protichinta

সপ্তদশ শতকের বাংলায় ধর্মীয় জীবন: কিছু প্রাসঙ্গিক ভাবনা

আকবর আলি খান

সারসংক্ষেপ

বাংলা অঞ্চলে মানুষের আর্থসামাজিক জীবনে ধর্মের প্রভাব নিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ আলোচনা করার প্রয়াসেই এই প্রবন্ধটি লেখা হয়েছে। এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ধর্মীয় ও জাতিগত ভেদাভেদ এক দিনে শিকড় গেড়ে বসেনি। শুধু হিন্দু-মুসলমান বিভক্তিই নয়, প্রত্যেক ধর্মের ভেতরে শাখা-প্রশাখার মধ্যে বিভেদ ও বৈষম্য মানুষের সামাজিক জীবনে বিস্তর প্রভাব ফেলেছিল। এ প্রবন্ধে বাংলা অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব ও সম্প্রসারণ এবং হিন্দু ধর্মের প্রকৃতি ও বিবর্তনকে ঐতিহাসিক আর্থসামাজিক বাস্তবতার আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইসলাম প্রচারের মাধ্যম নিয়ে অনেক অস্পষ্ট ধারণাকে স্পষ্ট করা হয়েছে। এখানে সপ্তদশ শতকের প্রেক্ষাপটে আলোচনা করা হলেও বিংশ শতাব্দীতে এসে এই ধর্মীয় ভেদাভেদের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ব্যবহারের ফলেই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প আজকের সমাজে বিরাজমান।

মুখ্য শব্দগুচ্ছ: ইসলাম ও হিন্দু ধর্ম, সূফি ও পীর, শাক্ততন্ত্র, শাসনব্যবস্থা, জাতি-গোত্র ভেদাভেদ।

প্রারম্ভিক কথা

খ্রিষ্টাব্দ ১৬১০-১৭০৪ সময়কালকে অধ্যাপক ইটন বাংলাদেশে মোগল কর্তৃত্ব সুসংহতকরণের যুগ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ভৌগোলিক অন্তরায়সমূহকে অগ্রাহ্য করে বাংলা বদ্বীপের ইতিহাসে এই প্রথমবার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হলো। রাজনীতি ও প্রশাসনে অভিন্নতার প্রবণতা দেখা দিলেও বাংলাদেশে সপ্তদশ শতকে ধর্মের ক্ষেত্রে বিভক্তির ধারা বেগবান হয়ে ওঠে। অবশ্য বাঙালির ধর্মের জগতে এ সময়ে কোনো নাটকীয় ঘটনা পরিলক্ষিত হয়নি। তবু আপাত-স্থবির ও নিস্তরঙ্গ ধর্মীয় জীবনে লোকচক্ষুর অন্তরালে এই বিভেদ ও ভিন্নতা বেড়ে চলে।

ষোড়শ শতকে শ্রীচৈতন্য দেবের আবির্ভাবে উচ্চকিত হয়ে উঠেছিল সারা দেশ। তবু বৈষ্ণব আন্দোলনের জোয়ার বাংলাদেশের সব হিন্দুর মধ্যে অভিন্ন বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়। তপন রায় চৌধুরী যথার্থই লিখেছেন যে বৈষ্ণববাদ পশ্চিমবঙ্গের নিম্নবর্ণের হিন্দুদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে আকৃষ্ট করলেও পূর্ববঙ্গের উচ্চ ও নিম্নবর্ণের এবং পশ্চিমবঙ্গের বেশির ভাগ উচ্চবর্ণের হিন্দুদের নতুন মতবাদে দীক্ষিত করতে পারেনি। শ্রীচৈতন্যের জীবদ্দশায় বাংলার হিন্দুদের সিংহভাগ ছিল শাক্ততান্ত্রিক মতবাদে বিশ্বাসী। তপন রায় চৌধুরী তাই লিখেছেন, “Thus Vaisnavism in Bengal never became anything more than the faith of a powerful minority” (বাংলায় বৈষ্ণববাদ কখনো একটি শক্তিশালী সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর বিশ্বাসের চেয়ে বেশি মর্যাদা অর্জন করতে পারেনি।) বৈষ্ণব আদর্শে অনুপ্রাণিত ধর্মীয় সম্প্রদায়ও একত্র থাকতে পারেনি। শ্রীচৈতন্যের মহাপ্রয়াণের পর নব্য বৈষ্ণববাদের আবির্ভাবের ফলে বৈষ্ণবদের মধ্যেও নতুন বিভক্তি দেখা দেয়। অন্যদিকে বাংলার পূর্ব ও মধ্য অঞ্চলে চতুর্দশ শতক থেকে শুরু করে নিঃশব্দে ইসলামে ধর্মান্তরিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে এই নতুন মুসলমানেরাও ইসলামি উম্মাহর আদর্শে একত্র হতে পারেনি। এদের মধ্যেও মৌলবাদ-সমন্বয়বাদ, শিয়া-সুন্নি, বহিরাগত আশরাফ ও স্থানীয় আতরাফদের বিভক্তি দেখা দেয়। ধর্মীয় বিভক্তির এখানেই শেষ নয়। বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে আদিবাসী ও অন্ত্যজ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছিল অবৈদিক দেবদেবীর ও লোকধর্মের (folk religion) বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের প্রাবল্য।

সপ্তদশ শতকে বাংলাদেশে তাই মানুষের হূদয়কে জয় করার জন্য বহু ধরনের ধর্ম ও আচার-অনুষ্ঠান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। তবে এসব বিশ্বাসের উত্থান ও বিকাশ সম্পর্কে যথেষ্ট ঐতিহাসিক তথ্যের অভাব রয়েছে। কাজেই বাংলাদেশে সপ্তদশ শতাব্দীতে সব ধরনের ধর্মীয় গোষ্ঠী ও উপগোষ্ঠীর বিশ্বাস ও আচারের বিশ্লেষণ এ মুহূর্তে সম্ভব নয়। তাই মোটা দাগে সপ্তদশ শতকে বাংলাদেশে ধর্মের জগতে তিনটি বড় ধরনের প্রবণতা বিশ্লেষণে এই আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকবে। প্রথমত, এই সময়কালে বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের প্রসার ও ধর্মান্তরের প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা করা হবে। মূলত এ প্রবণতা পূর্ব ও উত্তরবঙ্গে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল। দ্বিতীয়ত, চৈতন্য-উত্তর বঙ্গদেশে হিন্দু ধর্মের বিবর্তনের মূল প্রবণতাসমূহ আলোচিত হবে। সবশেষে অন্ত্যজ ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীসমূহের ধর্মীয় জীবনের পরিবর্তনসমূহ সম্পর্কে আলোকপাত করা হবে।

সপ্তদশ শতকে বাংলায় ইসলামের প্রসার ও প্রকৃতি

১২৮৭ বঙ্গাব্দে বঙ্গদর্শনে ‘বাঙ্গালার ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকটি কথা’ শীর্ষক নিবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলাদেশে ইসলামের প্রসার সম্পর্কে কিছু মন্তব্য করেন, যা আজকের ঐতিহাসিকদের জন্যও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। প্রথমত, বাংলাদেশের মুসলমানদের অধিকাংশ বহিরাগত—এ যুক্তি মানতে বঙ্কিমচন্দ্র আদৌ রাজি নন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের মুসলমানেরা প্রধানত স্থানীয়, এ অনুমানের পক্ষে কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণের প্রয়োজন নেই। বর্তমান পরিস্থিতি থেকেই অতীত সম্পর্কে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব। তিনি লিখেছেন, ‘এখন ত দেখিতে পাই, বাঙ্গালার অর্দ্ধেক লোক মুসলমান। ইহার অধিকাংশই যে ভিন্নদেশ হইতে আগত মুসলমানদের সন্তান নয়, তাহা সহজেই বুঝা যায়। কেননা ইহার অধিকাংশই নিম্ন শ্রেণীর লোক—কৃষিজীবি। রাজার বংশাবলী কৃষিজীবি হইবে আর প্রজার বংশাবলী উচ্চশ্রেণী হইবে ইহা অসম্ভব। দ্বিতীয় অল্প সংখ্যক রাজানুচর এত অল্প সময়ের এত বিস্তৃতি লাভ করিবে, ইহাও অসম্ভব। অতএব দেশীয় লোকেরা যে স্বধর্ম ত্যাগ করিয়া মুসলমান হইয়াছে, ইহাই সিদ্ধ।’

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের নিম্নবর্ণের মানুষের মধ্যে ইসলাম ধর্মের জনপ্রিয়তা বঙ্কিমের কাছে ইতিহাসের একটি বড় প্রহেলিকা। ‘দেশীয় লোকরা অর্দ্ধেক অংশ কবে মুসলমান হইল? কেন স্বধর্ম ত্যাগ করিল? কেন মুসলমান হইল? কোন জাতীয়েরা মুসলমান হইয়াছে? বাংলার ইতিহাসে ইহার অপেক্ষা গুরুতর তত্ত্ব আর নাই।’

বাঙালি মুসলমানদের উত্পত্তি সম্পর্কে বিংশ শতাব্দীতে নৃতত্ত্ববিদ ও ঐতিহাসিকদের মধ্যে সুদীর্ঘ বিতর্ক হয়েছে। শেষ বিচারে বাংলার মুসলমানেরা এ দেশেরই নিম্নশ্রেণীর জনগোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত বঙ্কিমের এই অনুমানই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। তবে বঙ্কিম বাঙ্গালায় ইসলামের প্রসার সম্পর্কে যেসব প্রশ্ন তুলেছেন, এখন পর্যন্ত তার সন্তোষজনক মীমাংসা সম্ভব হয়নি। এর বড় কারণ, বাংলার বিশাল জনগোষ্ঠীর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ সম্পর্কে যথেষ্ট ঐতিহাসিক উপাত্ত পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই বাংলায় মুসলিম সমাজে কাল-অনুক্রমিক বিবর্তনের বিশ্লেষণ সব ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের প্রসার একটি ঘটনা নয়; এটি ছিল অত্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া। সপ্তদশ শতকে বাংলায় ইসলাম সম্পর্কে আলোচনার আগে এ প্রক্রিয়া সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণার প্রয়োজন। বঙ্কিমের উপস্থাপিত প্রশ্নের আলোকে এ প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করা যেতে পারে।

‘কবে মুসলমান হইল?’

বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ শতকে। ইসলাম ধর্মের উদ্ভবের প্রায় ৬০০ বছর পরে বাংলায় মুসলমান রাজত্ব শুরু হয়। এই দীর্ঘ সময় ধরে ভারত মহাসাগরের বাণিজ্য মুসলমান বণিকেরা কুক্ষিগত করে রেখেছিল। কাজেই মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠার অনেক আগেই এখানে মুসলমান বণিকদের আনাগোনা ছিল। এ ধরনের বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাংলায় ইসলাম প্রসারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেনি। তবে ত্রয়োদশ শতকে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানদের সঙ্গে যোগাযোগ অনেক বেড়ে যায়। তাই অনুমান করা হয় যে ত্রয়োদশ শতক থেকে শুরু করে বাংলাদেশে বড় ধরনের ধর্মান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলায় ইসলাম দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েনি। তিনটি কারণে অনুমান করা হয় যে বাংলায় ইসলাম ধর্মে দীক্ষিতকরণের প্রক্রিয়া অত্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে চলে।

প্রথমত, এটি একটি ভুল ধারণা যে যেখানেই ইসলামের রাজনৈতিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানেই অতি দ্রুত ইসলাম ধর্ম বিজিতদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের ঘটনা বাংলায় দূরে থাক, ইসলামের জন্মভূমি মধ্যপ্রাচ্যেও ঘটেনি। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আলবার্ট হুরানির বিশ্লেষণ থেকে দেখা যাচ্ছে যে, মুসলমান শাসনের ১০০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর ইরান, ইরাক, সিরিয়া, মিসর, তিউনিশিয়া ও স্পেনে মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশও ইসলাম কবুল করেনি। এসব দেশের নব্যদীক্ষিত মুসলমানেরা শহর অঞ্চলে আরব শাসকদের ছত্রচ্ছায়ায় বাস করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে স্থানীয় লোকদের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিতকরণের প্রক্রিয়া প্রায় ৪০০ বছর সময় ধরে চলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় বাংলায় ধর্মের প্রাধান্য ছিল অনেক বেশি। হিন্দুদের জন্য ইহকালের চেয়ে পরকাল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলার হিন্দুরা অতি সহজে মুসলমানদের শাসন মেনে নিয়েছে, কিন্তু ধর্মের ব্যাপারে ভারতের কোথাও হিন্দুরা আপস করতে চায়নি। এই প্রবণতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দার্শনিক উইল ডুরান্ট যথার্থই লিখেছেন, ‘হিন্দুরা একের পর এক বিদেশি সরকারকে তাদের ওপর আধিপত্য করার সুযোগ দিয়েছে, অংশত এর কারণ হচ্ছে—দেশি না বিদেশি কে তাদের শাসন বা শোষণ করছে সে ব্যাপারে তারা উদ্বিগ্ন ছিল না, তাদের কাছে রাজনীতি নয়, পরবর্তী অনন্ত জীবন ছিল তাদের আরাধ্য।’ এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলার হিন্দুদের ভিন্ন দেশের ধর্মে দীক্ষিত হওয়া মানসিক দিক দিয়ে একটি যন্ত্রণাদায়ক সিদ্ধান্ত ছিল। কাজেই এখানে ধর্মান্তর-প্রক্রিয়া অত্যন্ত দীর্ঘ হওয়াই স্বাভাবিক।

