলে তোলপাড় শুরু হয়। এ ধরনের আন্দোলন দমনে নানা কৌশল খুঁজতে থাকে প্রশাসন।’৪৩

২ মার্চ ২০১৩ তারিখে পত্রিকাটি লিড সংবাদ করে এভাবে, ‘ইসলামবিদ্বেষী সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত তৌহিদী জনতার আন্দোলন থামবে না।’৪৪

ব্লগার রাজীব হত্যার কারণ অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করে তাঁকে ইসলামবিদ্বেষী লেবেল দেওয়ার মাধ্যমে পুরো শাহবাগ আন্দোলনকে নাস্তিকতার আন্দোলনের লেবেল দিয়েছিল পত্রিকাটি। ৩ মার্চ ২০১৩ তারিখে পত্রিকাটির শিরোনাম ছিল, ‘ছাত্রশিবিরকে জড়ানোর চেষ্টা ডিবির: ব্লগার রাজীব হত্যায় জড়িত অভিযোগে নর্থ সাউথের ৫ ছাত্র গ্রেপ্তার: আটকদের দাবি তারা ষড়যন্ত্রের শিকার’। আরও উল্লেখ করা হয়, ‘প্রচণ্ড ইসলামবিদ্বেষী ব্লগার রাজীব হায়দার ওরফে থাবা বাবার লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তিনি থাবা বাবা নামে একটি ব্লগে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে কুত্সা রটনা করেছেন। এ ঘটনায় তার কয়েকজন বান্ধবী ও স্ত্রীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ।’৪৫

নাস্তিকতার ইস্যুটি মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে চরমভাবে আঘাত করে। বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে শাহবাগের আন্দোলন সম্পর্কে। এই বিভ্রান্তি ও ধর্মীয় অনুভূতিকে লুফে নেয় ইসলামপন্থী একটি দল হেফাজতে ইসলাম।৪৬

হেফাজতে ইসলামের উত্থান

২৪ ফেব্রুয়ারি শাহবাগের নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে দেশজুড়ে হরতাল ডাকে ইসলামি দলগুলো। এই হরতালে সমর্থন দেয় বিএনপি। ১৫ মার্চ মুন্সিগঞ্জে শাহবাগের আন্দোলন নিয়ে প্রথম কথা বলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ইসলামি দলগুলোর মতো তিনিও শাহবাগের আন্দোলনকারীদের নাস্তিক বলে সমালোচনা করেন। ওই জনসভায় তিনি আরও বলেন, ‘শাহবাগে আন্দোলনকারী যুবকেরা নিরপেক্ষ নয়। তারা আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মী। তারা নাস্তিক। তারা হিন্দু, বৌদ্ধ, ইসলাম কোনো ধর্ম মানে না। আল্লাহ-রাসুল কিছুই মানে না। তারা বিচার নিয়ে খেলা শুরু করেছে। তারা রায় মানে না, বিচার মানে না, আদালত মানে না।’৪৭

যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য আটককৃতদের অধিকাংশই বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামীর সদস্য। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধীদের বিচারপ্রক্রিয়ার শুরু থেকেই খালেদা জিয়া অভিযুক্তদের রাজবন্দী দাবি করে মুক্তি দাবি করেছিলেন। বিএনপি-জামায়াত জোটের আশঙ্কা ছিল, সরকার শাহবাগের আন্দোলনকারীদের মাঠে নামিয়ে দ্রুত বিচার করতে চাইছে। হেফাজতে ইসলামকে সমর্থন দিয়ে বেগম জিয়া সরকারকে আলটিমেটাম দিয়ে হুমকি দিয়ে বলেন, সরকার গণজাগরণ মঞ্চ বন্ধ না করলে, বিএনপি নিজেই পাল্টা মঞ্চ তৈরি করবে। এরপর পাল্টা ওই মঞ্চ থেকে গণজাগরণ মঞ্চ বন্ধ করার জন্য সারা দেশ থেকে মানুষ আসতে বলা হবে। খালেদা জিয়ার এই বক্তব্যের পরই হেফাজতে ইসলাম ৬ এপ্রিল ঢাকায় জনসভা করার ঘোষণা দেয়। আর ওই জনসভা থেকে ১৩ দফা দাবিতে ৫ মে ঢাকা অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়।

