protichinta

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ও ‘অন্যের’ ভাবমূর্তির ধারণা

ইমতিয়াজ আহমেদ, অনুবাদ: গোলাম মুস্তফা

সারসংক্ষেপ

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক যে ভাবমূর্তিটি দাঁড়িয়েছে, তা অনেকটাই প্লেটোর গুহার রূপক গল্পটির মতো, যেখানে একজন আজন্ম গুহাবন্দী মানুষ তার নিজের ছায়া সম্পর্কে এবং তাকে পাহারা দেওয়া ব্যক্তি সম্পর্কে অস্পষ্ট এবং ছায়াচ্ছন্ন ধারণা পোষণ করে। এই দুটি দেশ একে অন্যের ভীতিকর ভাবমূর্তি এঁকেছে, যেটা তাদের নিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়। আর ‘অন্যের’ একটি অস্পষ্ট ও ছায়াচ্ছন্ন ভাবমূর্তি তৈরি করার পেছনে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ যেমন ভূমিকা রেখেছে, তেমনি পারস্পরিক আকাঙ্ক্ষার ঘাটতি এবং শ্রমিক ও অভিবাসন ব্যাপারটিও নিয়ত একটি ভীতিকর ভাবমূর্তি সৃষ্টিতে সহায়তা করছে। যার ফলাফল হলো সম্পর্কের এই পারস্পরিক আস্থাহীনতা। অবৈধ চোরাকারবারি এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোও আরেকটি সন্দেহপূর্ণ ‘অন্যের’ ভাবমূর্তি হয়ে উঠেছে, যারা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণহীনতা ও ব্যর্থতা দুয়েরই সুযোগ নেয়।

মুখ্য শব্দগুচ্ছ: ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, নিম্নবর্ণীয় জনসংখ্যা, অন্যের ভাবমূর্তি, দেশ বিভাগ, শ্রমের বাজার, অভিবাসন, চোরাচালান।

প্রারম্ভিক কথা

প্লেটোর গুহার রূপক গল্পটি ‘অন্যের’ ধারণা সৃষ্টির সঙ্গে বেশ ভালোভাবে মিলে যায়। আজন্ম একটি গুহার ভেতরে বন্দী ও শৃঙ্খলিত অবস্থায় গুহার খোলা মুখের দিকে পেছন ফিরে থাকা একজন বন্দী শুধু দেয়ালে প্রতিফলিত তার ছায়া দেখতে পায়। বন্দী একই সঙ্গে নির্দিষ্ট বিরতিতে তাকে খাওয়াতে আসা জেলারের ছায়াও দেখতে পায়। ওই বন্দীর কাছে ‘বাস্তবতা’ কী রকম হতে পারে? প্লেটো এর উত্তরে বলেন, সত্য বলে আপাত ধরে নেওয়া ওই ছায়া ‘অন্যের’ ধারণাকে সংজ্ঞায়িত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে কৌশলী অবদান রাখে, অর্থাত্ পরিশেষে ‘অন্যের’ একটি ছায়াচ্ছন্ন, অস্পষ্ট প্রতিমা ধারণ করে। বিষয়টি এখানে থেমে থাকেনি। কয়েক শতাব্দীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ঝুটঝামেলা পেরিয়ে আধুনিকতা ‘অন্যের’ এই ছায়াচ্ছন্ন ও অস্পষ্ট মূর্তিটিকে ভূখণ্ড বন্দী করার মাধ্যমে আরও বেশি শৃঙ্খলিত করেছে। আধুনিকতাবাদী পর্বকে নির্দিষ্ট করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সময় প্রস্তাব করা যেতে পারে। ১৫৫৫ সালের দ্য পিস অব অগসবার্গ হলি রোমান অ্যাম্পায়ারে বসবাসরত সব প্রজার জন্য তাদের নিজ নিজ শাসক কর্তৃক মনোনীত প্রোটেস্টানিজম বা রোমান ক্যাথলিসিজমের প্রতি সমর্থন প্রদান বাধ্যতামূলক করে। প্রকৃতপক্ষে, ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো প্রজাদের সার্বভৌম কর্তৃপক্ষের পরিবর্তে তার ভূখণ্ডের নিয়মকানুন পালনে বাধ্য করার মাধ্যমে মানুষ, বিভিন্ন ধারণা, স্থাবর, নীতিসমূহ, এমনকি ভাবমূর্তিগুলোকে ভূখণ্ড বন্দী করার আধুনিক, কিন্তু বিশৃঙ্খল যাত্রা আরম্ভ করে। অনতিবিলম্বে, গেরারডাসের মার্কেটরের সাহায্যে মানচিত্র অঙ্কনশিল্প (১৫৮৬) একই সঙ্গে একটি প্রধান পেশা এবং রক্তাক্ত বিরোধের উত্স হিসেবে হাজির হয়। এর ফলে, ভূখণ্ড ও মানচিত্র বন্দী ছায়াচ্ছন্ন ও অস্পষ্ট ভাবমূর্তিটি ‘সত্যিকার অন্য’ হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে—একটি অদ্ভুত কিন্তু অন্তরঙ্গ বস্তু যা অভিপ্রায়, প্রমাণীকরণ এমনকি সুযোগমতো স্বার্থপর কার্যদর্শনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

উপনিবেশবাদ উপনিবেশ স্থাপনাকারীদের প্রত্যক্ষ কর্তৃত্ব পুনরুত্পাদনের সময়ই ইউরোপীয় ডিসকোর্সগুলোকে দক্ষিণ এশিয়ায় নিয়ে এসেছিল। সমালোচকেরা এই প্রক্রিয়াকে দক্ষিণ এশিয়ার মানসিক ঔপনিবেশীকরণ নামে অভিহিত করেছেন এবং এটিকে ইউরোপীয় সরাসরি কর্তৃত্বের মতোই অশুভ ও বিধ্বংসী বলে মনে করেন। আদমশুমারি, যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিত্সা, নজরদারি এবং আরও বিভিন্ন আবিষ্কার ও হস্তক্ষেপের মাধ্যমে প্রথমে এসব ক্ষেত্রে একটি ছায়াচ্ছন্ন ও অস্পষ্ট ‘অন্যের’ ধারণা তৈরি করা হয়েছে। অতঃপর, উপনিবেশ স্থাপনাকারীদের আত্মপ্রত্যয় এবং স্থানীয়দের গতানুগতিকতার সুযোগে এই ছায়াচ্ছন্ন ও অস্পষ্ট ভাবমূর্তি মিথ্যা না হলেও একটি চিরন্তন ‘সত্যিকার অন্যের’ রূপ লাভ করে। রূপান্তরের এই সাফল্য উপনিবেশ স্থাপনাকারী এবং উপনিবেশিত উভয়ের ওপরই নির্ভরশীল ছিল। বিশেষত, উপনিবেশিতরা যখন ঔপনিবেশিক শক্তি দ্বারা সৃষ্ট এই ‘অন্যকে’ ঔপনিবেশিক এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক কালেও বিশ্বাস ও স্মরণ করা শুরু করেছে। অজস্র রাজনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক এবং জনসাধারণ দক্ষিণ এশিয়ার ভূখণ্ডগত বিভক্তিকে কোনো রকম আপত্তি ছাড়াই গ্রহণ করেছিল। হত্যার প্রযুক্তি এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা ব্যতিরেকে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল ভিন্ন নয়, যদিও ১৯৭১ সাল বাংলাদেশের জন্য অধিক সংকটময়, সাম্প্রতিক এবং জীবন্ত হয়ে আছে। চূড়ান্ত বিচারে দুটিই বিভেদময়, গণঘাতী এবং বিয়োগান্ত হিসেবে বিরাজমান। দক্ষিণ এশিয়ার ‘অন্যকে’ যেভাবেই নামকরণ করা হোক না কেন, ‘ভারতীয়’, ‘বাংলাদেশি’, ‘পাকিস্তানি’ বা তাদের মধ্যে কিছু পরিচিত উপবিভাগ এখন আর ছায়াচ্ছন্ন ও অস্পষ্ট নয়; বরং তা এখন ভূখণ্ড বন্দী এবং প্রত্যেকের কাছে ‘অন্যরা’ এখন খুবই অচেনা।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে, বাংলাদেশের দৃষ্টিতে ভারতের ভাবমূর্তি এবং ভারতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করা যায়। প্রবন্ধটি চারটি ভাগে বিভক্ত। প্রথম অংশে দেশ বিভাগ নিয়ে আলোচনা থাকবে। এখানে মূলত দেশ বিভাগের প্রভাব এবং দেরিদার ভাষায়, কীভাবে এটি ভারতীয় এবং বাংলাদেশিদের হন্টোলজিক্যাল সত্তায় রূপান্তরিত করেছে, তার প্রতি দৃষ্টি দেওয়া হবে। এর ফলাফল কোনোভাবেই দেশ বিভাগের চেয়ে কম বিভেদকারী ও বিয়োগান্ত নয়। দ্বিতীয় অংশের আলোচনার বিষয় হলো আকাঙ্ক্ষার জগত্। আকাঙ্ক্ষার অসংগতির ফলেই একে অন্যের প্রতি আগ্রহ থাকার পরও দুই দেশের জনগণের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে। সব নিয়মকানুন এবং সীমান্তে বেড়া দেওয়া সত্ত্বেও মেশানো ও মিশে যাওয়ার মধ্যে একটি অন্তর্নিহিত স্বার্থ আছে। অতঃপর তৃতীয় অংশে বিশ্বায়নের এই যুগে শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনা করা হবে এবং ‘অন্যের’ ভীতিকর ভাবমূর্তি জোরদার করার পেছনে বিশ্বায়নের প্রভাব ব্যাখ্যা করা হবে। এখানে মূলত ‘অন্যের’ ভাবমূর্তিগুলোর ক্লেশ অধিক পরিমাণে উপস্থাপন এবং অবহিত করা অনানুষ্ঠানিক এবং নিম্নবর্ণীয় মেলবন্ধনের ওপর দৃষ্টি দেওয়া হবে। শেষ অংশে আগামী দিনগুলোতে যারা বাংলাদেশ ও ভারতকে নেতৃত্ব দেবে তাদের জন্য এই সবকিছু কী অর্থ বহন করে তা বিবেচনায় নেওয়া হবে।

মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে এই প্রবন্ধে প্রস্তাবিত বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্পগুলো উল্লেখ করছি। প্রথমটি পদ্ধতিগত। এই প্রবন্ধে আধুনিক দুটি রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক বিষয়ে ধারণায়ন এবং লেখার সময় সরলীকৃত সময় ও সম্পর্কের যে ডিসকোর্স তার ফাঁদ থেকে মুক্ত থাকার পদ্ধতি ব্যাখ্যার চেষ্টা করা হয়েছে। যেমনটি আইনস্টাইন একবার বলেছিলেন: ‘...অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যকার পার্থক্য শুধু একটি পুনঃ পুনঃ ঘটমান বিভ্রম’। আইনস্টাইনকে আরও অনুসরণ করলে আমরা দেখতে পাব, বাস্তবতা মূলত স্পেস-সময়ে ঘটা সব ঘটনার সমষ্টি এবং এই বিষয়টির ওপরই এই প্রবন্ধে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। দ্বিতীয়টি তত্ত্বীয়। এই প্রবন্ধটি বাস্তববাদী প্যারাডাইমের সূক্ষ্ম সমালোচনা। প্রধানত ঠাকুরীয় ডিসকোর্সে পাওয়া উত্তর-আধুনিকতাবাদের দক্ষিণ এশীয় সংস্করণ ছাড়াও এই প্রবন্ধ কোয়ান্টাম মেকানিকসের অন্তর্জ্ঞান বা আরও সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে অনিশ্চয়তার মূলনীতির ওপর বেশি নির্ভর করছে। অনিশ্চয়তার মূলনীতি সূত্রবদ্ধ করার জন্য ব্রায়ান গ্রিনির কাছে আমি ঋণী:

ইলেকট্রনটি ঠিক কোথায় আছে আপনি তা জানতে পারেন, কিন্তু ঠিক ওই সময়ে ইলেকট্রনটি কত বেগে আবর্তন করছে আপনি তা সুনির্দিষ্টভাবে জানতে পারবেন না। বিপরীতক্রমে, কত বেগে ইলেকট্রনটি আবর্তন করছে আপনি তা সুনির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করতে পারেন, কিন্তু এটা করার সময়ে আপনি ইলেকট্রনটির সুনির্দিষ্ট অবস্থান নির্ণয়ের সক্ষমতাকে ব্যাহত করবেন। এই রকম পরিপূরক বৈশিষ্ট্যগুলোকে নির্ধারণের বেলায় সুনির্দিষ্টতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রকৃতির নিজস্ব একধরনের সহজাত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যদিও আমরা ইলেকট্রনের ওপর মনোযোগ নিবদ্ধ করছি, অনিশ্চয়তার এই মূলনীতি সম্পূর্ণরূপে সরলীকৃত এবং সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

একইভাবে দেশ বিভাগ, আকাঙ্ক্ষা এবং শ্রমের ‘তিনটি জগতের’ মধ্যে দুটিকে বাদ দিয়ে শুধু একটির ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে ‘অন্যের’ ধারণা বোঝার ক্ষেত্রে বিকৃতি ঘটতে পারে। এই তিনটি জগত্ (এ রকম আরও থাকতে পারে) এক বৈচিত্র্যমণ্ডিত জটিলতায় পরস্পর সংঘবদ্ধ। সবশেষে জ্ঞানতাত্ত্বিক। এই প্রবন্ধে কোনো পরিচিত বিষয় স্বীকার করার ব্যাপারে একজন আমজনতার সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা বা গণমাধ্যমে কোনো পার্থক্য করা হয়নি। এর বিপরীত যেকোনো মতই ‘অন্যের’ একটি বিকৃত মূর্তি উপস্থাপন করবে এবং এটা আনুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিক এবং ব্যক্তিগত কল্পনা এবং আচরণ দ্বারা অবহিত এবং প্রভাবিত।