দ্বিতীয় প্রখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা ১৩৪৬ খ্রিষ্টাব্দে হজরত শাহজালালের সঙ্গে দেখা করার জন্য পূর্ববঙ্গের মধ্য দিয়ে সিলেট শহরে যান। তিনি প্রত্যাবর্তনের পথে ১৫ দিন ধরে মেঘনা নদীতে ভ্রমণ করেন। মেঘনার তীরবর্তী অধিবাসীদের তিনি ‘Infidels under Muslim rule’ বা মুসলমান রাজত্বের অধীনে কাফের বলে বর্ণনা করেছেন। ইবনে বতুতার ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকে এ কথা সুস্পষ্ট, পূর্ববঙ্গে চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত হিন্দুদের প্রাধান্য ছিল। ১৫১৪ খ্রিষ্টাব্দে

পর্তুগিজ পরিব্রাজক বরবোসা বাংলাদেশে আসেন। তিনি বাংলাদেশ সম্পর্কে নিম্নরূপ বর্ণনা দিয়েছেন, ‘রাজা হচ্ছেন একজন মুসলমান। তিনি একটি বড় রাজত্বের প্রভু এবং অত্যন্ত ধনী। তিনি হিন্দুদের দ্বারা অধ্যুষিত একটি দেশ অধিকারে রেখেছেন। এখানে রাজা ও তাঁর সহকর্মীদের কাছ থেকে সুবিধা নেওয়ার জন্য প্রতিদিন অনেক হিন্দু মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করছে।’ এসব ভ্রমণকাহিনি থেকে এ কথা সুস্পষ্ট যে মুসলমান শাসনের প্রথম ৩০০ বছরেও বাংলায় মুসলমান সংখ্যাধিক্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

তৃতীয়ত, পশ্চিম এশিয়া থেকে যেসব ধর্মপ্রচারক ইসলাম প্রচারের জন্য বাংলাদেশে এসেছিলেন, তাঁদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে তাঁরা ত্রয়োদশ শতক থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত বাংলাদেশে এসেছেন। বাংলাদেশে প্রখ্যাত ৫৯ জন ইসলাম প্রচারক পীর-দরবেশ সম্পর্কে একটি সমীক্ষা খানের Discovery of Bangladesh  গ্রন্থে করা হয়েছে। ওই সমীক্ষা থেকে দেখা যায় যে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার আগে তিনজন পীর বাংলাদেশে এসেছিলেন। মুসলিম শাসনামলে ৫৬ জন প্রখ্যাত ইসলাম প্রচারক পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর ভারত থেকে বাংলায় আসেন। এঁদের ১৫ শতাংশ ত্রয়োদশ শতকে আসেন, ৩৬ শতাংশ আসেন চতুর্দশ শতাব্দীতে: ১৮ শতাংশ আসেন পঞ্চদশ শতকে, ২৩ শতাংশ আসেন ষোড়শ শতকে। মাত্র ৩ শতাংশ আসেন সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে। এই সমীক্ষা থেকে প্রতীয়মান হয় যে বাংলায় ইসলাম প্রচার সবচেয়ে জোরেশোরে চলেছে ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে ষোড়শ শতাব্দী—এই ৪০০ বছর। তবে পীরেরা আসার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় হিন্দুরা মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করেনি। মৃত পীরেরা জীবিত পীরদের চেয়ে কম কার্যকর নন। অনেক ক্ষেত্রে মৃত পীরদের কাছে মানত মানার সুফল পেয়েও অনেক হিন্দু মুসলমান হতে পারে। ষোড়শ শতকের তুলনায় অনেক কম পীর সপ্তদশ শতকে বাংলাদেশে আসেন। সম্ভবত ষোড়শ শতকে যে পীরেরা বাংলায় আসেন, তাঁদের প্রভাব সপ্তদশ শতকেও অব্যাহত ছিল। সপ্তদশ শতকের পরে বাইরে থেকে বাংলাদেশে পীরদের আগমন একেবারে কমে যায়। এতে অনুমান করা যায় যে সপ্তদশ শতকে বাংলার পূর্ব ও উত্তর অঞ্চলে মুসলমানদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ বছর ধরে ধর্ম প্রচারের পর বাংলাদেশে জনসংখ্যার একটি বড় অংশ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।

কেন স্বধর্ম ত্যাগ করিল? কেন মুসলমান হইল?

বাংলায় ইসলামের বিস্ময়কর সাফল্য ব্যাখ্যার জন্য চার ধরনের তত্ত্ব উপস্থাপন করা হয়েছে। এই তত্ত্বগুলো নিম্নরূপ:

ক. মুসলমান শাসকদের ইসলাম ধর্ম প্রচারে আনুকূল্য;

খ. ব্রাহ্মণ্যবাদের উত্পীড়নের বিরুদ্ধে নিম্নবর্ণের বিদ্রোহ;

গ. হিন্দু উত্পীড়নের ফলে উত্পীড়িত বৌদ্ধদের ইসলাম গ্রহণ;

ঘ. মুসলিম পীরদের ধর্ম প্রচার;

কেউ কেউ অনুমান করেন যে মুসলমান শাসকেরা হিন্দুদের অত্যাচারের ভয় দেখিয়ে ও পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার করেছেন। দীর্ঘদিনের ইতিহাস থেকে দু-চারটি অত্যাচার বা ইসলাম গ্রহণের জন্য পুরস্কারের নজির বের করা অসম্ভব নয়। তবে মূলত বাংলায় ইসলাম প্রচারে শাসকদের ভূমিকা ছিল অতি নগণ্য। এই অনুমানের পক্ষে তিনটি যুক্তি রয়েছে। প্রথমত, যদি ধর্মান্তরে রাজাদের ভূমিকাই মুখ্য হয়, তবে রাজধানীর আশপাশের মুসলমানদের সংখ্যাধিক্য সবচেয়ে বেশি হতো। দীর্ঘ সাড়ে ছয় শ বছর ধরে দিল্লি মুসলমান শাসকদের রাজধানী হওয়া সত্ত্বেও দিল্লির আশপাশের অঞ্চলে মুসলমানেরা সংখ্যালঘিষ্ঠ। দিল্লি নগর ও তার আশপাশে বেশির ভাগ মুসলমানই ছিল বহিরাগত বা বহিরাগতদের বংশধর। যদি রাষ্ট্রশক্তি প্রয়োগ করে ধর্মান্তর করা হতো, তবে উত্তর ভারতে মুসলমানদের সংখ্যা এত নগণ্য হতো না। বাংলার দিকে তাকালেও দেখা যাবে যে ঢাকা ও মুর্শিদাবাদের (যেসব অঞ্চলে বাংলার মুসলমান শাসকেরা রাজত্ব করেছেন) তুলনায় মুসলমানের হার বগুড়া, পাবনা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ইত্যাদি প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক বেশি ছিল।

দ্বিতীয় মুসলমান শাসনামলে বাংলার মুসলমানেরা ছিল খুবই দরিদ্র। কবি কঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী লিখেছেন১০:

‘হিন্দু হইআ মুসলমান হয় গরসাল

কাঁণ হইয়া ম্যাগ্যা খায় পায়্যা নিশাকাল।’

অর্থাত্ ইসলামে ধর্মান্তরিত হিন্দুরা ‘গরসাল’ নামে পরিচিত ছিল এবং তারা রাত্রে অন্ধ সেজে ভিক্ষা করে জীবিকা অর্জন করে। চণ্ডীমঙ্গল থেকে দেখা যায় যে মুসলমান শাসনামলে স্থানীয় মুসলমানদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থান ছিল খুবই নিচে। আর্থিকভাবে মুসলমান শাসন থেকে সবচেয়ে বেশি লাভ হয় বাংলার বর্ণ হিন্দুদের (বিশেষ করে কায়স্থদের)। দরিদ্র ও অশিক্ষিত স্থানীয় মুসলমানদের এই শাসনব্যবস্থায় কোনো ভূমিকা ছিল না।১১ কাজেই মুসলমান সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলায় ইসলাম প্রচারিত হয়েছে—এ ধরনের অনুমান অমূলক।

তৃতীয়ত, কোনো কোনো ক্ষেত্রে (কদাচিত্) শাসকদের জোরজবরদস্তির যেমন নজির রয়েছে, তেমনি অনেক উদাহরণ রয়েছে যেখানে বাংলার মুসলমান শাসকেরা ইসলাম ধর্ম প্রচারে বিঘ্ন ঘটিয়েছেন। সমসাময়িক লেখক মির্জা নাথাম লিখেছেন, মোগল সুবেদার ইসলাম খান মুসলমান আমলাদের হিন্দুদের জোর করে মুসলমান করার জন্য শাস্তি দেন।১২ মানরিক ১৬৪০ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় আসেন। তিনি লিখেছেন যে মোগল সম্রাট মোল্লাদের অভিযোগ সত্ত্বেও খ্রিষ্টান মিশনারিদের প্রচারণা বন্ধ করতে অস্বীকার করেন।১৩ মনে রাখতে হবে যে মুসলমান শাসকেরা ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের কমপক্ষে ৬০০ বছর পরে বাংলায় আসেন। তত দিনে মুসলমান শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মীয় উদ্দীপনা স্তিমিত হয়ে গেছে। ধর্ম নয়, ব্যক্তিগত স্বার্থ ও গোষ্ঠীগত রাজনীতিই ছিল এদের সব কর্মকাণ্ডের নিয়ামক। ধর্মান্তরকরণ তাদের জন্য আদৌ গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

দ্বিতীয় ঘরানার ঐতিহাসিকেরা মনে করেন যে বাংলার নিম্নবর্ণের মানুষ ব্রাহ্মণ্যবাদের অত্যাচারে ক্ষুব্ধ হয়ে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করেছে। এ ধরনের বক্তব্য বেভারলি১৪ ও আর্নল্ডের১৫ লেখায় দেখা যাবে। এই বক্তব্য সমর্থন করে দীনেশচন্দ্র সেন লিখেছেন, ‘কিন্তু বাঙ্গলাদেশ চিরকালই দুর্দান্ত—স্বাধীনতাপ্রিয় সিংহকে খাঁচায় পুরিলে সে যে রূপ শৃঙ্খলকে দুঃসহ মনে করিয়া ছটফট করিতে থাকে, অত্যধিক ব্রাহ্মণ-শাসনে পীড়িত হইয়া বাঙ্গালী এই দৌরাত্ম্যের হাত হইতে নিষ্কৃতি পাইতে ব্যাকুল হইল। ব্রাহ্মণেরা মন্দিরগুলি আত্মসাত্ করিয়া দেবতাদিগকে আড়াল করিয়া দাঁড়াইলেন, জনসাধারণ ও তাহাদের মধ্যে এক দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর উত্থিত হইল। অভিমানে এ দেশে অনেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিল।’১৬

এ কথা ঠিক যে বাংলায় নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে প্রাণহীন ব্রাহ্মণ্যবাদকে প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু বাংলায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার এটি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা হতে পারে না। ব্রাহ্মণদের আধিপত্য শুধু বাংলায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে ব্রাহ্মণেরা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের বাংলার ব্রাহ্মণদের চেয়ে অনেক বেশি অত্যাচার করেছে। দক্ষিণ ভারতে শূদ্রদের কোনো দিক থেকেই ব্রাহ্মণের ৪০ হাত দূরত্বের মধ্যে প্রবেশ করতে দেওয়া হতো না। রাস্তায় কোনো ব্রাহ্মণ দেখলে শূদ্রদের ইউরোপের কুষ্ঠরোগীদের মতো পথ থেকে নামতে হতো। উত্তর ভারতে ব্রাহ্মণদের প্রতি ঘৃণা একটি প্রবাদে ব্যক্ত হয়েছে:

‘ইস দুনিয়া মে তিন কসাই

পিসু খাটমল, ব্রাহ্মণ ভাই’

(এই জগতে তিন ধরনের রক্তচোষা রয়েছে। পিসু (একধরনের মাছি), ছারপোকা ও ব্রাহ্মণ ভাই। লক্ষণীয়, ভারতের অন্যত্র ব্রাহ্মণদের প্রতি প্রচণ্ড অসন্তোষ সত্ত্বেও স্থানীয় অধিবাসীরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি।

দ্বিতীয় মধ্যযুগের বাংলার মুসলমানদের মধ্যে ধর্ম অনুমোদিত বর্ণ না থাকলেও প্রকট বৈষম্য বিরাজ করত। অভিজাত ‘আশরাফ’ ও নিম্নশ্রেণীর আজলাফ বা আতরাফের মধ্যে ছিল দুস্তর ব্যবধান। হিন্দু থেকে যাঁরা মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত হতেন, তাঁদের আশরাফ হিসেবে গণ্য করা হতো না। তাঁদের ঠাঁই হতো আতরাফদের বর্গে। আতরাফ শব্দটি আজলাফ শব্দের অপভ্রংশ। আজলাফ শব্দের অর্থ হলো নীচ লোক। তাঁদের ইতর, কমিন বা রাজেল (যার অর্থ হলো অপদার্থ) বলেও অভিহিত করা হতো। কাজেই মুসলমান হলেই সামাজিক বৈষম্য থেকে মুক্তি পাওয়া যেত, এ ধরনের অনুমান সঠিক নয়।

সবশেষে বাংলায় ব্রাহ্মণ্যবাদ ছিল অত্যন্ত দুর্বল। বাংলার ব্রাহ্মণদের অধিকাংশ কুলীন ব্রাহ্মণ ছিলেন না, অনেক ব্রাহ্মণ নিজেরাই ছিলেন বৈষম্যের শিকার। বাংলায় ব্রাহ্মণদের দুটো প্রধান শ্রেণি ছিল। শ্রোত্রীয় ব্রাহ্মণ ও বর্ণ ব্রাহ্মণ। শ্রোত্রীয় ব্রাহ্মণেরা বর্ণ ব্রাহ্মণদের হাত থেকে জল গ্রহণ করত না। চাষি কৈবর্তদের ব্রাহ্মণেরা এত নিচু পর্যায়ের ছিল যে তাদের যজমানরা পর্যন্ত তাদের গৃহে আহার করত না। বাঙ্গালার ব্রাহ্মণেরা নিজেরাই অনেক শ্রেণিতে বিভক্ত। একে অপরকে শোষণ করত। গোটা সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো ঐক্য তাদের ছিল না।

উপরিউক্ত যুক্তিসমূহ বিবেচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বাংলায় ইসলাম প্রচারে একটি সহায়ক উপাদান হলেও মূল চালিকাশক্তি ছিল না। যদি তা-ই হতো, তবে বাংলার অনেক আগে বিহার ও দক্ষিণ ভারতে মুসলিম সংখ্যাধিক্য সুপ্রতিষ্ঠিত হতো।

তৃতীয় ঘরানার ঐতিহাসিকদের বক্তব্য হলো যে হিন্দুদের অত্যাচারে বাংলায় বৌদ্ধরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।১৭ এই মতবাদের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হলেন দীনেশচন্দ্র সেন। তিনি লিখেছেন, ‘বঙ্গদেশীয় মুসলমান সমাজের নিম্নশ্রেণীর অধিকাংশ লোকই বৌদ্ধ সম্প্রদায় হইতে গৃহীত।’১৮ এই বক্তব্যের কয়েকটি বড় দুর্বলতা রয়েছে।

প্রথমত, এটি অত্যন্ত ভুল ধারণা যে মুসলমান শাসনের আগে বাংলায় বেশির ভাগ লোক বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ছিল। নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, বৌদ্ধধর্মাবলম্বী পাল সম্রাটদের শাসনামলে বাংলায় বৌদ্ধদের তুলনায় অনেক বেশি হিন্দু ছিল।১৯ কাজেই যদি ধরেও নেওয়া হয় সব বৌদ্ধ ইসলামে দীক্ষিত হয়, তবু বাংলায় বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইসলামের প্রাধান্য সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না।

দ্বিতীয়ত, যদি হিন্দুদের অত্যাচারে বৌদ্ধরা মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করে থাকে, তবে মুসলমান শাসনের প্রথম এক/ দুই শতকের মধ্যে তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করত। ইবনে বতুতার ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকে এ কথা স্পষ্ট যে চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশে কাফেরের বা অমুসলমানের সংখ্যাই ছিল অনেক বেশি। মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠার পর বৌদ্ধদের ওপর হিন্দুদের অত্যাচার কমে যাওয়ার কথা। কাজেই মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কয়েক শ বছর পরে হিন্দুদের অত্যাচারে বৌদ্ধরা ইসলাম গ্রহণ করে এ ধরনের যুক্তি মেনে নেওয়া শক্ত।

তৃতীয়ত, মুসলমানেরা বৌদ্ধদের প্রতি আদৌ সদয় ছিলেন, এ ধরনের কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং মুসলমান শাসকেরা বৌদ্ধদের অত্যাচার করেছেন। সমকালীন ঐতিহাসিক মিনহাস উস সিরাজ লিখেছেন যে ইখতিয়ারউদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি উদয়ন্তপুরী বিহার ধ্বংস করেছেন ও নেড়ে মুণ্ড বৌদ্ধদের হত্যা করেছেন। হিন্দুরা গৌতম বুদ্ধকে দেবতা গণ্য করত, মুসলমানরা গৌতম বুদ্ধ বা তাঁর মতবাদের প্রতি কোনো শ্রদ্ধা দেখায়নি। এই অবস্থায় স্থানীয় বৌদ্ধরা (তাদের সংখ্যা যা-ই হোক না কেন) দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করেছে এ ধরনের অনুমান গ্রহণযোগ্য মনে হয় না।

চতুর্থ ঘরানার ঐতিহাসিকেরা মনে করেন যে বাংলায় ইসলামের সাফল্যের সবচেয়ে বড় কারণ হলো মুসলমান পীর, দরবেশ ও সুফি সাধকদের ধর্ম প্রচার। এ বক্তব্য সঠিক, তবে আংশিকভাবে সঠিক। সঠিক এই অর্থে যে মুসলমান পীর, দরবেশ ও আউলিয়ারাই বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইসলামের বাণী পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমে সাধারণ মানুষের পক্ষে ইসলামের সঙ্গে পরিচিত হওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে পীর-দরবেশরা শুধু বাংলাদেশেই আসেননি। মুসলমান পীর-আউলিয়ারা ভারতের সব স্থানেই ইসলামের বাণী প্রচার করেছেন। এঁদের মধ্যে খাঁজা মঈনউদ্দিন চিশতি (ত্রয়োদশ শতাব্দী), বু আলি কলন্দর (১৪ শতক), দাতা গঞ্জ বক্স (১১ শতাব্দী), কুতুবউদ্দিন, নিজামউদ্দিন আউলিয়া, শাহ ফরিদ উদ্দিন, সৈয়দ মোহাম্মদ ঘিসু দরাজ, পীর মহাবীর কামদিয়াত, ইমাম শাহ প্রভৃতি সর্বভারতে শ্রদ্ধেয় বুজুর্গজন রয়েছেন। এ ঘরানার বক্তব্য গ্রহণ করতে হলে বুঝতে হবে কেন বাংলার বাইরে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে পীর-দরবেশরা ইসলাম ধর্ম প্রচারে সাফল্য অর্জন করতে পারেননি। অবশ্য এঁদের আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ও কার্যদক্ষতা বাংলার মুসলমান ধর্ম প্রচারকদের থেকে কম ছিল না। প্রশ্ন হলো, ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে ব্যর্থতা সত্ত্বেও মুসলমান ধর্ম প্রচারকেরা বাংলায় কেন সফল হলেন? এ প্রশ্নের উত্তর না দিতে পারলে এ ঘরানার ঐতিহাসিকদের বক্তব্য পূর্ণাঙ্গ হবে না।

ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বাংলার মুসলমান ধর্ম প্রচারকদের সাফল্য সম্পর্কে সম্প্রতি তিনটি ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রথম ব্যাখ্যাটি দিয়েছেন ঐতিহাসিক অসীম রায়।২0 তিনি মনে করেন যে বাংলায় ইসলাম ধর্ম প্রচারক পীর-আউলিয়াদের প্রকৃতি ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের অনুরূপ প্রচারকদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর মতে, বাংলার পীরদের তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রথমত, বাংলার পীর বলতে শুধু আধ্যাত্মিক মুরশিদ বা ফকির-দরবেশ বোঝায় না। পীরদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে দেবতার পর্যায়ে উন্নীত সফল সেনাপতি, অনাবাদি এলাকার অগ্রণী বসতকার ও রূপান্তরিত হিন্দু ও বৌদ্ধ দেবতা। দ্বিতীয়ত, বাংলায় পীরদের ভাবমূর্তি শুধু ইসলামি আদর্শে প্রভাবান্বিত হয়নি। পীরদের ভাবমূর্তি লৌকিক দেবতাদের আদলে গড়ে তোলা হয়। ব্যাঘ্র দেবতা, সর্প দেবী, কুমির দেবীর মতো দেবত্ব লাভকারী প্রাণীর আত্মাকে বাংলায় পীরের ক্ষমতার সঙ্গে একীভূত করা হয়। সবশেষে, বাংলায় নিয়ত পরিবর্তনশীল অশান্ত বদ্বীপের পরিবেশে যেখানে নদীভাঙন, বন্যা, প্রলয়ংকরী ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক রুদ্ররোষ জীবনকে অস্থিতিশীল করে রেখেছে। এই পরিবেশে পীরেরা একটি বন্ধনকারী শক্তি হিসেবে মানুষের জীবনে শান্তির প্রলেপ নিয়ে আসেন। তাই মানুষ দলে দলে স্থানীয় পীরদের অনুসরণ  করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।

অসীম রায় যেসব বৈশিষ্ট্যের জন্য বাংলায় পীরদের অনন্য বলেছেন, সেসব গুণ ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের পীরদেরও ছিল। রায়ের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে দুটি প্রধান দুর্বলতা রয়েছে। প্রথমত, বাংলায় পীরদের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের পীরদের বিস্ময়কর সাদৃশ্য রয়েছে। বাংলার অধিকাংশ কিংবদন্তি পীরকে উপমহাদেশের অন্যান্য অংশেও সমভাবে ভক্তি-শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়। উত্তর ভারতের মধ্যে মুসলমান ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে পাঁচ পীরের পূজা সমভাবে জনপ্রিয়। মুসলমান বিশ্বের সর্বত্র খাজা খিজরকে ভক্তি-শ্রদ্ধা করা হয়। বাংলায় তিনি পীর বদর নামে পরিচিত। গাজী মিয়াকে বাংলায় বিয়ে-শাদি ও সন্তান ধারণের পীর হিসেবে পূজা করা হয়। উত্তর প্রদেশ ও পাঞ্জাবে গাজী মিয়াকে সমভাবে ভক্তি-শ্রদ্ধা করা হয়। বাংলায় প্রেমের পীর হচ্ছেন মনাই পীর, গরু-বাছুরের রক্ষক হচ্ছেন তিন নাথ, গ্রাম রক্ষাকারী হচ্ছেন মানিক পীর, বাঘের আক্রমণ থেকে রক্ষা করেন গাজী সাহেব এবং জানমালের হেফাজতকারী হচ্ছেন সত্যপীর। ভারত উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যেও একই ধরনের স্থানীয় পীরকে উপাসনা করা হয়েছে। বাঙালি মানিক পীরের পাঞ্জাবি প্রতিরূপ হচ্ছে শাখি সরওয়ার সুলতান। শেখ সাদ্দু হচ্ছেন মনাই পীরের উত্তর ভারতীয় সংস্করণ। উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুরূপ স্থানীয় পীরদের মধ্যে রয়েছে গুগ্গা পীর, পীর লালবাগ, পীর শাহতাব, পীর মিলা, পীর দিদার কাঠ বাওয়া সাহেব, পীর ইমাম জামিল ইত্যাদি। রায় মনে করছেন যে বাংলার প্রকৃতি ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি নিষ্ঠুর। এ অনুমান সঠিক নয়। গরিব মানুষের জন্য পৃথিবীর সর্বত্রই প্রকৃতি নিষ্ঠুর। যেহেতু বাংলায় পীরদের প্রকৃতির রুদ্ররোষ থেকে রক্ষাকারী হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, সেহেতু তাঁরা ভারতের অন্য অঞ্চলের পীরদের থেকে ভিন্ন—এ অনুমানের কোনো ভিত্তি নেই।

