protichinta

বাংলাদেশে হরতাল ও স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামো

বার্ট সুইকেন্স ও আইনুল ইসলাম, অনুবাদ: খলিলউল্লাহ্

সারসংক্ষেপ

হরতাল—সাধারণ ধর্মঘট, অবরোধ কিংবা সম্পূর্ণ অচলাবস্থা, বাংলাদেশের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বিরোধী দলগুলো সরকারি দলকে চাপে ফেলতে হরতালকে একমাত্র অবলম্বন মনে করে, কিন্তু বাংলাদেশি মধ্যবিত্ত শ্রেণী এবং আন্তর্জাতিক দাতা সংগঠনগুলো হরতালকে ধ্বংসাত্মক কর্মযজ্ঞ হিসেবেই দেখে। বাংলাদেশের স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোর সংগঠনে হরতাল কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তা স্থানীয় পর্যায়ে হরতাল-প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে দেখানো হয়েছে। হরতালকে একটি জটিল রাজনৈতিক কর্মসিদ্ধি হিসেবে বিবেচনা করলে দেখা যায়, হরতাল স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠকদের স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোতে নিজেদের অবস্থানকে প্রদর্শন করা, বজায় রাখা এবং উন্নত করতে অনেক সুবিধা প্রদান করে থাকে। বহুস্তরের জনগোষ্ঠীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারায় হরতাল তাদের স্থানীয়, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সুবিধাজনক পৃষ্ঠপোষকতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করে। এসব সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠা ও সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে ঝুঁকি নেওয়ার ইচ্ছা এবং হরতালে অংশগ্রহণকারীদের অন্তর্ভুক্ত করার সামর্থ্য, দুটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হিসেবে কাজ করে। এই পৃষ্ঠপোষকতা সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখানে দুুটো বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যার একটি হলো হরতালে অংশগ্রহণকারীদের আকৃষ্ট করা এবং অন্যটি হরতালে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা। এ ক্ষেত্রে, রাজনৈতিক নেতাদের বিবেচনায় হরতাল ছেড়ে ‘কম ধ্বংসাত্মক’ প্রতিবাদের ধরনকে গ্রহণ করার প্রচেষ্টা খুব কমই আকৃষ্ট করে।

 

মুখ্য শব্দগুচ্ছ: হরতাল, ধর্মঘট, স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামো, রাজনৈতিক কর্মক্ষমতা, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ

১. প্রারম্ভিক কথা

স্বাধীনতার পর থেকে হরতাল, সাধারণ ধর্মঘট, অবরোধ এবং সম্পূর্ণ অচলাবস্থা বাংলাদেশের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব দোকানপাট ও যান চলাচল বন্ধ এবং জনজীবন সম্পূর্ণ স্তিমিত হয়ে গেলে হরতালকে সফল ধরে নেওয়া হয়। এর মধ্যে সীমিত পরিসরে রিকশা চলাচল করতে দেওয়া হয়। হরতালের মতো সমন্বিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড উদ্ভব হয়েছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময়। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলন এবং স্বাধীনতার পর স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে হরতাল বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে। ১৯৯১ সালের পর থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও বিরোধী দলের জন্য হরতাল সুবিধাজনক অবলম্বন হিসেবে তাদের দাবি-দাওয়া ক্ষমতাসীন দলের কাছে পৌঁছাতে ব্যবহূত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাতে অঘোষিত পদ্ধতিটি হলো বিজয়ী রাজনৈতিক দলই সবকিছু পাবে। এটিই বিরোধী দলগুলোকে জাতীয় সংসদের পরিবর্তে রাজপথের আন্দোলনকে উত্সাহিত করে থাকে। হরতালের মতো কার্যকলাপ প্রাত্যহিক কাজকর্ম বিঘ্নিত করে বলে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা এবং জাতীয় পর্যায়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণী এর তীব্র নিন্দা জানায়। পণ্য উত্পাদন-প্রক্রিয়া এবং এর স্থানান্তর ব্যাহত করায় হরতাল অর্থনীতির জন্য চরম ক্ষতিকর একটি কর্মসূচি এবং রাজনৈতিক শ্রেণীর জন্য অবক্ষয় হিসেবেই গণ্য হয়। কিন্তু এই ক্ষোভ থাকার পরও হরতাল থেমে নেই। বিরোধী দলগুলোর দাবি, তাদের অসন্তুষ্টি জানানোর জন্য এটিই একমাত্র পন্থা; অন্যদিকে মধ্যবিত্ত এলিট শ্রেণী মনে করে হরতালের মাধ্যমে দরিদ্র শ্রেণীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায় বলেই হরতালব্যবস্থা টিকে থাকে।

যে বিষয়টি নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই সেটি হলো ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উত্তরণের পর থেকে হরতালের সংখ্যাগত বৃদ্ধি। আশির দশকে হরতালের মাত্রা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। যেখানে ১৯৪৭-১৯৮৬ সাল পর্যন্ত মোট ২০৩ দিন হরতাল ডাকা হয়েছিল, সেখানে ১৯৮৭-১৯৯০ সালের মধ্যে ২৪৫ দিন হরতাল পালিত হয়, যার বেশির ভাগই স্বৈরাচার এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে। ১৯৯১ থেকে ২০০২ সালের মধ্যে হরতাল পালিত দিনের সংখ্যা হয়েছে আকাশচুম্বী, ৮২৭ দিন। (ইউএনডিপি বাংলাদেশ ২০০৫)। ২০০২ সালের পর আজ অবধি হরতালের ধরন, পরিসর ও প্রক্রিয়ায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যোগ হয়েছে অনেক নিত্যনতুন কারণ। ২০১২-২০১৩ সালে হরতাল অনেকটাই স্থানীয়করণ হয়েছে। একসময় হরতাল বাস্তবায়নের নির্দেশনা আসত কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক পর্যায় থেকে। কিন্তু এখন স্থানীয় পর্যায় থেকেও হরতাল পালনের নির্দেশনা দেখা যায়। প্রক্রিয়াগত দিক থেকে একে একটি বড় পরিবর্তন বলা যায় (এই বিষয়ে পরবর্তী সংখ্যায় আলোচনা করা হবে।)

যাই হোক, ক্রমবর্ধমানভাবে হরতালের গুরুত্ব বাড়লেও এই বিষয়ের ওপর সুনির্দিষ্ট ও বিস্তৃত গবেষণা খুব কমই হয়েছে (হোসেন ২০০০, মনিরুজ্জামান ২০০৯, রাশিদুজ্জামান ১৯৯৭, ইউএনডিপি বাংলাদেশ ২০০৫)। বেশির ভাগ গবেষণাই হরতালকে বৃহত্তর পরিসরে দেখতে চেয়েছে। হোসেন (২০০০) দেখেছেন হরতালকে ক্ষমতাসীন দল কর্তৃক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার একচেটিয়াকরণ এবং সামন্ততান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির ফলাফল হিসেবে। বিপরীতভাবে মনিরুজ্জামান (২০০৫) মনে করেন, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যকার আদর্শিক দ্বন্দ্বই হরতালের কারণ, যদিও উনি মনে করেন যে দুটি দলের মধ্যে ক্রমেই আদর্শিক মিল ঘটছে। বেশির ভাগ বিশ্লেষক মনে করেন, বাংলাদেশে হরতাল রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ভঙ্গুর অবস্থার একটি চিত্র (রাশিদুজ্জামান, ১৯৯৭)। যদিও এই গবেষণাগুলো গণতান্ত্রিক রীতিনীতির বিচারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর হতাশার প্রতিফলন, কিন্তু তাঁরা ‘সংঘাতময় রাজনীতির’ উত্পাদনশীল দিকটি বিবেচনা করেননি। হরতাল কীভাবে সংগঠিত হয়, এই প্রক্রিয়াগত বিষয়টি বরাবরই অনালোচিত রয়ে গেছে।

২০০৫ সালে ইউএনডিপি Beyond Hartal নামে একটি গবেষণা পরিচালনা করে, যেখানে হরতালের ইতিহাস ও এর অনুশীলনের একটি বিস্তৃত এবং গভীর পর্যালোচনা দেওয়া হয়। এখানে দুজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ইরাজ আহমেদ এবং গোলাম মর্তুজা স্থানীয় পর্যায়ে এবং বাস্তবিক অর্থে হরতাল কীভাবে সংগঠিত হয়, তার একটি চমত্কার বর্ণনা দেন। এতত্সত্ত্বেও, এই কাজটিও এই বিষয়ের ওপর অন্যান্য কাজের মতো একই জায়গায় আলোকপাত করেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশকে যেভাবে উপস্থাপন করে ঠিক সেভাবেই হরতালকে দেশের অর্থনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা ইত্যাদির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখেছে। সবশেষে, তারা হরতালের বিকল্প সম্ভাবনাগুলো উদ্ঘাটন করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। যদিও এই প্রচেষ্টা অবশ্যই মূল্যবান, এবং সাধারণ মানুষ মনে করেছিল ২০০৭-০৮ সালে হরতালের অনুপস্থিতি তাদের জন্য স্বস্তিদায়ক, তদুপরি, হরতালের উপস্থিতিকে একটি অগণতান্ত্রিক ব্যাধি হিসেবে না দেখে এটিকে একটি সুবিধাজনক রাজনৈতিক উপকরণ হিসেবে দেখা উচিত।