মার্চের মাঝামাঝি থেকেই হেফাজতে ইসলামকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে সামনে নিয়ে আসে আমার দেশ। ১৮ মার্চ ২০১৩ তারিখে পত্রিকাটিতে উল্লেখ করা হয়, ‘আল্লাহ ও রাসুলের জঘন্য অবমাননাকারী নাস্তিক ব্লগার এবং তাদের পৃষ্ঠপোষক ও পক্ষাবলম্বনকারীদের অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্যে কান না দিয়ে দাবি আদায়ে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের ৬ এপ্রিল দেশের প্রতিটি জেলা থেকে ঢাকা অভিমুখে লংমার্চসহ সব প্রতিবাদ কর্মসূচি সর্বাত্মকভাবে পালন করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলামের বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী। নাস্তিক ব্লগারদের প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন বৃহত্তর রংপুরের তৌহিদী জনতা।’৪৮

২৮ মার্চ ২০১৩ তারিখে লেখা হয়, ‘নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। প্রস্তুতি সভা থেকে জানা গেছে, কর্মসূচিতে বাধা দিলে লাগাতার হরতাল দেওয়া হবে।’৪৯ ৭ এপ্রিল ২০১৩ তারিখে আমার দেশ-এ প্রকাশিত হয়, ‘সরকারের কণ্টকাকীর্ণ বাধার বৃত্ত, পদে পদে নিপীড়ন আর প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষুসহ বহুমুখী ষড়যন্ত্রের কূটচালকে চূর্ণ করে সারা দেশে ইসলামি চেতনার মহাজাগরণ ঘটেছে। শাহবাগি নাস্তিক মুরতাদদের বিরুদ্ধে ইমানি শক্তিতে জেগে উঠেছে বাংলাদেশ। গতকাল মহাসাগরের ঊর্মি তুলে রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রস্থলের পুরোটাই ছিল মুসলিম জনতার দখলে। হেফাজতে ইসলামের আহ্বানে অগণিত তৌহিদী জনতার এ জমায়েতকে প্রাণের ভালোবাসা দিয়ে সেবা দিয়েছে ঢাকাবাসী। আসমুদ্রহিমাচলে নাস্তিকদের বিরুদ্ধে এমন বুলন্দ আওয়াজও কেউ শোনেনি। জনতার এই মহাসমুদ্র থেকে নাস্তিকদের বিরুদ্ধে যে গর্জন ওঠে তা সাগরের কলধ্বনিকে ম্লান করে দেয়।’৫০

৫ মে ঢাকা অবরোধ করে হেফাজতে ইসলাম। দুপুরে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে এসে জড়ো হয় তারা। শাপলা চত্বরের সমাবেশ থেকে নাস্তিক ব্লগারদের বিচারসহ ১৩ দফা দাবিতে লাগাতার অবস্থান ধর্মঘটের ঘোষণা দেয় বিক্ষোভকারীরা। ভাঙচুর, জ্বালাও পোড়াও শুরু করে হেফাজতের কর্মীরা। বাস, ট্রাকে আগুন, কমিউনিস্ট পার্টির অফিসে আগুন, বইয়ের দোকানে আগুন, মতিঝিলের শাপলা চত্বরজুড়ে শুরু হয় তাণ্ডব। সরকারের পক্ষ থেকে হেফাজতের সমর্থকদের বারবার সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু অবস্থান ছাড়ে না হেফাজতে ইসলাম। রাতে মতিঝিল থেকে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিতে অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শুরু হয় যৌথ বাহিনীর অপারেশন। অপারেশনে দেশজুড়ে হেফাজতের কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে মারা যায় ২৭ জন।’৫১