দ্বিতীয়ত, রায় মনে করেন যে বাংলায় হিন্দুরা বিচ্ছিন্নভাবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি, এখানে পীরদের উদ্যোগে গণধর্মান্তর ঘটেছে। গণধর্মান্তরের বিষয়টি বিশদভাবে পরীক্ষা করে মোহর আলি মনে করেন যে বাংলায় ইসলাম ধর্মে আদৌ কোনো গণধর্মান্তর হয়নি। মোহর আলির নিম্নলিখিত বক্তব্যটি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য।21 ‘লক্ষণীয় যে সাহিত্য বা অন্য কোনো সূত্রে কোনো কালে বা কোনো স্থানে বড় ধরনের ধর্মান্তরের কোনো উল্লেখ নেই। উঁচু বা নিচু যেকোনো শ্রেণির মানুষের মধ্যে গণধর্মান্তরের কোনো ঘটনা যদি ঘটে থাকত, তবে তত্কালীন ঘটনাপঞ্জির দলিল বা ধর্মজীবনীতে তা অবশ্যই স্থান পেত। সে যুগের লেখকগণ তাঁদের নেতাদের ধর্মীয় সাফল্যের বর্ণনা করার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সচেতন ছিলেন, তাই তা দলিল-দস্তাবেজে অবশ্যই স্থান করে নিত, এমন ধারণা করা যায়।’ বাংলায় গণধর্মান্তর ঘটলে কোনো কোনো অঞ্চলে জনসংখ্যার প্রায় ১০০ ভাগই মুসলমান হতো। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশে (যখন ধর্মের কারণে অভিবাসন ঘটেনি) এমন গ্রাম খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যা পুরোপুরি মুসলমান অধ্যুষিত। কোনো জেলাতেই হিন্দুদের জনসংখ্যা ২০ শতাংশের কম ছিল না। চতুর্দশ শতকে হজরত শাহজালাল ৭০০ ধর্মপ্রচারক নিয়ে সিলেট অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। ৫০০ বছর মুসলিম ধর্ম প্রচারকদের অব্যাহত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সিলেট জেলায় ১৯৩১ সালে জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের বেশি ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী। যদি গণধর্মান্তর ঘটত তবে সিলেটে জনসংখ্যার অনেক বড় অংশ মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করত।

রিচার্ড এম ইটন অসীম রায়ের সঙ্গে একমত যে পীরদের প্রচেষ্টাতেই বাংলায় ইসলামের সাফল্য সম্ভব হয়েছে। তিনি অসীম রায়ের সঙ্গে একমত যে বাংলায় নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ইসলামে গণধর্মান্তর ঘটেছে। অবশ্য গণধর্মান্তরের কোনো নতুন নজির দেননি। তবে পীরদের জনপ্রিয়তার কারণ সম্পর্কে তিনি অসীম রায়ের সঙ্গে একমত নন। তিনি মনে করেন যে পূর্ব বাংলায় পীরদের জনপ্রিয়তার একটি কারণ হলো, পীররা উত্তর ভারত ও পশ্চিম বাংলার অনুর্বর অঞ্চল থেকে তাঁদের শাগরেদদের দক্ষিণ বাংলার বাদা অঞ্চলে অভিবাসনের নেতৃত্ব দিয়েছেন।২২ তাঁর ভাষায়, ‘এ অঞ্চলের পূর্বেকার ঘন জঙ্গলকে ধানখেতে রূপান্তরিত করার জন্য উন্নততর সাংগঠনিক দক্ষতা ও প্রচুর জনবলের প্রয়োজন পড়েছিল।’ পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলায় সক্রিয় বদ্বীপ উপনিবেশ গড়ে তোলার নেতৃত্ব এসেছে পীরদের মধ্য থেকে। এসব বসতি বাইরের অভিবাসীসহ স্থানীয় জেলে সম্প্রদায় ও ভাসমান কৃষক সম্প্রদায়কে আকৃষ্ট করে। তারা এসব নতুন বসতিতে মসজিদ নির্মাণ করে এবং মসজিদই ইসলামের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।

ইটনের এই অভিনব ব্যাখ্যা অনুসারে বাংলায় পীরেরা শুধু আধ্যাত্মিক নেতৃত্বই দেননি, তাঁরা দক্ষিণ ও পূর্ব বাংলার ঘন জঙ্গল পরিষ্কার করে নতুন উর্বর জমিতে তাঁদের অনুসারীদের বসতি স্থাপন করে তাদের বৈষয়িক জীবনকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাই ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বাংলায় পীরদের জনপ্রিয়তা অনেক বেশি। ইটনের বিশ্লেষণের বিস্তারিত বিশ্লেষণ খানের Discovery of Bangladesh গ্রন্থে দেখা যাবে।২৪ এখানে শুধু তিনটি বক্তব্য উপস্থাপন করাই যথেষ্ট হবে।

প্রথমত, ইটনের বক্তব্যের পক্ষে যথেষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। জহর সরকারের ভাষায় ইটনের বক্তব্যের পক্ষে ‘স্বল্প প্রত্যক্ষ প্রমাণ রয়েছে।’২৫ তিনি বলছেন যে পীরেরা ঘন জঙ্গল পরিষ্কার করে তাদের শাগরেদদের নিয়ে দক্ষিণ ও পূর্ববঙ্গের বাদা ও ভাটি অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছেন। কিন্তু দুই-তিনজন পীর ছাড়া অন্যদের নাম উল্লেখ করতে পারেননি। তিনি বলছেন যে পশ্চিমবঙ্গ এমনকি উত্তর ভারত থেকে পীরেরা বসতি স্থাপন করার জন্য শাগরেদদের নিয়ে এসেছেন। কোন অঞ্চল থেকে কখন পীরের নেতৃত্বে এ ধরনের অভিবাসন ঘটেছিল সে সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই।

দ্বিতীয়ত, ইটন মনে করেন যে মুসলমান পীরেরাই দক্ষিণ ও পূর্ব বাংলার ঘন জঙ্গলকে আবাদযোগ্য করেছেন। কোনো কোনো স্থানে মুসলমান পীরেরা কৃষির জমি সম্প্রসারণে অবদান রাখতে পারেন। তবে দক্ষিণ ও পূর্ববঙ্গে জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষবাস মুসলমান পীরদের আগমনের অনেক আগেই শুরু হয়েছে এবং মুসলমান পীরদের অভিবাসন থেমে যাওয়ার পরও ২০ শতক পর্যন্ত চলেছে। ষষ্ঠ শতাব্দীর শিলালেখে ফরিদপুর অঞ্চলকে নব্যাবশিকা বলা হয়েছে। আক্ষরিক অর্থে এই অঞ্চল হলো নতুনভাবে সৃষ্ট ভূমি। এ অঞ্চলে পীরদের তদারকি ছাড়াই বসতি গড়ে উঠেছে। অনুরূপ ঊনবিংশ শতকে বরিশাল-খুলনা অঞ্চলে জঙ্গল পরিষ্কার করে উপনিবেশ স্থাপন করা হয়েছে। এ ধরনের বসতি স্থাপনের পেছনে পীর-মুরশিদদের কোনো ভূমিকা ছিল না।

তৃতীয়ত, দক্ষিণ অঞ্চলের নতুন বসতির অঞ্চল থেকে উত্তর অঞ্চলের প্রাচীন বসতির অঞ্চলে মুসলমানদের প্রাধান্য দেখা যায়। ১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দের আদমশুমারি অনুসারে খুলনায় জনসংখ্যায় মুসলমানদের হিস্যা ছিল ৫১.৪ শতাংশ, বাকেরগঞ্জে ৬৬.৬ শতাংশ ও নোয়াখালীতে ৭৪.১ শতাংশ। পক্ষান্তরে বগুড়ায় মুসলমানের অনুপাত ছিল ৮০.৮ শতাংশ, পাবনায় ৭২.৪ শতাংশ ও রাজশাহীতে ৭৮.৪ শতাংশ। স্পষ্টতই ইটনের তত্ত্ব অনুসারে বগুড়া, পাবনা ও রাজশাহীর মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যাখ্যা করা যায় না। অন্যদিকে খুলনায় মুসলমান পীরদের কার্যকলাপ সত্ত্বেও জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক হিন্দুই থেকে গিয়েছিল।

উপরিউক্ত বিশ্লেষণের আলোকে বাংলায় ইসলাম প্রচার সম্পর্কে খান নিম্নলিখিত প্রবণতাসমূহ চিহ্নিত করেছেন।২৬

— বাংলাদেশে ইসলাম আকস্মিকভাবে আবির্ভূত হয়নি। ত্রয়োদশ খ্রিষ্টাব্দ থেকে শুরু করে একটি দীর্ঘ স্থায়ী প্রক্রিয়ায় ইসলাম প্রচারিত হয়েছে। বাংলাদেশে বহিরাগত পীর-দরবেশদের কার্যাবলি পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে শুরু করে সপ্তদশ ও সম্ভবত অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত পাঁচ থেকে ছয় শ বছর ধরে ধীরে ধীরে পূর্ব বাংলায় ইসলাম ধর্ম প্রাধান্য লাভ করেছে।

— বাংলায় গণধর্মান্তর ঘটেনি। এখানে বিচ্ছিন্নভাবে ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে ধর্মান্তর ঘটেছে। তাই এখানে ধর্মান্তরের প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত প্রলম্বিত।

— বাংলাদেশে জীবিত পীরদের তুলনায় মৃত পীরদের মাধ্যমে ধর্ম প্রচারিত হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় জীবিত পীরদের তুলনায় মৃত পীরদের ভূমিকা কম

সক্রিয় ছিল না। মৃত পীরদের কাছে মানত মেনে ফল পাওয়ায়ও অনেকে

মুসলমান হয়েছেন।

— দক্ষিণ এশিয়ার সর্বত্রই মুসলমান পীর-দরবেশরা ধর্মপ্রচারে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু বাংলায় তাঁরা যতটুকু সফল হয়েছেন অন্যত্র তা সম্ভব হয়নি। তার প্রধান কারণ হলো বাংলায় দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় গ্রামসমূহ প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অত্যন্ত দুর্বল। যেখানে গ্রামীণ সংগঠন শক্তিশালী ছিল, সেখানে ধর্মান্তরের সুযোগ ছিল সীমিত। অধ্যাপক বেশামের মতে, শক্তিশালী গ্রামীণ সংগঠনের উপস্থিতির জন্য দক্ষিণ ভারতে হিন্দু ধর্ম টিকে থেকেছে।২৭ অথচ বাংলায় বিশেষ করে পূর্ব বাংলায় শক্তিশালী গ্রামীণ সংগঠন ছিল না। বাংলার পূর্ব দিকে বেশির ভাগ গ্রামীণ সংগঠন ছিল অত্যন্ত দুর্বল। যতই পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে যাওয়া যায় ততই গ্রামীণ সংগঠনের প্রকৃতি পরিবর্তিত হতে থাকে। বাংলার পশ্চিম অঞ্চলে গ্রামীণ সংগঠন ছিল শক্তিশালী। তাই পশ্চিমাঞ্চলে হিন্দু সংখ্যাধিক্যই থেকে যায়। (বাংলাদেশে গ্রামীণ সংগঠনের অনন্যতার বিশ্লেষণ খানের Discovery of Bangladesh বইয়ে দেখা যাবে)। যেখানে গ্রামীণ সংগঠন দুর্বল থাকে, সেখানে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ প্রবল হয়। বাংলায় যেসব অঞ্চলে গ্রামীণ প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী ছিল না, সেখানে মানুষ তাদের পছন্দমতো ধর্ম বেছে নিয়েছে। বাংলার বাইরে অন্যান্য অঞ্চলের অধিবাসীরা মুসলমান পীর-দরবেশদের আধ্যাত্মিক ক্ষমতায় আকৃষ্ট হলেও গ্রাম থেকে বহিষ্কারের ভয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে পারেনি। ইসলাম গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে যেকোনো ব্যক্তি পতিত হয়ে যায়। তাদের জন্য হিন্দু ধর্ম চিরদিনের জন্য রুদ্ধ হয়ে যায়। মনুর অনুশাসন হচ্ছে এই যে লোকের বর্ণচ্যুতি ঘটে তার সঙ্গে কথা বলা এমন কি ওঠা-বসাও উচিত নয়; উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি তাকে দেওয়া যাবে না, সাধারণভাবে তার সঙ্গে কোনো সম্পর্কও রাখা চলবে না। আরও বলা হয়েছে যে কোনো লোক যদি পতিত কোনো লোকের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে, তবু সে পতিত বলে গণ্য হবে। বর্ণচ্যুতির শাস্তি শুধু বর্তমান জন্মেই সীমিত নয়, আগামী সাত জন্ম পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে। তাই ধর্মান্তরিত মুসলমানদের মধ্যে পূর্বতন লোক ধর্মে বিশ্বাস সত্ত্বেও হিন্দু ধর্মে প্রত্যাবর্তন সম্ভব ছিল না।