রাজনৈতিক কর্মক্ষমতার১ আলোচনায় আগ্রহী বেশির ভাগ লেখক হরতালকে দেখে একটি একক কর্মক্ষমতা হিসেবে, যেটি একই ধরণের প্রতীকী বিষয়বস্তুসম্পন্ন, কিন্তু বিশাল সংখ্যক মানুষকে প্রভাবিত করতে সক্ষম। তাঁরা অনেকগুলো নির্দিষ্ট বিষয়ে সীমিত মনোযোগ দেন, যেগুলোর রাজনৈতিক কর্মক্ষমতা অনেক ব্যাপক এবং উদ্দেশ্য বহুসংখ্যক দর্শককে আকৃষ্ট করা। হরতালের এই বিশেষ কর্মক্ষমতার দিকগুলো এই লেখার পরবর্তী অংশে আলোচনা করা হবে। প্রকৃতপক্ষে দূর থেকে দেখলে মনে হয়, হরতালে যারা অংশগ্রহণ করে তারা নির্দিষ্ট হরতাল কর্মসূচি (লিউকস ১৯৭৫) বা বিষয়বস্তুতে (টিলি ১৯৯৩) একমত। হরতালের সংগঠনের দিকটি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করলে বিশেষ সক্ষমতার দিকসমূহ, তাদের লক্ষ্যবস্তু এবং আরও স্থানীয় পর্যায়ে এর কার্যকারিতা বোঝা যাবে। আমরা জোসেফ এশেরিকের (২০০৭:২৪৩) সঙ্গে একমত যে রাজনৈতিক কর্মক্ষমতা রাজনীতিকে দৃশ্যমান করে। এটি বহু পর্যায়ের রাজনৈতিক সংগঠনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং আলোচনারও দাবি রাখে। মুম্বাইয়ে শিবসেনার রাজনীতির স্থায়ী কর্মক্ষমতার বিশ্লেষণে থমাস ব্লম হ্যানসেন সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন যে ‘ছবি ও দৃশ্য তৈরি, বক্তব্যের ধরন, পোশাক এবং গণমানুষের আচরণ একটি আন্দোলন বা দলকে সমুন্নত করে, তার সদস্যদের সংজ্ঞায়িত করে এবং এটার হেতু বা বিশ্ব দর্শনকে উন্নত করে, আর এসব নিয়েই রাজনৈতিক পারফরম্যাটিভিটি গঠিত হয়’ (হ্যানসেন ২০০৪: ২৩)। এই সংজ্ঞার মধ্য দিয়ে তিনি রাজনৈতিক কর্মক্ষমতার অন্যান্য অনেক বিশ্লেষণের চেয়ে আচরণগত ও সামাজিক ভূমিকার বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করতে অধিকতর সক্ষম হয়েছেন। হরতালকে বুঝতে হলে হরতালের সময়ে অংশগ্রহণকারী এবং সংগঠকেরা কীভাবে বহু পর্যায়ের লক্ষ্যবস্তুকে গুরুত্বসহকারে হরতাল কর্মকাণ্ডে অন্তর্ভুক্ত করে তা মনোযোগসহ অনুধাবন করতে হবে। আমরা ভিনসেন্ট ফচারের (২০০৭: ১২০) সেনেগালে পার্টি সোশ্যালিস্ট অনুষ্ঠানের আলোচনার সঙ্গে একমত: ‘পার্টি সোশ্যালিস্টকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে হলে বুঝতে হবে যে এই অনুষ্ঠানে তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো অভ্যন্তরীণ এবং এই অনুষ্ঠানটি হলো অভ্যন্তরীণ পার্টি সোশ্যালিস্ট রাজনীতির মূল উপাদান।’

সংক্ষেপে বলতে গেলে এই প্রবন্ধ দুটি মূল যুক্তির ওপর ভিত্তি করে এগিয়েছে: প্রথমত, হরতালের ঘটনা বুঝতে হলে আমাদের এর বিশেষ কর্মক্ষমতার দিকটি বুঝতে হবে। আমরা যুক্তি দেখিয়েছি যে হরতালের দিন কীভাবে স্থানীয় এলিট এবং হরতাল সংগঠকেরা কর্মক্ষমতা দেখাল সেটার ওপর তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ নির্ভর করে। এ জন্য হরতাল এবং হরতালে যে ভূমিকা রাখা হয় সেটা সংগঠকদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে এবং স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোয় এলিটদের ‘বেড়ে ওঠার’ সঙ্গে সম্পৃক্ত। মূলত কতগুলো প্রত্যক্ষ কারণ, যেমন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি কিংবা সরকার কর্তৃক প্রণীত আইনকানুনের পক্ষ-বিপক্ষকে কেন্দ্র করে, হরতাল কর্মকাণ্ড পরিচালিত হলেও প্রকৃতপক্ষে হরতালের কর্মক্ষমতা অনেক গভীর। হরতালের দিনে বিশেষ করে ঝুঁকি নেওয়ার ব্যাপারে কী ধরনের ভূমিকা পালন করা হয়, স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোতে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ভবিষ্যতে সেটার একটি বড় ভূমিকা আছে।

দ্বিতীয়ত, প্রথম যুক্তির সমর্থনে এই বিশেষ কর্মক্ষমতার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও বিষয়বস্তুর ধরন নিয়ে আলোচনা করা হবে। সাদা চোখে হরতালের উদ্দেশ্য ও বিষয়বস্তু খুব পরিষ্কার। এর উদ্দেশ্য হলো জনজীবন নিয়ন্ত্রণে ক্ষমতাসীন দলের কাছে বিরোধী দলের চলমান ক্ষমতাকে প্রকাশ করা। হরতাল সংগঠনপ্রক্রিয়া এবং হরতাল সংগঠনে বিভিন্ন কর্মকের (actor) ওপর দায়িত্ব ভাগাভাগির দিকে ভালোভাবে নজর দিলে দেখা যাবে, উদ্দেশ্যকৃত বিষয়বস্তু মোটেও একটি নয়। হরতালের কতগুলো বিশেষ কর্মক্ষমতাকে ব্যাখ্যা করে পরবর্তী অংশে দেখানো হবে হরতালের বিষয়বস্তু বহু পর্যায়ের, যার সম্পৃক্ততা গাণিতিক আকারে বৃদ্ধি পায়।

এই প্রবন্ধটি ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসের মাঠ পর্যায়ের গবেষণার ফলাফল। গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় পর্যায়ে কীভাবে হরতাল সংগঠিত হয় তার একটা বিশ্লেষণ দাঁড় করানো। এই গবেষণায় ঢাকার প্রধান তথ্যদাতাদের সাক্ষাত্কারগুলোর (রাজনীতিক, সাংবাদিক, গবেষক ও নাগরিক সমাজ) সঙ্গে চট্টগ্রামে স্থানীয় পর্যায়ে হরতালে অংশগ্রহণকারী এবং এলাকাবাসীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত অনানুষ্ঠানিক এবং ফোকাস গ্রুপ আলোচনার একটি সমন্বয় রয়েছে। ঢাকার পর চট্টগ্রামই প্রধান হরতালপ্রবণ শহর। তাই প্রধান তথ্যদাতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন একটি ওয়ার্ড বাছাই করা হয়েছে, যেখানে হরতাল সংগঠনে শহর কেন্দ্রের সঙ্গে কাছাকাছি দূরত্বের হওয়ায় এবং হরতালে প্রয়োজনীয় লোকবল সহজেই পেয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকায় এটা স্থানীয় পর্যায়ে হরতাল সংগঠন বোঝার ক্ষেত্রে একটি আদর্শ জায়গা, যেটি পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের রাজনৈতিক কর্মসূচির ঐতিহ্যও বহন করে।

২. বিজয়ীই সব পাবে (winner-takes-all): বাংলাদেশে সাংঘর্ষিক রাজনীতি এবং হরতাল

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ কখনো একদলীয় শাসনব্যবস্থার অধীনে, আবার কখনো সামরিক ও স্বৈরাচারী সরকারের অধীনে অনেকটা সময় পার করলেও, সবশেষে ১৯৯১ সালের পর থেকে একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সেই থেকেই রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নামক দুটি রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে এবং দুই নারী নেত্রীর অনেকটা ব্যক্তিগত শাসনের অধীনে। একজন হলেন শেখ হাসিনা, যিনি নিহত জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা এবং আরেকজন খালেদা জিয়া, যিনিও নিহত সাবেক সামরিক স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের স্ত্রী (কচানেক ২০০০, ভ্যান শেন্ডেল ২০০৯)। যদিও তীব্র লড়াইয়ের মাধ্যমে নির্বাচন হচ্ছে, তথাপি শাসনক্ষমতা এই দুই দলের মধ্যেই পালাবদল হচ্ছে। ১৯৯১ সালের পর বিএনপি প্রথম নির্বাচনে জিতেছিল, তার পরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে এবং তার পর থেকে ক্ষমতার এই চক্রাকার পালাবদলই চলছে।

যদিও জনমনে এই বিশ্বাস জন্মেছে যে ক্ষমতার পালাবদলে একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পাওয়া যাবে, তথাপি বিরোধী দলের ভাষ্য প্রকাশের তেমন কোনো সুযোগ আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নেই বললেই চলে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিজয়ী সব পাবে মানসিকতা বিরাজমান, যেটিকে ঢাকায় অবস্থিত ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স স্টাডিজ তাদের প্রভাবশালী ‘স্টেট অব গভর্ন্যান্স’ প্রতিবেদনে পার্টিআর্কি বলে আখ্যায়িত করে:

বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় যেখানে বিজয়ী তার রাজনৈতিক মেয়াদকালে ক্ষমতার একক কর্তৃত্ব ভোগ করে, সেখানে ক্ষমতাসীন দল এবং তার অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব রাজনৈতিক ক্ষমতার অপ্রতিদ্বন্দ্বী কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই অভ্যন্তরীণ চক্রটির সমগ্র দল, আইনসভা, সংসদীয় কমিটিসমূহ, প্রকিউরমেন্ট নীতিসমূহ, উন্নয়ন বরাদ্দ, আমলাতন্ত্র এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর কার্যত কর্তৃত্ব রয়েছে। এটার অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতা কিছুটা সীমিত হয় মাঝে মাঝে উচ্চতর আদালত এবং সময় সময়ে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সংগঠনসমূহ কর্তৃক গঠিত গণ-নিরীক্ষণের মাধ্যমে। (হাসান ২০০৬: ২০)

যেহেতু আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের ভূমিকা রাখার সুযোগ সীমিত, ১৯৯১ সালে গণতন্ত্রে ফিরে আসার পর থেকে সাংঘর্ষিক রাজনীতিই বাংলাদেশের রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে (হাসান ২০০৬, কচানেক ২০০০, মনিরুজ্জামান ২০০৯, রহমান ২০০৭)। যদিও বিশ্লেষকদের মধ্যে এর নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে দ্বিমত রয়েছে, কিন্তু বেশির ভাগই একমত যে রাজনৈতিক সহিংসতা বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রাজনৈতিক সহিংসতার মাত্রা এবং রাজপথের রাজনীতির কারণে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয় এবং ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু থাকে। হরতাল এই সাংঘর্ষিক রাজনীতির একটি অন্যতম প্রধান উপকরণ।