দেশ বিভাগের (Partition) জগত্

কলকাতার লিটল রাসেল স্ট্রিটে আমার সঙ্গে দেখা হওয়া নিখিল, যিনি পেশায় একজন নাপিত, আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘দেশ বিভাগ শুরুতেই আমাদের আঘাত করেছিল।’ তিনি আসলেই কি ১৯৪৭ সালের কথা বলছিলেন? নিখিল পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমান বাংলাদেশ থেকে ১৯৭১ সালে পালিয়ে যাওয়ার পর আর ফিরে আসেননি। নিখিলকে আমি দুবার বিভক্ত বলতে পারি। ১৯৪৭ সালের পর জন্মগ্রহণ করা সত্ত্বেও তাঁর মা-বাবার কাছ থেকে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময়ে মানুষকে কী কষ্ট সহ্য করতে হয়েছিল তিনি তা শুনেছেন। কিন্তু তার পরও শোনার অনেক বাকি ছিল। তখন মানুষকে এক বিভীষিকাময় সময় পার করতে হয়েছে, যাঁরা পরস্পর শত শত না হলেও বছরের পর বছর পাশাপাশি বাস করে আসছিলেন। তাঁর স্বদেশে পাকিস্তানি শাসনামলে পরিস্থিতি প্রায় একই ছিল, যেখানে প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্বে সংখ্যাগুরু মাস্তানদের আধিপত্য স্বাভাবিক জীবন নষ্ট করে দিয়েছিল। এপ্রিল, ১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তানি সেনারা তাদের মফস্বল শহর আক্রমণ করে, তখন তাঁর পক্ষে সেখানে টিকে থাকা সম্ভব হয়নি। বৃদ্ধ মা আর তরুণী বোনের হাত ধরে তাঁকে এক রাতে সীমান্ত পার হতে হয়েছিল। তিনি আর এই দেশে ফিরে না আসার সিদ্ধান্ত নেন। নিখিলের দিক থেকে চিন্তা করতে গেলে বাংলাদেশ তাঁর জন্য এক ভীতিকর ভাবমূর্তির জগত্।

ফরিদা বেগম তাঁর স্বামীকে নিয়ে কথা বলতে সংকোচ বোধ করেননি। জহিরুদ্দীন কলকাতার প্রান্তভাগের একটি ছোট শহরে প্রশাসনিক চাকরি করতেন। ১৯৫০-এর দশকের প্রথম দিকে স্থানীয় তরুণেরা তাঁর বাসায় ঢিল ছুড়েছিল। এই ঘটনার পর জহিরুদ্দীন তাঁর চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। ভারতে যাঁরা থেকে যেতে চেয়েছিলেন, তিনি তাঁদেরই একজন ছিলেন, এমনকি ১৯৪৭ সালের নৃশংসতার পরও। কিন্তু তরুণদের (তিনি পরে যাদের মজা করার ভঙ্গিতে ‘ভারতের ভবিষ্যত্’ বলতেন) ঢিল ছোড়ার এই ঘটনা তাঁকে বিচলিত করে তুলেছিল এবং ঠিক পরের দিন সকালে তিনি ওই জায়গা ছাড়ার ইচ্ছার কথা তাঁর পরিবারকে জানান। রাজশাহীর সীমান্ত অঞ্চলে কিছুদিন থাকার পর তাঁরা পরিশেষে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বাস করা শুরু করেন। আদিনিবাস ত্যাগের দিনের অস্থিরতা এবং বিষণ্নতা জহিরুদ্দীন তাঁর বাকি জীবনে আর কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তাহলে ১৯৭১ সালে ভারতে ১০ মিলিয়ন শরণার্থীর আশ্রয় গ্রহণ এবং বাংলাদেশের জন্মের ব্যাপারে কী বলবেন? ফরিদা কিছুক্ষণ থেমে বললেন, ‘আমার মনে হয় সে কখনো তার মন থেকে ওই উচ্ছৃঙ্খল তরুণদের মুখগুলো মুছে ফেলতে পারেনি।’ আরেকটি উচ্ছেদ, ‘অন্যের’ আরেকটি ভীতিকর ভাবমূর্তি।

‘অন্য’ বোঝাতে কিছু বৈসাদৃশ্য চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু নিজেদের আলাদা রাখতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত কিছু একই ধরনের আকাঙ্ক্ষার কথা সবাই বলে বসেন। নিখিল ও ফরিদার একই ধরনের মর্মভেদী অভিজ্ঞতা ছাড়াও একটি বিষয়ে সাদৃশ্য রয়েছে। তাঁরা উভয়ই তাঁদের দুর্দশার চূড়ান্ত ফলাফলকে অর্থাত্ জাতিরাষ্ট্র গঠনকারী ভৌগোলিক সীমারেখাকে চ্যালেঞ্জ করে যান। তাঁদের পূর্বতন এবং বর্তমান আবাসস্থলের মধ্যে দেয়াল উঠলেও তাঁরা তা ভুলে তাঁদের পূর্বতন আবাসস্থলকে বেশ মমতার সঙ্গেই ‘আমার দেশ’, ‘জন্মভূমি’ বা ‘আমার গ্রাম’ বলে অভিহিত করছেন। তাঁরা ভুলে যান যে তাঁদের পূর্বতন বাসভূমিতে যেতে হলে তাঁদের বর্তমানে পাসপোর্ট, ভিসা, শুল্ক বিভাগের সম্মতি এবং এনওসি প্রয়োজন হবে। এমনকি নিজ দেশের মুদ্রার পরিবর্তে ডলারও জমা দিতে হতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এটা বড়জোর নিজের ভূমিতে একটি ভূখণ্ডবন্দী ভ্রমণ হবে।

মজার বিষয়, মুক্তিসংগ্রাম এবং উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের নেতারা মানুষের চেয়ে ভূখণ্ডকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। যেমন বাংলা বিভাগের সময় কংগ্রেস জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বিবেচনা না করে ভূখণ্ডভিত্তিক বিভাগের প্রস্তাব দিয়েছিল। কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের জন্য অখণ্ড বাংলার মোট ভূমির ৫৫.৪১ শতাংশের বিপরীতে জনসংখ্যার ৪৬.৫৭ শতাংশ এবং পূর্ব বাংলার জন্য ৪৪.৫৯ শতাংশ ভূমির বিপরীতে ৫৩.৩৩ শতাংশ জনসংখ্যা প্রস্তাব করে। কিন্তু এটা সমস্যার সমাধান এনে দেয়নি। কারণ, জনসংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে দেশ বিভাগ কখনো সম্পূর্ণ হতে পারে না। এমনকি কংগ্রেসের প্রস্তাবমতেই ২৩ শতাংশ মুসলিম পশ্চিমবঙ্গে থেকে যেত এবং তার চেয়ে সামান্য কম হিন্দুধর্মাবলম্বী থেকে যেত পূর্ব বাংলায়। কিন্তু এরই মধ্যে অংশত সাম্প্রদায়িকতা এবং অংশত শ্রেণি ও বর্ণের ভিত্তিতে ‘অন্যের’ ধারণা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। কংগ্রেসের মতে, বাংলার সংখ্যাগুরু জনসংখ্যা নিয়ে তৈরি এই ‘অন্য’ অপেক্ষাকৃত ছোট ভূখণ্ডে বসবাস করতে সক্ষম এবং পূর্ব বাংলায় যাঁরা থেকে গিয়েছিলেন (প্রধানত নিম্নবর্ণের হিন্দুধর্মাবলম্বী), সাবেক কংগ্রেসি এবং বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত আইনজীবী বাবুভূষণ কিছুটা হতাশা নিয়ে যেমনটা বলেছিলেন, ‘তারা দুর্ভাগা’ এবং তাদের জন্য এর চেয়ে ভালো কিছু করা যাবে না।

মুসলিম লীগের নীতিগত অবস্থান নিয়েও—বিশেষত পূর্ব বাংলার মুসলমানদের বিষয়ে—একই রকম যুক্তি উপস্থাপন করা যেতে পারে। প্রচলিত আছে মাউন্টব্যাটেন বলেছিলেন মুসলিম লীগ আপাতত একটি ‘ভালো সমঝোতায় পৌঁছেছে, যেখানে পূর্ব বাংলার চেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের স্বার্থই অধিক’। পূর্বাংশের ছিটমহলগুলো আরও সমস্যার সূত্রপাত করেছিল। বাংলাদেশ ও ভারতের ২২৫টি ছিটমহল রয়েছে। এর মধ্যে ১১৯টি বিনিময়যোগ্য ভারতীয় ছিটমহল (১৭,১৫৭.৭২ একর) বাংলাদেশে অবস্থিত। বাকি ১১টি (৩৭৯৯.৩৫ একর) অবিনিময়যোগ্য ছিটমহল। এগুলো বিনিময়যোগ্য নয়, কারণ এগুলোর ওপর ভারতের নিয়ন্ত্রণ নেই বা প্রবেশের কোনো পথ নেই। ভারতে বাংলাদেশের ছিটমহল মোট ৯৫টি। এর মধ্যে ৭২টি (৭,১৬০.৮৫ একর) বিনিময়যোগ্য এবং প্রায় ৫,১২৮.৫২ একর বিনিময়যোগ্য নয়। শুধু জনসংখ্যাতাত্ত্বিকভাবেই নয়, ভূখণ্ডগতভাবেও দেশ বিভাগ নিশ্চিতভাবে অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। তার পরও ভূখণ্ড নিয়ে আবিষ্টতা চলছেই, যা মানুষকে শুধু সীমান্তের বাইরের অপর রাষ্ট্র নয়, নিজ রাষ্ট্রেও আতঙ্কিত করে তুলছে। স্বদেশের ভূখণ্ডেই তারা আতঙ্কগ্রস্ত। ১৯৪৭ সালের পর ভারত ও পাকিস্তান ভিন্নভাবে তাদের রাজনীতি পরিচালিত করে এবং একই সঙ্গে পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে পরিবর্তন আসে। পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে এই পরিবর্তন সীমান্তের দুই পাশের বাংলার মানুষের চিন্তার ভিন্নতার বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে কিছুটা সাহায্য করে। রাজনীতিকে সামরিকায়ন এবং ধর্মের উর্দি পরানোর কারণে পূর্ব পাকিস্তানিরা পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে একটি প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক অস্থিরতায় উপনীত হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে গণহত্যা এবং বাংলাদেশের রক্তস্নাত জন্মের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়। তাত্ক্ষণিক অভিজ্ঞতার কাছে পূর্বেকার দুর্দশাগুলো অংশত ঢাকা পড়ে যায়। ১৯৪৭ সালের চেয়ে ১৯৭১ সালই তাদের বেশি তাড়া করে বেড়ায়। বাস্তবে, যখন সহিংসতার বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছিল, চটজলদি ফরিদা ১৯৭১ সালের কথা বলা শুরু করেছিলেন; মনে হচ্ছিল, যেন ১৯৪৭ সাল নিয়ে আর কিছু বলার নেই। কিন্তু ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট শনাক্তযোগ্য পার্থক্য উল্লেখ করা যায়।

নিখিল না ফিরলেও যাঁদের বাবা-মা বা দাদা-দাদি পূর্ব বাংলা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন বা যাঁরা এত ছোট বয়সে পূর্ব বাংলা ছেড়েছিলেন যে তাঁদের আজ আর কোনো কিছুই মনে নেই, তাঁরাও বাংলাদেশে আসতে চান, শুধু এটা দেখতে যে তাঁদের মা-বাবা এবং দাদা-দাদিরা কী নিয়ে এত বেশি স্মৃতিকাতর ছিলেন। প্রদীপ এই লক্ষ্য নিয়েই ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ ভ্রমণে এসেছিলেন এবং তিনি বরিশালের স্বরূপকাঠির সেই বিশুদ্ধ সবুজাভ বাতাসে নেওয়া নিঃশ্বাস এখনো অনুভব করেন। এই বিষয়টা বাংলাদেশিদের কাছে সুস্পষ্টভাবে ভিন্ন। ১৯৭১ সালের বিভীষিকার সম্মুখীন হয়ে এবং জাতির নতুনত্ব্বের উত্তেজনায় বাংলাদেশিরা তাঁদের প্রাত্যহিক স্মৃতি থেকে আগেরকার বিষয়গুলো ত্যাগ করেছেন। আনিসুজ্জামান ১৯৪৭ সালে ১০ বছর বয়সে তাঁর মা-বাবার সঙ্গে কলকাতা ছেড়েছিলেন। যেমনটি তিনি আমেনা মহসিনের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনে বিবৃত করেছেন:

আনিসুজ্জামান তাঁর পৈতৃক বাড়ির জন্য কখনো অতীতবিধুরতায় ভোগেননি। তিনি শুধু একবার চব্বিশ পরগনায় বেড়াতে গিয়েছিলেন এবং ওই সময়েই তাঁদের পুরোনো বাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে এসেছিলেন। তাঁরা কলকাতার যে বাড়িতে থাকতেন সেটার পাশ দিয়ে তিনি বহুবার গিয়েছেন কিন্তু কখনো বাড়িটির ভেতরে প্রবেশ করেননি। তিনি কখনো বাড়িটি ঘুরে দেখার ইচ্ছা বা কৌতূহল বোধ করেননি। তিনি বাড়িটির বর্তমান বাসিন্দাদের জ্বালাতন করাও সমীচীন মনে করেননি। তিনি তাঁর পুরোনো বিদ্যালয়ের পাশে গিয়েছিলেন কিন্তু এ ক্ষেত্রে অতীতবিধুরতার চেয়ে কৌতূহলই বেশি ছিল। বিদ্যালয়টি এখন একটি নতুন স্থানে স্থানান্তর করার ফলে তিনি আর পুনরায় যাওয়ার চেষ্টা করেননি।১০