পীরদের প্রাধান্যের ফলে মধ্য যুগের বাংলায় সুফিবাদ মুসলমানদের গভীরভাবে প্রভাবান্বিত করে। বাংলায় প্রধানত সাতটি ঘরানার সুফি মতবাদ দেখা যায়। এই ঘরানাগুলো হচ্ছে: ১. সোহরাওয়ার্দী, ২. চিশতি, ৩. কলন্দরিয়া, ৪. মাদারিয়া, ৫. আদহামিয়া, ৬. নক্সবন্দি ও ৭. কাদেরিয়া। তবে এ সাতটি ঘরানার মধ্যে বাংলাদেশের ধর্মীয় জীবনে ফলন্দরি, মাদারি ও অদহমী সম্প্রদায়ভুক্ত সুফিরা সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী ছিল। এই সুফি মতবাদসমূহ পশ্চিম এশিয়া থেকে উত্তর ভারতের মধ্য দিয়ে বাংলায় আসে। সুফি মতবাদের সঙ্গে তান্ত্রিক, মরমিয়া ও যোগ সাধনে বিশ্বাসী সাধকদের বিশ্বাস ও আচরণের সঙ্গে অনেক মিল রয়েছে। তাই সুফিবাদ সহজেই স্থানীয় বিশ্বাস ও আচার অনুষ্ঠানের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়।

ইসলাম ধর্মে দীক্ষা স্থানীয় মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনের ওপর কী প্রভাব এনেছে সে সম্পর্কেও বিতর্ক রয়েছে। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার মুসলমানেরা লোকধর্মের (folk religion) বিশ্বাস ও আচার-আচরণ সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করেনি। তাই তারা প্রথম দিকে নামমাত্র মুসলমান ছিল। পরবর্তীকালে এরা মৌলবাদী আন্দোলনের ভেতর দিয়ে আপসহীন মুসলমানে পরিণত হয়। এ মতবাদের প্রধান প্রবক্তা হলেন অসীম রায়২৭ ও রিচার্ড এম ইটন।২৮ এ কথা সত্য যে ইসলাম প্রচারের প্রথম পর্যায়ে ধর্মান্তরিত মুসলমানদের ওপর লোকধর্মের দেবদেবতা বা বিশ্বাসের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। তবু রায় ও ইটনের তত্ত্বের দুটি প্রধান দুর্বলতা রয়েছে। প্রথমত, বাংলার সব মুসলমান একই ধরনের জীবন ধারণ করেনি। অনেকে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকেই ইসলাম নির্দেশিত জীবন যাপন করেছে। বহিরাগত মুসলমানেরা এ ধরনের জীবন যাপন করত। ষোড়শ শতকে মুকুন্দরাম এ ধরনের মুসলমানদের জীবনযাত্রার নিম্নরূপ বর্ণনা করেছেন।২৯

ফজর সময়ে উঠি  বিছাই লোহিত পাটী

পাঁচ বেরি করয়ে নমাজ

সোলেমানী মালা ধরে জপে পীর পেগম্বরে

পিরের মোকামে দেই সাঁজ

দশ বিশ বিয়াদবে বসি আ বিচার হবে

অনুক্ষণ পড়য়ে কোরান

বেসাইআ কেহ হাট পিরের সিরনি বাটে

সাঁজে বাজে দগড়ি নিসান।

দ্বিতীয়ত, ইসলাম গ্রহণ করা দূরের কথা, মুসলমানদের সঙ্গে চলাফেরা করলেই হিন্দুরা জাতিচ্যুত হতো। কাজেই ধর্মান্তরিত মুসলমানদের হিন্দু ধর্মে ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। তবু বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের দিক থেকে বৈষ্ণববাদ এবং সুফিবাদ অতি কাছাকাছি চলে আসে। ডক্টর এনামুল হকের ভাষায়: ‘...গোড়ীয় বৈষ্ণবদের এই “নামে রুচি জীবে দয়া” মুসলিম সুফি সাধকদের “জিকর” ও “খিদমত্” নীতির নামান্তর... “কীর্তন” ও “সমা” এবং “দশা” ও “হাল” শব্দার্থ ভাব, সম্পাদনা ব্যবস্থা ও মানবিক অনুভূতির দিক হইতে একই বস্তুর অভিব্যক্তি। বিশেষত গোড়ীয় বৈষ্ণবদের “প্রেম”, সুফিদের “ইশক” “রাধা-কৃষ্ণ” সুফীদের “সাকী” ও “বুত্” কিংবা শমআ ও পরওয়ানা, ঐশ্বর্য সুফিদের কিয়ামত ছাড়া কিছুই নহে। সুফিদের “গজলিয়াত” ও বৈষ্ণবদের “পদাবলী” ভাব ও রচনা উভয় হইতে অনেকখানি এক। সুফি সাহিত্যের “মৈয়” ও “শরাব”, বৈষ্ণব পদাবলীতে প্রেম ও পীরিতি হইয়া দেখা দিয়াছে। সুফি সাহিত্যের “আশিক ও মাসুক” বৈষ্ণব পদাবলীর “রাধা ও কৃষ্ণ”। এই সাহিত্যের “হিজরান” ও “বিশাল” বৈষ্ণব পদাবলীর বিরহ ও মিলন।’৩০

এত সাদৃশ্য সত্ত্বেও বৈষ্ণববাদ ও সুফিবাদের দুটি ধারা সমান্তরালে প্রবাহিত হয়েছে কিন্তু কখনো একত্র হয়নি। এর কারণ ছিল দুটি। প্রথমত, বাংলার সুফি সাধকেরা মুসলমান শাসনের বড় সমর্থক ছিলেন। তাঁরা সুন্নি মুসলমান শাসকদের রাষ্ট্র পরিচালনায় বিঘ্ন সৃষ্টির চেষ্টা করেননি। হয়তো তাঁরা মনে করতেন যে মুসলমান শাসনের ছত্রচ্ছায়া ছাড়া হিন্দু সমাজপতিরা তাঁদের মতবাদ উচ্ছেদ করবেন। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাই সুফিবাদ সুন্নি শাসনকে দৃঢ়তর ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করেছে। অন্যদিকে বৈষ্ণবদের পক্ষ থেকে সুফিবাদে প্রভাবান্বিত স্থানীয় মুসলমানদের বৈষ্ণববাদে অঙ্গীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বৈষ্ণবরাও মুসলমানদের পতিত গণ্য করত।

সুন্নি শাসকদের প্রাধান্য সত্ত্বেও সপ্তদশ শতকে বাংলার মুসলমানদের সঙ্গে ইরানের শিয়াদের যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। শের শাহ কর্তৃক বিতাড়িত হয়ে ষোড়শ শতকে মোগল সম্রাট হুমায়ুন ইরানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি যখন বিজয়ীর বেশে ভারতে ফেরেন তখন তাঁর সঙ্গে ইরানি শিয়া সৈন্যরা ভারতে প্রবেশ করেন। শিয়ারা মোগল শাসনযন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়। সপ্তদশ শতকে বাংলায় অনেক রাজপুরুষ ছিলেন শিয়াধর্মাবলম্বী। অনেক শিয়া ব্যবসায়ী ও ইরানে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে পরাভূত রাজপুরুষেরা বাংলার শহর অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। তবে বাংলার মোট মুসলিম জনসংখ্যায় এসব নগরবাসী শিয়াদের হিস্সা ছিল অত্যন্ত নগণ্য। রাজনৈতিক দিক থেকে অষ্টাদশ শতকে তারা গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করলেও, সপ্তদশ শতকে বাংলায় শিয়াদের রাজনৈতিক ভূমিকা ছিল সীমিত। তবে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে শিয়াদের প্রভাব অনুভূত হয়। শিয়াদের উদ্যোগে মহররম বাংলার মুসলমানদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। উপরন্তু কারবালার মর্মন্তুদ ট্র্যাজেডি মুসলমান সাহিত্যিকদের চিন্তা ও চেতনাকে উদ্দীপ্ত করে। বাংলা ভাষায় মর্সিয়া সাহিত্যের আত্মপ্রকাশ ঘটে।’ মকতুল হুসৈন, ‘কারবালা’, ‘জঙ্গনামা’, ‘মহরম পর্ব’ ইত্যাদি শিরোনামে মোগল শাসনামলে কারবালার বিয়োগান্ত নাটক বাংলা ভাষায় প্রচারিত হয়। এমনকি মনসামঙ্গল কাব্যে হাসান ও হোসেন নামে চরিত্র দেখা যায়।৩১

সপ্তদশ শতকে বাংলায় হিন্দু ধর্মের বিবর্তন

খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতক থেকে বাংলাদেশে শাক্ত ধর্মের প্রাধান্য দেওয়া যায়।৩২ শাক্ত ধর্মের পাশাপাশি বাংলায় তান্ত্রিক ধর্মের বিকাশ ঘটে। শাক্ত ও তান্ত্রিক মতবাদই হলো বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের ধর্মের মূল ভিত্তি। বৈষ্ণব আন্দোলনের মতো জনপ্রিয় আন্দোলনও শাক্ত-তান্ত্রিক ধর্মের পথ থেকে অধিকাংশ বাঙালিকে বিচ্যুত করতে পারেনি।

বাংলায় শাক্ত-তান্ত্রিক ধর্মের ক্ষেত্রে সপ্তদশ শতকে কোনো বড় ধরনের ঘটনা ঘটেনি। তবু শাক্ত-তান্ত্রিক হিন্দুদের ধর্মচর্চার ক্ষেত্রে দুটি প্রবণতা দেখা যায়। প্রথমত, শাক্ত-তান্ত্রিক হিন্দুদের মধ্যে পশ্বাচার সম্প্রদায়ের প্রাধান্য হ্রাস পায় এবং কুলাচার সম্প্রদায়ের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। পশ্বাচার সম্প্রদায় সব দেবদেবীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এই সম্প্রদায়ের মূল বিশেষত্ব হলো এই যে তারা গুরুর কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করে ও তার কাছ থেকে মন্ত্র গ্রহণ করে। কুলাচার সম্প্রদায় গুরুবাদে বিশ্বাস করলেও এরা তিন ধরনের শক্তি বা প্রকৃতিতে বিশ্বাস করে। একটি শক্তি শরীরে গুহ্য রয়েছে। একটি শক্তি বর্ণে বিভাসিত এবং আরেকটি শক্তি

রয়েছে নারীতে। এরা পশ্বাচার সম্প্রদায়ের মতো সাত্ত্বিক সাধনায় বিশ্বাসী নয়। পঞ্চমকার বা মত্স্য, মাংস, মদ্য, মুদ্রা ও মৈথুনকে এরা সাধনার অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করে। ক্রমে শাক্ত-কুলাচার যৌন অনাচারের বাহন হয়ে দাঁড়ায়। বর্ণ প্রথা সম্পর্কেও পশ্বাচার ও কুলাচার সম্প্রদায়ের মতভেদ ছিল। কুলাচার মতবাদ বিশ্বাস করত যে কুলাচার পালন করলে একজন শূদ্রও ব্রাহ্মণের মর্যাদা অর্জন করতে পারে। এঁরা বিশ্বাস করতেন যে কুলাচার নির্ধারিত পথ অনুসরণ করলে নিম্নবর্ণের ব্যক্তিরাও দেবত্ব অর্জন করবে। পক্ষান্তরে পশ্বাচার বর্ণপ্রথাকে অমোঘ বিধান হিসেবে মেনে নেয়।