পুলিশি অভিযান ও মৃতের সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা

হেফাজতের অবস্থানে পুলিশের অভিযান ও মৃতের সংখ্যা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়। রাতে এই অভিযানে মতিঝিল ও এর আশপাশের এলাকায় বাতি নিভিয়ে অপারেশন পরিচালনা করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, হেফাজতের তাণ্ডবে পাওয়ার স্টেশনে বিদ্যুত্ ছিল না। আর বিএনপি-জামায়াত সমর্থকেরা প্রশ্ন তোলে, ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্যুত্ নিভিয়ে এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে, যাতে করে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো যায় এবং মৃতের সংখ্যা গোপন রাখা যায়। ৫ মে সারা দিন দেশজুড়ে হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষে সাধারণ মানুষসহ মৃতের সংখ্যা ৩০ ছাড়ায়নি। হেফাজতে ইসলাম দাবি করতে থাকে, তাদের দুই থেকে তিন হাজার কর্মী র্যাব-পুলিশের হামলায় ৫ মের রাতে মারা গেছে। রাতের আঁধারে হেফাজতকর্মীদের লাশ সরিয়ে ফেলেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিএনপি-জামায়াত জোটও তাদের দাবির সঙ্গে একাত্ম হয়ে প্রচার করতে শুরু করে, সেই রাতে যৌথ বাহিনীর অপারেশনে আড়াই হাজার হেফাজতকর্মীকে মেরে ফেলা হয়েছিল। যদিও তারা তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কোনো তালিকা দিতে পারেনি। তাদের এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সে সময়কার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর জানান, ‘৫ ও ৬ মে ২০১৩ তে সমগ্র ঢাকা শহরে নয়জন মারা গেছে।’৫২

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিএনপির ক্রমাগত প্রচারণা, মৃতের সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি এবং সরকারের বক্তব্যের পর জনমনে মৃতের আসল সংখ্যা নিয়ে দ্বিধা তৈরি হয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার এক বিবৃতিতে জানান, নিহতের সংখ্যা ১১ জন, যাঁদের মধ্যে একজন পুলিশও আছেন। আর ডিএমপি কমিশনারের বক্তব্য এমন এক সময়ে আসে, যখন সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোতে যৌথ বাহিনীর অপারেশনে হেফাজতে ইসলামের মৃতের সংখ্যা নিয়ে ঝড় বইছিল। সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলোর বিভিন্ন পেজে বলা হচ্ছিল, মৃতের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি। ডিএমপি কমিশনার এই সময় হেফাজতে ইসলামের প্রচারণার কথাও বলেন, তাঁর এই মন্তব্যটি পড়লে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে উঠবে, ‘যদি তিন হাজার মানুষ মারা গিয়ে থাকেন, তাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুরা তো আছেন, তাঁরা কোথায়? প্রাণহানি ঘটাতে পারে, এমন কোনো অস্ত্র আমরা ব্যবহার করিনি। সংবাদকর্মীদের উপস্থিতিতেই পুরো অভিযানটি পরিচালনা করা হয়েছে।’৫৩

‘বিএনপি বা জামায়াত বা হেফাজতের প্রচারণা ছিল যে এই অভিযানটি এতটাই নির্মম ছিল যে তা ২৫ মার্চের গণহত্যাকেও হার মানিয়েছে।’৫৪ বিএনপি বা হেফাজত বারবার করে আড়াই হাজার বা তিন হাজার মৃতের সংখ্যা দাবি করলেও আজ পর্যন্ত নিহতদের কোনো সঠিক তালিকা দিতে পারেনি। সাভারে রানা প্লাজা ধসের পর আত্মীয়স্বজন জড়ো হয়েছিলেন আটকে পড়াদের খোঁজে, মৃতের খোঁজে। মতিঝিলে লাশের খোঁজে কেউই আসেনি; বরং বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখা গেছে, যাদের মৃত দেখানো হচ্ছিল, সেই নামে কোথাও কেউ নেই। কেউ মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছেন, আবার একই নাম-ঠিকানার ব্যক্তিকে বারবার করে তালিকায় সংযোজন করা হয়েছে। ‘অধিকার’ নামের বেসরকারি সংগঠন এ রকমই একটি তালিকা প্রকাশ করে ৬১ জনের মৃতের তালিকা প্রকাশ করে, যা নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়।

জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের ফেসবুক পেজ বাঁশের কেল্লায় দাবি করা হয়, মৃতের সংখ্যা আড়াই হাজারের বেশি। অনেক লাশ সরকারি নানা সংস্থা সরিয়ে নিয়েছে। শুধু সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোই নয়, বিএনপিঘেঁষা সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেল প্রত্যক্ষভাবে না বললেও বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতানেত্রীদের সাক্ষাত্কার ও তাদের সমাবেশ-মিছিলে সংবাদের মাধ্যমে মৃতের সংখ্যা যে হাজার ছাড়িয়েছে, সে এজেন্ডা মানুষের মধ্যে নিবিষ্ট করার চেষ্টা করে। এর বাইরে ছিল না আমার দেশ পত্রিকাও। ১৯১৯ সালে ভারতের জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণে মারা যায় তিন হাজারেরও বেশি। আমার দেশ পত্রিকা শাপলা চত্বরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানকে সেই জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করে। দি ইকোনমিস্ট, আল-জাজিরার মতো আন্তর্জাতিক কিছু গণমাধ্যমের ভূমিকাও ছিল ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। দি ইকোনমিস্ট এই অভিযানে ‘গণহত্যা’ হয়েছে বলে খবর ছাপায়। আর আল-জাজিরা জানায়, শাপলা চত্বরে অভিযানে মারা যাওয়ার সংখ্যা নিয়ে সরকার লুকোচুরি করছে। সরকারের দাবি করা সংখ্যার চেয়ে মারা গেছে আরও বেশি। সঙ্গে যোগ হয় বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’। ‘অধিকার’ তাদের প্রতিবেদনে দাবি করে যে তাদের কাছে ৬১ জন মৃতের তালিকা আছে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা এই তালিকা বাংলাদেশ সরকার ও গণমাধ্যমের কাছে দিতে অস্বীকৃতি জানায়।৫৫ শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আসলে কতজন মারা গেছে, তা খুঁজে বের করার জন্য একটি কমিশন গঠনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়।৫৬

অর্থাত্ দেশের ভেতর বিএনপি, জামায়াত ও হেফাজতে ইসলামের ভুল তথ্যের প্রচারণা, বিএনপিপন্থী গণমাধ্যমের পক্ষপাতমূলক অবস্থান ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ধোঁয়াশাচ্ছন্ন পক্ষপাতমূলক সংবাদ জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে, দ্বিধাগ্রস্ত করেছে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা নিয়ে।

৫ জুন ২০১৩ সালে খুলনা, সিলেট, বরিশাল ও রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। এই নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে প্রচারণায় যোগ হয় হেফাজতে ইসলাম। তারা প্রচারণায় দাবি করতে থাকে, ৫ মের রাতে তাদের দুই হাজারের বেশি কর্মীকে পুলিশ হত্যা করেছে। জনসভায় হেফাজতের নেতারা এই নির্বাচনকে আস্তিক ও নাস্তিকদের মধ্যে যুদ্ধ বলেও মন্তব্য করেন। আওয়ামী লীগ শাহবাগের আন্দোলনকে সমর্থন করে নাস্তিকদের সমর্থন দিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা। প্রতিটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। আওয়ামী লীগ এই পরাজয়ের জন্য দায়ী করে হেফাজতে ইসলামের মিথ্যা প্রচারণাকে। ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পরাজয় নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করে, যার শিরোনাম ছিল ‘নাস্তিক কার্ডের প্রচারণায় জয়’। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সিটি করপোরেশনগুলোতে হেফাজতে ইসলাম আওয়ামী লীগ সরকারকে নাস্তিকদের আশকারা দেওয়ার জন্য দায়ী করেছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে নাস্তিকদেরই ভোট দেওয়া হবে, এমন তুলনা করেছে সংগঠনটি। বরিশালে সংবাদপত্রটির প্রতিবেদক ১০ জন ভোটারকে প্রশ্ন করেছিলেন, ৫ মে তে সরকার যে হাজার হাজার হেফাজতকর্মীকে হত্যা করেছে, তা সত্য কি না। আর উত্তরদাতাদের প্রায় সবাই বলেছেন, সরকারের বিরুদ্ধে হেফাজতকর্মীদের গণহত্যার অভিযোগ সত্য। এই মিথ্যা প্রচারণার জন্যই আওয়ামী লীগের এমন পরাজয় বলেও উল্লেখ করা হয়।৫৭

এই ষড়যন্ত্রে কে লাভবান আর কে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে? ষড়যন্ত্র-তত্ত্বের একটি বিশেষ দিক হচ্ছে, এটি বিরুদ্ধবাদীদের বিপক্ষে বিশ্বাসহীনতা তৈরি করে। এই বিশ্বাসহীনতা কোনো না কোনোভাবে তার কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিফলন ঘটে। আগেই উল্লেখ করেছিলাম ‘গণহত্যা’ শব্দ যখন ব্যবহূত হয় তখন এটি মনোজগতে ব্যাপক প্রভাব তৈরি করতে সমর্থ হয়। ‘গণহত্যা’ এমন একটি প্রত্যয়, যা বিরুদ্ধবাদীদের বিরুদ্ধে প্রচারণায় ব্যবহার করা হয়।