অন্যদিকে, ১৯৭১ সালে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ফিরে আসা বাঙালি মুসলমানরা আর ‘শরণার্থী’ ছিলেন না। বরং, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের পক্ষ নেওয়া এবং বাংলাদেশের জন্মের পর পাকিস্তানে ফিরে যেতে ইচ্ছুক বিহারি এবং আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ‘শরণার্থী’ নামকরণ করা হয়েছিল। নতুন সৃষ্ট রাষ্ট্র জনসাধারণের চেতনায় ১৯৪৭ সালের স্মৃতি জিইয়ে রাখার কোনো কারণ দেখেনি। আরও নতুন ও বেদনাদায়ক ইতিহাস আগের ইতিহাসের স্থান দখল করে নিয়েছিল।

ভারতীয় এবং পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের মধ্যে শরণার্থী সিনড্রোম থেকে যায়। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং ভারতের আরও অনেক অংশে এখনো ‘রিফিউজি কলোনি’ আছে। কিন্তু অপচ্ছায়াটি ছিল অতিসম্প্রতি সময়ের। ‘এটা কি সত্য নয় যে ১৯৭১ সালে প্রায় ১০ মিলিয়ন মানুষ শরণার্থীতে পরিণত হয়েছিল?’ ‘১ মিলিয়ন শরণার্থী কি থেকে যায়নি?’ ‘এটা কি অনেকটা ১৯৪৭ সালের পুনরাবৃত্তি ছিল না যখন দলে দলে শরণার্থীরা আমাদের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিল?’ ‘বাংলাদেশিরা—যারা ক্রমবর্ধমান হারে সংখ্যাগুরু এবং বাঙালি মুসলমানে পরিণত হচ্ছে—তারা কি দারিদ্র্যপীড়িত এবং প্রায় অপর্যাপ্ত ভূখণ্ডে নিজেদের আবদ্ধ রাখতে পারবে?’ এগুলো হচ্ছে কলকাতা এবং দিল্লিবাসীর কতগুলো সাধারণ পর্যবেক্ষণ এবং এর সবটুকু সত্যতাবর্জিত নয়, কেননা পুরোনো ভাবমূর্তির ওপরই নতুন ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালের ‘অন্যদের’ ধারণা ১৯৭১ সাল-পরবর্তী ‘অন্যের’ ধারণার মধ্যে দৃঢ়তর হয়।

আবারও সেই ভূখণ্ডকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তই হলো এবং এবার ভূখণ্ডে কঠিন ও সত্যিকারের দেয়াল নির্মাণের মাধ্যমে। মূলত বেসামরিক ধাঁচের ‘প্রাচীরবন্দী মানসিকতা’ সামরিক আক্রমণ ঠেকাতে নয়, মানুষকে বিভক্ত করার নিমিত্তে তৈরি হয়। এটা বেশ কিছু সময় ধরে আধুনিকতাবাদী চিন্তা-চেতনার অংশে পরিণত হয়েছে। বার্লিন ওয়াল, বেলফেস্ট ওয়াল এবং এমনকি সম্প্রতি নির্মিত ওয়েস্ট ব্যাংক বেরিয়ার ‘অন্যের’ ভাবমূর্তিকে ভূখণ্ডবন্দী করার মাধ্যমে মানুষকে বিভক্ত করার প্রচেষ্টাই ছিল।১১ এর মধ্যে কিছু প্রাচীর ব্যর্থ ও ভেঙে ফেলা হলেও অন্যদের নতুন করে প্রাচীর নির্মাণের প্রচেষ্টা থেমে নেই। একবার এই মানসিকতা আত্মস্থ হয়ে গেলে এর থেকে মুক্তি নেই। ইহুদিরা বাস্তবিক অর্থেই নািসদের দ্বারা জার্মানি এবং পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন অংশে দেয়াল ও বেড়াবন্দী ছিল। কিন্তু এটা তাদের ফিলিস্তিনে নতুন দেয়াল নির্মাণ থেকে বিরত রাখতে পারেনি। একজন কীভাবে তার ভূখণ্ডের সীমানার ঠিক ওপারের ‘অন্যদের’ সম্পর্কে জানতে পারবে, বিশেষত যখন ‘অন্যরা’ আধাস্বীকৃত এবং প্রচলিত মতানুসারে গোপনে সীমান্তবর্তী শহর, গ্রাম এবং তার বাইরেও বিদ্যমান পার্থক্যগুলো রহিত করার কাজে যুক্ত থাকে? যদি আধুনিকতাবাদী ডিসকোর্সের ভূখণ্ডকেন্দ্রিকতাকে গুরুত্ব দিই এবং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিই, তাহলে সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ এবং বেড়া দেওয়া একটি বিয়োগান্ত এবং প্রহসনমূলক বিকল্প। আমি এখানে অবশ্যই মার্ক্সের ধ্রুপদি উক্তি স্মরণ করব, ‘ইতিহাস ফিরে আসে দুবার—প্রথমবার বিয়োগান্ত রূপে, দ্বিতীয়বার প্রহসন রূপে।’ কিন্তু এখানেই শেষ নয়।

ভারতীয় সরকার তার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ১,১৩৪ কোটি রুপি ব্যয়ে পুরো ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং প্রকল্পটি মার্চ ২০০৭ সালে সম্পন্ন হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। বাংলাদেশকে বেড়াবন্দী করার জন্য সীমান্তে বেড়া নির্মাণ (২৪০৯ কিলোমিটার) এবং রাস্তা নির্মাণ (৭৯৭ কিলোমিটার) করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বেড়া নির্মাণ সবচেয়ে বেশি হবে পশ্চিমবঙ্গে (১০২১ কিলোমিটার) এবং সর্বনিম্ন হবে আসামে (৭১.৫ কিলোমিটার)। ত্রিপুরায় ৭৩৬ কিলোমিটার, মিজোরামে ৪০০ কিলোমিটার এবং মেঘালয়ে ১৯৮ কিলোমিটার সীমান্তে বেড়া নির্মাণ করা হবে।১২ প্রাচীরবন্দী এবং সামরিক বেষ্টনীঘেরা ‘অন্যরা’ এখন কোথায় যাবে? গুয়াহাটির ফটোসাংবাদিক সিং আমাকে বলেছিলেন, ১,১৩৪ কোটি রুপির বেড়া কাটতে মাত্র ১০ রুপির (একটি কাঁচির মূল্য) প্রয়োজন। তিনি আরও বললেন, কে কাকে শোষণ করছে? যেহেতু স্থানীয়রা কথিত ‘অবৈধ অভিবাসীদের’ তীব্রভাবে শোষণ করছে (নিম্ন বেতন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অমানবিক জীবনযাত্রার অবস্থা এবং এ রকম আরও অনেক), তাই বাংলাদেশের উচিত ভারতের কাছে শ্রমিকদের সময় ও শ্রমের ক্ষতিপূরণ দাবি করা। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, সীমান্তে এই বেড়া নির্মাণ আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে প্রস্তাবিত জনসংখ্যা বিস্ফোরণ—বিশেষত অন্যদের—কি রোধ করতে পারবে? সমালোচকেরা বোধ হয় ভিন্নমত পোষণ করবেন।

এই বিষয়ে তিনটি ভাগে যুক্তি উত্থাপন করা হয়। প্রথমটি যৌক্তিক সামঞ্জস্যহীনতা। ১৯৯২ সালেই মুচকুন্দ দুবে বিষয়টি সবার দৃষ্টিতে এনেছিলেন:

প্রথমেই ভারতের সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী এই মিথ্যা ছড়াতে থাকে যে অধিকাংশ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিন্দু এবং এই হিন্দুরা নৃশংসতার শিকার হয়েই বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু অনুপ্রবেশের সময় ধরা পড়া এবং যাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে তাদের সংখ্যাকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করলে সম্পূর্ণ ভিন্নচিত্র পাওয়া যায়। বাংলাদেশ-পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে ভারতে অনুপ্রবেশের সময় ধরা পড়াদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমানের অনুপাত ছিল প্রায় ৬০:৪০ এবং বাংলাদেশ-আসাম সীমান্তে তা প্রায় ২৫:৭৫। এখন এই একই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী বলছে যে বাংলাদেশ থেকে মুসলমানরা পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের কাছাকাছি জেলাগুলোতে এসে ভিড় করছে এবং প্রায় দিল্লি পর্যন্ত চলে আসছে। এই কথারও খুব সামান্যই বাস্তবিক ভিত্তি রয়েছে। তা ছাড়া, এই বিবৃতি দুটি একটি অপরটিকে বাতিল করে দেয়।১৩

দ্বিতীয়টি হচ্ছে আদমশুমারি। ১৯৯১ সালের আদমশুমারির আপাত তথ্যগুলো ১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে উন্মুক্ত করা হয়। এখান থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে গুয়াহাটির রবিজিত্ চৌধুরী নিচের প্রতিবেদনটি তৈরি করেছিলেন:

১৯৯১ সালের আদমশুমারির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু আপাত জনসংখ্যার আকার বাংলাদেশ থেকে আসামে একটি বড় জনস্রোত প্রবেশ করছে মর্মে যে সাধারণ ধারণা তা সমর্থন করছে না...

আদমশুমারি অনুসারে ১৯৭১-১৯৯১, এই দুই দশকে সর্বভারতীয় ৫৩ শতাংশের বিপরীতে আসামে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ৫২.৪৪ শতাংশ। এই দুই দশকে আসামে জনসংখ্যা ৭,৬৬৯,৪১০ জন বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা ১৯৮৭ সাল থেকে দুই থেকে তিন মিলিয়ন বাংলাদেশি ভারতে অনুপ্রবেশ করেছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যে দাবি তা নাকচ করে দেয়।১৪

শেষ তর্কটি অভ্যন্তরীণ অভিবাসনবিষয়ক। কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের সামির গুহ রায়ের মতে, অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যাটি ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অতিরঞ্জিত’। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ এবং বাংলাদেশের মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং হ্রাসের হারের তুলনামূলক পর্যালোচনা করার পর, রায় বলেন:

জনসংখ্যাতাত্ত্বিক পরিসংখ্যান সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করার পর চূড়ান্তভাবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা সমস্যার জন্য বাংলাদেশি শরণার্থীরা দায়ী নয়; বরং পার্শ্ববর্তী প্রদেশগুলো থেকে ব্যাপক হারে আসা অভিবাসীরাই দায়ী...১৯৮১-৯১ সালের মোট ১৬ লাখ অভিবাসীকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসা অভিবাসীর সংখ্যা ৯.১ লাখ; বাকি প্রায় সাত লাখ লোক এসেছে ভারতেরই অন্যান্য প্রদেশ থেকে। অর্থাত্ এই দশকে বার্ষিক গড়ে প্রায় ৯১ হাজার বাংলাদেশি আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করেছে কিন্তু এর মধ্যে কতজনকে চিহ্নিত করা গেছে এবং কতজনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, তা জানা যায়নি। সম্ভবত এই অভিবাসীদের একটি অংশ নিজেদের ইচ্ছাতেই তাদের আদি-নিবাসে ফিরে গিয়েছিল।১৫

বিতাড়ন ইস্যুতে বলতে গিয়ে সিপিআই(এম) সদস্য হান্নান মোল্লা প্রায় রায়ের যুক্তিকেই বর্ধিত করে একবার সংসদে বলেছিলেন, ‘মহারাষ্ট্র থেকে বিতাড়িত অধিকাংশ বাংলাভাষী মানুষ হাওড়া এবং পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য জেলা থেকে মহারাষ্ট্রে চলে গেছে।’ তিনি আরও অভিযোগ করেছিলেন, ‘কারাবন্দী বাংলাভাষী মানুষদের মুক্তির বিনিময়ে প্রত্যেকের কাছে পুলিশ সাধারণত ২০০০ থেকে ২৫০০ রুপি দাবি করত। তা দিতে ব্যর্থ হলে পুলিশ তাদেরকে ১০-১৫ দিন আটকে রেখে সীমান্তে নিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়’।১৬ কিন্তু তা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা ৯.১ লাখ। যেমনটি একজন পর্যবেক্ষক সম্প্রতি বলছিলেন:

এটা সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে সস্তা বিদেশভ্রমণ। যদি আপনি বাংলাদেশি হয়ে থাকেন তাহলে ২০০০ রুপির কম খরচে টুর অপারেটরের খরচ মিটিয়ে আপনি ভারতে একটি নিরাপদ যাত্রা ও একটি ভবিষ্যত্ কিনে নিতে পারেন। সামান্য কিছু বিষয় পরিবর্তন করলে আপনি আপনার পছন্দমতো ভারতের যেকোনো অংশে স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে ভোটব্যাংকের অংশ হিসেবেও দেখতে পাবেন। যেহেতু একজন বাংলাদেশি সাংস্কৃতিকভাবে একজন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির মতোই তাই তিনি খুব সহজে একজন ভারতীয় হয়ে উঠতে পারেন। যা আবার ২০০ রুপির কম মূল্যের নকল রেশন কার্ডের মাধ্যমে খুব দ্রুত সুরক্ষিত হয়।

বছর পরিক্রমায় অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে। পুলিশের হিসাবমতে, ভারতে অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা এক কোটির ওপরে। তবে এই সংখ্যা আরও বাড়বে। সংগতভাবেই সীমান্তে কড়া নজরদারির মাধ্যমে অনুপ্রবেশ প্রতিহত করে সমস্যাটি অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার আহ্বান জানানো হয়েছে।১৭