৩. প্রথম ধাপ: হরতালের স্ক্রিপ্ট/বিষয়বস্তু

হরতাল পালনের প্রথম স্তরে যেটি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো কড়াকড়িভাবে নিয়ম এবং কৌশলাদি মেনে চলা (টিলি ১৯৯৩, ২০০৮)। এর মানে হলো হরতাল পালনকারীরা বা সংগঠনকারীরা আওয়ামী লীগ-বিএনপি যে দলেরই হোক না কেন, তারা একইভাবে, একই জায়গায় এবং একই দৃশ্যপট অনুসরণ করে।২ যাদের সাক্ষাত্কার গ্রহণ করা হয়েছে তারা হরতালের পূর্ব-মুহূর্তে এবং হরতাল চলাকালে একই ধরনের কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করেছে। যারা হরতালে অংশগ্রহণ করে না, তারাও অনুমান করতে পারে হরতালের দিন কী ঘটবে। এই অনুমান হরতাল সফল করার ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে গুরুত্ব্বপূর্ণ। বস্তুত, লোকজন তাদের যানবাহন চালায় না হরতাল পালনকারীরা জ্বালিয়ে দিতে পারে এই ভয়ে, দোকানিরা তাদের দোকান বন্ধ রাখে হরতালে ভাঙচুরের ভয়ে। এ জন্য সাধারণ ধর্মঘট স্বতঃস্ফূর্ত নয়, অনেকটা আরোপিত। সাধারণ মানুষ হরতালের নিয়মনীতি জানে এবং এ-ও জানে হরতালের নির্দেশনা না মানলে এর পরিণতি কী হবে।

হরতাল শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকে ভবিষ্যত্ হরতাল সম্পর্কে অনুমান করা শুরু হয়। আমাদের প্রায় সব উত্তরদাতাই মনে করে, নির্বাচনের এক-দেড় বছর আগে থেকে যে হরতাল আসবে তা জানা সাধারণ জ্ঞানের ব্যাপার এবং যত নির্বাচন ঘনিয়ে আসবে ততই এর মাত্রা বাড়তে থাকবে। যখনই প্রত্যাশা করা হয় যে হরতাল আসবে, তখনই সংবাদপত্রগুলো হরতাল সম্পর্কে সংবাদ এবং গুজব ছড়ানো শুরু করে এবং দলের নেতারা যে হরতাল নিয়ে আলোচনা করছেন সে কথা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সবশেষে, দলীয় নেতৃত্ব যেদিন হরতাল হবে তার প্রায় এক সপ্তাহ আগে হরতালের তারিখ ঘোষণা করেন। বৃহস্পতিবারগুলোকে অধিক পছন্দের তারিখ হিসেবে ধরা হয়, কারণ এর পর থেকেই লম্বা সাপ্তাহিক ছুটি শুরু হয়—শুক্রবার এবং শনিবার যেহেতু সাপ্তাহিক ছুটির দিন। হরতাল শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ আগে থেকে পুলিশ কিছু সুপরিচিত হরতাল সংগঠনকারীকে গ্রেপ্তার করতে থাকে অথবা হরতালপ্রবণ এলাকাগুলোতে নির্বিচারে গ্রেপ্তার চালাতে থাকে। হরতালের দিন কী ঘটবে, সেটির জন্য আগের রাতটি গুরুত্বপূর্ণ। সে রাতে, কিছু যুবক—আমরা পরে নির্দিষ্ট করব—ঘোরাফেরা করে এবং কিছু দেশীয় তৈরি বোমা (ককটেল) বিস্ফোরণ ঘটায় এবং বাসসহ কিছু যানবাহন ভাঙচুর করে। হরতালে এই ধরনের সহিংসতা খুবই স্বাভাবিক এবং যেসব এলাকায় যানচালিত ভ্রমণে এই ধরনের সহিংসতার আশঙ্কা বেশি থাকে, সেদিক দিয়ে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত পরিহার করা হয়।

হরতালের দিনগুলোতে বহুমুখী কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা চলতে থাকে। এর মধ্যে দোকানপাট অবশ্যই বন্ধ হয়ে যায় এবং সাধারণ সময়ে জনাকীর্ণ ও ট্রাফিক-জ্যামে পরিপূর্ণ শহরের রাস্তাঘাটও খালি হয়ে যায়। ট্রাফিক জ্যাম পরিপূর্ণ রাস্তাঘাট সম্পূর্ণরূপে খালি দেখতে অদ্ভুত ও ভীতিকর মনে হয়। একটি অবরুদ্ধ অবস্থা অনুভূত হয়। দ্বিতীয়ত, আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে হরতালকারীরা শহরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নেয়। কিছু কিছু জায়গা প্রতীকীর দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পাকিস্তান এবং এরশাদবিরোধী আন্দোলনে এগুলো হরতাল সংগঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিছু লোক গোষ্ঠীগতভাবে আশপাশে ঘোরাফেরা করে এবং যেসব যানবাহন হরতাল অমান্য করে রাস্তায় বের হয়েছে সেগুলোকে থামিয়ে দেয়। প্রায়ই যেসব যানবাহন হরতালের ডাককে উপেক্ষা করেছে এবং যেসব দোকানপাট খোলা হয়েছে সেগুলোকে ভাঙচুর করে। তৃতীয়ত, এক বা একাধিক মিছিল বের করার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে হরতাল পালনকারীদের শক্তির জানান দেওয়া হয়। এসব মিছিল স্থানীয় বা জাতীয় রাজনীতিবিদদের বক্তব্য দেওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবং প্রায়ই সহিংসতায় রূপ নেয়। সহিংসতার সময় দুটি প্রধান বিষয় চোখে পড়ে: একটি হলো যখন হরতাল সমর্থকেরা কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় যেতে চায় বা সফল হরতাল সম্পাদন করতে চায় তখন ক্ষমতাসীন জোটের মোতায়েন করা পুলিশ বাহিনী বাধা প্রদান করে। সাক্ষাত্কারদাতাদের কেউ কেউ মনে করে পুলিশ ইচ্ছা করেই সহিংসতা উসকে দিতে চায়, যাতে করে বিরোধী দলের সহিংস রূপ মানুষ দেখতে পায়। আর আরেকটি অবস্থার সৃষ্টি হয় যখন হরতাল সমর্থকগোষ্ঠী এবং ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের৩ হরতালবিরোধী গোষ্ঠী মুখোমুখি হয়। তখন সংঘর্ষে আহত ও নিহতের ঘটনাও ঘটে। মূলত সহিংসতা এখন হরতালের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে, যার ফলে যারা হরতালের বিরোধী তারা নিন্দা জানায় এবং হরতালের নামে এসব কার্যকলাপের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কারণ প্রকৃতপক্ষে হরতাল বলতে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম এবং গান্ধীবাদী অসহিংস কার্যক্রমের বিষয়বস্তুকে বোঝায়।

হরতালের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে সহিংসতার সম্পর্ক বুঝতে হলে আরও ব্যাখ্যার প্রয়োজন।৪ আসলে হরতাল একটি বহুল প্রচলিত অনেক পুরোনো ঐতিহ্য। ঐতিহাসিক সংগ্রামের দিনগুলোতে হরতালের সময় গণমানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণের ঐতিহ্য আছে, যা বর্তমান সময়েও হরতালের বৈধতা দিয়ে থাকে। তারা ৭০ থেকে ৮০ বছরের পুরোনো হরতালের ধরনকে রাজনৈতিক কার্যক্রমের মডেল হিসেবে দেখাতে চায়। ব্রিটিশবিরোধী গান্ধীবাদী আন্দোলন, পশ্চিম পাকিস্তানবিরোধী বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলনের সংগ্রাম সমসাময়িক হরতালকে বৈধতা দান করে, যদিও গান্ধীর৫ অহিংস ধাঁচের আন্দোলন, গণমানুষভিত্তিক স্বাধীনতা আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনের ধারে-কাছেও এখনকার হরতালগুলোর কার্যক্রম নেই। অনেক উত্তরদাতা অভিযোগ করেন, হরতাল শুধু নামেই হরতাল এবং আগের অসহিংস ও গণমানুষ-সমর্থিত হরতালের সঙ্গে এখনকার হরতালের কোনো সাদৃশ্য নেই। অনেকেই, বিশেষ করে যারা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত, তারা মনে করে হরতাল দক্ষিণ এশীয় ধাঁচের একটি প্রতিবাদের ধরন।৬ তারা মনে করে এটি আগে সফল হয়েছে এবং সব সময়ই একটি বৈধ রাজনৈতিক হাতিয়ার।

হরতালের প্রথম ধাপে লক্ষ্যবস্তু একেবারেই পরিষ্কার—প্রথমত, এর মাধ্যমে বিরোধী দল ক্ষমতাসীন দলকে তাদের চলমান শক্তি ও উপস্থিতি প্রদর্শন করে। দ্বিতীয়ত, হরতালে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া, যেমন নির্বাচনসম্পর্কিত অথবা পরিবর্তনের অঙ্গীকার তুলে ধরার মাধ্যমে বিরোধী দল বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাদের ভূমিকা এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি৭ মঞ্চস্থ করে। সবশেষে, যদিও বহুলাংশেই সম্ভব হয় না, তবুও হরতালের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেখানো হয় যে ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলের মতকে উপেক্ষা করে চলেছে। এ ক্ষেত্রে হরতাল সফল হয়েছে ধরে নেওয়া যায় যদি ক্ষমতাসীন দল ক্রমাগত হরতালে চাপের মুখে তাদের কিছু নীতি বিরোধী দলের দাবির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয় অথবা যদি বহুল জনগোষ্ঠী বিরোধী দলের পক্ষে অবস্থান নেয় (এবং নির্বাচনে জয়ী হয়) অথবা যদি হরতালকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ক্ষমতাসীন দলের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