দ্বিতীয়ত, ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে শাক্ত-তন্ত্রের অনুসারী পণ্ডিতরা তাঁদের ধর্মমত সমর্থনে গ্রন্থ রচনা করেন। পুরানন্দ পরমহংস পরিব্রাজিকা ষোড়শ শতকের শেষ দিকে তান্ত্রিক ধর্মমত ব্যাখ্যা করে বই লেখেন। এ ছাড়া মহাদেব বিদ্যাবাগীশ আনন্দ লহরী শীর্ষক বইটি লেখেন ১৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে এবং শারদ তিলক শিরোনামে আরেকটি বই লেখেন ১৬১৮ খ্রিষ্টাব্দে। তবে এসব গ্রন্থে শাক্ত-তান্ত্রিক মতবাদের কোনো নতুন ব্যাখ্যা বা দর্শন নেই। সামগ্রিকভাবে এসব লেখক প্রচলিত মতেরই পুনরাবৃত্তি করেছেন।

সপ্তদশ শতকে শাক্ত-তন্ত্রের অনুসারীদের মধ্যে কুলাচারের জনপ্রিয়তা বাড়ে। অষ্টাদশ শতকে এই সম্প্রদায় বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তপন রায় চৌধুরী মনে করেন যে পঞ্চদশ থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত সময়কালে বাংলাদেশে কুলাচার সম্প্রদায়ের বিস্তৃতি ঘটে।৩৩

সপ্তদশ শতকে বাংলায় হিন্দুদের ধর্মের জগতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো শ্রীচৈতন্য প্রবর্তিত বৈষ্ণববাদের বিবর্তন ও অবক্ষয়। বৈষ্ণববাদ শ্রীচৈতন্য আবিষ্কার করেননি। ভক্তি আন্দোলনের উত্স হিন্দু ঐতিহ্যের গভীরে প্রোথিত। তবু বাংলাদেশে ভক্তি আন্দোলনে প্রাণসঞ্চার করেন শ্রীচৈতন্য দেব (১৪৮৫-১৫৩৩ খ্রিষ্টাব্দ)। চৈতন্য দেবের আবির্ভাবের আগে বাংলাদেশে হিন্দু ধর্ম রঘুনন্দনের মতো শাস্ত্রকারদের প্রভাবে নিছক আচার-অনুষ্ঠানে পর্যবসিত হয়। বর্ণব্যবস্থা মানুষের মধ্যে বিভেদের প্রাচীর গড়ে তোলে। অন্যদিকে বহিরাগত ইসলাম ধর্ম বাংলায় জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশকে আকৃষ্ট করে। এই পরিস্থিতিতে শ্রীচৈতন্য দেব একই সঙ্গে হিন্দু ধর্মের পুনরুজ্জীবন ও ইসলামের প্রভাব প্রতিহত করার উদ্যোগ নেন। শ্রীচৈতন্যের প্রবর্তিত বৈষ্ণববাদের মূল বিশেষত্ব ছিল নিম্নরূপ:

ভক্তির প্রাধান্য। শ্রীচৈতন্যের আগে ধর্ম পালনে শাস্ত্রভিত্তিক জ্ঞান ও আচার অনুষ্ঠানকে প্রাধান্য দেওয়া হতো। শ্রীচৈতন্যের বক্তব্য হলো, জ্ঞান নয় ভক্তিই মুক্তির একমাত্র উপায়। তাই মুক্তির জন্য ভক্তের ব্যক্তিগত নিষ্ঠাই যথেষ্ট, মধ্যবর্তী কোনো পুরোহিত বা ব্রাহ্মণের প্রয়োজন নেই। মুক্তির জন্য প্রয়োজন অষ্টপ্রহর কৃষ্ণের নামকীর্তন। কীর্তনের মধ্যে কৃষ্ণ ও ভক্তের মধ্যে ব্যক্তিগত প্রেমের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হবে।

জাতিভেদ প্রত্যাখ্যান। শ্রীচৈতন্য বর্ণব্যবস্থাভিত্তিক জাতিভেদ প্রত্যাখ্যান করেন। নিম্নবর্ণের লোকদের উচ্ছিষ্ট খাওয়ার জন্য তিনি এক শিষ্যকে সাধুবাদ জানান। কথিত আছে যে যবন হরিদাসের মৃত্যুকালে তিনি সমবেত ব্রাহ্মণদের হরিদাসের পাদোদক পান করিয়েছিলেন। তিনি বলতেন, ‘মোর জাতি—মোর সেবকের জাতি নাই।’ শ্রীচৈতন্যের ব্রাহ্মণবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে বিদ্রূপ করে রক্ষণশীল সমাজ তাই বলত ‘সব অ-বিধি নদের বিধি।’

শ্রীচৈতন্যের মহাপ্রয়াণের পর বৈষ্ণবধর্ম বিস্তৃতি লাভ করলেও এর মধ্যে বড় ধরনের গুণগত পরিবর্তন দেখা দেয়। এসব পরিবর্তনের মধ্যে নিম্নলিখিত প্রবণতাসমূহ বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

শ্রীচৈতন্য ও তাহার প্রধান অনুচরদের দেবত্ব আরোপ। শ্রীচৈতন্য নিজে কখনো দেবত্ব দাবি করেননি এবং তিনি শ্রীকৃষ্ণ ও ভক্তদের মধ্যে কোনো মধ্যবর্তীর ভূমিকা স্বীকার করেননি। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস এই যে কয়েক দশকের মধ্যে শ্রীচৈতন্যকে অবতারের মর্যাদা দেওয়া হয়। শ্রীচৈতন্যকে বাস্তবজীবনের সঙ্গে সম্পর্কহীন এক কিংবদন্তির দেবতা হিসেবে গড়ে তোলা হয়। কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনায় অনাহারে শ্রীচৈতন্যের দেহ অস্থিচর্ম সার হয়ে উঠেছিল। বিদ্রূপ করে দীনেশচন্দ্র সেন লিখেছেন, ‘কৃষ্ণ নগরের কুমাররা তাহার যে মূর্তি প্রস্তুত করে, তাহাতে চৈতন্যদেব গোসাঁইদের মত নধর কান্তি ভুঁড়িটি অগ্রগণ্য, তৈলে ঘৃতে মাখনে পুষ্ট দেহ।’৩৪ শ্রীচৈতন্যকে বিষ্ণুর অবতারের আসনে প্রতিষ্ঠিত করে বৈষ্ণব ধর্মের গোঁসাইরা নিজেরাও দেবত্ব দাবি করে ও ভক্তদের তাদের পূজা করতে বাধ্য করে। চৈতন্যের প্রধান সঙ্গীদের প্রত্যেকেই রাধাকৃষ্ণ লীলাসংক্রান্ত দ্বাপর যুগের শ্রীকৃষ্ণের কোনো সঙ্গীর অবতার রূপে কীর্তিত হলেন। নিত্যানন্দ চিহ্নিত হলেন বলরাম, অদ্বৈতকে বলা হলো সদাশিবের অবতারকেশব, ভারতীকে বলা হলো শ্রীকৃষ্ণের গুরু সন্দীপনী মুনি। আবার শ্রীচৈতন্যের কোনো কোনো সঙ্গীকে কৃষ্ণলীলায় নারী চরিত্রের অবতাররূপে কল্পনা করা হয়েছে। নরহরি দাস হলেন মধুমালতী, রামানন্দ, বিশাখা রূপ—শ্রীরূপ মঞ্জুরি, সনাতন, লবঙ্গ মঞ্জুরী ইত্যাদি। এরা ভক্তদের ও আরাধ্য দেবতার মধ্যে নতুন মধ্যবর্তী শ্রেণির সৃষ্টি করে ভক্তির মূল চেতনাকেই দুর্বল করে দেয়।

জাতিভেদের প্রত্যাবর্তন। নব্য বৈষ্ণববাদে জাতিভেদকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করা হয়। দুইটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জাতিভেদ বৈষ্ণব ধর্মে ফিরে আসে। প্রথমত, রক্ষণশীল সমাজের পক্ষ থেকে বৈষ্ণবদের একঘরে করা হয়। রক্ষণশীল সমাজকে অগ্রাহ্য করলে হিন্দু সমাজে অচল হয়ে পড়বে। এই ভয়ে অনেক বৈষ্ণব ভক্তই জাতিভেদ মেনে নিতে বাধ্য হন। অদ্বৈত ও নিত্যানন্দের বংশধরেরা বহু চেষ্টা করে ও বহু অর্থ ব্যয় করে খড়দহ ও শান্তিপুর অঞ্চলে ব্রাহ্মণকুলীনদের সঙ্গে আদান-প্রদান সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। দ্বিতীয়ত, যেখানে বৈষ্ণবরা শক্তিশালী ছিল সেখানে রক্ষণশীল হিন্দুরা বৈষ্ণব নেতাদেরই ব্রাহ্মণের মর্যাদা দান করেন। উদাহরণস্বরূপ নরোত্তমের উদাহরণ স্মরণ করা যেতে পারে। নরোত্তম ব্রাহ্মণবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। বৈষ্ণবরা এক বিরাট জনসভা করে নরোত্তমকে খাঁটি ব্রাহ্মণ বলে ঘোষণা করে। তবে বৈষ্ণবদের এই বিদ্রোহ ছিল সীমিত। এরা আন্তবর্ণের বিবাহ প্রচলন করতে পারেনি। এমনকি ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও বিভিন্ন বর্ণের লোকেরা একসঙ্গে আহার করত না। যদিও চৈতন্য দেব জনগণের মুখের ভাষায় ধর্ম প্রচার করেছেন তবু তার শিষ্যরা সংস্কৃত ভাষায় তাঁদের পাণ্ডিত্যপূর্ণ বক্তব্য উপস্থাপন করেন। আদর্শগতভাবে জাতিভেদ অস্বীকার করলেও বৈষ্ণববাদ সনাতন হিন্দু সামাজিক বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি।

শ্রীচৈতন্যের মৃত্যুর পর বৈষ্ণববাদ বিভিন্ন শাখা ও গোত্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বৈষ্ণববাদের দুটি প্রধান ভৌগোলিক কেন্দ্র গড়ে ওঠে। বাংলার বাইরে বৃন্দাবনে ছয়জন গোস্বামী নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। গৌড়ে বৈষ্ণবদের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন শ্রীনিবাস আচার্য, নরোত্তম দত্ত ও শ্যামানন্দ। তবে মূল বিভাজন ঘটে তাত্ত্বিক প্রশ্নে। এই তাত্ত্বিক বিতর্কের মূল প্রশ্ন ছিল কৃষ্ণের মনে রাধা ও অন্যান্য গোস্বামীদের প্রেম ও দৈহিক সম্পর্কে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে। এই প্রশ্নে বৈষ্ণবরা স্বকীয়া ও পরকীয়া দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। স্বকীয়া মতবাদের প্রবক্তারা মনে করতেন যে রাধা ও কৃষ্ণের অন্যান্য গোপিনী প্রেমিকাদের সঙ্গে কৃষ্ণের বিয়ে হয়েছিল। তবে যোগমায়ার বলে তাদের স্বামীরা তা বুঝতে পারেনি। পরকীয়া মতবাদের সমর্থকেরা মনে করেন যে কৃষ্ণের সঙ্গে রাধা ও গোপিনীদের সম্পর্ক ছিল বিবাহবহির্ভূত।

পরকীয়া ব্যাখ্যার সমর্থকেরা বাংলায় দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত সহজিয়া সাধনা ও তান্ত্রিক আচার-অনুষ্ঠান মিলিয়ে বৈষ্ণব সহজিয়া ধারা গড়ে তোলেন। এ মতের প্রবক্তারা নিজেদের কৃষ্ণের লীলা সঙ্গিনী গোপিনী হিসেবে কল্পনা করত এবং নরহরি সরকারের মতো অনেক পুরুষ নারীসুলভ জীবন ধারণ করত। ভক্তিবাদের সহজিয়া ধারায় বিভিন্ন ধরনের যৌন বিকৃতি ও অনাচার দেখা দেয়। সপ্তদশ শতকে সহজিয়া বৈষ্ণববাদ, মুসলিম সুফিবাদ ও শাক্ত-তান্ত্রিকদের কুলাচার আচার-আচরণ ও বিশ্বাসের দিক অনেক ক্ষেত্রেই খুবই কাছাকাছি চলে আসে। সাধক কবি আলি রাজা (১৬৯৫-১৭৮০) যিনি সপ্তদশ শতকে জন্মগ্রহণ করেন, তিনি ছিলেন পরকীয়া মতের সমর্থক। তিনি লিখেছেন,৩৫