‘অন্যরা’ আবারও ‘পুলিশের ধারণা’ এবং ‘এক কোটির বেশি’ শব্দসমূহের সাহায্যে প্রকাশিত হলো। এখানে এটা দাবি করা হচ্ছে না যে অবৈধ অভিবাসীর অস্তিত্ব নেই, যদিও ‘অবৈধ’ শব্দটির ব্যবহার এখানে সঠিক নয়। কারণ অবৈধতার প্রশ্ন আসে কেবল বৈধ কোনো কিছুর বিপরীতে। বাংলদেশ ও ভারত, এমনকি পাকিস্তানের বেলাতেও বিয়ে ব্যতীত (এটাও একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং আমরা যদি সুষমা স্বরাজ এবং বিজেপিকে বিশ্বাস করি, তাহলে এমনকি সোনিয়া গান্ধীও এই শর্ত পুরোপুরি পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন) কোনো বৈধ অভিবাসন হতে পারে না। নেহরু-লিয়াকত প্যাক্ট এবং দুই দশক পরের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি, উভয়ই নাগরিকত্বের বিষয়টিকে ভূখণ্ডবন্দী এবং অবরুদ্ধ করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় অভিবাসন শুধু অবৈধ জগতেই সম্পন্ন হয়। মজার বিষয়, ভারতের ক্ষেত্রে এর একটি অদ্ভুত ব্যতিক্রম রয়েছে। নেপালের যে গোর্খারা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়, তাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব লাভের সুযোগ রয়েছে।১৮ সরকার এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের ক্ষমতা এবং গণতন্ত্রের জন্য এটাই যথেষ্ট। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে মানুষের চলাচল বা অভিবাসন না থাকা হবে অস্বাভাবিক ব্যাপার। যদি এই দুই দেশের মধ্যকার মানুষের যাতায়াত কখনো বন্ধ হয়, তবে ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ই নিষ্ফলা হয়ে যেতে পারে। যেহেতু ন্যায়ের দরজা বন্ধ, তাই একমাত্র পথ হচ্ছে দেশ বিভাগের এই ভূখণ্ডকেন্দ্রিক ‘টুর অপারেটর’ নামক দালালের মাধ্যমে বিশ্বকে অগ্রাহ্যকারী কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া এই সীমান্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে পার হওয়া।

আকাঙ্ক্ষার জগত্

এটা ভালো যে ১৯৭১ সালে সীমান্ত পার হতে নিখিল ও তার পরিবারের ‘টুর অপারেটরের’ প্রয়োজন হয়নি। তাহলে এটা নিখিল ও তার বোনকে কামাসক্তির জগতে নিয়েও যেতে পারত। ‘নিয়োগ, ট্রানজিট এবং সংগ্রহ’ এলাকা বলে চিহ্নিত ২৫০ গ্রামে পরিচালিত বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবছর সাত হাজারের ওপর নারী ও শিশু ভারত ও পাকিস্তানে পাচার হচ্ছে।১৯ এই রিপোর্টের তথ্যমতে, প্রতিদিন গড়ে কমপক্ষে এক ডজন বাংলাদেশি নারী পাচার হচ্ছে। একবার কলকাতা পৌঁছানোর পর—যেমনটা একজন গবেষক উল্লেখ করেছেন—এই ‘মেয়েদের কয়েক শ থেকে প্রায় ১০,০০০ রুপি মূল্যে পর্যন্ত বিক্রি করা যেতে পারে।’২০ অন্যদিকে, সব নারীই শেষ পর্যন্ত পতিতালয়ে বা যৌনদাসী হিসেবে বিক্রি হয়ে যায় না। পাচারকৃত নারীদের অনেকে শেষ পর্যন্ত অবৈধ শ্রমিক, দাস শ্রমিক, অবৈধ বিয়ে, শিশু-পালিকা হিসেবে কাজ করেন; এমনকি অনেকে অঙ্গ-ব্যবসার শিকার হন।২১ প্রায়ই এক ধরনের পাচার অন্য ধরনের পাচারকে সাহায্য করে, যেমনটি এক সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: বিবেচিত আইন কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত না হলেও সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য ‘পাত্রী-বাণিজ্য’ ভারতসংলগ্ন পশ্চিমের অঞ্চলবর্তী সীমান্তে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিবাহযোগ্য বয়সের মেয়েদের ভারতীয় স্বামী গ্রহণে এবং এরপর সীমান্ত পার হয়ে নানা রকম অসামাজিক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে।২২

এর ফলে অনেকে যৌন দাসে পরিণত হচ্ছে। এর পেছনে উপযুক্ত কারণও আছে। শুধু কলকাতাতেই প্রতিদিন ৬০ থেকে ৮০ হাজার লোক যৌনসঙ্গী ভাড়া করে।২৩ যদিও যৌন দাসত্বের শিকার নারীরা হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে এই জগতে প্রবেশ করেছে, কিন্তু এ রকম একটি বড় চাহিদাই নারী পাচারকে চাঙা রেখেছে।

 

কিন্তু আধুনিক সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য অনুসারে সামষ্টিক আকাঙ্ক্ষাও এখানে কাজ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ শ্রীঅরবিন্দ এটা অস্বীকার করেননি, যদিও এটা ভারসাম্যহীন এবং কনস্ট্রাকটিভিস্ট হতে পারে। ১৯২৬ সালে যখন ভারতে মুসলমানদের আত্তীকরণের সম্ভাবনা সম্পর্কে মতামত চাওয়া হয়েছিল, অরবিন্দ বেশ স্পষ্টভাবে বলেছিলেন:

‘কেন নয়? গ্রিস, পারস্য এবং অন্যান্য জাতি থেকে নানা উপাদান ভারত আত্তীকরণ করেছে। কিন্তু ভারত তখনই গ্রহণ করেছে যখন অন্য পক্ষ ভারতের কেন্দ্রীয় সত্যকে স্বীকার করেছে এবং সে এমনভাবে গ্রহণ করেছে যে গ্রহণের পর তা বিদেশি উপাদানের পরিবর্তে ভারতের নিজস্ব সত্তার অংশে পরিণত হয়েছে...। মানসিকভাবে মুসলিম সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে আত্তীকরণ করা হয়েছে এবং এটা আরও অনেক দূর হয়তো ঘটতে পারত। কিন্তু এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার জন্য মুসলিম মানসিকতায় পরিবর্তন আসা প্রয়োজন। বাহ্যিক জীবনে দ্বন্দ্ব রয়ে গিয়েছে এবং মুসলমানরা সহনশীলতা না শেখা পর্যন্ত আত্তীকরণ সম্ভব বলে মনে করি না।’২৪

এটা মোটেও বিস্ময়কর ছিল না যে মুসলমানদের ‘অন্যের’ দৃষ্টিতে দেখার কারণে শেষ পর্যন্ত অরবিন্দ ‘হিন্দু-রাষ্ট্র ধারণার পুস্তিকা রচয়িতা’ এবং ‘জিহাদি হিন্দুত্ববাদ ও রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদের’ মতাদর্শের প্রচারক খেতাব পেতে পারেন।২৫ অরবিন্দের মুসলমানদের আত্তীকরণ করার এবং ভারতীয় ভূখণ্ডকে হিন্দু ধর্মের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলার প্রত্যয়ের ফলে নতুন অনেক তর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অরবিন্দ শুধু একটি ইচ্ছা, মোহাবিষ্ট কল্পনা প্রকাশ করেছিলেন, যা সম্ভাবনার অতীত। কিন্তু অন্য যেকোনো আকাঙ্ক্ষার মতো এটা মানুষকে প্রলুব্ধ ও উন্মত্ত করেছিল এবং যখন এই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি, তখন মানুষকে ক্রোধ পেয়ে বসেছিল, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে নৃশংসতার মধ্য দিয়ে। কিন্তু মুসলমানদেরই কেন আত্তীকৃত হতে হবে এবং তাদের আকাঙ্ক্ষাকে শুরুতেই প্রত্যাখ্যান করতে হবে? ধর্ম ও সংস্কৃতিনির্বিশেষে সব মানুষই কি পরস্পর আত্তীকৃত হতে পারে না? সম্ভবত মওলানা আবুল কালাম আজাদ এটাই প্রত্যাশা করেছিলেন। ১৯৪০ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে রাষ্ট্রপতির ভাষণে আজাদ বলেছিলেন:

আমি একজন মুসলমান এবং আমি গভীরভাবে সচেতন যে আমি ইসলামের গত তেরো শ বছরের সুমহান ঐতিহ্য ধারণ করছি। আমি এই উত্তরাধিকারের একটি ছোট অংশও হারাতে চাই না...। একজন মুসলমান হিসেবে ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আমার একটি বিশেষ পরিচয় রয়েছে এবং এই বিষয়ে কোনো অন্যায্য হস্তক্ষেপ আমি বরদাশত করতে পারি না। কিন্তু এসব অনুভূতিসহ আমার আরও একটি গভীর চেতনা রয়েছে, যা আমার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নিয়েছে। ইসলামের আদর্শ এটিকে ব্যাহত করেনি বরং শক্তি জুগিয়েছে। আমি একইভাবে এই বিষয় নিয়ে গর্বিত যে আমি একজন ভারতীয়, ভারতীয় জাতিসত্তার এক অবিচ্ছেদ্য প্রয়োজনীয় অংশ, এর সামগ্রিক কাঠামোর একটি দরকারি উপাদান, যা ছাড়া এই মহান স্বপ্নসৌধ অসম্পূর্ণ। আমি আমার এই যৌক্তিক দাবি কখনো ত্যাগ করতে পারব না।২৬

কিন্তু মসজিদ এবং মাদ্রাসা তৈরি (অর্থাত্ দেবত্বকে পার্থিব বস্তুসমূহে অনুভবের আকাঙ্ক্ষা) যদি কোনো সূচক হয়, তবে এটা দেখা যায় যে ইতিহাস, আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে ভারতীয় ও বাংলাদেশিরা অরবিন্দ ও আজাদ উভয়কেই বেছে নিয়েছে। সেন্ট্রাল টাস্কফোর্স অন বর্ডার ম্যানেজমেন্ট কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্তের ভারতীয় দিকে ৯০৫টি এবং বাংলাদেশের দিকে ৯৬০টি মসজিদ রয়েছে। একইভাবে সীমান্তের ভারতীয় অংশে ৪৩৯টি এবং বাংলাদেশ অংশে ৪৬৯টি মাদ্রাসা আছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলাতেই শুধু ১৭২টি মসজিদ এবং ৫৫টি মাদ্রাসা রয়েছে; অন্যদিকে ৩০৫টি মসজিদ এবং ১০৪টি মাদ্রাসা সীমান্তের নানা অংশে ছড়িয়ে রয়েছে।২৭ প্রকৃতপক্ষে সীমান্তের উভয় পাশের মুসলমানরা আত্তীকৃত হতেও পারেনি (অরবিন্দের প্রস্তাব) আবার বোকার মতো আত্তীকরণ আশাও করেনি (আজাদের প্রস্তাব)। গোষ্ঠীবদ্ধ সেক্যুলার আকাঙ্ক্ষার চেয়ে ‘অন্যরা’ বুঁদ হয়ে আছে জীবিকার খোঁজে।

বিষয়টি এখানেই শেষ নয়, কারণ মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণের এই আকাঙ্ক্ষা সর্বত্রই দেশজ নয়। ‘ভিনদেশি সহযোগিতা’ ‘অন্যের’ প্রতিমূর্তি প্রচারকারীদের মধ্যে স্পন্দন তৈরি করে এবং এবার তা ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ নামক এক অস্পষ্ট যুক্তিতে। যেমনটি ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছিল:

এই মসজিদ এবং মাদ্রাসাসমূহ গালফ রাষ্ট্রসমূহ, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ থেকে ‘প্রচুর অর্থ সাহায্য’ পেয়ে থাকে। ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (জেদ্দা), পাকিস্তানের হাবিব ব্যাংক এবং গালফ রাষ্ট্রসমূহে বাস করা কিছু ভারতীয় মুসলমানের দ্বারা অর্থ সাহায্য এসব মসজিদ এবং মাদ্রাসা পেয়ে থাকে।২৮

দুর্ভাগ্যজনক হলেও এখানে যুক্তি হিসেবে দেখানো হচ্ছে যে তারা ‘ভারতীয় মুসলমান’ হতে পারে, কিন্তু গালফ রাষ্ট্রসমূহে বাস করে ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষা পূরণে তাদের কোনো অধিকার নেই। অথবা অন্যভাবে বলতে গেলে, যদি ‘ভারতীয় মুসলমানদের’ মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণের ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে হয়, তবে তাদের তা ‘মুসলিম পাকিস্তান’ বা ‘মুসলিম বাংলাদেশ’ রাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত।

নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা প্রায়ই ধ্বংসের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুগপত্ প্রকাশিত হয়, যদিও দুটিরই গন্তব্য একই। এই তর্কের দুটি দিক রয়েছে: একটি দিক বুদ্ধিবৃত্তিক এবং অন্যটি বাস্তব ও নৃশংস। বুদ্ধিবৃত্তিক দিকটি প্রথমে দেখা যাক। একবার দিল্লিতে বিজেপি শাসনামলে আমার সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়া এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিলেন: ‘আপনারা বাংলাদেশে সেক্যুলারিজমকে হত্যা করলেন কেন?’ এর উত্তর তৈরি করতে আমার এক বা দুই মিনিট লেগেছিল কিন্তু আমি খুব ভালোভাবেই জানতাম যে আমি যা-ই বলি না কেন ওই ব্যক্তিকে বাজপেয়ির ‘সেক্যুলারিজমের’ বিশ্বাস থেকে একচুলও নড়াতে পারতাম না। অন্যদিকে এই প্রশ্নকেও এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। যেমনটি তালুকদার মনিরুজ্জামান উল্লেখ করেছেন:

মুজিব তাঁর শাসনামলের শেষ দিকে ভাষণ এবং জনসমক্ষে কথাবার্তায় বিভিন্ন শব্দ ও বাক্যাংশের ব্যবহারের মাধ্যমে প্রায়শ ইসলামের উদাহরণ দিতেন, যা প্রধানত ইসলামমুখী বাংলাদেশিরাই ব্যবহার করত। তিনি আল্লাহ, ইনশা আল্লাহ, বিসমিল্লাহ, তাওবা এবং ইমানের মতো শব্দসমূহ ব্যবহার করতেন। পরবর্তী সময়ে এমনকি