সবশেষে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য হলো দলগুলোর মধ্যে হরতাল সম্পর্কে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন। অনেক বিশ্লেষক এবং নাগরিক সমাজের সদস্যরা হরতালের নিন্দা করেছে, এবং আওয়ামী লীগ বা বিএনপি যে দলই হোক না কেন, যখন ক্ষমতায় থাকে তখন সর্বজনীনভাবে হরতালের নিন্দা করেছে এবং হরতালবিরোধী প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছে, কিন্তু বিরোধী দলে গিয়ে সর্বজনীনভাবে ঘোষণা করেছে যে হরতালেই তাদের বক্তব্য প্রকাশের জন্য একমাত্র পথ। এই অবস্থায় বলা যায়, হরতাল সরকারি দল এবং বিরোধী দলের মধ্যে একটি যোগাযোগ স্থাপনকারী উপাদান, যার মাধ্যমে যথাক্রমে হরতাল সফল ও ব্যর্থ উভয়ই হতে পারে। এটি স্থানীয় পর্যায়েও ঘটে। এই গবেষণায় দেখা যায়, কীভাবে স্থানীয় পর্যায়ে সরকার-সমর্থিত রাজনৈতিক কর্মীরা হরতাল বানচাল প্রচেষ্টার মাধ্যমে ক্ষমতার ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থানকে আরও সুসংহত করে।

৪. হরতাল একটি জটিল রাজনৈতিক কর্মক্ষমতা

পূর্ববর্তী অধ্যায়ে অনেক বিশ্লেষকের হরতাল এবং অন্যান্য রাজনৈতিক কর্মক্ষমতার বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। তার পরও, হরতালের শুধু এই প্রথম ধাপকে ধরে নিলে রাজনৈতিক উপস্থাপনার বহুমুখী ধরনকে অগ্রাহ্য করা হবে। হরতাল কর্মকাণ্ডে যারা অংশগ্রহণ করে তাদের গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে পুরো হরতাল কর্মক্ষমতার অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক বোঝা যায়, যার মাধ্যমে মূলত রাজনৈতিক কর্মক্ষমতা, বিশেষ করে হরতালের প্রকৃত কার্যক্রম ভালোভাবে বোঝা যাবে। অনেক লেখকের মতে, এখানে ব্যক্তির ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রায়ই দেখা যায়, আলোচনা মূলত উচ্চপর্যায়ের নেতাদের ওপরই সীমাবদ্ধ থাকে, যেমন সভাপতির বক্তব্য এবং প্রচারণা (অ্যাবেলস ১৯৮৮, ম্যাকলয়েড ১৯৯৯) অথবা উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক মামলা, বিচার ইত্যাদি (কাভিরাজ ২০০৭, ট্রিপ ২০০৭)।

হরতালের মতো রাজনৈতিক কর্মে সাধারণ অংশগ্রহণকারীদের ওপর খুব কমই মনোযোগ দেওয়া হয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: কেন জনগণ হরতালে অংশগ্রহণ করে? হরতালের মতো বৃহত্ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকারীরা প্রকৃতপক্ষে কতগুলো নির্দিষ্ট কর্মের মাধ্যমে কী প্রদর্শন করতে চায়, কেন করতে চায় এবং কাদের কাছে পৌঁছাতে চায় তা স্পষ্টত বোঝা যায়নি। এসব গণরাজনৈতিক কর্মসম্পাদনকে বিশ্লেষণ করে বহুমুখী ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা যায়। এখানে উল্লেখ্য যে হরতাল একটি জটিল রাজনৈতিক কর্ম, যা মূলত বিভিন্ন ধরনের মিটিং-সমাবেশ, পিকেটিং, বন্ধ ঘোষণা এবং বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার একটি সমষ্টি। হরতালের সময় সম্পাদিত এসব জটিল কর্মকাণ্ডের ভূমিকা বহুগুণীয় এবং যৌথ কর্মের একধরনের মঞ্চায়ন। এ ক্ষেত্রে, হরতালের মতো বিবদমান কর্মক্ষমতার বিষয়বস্তু তৈরি হয় আরেক ধরনের বিবদমান কর্মক্ষমতার মাধ্যমে, যা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীসমূহ সম্পাদন করতে পারে (টিলি ২০০৮)। এটা অবশ্যই যে যাদের সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে কর্মকাণ্ড পরিচালিত তাদের ভূমিকাও এখানে মুখ্য। স্ট্রস এবং ক্রুইজ ও’ব্রেন (২০০৭৬:৩-৪) যথার্থই বলেছেন যে কর্মক্ষমতার একটি মূল লক্ষ্য হলো জনগণের কাছ থেকে একটি ইতিবাচক সাড়া পাওয়া, কিন্তু জনগণকে ভুলভাবে নিলে কার্যকারিতা সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের অনেক হরতাল জনগণের কাছে দলীয় আন্তরিকতার দিকটি নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়। আগেই বলা হয়েছে যে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় হরতাল জনগণের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার সম্পূর্ণ ভুল একটি মাধ্যম। তথাপি, হরতালের রাজনীতি স্থানীয় বা মাইক্রো লেভেল থেকে দেখলে এবং স্থানীয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করলে প্রথম দেখায় হরতাল ব্যর্থ মনে হলেও এটি সফল হতে পারে। ব্যর্থ মনে হয় কারণ অনেক ক্ষেত্রে হরতাল গণমাধ্যম এবং বেশির ভাগ জনগণের সমর্থন পায় না। হরতালকারীরা বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বা রাষ্ট্রের কাছে পৌঁছাতে না পারলেও তাদের কাছে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। এ ক্ষেত্রে বলা যায় হরতালকারীরা খুব সহজেই স্থানীয় দলীয় নেতা, নির্বাচিত স্থানীয় প্রতিনিধি বা স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে নিজেদের পারফরম্যান্স তুলে ধরতে পারে। এই নেতৃত্ব পর্যায়ের লোকগুলো তারাই যারা স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোয় হরতালে অংশগ্রহণকারীদের আনুগত্য পেতে চায় বা হরতাল পালনকারীকে দলের বিশ্বাসযোগ্য কর্মী হিসেবে দেখতে চায়। এই রকম একটি পারফরম্যান্স যখন সামগ্রিকভাবে, প্রথম ধাপে এবং অধিক জনগোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করে নেওয়া হয়, তখন এটিকে ব্যর্থ মনে হতে পারে, কিন্তু যখন খুবই ছোট পরিসরে এবং নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করে করা হয়, তখন সফল বলেই মনে হয়। একই সঙ্গে, বৃহত্তর পরিসরে হরতালের সফলতা, যেমন কোনো আইন পরিবর্তন বা সরকার পতন স্থানীয় পর্যায়ে ব্যর্থ মনে হতে পারে, কারণ হরতাল পালনকারীরা তাদের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে পারে না।

৫. হরতালের বিশেষ কর্মক্ষমতা এবং স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামো

প্রবন্ধের এই অংশে ক্ষমতা সংগঠনে হরতালের ভূমিকা এবং নির্দিষ্ট চালক/কর্তা কর্তৃক হরতাল পারফরম্যান্স কীভাবে স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোয় সম্পৃক্ত, তা ভালোভাবে বোঝা যাবে। এসব নির্দিষ্ট কর্মক্ষমতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা মানে এই নয় যে আমরা হরতালের প্রাথমিক পর্যায়টি বাদ দিয়ে দিচ্ছি। এ জন্যও নয় যে আমরা দ্বিতীয় পর্যায়টি দেখছি এমনভাবে, যেখানে মানুষ হরতালে অংশগ্রহণ করে শুধুই ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য সাধনে; বরং আমরা মনে করি, এই ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স যেভাবে স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামো এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তা হরতালের প্রথম ধাপের গণকর্মক্ষমতার সঙ্গে জড়িত। হরতাল-প্রক্রিয়ার এই ব্যক্তিপর্যায়ের এবং গণ-পারফরম্যান্সের আদান-প্রদানের সঙ্গে বর্তমান সময়ে হরতালের বিকল্প খোঁজার যুক্তি সমর্থনযোগ্য—যেমন হরতালের বিকল্প হিসেবে মানববন্ধন।

শুধু নির্দিষ্ট ভূমিকা বা বিষয়বস্তুই স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত নয়, বরং হরতাল চলাকালে বিভিন্ন কর্মযজ্ঞও কারও পারফরম্যান্স স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোতে তার অবস্থানকে সুদৃঢ় করে। হরতাল স্থানীয় পর্যায়ে এবং ক্ষমতার একেবারে ওপরের পর্যায়েও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান এবং আনুগত্য পরিমাপের বাহন হিসেবে কাজ করে। এ ক্ষেত্রে হরতালের মতো গণকর্মক্ষমতা শুধু ক্ষমতাকাঠামোরই বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এটা পুরো ক্ষমতাকাঠামোকেই সুগঠিত করে অথবা খ্যাতি অর্জনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাকাঠামোয় নিজের একটা জায়গা করে নেয়।

৫.১ ঝুঁকি এবং সাংগঠনিক ক্ষমতা

সাংগঠনিক সামর্থ্য ও ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোকে বিশেষ কর্মক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করে। শেষোক্তটি স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোর নিম্নপর্যায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত, যেখানে প্রথমটি উচ্চপর্যায়ের জন্যই বেশি জরুরি। তথাপি, প্রতিটি পর্যায়েই এই দুটি উপাদানের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া সংঘটিত হয়।