ওপরের আলোচনা থেকে আমরা একটি পর্যবেক্ষণ দাঁড় করাতে পারি, আর তা হলো, বিএনপিপন্থী গণমাধ্যম ‘গণহত্যার’ কথা বলে একটি এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট, বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মী ও দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠন হেফাজতের প্রচারণাকে আরও উসকে দিয়েছে। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্য যখন একই দিকনির্দেশ দেয় এবং প্রকৃত ঘটনা থেকে প্রাপ্ত তথ্য যখন ভিন্ন দিকনির্দেশনা দেখায় তখনই মনোজগতে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। যাকে অতিক্রিয়া প্রভাব বা সিনার্জিস্টিক ইফেক্ট বলা হয়। একই সঙ্গে আন্তব্যক্তিক যোগাযোগ, গণযোগাযোগ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রচারণা এই প্রভাবকে বাড়িয়েছে অনেক গুণ। আর একে মানুষের মনের গহিন কোণে নিয়ে গেছে ধর্ম বা আস্তিক-নাস্তিক প্রচারণা। বিশ্বের প্রতি ১০০ জন মুসলিমের মধ্যে প্রায় নয়জন বসবাস করে বাংলাদেশে। ফলে ধর্মকে যখন রাজনীতির সঙ্গে গুলিয়ে জনগণের দিকে তা নিক্ষেপ করা হয়, সেটি হয়ে ওঠে বেশ কার্যকর। 

উপসংহার

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী থমাস ফার্গুসন তাঁর গোল্ডেন রুল গ্রন্থে বলেছেন, ‘রাজনৈতিক দল ও নির্বাচনে প্রধান অনুদানদাতারা যদি কোনো একটা ইস্যুতে একমত হন, তাহলে প্রতিযোগী দলগুলো ওই ইস্যু নিয়ে আর মুখ খোলে না’।৫৮ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সংগঠিত শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের মূল উদ্দেশ্যের সরাসরি বিরোধিতা করা বিএনপি, জামায়াত জোটের পক্ষে করা সম্ভব ছিল না। ১৯৭১-এ স্বাধীনতাযুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী হত্যাযজ্ঞের বিচারের বিপক্ষে যাওয়া মানে সরাসরি ঘোষণা দিয়ে দেশের স্বাধীনতার অস্তিত্বের বিপক্ষে চলে যাওয়া; যা বিএনপির মতো বড় একটি রাজনৈতিক দল, যারা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে পরিচিতি পেতে চায়, তাদের পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার মানেই জোটের শক্তি হ্রাস, কারণ বিএনপি-জামায়াত জোটের অনেক নেতাই মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত। তাই যুদ্ধাপরাধের বিচার তারাও চায় এমন ধুয়া তুলে ‘গণজাগরণ মঞ্চের’ জাগরণকে বিভক্ত করাই ছিল একমাত্র বিকল্প এবং পরিকল্পিতভাবে আস্তিকতা-নাস্তিকতার দোহাই দিয়ে সেই মূল চেতনাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হয়েছে। শিখণ্ডী হিসেবে খাড়া করা হয়েছে হেফাজতে ইসলামকে। হেফাজতে ইসলামকে যৌথ বাহিনীর অপারেশনে চলে যেতে বাধ্য করা হলে শুরু হয় মৃতের সংখ্যা নিয়ে নতুন করে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা। বিএনপি-জামায়াতসমর্থিত নেতারা ও গণমাধ্যমগুলো চেষ্টা করেও হাজার হাজার মৃতের তালিকা দেখাতে পারেনি আজ পর্যন্ত। কিন্তু ক্রমাগতভাবে জনগণকে তাদের নেতিবাচক প্রচারণার মাধ্যমে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। তৈরি করেছে বিভ্রান্তি, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল গণমাধ্যম বা ওই বিশেষ দলের এজেন্ডার প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন।