 

‘স্বকীয়ার সঙ্গে নহে অতি প্রেমরস

পরকীয়ার সঙ্গে যোগ্য প্রেমের মানস।’

(বিবাহিতা নারীর প্রেমে অত্যধিক প্রেম রস নাই, পরস্ত্রী প্রেমিক মনের যোগ্য।)

আলি রাজার রচনা থেকে দেখা যাচ্ছে যে মুসলিম সুফি সাধকেরাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সহজিয়াভাব ধারায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। বাংলায় সুফিবাদ, বৈষ্ণববাদ, শৈব এবং বৌদ্ধ-তান্ত্রিক ধারণার সংমিশ্রণে নিম্নবর্ণের জনগোষ্ঠীতে নতুন নতুন সাধনার বিকাশ ঘটে। এসব সমন্বয়বাদী ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কর্তাভজা সম্প্রদায় ও বাউল সম্প্রদায়। কর্তাভজা সম্প্রদায়ের প্রবর্তক আওল চাঁদ (১৬৮৬-১৭৭৬) সপ্তদশ শতকে সক্রিয় ছিলেন। বাউল সম্প্রদায় অবশ্য অনেক পুরোনো। পঞ্চদশ শতকে শাহ মোহাম্মদ সগীরের ইউসুফ-জোলেখা গ্রন্থে বাউল শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। তবে এসব মতবাদ মূল জনগোষ্ঠীকে প্রভাবান্বিত করেনি। বাউল ও কর্তাভজা মতবাদ বাংলার কোনো কোনো অঞ্চলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে।

সামগ্রিকভাবে বৈষ্ণব আন্দোলন ধর্মের ক্ষেত্রে বাংলার মানুষকে একত্র করতে পারেনি। রক্ষণশীল হিন্দুরা শ্রীচৈতন্য প্রবর্তিত কীর্তনের বিরোধিতা করে। শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতে এ সম্পর্কে লেখা হয়েছে,৩৬

‘হেন কালে পাষণ্ডী পাঁচ সাত অইল

আসি কহে হিন্দুর ধর্ম ভাঙ্গিল নিমাত্রি

যে কীর্তন প্রবর্তাইল কভু শুনি নাই।

****

কৃষ্ণের কীর্তন করে নীচ বার বার

এই পাপে নব দ্বীপ হইবে উজাড়।’

রক্ষণশীল হিন্দুরা মনে করত যে বৈষ্ণববাদ হিন্দু ধর্মের অপূরণীয় ক্ষতি করছে। অন্যদিকে বৈষ্ণব সাহিত্যে শাক্তদের পাষণ্ড বলে আখ্যায়িত করা হতো। বৈষ্ণব সাহিত্যে পাষণ্ডদের যৌন অনাচার ও মদ্যপানের নিন্দা করা হয়। ইসলামের সঙ্গে বৈষ্ণবদের সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে তপন রায় চৌধুরী যথার্থই লিখেছেন, "As regards their attiude to Islam, it was one of contempt, if not of positive hostility’৩৭ ইসলামের প্রতি তাঁদের (বৈষ্ণবদের) দৃষ্টিভঙ্গি অবিসংবাদিত বৈরিতা না থাকলেও অবজ্ঞা ছিল। কৃষ্ণ দাস কবিরাজ (জন্ম ১৫৯৭) রচিত শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতে ইসলাম সম্পর্কে শ্রীচৈতন্যের উক্তি উদ্ধৃত করে বিদ্বেষমূলক ও ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করা হয়েছে।

 

হরিদাস কলিকালে যবন অপার

গো ব্রাহ্মণ হিংসা করে অতি দুরাচর \

ইহা সবার কোনো মতে হইবে নিস্তার

তাহার হেতু না দেখিয়ে, এ দুঃখ সবার

হরিদাস কহে, প্রভু চিন্তা না করিহ

যবনের সংসার দেখি দুঃখ না ভাবিহ \

যবন সকলের মুক্তি হবে অনায়াসে।

হারাম হারাম বোল কহে নামাভাসে।৩৮

 

(ভাবার্থ: শ্রীচৈতন্য হরিদাসকে বলিলেন, অসংখ্য যবন (মুসলমান) ব্রাহ্মণদের হিংসা করে, গো হত্যা করে এবং তারা দুরাচার। এদের সবার শাস্তি থেকে নিস্তার নেই এবং এ জন্য শ্রীচৈতন্য উদ্বিগ্ন। জবাবে হরিদাস বলিলেন যে মুসলমানদের মুক্তি নিয়ে চিন্তার কারণ নেই। কারণ তাহারা ঘন ঘন হারাম (যাহা শুনিতে হায়-রামের মতো শোনায়) জপিতেছে। কাজেই রামের নাম জপ করিয়া তাহারাও মুক্তি লাভ করিবে।)

উপরের বাংলা উদ্বৃতিতে মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ ব্যক্ত করা হলেও শেষে হারাম শব্দের ব্যাপারে মুসলমানদের প্রতি ঔদার্য প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলা শ্লোকটির শেষে ইসলামবিদ্বেষী একটি তথাকথিত পুরাণের শ্লোক কৃষ্ণদাস কবিরাজ শ্রীচৈতন্যের মুখে যোগ করেন। ডক্টর শহীদুল্লাহ্ মনে করেন যে তথাকথিত পুরাণের শ্লোকটি জাল।৩৯

ইসলামের প্রতি অনুরূপ অবজ্ঞা জয়ানন্দ ও ঈশান নাগরের রচনায়ও দেখা যায়। পক্ষান্তরে মুমিন মুসলমানেরাও কাফেরদের ঘৃণা করত। এই বিদ্বেষ ও ঘৃণার পরিবেশে ধর্মের ক্ষেত্রে সমন্বয়বাদী ধারা কখনো প্রাধান্য লাভ করতে পারেনি।

অবৈদিক ধর্মীয় বিশ্বাসের হিন্দু ধর্মের মূলধারায় স্বীকৃতি

বাংলার হিন্দুরা শুধু শিব ও বিষ্ণুর মতো বৈদিক দেবতা নিয়ে সন্তুষ্ট ছিল না। বাংলার লোকধর্মে অবৈদিক দেবতারাও একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছেন। এঁদের মধ্যে রয়েছেন ধর্ম ঠাকুর, মনসা, চণ্ডী, ষষ্ঠী, পঞ্চানন্দ ঠাকুর ও ঘাট কর্ম ইত্যাদি। এঁদের অনেকের ভক্তসংখ্যা এত বেশি ছিল যে তাদের সবাইকে সনাতন হিন্দু ধর্মের বাইরে রাখা সম্ভব ছিল না। ষোড়শ শতকের প্রখ্যাত বাঙালি শাস্ত্রকার রঘুনন্দন বেশ কয়েকজন অবৈদিক দেবতাকে স্বীকার করে নেন। তাঁর গ্রন্থে মনসা, ঘণ্টাকর্ম, শীতলা দেবী, মঙ্গল চণ্ডিকা ও সুতিকা ষষ্ঠিকার পূজার বর্ণনা রয়েছে। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মঙ্গলকাব্যের ও পীরের পাঁচালির প্রাচুর্য এসব দেবদেবীর অবিসংবাদিত জনপ্রিয়তার স্বাক্ষর। যেসব দেবদেবীর কর্মকাণ্ড ও মাহাত্ম্য শ্রবণ করিলে দৈহিক ও মানসিক মঙ্গল হয়, তাহাকেই মঙ্গলকাব্য বলে। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ নিম্নলিখিত ১৬ প্রকারের মঙ্গলকাব্য চিহ্নিত করেছেন। মনসা মঙ্গল, চণ্ডী মঙ্গল, ধর্ম মঙ্গল, কালিকা মঙ্গল, বাসুলী মঙ্গল, শীতলা মঙ্গল, ষষ্ঠী মঙ্গল, সারদা মঙ্গল, সূর্য মঙ্গল, রায় মঙ্গল, বরদা মঙ্গল, গোসানী মঙ্গল, লক্ষ্মী মঙ্গল, গঙ্গা মঙ্গল, কপিলা মঙ্গল ও পীর মঙ্গল। এসব মঙ্গলকাব্য প্রধানত ত্রয়োদশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী সময়কালে রচিত হয়। তবে পঞ্চদশ শতকের শেষদিকে ও ষোড়শ শতকে বেশি মঙ্গলকাব্য রচিত হয়। মধ্যযুগের বাংলায় মনসা ও চণ্ডীর মতো মঙ্গলকাব্যের অনেক দেবতাই সমাজে স্বীকৃতি লাভ করেন।

সপ্তদশ শতকের একটি বড় পরিবর্তন হলো, রাঢ় অঞ্চলে ধর্ম ঠাকুর হিন্দু ধর্মের মূল ধারায় বৈদিক দেবদেবীদের মতো মর্যাদা অর্জন করেন। জহর সরকারের মতে, ১৫৯০ থেকে ১৬৬০ পর্যন্ত সময়কালে বর্ধমান, বাঁকুড়া, বীরভূম, মেদেনীপুর অঞ্চলের অন্ত্যজ জনগোষ্ঠী ও আদিবাসীরা হিন্দু হিসেবে গৃহীত হয়। এরা ছিল মূলত ধর্ম ঠাকুরের পূজারি। সুকুমার সেন মনে করেন যে ‘ধর্ম ঠাকুরের পূজায় হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলমান সব ধর্মেরই অনুষ্ঠান অল্প-বিস্তর নেওয়া হইয়াছে।’ মূলত দক্ষিণ রাঢ়ের নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ধর্ম ঠাকুরের পূজা করতেন। দুটি কারণে ধর্ম ঠাকুরের উপাসকদের হিন্দু ধর্মের মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথমত, বাংলার পূর্বাঞ্চলে ইসলামের অভূতপূর্ব সাফল্যে আতঙ্কিত হয়ে, রাঢ় অঞ্চলের ব্রাহ্মণেরা ধর্ম ঠাকুরের উপাসকদের হিন্দু ধর্মে অঙ্গীভূত করার উদ্যোগ নেন। দ্বিতীয়ত, গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র ব্রাহ্মণদের যথেষ্টসংখ্যক যজমানের অভাবে আর্থিক সংকট দেখা দেয়। কাজেই গ্রামীণ দরিদ্র ব্রাহ্মণেরা রাঢ় অঞ্চলের ধর্ম ঠাকুরের উপাসকদের হিন্দু ধর্মের কাছে গ্রহণযোগ্য করার উদ্যোগ নেন।

জহর সরকারের মতে, রাঢ় অঞ্চলে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিজে নিজে গড়ে ওঠেনি।৪০ রাঢ় অঞ্চলে হিন্দু ধর্মের প্রচারের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাঁর মতে, পঞ্চদশ/ ষোড়শ শতক থেকে রাঢ় অঞ্চলে দুটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রবণতা দেখা দেয়। প্রথমত, মত্স্যজীবী, শিকারি ও অন্যান্য অকৃষি কাজে নিয়োজিত বর্ণের ব্যক্তিরা সার্বক্ষণিক চাষবাসের কাজ শুরু করে। এই প্রক্রিয়ার নাম দেওয়া হয়েছে peasantization বা কৃষি পেশায় উত্তরণ। রাঢ় অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসমূহ (কৈবর্ত সদগোণ, পোদ, চণ্ডাল, ডোম) পূর্ণকালীন কৃষিকাজ শুরু করলে তারা উচ্চতর সামাজিক মর্যাদা দাবি করে। তার ফলে বিংশ শতাব্দীর আদমশুমারিসমূহে মাহিষ্য শ্রেণির (যারা ছিল কৃষক) জনসংখ্যা রাঢ় অঞ্চলে দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