হরতালের সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত, এটি তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বটে, কিন্তু একই সঙ্গে এই ঝুঁকিই তাদেরকে নির্দিষ্ট কর্মক্ষমতার মূল্যায়নে সাহায্য করে। আগেই বলা হয়েছে যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিরোধী দলের অনুসারীদের বহুলাংশেই ক্ষমতার বাইরে রাখে। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দলের জন্য হরতালে অংশগ্রহণ করাটা ঝুঁকিপূর্ণ। আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে ক্ষমতায় আসার প্রত্যাশা পৃষ্ঠপোষকতারও প্রত্যাশা জোগায়। যদি কেউ দল এবং দলীয় স্থানীয় প্রতিনিধির প্রতি সত্যিকারের আনুগত্য প্রদর্শন করে, তাহলে ক্ষমতাকাঠামোয় তার অবস্থান তৈরি হয়। প্রথম পর্যায়ে, ছাত্রনেতারা ব্যাপকভাবে হরতাল এবং হরতাল-পূর্ব সহিংসতার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। এটি সবারই জানা যে বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতি সংঘাতময় এবং সহিংস ছাত্রনেতাদের এই সহিংস কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করার মতো অনুসারী খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয় না। আমরা কিছু লোকের সঙ্গে কথা বলেছি, যাঁরা কিছুটা এখন বয়স্ক, তাঁরা বলেছেন যে তাঁরা নিয়মিত হরতাল সহিংসতায় অংশগ্রহণ করতেন। কারণ, এটা মজার এবং দুঃসাহসিক একটা ব্যাপার ছিল (দেখুন ভেরাকাইক ২০০৪)। বাস পোড়ানো, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ অথবা ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষ বা পিকেটিংয়ে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে ছাত্রনেতারা নিজেদের দলের প্রতি বিশ্বস্ততা প্রমাণ করেন। বস্তিবাসী যারা নিয়মিত হরতালে অংশগ্রহণ করে তাদের মন্তব্য:

তাদের নিজস্ব ক্ষমতা দেখানোর জন্য সহিংসতা করা হয়। এর মাধ্যমে দলীয় নেতাদের সঙ্গে মিশতে সহজ হয়। যদি স্থানীয় নেতারা কোনো ধরনের সহিংসতা সৃষ্টি করেন, দলীয় নেতারা পরবর্তীকালে তাঁদের ওপর নির্ভর করেন। এইভাবে এটি মহল্লা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।৮

সহিংসতা এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে মূলত উচ্চপর্যায়ের নেতাদের নজরে পড়া যায়, যাঁরা হয়তো স্থানীয় পর্যায়ে সে রকম লোক খুঁজছেন।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যুবলীগের মধ্যম সারির নেতারা সরাসরি হরতালের সহিংসতায় সম্পৃক্ত না হলেও সহিংসতা সংঘটনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন এবং হরতালের সমর্থনে আয়োজিত র্যালিতে বস্তিবাসীদের নিয়ে যেতে সরাসরি ভূমিকা রাখেন। মানুষকে সংগঠিত করার সামর্থ্য ক্ষমতাকাঠামোয় তাদের অবস্থান বজায় রাখতে এবং বৃদ্ধি করতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রায়ই এসব মধ্যম সারির নেতাই গ্রেপ্তার হন, যেহেতু তাঁরা হরতাল সংগঠনের জন্য সুপরিচিত এবং এখনো রাজনৈতিকভাবে এতটা উচ্চপর্যায়ের নন, যাতে করে গ্রেপ্তারকারীদের জন্য বড় কোনো সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। তাঁরা প্রায়ই মিছিল বা র্যালি থেকে জনতার নেতা হিসেবে গ্রেপ্তার হন। কিন্তু গ্রেপ্তার হওয়াটা তেমন বড় কোনো সমস্যা হিসেবে মনে করা হয় না, বরং এটি তাঁর দল ও সমর্থনকারীদের মধ্যে আনুগত্য প্রদর্শনের একটি পথ হিসেবে দেখা হয়। একজন নারী নেতা বলেন:

আমরা সারা দিন রাস্তায় আন্দোলন করলাম। যখন বেশির ভাগ সমর্থক বাড়ি চলে গেল এবং আমিও বাড়ি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম, তখনই পুলিশ এসে আমাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে গেল। আমি তোয়াক্কা করিনি। আমি জনগণের জন্য কাজ করি। যখন মানুষ দেখবে, তখন তারা আমাকে মুক্ত করতে চলে আসবে। ছয়-সাত ঘণ্টা পরে সাংবাদিক এবং জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে কিছু ফোন এল থানায়। গরিব নারীরাই আমার বেশির ভাগ ভক্ত-সমর্থক; তারা থানায় জড়ো হতে লাগল। পুলিশ বুঝতে পারল যে অনেক গরিব নারী আসছে এবং তারা একটি আন্দোলন গড়ে তুলে আমাকে মুক্ত করবে। কিছুক্ষণ পরেই আমাকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হলো।৯

উচ্চপর্যায়ের নেতাদের জন্য সরাসরি শারীরিক কোনো ঝুঁকি নেই; তাঁরা সহিংসতায় নিজেরা যুক্ত হন না। আওয়ামী লীগের  একজন উচ্চপর্যায়ের নেতা, যিনি সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার ছিলেন, তাঁর উদাহরণ নেওয়া যেতে পারে। তিনি যেহেতু একটি বাস কোম্পানির মালিক ছিলেন, তাই হরতাল চলাকালীন তিনি মানুষজনকে র্যালিতে যোগ দেওয়ার জন্য পরিবহন-সুবিধা দিতেন। তবে সামান্য ঝুঁকির সম্ভাবনা ছিল। কেননা তিনি আওয়ামী লীগের একজন নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আবার যখন বিএনপি হরতাল ডাকত, তখন তিনি হরতাল অমান্য করার জন্য বাস চলাচল অব্যাহত রাখতেন। অবশ্যই বাসের সংখ্যা ছিল কম এবং নিম্নমানের বাসই চলত, যেন পুড়িয়ে দিলেও কম ক্ষয়ক্ষতি হয়। কিন্তু এর মাধ্যমে তিনি বাস পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে যে ইচ্ছুক, তা দেখিয়েছেন। আবার র্যালিতে আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের যোগদানে সহায়তা করে তিনি তাঁর সাংগঠনিক সামর্থ্যও দেখিয়েছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা। স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোর সব পর্যায়ই চায় র্যালি এবং মিছিলের জন্য সংখ্যাগত দিক দিয়ে মানুষ সরবরাহ করতে। এটাকে বলা যায় সংগ্রহ করার একটি ফাঁদ, যেখানে প্রতিটি পর্যায়ই তার পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মানুষ সমাবেশ করতে চায়। অংশত, এটি একটি পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক তৈরিতে সাহায্য করে। যেমন আওয়ামী লীগের নেতারা যুবলীগের নেতার ওপর, আবার যুবলীগ ছাত্রলীগের ওপর। আওয়ামী লীগের একজন ব্যবসায়ী নেতা হরতাল ও অন্যান্য রকমের মিছিলের সংগঠনে তাঁর জড়িত থাকায় বিষয়টি এভাবে সংযুক্ত করেছেন:

মন্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কটা ধাপে ধাপে কাজ করে। যদি মন্ত্রী বলেন যে তাঁর কিছু লোক দরকার, আমি এখানে আট-দশজন বন্ধুর ওপর নির্ভর করি এবং তাদের প্রত্যেকের আবার বিশজন করে বন্ধু রয়েছে। এটি একটি ব্যক্তিগত যোগাযোগ। কিন্তু সেখানে আরও কিছু পেশাগত গোষ্ঠী রয়েছে। যেমন আভাষ স্থানীয় একজন যুবলীগের নেতা। যদি আমি তাঁকে ডাকি, তিনি আরও কিছু লোক জোগাড় করতে পারবেন। যেমন—এখানে রিকশাওয়ালা ও দোকানদারদের একটি সংগঠন রয়েছে। যদি আপনার লোক দরকার হয়, আপনি ওদেরকে ডাকলেই ওরা ব্যবস্থা করে দেবে। এ রকম প্রায় বিশটি কমিটি রয়েছে। এবং প্রতিটি কমিটি আরও বিশজন করে লোক আনতে পারে। তার মানে বিশকে বিশ দিয়ে গুণ করলে চার শ লোক হতে পারে।১০

একটি নিবিড় দলগত আলোচনায় নিচের সারির কর্মীরাও একই প্রক্রিয়ার কথা বলেছে:

যখন উচ্চপর্যায়ের নেতা শাহ আমান, যাঁর এখানে নিজস্ব বাড়ি রয়েছে, একটি গ্রুপ তাঁর জন্য কাজ করে। শাহ আমানের একজন লোক আছে, তার নাম আলী আনছার। সে-ই শাহ আমানের জন্য লোকজন জোগাড় করে। আরেকজন আছে জাভেদ ভাই, তাকে লোক জোগাড় করতে বলা হয়। তখন জাভেদ ভাই এসে অন্যান্য ছোট নেতাকে ডেকে বলে ওপর থেকে ‘খবর’ এসেছে।১১

বিভিন্ন নেতার বিভিন্ন নেটওয়ার্ক এবং বিভিন্ন কমিটি সংগঠিত করার সামর্থ্য রয়েছে, যারা একে অন্যের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত। একটি নির্দিষ্ট ব্যানারে যত বেশি নেটওয়ার্ক থাকবে, তত বেশি লোক মিছিলে সমাগত হবে। এতে করে ওই নেটওয়ার্কটি তত বেশি ওপরের সারির নেতাদের নজরে আসবে। দ্বিতীয়ত, সাংগঠনিক সামর্থ্য বলতে বোঝায় স্বাধীনভাবে লোকসমাগম করার সক্ষমতাকে। লোকসমাগম বলতে শুধু নিজের নেটওয়ার্ক দিয়ে তাদেরকে অন্তর্ভুক্তিই বোঝায় না, এ ছাড়া তাদেরকে সঠিক জায়গায় পায়ে হাঁটিয়ে বা বাসে চড়িয়ে নিয়ে আসা এবং আনতে প্রণোদনা দেওয়াকেও বোঝায়:

বিভিন্ন ধরনের নেতার কাছ থেকে টাকা আসে, যাঁরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান। তাঁরা টাকা দেন স্থানীয় কোনো ছোট সংগঠককে এবং সে যেই বিশজনকে নিয়ে আসবে তাদের জন্য সে টাকা পাবে। এইভাবে ছোট সংগঠক আমাদেরকে টাকা দেয় এবং আমরা যাদেরকে নিয়ে আসি তাদেরকে টাকা বুঝিয়ে দিই।১২

প্রায়ই হরতালে অংশগ্রহণকারীদের১৩ টাকা দেওয়া হয়, কিন্তু অনেক সময় চা-নাশতা এবং দুপুরে খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়। নিচের সারির নেতারা এসবের জন্য টাকা পান, কিন্তু ওপরের সারির নেতারা বেশির ভাগ সময়ই ব্যক্তিগত টাকা এই উদ্দেশ্যে ব্যয় করে থাকেন:

যদি কোনো বৈঠক বা হরতালের মিছিল থাকে, ইউনিটের একজন নেতা হিসেবে নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখতে আমাকে পঞ্চাশজন লোক আনতে হবে। আমি লোক আনতে টাকা ব্যয় করি। অন্যথায় আমি আমার অবস্থান হারাব। যদি আমি লোক আনতে না পারি, তাহলে ওয়ার্ডের নেতারা আমাকে পছন্দ করবেন না। তাঁরা বলবেন: আমরা তোমাকে ইউনিট পর্যায়ে নেতা বানিয়েছি, কোনো ভিখারিকে নেতা বানাইনি।১৪

তখন নেতা গর্বের সঙ্গে অংশগ্রহণকারীদেরকে সত্যিকার অর্থেই তাঁর লোক হিসেবে উপস্থাপন করেন। তাদেরকে শুধু কর্মী হিসেবেই উপস্থাপন করা হয় না, বরং তাদেরকে কাজে লাগানোর কৃতিত্বও নেওয়া হয়।

৫.২ স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামো গঠন এবং পরিবর্তন

ঝুঁকি নেওয়া এবং সাংগঠনিক সামর্থ্যের মতো বিভিন্ন ধরনের হরতাল কার্যক্রম স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোতে দুটি স্পষ্ট প্রভাব ফেলে: তারা ক্ষমতার মাধ্যমে অবস্থান প্রকাশ করে, এবং সেই অবস্থানকে প্রতিষ্ঠা, সুদৃঢ় এবং প্রয়োজনে পরিবর্তন করতে চায়। এ ক্ষেত্রে তারা বহু রকমের নেতৃত্ব এবং মানুষের প্রতি মনোযোগী হয়, সেটা যেমন স্থানীয় পর্যায়ে, তেমনি দলীয় মধ্যম ও উচ্চপর্যায়ের ক্ষমতাধরদের বেলাতেও। স্থানীয় পর্যায়ে তারা ক্ষমতার তারতম্য টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছে নিজেদের প্রকাশ করে, যা মূলত পরবর্তীকালে পৃষ্ঠপোষকতার সম্পর্ক ব্যবহারে সাহায্য করে। এর মাধ্যমে তারা বুঝতে পারে, কোন ধরনের সাহায্যের জন্য কার কাছে যেতে হবে। দলীয় রাজনীতির উচ্চপর্যায়ে তারা দলীয় স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনের আপেক্ষিক গুরুত্ব তুলে ধরে এবং যখন সুবিধা বণ্টন করা হবে, তখন কাকে কী সুবিধা দেওয়া যায়, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে।

কখনো কখনো হরতাল-সম্পর্কিত কার্যক্রমে উপস্থিতিই যথেষ্ট। এই প্রবন্ধের মাঠপর্যায়ের গবেষণার সময় ইসলামি দলগুলো হরতাল ডেকেছিল। হরতালকালীন ওয়ার্ড পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের সময় আমরা স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন রকমের ক্ষমতার সম্পর্ক এবং অবকাঠামো বুঝতে সক্ষম হই।

মূল যে রাস্তাটি বস্তির দিকে গেছে, সেখানে আওয়ামী লীগের মধ্য সারির নেতারা বেশির ভাগ যুবলীগের লোকজন নিয়ে একটি চায়ের দোকানে অবস্থান নেন। আগেই বলা হয়েছে যে এই বস্তিটি হরতালে লোক সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এখানে বসে নেতারা রাস্তাটি পর্যবেক্ষণ করছিলেন এবং প্রত্যেককেই যেতে দিচ্ছিলেন, শুধু যাদেরকে হরতালে যোগদানকারী হিসেবে সন্দেহ হচ্ছিল তাদেরকে ছাড়া। যখন দল ক্ষমতায় থাকে তখন হরতালবিরোধী কাজকে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ভাবেন। তবু এই নিয়ন্ত্রণ-পর্যবেক্ষণ কাজে ওয়ার্ড কমিশনারের উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি আশ্চর্যজনক। এই কমিশনার নির্বাচিত হয়েছিলেন একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এবং আক্ষরিক অর্থে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না। কিন্তু এখন আওয়ামী কমিটিতে তাঁর উপস্থিতি এবং তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় স্পষ্টভাবেই প্রকাশ করে। আমরা ইতিমধ্যেই আওয়ামী লীগের একটি অংশের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার যোগসূত্র পেয়েছি, তথাপি এখানে যুবলীগের কর্মীদের সঙ্গে একত্রে হরতালবিরোধী কাজে তাঁর অংশগ্রহণ ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের দিকটি স্পষ্টত প্রকাশ পায়।

মিছিল এবং র্যালির জন্য লোক জোগাড় করার সাংগঠনিক সামর্থ্য অবশ্যই একজন শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের আপেক্ষিক ক্ষমতাকেই প্রকাশ করে। কারও দু শ বা দুই হাজার সমর্থককে দলীয় কর্মসূচিতে নিয়ে আসতে পারা মানে হলো, দলের আপেক্ষিক রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য কাজ করা। হরতাল চলাকালীন এই সমর্থকদেরকেই নির্বাচনে সম্ভাব্য ভোটার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই বিবেচনায় যুবলীগের একজন নেতা বিএনপি শাসনের (২০০১-২০০৬) সময়ে আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালে তার গুরুত্ব বাড়াতে সক্ষম হয়েছিল। সে সময়ে একজন সাধারণ ছাত্রলীগ নেতা হয়েও সে বেশ কয়েকটি পর পর হরতালে বহুসংখ্যক তরুণকে সংগঠিত করতে পেরেছিল। সচ্ছল পরিবারের হওয়ায় সে ব্যক্তিগতভাবে হরতালে অংশগ্রহণকারী জোগাড়ে টাকা খরচ করতে পেরেছিল, যদিও তার পরিবার তার রাজনৈতিক কার্যক্রমকে সমর্থন করে না। ওয়ার্ডে একজন আওয়ামী লীগ ক্ষমতাধরের দলে থেকে সে ওই পৃষ্ঠপোষকতা নেটওয়ার্কের একজন মূল ব্যক্তি হয়ে যায়। এখন সে বিবাহিত যুবলীগ নেতা হয়ে নিজেই তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন এবং আওয়ামী লীগের জন্য একজন মূল সংগঠক হয়ে উঠেছেন। তিনি ওই ওয়ার্ডে টেলিভিশন সংযোগ বিতরণে একটি কন্ট্রাক্ট পেয়ে যান এবং শহরের অন্যান্য জায়গায়ও তা বিতরণ করেন। তাঁর শক্ত রাজনৈতিক যোগাযোগ থাকাতেই তিনি এই কন্ট্রাক্টটি পেয়ে যান।

হরতাল সংগঠন মূলত একই শ্রেণীক্রম অনুসরণ করে, যেখানে ওপরের সারির নেতারা মধ্যম সারির নেতাদেরকে হরতালের জন্য লোক জোগাড় করতে বলেন এবং তাঁরা তাঁদের নিচের সারির নেতাদের একই কাজ করতে বলেন। এক অর্থে, এক ব্যক্তি বিভিন্ন পর্যায়ের জন্য সংগৃহীত হয়। যেমন যে প্রথম একজনকে সরাসরি জোগাড় করে, তাকে স্থানীয় নেতা বা জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের জন্যও কাজে লাগানো যায়। এভাবে একজন সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীর জন্যও লোক সংগ্রহ হয়ে থাকে।

একই সঙ্গে, কেউ কেউ অনেক সময়ে একজন স্থানীয় নেতাকে এড়িয়ে তাঁর উচ্চপদস্থ নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের লোক জোগাড় করার সামর্থ্য দেখান। এইভাবে বস্তিতে থাকা ছোট নেতারা শ্রেণীবিন্যাসে থাকা ওপরের সারির নেতাদের পাশ কাটিয়ে ওপরে উঠে যেতে পারে। কারণ, তাঁরা রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য লোকসমাগমের মূল উত্স:

ওয়ার্ড কমিটির সঙ্গে মন্ত্রীর ভালো যোগাযোগ আছে, কিন্তু বস্তিগুলো হলো আলাদা বিষয়। স্বাভাবিকভাবে মন্ত্রী ওয়ার্ড কমিটিকেই হরতালে লোক জোগাড় করতে বলে, কিন্তু বস্তির ক্ষেত্রে মন্ত্রী বস্তির নেতাদেরকেও জোগাড় করতে বলেন। যদি ওয়ার্ডের নেতা আমাকে বস্তির কিছু লোক নিয়ে আসতে বলে, আমি অবশ্যই করব। কিন্তু যখন মন্ত্রী সরাসরি আমাকে কাজটা করতে বলেন, আমি দ্বিগুণ উত্সাহিত হই। ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কটি অন্য রকম। এটা খুব স্বাভাবিক নয়, যেখানে মন্ত্রী ওয়ার্ডে লোক সংগ্রহের কথা বলবেন। মাঝেমধ্যে মন্ত্রী ওয়ার্ড কমিটিকে হুমকিও দেন—তোমরা কিছুই করো না; বস্তির লোকেরা অনেক কাজ করে। তোমাদেরকে আমার দরকার নেই, কারণ বস্তির লোকেরা অনেক কাজের।১৫