মুজিব তাঁর জনপ্রিয় বিদায় প্রকাশের ভঙ্গি ‘জয় বাংলা’ ত্যাগ করেন এবং ভাষণের শেষে বিদায় জানানোর ঐতিহ্যবাহী ইন্দো-ইসলামিক শব্দগুচ্ছ ‘খোদা হাফেজ’

বলা শুরু করেন। তাঁর শাসনামলের শেষ দিকের ভাষণগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের

মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টার কথা মুজিব বিশেষভাবে উল্লেখ করতেন।২৯

জিয়াউর রহমান আর এক পা এগিয়ে বাস্তবিকভাবেই অনেক বাঙালি মুসলমানের আকাঙ্ক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করেন। মে, ১৯৯৭ সালে এক সরকারি প্রজ্ঞাপনের সংবিধান থেকে ‘সেক্যুলারিজমকে’ বাদ দেওয়া হয় এবং এর পরিবর্তে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসই হইবে যাবতীয় কার্যাবলীর ভিত্তি’ শব্দগুচ্ছকে সংবিধানে সংযুক্ত করা হয়।৩০ কিন্তু মনিরুজ্জামানের মতে, আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘বইগুলোকে ইসলামীকরণের জন্য নানা মহল থেকে পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের উপর চাপ বাড়তে থাকে এবং পরবর্তীতে বেশি করে ইসলামি বিষয়গুলো বইতে সংযুক্ত করা হয়’।৩১ এক পক্ষের উত্থানের জন্য অন্য পক্ষের ধ্বংসের প্রয়োজন হয়।

এই উদাহরণ কি বিজেপি এবং মুরলি মনোহর যোশীর চেয়ে খুবই ভিন্ন ছিল? লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটের পতন এবং কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ক্ষমতায় ফিরে আসার পর মীরা নন্দ ভারতের মুক্তচিন্তাবিদদের বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে পুরোপুরি পার্থক্যরেখা টানার আহ্বান জানান, যা যোশী বিপজ্জনকভাবে গুলিয়ে ফেলেন:

হিন্দুবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসীরা ‘হিন্দু ভারতকে’ ‘জাতিসমূহের গুরু’ হিসেবে তৈরি করার দাবি করেছে, কারণ একমাত্র হিন্দুত্ববাদই আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ; যেখানে অন্য সব ‘সেমেটিক’ বিশ্বাস আধুনিক বিজ্ঞানের দ্বারা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে...।৩২

এটা সেই অন্ধ বিশ্বাস যা ড. যোশী এবং তার গোড়া অনুসারীদের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈদিক জ্যোতিষবিদ্যা বিভাগ খোলার পেছনে উদ্বুদ্ধ করেছে

এবং যেখানে দুনিয়ার তাবত কুসংস্কারের পেছনে কর প্রদানকারীদের অর্থ

ঢালা হচ্ছে...।

এই অন্ধ বিশ্বাসকে নস্যাত্ করা ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত...। অসহনীয় কুসংস্কারের অস্তিত্বকে অস্বীকার এবং তীব্র হিন্দু ও আর্য বর্ণবাদী অতিস্বরের জন্য এটাকে আমাদের অবশ্যই নস্যাত্ করতে হবে।

কিন্তু বাস্তবে কাজটি এত সহজ নাও হতে পারে। নতুনতর চাহিদার ফলে হয়তো ‘অগ্রহণযোগ্য’ এবং ‘বিতর্কিত’ বিষয়সমূহ বহাল থাকবে। যেমনটি সম্প্রতি এক পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: এতে ‘বিতর্কিত’ ভাস্কর্যের তালিকা থাকা সত্ত্বেও ‘দশম শ্রেণির সামাজিক বিজ্ঞান বইটি অপরিবর্তিত রাখা যেতে পারে, কারণ যেহেতু আগামী বছর শিক্ষার্থীরা বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে তাই দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মনোযোগ নষ্ট করা উচিত হবে না’।৩৩ দক্ষিণ এশিয়ার নিয়ত পরিবর্তনশীল রাজনীতির কারণে কে জানে আগামী বছর কী ঘটবে? এটা অবশ্যই ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোটের চেয়ে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট মাত্র ৩০টা সংসদীয় আসনে পিছিয়ে থাকলেও, মোট ভোটের হিসাবে কিন্তু কিছুটা এগিয়েই আছে (বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটের ভোট ৩৫.৩১ শতাংশ এবং কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোটের ভোট ৩৫.১৯ শতাংশ)।৩৪

অন্য নস্যাত্করণটি আরও বেশি বাস্তব ও নৃশংস। প্রায় প্রতিটি দাঙ্গাতেই মন্দির ও মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছে। মাত্র তিনটি প্রতিবেদন দেখা যাক:৩৫

১. ১৯৯২ অযোদ্ধা: ৬ ডিসেম্বর ১৯৯২ সালে হাজার হাজার কারসেবক বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলেছিল...। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ফলে ভারতের বিভিন্ন অংশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয় এবং এর প্রতিক্রিয়া প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তান ও বাংলাদেশেও দেখা দিয়েছিল। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে হিন্দুবিরোধী দাঙা ছড়িয়ে পড়ে এবং এতে বেশ কিছু মন্দির আক্রমণ ও ধ্বংস করা হয়।

২. ২০০২ লোহারু: ১৭ মার্চ, ২০০২ সালে হরিয়ানার ভায়ওনি জেলার লোহারুতে সাম্প্রদায়িক দাঙা বাধে। এই দাঙার কারণ ছিল গরু জবাইয়ের গুজব। এতে হিন্দু সম্প্রদায়ের উচ্ছৃঙ্খল জনতার একটি দল দুটি মসজিদ আক্রমণ করেছিল। তারা সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের কমপক্ষে ১৫টি দোকান ও ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়...। হিন্দু সম্প্রদায়ের উচ্ছৃঙ্খল জনতা রেলস্টেশনের কাছে আরেকটি মসজিদও জ্বালিয়ে দেয়।

৩. ২০০২ হুগলি: ৫ এপ্রিল, ২০০২ সালে কলকাতার কাছে হুগলি জেলায় তিনটি মসজিদের বাইরে দুটি বোমা বিস্ফোরিত হয়েছিল। শুক্রবার নামাজের পরে ঘটা এই বিস্ফোরণে আটজন আহত হয়েছিল...। একজন দুষ্কৃতকারী একটি বোমা বহন করছিল, যেটি বিস্ফোরিত হয়ে সে নিজে মারাত্মকভাবে আহত হয়...। এই দাঙ্গায় একজন মারা যায়, সাতজন আহত হয় এবং ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বাংলাদেশেও একই অবস্থা বিদ্যমান। হিন্দুধর্মাবলম্বীদের ওপর প্রতিটি নৃশংসতার সময়ই মন্দিরের পবিত্রতা নষ্ট ও ধ্বংসের ঘটনা ঘটে। অক্টোবর, ২০০১ সালে নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে যখন বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় ফিরে এসেছিল, তখন ঢাকা, ফেনী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, খুলনা ও চট্টগ্রাম জেলায় বেশ কিছু মন্দির আক্রমণ এবং অপবিত্র করা হয়েছিল। এই ক্ষেত্রে ‘অন্যদের’ আকাঙ্ক্ষিত বস্তু ধ্বংসের একটি উন্মত্ত প্রতিযোগিতা এখানে দেখা যাচ্ছে এবং আরও করুণ বিষয় হচ্ছে সীমান্তের বাইরের ‘অন্যরা’ এখন ভেতরে অবস্থান করছে।

একবার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কর্মরত ছিলেন এমন এক অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস (ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস) কর্মকর্তা আমার সঙ্গে ‘অন্যদের’ বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন। একবার নির্বাচনের এক বা দুদিন আগে এক রাজনীতিবিদ তাঁর কাছে এসেছিলেন এবং কোনো রকম পাপবোধ ছাড়াই তাঁকে বলেছিলেন: ‘আপনাকে আগামীকাল সকালবেলা কিছু সময়ের জন্য সীমান্ত খোলা রাখতে হবে, সীমান্তের ওপার থেকে প্রায় ২০,০০০ লোক আমার দলের পক্ষে ভোট দিতে আসবে।’ ‘সীমান্ত খোলা রাখব?’ ওই কর্মকর্তা তড়িঘড়ি জিজ্ঞেস করেছিলেন। ওই রাজনীতিবিদ বলেছিলেন: ‘হুম, আপনি অন্য কোথাও ব্যস্ত থাকবেন, এই লোকগুলো সকালবেলা আসবে এবং সন্ধ্যাবেলার মধ্যে সবাই ফিরে যাবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এটা নিশ্চিত করব। চিন্তা করবেন না!’ তারপর তিনি কী করেছিলেন আমি জানতে চেয়েছিলাম। ‘অবশ্যই আমি ওই রাজনীতিবিদের অনুরোধের সঙ্গে একমত হতে পারিনি, কিন্তু এমন একটি প্রস্তাব রাখার সাহস দেখে আমি সম্পূর্ণ বিচলিত হয়ে পড়েছিলাম। সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি কতটা ভিন্ন তা বোঝা গিয়েছিল। এখন আমি জানি কেন মানুষ বলে, সীমান্তের আশপাশে শুধু সন্ত্রাসী দলগুলোই আস্তানা গড়ে!’ তাঁর অন্য গল্পটিও সমান তাত্পর্যপূর্ণ। একজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ভারতে এসে তাঁর পাসপোর্ট হারিয়ে ফেলেছিলেন। তাঁর ভারতীয় বন্ধুরা এক সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে ওই ব্যবসায়ীকে অবৈধভাবে একটি নতুন ভারতীয় পাসপোর্ট তৈরি করে দিয়েছিলেন। এরপর ওই ব্যবসায়ী বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে ফিরতি যাত্রার জন্য বাংলাদেশি ভিসা নেন। ঢাকায় পৌঁছানোর পর তিনি ভারতীয় হাইকমিশনে গিয়ে হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সত্য কথা বলে তাঁর নতুন ভারতীয় পাসপোর্ট সমর্পণ করেছিলেন! ওই আইপিএস কর্মকর্তার মতে, রাষ্ট্রীয় জটিলতা ছাড়াও ক্ষমতাবান ‘অন্যদের’ সাহায্য ছাড়া রাজনীতিবিদ বা ব্যবসায়ী কেউই তাঁদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে সফল হতেন না। কিন্তু এর অন্য দিকও আছে।

শ্রমের জগত্

দেশ বিভাগ ‘অন্যদের’ আকাঙ্ক্ষায় দোটানা সৃষ্টি করেছিল, যা অনেককে দেওয়া-নেওয়ার প্রাচীন ঐতিহ্যে নিয়োজিত রাখে। নিরাপত্তাকর্মী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সরকারের অন্যান্য দমনমূলক সংস্থার সার্বক্ষণিক নজরদারি সত্ত্বেও অনেকে এ ক্ষেত্রে বেশ সাফল্য অর্জন করে। তবে এখনো রাষ্ট্রীয় জটিলতাও বিদ্যমান, কারণ শ্রমই (আনুষ্ঠানিক/অনানুষ্ঠানিক, বৈধ/অবৈধ) হলো রাষ্ট্রের পুনরুত্পাদনের ভিত্তি। এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার আগে আমি শ্রমিক শোষণ এবং মুনাফা সর্বোচ্চকরণবিষয়ক একটি সুনির্দিষ্ট পরিবর্তনের দিকে দৃষ্টি দিতে চাই। এই পরিবর্তন সহজ জ্ঞানেই ‘অন্যদের’ ভয়ানক ভাবমূর্তিকে দৃঢ়তর করেছে। আমি অবশ্যই বিশ্বায়নকে নির্দেশ করছি।

বিশ্বায়ন জ্ঞান এবং আচরণের বহু জগত্ বা একটি বহুরৈখিকতার জন্ম দিয়েছে। যার ফলে আমরা বিশ্বায়নের বিভিন্ন ধরনের চেহারা দেখতে পাচ্ছি। একটি নির্দিষ্ট ভাষ্য—নিম্নবর্গীয় বিশ্বায়ন—এই নিবন্ধের যুক্তিগুলো বুঝতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ, ব্যাখ্যা করা যাক।

আমরা সবাই অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন বা ‘ওপর থেকে বিশ্বায়নের’ সঙ্গে পরিচিত।৩৬ এটা দ্বারা বোঝানো হয় যে বাণিজ্য, অর্থায়ন ও বিনিয়োগের আন্তর্জাতিকীকরণ ছাড়াও উত্পাদন প্রক্রিয়ার আন্তর্জাতিকীকরণের ব্যবস্থা আছে। অর্থাত্ বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এখন কয়েকটি দেশ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে, অতঃপর অন্য কয়েকটি দেশে সেগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে এবং সবশেষে উত্পাদিত পণ্য সারা বিশ্বে রপ্তানি করে। তাই এখন একটি চূড়ান্ত পণ্যের গায়ে একক কোনো উত্পাদনচিহ্ন থাকে না, বরং যেহেতু এটা উত্পাদনে বিভিন্ন রাষ্ট্র জড়িত তাই এর গায়েও অনেকগুলো উত্পাদনচিহ্ন থাকে। এদিক থেকে দেখতে গেলে একটি কম্পেক কম্পিউটার পুরোপুরি আমেরিকান নয় বা একটি টয়োটা গাড়িও পুরোপুরি জাপানি নয়। উভয় পণ্যের ক্ষেত্রেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উত্পন্ন উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। ভিন্নভাবে বললে, আগের পণ্যের আন্তর্জাতিকীকরণের জায়গায় পুঁজিবাদ বিশ্বায়নের এই যুগে পণ্য নিজেই এখন আন্তর্জাতিক বা বৈশ্বিক।