পুঁজিবাদী সমাজকাঠামোয় গণমাধ্যম ক্ষমতাবানদের পক্ষেই সাফাই গায়, তারই প্রমাণ পাওয়া গেছে ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনায় গণমাধ্যমের ভূমিকা থেকে। Walgrave (২০০৫) বলেন, উপসাগরীয় যুদ্ধ থেকে ২০০২ সালের ইরাক আগ্রাসন, প্রতিটিতে মার্কিন গণমাধ্যম চেষ্টা করেছে যুদ্ধবাজ সরকারের পক্ষে জনমত তৈরি করতে। যুদ্ধের এজেন্ডাকে মানুষের মনে নিবিষ্ট করার চেষ্টা করে মার্কিন গণমাধ্যমগুলো।৫৯

মিডিয়ায় অগ্রাধিকার প্রদান ও পক্ষপাতিত্বের সমালোচনা করতে গিয়ে আমরা খোদ মিডিয়ার ওপরই অন্তত কিছু তথ্যের জন্য নির্ভর করি। মিডিয়ার ওপর আমাদের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বিভ্রান্তির সুযোগ সৃষ্টি করে। মিডিয়া শুধু জনগণের কাছে বার্তা ও প্রতীক সম্প্রসারণ করে না, বৃহত্তর সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে খাপ খাওয়ার উপযোগী করে জনগণকে মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও আচরণবিধিতে দীক্ষিত করে তোলে। কিন্তু যখন খোদ মিডিয়ার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে সংকীর্ণতার সৃষ্টি হয়, তখনই দেখা দেয় বিভ্রম, প্রচারণাব্যবস্থার ক্রিয়াশীলতা যাচাই করা তখন দুরূহ হয়ে পড়ে। গণমাধ্যমগুলো তখন আগ্রাসীভাবে মত প্রকাশ করতে থাকে এবং গণমানুষের স্বার্থের চেয়ে মিডিয়ার নিজস্ব স্বার্থ রক্ষাই প্রকট হয়ে ওঠে।

এই প্রবন্ধে মিডিয়াকে দেখা হয়েছে বিশেষ সামাজিক উদ্দেশ্য সাধনকারী প্রপঞ্চ হিসেবে। কিন্তু সে উদ্দেশ্য এমন নয় যে বিচক্ষণভাবে রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যাবলি প্রচারের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ওপর অর্থপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে; বরং মিডিয়া ব্যস্ত নিজ উদ্দেশ্য পূরণে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী নিয়ামক হিসেবে। প্রচারণা মডেল অনুযায়ী, মিডিয়ার সামাজিক উদ্দেশ্য হলো দেশ, সমাজ, ধর্ম বিশ্বাস ও রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং জনগণের ওপর আধিপত্যকারী বিশেষ অধিকারভোগী গোষ্ঠীগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক এজেন্ডাগুলো সমর্থন করা, জনমনে প্রোথিত করা ও জনগণের সম্মতি আদায় করা। মিডিয়াগুলো তাদের ক্রমবর্ধমান স্বাধীনতা ও কর্তৃপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে বহুদূর অগ্রসর হয়েছে এবং এত দূর অগ্রসর হয়েছে যে গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে ক্ষেত্র বিশেষে অবশ্যই তাদের লাগাম টেনে ধরতে হবে।

তথ্যসূত্র

১. http://www.passia.org/seminars/99/media_and_communication/rami2.html

২. Edward S. Herman and Noam Chomsky, Manufacturing Consent: The Political Economy of the Mass Media, New York: Pantehon Books, 1988.

৩.William J. Severin and James W. Tankard, Communication Theories, New York: Guilford Press, 1987.

৪. Michael J. Muin, ‘Agenda Setting Theory and the Role of the Media in Shaping Public Opinion for the Iraq War,’ research paper in partial fulfillment of the requirements for the degree of Master of Arts in the Department of Communication University of Central Missouri, 2011.http://centralspace.ucmo.edu/xmlui/bitstream/handle/10768/26/MMuin_Communication.pdf?sequence=1

৫. Bryan Hayes, ‘The Gulf War: The Bush Administration and Pentagon’s Mobilization of the Press to Achieve Favorable American Public Opinion,’  Military History Online, 2010, available at http://www.militaryhistoryonline.com/20thcentury/ articles/gulfwarpressmobilization.aspx

৬. এডওয়ার্ড এস হারম্যান ও নোয়াম চমস্কি, সম্মতি উত্পাদন: গণমাধ্যমের রাজনৈতিক অর্থনীতি, পৌষ ১৪১৪, জানুয়ারি ২০০৮, পৃ. ২৮.