ছাত্রলীগ থেকে যুবলীগ এবং ক্রমান্বয়ে আওয়ামী লীগ হয়ে ওঠা স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোয় একটি নিত্যকার প্রক্রিয়া। কিন্তু হরতাল হলো একটি বিশেষ আই-ওপেনিং মুহূর্ত। কারণ, এই সময় স্থানীয় বা শহর বা জাতীয় পর্যায়ে নিচু সারির নেতা বা কর্মীরা ওপরের সারির নেতাদের আনুগত্য, নিজের সাংগঠনিক ক্ষমতা এবং গুরুত্ব বোঝাতে সক্ষম হয়। এই প্রক্রিয়ায় বেশির ভাগ দলীয় কর্মীই ঝুঁকিপূর্ণ ছাত্রলীগের কার্যকলাপ থেকে শুরু করে অধিক সংগঠিত যুবলীগের দায়িত্ব পালন করতে পারে, আবার অল্পসংখ্যক কর্মী স্থানীয় উচ্চপর্যায়ের আওয়ামী লীগ কমান্ডে পৌঁছতে পারে। লোকজনকে উচ্চপর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতাদের সম্পর্কে বলে যে এসব নেতা অতীতে সহিংস ছিল, কিন্তু এখন তাদের অবস্থান পাকাপোক্ত। স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোর সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই পাকাপোক্ত অবস্থান অনেকটা স্বাভাবিক আচরণ। কিন্তু দলীয় রাজনীতির ছাত্র বা তরুণ শাখাগুলোতে নেতৃত্বের জন্য সহিংসতা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

সবশেষে, হরতাল কর্মক্ষমতা শুধু দলের বিভিন্ন স্তরের ক্ষমতার ভারসাম্যের ক্ষেত্রেই কার্যকর নয়। এটা স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-সমর্থকদের মধ্যেও ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করে। এটা পরিষ্কার যে ক্ষমতাসীন দলকে মোকাবিলার সামর্থ্য নির্ভর করে বিরোধী পক্ষ স্থানীয় পর্যায়ের নির্দিষ্ট লোকালয়ে কতটা সংগঠিত করার সামর্থ্য রাখে। এই স্থানীয় সামর্থ্য প্রায়শই স্থানীয় পর্যায়ে আন্তদলীয় ক্ষমতার ভারসাম্যের ফলাফল। বস্তির প্রবেশমুখে আওয়ামী লীগের পিকেটিংয়ের স্পষ্ট লক্ষ্য ছিল যেকোনো হরতাল-সমর্থককে সমাবেশে যেতে বাধা দেওয়া।

আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সংগঠকদের সফলতা হলো যে তারা মহড়া ও ভীতির মাধ্যমে বিএনপি-সমর্থকদের পূর্ববর্তী হরতালগুলোতে যেতে বাধা দিতে পেরেছিল। অন্যদিকে বিএনপির সংগঠকেরা তাদের সমর্থকদের কার্যকরভাবে সংগঠিত না করতে পারায় তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে যায়। তবে নির্বাচন ঘনিয়ে এলে ক্ষমতার এই ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটবে। কারণ, তখন বিএনপির সমর্থকেরা তাদের দল ক্ষমতায় আসার প্রত্যাশায় এবং স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোয় নেতা-কর্মীদের অবস্থান দৃঢ় করতে আরও বেশি ঝুঁকি নেবে।

৬. শেষ কথা: হরতালের স্থায়িত্ব

বাংলাদেশের স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামো নির্মাণে হরতাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হরতাল একটি জটিল রাজনৈতিক কর্মক্ষমতা, যেখানে গোষ্ঠী এবং বিশেষ কর্মক্ষমতার পারস্পরিক ক্রিয়া সংঘটিত হয়। হরতাল কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষ্য হলো বহু পর্যায়ের জনগোষ্ঠীকে আকর্ষণ করা। হরতাল শুধু বর্তমান ক্ষমতাকাঠামো কেমন, সেটাই প্রকাশ করে না। এ ছাড়া আরও দুটি পর্যায়ে কাজ করে। এক, হরতালের মাধ্যমে স্থানীয় কর্মীরা নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করে। দুই, হরতাল আঞ্চলিক ও জাতীয় নেতাদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ের যথাযথ প্রতিনিধি নির্বাচনে একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এ ক্ষেত্রে সাংগঠনিক সামর্থ্য ও ঝুঁকি নেওয়া দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে।

এভাবে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, কেন হরতাল সব রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয়, যেখানে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণী এবং আন্তর্জাতিক মহল হরতালের সহিংস ও ধ্বংসাত্মক ভূমিকাকে নিন্দার চোখে দেখে। হরতাল কার্যক্ষমতা শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে, কিংবা বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক জনগণের বিরুদ্ধেই নয়, হরতাল অনেকগুলো বিশেষ কর্মক্ষমতাকে একটি ব্যাখ্যায় দাঁড় করায়। এগুলো বহুপর্যায়ের জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে করা হয়, যা বহুলাংশেই দলীয় স্থানীয় ও জাতীয় উভয় পর্যায়ের ক্ষমতাকাঠামোকে লক্ষ্য করে করা হয়। যদি আমরা এ ধরনের বিশেষ কর্মক্ষমতাকে আলাদা করি, তাহলে বোঝা যাবে, সাধারণ অর্থে যেসব হরতাল ব্যর্থ, যেগুলো নীতি-নির্ধারণে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না, সেগুলোও এসব বিশেষ কর্মক্ষমতায় নিয়োজিত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জন্য সফল হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিশেষ কর্মক্ষমতা বৃহত্তর নীতি-নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে চায় না। এখানে লক্ষ্য হলো অভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠীর (দলের ভেতরে) মনোযোগ আকর্ষণ করা, যার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান দেখানো, বজায় রাখা এবং সুদৃঢ় করা যায়।

এ ক্ষেত্রে হরতালের বিকল্প প্রস্তাবে ঝুঁকির বিষয়টি থাকছে না (আলোচনার জন্য দেখুন, ইউএনডিপি ২০০৫)। ঝুঁকি নেওয়া—সরাসরি সহিংস কাজে অংশ নেওয়া বা কম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবে হরতালের লোক সমাগম করা—দলের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণী কর্তৃক প্রস্তাবিত অহিংস প্রতিবাদে এই প্রয়োজনীয় ঝুঁকির উপাদান থাকে না। এখানে আমরা দেখিয়েছি স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোতে নিজেদের স্থানকে দৃঢ় করতে ঝুঁকি নেওয়ার ইচ্ছা, সাহসী হওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ হরতাল মোকাবিলা করা স্থানীয় কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ঝুঁকি নেওয়ার সামর্থ্য ও ইচ্ছা দলের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন হিসেবে দেখা হয় এবং দলীয় পৃষ্ঠপোষকতার অংশ হিসেবে যোগ্য করে তোলে। স্থানীয় কর্মীদের কাছে এটা স্থানীয় নেতার ক্ষমতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন হিসেবে দেখা হয়। মানববন্ধন বা নীরব মিছিল হরতালের মতো একই রকম পারফরম্যান্সের শক্তি রাখে না।

১৯৯১-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—এই দুই দল এবং দুটি বৈশিষ্ট্য দ্বারাই শাসিত হয়েছে। প্রথমত, আওয়ামী লীগ বা বিএনপি, যে-ই ক্ষমতায় থাকুক, নির্বাচনে বিজয়ীই সব নিয়ে নেবে—এটাই অলিখিত নিয়ম। শুধু ক্ষমতার বেলায়ই নয়, প্রশাসন, পুলিশ এবং ব্যবসার একটি বড় অংশেরও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। দ্বিতীয়ত, জাতীয় ক্ষমতা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে চক্রাকারে চলতে থাকে। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দলই বিজয়ী হয় এবং রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব নিয়ে নেয়। মাঠপর্যায়ের অনেক কর্মীই এই শেষ উপাদানটি প্রত্যাশা করে। মূলত এই প্রত্যাশা থেকেই হরতালে অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। বিজয়ী-সব-পাবে ব্যবস্থায় হরতালে অংশগ্রহণ করা ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু একজন ঝুঁকি নেয়, কারণ তাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করা হয়। তথাপি ক্ষমতাবদলের প্রত্যাশায় হরতাল আনুগত্য প্রদর্শনের কার্যকর উপাদান হিসেবে কাজ করে, যার সংখ্যা নির্বাচন ঘনিয়ে এলে বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিরোধী দলের সংগঠক হিসেবে সাময়িকভাবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকি নেওয়াটা পুরস্কার হিসেবে ধরা হবে, যখন এই বিরোধী দল ক্ষমতায় আসবে। আগেই বলা হয়েছে, এই গবেষণায় মূলত ২০১১ সাল এবং তার পূর্ববর্তী সময়ের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে, তবে ভবিষ্যত্ প্রবণতা হিসেবে আমরা বলতে পারি, ২০১২ ও ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত হরতালগুলোর পারফরম্যান্স এই গবেষণায় মূল বিষয়বস্তুর সঙ্গে খুবই সংগতিপূর্ণ। হরতাল বা রাজনৈতিক সহিংসতার প্রক্রিয়াগত দিকগুলোর ওপর যথাযথ গবেষণা প্রয়োজন।

 

তথ্যসূত্র ও টীকা

১. আমরা হরতাল এবং রাজনৈতিক সক্ষমতা ধারনার ইতিহাস ও বিভিন্ন ভাগের সম্পূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেব না। দেখুন Negara (Geertz 1980); Turner (1969, 1988); Lukes (1975); and Tilly (1977, 1993, 2008). সূচনামূলক পর্যবেক্ষণের জন্য দেখুন, যেমন Burke (2005)and Strauss and Cruise O’Brien (2007)|

২. এটা অন্যান্য ছোট দলগুলোর জন্যও প্রযোজ্য, যদিও আরো ছোট পরিসরে কম তীব্রতা সম্পন্ন হয়।

৩. আমরা ক্ষমতাসীন দল এবং এর সমর্থকদের আরো কার্যকলাপ আলোচনা করব।

৪. দেখুন, ইউএনডিপি বাংলাদেশ (২০০৫)।

৫. গান্ধী পূর্ববর্তী হরতাল সম্পর্কে জানতে দেখুন, হেইটলার (১৯৭২) এবং ইর্শচিক (১৯৮৬)।