বিশ্বায়নকে দৃঢ়করণ এবং জানান দেওয়ার আরও এক ধরনের মিথস্ক্রিয়া আছে।৩৭ প্রকৃতপক্ষে, সমালোচকেরা অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন রোধে গড়ে ওঠা বৈশ্বিক নেটওয়ার্ককে ইতিমধ্যে ‘নিচ থেকে বিশ্বায়ন’ বলে অভিহিত করছেন।৩৮ এই নেটওয়ার্কে নানা ধরনের লোক আছে—পরিবেশবাদী, এনজিও, ধর্মীয় গোষ্ঠী, প্রান্তিক কৃষক, শ্রমিক ইউনিয়ন (দৈবাত্ উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় ধরনের রাষ্ট্র থেকে), নারীবাদী আন্দোলন কর্মী, ভোক্তাবাদী, আফ্রিকান ঋণ মওকুফ আন্দোলনকারী, ঘর্মশালাবিরোধী কর্মী এবং এ রকম অন্যান্য—এরা সবাই কোনো না কোনোভাবে অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের সমালোচনাকারী বা সরাসরি অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত অথবা এর ভুক্তভোগী। এই প্রতিরোধ আন্দোলনের, বিশেষত এর পারস্পরিক নেটওয়ার্কের নিম্নবর্গীয় চরিত্রকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।

অন্যদিকে, নিচ থেকে বিশ্বায়নের ধারণার গভীরতর নিম্নবর্গীয় একটি ধারা আছে। এই ধারা পণ্য চোরাচালান ও মানব পাচার, অবৈধ ছোট অস্ত্র ও বিস্ফোরক চোরাচালান, অর্থ পাচার, নেশাদ্রব্য উত্পাদন ও বাণিজ্য, সন্ত্রাসবাদ এবং সমগোত্রীয় অন্যান্য কাজে জড়িত ‘সন্দেহজনক গোষ্ঠী’ এবং ‘অস্পষ্ট কর্মকাণ্ডের’ মধ্যকার গভীর সম্পর্ককে নির্দেশ করে। এই ধারার সঙ্গে নানা জাতি, নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী, বর্ণ ও ধর্মীয় সম্পর্কও রয়েছে। নিম্নবর্গীয়, বিশেষ করে দারিদ্র্যপীড়িত ও প্রান্তিক মানুষ এসব গোষ্ঠী এবং কর্মকাণ্ডের সহজ শিকারে পরিণত হয়, কিন্তু নিম্নবর্গীয় হওয়ার কারণেই অনেক অপেক্ষাকৃত ধনী গোষ্ঠী এদের কাজে সমর্থন জানায় এবং গোপনে এদের জন্য কাজ করে। দারিদ্র্য ও প্রান্তিকতার দীর্ঘায়িত প্রকৃতি এবং তাদের জন্য স্বতন্ত্র বৈশ্বিক কোনো উদ্যোগ না থাকায় এই গোষ্ঠীগুলো তাদের টিকে থাকা বা ভাগ্যবদলের লড়াইয়ে অনানুষ্ঠানিক বা অপরাধপ্রবণ পথে চলে যায়। অর্থনৈতিক বিশ্বায়নবিরোধী আন্দোলনগুলোর সঙ্গে এই পর্যায়ের যৌগিক মেলবন্ধনকে একসঙ্গে মিলিয়ে এটাকে ‘নিম্নবর্গীয় বিশ্বায়ন’ নামে অভিহিত করা যেতে পারে। এখানে নিম্নবর্গ, তাদের উদ্দীপ্ত সমর্থক ও সমব্যথীরা মিলে জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং দৃঢ়করণে কোনো অংশে কম সৃজনশীল ও ক্ষমতাবান নয়। এটা করার ক্ষেত্রে তারা প্রায়ই অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের দানবীয় শক্তিকে মোকাবিলা করে থাকে। অর্থনৈতিক বিশ্বায়নবিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনের নিম্নবর্গীয় অংশকে অস্বীকার করা যায় না। সিয়াটল, রোম, প্রাগ বা ওয়াশিংটনে বিশ্বায়নবিরোধী বিক্ষোভ এটাই নির্দেশ করে যে অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন এই নিম্নবর্গীয় বা প্রান্তিক শক্তিসমূহকে এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। অন্য অর্থে, এই বিক্ষোভসমূহ বিশ্বব্যাপী নিম্নবর্গীয়দের দুঃখ-দুর্দশাকে তুলে ধরছে।

যা হোক, এই প্রতিরোধ আন্দোলন নিম্নবর্গীয়দের জীবন ও জীবিকা বদলে দিতে পারে না। জেমস মিটেলম্যানের মতে, ‘দারিদ্র্য যেখানে তীব্রতর, অপরাধী গোষ্ঠীগুলো সেখানে সক্রিয় হয়ে ওঠে’।৩৯ দারিদ্র্য ও অপরাধপ্রবণতার মধ্যে সম্পর্ক এতটা সরলও নয়। প্রকৃতপক্ষে, নিম্নবর্গীয় অবস্থা রাষ্ট্রের ক্ষমতা দৃঢ়করণে মানুষকে নিরুত্সাহিত করে ফেলে। অন্যদিকে, অপশাসন তখন নিয়মে পরিণত হয়। জনসাধারণ, বিশেষত নিম্নবর্গীয়রা তখন জীবন নির্বাহের জন্য অনানুষ্ঠানিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ওপর অধিক হারে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তখন মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্য বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য অযোগ্য এবং প্রায় দুর্নীতিবাজ সরকারি প্রশাসনযন্ত্রের বিপরীতে ‘গডফাদার’, ‘ভাড়াটে গুন্ডা, ‘মাস্তান’ এবং এ ধরনের শক্তিসমূহের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তখন লেনদেনের এক অস্পষ্ট নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে এবং এই প্রক্রিয়ায় শুধু রাষ্ট্রীয় নয়, বরং নিম্নবর্গীয় শক্তিকেও অস্থির করে তোলে, যা প্রকৃত প্রস্তাবে এদের আরও দুর্বল ও ক্ষমতাহীন করে ফেলে। এটা ফলে নিম্নবর্গীয় বিশ্বায়ন পরিচালনা এবং দৃঢ় করতে নতুন নিয়োগ এবং সৃজনশীল কিন্তু দানবীয় উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। এই জটিল কাঠামোটি কিছুটা দানবীয়ভাবে পরিকল্পিত।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে চোরাকারবারবিষয়ক এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছিল যে, ‘সাধারণ পুরুষ, নারী এমনকি শিশুরাও বাহক, কুলি এবং রিকশাচালক ছদ্মবেশে চোরাকারবারের কাজে অংশগ্রহণ করে।’৪০ এই গবেষণা এটাই নির্দেশ করে যে চোরাকারবারের নিম্নবর্গীয় রূপ আপাত প্রতীয়মান ব্যবস্থার চেয়েও অনেক বেশি জটিল। নিম্নবর্গীয় অসহায়ত্ব তাদের প্রায়ই নিজেদের ইচ্ছায় চোরাকারবারিদের সহজ শিকারে পরিণত করেছে। এটা নিম্নবর্গীয় চোরাকারবারের শিকার এবং চোরাকারবারের উপায়সমূহ তাদের জন্য সহজলভ্য করে করা হচ্ছে। এখানে উল্লেখ্য, চোরাকারবারি এবং চোরাচালান-বাহকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য আছে, যদিও উভয়ই সমাজ ও বিশ্বকে অপরাধকবলিত করার কাজে জড়িত।৪১ চোরাকারবারি হচ্ছে মূলধন বিনিয়োগকারী ব্যক্তি, অন্যদিকে চোরাচালান-বাহক হচ্ছে নিছক শ্রমিক, যাকে প্রতিবার সফলভাবে পণ্য গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে নগদ অর্থ পরিশোধ করা হয়। এই চোরাচালান-বাহকই তার যাত্রার প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা এবং অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ দেওয়ার মতো নোংরা কাজগুলো করে। অন্যদিকে, চোরাকারবারি চোরাচালানকৃত পণ্য থেকে বড় মাপের মুনাফা ভোগ করে। চোরাচালান-বাহকের দৃষ্টিকোণ থেকে এটা নিছক অন্য একটি পেশামাত্র, যা তারা ভালো কিছু পাওয়ার আশায় কিছুটা বেপরোয়াভাবে করে থাকে এবং যা বেপরোয়া নিম্নবর্গীয়দের জীবন ও জীবিকার জন্য সমানভাবে প্রয়োজনীয়।

কিন্তু ভারত থেকে বাংলাদেশে কি চোরাচালান হয়ে আসে? প্রায় সবকিছুই। স্টিলের রন্ধনশৈলী, কীটনাশক, সার, চিনি, সাইকেল, মোটর এবং রেডিও-টেলিভিশনের যন্ত্রাংশ, প্রসাধনদ্রব্য, মোটরসাইকেল, তৈরি পোশাক, ফোন, এয়ারগান, গুঁড়ো দুধ, লবণ, ফলমূল, জুতা, ঘড়ি, পিকআপ ভ্যান, বৈদ্যুতিক যন্ত্র, হেরোইন, অ্যালকোহল, ফেনসিডিল, উত্তেজক বড়ি ইত্যাদি। দিল্লিতে কাজ করা এক সাবেক বাংলাদেশি কূটনীতিক একবার বলেছিলেন, বাংলাদেশের গ্রামে ব্যবহূত ৪০ শতাংশ বস্তুই ভারত থেকে চোরাচালানকৃত পণ্য। ভারতীয় একটি দৈনিক পত্রিকার সাবেক সাংবাদিক এবং বর্তমানে একজন একাডেমিক মোহন একটু ভিন্নভাবে একই কথা বলেছিলেন। ‘আপনি কি জানেন বিএসএফের সংজ্ঞা কী?’ আমি উত্তর দেওয়ার আগেই তিনি তড়িঘড়ি করে বলরেন: ‘বর্ডার স্মাগলিং ফোর্স (সীমান্ত চোরাকারবার বাহিনী)’। তাহলে, প্রশ্ন থেকে যায় এই চোরাকারবারের কারণ কী? ভ্যান শেন্ডেলের মতে: ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকার আন্তসীমান্ত বাণিজ্যে একটি অতিপরিচিত পণ্য চিনিতে মুনাফা লাভের সম্ভাবনা পরিষ্কারভাবে অত্যন্ত বেশি ছিল। বাংলাদেশ একট চিনি উত্পাদনকারী রাষ্ট্র হলেও ভারতে চিনির মূল্য বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম ছিল। ১০০ কেজির এক বস্তা চিনির মূল্য কলকাতায় ছিল ৬০০ রুপি এবং বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী শহরগুলোতে তা ছিল ৯০০ রুপি (২০০০ টাকা)। ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কলকাতা থেকে বাণিজ্য করা বড় চিনি ব্যবসায়ীরা লাখ লাখ টাকা মুনাফা আশা করতে পারতেন, যা তাঁদের বিনিয়োগের কমপক্ষে শতকরা ২৫ ভাগ হতো। অন্যান্য পণ্যের (লবণ, শাড়ি, গুঁড়ো দুধ ইত্যাদি) বৃহত্ বাণিজ্যও একই ধরনের মুনাফা জোগাবে।৪২

দুটি পণ্য বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে: অবৈধ মাদক এবং নিষিদ্ধ ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্য। দেশে প্রতিবছর আমদানি হওয়া অবৈধ মাদকের পরিমাণ বেশ উল্লেখযোগ্য। ১৯৯৩ সালে শুধু বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডই সীমান্ত এলাকা থেকে নিম্নবর্ণিত পণ্যগুলো আটক করে: হেরোইন (৪,৩১৬ কেজি), আফিম (৬,৩০০ কেজি), চরস (৪,৩০০ কেজি), গাঁজা (৩৪০.৩৯০ কোজি), ভাং (২,৭৯০ কেজি), অ্যালকোহল (৩১৯১ বোতল) এবং ফেনসিডিল (২৩,২৮৭ বোতল)।৪৩ ২০১২ সালে সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মিলে ৩৮, ৭০২ কেজি গাঁজা উদ্ধার করে যা ২০১১ সালে ছিল  ৫৪, ২৪৪ কেজি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ২০১২ সালে ১২৪.৯২ কেজি হেরোইন এবং ১,২৯১,০৭৮ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে ইয়াবা। একজন মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তার মতে, মিয়ানমার থেকে একটি ইয়াবা ট্যাবলেট ১০০ টাকা দিয়ে কিনে ঢাকায় ৬০০ থেকে ১,০০০ টাকায় বিক্রি করা যায়।৪৪ দক্ষিণ এশিয়ার মাদক নেটওয়ার্ক এতটাই সক্রিয় এবং সৃজনশীল যে কার্গিল যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়েও আফিম আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানে এবং সেখান থেকে ভারতে এসেছে এবং প্রক্রিয়াজাত হয়ে হেরোইনও তৈরি করা হয়েছে। মাদক পাচারে মুনাফা অনেক বেশি। এক হিসাবমতে, (১৯৯৮ সালের মূল্যে) ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধ এক কেজি হেরোইনের মূল্য প্রায় ২৬০০ মার্কিন ডলার এবং একই পরিমাণ হেরোইন ভারতীয় সীমান্ত অতিক্রম করলে এর দাম বেড়ে হয় ৫২০০ মার্কিন ডলার। যখন এটা দিল্লিতে গিয়ে পৌঁছে তখন এর মূল্য ৭০০০ থেকে ৭২০০ মার্কিন ডলারে পরিণত হয়। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যের সঙ্গে তুলনা করলে দিল্লিতে এর মূল্য এখনো পরিমিত। মার্কিন বাজারে এক কেজি হেরোইনের মূল্য ৬০,০০০ মার্কিন ডলার।৪৫ এটা সহজে বোধগম্য যে আন্তমহাদেশীয় পর্যায়ে হেরোইন পাচার এবং এর থেকে মুনাফার জন্য একটি আঞ্চলিক কাম বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক প্রয়োজন। এটা ভালোভাবে অনুমানযোগ্য যে ভারত ও বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেকগুলো শহর ট্রানজিট এবং গন্তব্য হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে এবং এই বিশাল নেটওয়ার্ক থেকে মুনাফা অর্জন করছে। নিষিদ্ধ ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্যের বেলাতেও প্রায় একই অবস্থা বিদ্যমান।

উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশে প্রায় দুই লাখ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র আছে এবং সবগুলোই লোকমুখে মাস্তান হিসেবে পরিচিত স্থানীয় সন্ত্রাসীদের হাতে রয়েছে। কিছু প্রতিবেদন অনুসারে, সীমান্তপথে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দেশে প্রবেশ করে, যা এই অঞ্চলে একটি অনানুষ্ঠানিক অস্ত্রের বাজারের অস্তিত্বকে নির্দেশ করছে। দেশের ভেতরেই স্থানীয় অবৈধ কারখানায় ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র উত্পাদন করা হচ্ছে। ২০০১-২০০২ সালে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার এতটাই অবাধ হয়ে গিয়েছিল যে অপরাধীদের সাজার আওতায় নিয়ে আসতে বাংলাদেশ সরকার ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ নামক সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিল। এই অভিযানে যৌথ বাহিনীর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা। এই অভিযানে ২০১৬টি বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছিল, যার মধ্যে ছয়টি একে-৪৭, দুটি এম-১৬ রাইফেল এবং কয়েকটি এসএমজি ছিল। ওই অভিযানে অনেক স্থানীয় অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছিল। এগুলো হয় চোরাচালান হয়ে এ দেশে এসেছিল অথবা দেশের অভ্যন্তরেই এগুলো উত্পাদিত হয়েছিল। কিন্তু এটুকুর মধ্যেই সবকিছু সীমাবদ্ধ নয়।

২৭ জুন, ২০০৩ সালে পুলিশ বগুড়ার কাহালু থানার জোগারপাড়া গ্রামের এক বাড়ির উঠানে পরিত্যক্ত এক ট্রাক থেকে ৬২,১১২ রাউন্ড চায়নিজ রাইফেলের বুলেট এবং ১২০ কেজি বিস্ফোরকদ্রব্য উদ্ধার করেছিল। পরবর্তী সময়ে পার্শ্ববর্তী এলাকায় অভিযান চালালে আরও গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার হয়, যার মধ্যে ছিল প্রাণঘাতী আরডিএক্স। সর্বমোট প্রায় এক লাখ বুলেট এবং প্রায় ২০০ কেজি বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছিল। এরপর আবারও ২০০৪ সালের ১-২ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপকূলের একটি সরকারি মালিকানাধীন জেটিতে পুলিশ ও কোস্টগার্ড অবৈধ অস্ত্র জব্দ করে। এটাকে বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক জব্দকৃত ‘এককভাবে সবচেয়ে বৃহত্’ অস্ত্রের চালান হিসেবে বর্ণনা করা হয়। নিম্নে চট্টগ্রামে জব্দ হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র এবং গোলাবারুদের বিস্তারিত পরিসংখ্যান দেওয়া হলো;

চট্টগ্রামে জব্দ হওয়া অস্ত্রসমূহ:৪৬

অস্ত্রের ধরন                               সংখ্যা

৭.৬২ এমএম টি-৫৬-আই এসএমজি            ৬৯০

৭.৬২ এমএম টি-৫৬-এসএমজি                ৬০০

৪০ এমএম রকেট লঞ্চার টি-৬৯               ১৫০

৪০ এমএম রকেট                           ৮৫০

৯ এমএম সেমি-অটোমেটিক স্পট রাইফেল        ৪০০

টমি গান                                 ১০০

গ্রেনেড লঞ্চার                             ২,০০০

টি-৮২-২ হ্যান্ড গ্রেনেড                     ২৫,০২০

৭.৬২ এমএম বুলেট                        ৭৩৯,৬৮০

৭.৬২ এমএম পিস্টল বুলেট                  ৪০০,০০০

 

জব্দ হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। অনেকের মতে, এই আগ্নেয়াস্ত্রগুলো উলফার কাছে যাচ্ছিল, অন্যদের মতে এগুলো ত্রিপুরার বিদ্রোহীদের কাছে যাচ্ছিল। এমনকি অনেকে সম্ভাব্য ক্রেতার তালিকায় নেপালের মাওবাদী ও কাশ্মীরি জঙ্গিদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। একটা আপাত তত্ত্ব এটা হতে পারে যে এই চালানটি হংকং থেকে তামিল টাইগারদের কাছে যাচ্ছিল কিন্তু ভারতীয় বা শ্রীলঙ্কান নৌবাহিনীর ধাওয়ার মুখে সরবরাহকারীরা এই অস্ত্রগুলোকে বাংলাদেশে একটি নিরাপদ গোডাউনে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল, যাতে করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে চালানটি তার আসল খরিদ্দারের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। অস্ত্রের ধরন দেখে এটাকেই সত্য বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। যা হোক, শঙ্কার বিষয় হচ্ছে, হংকং থেকে দক্ষিণ এশিয়া এবং এমনকি এর বাইরেও অবৈধ অস্ত্রের একটি জটিল নেটওয়ার্কের অবস্থান। তা ছাড়া এই অস্ত্রগুলোর মধ্যে কিছু স্থানীয় বাজারে ঢুকে পড়ার মাধ্যমে মাস্তান এবং দক্ষিণ এশিয়ার নিম্নবর্গীয় বিদ্রোহীদের হাতে যে পৌঁছাবে না, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। ২০১২ সালে দেখা যায় সর্বমোট ২,৫০০ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র থেকে জানা যায় আগ্নেয়াস্ত্র-সম্পর্কিত মামলা ২০১২ সালে অনেক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬২৭টি এবং প্রায় ২,৬০০ জনকে অবৈধ অস্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে।৪৭

শেষ কথা

সন্দেহপূর্ণ এবং অস্পষ্ট শ্রমের ‘অন্য’ জগত্, শুরুতে অনুতপ্ত এবং আকাঙ্ক্ষাপূর্ণ প্রতীয়মান হওয়া ভূখণ্ডবন্দী ‘অন্যদের’ স্থান দখল করে নিয়েছে, যারা শুধু রাষ্ট্রের উদারতায় জীবিকা নির্বাহে উত্সাহী ছিল। এই সন্দেহপূর্ণ ‘অন্যরা’ একটি ক্ষমতাবান সত্তা, যারা মানব পাচার থেকে মাদক পাচারসহ প্রায় সব ধরনের চোরাকারবারের দ্বারা তহবিলপ্রাপ্ত। একে-৪৭, এসএমজির মতো অস্ত্র ও বিস্ফোরকসমৃদ্ধ এবং সৃজনশীল কিন্তু অস্পষ্ট ব্যাংকিং সুবিধাপ্রাপ্ত এই সন্দেহপূর্ণ ‘অন্যরা’ জীবন এবং জীবিকায় আঘাত হানতে প্রস্তুত। নিম্নবর্গীয় বিশ্বায়নের প্রভাবে এই ‘অন্যরা’ কখনো ভারতীয়, কখনো বাংলাদেশি, কখনো উভয় রাষ্ট্রের এবং কখনো ভারত ও বাংলাদেশ দুই রাষ্ট্রেরই বাইরের। নিজের চাহিদা ও সরবরাহ কীভাবে সৃজনশীলতার সঙ্গে কাজে লাগাতে হয়, তা এরা জানে। রাষ্ট্র যেখানেই নিয়ন্ত্রণ হারায় বা সেবা দিতে ব্যর্থ হয়, সেখানেই এরা একটি উচ্ছৃঙ্খল উপস্থিতির মাধ্যমে বিশাল মুনাফা করে নেয়। বাংলাদেশ, ভারত এবং বাকি দক্ষিণ এশিয়ায় এ রকম উদাহরণ প্রচুর আছে।

এই সন্দেহপূর্ণ ‘অন্যদের’ নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাষ্ট্রকে পৌরাণিক ওয়েস্টফেলীয় মর্যাদায় শক্তিশালী করার কোনো যুক্তি নেই, কারণ রাষ্ট্র নিজেই ‘অন্যদের’ সঙ্গে জটিলতায় জড়িয়ে আছে। বছরের পর বছর যখন পুলিশ, নিম্ন আদালত, প্রশাসন, সরকার বা বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদেরা, আর্থিক খাত এবং অন্যান্য অগণিত প্রতিষ্ঠান নিজেদের শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছে, তখন তারা তাদের অজান্তেই এই সন্দেহপূর্ণ ‘অন্যদের’ শক্তিকে মজবুত করেছে। এই সন্দেহপূর্ণ ‘অন্যদের’ নিয়ন্ত্রণে ভারত ও বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রের সামগ্রিক ব্যর্থতাই এই ক্ষেত্রে সমন্বিত এবং যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার পেছনে বেশ কার্যকর যুক্তি হতে পারে; যদিও তা দেশজ জ্ঞান-কল্পনার মধ্যেই নিহিত রয়েছে। এটা অবশ্যই এড়িয়ে যাওয়া যাবে না যে এ রকম সমন্বয় এমন এক অঞ্চলে দাবি করা হচ্ছে যেখানকার অনুন্নয়ন বেশ দৃষ্টিগ্রাহ্য, যদিও বিপরীত দিকে ইউরোপের দৃষ্টিগ্রাহ্য উন্নয়নের সময়েও তাদের এ ধরনের সমন্বিত প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত যৌথ বাহিনী রয়েছে।

একটি রাষ্ট্রের অবশ্যই ‘অন্য রাষ্ট্রকে’ ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করা থেকে নিবৃত্ত হওয়া উচিত। এই ন্যূনতম নীতি রাষ্ট্রের অবশ্যই থাকতে হবে। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ মালদ্বীপের পরিবেশ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা না করি, আর সব কটি রাষ্ট্রের মধ্যেই ‘ব্যর্থ রাষ্ট্রের’ অনুরূপ ছোট অঞ্চল আছে। এর মধ্যে জাফনা, করাচি, গুজরাট, নর্থ-ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার, কাশ্মীর, পার্বত্য চট্টগ্রাম, আসাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, উত্তর-পশ্চিম নেপাল, বিহারের অংশবিশেষ, দক্ষিণ ভুটান অপেক্ষাকৃত বেশি পরিচিত। যদি আমরা ‘অপরাধ জগতের’ শক্তিকেও আমাদের হিসাবে রাখি, তাহলে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে এসব ছোট ব্যর্থ অঞ্চলের সংখ্যা আরও বেড়ে যাবে। এ ধরনের ক্ষুদ্রাঞ্চলগুলোর উপস্থিতি রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক সংস্থা, বিশেষত পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর শক্তি দৃঢ়করণের সঙ্গে সঙ্গে সন্দেহপূর্ণ এবং অস্পষ্ট ‘অন্যদের’ জন্য আকর্ষণীয় ব্যবসার ক্ষেত্র তৈরি করে। যখন এই সন্দেহপূর্ণ এবং অস্পষ্ট ‘অন্যরা’ ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে তখন এটা ব্যর্থতার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া রাষ্ট্র এবং যে রাষ্ট্র এটিকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার কাজে মদদ জুগিয়েছে উভয়েই ব্যর্থতায় পরিণত হয়।

বিষয়গুলো পূর্বজ্ঞানভিত্তিক না হলেও, মাঝেমধ্যে প্রচারাভিযানটিই অদূরদর্শী প্রতীয়মান হয়। যেমন বাংলাদেশে আইএসআইয়ের (পাকিস্তানের ইন্টার সার্ভিস ইন্টেলিজেন্স) ভূমিকার বিষয়টি ভারত বারবার দাবি করে আসছে এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্গানিক বুদ্ধিজীবী এবং গণমাধ্যমের একটি অংশ। অভিযোগকারীরা এটা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয় যে ভারতীয়রা নয়, বরং বাংলাদেশিদেরই পাকিস্তানের অধীনে প্রায় ২৫ বছর আধা-ঔপনিবেশিক অবস্থায় বাস করতে হয়েছিল এবং আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক সংগঠিত এক গণহত্যার পরই বাংলাদেশ তার স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। তাই এখন বাংলাদেশিরা আইএসআই দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে বলা অর্থ শুধু তাদের বিদ্রূপ করাই নয়, বরং এটা জটিল এবং বহুমাত্রিক বিরোধের বিষয়গুলো সমাধান করার ক্ষেত্রে ভারতীয় রাষ্ট্রের ঐকান্তিকতার অভাবই প্রকাশ করে। এই দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো ভারত বা বাংলাদেশ কারোরই একার পক্ষে সমাধান করা বা নিয়ন্ত্রণে রাখার সম্ভাবনা ধীরে ধীরে কমে আসছে। একইভাবে কাশ্মীর, নাগাল্যান্ড বা অন্য কোনো অঞ্চলে ভারতীয় রাষ্ট্র উপজাতীয়তাবাদী আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ যখন আহ্লাদিত হয়, তখন বাংলাদেশ এটা বুঝতে ব্যর্থ হয় যে মাঝে মাঝে এই ভারতীয় ভিন্নমতাবলম্বীদের শক্তি তাঁর ভূখণ্ডের ভেতরের রাষ্ট্রবিরোধী উপাদানসমূহকে শক্তিশালী করতে পারে (ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র এবং মাদকের বাণিজ্য বা অর্থ পাচারের মাধ্যমে)। ‘অন্যদের’ নতুন অবস্থান নির্ধারণ করা একটি ভালো সূচনা হতে পারে। যে জায়গাগুলোতে সন্দেহপূর্ণ ‘অন্যরা’ ইতিমধ্যেই সক্রিয় এবং দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে—যেমন সীমান্তসংলগ্ন গ্রাম এবং শহরগুলোতে—এখন সেখান থেকেই তাদের ‘সৃজনশীল’ অনধিকার প্রবেশ এবং যোগাযোগের রীতিসমূহ জানতে হবে। প্রকৃতপক্ষে, ইতিমধ্যে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এক ধরনের ভূখণ্ডবহির্ভূত নাগরিকত্বের প্রচলন রয়েছে কিন্তু তা শুধু অস্পষ্ট এবং সন্দেহপূর্ণ ‘অন্যদের’ দ্বারাই পরিচালিত ও ব্যবহূত হচ্ছে। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে, বাংলাদেশ ও আসামের সীমান্তবর্তী শহর ও গ্রামের বিদ্যালয়গুলোতে অসমিয় ও বাংলা উভয় ভাষারই পাঠদান শুরু না করার কোনো কারণ নেই। অথবা শুধু সীমান্তবর্তী মানুষের জন্য এবং সেখানকার স্থানীয় মানুষদের দ্বারা পরিচালিত একটি অডিও-ভিজ্যুয়াল গণমাধ্যমও চালু করা যেতে পারে। রাষ্ট্রকে তাঁর অবস্থান দৃঢ় করতে হলে ‘অন্যদের’ জন্য অবশ্যই ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে এবং তাদের জীবনমান উন্নয়ন করতে হবে। অন্যথায় রাষ্ট্রের ব্যর্থতার কারণেই এরা হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে ‘অন্যদের’ এই স্থান পরিবর্তন ভূখণ্ড বা মানুষ হিসেবে না হয়ে বরং, যেমনটা থিওডর জেল্ডিন বলেছিলেন যে ‘সম্ভবত ব্যক্তি হিসেবে হওয়া উচিত।’৪৮ রাষ্ট্রের ভূখণ্ডকেন্দ্রিকতা এবং ‘অন্যের’ ভয়ানক ভাবমূর্তির এই আত্মঘাতী কারণ দূর করার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিটি বিবেচনা করা যেতে পারে।