৭. Doug Newsom and Alan Scott, This is PR: The Realities of Public Relations, Third Edition, Wadsworth Publication Co., 1985-1981. p: 169.

৮. Sam Black and Melvin L. Sharpe, Practical Public Relations: Common Sense Guidelines for Business and Professional People. 1985

http://libguides.usc.edu/content.php?pid=83009&sid=618409

৯. Edward S. Herman and Noam Chomsky, Manufacturing Consent: The Political Economy of the Mass Media, Vol. CI. No. 26,000

১০. http://www.prothom-alo.com/opinion/article/8813/  আমার দেশ-এর সাংবাদিকতা

১১. এডওয়ার্ড এস হারম্যান ও নোয়াম চমস্কি, সম্মতি উত্পাদন: গণমাধ্যমের রাজনৈতিক অর্থনীতি, পৌষ ১৪১৪, জানুয়ারি ২০০৮, পৃ. ৩৬-৩৭

১২. Gallup, Lesli, When to Forgive and Forget: Engaging Hanoy and out laws, New York Times, April 15, 1993

১৩. এডওয়ার্ড এস হারম্যান ও নোয়াম চমস্কি, সম্মতি উত্পাদন: গণমাধ্যমের রাজনৈতিক অর্থনীতি, পৌষ ১৪১৪, জানুয়ারি ২০০৮, পৃ. ৪১

১৪. জন. ই. রিলি, ফরেন পলিসি (বসন্ত ১৯৮৩, বসন্ত ১৯৮৭) রিলি, সম্পা, আমেরিকান পাবলিক ওপিনিয়ন ইউ এস ফরেন পলিসি ১৯৮৭, শিকাগো কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস, পৃ. ৩৩

১৫. এডওয়ার্ড এস হারম্যান ও নোয়াম চমস্কি, সম্মতি উত্পাদন: গণমাধ্যমের রাজনৈতিক অর্থনীতি, পৌষ ১৪১৪, জানুয়ারি ২০০৮, পৃ. ২৬-২৯

১৬. http://www.studymode.com/essays/Saddam-Hussein-The-u-s-Portrayal-Of-12772.html

১৭.  http://pages.gseis.ucla.edu/faculty/kellner/papers/gulfwarrevisited.htm

১৮. Martin J. Manning and Clarence R.Waytt, Encyclopedia of Media and Propoganda in Wartime America, 2010, p. 810

১৯. S. Iyengar, and A. Simon, News coverage of the Gulf crisis and public opinion, Communication Research, 1993.

২০. http://www.gallup.com/poll/1963/amer...orthwhile.aspx

২১. http://www.arabnews.com/news/451770)

২২. http://www.livescience.com/25110-negative-messages-mulsims-media.html

২৩. http://cojme.unl.edu/mosaic/2012/12/17/improvement-stereotyped-portrayals-muslims-linger/#sthash.T4LwRbCL.dpuf

২৪. http://en.wikipedia.org/wiki/Iraq_and_weapons_of_mass_destruction)

২৫. ‘U.S.officials Guilty of War Crimes for Using 9/11 As a False Justification for the Iraq War, WashingtonsBlog.October24, 2012, 

http://www.washingtonsblog.com/2012/10/5-hours-after-the-911-attacks-donaldrumsfeld-said-my-interest-is-to-hit-saddam-he-also-said-go-massive-sweep-it-all-up-things-related-and-not-and-at-2.html

২৬. http://georgewbush-whitehouse.archives.gov/news/releases/2002/09/20020912-1.html

২৭. http://www.pbs.org/wgbh/pages/frontline/shows/truth/why/said.html

২৮. Muin, Michael J. প্রাগুক্ত

২৯. http://www.theguardian.com/media/2012/jun/15/rupert-murdoch-tony-blair-iraq-alastair-campbell

৩০. http://www.nieman.harvard.edu/reports/article/100831/The-Press-and-Publi-Misperceptions-About-the-Iraq-War.aspx

৩১. Grant R. Jeffrey, War on Terror: Unfolding Bible Prophecy, Kindle Edition, March 24, 2010

৩২.‘U.S. Officials Guilty of War Crimes for Using 9/11 As a False Justification for the Iraq War,’ WashingtonsBlog.October 24, 2012, http://www.washingtonsblog.com/2012/10/10/5-hours-after-the-911-attacks-donald-rumsfeld-said-my-interest-is-to-hit-saddam-he-also-said-go-massive-sweep-it-all-up-things-related-and-not-and-at-2.html