৬. যদিও এই বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে দাঁড় করানোর সঠিক জায়গা এটি নয়, তবুও বলা যায়, হরতাল এবং এই ধরনের অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় সামষ্ঠিক কর্মকান্ড, যেমন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, খুবই জটিল প্রকৃতির। যখন স্থানীয় দাঙ্গা সংগঠন (Berenschot 2009, 2011) সম্পর্কে পড়ছিলাম, এই দুটি কার্যের মধ্যে স্পষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। দুটিই সমঝোতার নিত্য সম্পর্কে প্রোথিত এবং নির্বাচনের সময় আসলে আরো সংকটপূর্ণ হয়ে যায় (আরো দেখুন Brass 2003) । অবশ্যই দুটির মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করার সুযোগ রয়েছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আরো বেশি ধ্বংসাত্মক ধরণকে বিবেচনায় নিলে, দলীয় এবং সাম্প্রদায়িক বিভেদের মধ্যে এবং এই দুটি প্রপঞ্চের মধ্যে হরতাল এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলাকালীন সময়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক গতিপথ এবং পরিস্কার পার্থক্য পাওয়া যায়। তাছাড়া হরতালের চেয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উপরে অধিক পরিমাণে গবেষণা হয়েছে (ইতিমধ্যে উল্লেখ্যগুলো ছাড়াও যেমন, Das 1990, 2007; Hansen 2001; Kakar 1996; and Sen 2007)।

৭. বাংলাদেশে ১৯৯০ সাল থেকে সংসদীয় নির্বাচন করার লক্ষ্যে একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়। ধরে নেওয়া হয় যে এই সরকার হবে নির্দলীয় এবং দায়িত্ব হবে সীমিত সময়ের জন্য। কিন্তু এই সরকারের উপদেষ্টাদের বাছাই প্রক্রিয়ায় প্রচণ্ড রাজনৈতিক সংঘাত এবং অচলাবস্থার সৃষ্ঠি হয়, যেখানে বিরোধী দল হরতালকে একটি প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে।

৮. বস্তির তরুণদের সঙ্গে ফোকাস গ্রুপ আলোচনা, ২২ মার্চ ২০১১, চট্টগ্রাম।

৯. চট্টগ্রাম বিএনপি-এর ওয়ার্ড পর্যায়ের নারী নেত্রী সঙ্গে সাক্ষাত্কার, ১১ মার্চ ২০১১, চট্টগ্রাম।

১০. একজন আওয়ামী লীগ নেতা এবং ব্যবসায়ীর সঙ্গে সাক্ষাত্কার, ২৫ মার্চ ২০১১, চট্টগ্রাম।

১১. বস্তিবাসীর সঙ্গে ফোকাস গ্রুপ আলোচনা, ১৭ মার্চ ২০১১, চট্টগ্রাম।

১২. বস্তির তরুণদের সঙ্গে ফোকাস গ্রুপ আলোচনা, ২২ মার্চ ২০১১, চট্টগ্রাম।

১৩. প্রায়ই বলা হয়ে থাকে যে টাকার জন্যই মানুষ হরতালে অংশগ্রহণ করে। যদিও টাকা প্রত্যেকদিনই দেওয়ার প্রস্তাব করা হয় এবং অবশ্যই একটা প্রণোদনা, তথাপি আমরা অন্য জায়গায় দেখাবো যে শুধু টাকাই এই ব্যাখ্যার জন্য যথেষ্ঠ নয়।

১৪. যুবলীগ নেতার সঙ্গে সাক্ষাত্কার, ২৪ মার্চ ২০১১, চট্টগ্রাম।

১৫. জ্যেষ্ঠ আওয়ামী লীগ ওয়ার্ড সংগঠকের সঙ্গে সাক্ষাত্কার, ২৫ মার্চ ২০১১, চট্টগ্রাম।

 

গ্রন্থপঞ্জি

Abeles, Marc. ‘Modern Political Ritual: Ethnography of an Inauguration and a Pilgrimage by President Mitterrand.’ Current Anthropology 29 (3): 391-404, 1988.

Ahmed, Iraz and Golam Mortoza. ‘The Anatomy of Hartals: How to Stage Hartal.’ In Beyond Hartals: Towards Democratic Dialogue in Bangladesh, UNDP, 25-30. Dhaka: UNDP Bangladesh, 2005.

Berenschot, Ward. ‘Rioting as Maintaining Relations: Hindu-Muslim Violence and Political Mediation in Gujrat, India.’ Civil Wars 11 (4): 414-33, 2009.

Berenschot, Ward. Riot Politics: Hindu-Muslim Violence and Indian State. London: Hurst & Company, 2011.
Brass, Paul R. The Production of Hindu-Muslim Violence in Contemporary India. Seattle and London: University of Washington Press, 2003.

Burke, Peter. ‘Performing History: The Importance of Occasions.’ Rethinking History 9 (1): 35-52, 2005.

Das, Veena, ed. Mirrors of Violence: Communities, Riots and Survivors in South Asia. Delhi: Oxford University Press, 1990.

Das, Veena, ed. Life and Words: Violence and the Descent into the Ordinary. Berkeley: University of California Press, 2007.

Esherick, Joseph W. ‘Afterword: The Hiesenberg Principle of Political Performance.’ In Staging Politics: Power and Performance in Asia and Africa, edited by J.C. Strauss and D.B. Cruise O’Brien, 243-50. London: I.B. Tauris, 2007.

Foucher, Vincent. ‘“Blue Marches”: Public Performances and Political Turnover in Senegal.’ In Staging Politics: Power and Performance in Asia and Africa, edited by J.C. Strauss and D.B. Cruise O’Brien 111-32. London: I.B. Tauris, 2007.

Geertz, Clifford. Negara: The Theatre State in Nineteenth-Century Bali. Princeton: Princeton University Press, 1980.

Hansen, Thomas Blom. Wages of Violence: Naming and Identity in Postcolonial Bombay. Princeton: Princeton University Press, 2001.
Hansen, Thomas Blom. ‘Politics as Permanent Performance: The Production of Political Authority in the Locality.’ In The Politics of Cultural Mobilization in India, edited by J. Zavos, A. Wyatt and V. Hewitt, 19-36. New Delhi: Oxford University Press, 2004.

Hasan, M, ed. The State of Governance in Bangladesh 2006: Knowledge, Perceptions, Reality. Dhaka: Centre for Governance Studies, 2006.

Heitler, Richard. ‘The Varanasi House Tax Hartal of 1810-11.’ Indian Economic and Social History Review 9 (3): 239-57, 1972.

Hossain, Akhtar. ‘Anatomy of Hartal Politics in Bangladesh.’ Asian Survey 40 (3): 508-29, 2000.

Irschick, Eugene F. ‘Gandhian Non-Violent Protest: Rituals of Avoidance or Rituals of Confrontation?’ Economic and Political Weekly 21 (29): 1276-85, 1986.

Jaoul, Nicolas. ‘Dalit Processions: Street Politics and Democratization in India.’ In Staging Politics: Power and Performance in Asia and Africa, edited by J.C. Strauss and D.B. Cruise O’Brien, 173-94. London: I.B. Tauris, 2007.

Kakar, Sudhir. The Colors of Violence: Cultural Identities, Religion, and Conflict. Chicago: University of Chicago Press, 1996.

Kaviraj, Sudipta. ‘The Politics of Performance: Gandhi’s Trial Read as Theatre.’ In Staging Politics: Power and Performance in Asia and Africa, edited by J.C. Strauss and D.B. Cruise O’Brien, 71-90. London: I.B. Tauris, 2007.

Kochanek, Stanley A. ‘Governance, Patronage Politics, and Democratic Transition in Bangladesh.’ Asian Survey 40 (3): 530-50, 2000.

Kong, Lily. ‘The Construction of National Identity Through the Production of Ritual and Spectacle: An Analysis of National Day Parades in Singapore.’ Political Geography 16 (3): 213-39, 1997.

Lukes, Steven. ‘Political Ritual and Social Integration.’ Sociology 9 (2): 289-308, 1975.

McLeod, James R. ‘The Sociodrama of Presidential Politics: Rhetoric, Ritual, and Power in the Era of Teledemocracy.’ American Anthropologist 101 (2): 359-73, 1999.

Moniruzzaman, Md. ‘Party Politics and Political Violence in Bangladesh: Issues, Manifestation and Consequences.’ South Asian Survey 16 (1): 81-99, 2009.

Rahman, Muhammad Mustafizur. ‘Origins and Pitfalls of Confrontational Politics in Bangladesh.’ South Asian Survey 14 (1): 101-15, 2007.

Rashiduzzaman, M. ‘Political Unrest and Democracy in Bangladesh.’ Asian Survey 37 (3):n 254-68, 1997.

Sen, Atreyee. Shiv Sena Women: Violence and Communalism in Bombay Slum. London: Hurst & Company, 2007.

Tilly, Charles. ‘Getting it Together in Burgundy, 1675-1975.’ Theory and Society 4 (4): 479-504, 1977.

Tilly, Charles. ‘Contentious Repertoires in Great Britain, 1758-1834.’ Social Science History 17 (2): 253-80, 1993.

Tilly, Charles. Contentious Performances. Cambridge: Cambridge University Press, 2008.

Tripp, Charles. ‘“In the Name of People”: The “People’s Court” and the Iraqi Revolution.’ In Staging Politics: Power and Performance in Asia and Africa, edited by J.C. Strauss and D.B. Cruise O’Brien, 31-48. London: I.B. Tauris, 2007.

Turner, Victor W. The Ritual Process: Structure and Anti-structure. London: Routledge and Kegan Paul, 1969.

Turner, Victor W. The Anthropology of Performance. New York: PAJ Publications, 1988.

Schendel, Willem Van. A History of Bangladesh. Cambridge: Cambridge University Press, 2009.

Strauss, Julia C. and Donal B. Cruise O’Brien. ‘Introduction.’ In Staging Politics: Power and Performance in Asia and Africa, edited by J.C. Strauss and D.B. Cruise O’Brien, 1-14. London: I.B. Tauris, 2007.

UNDP. Beyond Hartals: Towards Democratic Dialogue in Bangladesh. Dhaka: UNDP Bangladesh, 2005.

Verkaaik, Oskar. Migrants and Militants: Fun and Urban Violence in Pakistan. Princeton: Princeton University Press, 2004.

 

pathok

যোগাযোগের ঠিকানা

সিএ ভবন,
১০০ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,
কারওয়ান বাজার, ঢাকা - ১২১৫।

ফোন: ৮৮০-২-৮১১০০৮১, ৮১১৫৩০৭
ফ্যাক্স - ৮৮০-২-৯১৩০৪৯৬

protichinta kinte chile