তথ্যসূত্র ও টীকা

১. এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। দিল্লির Centre for the Study of Developing Societies পরিচালিত ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগ এবং সহিংসতা বিষয়ে একটি প্রজেক্টে যখন ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে সাক্ষাত্কার নেওয়া হচ্ছিল, তখন বাংলাদেশে যাদের কাছ থেকে সাক্ষাত্কার নেওয়া হয়েছিল তারা ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল নিয়েই বেশি কথা বলেছিল। যেমনটি কুলদীপ নায়ার সম্প্রতি উল্লেখ করেছেন, ‘বাংলাদেশ সরকার হয়তোবা দুরূহ আচরণ করছে (যেমনটি করছে ভারত সরকারও) কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ নয়, যাদের মধ্যে বুদ্ধিজীবী, মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের সন্তানেরা রয়েছেন’। দেখুন—The Indian Express, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০০৪।

২. দেখুন—Tom Lewis, ‘The politics of’ Hauntology,’ in Derrida’s ‘Specters Of Marx,’ in Michael Sprinker, ed., Ghostly Demarcations: A Symposium on Jacques Derrida’s Specter of Marx (London: Verso, 1999), pp. 134-167.

৩. Brian Greene, The Fabric of the Cosmos: Space Time, and the Texture of Reality (New York: Alfred A. Knopf, 2004), p.139.

৪. E.P. Thompson, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের Nationalism-এর সূচনাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ইউরোপে উত্তর-আধুনিকতাবাদ ধারণার আবির্ভাবের বহু পূর্বের একজন উত্তর-আধুনিক ভাবুক বলে উল্লেখ করেছেন। দেখুন, Rabindranath Tagore, Nationalism (Calcutta: Rupa&Co, 1992).

৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৭।

৬. দেখুন, Tai Yong Tan and Gyanesh, The Aftermath of Partition in South Asia, (London: Routledge, 2000) p.89.

৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ৯০।

৮. দেখুন, Nitin A. Gokhale ‘A Tale of Two Blunders: Misplaced Machismo and Poorly Demarcated Border Combine to Lead to a Flare-up,’ Outlook Magazine, 22 April, 2001.

৯. মার্চ, ১৯৭৪ সালে ভারত ও বাংলাদেশ একটি সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করে। কিন্তু ভারত কখনো এটা অনুসমর্থন করেনি। বাংলাদেশ এটাতে অনুসমর্থন করে (সংবিধান তৃতীয় সংশোধনী আইন, ১৯৯৪)। কিন্তু সেকশন-৩-এ শর্ত আরোপ করা হয় যে দুই দেশের মধ্যকার সীমান্তের সীমারেখা নির্ধারণের পরই চুক্তি কার্যকর হবে। দেখুন, Outlook, 11 June 2001, p.24.

১০. দেখুন, Amena Mohsin, ‘Partitioned Lives Partitioned Lands’, in imtiaz Ahmed, ed. Memories of a Genocidal Partition: The Haunting Tales of Victims, Witnesses Perpetrators, (Colombo: Regional Centre for Strategic Studies, 2002).

১১. তবে এসব দেয়াল এবং চীনের মহাপ্রাচীর বা এমনকি ম্যাজিনট লাইনের মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য রয়েছে। চীনের মহাপ্রাচীর এবং ম্যাজিনট লাইন উভয়ই নির্মাণ করা হয়েছিল ভিনদেশি শত্রুর উপদ্রব থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু এই দেয়ালগুলোও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।

১২. প্রাচীরবন্দী মানসিকতা অবশ্যই সংক্রামক। এখন ভুটান ‘ভারতসংলগ্ন সীমান্তে দেয়াল চায়’ দেখুন, The Times of India, 12 July 2004.

১৩. দেখুন, The Hindu (Madras), 9 December 1992.

১৪. দেখুন, The Statesman, 7 July 1994.

১৫. দেখুন, The Statesman, 11 September 1994.

১৬. দেখুন, The Daily Star, 5 August 1998.

১৭. দেখুন, Seema Kamdar, ‘Illegal Influx: Bright lights beckon Bangladeshis,’ Times News Network, 5, April 2004.

১৮. আমি অ্যাডমিরাল (অবসরপ্রাপ্ত) রমাদাশের কাছে এই তথ্যের জন্য কৃতজ্ঞ।

১৯. দেখুন, The Daily Star, 5 October 2000, p.12.

২০. দেখুন, Louise Brown, Sex Slaves: the Trafficking of Women in Asia (London: Virago Press. 2000), p.79.

২১. দেখুন, Nazmul Abedin, et.al. ‘Trafficking of Women and Children in Bangladesh,’ unpublished research paper, Department of International Relations, University of Dhaka, 26 May 1999, p.8.

২২. দেখুন, The Independent (Dhaka), 1 May 1997.

২৩. দেখুন,  Louise Brown, 2000, p.135.

২৪. দেখুন, Sri Aurobindo, India’s Rebirth, Paris & Mysore, Institute De Recherches Ecvolutives and Mira Aditi, 2000 edition, p.177, cited from Jyotirmaya Sharma, Hindutva: Exporing the ldea of Hindu Nationalism (New Dilhi: Penguin, 2003) p. 68.

২৫. দেখুন, Jyotirmaya Sharma, 2003, p. 69.

২৬. Mushirul Hasan, ‘India’s Partition Revisited,’ in K.N. Panikkar, et.al.eds., The Making of History: Essays Presented to Irfan Habib (New Delhi: Tulika, 2000), p.558.

২৭. দেখুন, The Pioneer (New Dilhi: 5 January 2002.

২৮. প্রাগুক্ত।

২৯. দেখুন, Talukder Maniruzzaman, ‘Bangladesh Politics: Secular and Islamic Trends,’ in Rafiuddin Ahmed (ed.), Religion, Nationalism and Politics in Bangladesh (New delhi: South Asian Publishers, 1990) pp.73-74.

৩০. অনুচ্ছেদ ৮(১ক)। একই সময়ে সেক্যুলারিজম ঘোষণাকারী অনুচ্ছেদ ১২ রহিত করা হয়। দেখুন, Syed Anwar Husain, ‘Bangladesh and Islamic Countries, 1972-1983,’ in Mohammad Mohabbat khan and Syed Anwar Husain (eds.), Bangladesh Studies: Politics, Administration, Rural Development and Foreign Policy (Dhaka: The City Press, 1985), p.244.

৩১. দেখুন, Muniruzzaman,1990, pp.74-75.

৩২. বিষয়টি নন্দ আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন: ‘হিন্দুত্ববাদের মূল বিশ্বাস নিম্নোক্তভাবে উপস্থাপন করা যায়: চিরন্তন, সর্বজনীন বা অনধিযান্ত্রিক (non-mechanistic) প্রাকৃতিক বিধির মধ্যে হিন্দু ধর্মের মূল নিহিত আছে, যা ‘বৈদিক আর্যদের’ অন্তর্জ্ঞানের চমকে আবিষ্কৃত। এই বিধিসমূহ আধুনিক বিজ্ঞান দ্বারা স্বীকৃত, তাই হিন্দুত্ববাদ অনন্যরূপে বিজ্ঞানসম্মত। যেহেতু হিন্দুরা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত প্রাকৃতিক বিন্যাস অনুসারে জীবনধারণ করে, যা বস্তুকে উচ্চমার্গীয় আত্মার সঙ্গে মিলিত করে, তাই হিন্দুত্ববাদ আব্রাহিমিয় ধারার বিশ্বাসগুলোর চেয়ে অধিক যুক্তিসিদ্ধ এবং পরিবেশবান্ধব। অন্যদিকে আব্রাহিমিয় বিশ্বাসের অনুসারীরা এক কল্পিত অতিপ্রাকৃত সত্তার কাছ থেকে পাওয়া নৈতিক বিধি মেনে চলে এবং প্রকৃতিকে নিছক বস্তু হিসেবে গণ্য করে, যার কোনো আধ্যাত্মিক অর্থ নেই। যেহেতু হিন্দুত্ববাদ অতিশয় বিজ্ঞানসম্মত তাই ভারতে বিশ্বাস এবং যুক্তির মধ্যে এনলাইটেনমেন্ট ধারার কোনো বিতর্কের প্রয়োজন নেই। তাই সত্যিকার এবং গভীরভাবে বিজ্ঞানমনস্ক ভারতীয় হয়ে ওঠার জন্য—প্রকৃতপক্ষে গোটা বিশ্বের—অবশ্যই বেদ ও বেদান্তের শিক্ষাকে গ্রহণ করতে হবে’। দেখুন, The Hindu, 22 May 2004.

৩৩. দেখুন, The Times of India, 15 July 2004.

৩৪. আপাতক সংখ্যার ভিত্তিতে নির্ধারিত। দেখুন, India Today, 24 May 2004, p.25.

৩৫. R.N.P. Singh, Riots and Wrongs; Islam and Religious Riots: A Case Study (New Delhi: India First Foundation, 2004), pp.279-280, 289-290.

৩৬. দেখুন, Imtiaz Ahmed, ‘Globalization, State and Political Process in South Asia,’ in Abdur Rob Khan, ed. Globalization and Non-Traditional Security in South Asia (Dhaka: Academic Press, 2001); এবং Jeremy Brecher, Tim Costello and Brendan Smith, Globalization From Below: The Power of Solidarity (Cambridge, Mass: South End Press, 2000).

৩৭. বিস্তারিত দেখুন, Imtiaz Ahmed, ‘Contemporary Terrorism and the State, Non-State, and the Interstate: Newer Drinks, Newer Bottles,’ in Sridhar K. Khatri and Gert W. Kueck, eds. Terrorism in South Asia: Impact on Development and Democratic Process (Colombo and New Delhi: RCSS and FAF, 2003).

৩৮. দেখুন, Brecher, Costello and Smith, 2000, p.10.

৩৯. দেখুন, James H. Mittelman, The Globaliation Syndrome: Transformation and Resistance (Princeton, NJ: Princeton University Press, 2000), p.209.

৪০. দেখুন, Chandan Nandy, ‘World Bank study indicts BSF, Customs,’ The Telegraph, 21 January 1995.

৪১. দেখুন, Imtiaz Ahmed, ‘Travails of Refugees across Bangladesh-India Border,’ in Nancy Jetly, ed., Regional Security in South Asia: The Ethno-Sectarian Dimensions (New Delhi: Lancers, 1999), p.439.

৪২. দেখুন, Willem van Schendel, ‘Easy Come, Easy Go: Smugglers on the Ganges,’ Journal of Contemporary Asia, Volume 23, Number 2 (1993), p.200.

৪৩. দেখুন, Statistics on Seized Illegal Drugs (Limited Circulation), Bangladesh Rifles, Dhaka, 1 January 1993 to 31 December 1993.

৪৪. Abid Azad, ‘Routes of Drug Trafficking,’ New Age, 19 July, 2013, accessed at http://www.newagebd.com/supliment.php?sid=258&id=1843    

৪৫. দেখুন, Shah, Giri Raj Shah, Encyclopedia of Narcotic Drugs & Psychotropic Substance, Volume 2, (New Delhi: Gyan publishing House, 1998), pp.515-516.

৪৬. বিভিন্ন পত্রিকা অবলম্বনে।

৪৭. Mohammadm Jamil Khan, ‘Illegal Arms Flowing Through Our Porous Border,’ Dhaka Tribune, 15 May, 2013. 

৪৮. ‘মানুষকে ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া প্রয়োজন’। দেখুন, Theodore Zeldin, An Intimate History of Humanity (London: Vintage, 1998), p.469.

 

pathok

যোগাযোগের ঠিকানা

সিএ ভবন,
১০০ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,
কারওয়ান বাজার, ঢাকা - ১২১৫।

ফোন: ৮৮০-২-৮১১০০৮১, ৮১১৫৩০৭
ফ্যাক্স - ৮৮০-২-৯১৩০৪৯৬

protichinta kinte chile