দ্বিতীয় প্রক্রিয়াটি সমাজতত্ত্বে sanskritization বা সংস্কৃতায়ন নামে পরিচিত।৪১ সমাজতত্ত্ববিদ শ্রীনিবাসন হিন্দুদের মধ্যে এ প্রক্রিয়াকে চিহ্নিত করেছেন। শ্রীনিবাস দেখিয়েছেন যে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা যখন আর্থিক সমৃদ্ধি লাভ করে, তখন তারা উচ্চবর্ণের হিন্দুদের আচার-অনুষ্ঠান পালন করে নিজেদের বর্ণগত মর্যাদা বাড়িয়ে তোলে।৪২ বাংলার রাঢ় অঞ্চলেরও অকৃষি (যথা—মত্স্যজীবী, শিকারি, যাযাবর) জনগোষ্ঠীসমূহে পূর্ণকালীন কৃষিকাজে নিয়োজিত হওয়ার পর উচ্চবর্ণের মর্যাদা লাভ করে। তবে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় রাঢ় অঞ্চলের সংস্কৃতায়ন কিছুটা ভিন্ন। এখানে অন্ত্যজ জনগোষ্ঠীতে (যাদের মোটামুটিভাবে বেশির ভাগ নিম্নবর্ণের ছিল) হিন্দু ধর্মে অঙ্গীভূত করার উদ্যোগ নেন গ্রামের পুরোহিতরা। পশ্চিম বাংলায় সংস্কৃতায়ন-প্রক্রিয়ায় শুধু অন্ত্যজ জনগোষ্ঠীকেই উচ্চতর সামাজিক মর্যাদা দেওয়াতে সীমাবদ্ধ ছিল না। এখানে অবৈদিক দেবদেবীকে হিন্দু ধর্মের দেবদেবীর মর্যাদা দেওয়া হয়। বিপুলসংখ্যক অন্ত্যজ জনগোষ্ঠী সামাজিকভাবে ও আদর্শগতভাবে হিন্দু সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়।

জহর সরকারের এ তত্ত্ব পশ্চিম বাংলায় হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা সম্পর্কে একটি নতুন দিক তুলে ধরেছে। তবে এই তত্ত্বের মূল্যায়ন করতে গিয়ে তপন রায় চৌধুরী যথার্থই লিখেছেন, “জহর সরকার তার নাতিদীর্ঘ নিবন্ধে সব প্রশ্নের জবাব দেন নি, সব তথ্যের তথ্য-ভিত্তি প্রকাশ করেননি, যা দিয়েছেন তা তার অসাধারণ বিশ্লেষণ শক্তি এবং বহু বিষয়ে জ্ঞানের পরিচয়।” এই অনুমানটি নিয়ে আরও গবেষণার অবকাশ রয়েছে।৪৩

উপসংহার

মধ্যযুগের বাংলায় ধর্ম ছিল সমাজজীবনের একটি চালিকাশক্তি। তবে বাংলায় কোনো ধর্মীয় ঐক্য ছিল না। এখানে অনেক ধর্ম, সম্প্রদায় ও তন্ত্র একই সঙ্গে বিকশিত হয়েছে। সপ্তদশ শতকে বাংলায় ধর্মের জগতে কোনো নাটকীয় ঘটনা ঘটেনি। তবু নেপথ্যে এ অঞ্চলে আস্তে আস্তে অনেক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের প্রবণতা দেখা গেছে।

ধর্মীয় বিশ্বাসের জগতে একই সঙ্গে বিভক্তি ও সমন্বয়ের প্রবণতা দেখা যায়। প্রথম বিভক্তি দেখা দেয় হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে। আবার হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের ভেতরেও বিভক্তি ও দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। বৈষ্ণব ধর্ম বাংলার হিন্দুদের একত্র করেনি। বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু শাক্ত-তান্ত্রিক মতবাদ অনুসরণ করে। আবার শাক্ত-তান্ত্রিক মতাবলম্বীরা ও বৈষ্ণবরা নিজেরা বিভক্ত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে নিম্নবর্ণের মানুষের মধ্যে সমন্বয়বাদের প্রবণতা দেখা দেয়। মুসলিম সুফি, বৈষ্ণব সহজিয়া ও শাক্তদের কুলাচারের মধ্যে অনেক সাদৃশ্য দেখা যায়। এই সময়ে কর্তাভজা সম্প্রদায় বাউল সম্প্রদায় এই সমন্বয়ের ধারাকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। অবৈদিক দেবতারা হিন্দু ধর্মে স্বীকৃতি লাভ করে। এসব পরিবর্তন সত্ত্বেও ধর্মীয় সংঘাত দূরীভূত হয়নি। হিন্দুরা মুসলমানদের ‘ম্লেচ্ছ’ ও ‘যবন’ নামে আখ্যায়িত করতা আর মুসলমানেরা হিন্দুদের কাফের বলে গণ্য করত। হিন্দু ও মুসলমানেরা নিজেরাও বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিল এবং এ সম্প্রদায়সমূহ একে অপরের বিরোধিতা করত।

ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলার অধিবাসীরা ভৌগোলিকভাবে তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পূর্ব ও উত্তর অঞ্চলে দেখা যায় ইসলামের প্রাধান্য। পশ্চিম বাংলার রাঢ় অঞ্চলের পূর্বভাগে দেখা যায় হিন্দু ধর্মের শাক্ত ও বৈষ্ণবমতের প্রাধান্য। রাঢ় অঞ্চলের দক্ষিণ ও পশ্চিম ভাগে অবৈদিক দেবদেবীর পূজারিরা সংস্কৃতায়ন প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে হিন্দু সমাজের অঙ্গীভূত হয়। সপ্তদশ শতকে এই বিভক্তিসমূহ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে এই বিভক্তিসমূহই বিংশ শতকে রাজনৈতিক বিভক্তির ইন্ধন জোগায়।

তবে ধর্মের ক্ষেত্রে এসব বিভক্তি সবটুকুই লোকসান নয়। এসব বিভক্তির ফলেই মানুষ তাদের পছন্দমতো ধর্ম বেছে নিতে পেরেছিল। কবি মনোহর দাস (ষোড়শ/ সপ্তদশ খ্রিষ্টাব্দ) যথার্থই লিখেছেন,৪৪

 

‘নানা শাস্ত্র নানা ধর্ম আছয়ে সংসারে

মোর শক্তি নাহি হয় এসব আচারে।

আমি কোন ছার ধর্ম আচরণ করি

থাকুক ধর্মের দায় মর্ম বুঝিতে নারি।

ধর্ম যারে বলে তিনি ব্রাহ্মণ্ড বেড়িয়া

স্থাবর জঙ্গম আদি দেখ বিচরিয়া।

হূদয়ে উদয় যেই সেই কার্য সার

তাহা বিন অন্য ধর্মকর্ম কিবা সার।’

‘হূদয়ে উদয়ে যেই’ সেই কাজকেই সার করে বাঙালি তার ধর্ম পালন করেছে। ধর্মের ক্ষেত্রে বাঙালি সব সময়েই হূদয়কে অনুসরণ করেছে।

তথ্যনির্দেশ

১. Richard M. Eaton, The Rise of Islam and the Bengal Frontier, Delhi: Oxfrord University Press, 1994, P. 153.

২. Tapan Ray Chaudhuri, Bengal under Akbar and Gahangir, Delhi, Munshiram, Monoharlal, 1969, P. 135.

৩. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়,বঙ্কিম রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, কলকাতা: কামিনী প্রকাশনালয়, ১৯৯১, পৃষ্ঠা ৩৪০।

৪. এই বিতর্ক সম্পর্কে দেখুন Akbar Ali Khan Discovery of Bangladesh: Explorations into Dynamics or a Hidder Nation, Dhaka; University Press Limited, 2001, P. 83-89.

৫. Albert Hourani, A History of the Arab Peoples, New York, Boston; Warner Books 1991, P. 46-47.

৬. Will Durant, Our Oriental Heritage, New York: Simon and Schuster, 1963, P. 503.

৭. Ibn Batuta, Travels in Asia and Africa 1325-1354, Tranaslated by H. A. R. Gibb, New York: Augustus M. Kelly, 1969, P. 257.

৮. উদ্ধৃত, সুখময় মুখোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাসে দুশ বছর, কলকাতা: ভারতী বুক স্টল, ১৯৯৬, পৃ. ৩৪৬।

৯. Akbar Ali Khan, Discovery of Bangladesh, Dhaka: University Press Ltd. 1996

১০. সুকুমার সেন (সম্পা.), কবিকঙ্কণ মুকুন্দচণ্ডীমঙ্গল, নয়াদিল্লি ও কলকাতা: সাহিত্য একাডেমি, ২০০১, পৃ. ৭৯।

১১. Muhammad Abdur Rahim, Social and Cultural History of Bangal, Vol. II, Karachi: Pakistan Publishing House, 1967.

১২. Mirza Nathan, Bahiristani-i-Ghaibi, 2 Vols, Eng. by M. I. Borah. Gauhati: 1936.

১৩. উদ্ধৃত, Richard M. Eaton, The Rise of Islam and the Bengal Frontier, P. 179.

১৪. Henry Beverley, Census of Bengal 1871, Calcutta: Bengal Secretariat Press, 1872.

১৫. Thomas Walker Arnold, The Preaching of Islam, New Delhi: Adam Publishers and Distributors, 2010.

১৬. দীনেশচন্দ্র সেন, বৃহত্ বঙ্গ, দ্বিতীয় খণ্ড, কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং হাউস, ১৯৯৩, পৃ. ৯৮৭।

১৭. Murray T. Titus, Islam in India and Pakistan, Calcutta: YMCA Publishing House, 1959, P. 45.

১৮. দীনেশচন্দ্র সেন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০০১।

১৯. নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালির ইতিহাস: আদি পর্ব, কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং হাউস, ১৪০০ বঙ্গাব্দ, পৃ. ৩৪।

২০. Ramesh Chandra Majumdar, Struggle for Empire, Bombay: Bharartya Vidya Bhavan, 1958, P. 50-51.

২১. Asim Roy, The Islamic Syncretistic Tradition in Bengal, Dhaka: Academic Publishers, 1983.

২২. Mohammad Mohar Ali, History of the Muslims of Bengal, Vol. IB Riyadh: Imam Mohammad Ibn Saud Islamic University 1985, P. 782.

২৩. Richard M. Eaton, প্রাগুক্ত।

২৪. Jawahar Sircar, The Construction of the Hindu Identity in Medieval Western Bangal: The Role of Popular Cults, Calcutta: Institute of  Historical Studies, 2005 P. 53.

২৫. আকবর আলি খান, বাংলাদেশের সত্তার অন্বেষা, অনুবাদ আমিনুল ইসলাম ভুঁইয়া, ঢাকা, বাংলা একাডেমি, ২০০৫।

২৬. A.L. Basham, The Wonder That was India: A Survey of the History and CUlture of the Indian Sub-continent before the Coming of the Muslims, New York: Grove Press, 1959.

২৭. Asim Ray, প্রাগুক্ত।

২৮. Richard M. Eaton, প্রাগুক্ত।

২৯. কবিকঙ্কণ মুকুন্দ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৮।

৩০. মুহম্মদ এনামুল হক, মুসলিম বাংলা সাহিত্য, ঢাকা: পাকিস্তান পাবলিকেশনস, ১৯৫৭, পৃ. ৫০-৫২।

৩১. বিপ্লব দাস গুপ্ত, বাঙালি জাতি ও বাংলা ভাষা, কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং হাউস, ২০০৪, পৃ. ২২৭।

৩২. নীহাররঞ্জন রায়, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫১৬।

৩৩. Tapan Roy Chaudhuri, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৯-১৬৫।

৩৪. দীনেশচন্দ্র সেন, প্রাগুক্ত ৭৬৮।

৩৫. উদ্ধৃত, Momtazur Rahman Tarafdar, Husain Shahi Bengal, Dhaka: Asiatic Socity of Pakistan, 1965, P. 269.

৩৬. উদ্ধৃত, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, বাংলা সাহিত্যের কথা, দ্বিতীয় খণ্ড, ঢাকা; রেনেসাঁস প্রিন্টার্স, ১৯৬৭, পৃ. ১২৩।

৩৭. Tapan Ray Chaudhuri, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩১।

৩৮. উদ্ধৃত, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৪।

৩৯. ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪২-৪৪৭।

৪০. Jawahar Sarker, প্রাগুক্ত।

৪১. M. N. Srinivas, The Dominant Caste and Other Essays, Delhi: Oxford University Press. 1947.

৪২. সুকুমার সেন, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, ২য় খণ্ড, কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৭৫, পৃ. ১১০।

৪৩. তপন রায় চৌধুরী। প্রবন্ধ সংগ্রহ। কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স, ২০০৯, পৃ. ২২২।

৪৪. উদ্ধৃত, সুকুমার সেন। প্রাগুক্ত, পৃ. ৮০-৮১।

pathok

যোগাযোগের ঠিকানা

সিএ ভবন,
১০০ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,
কারওয়ান বাজার, ঢাকা - ১২১৫।

ফোন: ৮৮০-২-৮১১০০৮১, ৮১১৫৩০৭
ফ্যাক্স - ৮৮০-২-৯১৩০৪৯৬

protichinta kinte chile