৩৩. Kai Hafez, ‘The Iraq War 2003 in Western Media and Public Opinion: A Case Study of the Effects of Military (Non-) Involvement in Conflict Perception,’ 2003. Available at: http://www.uni-erfurt.de/fileadmin/user-docs/philfak/kommunikationswissenschaft/ files_publikationen/hafez/Hafez-Irak.pdf (Accessed on 30th September, 2013)]

৩৪. ‘U.S. Officials Guilty of War Crimes for Using 9/11 As a False Justification fot the Iraq War,’ WashingtonsBlog. October 24, 2012, http://www.washingtonsblog.com/2001/10/5-hours-after-the-911-attacks-donald-rumsfeld-said-my-interest-is-to-hit-saddam-he-also-said-go-massive-sweep-it-all-up-things-related-and-not-and-at-2.html

৩৬. http://www.gallup.com/poll/8038/seventytwo-percent-americans-support-war-against-iraq.aspx

৩৬. Nadine Murshid, ‘The Shahbag Uprising War Crimes and Forgiveness,’ Economic and Political Weekly, March 2013.

৩৭. http://www.amardeshonline.com/pages/details/2013/02/10/187279)

৩৮. http://www.amardeshonline.com/pages/details/2013/02/10/187768#.UiHMXtKBkg4

৩৯. http://www.amardeshonline.com/pages/details/2013/02/15/188030#.Uu6DTT2Syr4

৪০. http://www.amardeshonline.com/pages/details/2013/03/02/190232

৪১. http://www.amardeshonline.com/pages/details/2013/03/01/190103#.UwmVo2KSyr5

৪২. http://www.amardeshonline.com/pages/details/2013/03/01/190112

৪৩. http://www.amardeshonline.com/pages/details/2013/03/01/190112

৪৪. http://www.amardeshonline.com/pages/details/2013/03/01/190114

৪৫. http://www.amardeshonline.com/pages/details/2013/03/02/190246

৪৬. http://www.amardeshonline.com/pages/details/2013/03/03/1950387

৪৭. http://www.amardeshonline.com/pages/details/2013/02/18/188548#.Uu58fD2Syr5

৪৮. http://www.amardeshonline.com/pages/details/2013/03/16/192173#.Uu6FwD2Syr4

৪৯. http://www.amardeshonline.com/pages/details/2013/03/18/192450#.UwmzH2KSyr4

৫০. http://www.amardeshonline.com/pages/details/2013/03/28/193988#.Uwm1OGKSyr4

৫১. http://www.amardeshonline.com/pages/details/2013/04/07/195470#.Uwm2CGKSyr4

৫২. http://www.thedailystar.net/beta2/news/22-more-killed/

৫৩. http://www.newagebd.com/detail.php?date=2003-05-07&nid=48361

৫৪. http://www.bbc.co.uk/bengali/news/2013/05/130508_sg_hefazat_missing.shtml

৫৫. http://www.newagebd.com/detail.php?date=2013-05-08&nid=48401#.Ukun2tlzhZg

৫৬. http://odhikar.org/wp-content/uploads/2013/06/Fact-finding_Hefazate-Islam_Bangla.pdf

৫৭. http://www.hrw.org/news/2013/05/10/bangladeshindependent-body-should-investigate-protest-deaths

৫৮. http://archive.thedailystar.net/beta2/news/triumph-of-atheist-card/

৫৯. Thomas Feguson, Golden Rule: The Investment Theory of Party Competition and the Logic of Money-Driven Political Systems, University of Chicago Press, June, 1995, pp. 28-29

৬০. Stefaan Walgrave and Joris Verhulst, The 2003 Iraqi war in the media: Politics, media, and public opinion in eight countries. 2005. http://www.m2p.be/publications/00101561.pdf

pathok

যোগাযোগের ঠিকানা

সিএ ভবন,
১০০ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,
কারওয়ান বাজার, ঢাকা - ১২১৫।

ফোন: ৮৮০-২-৮১১০০৮১, ৮১১৫৩০৭
ফ্যাক্স - ৮৮০-২-৯১৩০৪৯৬

protichinta kinte chile